শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ 

খাওয়াদাওয়ার পর শ্যামলবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “মেলায় কখন যেতে চান?”

 

প্রমথ উলটে জিজ্ঞেস করল, “আপনাদের কখন সুবিধা?”

 

“আমরা খুব ফ্লেক্সিবল। তবে দুপুরে নিশ্চয় আপনারা একটু ঘুমোবেন।”

 

বাঁচা গেল! মনে মনে ভাবলাম। মুখে বললাম, “সেই ভালো, আপনারা দুজন একটু জিরিয়ে নিন। আমরা ট্রেনে খুব ঘুমিয়েছি।”

 

“আপনারা কি তাহলে এখন মেলায় যাবেন?”

 

“মেলায় না। ভাবছি প্রভাসের সঙ্গে শান্তিনিকেতনটা একটু ঘুরে দেখি। তোমার অসুবিধা নেই তো প্রভাস?”

 

“এতটুকু নয়।”

 

“এক্সলেন্ট! তাহলে আমরা একটু ঘুরে-টুরে তারপর মেলায় যাব। বিকেলে মেলাতেই আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে।”

 

শ্যামলবাবু বললেন, “মেলার ঐ ভিড়ে খুঁজে পাবেন?”

 

“ঠিক খুঁজে নেব, একদম ভাববেন না,” প্রমথ বলল। “না পেলে তো আমরা ফিরেই আসছি। রাত্রে এখানে দেখা হবে।”

 

শ্যামলবাবু আড্ডাবাজ লোক। মনে হল সঙ্গ হারিয়ে একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলেন।

 

শ্যামলবাবু আর রিতা শুতে চলে যাওয়ার খানিক বাদেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে পূর্বপল্লীর রাস্তা ধরে রেললাইনের দিকে এগোলাম। রাস্তার বাঁ দিকে এককালে খোয়াই ছিল –মাইলের পর মাইল লালমাটির উঁচু নিচু জমি –মাঝে মধ্যে কয়েকটা করে তালগাছ। সে খোয়াই অবশ্য অদৃশ্য হতে শুরু করেছে আমার জন্মের আগে থেকেই। কিন্তু আগেরবার যখন এসেছি, তখনও কিছু কিছু ফাঁকা জায়গা চোখে পড়ত। এখন শুধু বাড়ি আর বাড়ি। পূর্বপল্লীর পুরোনো বাড়িগুলোর সঙ্গে লাগোয়া জমি থাকত প্রচুর। বিশ্বভারতী ট্রাস্টের জমি দু’বিঘার কমে লিজ দেওয়া হত না। এখন সেসব গেছে। নতুন পূর্বপল্লীতে তিনকাঠা পাঁচকাঠার প্লটও বিক্রি হচ্ছে। গায়ে গায়ে লেগে বাড়ির সারি। শান্তিনিকেতন

 

পশ্চিমবঙ্গের আরেকটা মফস্বল শহর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

 

“আপনাদের কোনো তাড়া নেই তো?” প্রভাস প্রশ্ন করল।

 

প্রভাস আমাকে দুয়েকবার চেষ্টা করে তুমি বললেও প্রায়ই ‘আপনি’-তে ফিরে আসছে। আমি ওকে শোধরাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়েছি। যা ওর সুবিধা বলুক।

 

“না, কেন বলত?”

 

কাঁধের ঝোলাটা দেখিয়ে প্রভাস বলল, “আমাকে একটা বই ফেরত দিতে হবে অবনপল্লীতে। কাছেই, বেশি সময় লাগবে না।”

 

“লাগুক না সময়, হাঁটার জন্যই তো বেরোনো। বুঝেছ, একটা জিনিস বেশ লাগছে –বাড়ির এই নামগুলো। বাঙালিরা যে কাব্যপ্রেমিক, সেটা বাড়ির নামগুলো দেখলেই বোঝা যায়।”

 

“নামগুলো কাব্যিক, প্রমথ বলল। “কিন্তু গুরুদেব দেখলে হার্টফেল করতেন। ‘রূপসী’ না লিখে লিখেছে “রুপসি”!”

 

প্রভাস মুচকি হেসে বলল, “বানানের পরীক্ষায় এখানকার অনেক কন্ট্রাক্টারই বোধহয় ফেল করবেন।”

 

“আজকাল ‘রুপসি’ বানানটাই বোধহয় চলে,” আমি বললাম।

 

“ইডিয়েটের মতো কথা বলিস না, ‘রূপসি’ চলতে পারে, ‘রুপসি’ চলে না।“

 

“না চললেও এসে যায় না,” প্রভাস বলল। “আফটার অল প্রপার নাউন।”

 

“তার মানে?”

 

“ধরুন,আপনার কোনো বন্ধুর নাম সূর্য। তিনি নিজের নামের বানান লিখলেন ‘সুর্য’। এতে আপত্তির কী আছে?”

 

“কিছুই নেই, শুধু বাংলার বাপের শ্রাদ্ধ, প্রমথ গম্ভীরভাবে বলল।

 

“না, না, সিরিয়াসলি। বাপিদার বন্ধু তো সত্যি করে সূর্য নন। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি সূর্যকে চিনি কিনা। আমি বলব, নিশ্চয় চিনি। মেঘ না থাকলে সারা দিনই তো চোখে পড়ছে। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করেন, সুর্যকে চিনি কিনা। আমাকে বলতেই হবে চিনি না। কারণ বাপিদার সেই বন্ধুকে আমি সত্যিই চিনি না। এক্ষেত্রে সুর্য হলেন শুধু বাপিদার বন্ধু, সে নামের অন্য অর্থ থাকার কী প্রয়োজন?”

 

“কথাটা মন্দ বলনি,” আমি বললাম। “এক বাক্যে বাড়ির মালিকদের পাপ খন্ডন।”

 

“এটা আমার কথা নয়। যাঁর বাড়ি যাচ্ছি, আমাদের মাস্টারমশাই শিশিরবাবুর কথা। ওঁর বাড়ির নাম নীলিন।”

 

“তাঁর অর্থ কি?”

 

“নিলীন কথাটার অর্থ আছে, কিন্তু নীলিনের নেই। সেই সূর্য আর সুর্যের ব্যাপার। আমি একদিন ওঁকে বলেছিলাম, “বানানটা কারেক্ট করিয়ে নিন, চোখে বড় লাগে।” তার উত্তরে এই কথাগুলো বলে উনি বলেছিলেন, শান্তিনিকেতনে এই নামে আর দ্বিতীয় বাড়ি পাবে না।”

 

কয়েকমিনিটের মধ্যেই আমরা গন্তব্যস্থলে গিয়ে পৌঁছলাম। ছোট্ট একতলা বাড়ি, সংস্কারের অভাবে একটু জরাজীর্ণ। সামনে বেশ কিছুটা জমি। হঁটের দেয়াল জায়গায় জায়গায় ধ্বসে পড়েছে। সেখান দিয়ে কুকুর ছাগল, এমন কি গরু মহিষও ঢুকে পড়তে পারে। গেটটাও হাট করে খোলা। তার একটা পাল্লার পাশে গাছের অনেক মরা ডাল স্তূপাকৃতি করে রাখা। দেখলে মনে হয় অনেকদিন ধরেই সেগুলো ওখানে পড়ে আছে, সুতরাং গেটটা বোধহয় খোলাই রাখা হয়। এতটা জমি, কিন্তু কয়েকটা বড়ো ইউক্যালিপ্টাস, দুটো পেয়ারা আর একটা খেজুর গাছ ছাড়া আর কিছুই দেখলাম না। একটা পেয়ারা গাছকে আবার উইপোকা ধ্বংস করছে। মরা ডালগুলো হয়তো ওই পেয়ারা গাছেরই।

 

এমন সময়ে শুনলাম একটা কেউ কেউ আওয়াজ। একটা নেড়ি কুত্তাকে দুটো অল্প বয়সি ছেলে দড়ি দিয়ে বেঁধে বাড়ির পেছন থেকে টানতে টানতে নিয়ে বেরিয়ে এল।

 

“এই কী হচ্ছে?” বলে প্রভাস একটা বকুনি দিতেই ছেলেদুটো কুকুর ফেলে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ভোঁ-দৌড়! কুকুরটাও মুক্তি পেয়ে দড়ি সুধুই দ্রুত পালাল।

 

“মাস্টারমশাই ভালো লোক বলে যে যার খুশি এখানে ঢুকে বদমায়েশি করে!” বিরক্ত হয়ে প্রভাস বলল।

 

“ওঁর একটা মালি রাখা উচিত,” আমি বললাম।

 

কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে প্রমথ মন্তব্য করল, “ঠিকই বলেছিস, কয়েকটা ফুল গাছ থাকলে বাড়িটা এত ন্যাড়া লাগত না!”

 

প্রভাস বোধহয় আমাদের কথায় একটু ব্যথা পেল। বলল, “পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ। একা মানুষ, বইপত্র নিয়েই পড়ে থাকেন।”

 

বাড়ির দরজার সামনে ছোট্ট বারান্দা। সেখানে বেতের চেয়ারের উপর একটা পত্রিকা পড়ে আছে। প্রমথ সেই চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে পত্রিকার পাতা উলটোতে লাগল। প্রভাস কড়া নাড়তে নাড়তে উচ্চস্বরে ডাক দিল, “মাস্টারমশাই!”

 

কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না।

 

“ওঁর কাজের লোকটা দু’দিন হল গ্রামে গেছে। উনি আবার কানেও ভালো শোনেন না।” আমাদের উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলে প্রভাস আবার জোর গলায় ডাকল, “মাস্টারমশাই, মাস্টারমশাই।”

 

উত্তর নেই।

 

“তাহলে কি কোথাও গেছেন?” প্রভাস আত্মগত ভাবেই কথাটা বলল।

 

“আমি একটু দেখি,” বলে প্রমথ চেয়ার থেকে উঠে দরজায় একটা ধাক্কা দিতেই একটা কপাট পুরো খুলে গেল।

 

“ও মাই গড!” প্রমথ এক পা পিছিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। “আই থিঙ্ক হি ইজ ডেড!”

 

আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম মেঝেতে কেউ পড়ে আছে। শুধু কোমরের নীচটা দেখা যাচ্ছে, উপরটা কপাটের আড়ালে। রক্ত আর রক্ত, সারা জায়গাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

 

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমরা হতচকিত হয়ে গেলাম। প্রভাস ভেতরেও ঢুকল না, দৌড়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে প্রবল বেগে কড়া নাড়তে শুরু করল। আমিও ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজা খুললেন একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক। ধুতিটা লুঙ্গির মতো করে

 

রা, গায়ে গেঞ্জি, চাদরটা গায়ের একপাশে ঝুলছে –বোধ হয় ঘুমের তোড়জোড় করছিলেন।

 

“কি ব্যাপার?”

 

“ডাক্তারবাবু, এক্ষুণি আসুন। মাস্টারমশাই বোধ হয় মারা গেছেন।”

 

“সেকি!”

 

ডাক্তারবাবু, সেই অবস্থাতেই ভেতর থেকে একটা ডাক্তারি ব্যাগ আর স্টেথিসস্কোপটা নিয়ে এসে বললেন, “চলুন।”

 

অন্য কপাটটা খোলা যাচ্ছে না। ডাক্তারবাবু (পরে নাম জেনেছি ডাক্তার অরুণ চৌধুরী) কাঁধটা একটু পাশ করে দরজার ফাঁক দিয়ে গলে ভেতরে গেলেন। আমি, প্রমথ আর প্রভাসও ওঁর পেছন পেছন ঢুকলাম।

 

প্রভাসের মাস্টারমশাইয়ের দেহটা আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে। ঘাড়টা উঁচু হয়ে দরজা আর দেয়ালের কোণে আটকা। ঘাড়টা বোধহয় ভেঙেই গেছে। মাথার পেছনটা নিশ্চয় ফেটেছে, কারণ রক্তের ধারাটা ওখান থেকেই বেরিয়েছে মনে হল। বাঁ-হাতের ঠিক পাশেই একটা তালা চাবি-আটকানো অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। হাতের লাঠিটা তার একটু দূরে। তালা আর লাঠিটা দেখে মনে হয় বোধহয় বেরচ্ছিলেন বা ঘরে ঢুকছিলেন।

 

ডাক্তার চৌধুরি হাঁটু গেড়ে বসে বৃদ্ধের বুকে স্টেথিসস্কোপ বসিয়ে গলার পাশের শিরাটা আঙুল দিয়ে টিপে ধরলেন। আহত বা মৃতদের দিকে আমি তাকিয়ে থাকতে পারি না। তাই ঘরের চারিদিকটা একবার দেখলাম। দামী কোনো আসবাবপত্র চোখে পড়ল না। একটা বড়ো তক্তপোশ আর বেতের কয়েকটা চেয়ার। তক্তপোশে অবশ্য বসারও জায়গা নেই স্তূপাকৃত বই সেখানে জড় করে রাখা। দেয়ালের একটা শেলফে মাটির আর কাঠের তৈরি নানান মূর্তি। দু’দিকের দেয়ালে কয়েকটা ছবি। একটা যামিনী রায়ের ধাঁচে আঁকা। আরও হয়তো দেখার মতো কিছু ছিল, কিন্তু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার মানসিক অবস্থা আমার ছিল না।

 

ডাক্তার চৌধুরী পরীক্ষা শেষ করে বললেন, “প্রাণ নেই, ডেড।”

 

“উনি কি হঠাৎ পড়ে গিয়ে মারা গেলেন? প্রভাস জিজ্ঞেস করল।

 

“অসম্ভব নয়। তবে অপঘাতে মৃত্যু, তাড়াতাড়ি পুলিশকে একটা খবর দেওয়া দরকার।”

 

ডাক্তার চৌধুরী স্টেথিসস্কোপটা গলায় ঝোলাতে ঝোলাতে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর কেমন একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন, “আপনারা কখন এলেন এখানে?”

 

প্রভাসই উত্তর দিল, “এই এক্ষুণি! দেখেই আপনাকে ডাকতে গেছি।”

 

“গা-টা এখনও পুরো ঠান্ডা হয়নি। অল্প কিছুক্ষণ হল মারা গেছেন। চলুন, আমার বাড়ি থেকেই পুলিশকে ফোন করবেন।”

 

“আপনি শিওর উনি বেঁচে নেই?” প্রভাস বিশ্বাস করতে পারছে না।

 

“শিওর।”

 

আধঘন্টার মধ্যেই একটা জিপে চেপে দু’জন পুলিশ এল। ওঁদের মধ্যে যিনি পদস্থ তিনি বোধহয় সাব-ইনস্পেক্টর র‍্যাঙ্কের হবেন। আমরা কেন এসেছিলাম, ঠিক কখন এসেছিলাম, ঢুকে কী দেখেছি, ভেতরে ঢুকে কিছু নাড়াচাড়া করেছি কিনা, কোনো সন্দেহজনক শব্দ শুনেছি কিনা, কোনো সন্দেহভাজন কাউকে দেখেছি কিনা –এরকম হাজারও প্রশ্ন করলেন।

 

প্রমথ আবার সন্দেহভাজন বলতে কী বোঝাচ্ছেন জিজ্ঞেস করাতে সাবইনস্পেক্টর মশাই খুব বিরক্ত হলেন। প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন, “আর কাউকে দেখেছেন আশেপাশে?”

 

আমি দুটো ছেলের কথা বললাম।

 

“ছেলেদুটোকে দেখলে চিনতে পারবেন?”

 

“মনে হয় না, এক ঝলকের জন্য দেখেছি।”

 

প্রমথ আর প্রভাসও বলল যে ওরা শিওর নয় চিনতে পারবে বলে।

 

এরমধ্যে থানার ওসি নিজেই এসে হাজির হলেন। ভাগ্যক্রমে প্রভাসকে উনি ভালো করে চিনতেন। নইলে সাব-ইনস্পেক্টর মশাইয়ের কাছে আমাদের আরও অনেক ভোগান্তি হত বলে আমার বিশ্বাস।

 

বাড়ি ফিরতে প্রায় বিকেল পাঁচটা হল। শ্যামলবাবুরা ইতিমধ্যে মেলায় চলে গেছেন। আমাদের সবার যা মানসিক অবস্থা, তাতে মেলায় গিয়ে আনন্দ করার প্রশ্ন ওঠে না।

 

“দিনটা কি সুন্দর ভাবে শুরু হয়েছিল, আর কী হয়ে গেল!” বিষণ্ণভাবে বলল প্রভাস।

 

প্রভাসের মানসিক অবস্থা আমি যথেষ্ট অনুমান করতে পারছিলাম। জীবনে এই প্রথম প্রভাস এইরকম অপঘাত মৃত্যু চোখের সামনে দেখল। আমি আর প্রমথ অবশ্য এইরকম ঘটনার সম্মুখীন আগেও আরেকবার হয়েছি। প্রমথর অ্যাপার্টমেন্টেই এক রাতের জন্য এক গেস্ট এসে খুন হন! যাই হোক, সে গল্প এখানে নয়। শুধু এটুকুই যোগ করি যে সেই সূত্রেই একেনবাবুর আসল পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম।

