শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

সাত

কলকাতায় ফিরেও শিশিরবাবুর মৃত্যুটা আমায় হন্ট করছিল। শিশিরবাবুর মৃতদেহটা যেভাবে মাটিতে পড়েছিল, তাতে মনে হয় উনি যখন বাড়িতে ঢুকছিলেন তখনই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। কিন্তু তাই যদি হবে, তাহলে দরজাটা ওরকম পরিপাটি ভাবে ভেজানো থাকবে কেন? এটার কোনো সদুত্তর নেই। কেউ বাড়িতে ঢুকে হাত পেছন করে দরজা ভেজিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে না। যে-ভাবে ওঁর দেহ পড়ে ছিল, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় যে পড়ার আগে উনি ঘরের ভেতরের দিকে মুখ করে ছিলেন। দরজাটা ভেজিয়ে ছিটকিনি না আটকিয়ে উলটোদিকে ঘুরবেন কেন? এর একটা সম্ভাব্য উত্তর হয়তো ছিটকিনি খুলে বেরোতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু কিছু একটা ভুলে ফেলে যাচ্ছেন বলে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন।

কেন জানি না, এটা খুব যুক্তিযুক্ত মনে হল না। তাহলে কি কোনো আততায়ী বাড়িতে ঢুকে অপেক্ষা করছিল? কিন্তু সে বাড়ির ভেতর ঢুকল কি করে? তালা ভেঙে নিশ্চয় ঢোকেনি। সেক্ষেত্রে তালা আর চাবি ভেতরে মেঝেতে পড়ে থাকত না। তারচেয়েও বড়ো কথা, বাড়ির দরজায় তালা না দেখে কেউ বাড়িতে ঢুকেছে বলে শিশিরবাবুর নিশ্চয় সন্দেহ হত। একা একা ওভাবে ঢুকতেন না।

আর একটা সম্ভাবনাও বাদ দিতে পারি না। যদি ধরি নিই উনি বাড়িতে ঢুকছিলেন না, বেরোচ্ছিলেন, আর তখনই আততায়ী এসে দরজায় কড়া নাড়ে। উনি দরজা খুলতেই ঠেলে ভেতরে ঢুকে ওঁকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল হয়তো চুরি করা। খুনটা অ্যাকসিডেন্ট, যাকে বলা যেতে পারে ইনভলান্টারি ম্যানফ্লটার। কিন্তু কী নিতে লোকটা এসেছিল?

কলকাতা ছাড়ার দুদিন আগে প্রভাসের ফোন পেলাম। যেটুকু বুঝলাম, সেটা হল ওসি নিজেই শিশিরবাবুর মৃত্যুর তদন্ত করছেন। এর মধ্যে প্রভাসকে নিয়ে শিশিরবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন, যদি প্রভাসের চোখে পড়ে দামি কোনো জিনিস অদৃশ্য হয়েছে! কিন্তু সেরকম কিছুই প্রভাসের নজরে আসেনি। তবে একটা জিনিস দেখে ও বেশ অবাক হয়েছে। সেটা হল, একগুচ্ছ পুরোনো চিঠি খাবার টেবিলের উপর পড়েছিল। শিশিরবাবু খাবার টেবিলে কাগজপত্র কখনোই রাখতেন না। কথাটা ওসি-কে বলায় তিনি জানান যে চিঠিপত্রগুলো মেঝেতে ছিল, ওঁর লোকেরাই ওগুলো তুলে টেবিলে রেখেছে। চিঠিপত্রগুলো বাস্তবিকই পুরোনো। প্রভাস শুধু দুয়েকটা চিঠির ওপরেই চোখ বুলিয়েছে। সেগুলো প্রেমপত্র। প্রভাসের মনে হয়েছে লেখার ছাঁদ মেয়েলি। স্টাইলটাও। মনে হয় শিশিরবাবুকে উদ্দেশ্য করেই এককালে কেউ সেগুলো লিখেছিলেন। প্রশ্ন হল, চিঠিগুলো কোথায় ছিল, আর মেঝেতে পড়েছিল কেন? কেউ কি এই চিঠিগুলোর মধ্যে কোনো একটা বিশেষ চিঠির খোঁজে এসেছিল? কিন্তু এই পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে লেখা প্রেমপত্রে এমন কী কথা লুকিয়ে থাকতে পারে যার জন্য এত বছর বাদে কেউ সেটা চুরি করতে আসবে? হয়তো অন্য কোনো দরকারি কাগজ চিঠিগুলোর সঙ্গে ছিল। সেইটে বার করবার সময়েই চিঠিগুলো মাটিতে পড়ে গেছে। তালা-চাবির ব্যাপারে আমার মনের মধ্যে যে চিন্তাটা ঘুরছিল, সেটাও প্রভাতের কথায় পরিষ্কার হল। পুলিশের লোকরা বাড়ির আশেপাশে পরীক্ষা করতে গিয়ে দরজার বাইরে বারান্দার মেঝেতে একটা চাবি পেয়েছে। চাবিটা বাইরের তালার। কিন্তু বাইরের চাবিতে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে তার সঙ্গে ভেতরের চাবির ফিঙ্গার প্রিন্টের মিল নেই। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এক একাধিক লোক শিশিরবাবুর ঘরে ঢুকেছিল এবং কোনো কাগজপত্রের খোঁজে এসেছিল। ওসি-রও ধারণা এটা সম্ভবত কোনো ইচ্ছাকৃত খুন নয়। কেউ বা কারা কিছু চুরি করতে এসেছিল। দুবর্তৃতরা বাড়িতে থাকাকালীন শিশিরবাবু ফিরে আসেন। তখন ধাক্কাধাক্কি হয় –তাতেই বৃদ্ধ পড়ে গিয়ে মারা যান। তবে মনে হল শান্তিনিকেতনের পুলিশের উপর প্রভাসের বিশেষ আস্থা নেই। সবকিছু বলার পর আমাকে জিজ্ঞেস করল, “একেনবাবু কি এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন?”

আসলে একেনবাবুর কথা একটু ফলাও করেই সেদিন প্রভাসকে বলেছিলাম। বললাম, “বলতে পারি, কিন্তু তোমাদের শান্তিনিকেতনের পুলিশ কি ওঁর কথা শুনবে?”

প্রভাস কিছু বলার আগে, বন্দনা ফোনটা ধরল। নিশ্চয় প্রভাসের কাছে বেড়াতে গেছে। বলল ওরা ঠিক করেছে সিভিল ম্যারেজ করবে। তিরিশ দিনের নোটিস দিতে হবে। ওদের দুজনেরই খুব ইচ্ছে বিয়েতে আমি সাক্ষী হই। আমি কি যাওয়াটা একটু পেছোতে পারি?

“কোনো উপায় নেই রে, আমার ক্লাস শুরু হচ্ছে। তবে আমার বেস্ট উইশেস রইল।”

বন্দনা মনে হল একটু দুঃখিত হয়েছে। কিন্তু আসলে ও বেশ বুঝদার মেয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *