শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

ষোল

বাড়ি ফিরে দেখি প্রমথ আড্ডা মারছে ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে। প্রমথর মুখটা হাসিখুশি দেখে বুঝলাম এক্সপেরিমেন্টের ঝামেলা মোটামুটি মিটেছে। আমাদের ঢুকতে দেখে ফ্রান্সিস্কা বলল, “কফি খাবে?”

আমি বললাম, “একেনবাবু একটু আগে খাওয়ালেন।”

প্রমথ বলল, “ তার মানে?”

“মানে আবার কি, আমরা কফি খেয়ে এসেছি।”

“সেটা তো বুঝতে পারছি, কিন্তু একেনবাবু খাওয়ালেন মানে কি?” তারপর একেনবাবুর দিকে চোখ পাকিয়ে বলল, “লুকিয়ে লুকিয়ে একজনকে কফি খাইয়ে পয়সা বাঁচানোর মানেটা কি? আমাকে না হয় নাই খাওয়ালেন –বেচারা ফ্রান্সিস্কা কি দোষ করল!”

একেনবাবু বললেন, “আপনারা ছিলেন না, আমি কি করব স্যার? আপনি কঠিন কঠিন এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে পড়ে থাকেন!”

“আপনার সব সময়েই একটা অজুহাত আছে। তা দুজনের যাওয়া হয়েছিল কোথায়?”

“লাইব্রেরিতে,” আমি উত্তর দিলাম। তারপর বললাম, “গেস –কার সঙ্গে পথে দেখা?”

“অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।”

“চ্যাংড়ামো করিস না!” আমি বললাম, “রোহিত রয়।”

“রোহিত রয় কে?” ফ্রান্সিস্কা জিজ্ঞেস করল।

“তুমি চিনবে না, সুভদ্রামাসির খুব পরিচিত এক ফোটোজার্নালিস্ট,” প্রমথ বলল। “আমি কিন্তু ইমপ্রেসড, তুই একজনকে একবার মাত্র দেখে আবার চিনতে পেরেছিস! কেমন আছে সে?”

“ভালোই তো মনে হল। তবে একটা কথা বললেন সুভদ্রামাসির দেওয়া ছবিটা সম্পর্কে –শুনে বেশ খটকা লেগে গেছে।”

প্রমথর চোখে প্রশ্ন।

আমি বললাম, “কে জানি ওঁকে দুটো ক্রেজি ইমেইল পাঠিয়েছে ঐ ছবিটা নিয়ে।”

“দাঁড়া দাঁড়া, একটু বুঝতে দে। কোন ছবির কথা বলছিস –তোর দিদিমা আর সুভদ্রামাসির মায়ের ছবি?”

“এক্সাক্টলি।”

“যে ই-মেইল পাঠিয়েছে –সে ছবি দেখল কোত্থেকে?”

“রোহিত রয়ের পার্সোনাল ওয়েবসাইটে ছিল –তাইতো উনি বললেন যদুর মনে পড়ছে।”

“তারপর?”

“রোহিত অবশ্য পরিষ্কার করে বলেননি ঠিক কী লেখা ছিল ই-মেইলে। কিন্তু খুব সম্ভবত সুভদ্রামাসির সোনা-রূপো মেশানো মূর্তি সম্পর্কে কিছু সেখানে ছিল।”

“হঠাৎ এই কনকুশনের কারণ?”

“আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে, কেউ সেটাকে আইডেন্টিফাই করতে পেরেছে মিউজিয়াম থেকে চুরি যাওয়া জিনিস বলে।”

“তুই গাঁজা-ফাজা খাচ্ছিস নাকি –কী যা-তা বকছিস! রোহিত কি বলেছেন ঐ মূর্তি সম্পর্কে কেউ লিখেছে?”

“না।”

“তাহলে?”

“কিন্তু তাছাড়া আর কি হতে পারে? মূর্তিটা ছবিতেও স্টানিং।”

“মানছি, কিন্তু তার সঙ্গে মিউজিয়াম থেকে চুরি যাওয়ার সম্পর্ক কি?”

“সুভদ্রামাসির এক পূর্বপুরুষ কুখ্যাত আর্ট-চোরের বোনকে বিয়ে করেনি!”

“তুই তোর মাথা ডাক্তারকে দেখা আর একেনবাবুর সঙ্গ কমা। কি মশাই, আপনারও এই মত নাকি?”

“কোনো সম্ভবনা কি স্যার বাদ দেওয়া যায়?”

“এটা যায়।” প্রমথ গম্ভীরভাবে বলল।

সুভদ্রামাসির জিনিওলজি নিয়ে আমাদের যে-সব কথা হয়েছে –তার কিছুই ফ্রান্সিস্কা জানত না। আমাদের কাছে সব কিছু শুনে বলল, “গ্রেট স্টোরি, কিন্তু মা বলেছে ওটা নেপালের এক রাণার কাছ থেকে মায়ের দাদুর বাবা কিনেছিলেন। ওটা চুরির হবে কেন?”

“ব্যাপার বুঝছ না,” প্রমথ বলল, “বাপি যেই শুনছে, তুমি মূর্তিটা পাচ্ছো, হাজার রকম ফ্যাঁকড়া তুলছে।”

“তুমি শিওর, সুভদ্রামাসি তাই বলেছেন?” আমি ফ্রান্সিস্কাকে প্রশ্ন করলাম।

“নিশ্চয়। আর মূর্তিটার মুখ তোমরা দেখনি? টিপিক্যাল ভারতীয় মুখ –কানে ইয়াররিং, শাড়ি পরা।”

ফ্রান্সিস্কা কথাগুলো যখন বলছে, আমি বুকশেলফ থেকে অ্যালবাম খুলে দিদিমা আর সুভদ্রামাসির মা’র ছবিটা দেখছি। কথাটা ঠিক, ওই মূর্তিটা কাঠের বাক্সের উপর শোয়ানো থাকলেও শাড়ির ভাঁজগুলো সুন্দরভাবে ফুটে আছে। একটু ভালোভাবে দেখলে কানের দুলও চোখে পড়ে। আশ্চর্য, মনে মনে ভাবলাম, অতবার মূর্তিটা সুভদ্রামাসির বাড়িতে দেখেছি, কিন্তু শাড়ি খেয়াল করিনি! শাড়ি গয়নার দিকে মেয়েদের দারুণ চোখ, দেশি বিদেশিনী সবার!

বাধ্য হয়ে স্বীকার করলাম, “দেয়ার গোজ মাই থিওরি! কিন্তু এছাড়া কী নিয়ে ক্রেজি ই-মেইল আসতে পারে বলো?”

“মিস্টার রয়কে ফোন করে জিজ্ঞেস করুন না স্যার, কী বলতে চেয়েছিলেন উনি। তাহলেই তো সন্দেহ মিটে যায়।”

এবার আমার সত্যিই লজ্জা লাগল। কেন যে এই অদ্ভুত চিন্তাগুলো মাথায় এসেছিল! মূর্তি প্রসঙ্গে সেইখানেই ইতি।

.

পরদিন দুপুরবেলা আমার ক্লাস ছিল। পড়িয়ে নিজের অফিসে ঢুকে সবে চেয়ারে বসেছি, ফোন বেজে উঠল। একেনবাবু।

“স্যার একটা ট্রাজেডি হয়েছে।”

“কী ট্রাজেডি?”

“একটু আগে মাসিমার ফোন পেলাম।”

“কী হয়েছে সুভদ্রামাসির?”

“না, না, মাসিমার কিছু হয়নি। মিস্টার রোহিত রয় মারা গেছেন।”

“মারা গেছেন!”

“কথা শুনে মনে হল মার্ডারড।”

“মার্ডারড! সুভদ্রামাসি কোথায়?”

“উনি মিস সুজাতাকে নিয়ে মিস্টার রয়ের অ্যাপার্টমেন্টে আসার প্ল্যান করেছিলেন। আমি কোনোমতে নিরস্ত করেছি। বলেছি সব খোঁজখবর নিয়ে ওঁকে জানব। আমি এখনি যাচ্ছি ওখানে। আপনার ক্লাস শেষ?”

“হ্যাঁ শেষ, আমিও কি আসবে?”

“জানি না গিয়ে কি করবেন স্যার। ওখানে হয়তো বাইরের লোকদের ঢুকতেও দেবে না।”

কথাটা ভুল বলেননি একেনবাবু। উনি ঢুকবেন ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের কানেকশনে। আমাকে ওখানে যেতে দেবে কেন? রোহিতের আত্মীয় বা বিশেষ বন্ধু হলে খবর পেয়ে ওখানে যাওয়া এক কথা। জীবনে দুবার মাত্র দেখা হয়েছে রোহিতের সঙ্গে। সুভদ্রামাসি এলে, তাঁর সঙ্গ দেবার জন্য যাওয়ার একটা অর্থ হত।

“প্রমথ জানে?”

“ওঁকে পাইনি, একটা মেসেজ রেখেছি। আমি ঘন্টা কয়েকের মধ্যেই ফিরে আসব।”

আমি সুভদ্রামাসিকে ফোন করলাম। উনি একেবারে ডিভাস্টেটেড। স্বাভাবিক। ধরাধরা গলায় এলোমেলোভাবে যা বললেন:

রোহিতের আসার কথা ছিল সকালে। আসছেন না দেখে সুভদ্রামাসি রোহিতকে ফোনে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাড়ির ফোন বা মোবাইল কোনোটাতেই উত্তর নেই। রোহিত এরকম কখনো করে না। তাই সুভদ্রামাসি ওঁর পুরোনো এক বন্ধু এঞ্জেলিকাকে ফোন করেন। ভদ্রমহিলাও সুভদ্রামাসির মতো বাতের রুগি। হাঁটাচলা করতে হয় খুব কষ্ট করে। তবে উনি রোহিতের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে একই তলায় থাকেন। এঞ্জেলিকা অবশ্য সুভদ্রামাসিকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে তিনি নিউজে শুনেছেন আজ সকাল আটটা থেকেই লিঙ্ক টানেল আর জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজে বিরাট জ্যাম। দু’টো বড়ো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। তাই হয়তো দেরি হচ্ছে।

আধঘন্টা বাদে সুভদ্রামাসি যখন আবার ফোন করেন, তখন উনি ইন্টারকম-এ সিকিউরিটির লোকদের জিজ্ঞেস করেন রোহিতকে বাইরে যেতে দেখেছে কিনা। দেখেনি শুনে রোহিতের অ্যাপার্টমেন্টে যান। লক্ষ্য করেন বাইরের দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। ভিতরে উঁকি দিতেই নজরে পড়ে রোহিত সোফায় এলিয়ে পড়ে আছেন, চারিদিকে রক্ত। সঙ্গে সঙ্গে সিকিউরিটিকে ডাকেন। তারাই পুলিশে খবর দেয়। এইসবের মধ্যে এঞ্জেলিকা ভুলেই গিয়েছিলেন সুভদ্রামাসিকে ঘটনাটা জানাতে। পরে খেয়াল হয়। প্রায় একঘন্টা বাদে সুভদ্রামাসিকে ফোন করেন। সঙ্গে সঙ্গেই সুভদ্রামাসি আমাদের বাড়িতে ফোন করে একেনবাবুকে জানান।

যাইহোক, রোহিতের অ্যাপার্টমেন্টে একেনবাবু গেছেন, আমি জানালাম। “আমাকে তো ঢুকতে দেবে না, তাই যাইনি। একেনবাবু ফিরে এলেই তোমাকে ফোন করব।”

“তাই কোরো।” তারপর একটু থেমে সুভদ্রামাসি বললেন, “তোমরাও সাবধানে থেকো। বাইরের দরজা-টরজা সব সময়ে লক করে রেখো। নিউ ইয়র্ক দিন-কে-দিন যা খারাপ হচ্ছে।”

“তুমি চিন্তা কোরো না, আমরা সাবধানে থাকব।”

ঘন্টা তিনেক বাদে একেনবাবু এলেন।

“বাড়িতে ফোন করে কাউকে পেলাম না স্যার, তাই ধরে নিলাম আপনি অফিসেই আছেন।”

“ভালো করেছেন এসে, আমি চিন্তায় চিন্তায় মরছি।”

“প্রমথবাবুকে ধরতে পেরেছেন?”

“নাঃ, কোথায় ডুব মেরেছে কে জানে! ফ্রান্সিস্কাকেও পেলাম না। দুজনে হয়তো কোথাও গেছে।”

“আপনার কি আর কোনো কাজ আছে?”

“আছে, কিন্তু জরুরি নয়।”

“তাহলে স্যার বাড়িতেই চলুন। যেতে যেতে আপনাকে বলি যতটুকু বুঝতে পারছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *