টাঁড়বাঘোয়া (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আমি লক্ষ করলাম যে, আমার রাইফেলটা আমার হাতে নেই। টেড-এর পাশে একটা পাথরে রেখে এসেছিলাম রাইফেলটা।

টেড-এর হাতে রাইফেল তার শক্ত মুঠিতে ধরা। ও আমার পায়ের দিকে মুখ করে আছে, আমাকেই দেখছে যেন, এমন ভাব করছে আসলে তাকিয়ে আছে আমার পেছনে।

হঠাৎ ঝরঝর করে মাটি আর নুড়ি পাথর খসে পড়ার আওয়াজ হল আমার ঠিক পেছনে।

আমি বুঝলাম কোনও জানোয়ার আমার ঘাড়ে লাফাবার মতলব ছিল, কোনও কারণে সে পা পিছলে অথবা ইচ্ছে করে সরে গেছে।

টেড স্বাভাবিক গলায় বলল, আর চুপ করে থাকার দরকার নেই। ভাব দেখা যেন কিছুই হয়নি। সেই গানটা গা-না, যেটা গাইছিলি একটু আগে।

আমার পেছনে নিশ্চয়ই বাঘিনী। হাতে রাইফেলও নেই। আর টেড গান গাইতে বলছে। কিন্তু নিরুপায় আমি। নিশ্চয়ই গান গাওয়াটাও এখন দরকার। তাই জোরে আবার গান ধরলাম আমি, ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা…।

হঠাৎ আমাকে চমকে দিয়ে ডানদিকে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েই টেড আমার গায়ে যাতে গুলি না লাগে এমনভাবে রাইফেলটা কাঁধে তুলেই গুলি করল। গুলি করতেই, প্রচণ্ড হুংকার শুনলাম আমার পেছনের জঙ্গলে। এবং সঙ্গে সঙ্গে আমি ওখান থেকে লাফিয়ে সামনে পড়ে আমার রাইফেলটা হাতে তুলে নিলাম।

ট্রেড দৌড়ে উল্টোদিকের পাড়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। আমিও দৌড়ে ওর ডানদিকে গিয়ে দাঁড়ালাম।

দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে রইলাম সেদিকে, যেদিক থেকে গর্জন করেছিল বাঘিনী। কিন্তু আমাদের আর খুঁজতে হল না তাকে। গাছপালা ঝোঁপঝাড় কামড়ে-আঁচড়ে ভেঙে-চুরে মাটি পাথর সব উপড়ে ফেলে বাঘিনী যে কী প্রলয় উপস্থিত করল তার বর্ণনা লিখতেও আজ এত বছর পরেও হাত ঘেমে উঠছে আমার।

টেড-এর গুলি বাঘিনীর পিঠ আর পেটের মধ্যে মেরুদণ্ডে লেগেছিল। তবে তার গর্জন এবং যন্ত্রণা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। টেড-এর হেভী রাইফেলের আর একটি গুলি ততক্ষণে তার কাঁধ দিয়ে ঢুকে বুকের ডানদিক দিয়ে বেরিয়ে গেছিল। আমার রাইফেলের একটি গুলি লেগেছিল তার মাথার পেছনে।

আমি যে জায়গাতে গিয়ে পৌঁছেছিলাম সেখান থেকে মাথার পেছনটাই দেখা যাচ্ছিল শুধু।

বাঘিনী শান্ত হল অনেকক্ষণ থর থর করে কেঁপে।

যাঁরাই নিজেরা গুলি করে কখনও কোনও জানোয়ার মেরেছেন, সে মানুষখেকো বাঘই হোক, আর যাইই হোক, তাঁরাই জানেন যে, সেই জানোয়ার যখন মারা যায় তখন বড় কষ্ট হয়। মনটা বড়ই খারাপ হয়ে আসে। কিন্তু এবারে আমাদের টাঁড়বাঘোয়া আর তার সঙ্গিনীকে না মেরে উপায় ছিল না।

টেড ধেই ধেই করে লাফাতে লাগল, ঢানা ঢান্যে ফুস্ফে বারা আমাডের বশুরা বলে গান গাইতে গাইতে।

আমি বললাম, কী সাংঘাতিক চালাক দেখেছিস বাঘিনী। একটু হলে তো আমাকে খেয়েই ফেলত!

টেড বলল, চালাকেরও বাবা থাকে। বাঘিনী আমাদের কোথা থেকে ফলো করেছিল বল তো?

কোথা থেকে?

সেই যেখানে হনুমানরা ফিরে গেল, আমরা ভাবলাম, জানোয়ারটাও ফিরে গেল, সেইখান থেকে। ওটা ওর একটা কায়দা। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তোকে কিছু বলিনি। ভেবেছিলাম, সময় মতো বলব। কিন্তু যে বাঘিনী অতগুলো গুলির শব্দ শোনার পরও ভর দুপুরে দু দুজন শিকারীকে এতখানি ফলো করে আসে সে নতুন নয়। এখন আমার মনে হচ্ছে কী জানিস? মনে হচ্ছে টাঁড়বাঘোয়া একটি মানুষও খায়নি। সবই এই বাঘিনীর কাজ। তা না হলে দ্যা টিকায়েতের গুলি তো খেয়েছিল সে গত বছর গরমের সময়। এই গত একবছরে একজনকেও সে ধরল না কেন?

ভাববার মতো কথা, আমি বললাম।

তারপর বললাম, আমরা দুজনেই তো সমান অথরিটি। তার চেয়ে চল, কলকাতায় ফিরে ঋজুদাকে ভাল করে সব বলে ব্যাপারটা আসলে কী তা জিজ্ঞেস করব।

টেড বলল, নট আ ব্যাড আইডিয়া।

তারপর বলল; আর এখানে নয়। এবার তাড়তাড়ি ফেরা যাক। অনেক কাজ বাকি আমাদের; গ্রামের লোকদের।

আমি বললাম, টিকায়েতের সঙ্গী দুজনকে ধরে ঠ্যাঙাব কিন্তু আমি। মিথ্যক পাজী লোকগুলো।

টেড বলল, ওদের ঠ্যাঙানোই উচিত।

যে জায়গাটা দিয়ে আমরা তখন যাচ্ছিলাম, সেই জায়গাটা খুব উঁচু।

ওখানে দাঁড়িয়ে দারুণ দেখাচ্ছিল নীচের পলাশে পলাশে লাল-হয়ে-যাওয়া পলাশবনা বস্তী, তার আশেপাশের জঙ্গল আর টাঁড়কে; দুপুরের আলোতে।

আঁধি উঠছে। ধুলোর মেঘের আস্তরণে ছেয়ে গেছে চারদিক। রুখু হাওয়ায় নাক চোখ জ্বালা জ্বালা করে। অথচ ভালও লাগে। দম দম হাওয়ায় মহুয়া করৌঞ্জ আর নানা ফুলের মিশ্র গন্ধ ভেসে ভেসে আসছে ছুটোছুটি করে, মনে হচ্ছে যেন কোনও খেলায় মেতেছে ওরা; কে কার আগে এসে পৌঁছবে।

গরু চরছে বস্তীর মাঠে, প্রান্তরে, মুরগী ছাগল ডাকছে। আটার কলে গম পেষাই হচ্ছে, তার পুপ পুত্ পুষ্প পুত্ আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসছে। হাওয়াতে। লালরঙা হনুমান ঝাণ্ডা উড়ছে অশ্বত্থ গাছের মগডাল থেকে। রুক্ষ উদাস প্রকৃতি, বড় গরীব কিন্তু বড় ভাল মানুষজন; কী শান্তি চারদিকে!

চলতে চলতে নীচে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম, বন-পাহাড় ঘেরা এই শান্তির বস্তী পলাশবনাতে দুজন রাজা ছিল। একজন টিকায়েত। আর অন্যজন টাঁড়বাঘোয়া। যদিও একেবারেই আলাদা ছিল তাদের রাজত্বের রকম, তাদের প্রজাদের চেহারা। তাদের চরিত্র। কিন্তু এই দুই রাজার মধ্যে সত্যিকারের কোনও ঝগড়া ছিল না। দুজনেই দুজনকে চিরদিন সমীহ করে চলত। ভুল বোঝাবুঝির জন্যেই এই দুপুরে তারা দুজনেই এক মর্মান্তিক ঝগড়ার পরিণতির শিকার হয়ে জঙ্গলের মধ্যের এক অনামা নদীর ঝরনার পাশে শুয়ে রয়েছে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত হয়ে, বালিতে, পাথরে, জলে মাটিতে, রোদে ছায়ায়।

একই সঙ্গে।

টেড আমার আগে আগে চলছিল।

আমি টেডকে বললাম, আমার কী মনে হয় জানিস? মনে হয়, সমস্ত ঝগড়া, যতরকম ঝগড়া হয়, হয়েছে আজ পর্যন্ত এবং হবে মানুষে মানুষে, দেশে দেশে এবং একদিন হয়তো এক গ্রহের সঙ্গে অন্য গ্রহের, সেই সমস্ত ঝগড়ার পেছনেই একটিই মাত্র কারণ থাকে; ভুল বোঝাবুঝি।

ভারী দুঃখের। তাই না?

টেড এখন কোনও কথাই শুনতে রাজি নয়। ও ওর রাইফেলটা বাঁ কাঁধে ফেলে মাথার চুল ঝাঁকিয়ে বড় বড় পা ফেলে গান গাইতে গাইতে এগোচ্ছিল–ঢন ঢান্নে ফুস্ফে বারা আমাডের বশুন্ডরা।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *