শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

চার

এর আগে আমি বার দুই শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় গেছি। দু’বারই প্রমথর সঙ্গে। পূর্বপল্লীতে প্রমথর বডোেমাসির একটা বাড়ি আছে। বাড়িটা দেখাশোনা করার জন্য একজন লোক আছে। নাম বনমালী। সেই ঘরদোর পরিষ্কার রাখে। কেউ ওখানে গিয়ে থাকলে রান্নাবান্না করে দেয়। এমনিতে প্রায় সারা বছরই বাড়িটা ফাঁকা পড়ে থাকে। কেবল পৌষমেলার সময় বহু লোক সেখানে এসে হাজির হয়। এবার প্রমথ বড়োমাসিকে অনেক আগে থেকেই বলে রেখেছিল কাউকে ঘর না দিতে। তাতে কাজ কিছুটা হয়েছিল। শুনলাম ওঁর এক বন্ধুর ছেলে আর তার বউ শুধু আসছে। তার মানে আমরা চারজন। বাড়িতে তিনটে ঘর –দুটো বাথরুম। সুতরাং খুব আরামেই থাকা যাবে।

 

প্রমথ এসি চেয়ার কার বুক করেছিল। এর আগে সেকেন্ড ক্লাসে চেপে গিয়েছি। সিট রিসার্ভ করতাম, কিন্তু লাভ বিশেষ হত না। ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা, যারা অনেকে টিকিটও কাটে না, তারা জোর করে এসে ঠেলেঠুলে বসত। এসি চেয়ার কার দেখলাম সেদিক থেকে চমৎকার। ডেইলি প্যাসেঞ্জারদের জুলুমবাজি নেই। টিকিট চেকার আসে এবং টিকিট চেক করে। সিটগুলোও গদির –বসে আরামই লাগে। মেঝেটা একটু অপরিস্কার। কিন্তু একটু বাদেই একটি বাচ্চা এন্টারপ্রেনার ছোট্ট একটা ঝাড় নিয়ে তার কিছুটা সংস্কার করল। প্রায় সবাই দেখলাম কিছু না কিছু ছেলেটাকে দিল।

 

প্রমথ মন্তব্য করল, “ভিক্ষে করার থেকে এটা ভালো।”

 

হয়তো তাই। কিন্তু এতটুকু ছেলে পয়সার জন্য খেলাধুলো না করে কাজ করছে ভাবতে মনটা কেমন জানি করে উঠল। প্রমথকে সেটা বলতেই ও ধাতানি দিল,

 

“তিন দিনের যোগী ভাতকে বলিস পেস্সাদ। ওসব সায়েবি বোলচাল ছাড় তো। কাজ করে খাচ্ছে –একটা ওয়ার্ক এথিক্স গ্রো করছে। ভিক্ষে করলেও তো মুখ বাঁকাতিস!”

 

গাড়ি চলতে শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি রবীন্দ্রসংগীত শুরু হয়েছে। সাউন্ড সিস্টেমটা অবশ্য খুব একটা ভালো নয়। প্রমথ একটা মোটা গল্পের বই নিয়ে এসেছে, সেটায় মন দিল। আমি একটা খবরের কাগজ কিনেছিলাম হাওড়া স্টেশনে। সেটা খুলে পড়তে গিয়ে নজর পড়ল অন্যপাশে বসা ডিজাইনার সার্ট আর জিন্স পরা এক যাত্রীর দিকে। বিদেশ থেকে অল্পদিন হল এসেছেন বোঝা যায়, মুখে এখনও চকচকে ভাবটা আছে। লম্বা চেহারা, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, নাকের নীচে একটা চিলতে গোঁপ। জুতোটাও বেশ ফ্যান্সি। শৌখিন লোক বুঝতে অসুবিধা হয় না। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকাতেই আমি চোখটা সরিয়ে নিলাম। হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখলে কী ভাববেন। কিন্তু কেন জানি না পত্রিকা পড়ার ফাঁকে বার বার ভদ্রলোকের দিকে আমার চোখ চলে যাচ্ছিল। ভদ্রলোক বসেছেন জানলার ধারে। কিন্তু বাইরের দিকে না তাকিয়ে মন দিয়ে একটা মোটা চামড়ায় বাঁধানো খাতা থেকে কী জানি পড়ছেন, আর একটা ক্যালকুলেটর দিয়ে নানান হিসেব করছেন।

 

কিছুক্ষণ বাদে আমায় একবার বাথরুমে যেতে হল। বাথরুমটা বন্ধ, কেউ ওখানে রয়েছে। দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি, হঠাৎ দেখি পেছনে সেই ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়েছেন। ভদ্রলোকের গলায় সোনার নেকলেসটা আগে নজরে পড়েনি। চেনের নীচে “BS” লেখা লকেট ঝুলছে। নিশ্চয় নামের আদ্যক্ষর। কিন্তু কী ট্রাজেডি –BS দেখলে প্রথমেই মনে আসে Bull shit!

 

আমি “হ্যালো” বললাম।

 

উত্তরে উনিও একটু হেসে “হ্যালো” বললেন।

 

“বাঙালি?” আমি ইংরেজিতেই জিজ্ঞেস করলাম।

 

“না, কিন্তু বাংলা জানি।” উচ্চারণটায় একটু হিন্দি টান আছে।

 

আমি বললাম, “বাঃ, বাংলা তো আপনি বাঙালিদের মতন বলেন।”

 

“কলকাতায় বহুদিন ছিলাম।”

 

“আর এখন?”

 

“নিউ ইয়র্কে।”

 

“আরে! আমিও তো নিউ ইয়র্কে থাকি।”

 

“তাই নাকি! স্মল ওয়ার্লড।”

 

“পৌষমেলায়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“ওয়েল, সর্ট অফ। তবে আমায় আজকেই ফিরে যেতে হবে।”

 

“সেকি মেলা তো সবে শুরু হচ্ছে!”

 

“আই হ্যাভ সাম বিজনেস।”

 

এই সময়ে বাথরুমের লোকটি বেরিয়ে আসায় কথাবার্তা আর হল না। আমি ফিরে আসার বেশ কিছুক্ষণ বাদে ভদ্রলোক ফিরলেন। ফিরেই দেখলাম চোখ বুজে একটা ঘুম লাগিয়েছেন। নামটাও জানা হল না। কিছুক্ষণ জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে চললাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালও করিনি। এসে পর্যন্ত এত হইচই-এর মধ্যে কেটেছে যে জেট ল্যাগটা এখনও ভালো করে কাটেনি। প্রমথর ডাকে ঘুম ভাঙল, তখন বোলপুরে পৌঁছে গেছি!

 

আমরা যখন প্রমথর বড়োমাসির বাড়ি পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় দুটো। বনমালী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাদের জন্য দুটো সিঙ্গল বেড পাতা ঘর পরিষ্কার করে রেখেছে। সেখানে ব্যাগ রাখতে রাখতে প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “আর যাদের আসার কথা তাঁরা এসেছেন?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“তাঁরা কোথায়?”

 

“মেলায় গেছেন। একটু বাদেই ফিরবেন।”

 

কথা শেষ হতে না হতেই বাইরের থেকে একটা গলা শুনলাম, “এই যে আপনারা এসে গেছেন!”

 

তাকিয়ে দেখি বেঁটেখাটো ফর্সা নাদুসনুদুস চেহারার এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকেছেন –পেছন পেছন একজন মহিলা। ভদ্রলোকের গলায় জড়ানো একটা মেরুন রঙের মাফলার। গায়ে উলের ফুলহাতার সাদা সোয়েটার। প্যান্টটা সম্ভবতঃ পলিয়েস্টারের, চকচকে কালো। ভদ্রমহিলাও গৌরাঙ্গী। ভদ্রলোকের সমান বা একটু লম্বাই হয়তো হবেন। মুখটা ঢলঢলে। পরনে লালপেড়ে সবুজ শাড়ি আর ম্যাচিং ব্লাউজ। কপালে লাল রঙের একটা বড়ো গোল টিপ। মহিলাকে সুন্দরী বলা যাবে না –কিন্তু একটা আলগা শ্ৰী আছে।

 

“নমস্কার, আমি শ্যামল বসু। আমার স্ত্রী রিতা।”

 

আমরাও উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিলাম।

 

ভদ্রলোক খুব হাসিখুসি। অল্প দুচার কথার পর বললেন, “বুঝলেন, কাল থেকে আপনাদের আসার জন্য দিন গুনছি। একা বৌয়ের সঙ্গে আর কতক্ষণ গল্প করা যায় বলুন!”; প্রমথ রিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার বরের সাহস তো কম নয়!”

 

“বুঝুন কি রকম লোকের সঙ্গে ঘর করছি!” এক ঝলক হেসে রিতা অদৃশ্য হলেন।

 

শ্যামলবাবু একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে গলাটা নামিয়ে বললেন, “আপনারা আসবেন বলে মাছ রান্না করেছে ও। অথচ দেখুন, কালকে কত কাকুতি মিনতি করলাম। বললাম, রাত্রে একটু মাছ করবে?” আমায় মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “এসেছ মেলা দেখতে, অত মাছ মাছ করছ কেন; এবার বুঝলেন তো শুধু গল্পের জন্য নয়। আপনারা এসেছেন– খাওয়াদাওয়াটাও ভালো হবে আশা করছি।”

 

আমি বললাম, “আচ্ছা এটা কেন করছেন! আমরা তো আপনাদের অতিথি নই। সবাই বেড়াতে এসেছি।”

 

“এসব বলে আমার বউকে বিগড়ে দেবেন না তো। দিব্বি ভালো খাওয়া জুটবে ভাবছিলাম।”

 

“ মেলা কেমন দেখলেন?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

 

“চমৎকার। তবে নাকে বেশ ভালো করে রুমাল চেপে ঘুরবেন। জল ছেটাচ্ছে বটে, কিন্তু তাও অসম্ভব ধুলো।”

 

“ভিড় কিরকম?”

 

“এখনও খুব দেখলাম না। শুনলাম ভিড় শুরু হবে আজ বিকেল থেকে। সকালে এলেন না–ফাংশানটা মিস করলেন।”

 

আজ ৭ই পৌষ। নিশ্চয় উপাসনার কথাটা বলছেন। জিজ্ঞেস করলাম, “কিরকম দেখলেন উপাসনা?”

 

“নট ব্যাড। তবে ফ্র্যাঙ্কলি বলছি, আমার মন্ত্র-যন্ত্র বা বাণীর থেকে নাচ-গানই ভালো লাগে বেশি। নাচ লাগালে আরও জমত। কেন যে নাচটা বাদ দেয় বুঝলাম না।”

 

“ওটা বোধহয় বসন্ত উৎসবের জন্য তুলে রেখেছে।” প্রমথ বলল, “এক সঙ্গে আপনাদের সবকিছু দেখাতে চায় না।”

 

প্রমথর মন্তব্যে যে শ্লেষটা ছিল, শ্যামলবাবু সেটা বোধহয় ধরতে পারলেন না।

 

“তাই হয়তো হবে।”

 

“ওখান থেকে মেলার মাঠে গেলেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“হ্যাঁ, দেখলাম সবাই যাচ্ছে, আম্রকুঞ্জের পাশ দিয়ে শালবীথি ধরে সোজা মেলার মাঠ। সাত সকালে গেছি, চা পর্যন্ত খাওয়ার সময় পাইনি। প্রথমেই কালোর দোকানে ঢুকে চা-টা খেয়ে, মেলায় ভালো করে একটা চক্কর মেরে তারপর এসেছি। তা আপনারা কি এই প্রথম আসছেন?”

 

শ্যামলবাবু সত্যিই গল্প করতে ভালোবাসেন। প্রমথ এক ফাঁকে ফিসফিস করে আমাকে বলল, “একেনবাবুর সঙ্গে এঁর জমত ভালো।”

 

আমি ভাবছিলাম খাওয়া দাওয়ার পরে কী ভাবে ওঁর কবল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এমন সময়ে বাইরে থেকে কে যেন আমাদের নাম ধরে ডাকল। আমি বেরিয়ে এসে দেখি চাদর গায়ে ধুতিপাঞ্জাবি পরা একজন সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে।

 

“আপনি কি বাপিদা?”

 

আমি বললাম, “হ্যাঁ, আপনি?”

 

“আমাকে আপনি চেনেন না। আমি প্রভাস মিত্র।”

 

“কে বলল চিনি না, খুব ভালো করে আপনাকে চিনি।”

 

প্রভাস আমার বলার ধরন শুনে হেসে ফেলল। “আমাকে তুমি করেই বলবেন। বন্দনা আর আমি একসঙ্গে পড়েছি।”

 

“বেশ, কিন্তু তুমিও আমাকে তুমি বলবে বন্দনার মতো। ভেতরে এসো, আমার বন্ধু প্রমথর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।”

 

প্রভাস শান্তিনিকেতনে পড়ায় শুনে উৎসাহিত শ্যামলবাবু প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, পৌষমেলার সিগ্নিফিকেন্সটা কি বলুন তো?”

 

প্রভাস বলল, “ভাগ্যিস আপনি বিশ্বভারতীর ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন না থাকলে বিপদে পড়তাম।”

 

“না না, সিরিয়াসলি, এর ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু জানা দরকার।”

 

“আমি যতদূর শুনেছি, এটা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের উইলে ছিল। মহর্ষির মৃত্যুর পর বলেন্দ্রনাথ যখন শান্তিনিকেতনের ভার নেন, তখন এই মেলা চালু করেন। তারপর রবীন্দ্রনাথের আমল থেকে এটা ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকে।”

 

শ্যামলবাবু বুঝলাম খুবই ইমপ্রেসড হয়েছেন প্রভাসের কথা শুনে। বললেন “আপনাকে মশাই একটু সময় দিতে হবে। শান্তিনিকেতনের বাড়িঘরগুলো, এই উত্তরায়ন, উদয়ন, শ্যামলী –এগুলো যদি একটু চিনিয়ে দেন। কাল একটা রিক্সাওয়ালাকে নিয়ে ঘুরলাম। ব্যাটা বলে ও সব জানে। শ্যামলী বলে একটা বাড়ি দেখাল– যেটা দোতলা পাকা বাড়ি। তারপর আমি ধমক দিতে স্বীকার করল, হুগলির ছেলে। হপ্তা দুই হল মামার রিক্সা চালাতে বোলপুরে এসেছে।”

 

“উত্তরায়ন বাড়িটাও দেখাল নাকি?” প্রমথ প্রশ্ন করল।

 

এটাই প্রমথর দোষ। কেউ একটা কিছু ভুল কথা বললে –তাঁকে না খুঁচিয়ে পারে না। শ্যামলবাবুর আর দোষ কি, আমিও বহুদিন উত্তরায়নকে একটা বাড়ি বলেই ভাবতাম। শ্যামলবাবু ভালো মনেই উত্তর দিলেন, “দেখিয়েছিল, কিন্তু আমি ওর একটা কথাও বিশ্বাস করি না। কি মশাই, দেখিয়ে দেবেন তো?” প্রভাসকে আরেকবার জিজ্ঞেস করলেন শ্যামলবাবু।

 

“বেশ তো, আমি তো এখানেই আছি।”

 

“দুপুরে খেয়েছেন?” শ্যামলবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

 

“আমি সকালে খুব ভালো করে খাই। দুপুরে কিছু খাই না।”

 

“একদিন না হয় খেলেন। দাঁড়ান,” বলে প্রভাসের আপত্তি সত্বেও শ্যামলবাবু রান্নাঘরে বোধহয় রিতাকে জানাতে গেলেন।

 

“সত্যি আমি দুপুরে খাই না,” প্রভাস আমার দিকে তাকিয়ে বলল।

 

“বসো আমাদের সঙ্গে, খেতে হবে না। গল্পটা তো হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *