শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
বাইশ
পর পর দুটো মার্ডারের পর শিশিরবাবুর ব্যাপারটা আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। রাত্রে প্রভাসের একটা ই-মেইল পেলাম। লিখেছে ওখানকার ওসি রাখালবাবু নাকি একেনবাবুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। জিজ্ঞেস করেছে আমরা কিছু শুনেছি নাকি একেনবাবুর কাছ থেকে?
সকালে ব্রেকফাস্ট খাবার সময়ে আমি একেনবাবুকে শিশিরবাবুর কথা জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ স্যার, আপনাদের বলতে ভুলে গেছি, যা ঝামেলা যাচ্ছিল ক’দিন!”
তারপর যা বললেন, তা হল–
পুলিশ দুজন রিকশাওয়ালা আর শিশিরবাবুর বাড়িতে মতিলাল নামে যে কাজ করত, তার ভাইকে ধরেছে। রিক্সাচালকদের বয়ান অনুসারে এক আধ-চেনা ভদ্রলোক ওদের বলেন যে শিশিরবাবুর বাড়িতে একটা ছোটো কাঠের বাক্স আছে, সেটা চুরি করে আনতে পারলে দু-হাজার টাকা দেবেন। ওরা ওদের বন্ধু মতিলালের ভাইকে ধরে। সে শিশিরবাবুর বাড়িতে অনেকবারই গিয়েছে। সে বলে দেয় কোথায় পুরোনো কাঠের বাক্সটা আছে। মতিলালের অজান্তে বাড়ির চাবিও বন্ধুদের দেয়। পরদিন শিশিরবাবু বাইরে যেতেই একজন বাড়িতে ঢোকে, অন্যজন বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। তালা লাগানো দেখলে কারো কোনো সন্দেহ হবে না ভেতরে কেউ আছে বলে। একটু বাদেই ভেতর থেকে সিগন্যাল পেয়ে বাইরের লোকটি দরজা খুলতে যায়। এমন সময়ে শিশিরবাবু হঠাৎ বাড়ি ফিরে আসেন। শিশিরবাবু বুঝতেও পারেননি কী হচ্ছে! উনি লোকটিকে জিজ্ঞেসা করেন, কী চাও?’ সে ভয় পেয়ে হঠাৎ ছুট লাগায়। যাবার সময় হাত থেকে চাবিটা পড়ে যায়। শিশিরবাবু নিশ্চয় অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু দরজায় তালা আছে। সুতরাং লোকটির বদ-উদ্দেশ্য থাকলেও ক্ষতি করতে পারেনি। এই ভেবে নিশ্চয় তালা খুলে ভেতরে ঢোকেন। তখনই ভেতরের লোকটি এঁকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে এসে দরজাটা ভেজিয়ে অদৃশ্য হয়। তার বক্তব্য, শিশিরবাবু যে ঐটুকু ধাক্কাতেই মারা যাবেন কল্পনাও করেনি। ও চোর, কিন্তু খুনি নয়। বুড়ো মানুষ মারা যাওয়াতে ও খুবই অনুতপ্ত, ইত্যাদি। যাইহোক, ওরা যখন বাক্সটা সেই ভদ্রলোককে দেয়। তিনি বলেন ওটা ভুল বাক্স। এই নিয়ে ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। ভদ্রলোক শেষে রাগ করে পাঁচশো টাকা দিয়ে বাক্সটা নিয়ে যান। রাখালবাবু প্রভাসকে জিজ্ঞেস করে জেনেছেন যে পুরোনো একটা কাঠের বাক্স কাঁচের আলমারিতে ছিল। শিশিরবাবু প্রাণে ধরে কিছুই ফেলেন না। তবে এই বাক্সের জন্য কেউ দু-হাজার টাকা দেবে ভাবা যায় না। ভদ্রলোক নিশ্চয় গয়নার বা অ্যান্টিক কোনো বাক্সের কথা বলেছিলেন, যেটা প্রভাস কখনও দেখেনি। রাখালবাবু দল নিয়ে শিশিরবাবুর বাড়িতে আবার গিয়েছিলেন, যদি অন্য কোনও বাক্স চোখে পড়ে। গিয়ে দেখেন দরজার তালা ভাঙা। এমনি কি গোদরেজের আলমারিও কেউ শাবল বা কিছু দিয়ে ভেঙেছে। দুয়েকটা পুরোনো জামাকাপড় ছাড়া মূল্যবান কিছুই সেখানে অবশিষ্ট নেই। অর্থাৎ, মহামূল্য সেই অলীক বাক্স শুধু নয়, কাপডিশ ইত্যাদিও সেই সঙ্গে অদৃশ্য হয়েছে। বাক্সের খোঁজ যাঁরা করছিলেন তাঁরা তো এসেছিলেনই, সেইসঙ্গে ছিঁচকে চোরও ভাঙা দরজার সুযোগ নিয়েছে বলে মনে হয়। পুলিশ এখন চেষ্টা করছে সেই বাবুটিকে ধরার। ভদ্রলোকের চেহারার একটা বিবরণ পুলিশ পেয়েছে। বেঁটে, দেহটা একটু মোটার দিকে, অল্প ভুড়ি আছে, গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, মাথায় অল্প টাক, নাকে এক চিলতে গোঁপ। এরকম অজস্র লোক রাস্তায় চোখে পড়বে।
একেনবাবুর দীর্ঘ কাহিনি শেষ হবার পর আমি বললাম, “আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে, শান্তিনিকেতনের পুলিশ ডেড-এন্ডে গিয়ে পৌঁছেছে।”
একেনবাবু তার উত্তর না দিয়ে বললেন, “স্যার, কাল সকালে কি আপনার ক্লাস আছে?”
“না, কিন্তু কেন?”
“আপনার সঙ্গে নিউ জার্সি যেতাম।”
“নিউ জার্সিতে? কোথায়?”
“জার্সি সিটিতে।”
“সেখানে কে থাকেন?”
“একজন থাকেন স্যার।”
“নিশ্চয় একজন থাকেন,” প্রমথ বলল। “কিন্তু সেই একজনটি কে? আপনার কি একজন গার্লফ্রেন্ড হয়েছে নাকি?”
“ছি ছি, কী যে বলেন স্যার।”
“কেন মশাই, বউদিকে এদ্দিন ছেড়ে আছেন, একটু যদি মন উড়ু উড় হয় –তাতে তো অবাক হবার কিছু নেই।”
“সত্যি স্যার, আপনার মুখে কিছু আটকায় না!”
“তাহলে লোকটি কে?”
“লোক নয় স্যার, একজন মহিলা।”
“পথে আসুন, কত বয়স মহিলাটির?”
“ধারণাই নেই স্যার, আশি-টাশি হবে।”
“ওরে বাবা, তা এই বুড়ির সঙ্গে আপনার কী দরকার?”
“উনি টম ক্যাসিডির পিসি। হয়তো টম ক্যাসিডির খোঁজ জানতে পারেন।”
“তা এই পিসিটির সন্ধান জোগাড় হল কী করে?”
“সে এক কাহিনি স্যার।”
এমন সময়ে ফোন। একেনবাবুই ধরলেন। দুয়েকটা কথা বলে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “কাল স্যার ছুটি। এইমাত্র খবর পেলাম টম ক্যাসিডির খোঁজ পাওয়া গেছে। মাস দুই আগে সেলসম্যানের চাকরি নিয়ে অ্যারিজোনা গেছেন।”
