শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
এগারো
বন্দনা আর প্রভাসের বিয়ে নেক্সট উইকে হচ্ছে। আজকাল অনলাইনে গিফ্ট কিনে উপহার দেওয়া যায়। যদিও সেটা খুব একটা সস্তায় হয় না। আমি গিফ্ট-ইন্ডিয়া ডট কম-এ দিয়ে একটা ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি অর্ডার করলাম। বন্দনার জন্যই ওটা কিনলাম। আমাদের বাড়িতে একটা বুদ্ধমূর্তি ছিল, নেপাল থেকে বাবা কিনে এনেছিলেন। বন্দনা সেটা খুব ভালোবাসত। পুরোনো কথা। এখন হয়তো ভুলেও গেছে। প্রমথ অবশ্য আমার থেকে অনেক বেশি দূরদর্শী। ওর মা’কে বলে এসেছিল একটা ভালো শাড়ি কিনে রাখতে। সেই সঙ্গে বলে এসেছে বিয়েটা গোপনে হচ্ছে, কাউকে যেন কিছু না বলেন, শুধু বিয়ের পরে বন্দনার হাতে যেন শাড়িটা পৌঁছে দিলেই হবে। আমি মা’কে কিছু বলিনি, পেটে কথা রাখতে পারে না বলে।
কলেজে যাবার আগে ইমেইল চেক করতে গিয়ে বন্দনার একটা মেসেজ পেলাম। ওর বাবা-মা বিয়ে দিতে রাজি হয়েছেন। রেজিস্ট্রিটা যেমন হবার তেমন হবে। হিন্দু বিয়েটা হবে ছ’ সপ্তাহ বাদে। লিখেছে, “তোমার ওকালতি বোধ হয় কিছুটা কাজ করেছে। তার থেকেও বোধ হয় বেশি কাজ হয়েছে যখন জানিয়েছ, তুমি ওদের জামাই হতে চাও না। বন্দনা মিথ্যে বলেনি। অথচ, কথাটা সম্পূর্ণ সত্যিও নয়। এনিওয়ে, শিশিরবাবুর কোনো কথা বন্দনার চিঠিতে নেই। আশাও করিনি। ও এখন নিজের বিয়ে নিয়ে মশগুল। ফ্রাঙ্কলি, শিশিরবাবুর মৃত্যু নিয়ে প্রধান যে চিন্তাটা ছিল, সেটা দূর হওয়ায় আমিও ওসব নিয়ে বিশেষ ভাবছি না। একেনবাবুর ব্যাপারটা আলাদা। উনি সাধারণত আগবাড়িয়ে কোনো কিছুতে জড়ান না। কিন্তু একবার জড়িয়ে গেলে, জট না ছাড়া পর্যন্ত চুপচাপ থাকতে পারেন না। দুদিন আগেও দুলাল মিত্রের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেছেন। গতকাল দেখলাম দুলাল মিত্রের কাছ থেকে ওঁর নামে একটা মোটা খাম এসেছে। কিন্তু খামের মধ্যে কি আছে সেটা আর জানা হয়নি, কারণ একেনবাবু এক দিনের জন্য মায়ামি গেছেন একটা কনফারেন্সে। ফিরবেন আজ বিকেলে। তখন জানতে পারব।
ফ্যান্সিস্কার ফোন এল। এই শনিবার সুভদ্রামাসির কাছে গান শিখতে যেতে চায়। জিজ্ঞেস করল, আমাদের সুবিধা হবে কিনা। তাহলে সুভদ্রামাসিকে ফোন করবে। বিনি পয়সায় ভোজে আপত্তিটা কোথায়! প্রমথ নিশ্চয় রাজি হয়েছে। একেনবাবুরও মনে হয় না আপত্তি হবে বলে। বললাম, “গো অ্যাহেড।”
একেনবাবু এলেন বিকেল বেলায়। বললাম, “আপনার একটা বড়ো খাম এসেছে দুলাল মিত্রের কাছ থেকে।”
“এসে গেছে স্যার! কই দিন।”
খামটা এগিয়ে দিতেই সেটা ছিঁড়ে একতাড়া কাগজ বার করলেন।
“কী ওগুলো?”
“যে চিঠিগুলো শিশিরবাবুর বাড়িতে মেঝেতে পেয়েছিল, তারই কপি।”
একেনবাবু চোখ বুলিয়ে চিঠিগুলো আমাকে দিলেন। গোটা আটেক পুরোনো চিঠি। লেখাগুলো কিছু কিছু জায়গায় অস্পষ্ট হয়ে গেছে। অনেকদিন ভাঁজ করা অবস্থায় ছিল, ভাঁজের জায়গাগুলো ভালো পড়া যাচ্ছে না। বোঝাই যায় প্রেমপত্র। হাতের লেখা সব একই ছাঁদের। সুতরাং শিশিরবাবুর কোনো বান্ধবী হবেন। বান্ধবী বলছি, কারণ প্রভাসের কাছে শুনেছি উনি বিয়ে করেননি। তথ্যটা সঠিক কিনা জানি না।
“কোনো চিঠিতেই তারিখ নেই,” একেনবাবু বললেন।
“তারিখ জানলে সুবিধা হতো?”
“কে জানে স্যার, তবে এইটেই মনে হয় শেষ চিঠি।” একেনবাবু একটা চিঠির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। আঁকাবাঁকাভাবে এক লাইনের চিঠি।
‘এটা রেখে দিও, আর কাল ভোর চারটের সময় ট্যাক্সি নিয়ে বাইরে অপেক্ষা কোরো।‘
খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা। জেরক্স-এ আসল কাগজের একটা ছাপ বাইরে পড়ে। সেই ছাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, যে কাগজে লেখা হয়েছিল –সেটা চিঠি লেখার কাগজ নয়, এক টুকরো ছেঁড়া কাগজ।
জিজ্ঞেস করলাম, “কী বুঝছেন?”
“কে জানে স্যার, এইসব প্রেম-ফ্রেম বুঝি না। আমার আবার অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। বাবা বললেন করতে, আমি করলাম।”
“সেটা বুঝলাম। কিন্তু দুশো টাকার ডাক টিকিট লাগিয়ে ওসি সাহেব এটা পাঠালেন, কিছুই মিলল না বলছেন।”
“আপাতত নয় স্যার। তবে ভবিষ্যতের কথা আমরা কতটুকু জানি।” খামের মধ্যে চিঠিগুলো ভরতে ভরতে একেনবাবু বললেন।
আমি বললাম, “টু ব্যাড, চিঠিগুলো ছেলেদের লেখা নয়।”
“কেন বলুন তো স্যার?”
“তাহলে আপনি গিন্নীকে চিঠিগুলো কপি করে পাঠাতে পারতেন।”
“এই সব চিঠি পেলে স্যার ও হার্ট ফেল করত। ভাবত নির্ঘাৎ আমি কারোর সঙ্গে প্রেম-টেম করছি।”
প্রমথ বাড়িতে এসে চিঠিগুলো দেখল। ও আবার খুব টেকনিক্যালি সবকিছু দেখে। বলল, “দেখলি একটা বানান ভুল নেই। তুই হলে একগণ্ডা বানান ভুল লিখতি। বিশেষ করে এই ‘সরস্বতী’ আর ‘যথেষ্ট’ বানানটা।”
আমায় মানতে হবে ওই দুটো বানান আমি সবসময়ে ভুল করি, আর প্রমথ সেটা কারেক্ট করে প্রভূত আনন্দ পায়।