 

আমি আর প্রমথ দুজনেই প্রভাসকে বললাম, আমাদের সঙ্গে রাতটা কাটাতে। ঘুম আমাদেরও যে খুব একটা হবে তা নয়। ঘুমোনোর চেষ্টা না করে বরং কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলে হয়তো মানসিক দিক থেকে কিছুটা আরাম হবে। প্রভাসকে বেশি বলতে হল না। ও রাজি হয়ে গেল।

 

বনমালী চা দিয়ে গেল। প্রভাস হঠাৎ বলল, “একটা কথা কি জানেন, উনি যেন মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছিলেন।”

 

“তার মানে?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

 

“বেশ কিছু দিন ধরে যখনই ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, আমাকে দিয়ে নানান লোকের নানান জিনিস ফেরত পাঠিয়েছেন। একদিন বললেন, এই বইটা বিকাশবাবুকে ফেরত দিয়ে এসো। আমাকে বহুদিন আগে দিয়েছিলেন, কিন্তু ফেরত দেওয়া হয়নি।“

 

বিকাশবাবুও এককালে বিশ্বভারতীতে পড়াতেন –এখন শ্যামবাটিতে থাকেন। তাঁকে যখন বইটা দিলাম, তিনি অবাক! তিনিও ভুলে গিয়েছিলেন বইটার কথা। এমন কিছু দামি বই নয়, কিন্তু মনে করে করে মাস্টারমশাই যেন নিজেকে ঋণমুক্ত করছিলেন! আমাদের এক সহকর্মী মাস্টারমশাইকে একটা লাঠি দিয়েছিল। কিছুই নয় সাদামাটা অতি সাধারণ লাঠি। মাস্টারমশাই হাঁটতে হাঁটতে একদিন হঠাৎ আছাড় খেয়ে পড়ে যান। ওঁর লাঠি নর্দমায় পড়ে যায়। যেখানে পড়েছিলেন তার পাশেই আমার সেই সহকর্মীর বাড়ি। উনি দৌড়ে এসে মাস্টারমশাইকে তোলেন। তারপর ওঁর বাবার একটা লাঠি মাস্টরমশাইকে দেন। সেটা মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে ছিল বেশ কিছুদিন। সহকর্মীর বাবা মারা গেছেন, সেই লাঠির কোনো প্রয়োজনই তাঁর ছিল না। আমাকে বলেছিলেন ‘ওটা মাস্টারমশাইয়ের কাছেই থাক, ওঁর কাজে লাগুক।’

 

দিন দশেক আগে মাস্টারমশাই আমাকে বললেন, “তুমি আমাকে একটা লাঠি কিনে এনে দিও তো।“

 

আমি বললাম, “কেন, লাঠিটাতে আপনার অসুবিধা হচ্ছে?”

 

মাস্টারমশাই বললেন, “না। কিন্তু লাঠিটা তো আমার নয়। ওটা আমি ফেরত দিতে চাই।“

 

এছাড়াও প্রায়ই দেখি নিজের বইগুলো ঘাঁটছেন। সেখানে খুঁজছেন অন্য কারো বই ওঁর কাছে আছে কিনা। বেশ কয়েকটা বই আমার হাতে দিয়ে বললেন, “তুমি এগুলো ফেরত দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে পারো?”

 

বইগুলো যাঁদের তাদের কয়েকজনকে আমি চিনিও। একজন মারাও গেছেন বেশ কিছুদিন হল। আমি সেটা বলতেই বললেন, “তা হোক, ওর ছেলেমেয়েদের কাউকে দিয়ে দিও। আমি সব কিছু ফেরত দিয়ে দিতে চাই।“

 

আমি একদিন বলেই ফেলেছিলাম, “কবে নিয়েছিলেন বইটা?” মাস্টারমশাইয়ের উত্তর, প্রায় বছর দশেক আগে। আমার ব্যাপার তো জানোই, একসঙ্গে এতগুলো বই পড়ি যে এক-একটা শেষ করতে অনেক সময় লেগে যায়। তারপর যা হয় বইগুলো পড়েই থাকে। যার বই সেও চায় না। আমারও খেয়াল থাকে না।’

 

“যাঁর কাছ থেকে আপনি বইগুলো ধার নিয়েছিলেন, তাঁদের কাছেও নিশ্চয় আপনার অনেক বই আছে।“

 

“তা হয়তো আছে, কিন্তু তার সঙ্গে বই ফেরত না দেওয়ার সম্পর্ক কি।“ একটু যেন বিরক্ত হয়েই মাস্টারমশাই আমায় বলেছিলেন।

 

আমি বলেছিলাম, “না,না, আমি ফেরত দিয়ে দেব। কিন্তু আপনার স্মরণশক্তি দেখে সত্যিই অবাক হচ্ছি। আট দশ বছর আগে বই ধার করেছেন, কিন্তু ঠিক মনে আছে কার কাছে থেকে কোন বই নিয়েছিলেন।“

 

‘স্মরণশক্তির আবার কি দেখলে। ফেরত দিতে তো ভুলেই গিয়েছিলাম।‘

 

‘তা হোক, কিন্তু ধার করেছিলেন সেটা তো মনে আছে।

 

‘তা আমার মনে থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে ভীষণ ভুলও হয়। বছর পাঁচেক আগে এক ভদ্রলোকের সাথে হঠাৎ করে দেখা হল –মানে তিনিই খোঁজ করে আমার কাছে এসেছিলেন। আমার পরিচিত একজনের জামাই। তাকে দেখে হঠাৎ মনে পড়ল, একটা জিনিস আমার ফেরত দেওয়া হয়নি। অথচ যাকে দেবার, সে আর বেঁচে নেই!’

 

‘তার ছেলেমেয়েরা নেই?’

 

‘তা আছে। সেটাও ফেরত দিতে হবে। আরও এরকম কত জিনিস হয়তো রয়ে যাচ্ছে। নিজের স্মরণশক্তির উপর এক সময়ে আমার আস্থা ছিল –এখন আর ততটা নেই।”

 

এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে প্রভাস কিছুক্ষণ চুপ রইল। প্রমথ চুপ, আমিও ঠিক কি বলব ভেবে পেলাম না।

 

একটু বাদে প্রভাস বলল, “বন্দনা ওঁর ভীষণ ভক্ত ছিল। খবরটা শুনলে ও ডিভাস্টেটেড হয়ে যাবে।”

 

“এখন না হয় নাই জানালে, ক’দিন বাদেই তো ও আসছে।” আমি বললাম।

 

“বন্দনা ওঁকে বরাবর দাদুই ডেকেছে। উঃ, কী অদ্ভুত ভাবে চলে গেলেন!”

 

“হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন,” আমি বললাম। “আগেও তো একবার বললে পড়ে গিয়েছিলেন। এবার পড়েছেন বেকায়দায়।”

 

“কেন জানি না আমার মন বলছে তা নয়।”

 

“তুমি কি ভাবছ, মার্ডার?”

 

“না, না কে এমন নৃশংস কাজ করবে? কেন করবে? একজন সাধু-সজ্জন বৃদ্ধ!”

 

“হয়তো অ্যাকসিডেন্ট!” প্রমথ মন্তব্য করল।

 

“অ্যাকসিডেন্ট!”

 

“কেউ হয়তো কিছু চুরি করতে এসেছিল, উনি হঠাৎ এসে পড়ায়, পালাবার চেষ্টা করছিল, ধাক্কাধাক্কিতে উনি পড়ে গেছেন।”

 

চিন্তাটা আমার মনেও এসেছিল। প্রভাসের মুখটা হঠাৎ কেমন ফ্যাকাশে লাগল।

 

“কি হল?” আমি প্রশ্ন করলাম। “ওঁর খিড়কির দরজার খিল ভেঙে গিয়েছিল –ছিটকিনিও নড়বড়ে ছিল। কাজের লোক দেশে চলে গেছে শুনে আমিই গতকাল ওখানে একটা তালা লাগিয়ে দিয়েছিলাম।

 

ওটা খোলা থাকলে, চোর হলে নিশ্চয় ওখান দিয়ে পালাতে পারত! মাস্টারমশাইয়ের পক্ষে তো কাউকে তাড়া করার প্রশ্ন ওঠে না।”

 

ওর কথাটা খুবই যুক্তিপূর্ণ। কিন্তু আমি ওকে বললাম, “কি ঘটেছে আমরা তো জানি প্রভাস। তুমি এসব এখন ভাবছ কেন?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *