শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
বারো
শনিবার সুভদ্রামাসির বাড়িতে ফ্রান্সিস্কার রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষা শুরু হল। আমরা নির্বাসিত হলাম বেসমেন্টে। সুভদ্রামাসির বেসমেন্টে আগে কোনোদিন আসিনি। বিশাল বেসমেন্ট, পুরোটাই ফিনিশড। শুধু যেখানে ফার্নেস আর জলের হিটারটা আছে সেটা পার্টিশন দিয়ে ঘেরা। মেঝেটা দামি কার্পেটে ঢাকা। একদিকে পুল টেবিল, ট্রেড মিল, আর এক্সারসাইজ বাইক। নিশ্চয় রিচার্ডমেসো ওগুলো ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে একটা ফুল ফাইভ-পিস সোফাসেট। দেয়াল জুড়ে লম্বা বিল্ট-ইন বুকশেলফ।
সেখানে সাজানো অজস্র বই।
একেনবাবু কয়েকটা বই নিয়ে সোফায় বসলেন। আমিও বই ঘাঁটতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু প্রমথ বলল, “একটু পুল খেললে মন্দ হয় না।”
তিনজনে একসঙ্গে পুল খেলা যায় না। একেনবাবু দেখলাম খেলায় খুব একটা উৎসাহী নন।
আমি পুল খেলা এদেশে এসে শিখেছি। নিয়মটা জানি এইটুকুই। প্রমথ বলল ও শুধু একদিন খেলেছে। অথচ দিব্বি আমাকে নাকানিচোবানি খাওয়াতে শুরু করল।
আমি ওর একদিন খেলার সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করাতে, বলল, “চুপ কর, তোকে হারাতে আবার প্র্যাকটিস করতে হবে নাকি!”
আমি তার উপযুক্ত জবাব দেবার আগেই একেনবাবু এসে বললেন, “স্যার, টুলি অ্যামেজিং!”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী পড়ছেন অত মন দিয়ে?”
“কী করে জিনিওলজি কনস্ট্রাক্ট করতে হয়। এইসব নিয়ে যে এত বই আর অর্গানাইজেশন আছে, আমার ধারণাই ছিল না!”
“মনে হচ্ছে আপনি এখন জিনিওলজির কিক্-এ আছেন,” প্রমথ টিপ্পনি কাটল।
“তা আছি স্যার। সত্যি দেখুন তো, এই ধরুন রবীন্দ্রনাথ। তিনি তো জন্মেছেন ১৮৬১ তে। তাঁর সম্পর্কে আমরা খুঁটিনাটি কত কিছু জানি। এবার দেখুন স্যার, রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয় আপনার ঠাকুরদার বাবার থেকেও বড়ো।”
এবার একটু হিসেব করতে হল। আমার বাবা জন্মেছেন ১৯৪৫ সালে। বছর পঁচিশ তিরিশ বয়সে যদি পূর্বপুরুষদের সন্তান হয়েছিল ধরা যায়, তাহলে রবীন্দ্রনাথ আর আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা এক বয়সি হওয়া কিছুই বিচিত্র নয়।
“তা হবেন সম্ভবত।”
“এবার বলুন স্যার, আপনার ঠাকুরদা কী করতেন?”
“তিনি কলেজে পড়াতেন।”
“ঠাকুরদার বাবা?”
“শুনেছি উকিল ছিলেন, খুব শিওর নই।”
“তাঁর বাবা?”
“কোনো ধারণাই নেই।”
“দ্যাটস দ্য পয়েন্ট স্যার। আমরা নিজেদের হিস্ট্রি কিছুই জানি না।”
“জানার কি খুব প্রয়োজন আছে?” প্রমথ প্রশ্ন তুলল। “ধরুন, আপনার ঠাকুরদার ঠাকুরদা ছিলেন অতি জোচ্চর, বদমাইশ লোক –দুনিয়া ঠকিয়ে খেতেন। কিংবা ধরুন তিনি ছিলেন অতি মহৎ সাধুসজ্জন এক ব্যক্তি। তাতে আপনার কী এসে গেল?”
একেনবাবু মাথা নাড়লেন, “না স্যার, রুটটা ইম্পর্টেন্ট। আপনি যাই বলুন না কেন।”
“ননসেন্স!” প্রমথ একেনবাবুর বক্তব্য খারিজ করল।
পুল খেলাটা বিশেষ জমছিল না। তাই সবাই উপরে চলে এলাম। এসে দেখি ফ্রান্সিস্কার গান শেখা পুরোদমে চলছে। ওদের ডিস্টার্ব না করে, আমরা লিভিংরুমে
এলাম। আমি ঘরের আরাম কেদারায় শুয়ে গান শুনছি, একেনবাবু নীচ থেকে বই এনে মগ্ন হয়ে পড়ছেন। প্রমথ একটু ঘুর ঘুর করে সুজাতার সঙ্গে গল্প-গুজব করতে গেল। নিশ্চয় রান্নার টিপস নিচ্ছে। ও রাঁধতে ভালোবাসে, তবে খুব লিমিটেড মেনু। সুতরাং ও যে সুজাতার সঙ্গে কথা বলছে, তাতে আমি উৎসাহিত হলাম।
শুয়ে শুয়ে একটু ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। প্রমথর ডাকে চমক ভাঙল। “কিরে শুয়ে শুয়ে নাক ডাকছিস?”
“সেকি রে অনেকক্ষণ ঘুমোলাম নাকি!”
“তা আধঘন্টা তো হবেই।”
“সুভদ্রামাসিরা কোথায়?”
“রান্নাঘরে।”
“গান শেখা শেষ?”
“হ্যাঁ, কিন্তু এখন ওখানে যেতে পারবি না। আমাকেও তাড়িয়ে দিল।”
“তার মানে?”
“সোশিওলজিক্যাল ডিসকাশনস হচ্ছে– ইন্টার-রেশিয়াল ম্যারেজের সুফল–কুফল নিয়ে।”
অনেকদিন থেকেই আঁচ করেছি প্রমথর ব্যাপারে ফ্রান্সিস্কা এখন খুব সিরিয়াস।
চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “সুভদ্রামাসি, আমার কি ওখানে যাওয়া বারণ?”
“কেন বারণ হবে?”
“প্রমথ যে বলল।”
“ও পালাতে চাইলে আমি কি করব?”
কিছুক্ষণের মধ্যেই সুভদ্রামাসি আর ফ্রান্সিস্কা আমাদের সঙ্গে এসে বসল। আমিই বললাম, “তোমরা নাকি মিক্সড ম্যারেজ নিয়ে আলোচনা করছিলে।”
“তা একটু করছিলাম।”
“আচ্ছা, সুভদ্রামাসি, তুমি যখন মেসোমশাইকে বিয়ে করবে বলে বাবা-মাকে বললে, তখন তাঁদের রিয়্যাকশন কী হয়েছিল?”
“শোনো ছেলের কথা,” সুভদ্রামাসি সস্নেহে আমার দিকে তাকালেন।
“বলো না।”
“বাবার ভীষণ আপত্তি ছিল। চিঠি লেখাই বন্ধ করে দিয়েছিল।”
“আর তোমার মা-র?”
“মা অতটা আপসেট হয়নি, যদিও আমার ভয় ছিল মা-কে নিয়েই। বাবাকে আমি একজন লিবারেল ইন্ট্যালেকচুয়াল ভাবতাম। লন্ডন-ফেরত ফিলসফির লোক। মা’র যেটুকু পড়াশুনো দেশেই, দাদু-দিদিমার ফ্যামিলি ছিল খুব কনসার্ভেটিভ। কিন্তু মা লিখেছিল, ‘তোমার বাবার সঙ্গে সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েও ওঁকে আমি ভালোবাসতে পেরেছি। তুমিও সেটা পারতে বলে আমার বিশ্বাস। তাও আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমার বন্ধুকেই যদি বিয়ে করো, আমাকে সেটা মানতেই হবে। শুধু মনে রেখো, ভালোবাসার যে উন্মত্ততা এখন অনুভব করছ, সেটা কিন্তু জিইয়ে রাখা কঠিন। দুই কালচারে দুই ধর্মের মধ্যে তোমরা বড়ো হয়েছ, সেই ব্যবধান অতিক্রম করার শক্তি তুমি যেন পাও।’।”
“মাই গড, তোমার মনে আছে কথাগুলো?”
“খুব, ওই চিঠিটা যে আমি কতবার পড়েছি!” বলে সুভদ্রামাসি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “চলো, তোমাদের নিশ্চয় খুব খিদে পেয়ে গেছে। এবার খেয়ে নেওয়া যাক।”
খেতে খেতে একেনবাবু হঠাৎ বললেন, “মাসিমা, আমি রিচার্ডমেসোকে দেখিনি, কিন্তু উনি রিমার্কেল।”
সুভদ্রামাসি হেসে বললেন, “তা তো আমি জানি, কিন্তু তুমি সেটা আবিষ্কার করলে কী করে?”
“আমি আপনাদের জিনিওলজিটা সেদিন পড়ছিলাম। আজকেও কয়েকটা পাতা উলটোলাম –কী ভাবে সব ইনফরমেশন জোগাড় করেছেন। বিশেষ করে আপনার দাদুর ঠাকুরদার খবরগুলো।”
একেনবাবুর কথা শুনে সুভদ্রামাসিকেও চিন্তা করতে হল, “কার কথা বলছ একেন?”
“কেন শিবনারায়ণ গুপ্তর কথা।”
“ওরে বাবা তুমি তো আমার গুষ্টির খবর জেনে ফেলেছ!”
“না, ম্যাডাম, মানে মাসিমা –আমি ওঁর লেখা আর নোটগুলো পড়ে মুগ্ধ!”
সুভদ্রামাসিকে বোঝালাম, “প্রমথর ভাষায় একেনবাবু এখন জিনিওলজির কিক্-এ আছেন।”
“আহা বেশ তো। রিচার্ড কত কষ্ট করে ওগুলো লিখেছে, একজন তো মন দিয়ে পড়ছে।”
“প্রতিটি পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। কোথায় কোথায় ঘুরেছেন –ব্রাসেলস, প্যারিস, মিউনিক… একটা বিরাট রিসার্চ।”
“সেটা করেছে। একেবারে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল কয়েক বছর।”
“কিন্তু এতসব খবর জোগাড় করলেন কি করে?”
“রোহিতই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল বাবু পিন্টো বলে এক জিনিওলজি কনসাল্টেন্টের সঙ্গে। রোহিতেরই বয়সি, খুব এন্টারপ্রাইজিং। সেও খুব ইন্টারেস্ট পেয়েছিল কাজটায়। রিচার্ডের সঙ্গে ইউরোপে গিয়েছিল।”
প্রমথ বলল, “ব্যাস, আপনি এবার একটা লিড পেয়ে গেলেন। বাবু পিন্টোর সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনার ফ্যামিলি ট্রি-টাও শুরু করে দিন।”
“কী যে বলেন স্যার, এসব অনেক পয়সার ব্যাপার। তবে একটু টিপস যদি পেতাম কি করে কাজটায় এগোব…”
“কথা বলে দেখতে পারো,” সুভদ্রামাসি সস্নেহে বললেন। “আমার কাছে এসেছে বাবু কয়েকবার, ছেলেটা ভালো।”
