নিনিকুমারীর বাঘ (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
সাত
আমি যখন সুস্থ হয়ে কুচিলাখাঁই বাংলোতে ফিরে গেলাম ততদিনে নিনিকুমারীর বাঘ আরও তিনজন মানুষ খেয়েছে। একজন মেয়ে এবং দুজন ছেলে। ঋজুদার কাছে খবর এসেছিল অনেক দেরিতে। তিনটে গ্রামের দূরত্বই কুচিলাখাঁইয়ের বাংলো থেকে অনেক দূরে। জিপ যাওয়ার রাস্তাও নেই। তাছাড়া দেরিতে খবর পাওয়ার ফলে সেসব জায়গাতে গিয়ে কোনও লাভ হত না।
প্রথম দিন রাইফেল এবং বন্দুক ছুঁড়ে দেখলাম যে ঠিকমত হোল্ড করতে পারছি কি না। হঠাৎ এক ঝটকাতে তুলে নিয়ে গুলি করতে গেলে হাতে লাগছে কি না?
ঋজুদা বলল, তুই তোর ডান কাঁধের ওপরে একটা মাফলার ভাঁজ করে রেখে তার উপরে চামড়ার জার্কিনটা পরে নে। তাহলে ব্যথা করবে না। তাই করে সত্যিই ভাল ফল হল।
বিশ্বল সাহেব এসেছিলেন বিকেলে। তাঁর সঙ্গেও অনেক পরামর্শ হল।
ঋজুদা বলল, যা বুঝছি তাতে বাঘের কিল্-এর অপেক্ষায় থাকলে আর চলবে না। আমাদেরই বাঘকে খুঁজে বের করতে হবে। সাম্বপানি থেকে খবর এসেছে যে বাঘ আর শিকার-গড়ে আসেনি তারপর। সে ডেরা বদলেছে। এবং ডেরা বদলেছে বলে তাকে এখন খুঁজে বের করা খুব মুশকিল হবে। সুতরাং দুটো ন্যাপস্যাকে গুলি, ছুরি, টর্চ, জলের বোতল, কিছু শুকনো খাবার, চিড়ে গুড় আর চা চিনি নিয়ে আমাদের বেরতে হবে। জঙ্গলেই থাকতে হবে। খাবার ফুরিয়ে গেলে জঙ্গলের মধ্যে যদি গ্রাম পাওয়া যায় তবে সেখানে ডালভাত যা জোটে তা খেয়ে আবার জঙ্গলে ফিরে যেতে হবে। ঐভাবে ঘুরতে ঘুরতে যদি কোনও ফ্রেশ কিল পাওয়া যায় অথবা অন্যভাবে বাঘের মুখোমুখি হওয়া যায়, তাহলে একটা চান্স পেলেও পাওয়া যেতে পারে। অফেন্স ইজ দ্যা বেস্ট ডিফেন্স-এই পলিসি নিতে হবে আমাদের। ভটকাই থাকবে এই বাংলোতে। বলভদ্রবাবু আমাদের জিপে করে যতখানি সম্ভব এগিয়ে দিয়ে যে গ্রাম অবধি জিপ পৌঁছয় সেখানেই থাকবেন ক্যাম্প করে। বিশ্বল সাহেবকে বলে তাঁর ছুটির বন্দোবস্তও করে নিয়েছে ঋজুদা। তারপর দেখা যাবে কী হয়!
আগামীকাল ভোরে হেভি ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরিয়ে পড়ব।
ভীমগদা বলে একটা গ্রাম আছে কুচিলাখাঁইয়ের উত্তরে। মাইল পনেরো পথ। সেইখানে পৌঁছে জিপ ছেড়ে আমরা জঙ্গলে ঢুকব। শেষ কি যেখানে হয়েছে সেখান থেকে ভীমগদা গ্রাম মাইল পাঁচেক দক্ষিণে। উত্তরে আমাদের হেঁটে যেতে হবে সেই পাঁচ মাইল। প্রয়োজনে রাতটা ভীমগদাইে কাটাব। যদি জঙ্গলে থাকার কোনও অসুবিধে থাকে।
রাতে পেট ভরে মুগের ডালের খিচুড়ি খাওয়া হল। দারুণ বেঁধেছিল জগবন্ধু। সঙ্গে আলু ও বেগুন ভাজা, শুকনো লঙ্কা ভাজা। খাঁটি গাওয়া ঘি দিয়ে জবজবে করে মাখা খিচুড়ি।
ভটকাইকে যে সত্যিই বাংলোতে থাকতে হবে একথা ও তখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না।
ঋজুদা বলল, ভাবিস না যে আমরা যখন বাঘের খোঁজে বনজঙ্গল তোলপাড় করব তখন বাঘ তোর সঙ্গে দেখা করতে এখানে আসবে না। সাবধানে থাকবি। বন্দুক লোড করে সবসময় হাতের কাছে রাখবি। রাতে, দরজা জানলা ভাল করে বন্ধ করে শুবি। বলভদ্রবাবু রোজ একবার করে এসে তোর খোঁজ নিয়ে যাবেন আর আমাদের জন্যে কিছু টাটকা ডিম, তরি-তরকারি নিয়ে যাবেন। যদি আমরা ঘুরতে ঘুরতে ভীমগদাতে চলে আসি তাহলে ভালোমন্দ খেয়ে একটু মুখ বদলানো যাবে।
শেষ রাতের দিকে জোরে বৃষ্টি এল। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। ভোরবেলা দরজা খুলে দেখি নানারঙের ঝরাপাতা আর মরা পাখিতে চারধার ছেয়ে গেছে। শিলাবৃষ্টি হয়েছিল। বাংলোর টালির ছাদে চটাপট করে শব্দ শুনেছিলাম সে জন্যে।
চান করে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। বলভদ্রবাবুও সঙ্গে এলেন। বালাবাবু রইলেন অন্য জিপটা নিয়ে ভটকাইয়ের লোকাল গার্জেন হিসেবে।
পথটা শুধুই চড়াইয়ে চড়াইয়ে উঠেছে। সকাল নটাতে কনকনে হাওয়া জার্কিনের কলার তুলে দেওয়া সত্ত্বেও কান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ঝকম করছে নীল আকাশ। পাহাড়ী বাজ উড়ছে ঘুরে ঘুরে। ঋজুদার পাইপের টোব্যাকোর গন্ধটা শীতের বৃষ্টি ভেজা প্রকৃতির গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। একটা গুরান্টি হরিণ দৌড়ে পথ পেরল। তারপরই একদল চিতল হরিণকে দেখা গেল পাহাড়ের ঢালে বৃষ্টি ভেজা ঘাস খাচ্ছে পটপট করে ছিঁড়ে। চলন্ত জিপ দেখেও তারা পালাল না। মুখ তুলে চাইল শুধু।
গ্রামটার নাম ভীমগদা কেন?
বলভদ্রবাবু বললেন এখানে নাকি ভীমের গদা পড়েছিল। মন্দিরও আছে একটা। ভীম-মন্দির। যখন বাঘের উপদ্রব ছিল না তখন প্রতি বছর চৈত্র মাসে এখানে প্রকাণ্ড মেলা বসত চৌঠা বৈশাখ। যাত্রা হত। রুপোর গয়না, পেতলের বাসন-কোসন, ঝাঁটা, চাদর, ধুতি, শাড়ি, জামা, গুলগুলা আর পোড়পিঠার দোকান বসত। দেখবার মত। এখন বাঘটা এই পুরো অঞ্চলের মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, আমোদ-প্রমোদ, সাধ-আহ্লাদ সব মাটি করে দিয়েছে।
গ্রামটা একটা পাহাড় চুড়োয়। গোটা পনেরো ঘর। সজনে গাছ। আম। কাঁঠাল। হলুদ সর্ষে ক্ষেত। মাটির দেওয়ালে লাল হলুদ আর সাদা রঙের নানারকম ছবি। এখানকার বাসিন্দারা জাতে খড়িয়া। সুন্দর বলে এদের খুব নামডাক আছে। যেমন ছেলেরা, তেমনই মেয়েরা। তবে তাদের মূল বাস অনেক দূরে। বছর পঞ্চাশ আগে একটি দম্পতি এসে ঘর বানিয়েছিল এখানে। কোনো সামাজিক অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল মূল বাস থেকে। তাদেরই ছেলে মেয়ে বউ জামাই নিয়ে এ গ্রাম। এখন আর খাঁটি খড়িয়া নেই তারা। ছেলেদের বৌ আর মেয়েদের জামাই এসেছে অন্য গোষ্ঠী থেকে।
পাহাড় চুড়োয় পৌঁছে বলভদ্রবাবু মোড়লকে ডেকে বাঘের খোঁজখবর নিলেন। মোড়ল বলল, বাঘ পরশু রাতে খুব ডাকাডাকি করছিল। তবে সে বাঘ নিনিকুমারীর বাঘ কি না তা বলতে পারবে না। এখন সব বাঘই সমান ভয়ের এদের কাছে।
একজন বলল, গাঁয়ের গরু মোষ যে বাথানে থাকে তার কাছে এসেছিল বাঘ। মোষেদের ক্রুদ্ধ গর্জনও শোনা গেছিল। প্রায় আধঘণ্টা ডাকাডাকি করে তারপর বাঘ ফিরে গেছিল। বাথানের মধ্যে ঢোকার সাহস পায়নি। তাছাড়া বাথানের কাছে গিয়ে আমরা দেখলাম যে মোটা মোটা ডবা বাঁশ দিয়ে বেড়া দেওয়া খুবই শক্ত পোক্ত করে। বাঘের পায়ের দাগ হয়ত দেখা যেত কিন্তু গত রাতের বৃষ্টিতে সব ধুয়ে মুছে গেছে। ওরা কিছু আনাজের চাষ করেছিল পাহাড়ের পেছনের ঢালে। তারও ক্ষতি হয়েছে খুব শিলাবৃষ্টিতে। তার ওপরে এই অসময়ের শিলাবৃষ্টি। লোকগুলো খুবই মনমরা হয়ে বসেছিল।
পাহাড় চুড়োয় দাঁড়িয়ে পরশু রাতে আসা বাঘ কোনদিকে গেছিল তার একটা আন্দাজ দিল মোড়ল। আমাদেরও এখন ওদের মতই অবস্থা। কোনো বাঘকেই তাচ্ছিল্য করার উপায় নেই। যে কোনো বাঘের হদিস পেলেই যাচাই করে দেখতে হবে সে নিনিকুমারীর বাঘ কি না।
পাইপে নতুন করে তামাক ভরে নিয়ে ঋজুদা বলল, চলি বলভদ্রবাবু। কোনো খবর থাকলে জানাবার চেষ্টা করবেন। বাঘকে পেলে আর আমাদের ডাকার অপেক্ষায় থাকবেন না। কে মারলো সেটা বড় কথা নয়। এই বাঘ মারা পড়াটাই সবচেয়ে জরুরী।
উনি মাথা নাড়লেন।
ঋজুদা বলল, চল্ রে রুদ্র।
ন্যাপস্যাকটা পিঠে বেঁধে নিয়ে রাইফেল কাঁধের ওপর শুইয়ে এগোলাম ঋজুদার সঙ্গে।
আমরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পেছনের উপত্যকাতে নেমে চললাম। পিটি-টুই, পিটি-পিটি-পিটি-টুই আওয়াজ করে একটি টুই পাখি, সবুজ টিয়ার বাচ্চার মত, ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল এক ঝোপ থেকে অন্য ঝোপে। পাখিটার নাম আমি দিয়েছি টুই। আসল পাখিটা যে কি ঋজুদার কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে।
পাহাড়ের এই ঢালে বেশিই হরজাই গাছের জঙ্গল। ঝোপ ঝাড়। অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গা। কিছুক্ষণ হল জলের ঝরঝরানি শব্দ কানে আসছিল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মাঝামাঝি নামতেই হঠাৎ চোখে পড়ল জলপ্রপাত। কাল সারা রাতের বৃষ্টিতে নতুন করে জোরদার ঢল নেমেছে তাতে। প্রপাতটি প্রায় শ-দুয়েক ফিট উপর থেকে পড়ছে। চওড়াতেও নেহাত কম নয়। নিচে একটি দহর মত সৃষ্টি করেই নদী হয়ে বয়ে গেছে কনসরে গিয়ে মিলবে বলে। প্রপাতের নিচের খাদে গভীর জঙ্গল। বড় বড় ডবা বাঁশের। ঝাড়। নলা বাঁশ ও কন্টা বাঁশও আছে। একই জায়গায় যা সচরাচর দেখা যায় না। বহু। প্রাচীন, প্রায় প্রাগৈতিহাসিক জংলি আম এবং কাঁঠালের গাছ। প্রায় আধ বর্গমাইল। জায়গাতে জঙ্গল এখানে এতই ঘন যে একেবারে চন্দ্রাতপের মত সৃষ্টি হয়েছে। নানা পাখির ডাক ভেসে আসছে প্রপাতের শব্দকে ছাপিয়ে।
ঋজুদা বলল, আশ্চর্য! এরা তো কেউই আমাদের এ জায়গাটির কথা বলল না। অথচ এই এলাকাতে এই প্রপাত এবং প্রপাতের নিচে জঙ্গলটি নিঃসন্দেহে একটি আশ্চর্য ল্যান্ডমার্ক। বাঘের থাকার আইডিয়াল জায়গাও বটে!
আমি বললাম, আমাকে বলেছিল।
কে?
ভটকাই।
ভটকাই? জানল কি করে ও?
ওকে জগবন্ধুদা বলেছিল।
কী বলেছিল?
বলেছিল ভীমগদা পাহাড়ের পেছনের ঢালে একটি মস্ত প্রপাত আছে এবং নিচের ছায়াচ্ছন্ন জঙ্গলে হাতিডিহ।
কি?
হাতিডিহ। হাতিদের থাকার জায়গা। ওখানে নাকি মা-হাতিরা এসে বাচ্চা হওয়ার সময়ে থাকে।
আমরা কথা বলতে বলতেই হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে হাতির বৃংহণের শব্দ ভেসে এল। প্রপাতের আওয়াজ ছাপিয়ে পাখিদের মিশ্রস্বর ডুবিয়ে প্রচণ্ড জোরে হাতি বারবার বৃংহণ করতে লাগল। মনে হল, কোনো বাচ্চা ছেলে দানবের মত দেখতে কোনো মার্সিডিস ট্রাকের সীটে উঠে অনেকক্ষণ ধরে মার্সিডিস-এর এয়ার-হর্নটি টিপে রয়েছে।
ঋজুদা একটু আশ্চর্য হল। বলল, এই ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে এমন একটি জায়গা যে আছে সে কথা বালাবাবু, বলভদ্রবাবু এবং বিশ্বলবাবুরা জানালেন না কেন আমাকে?
জানাননি, তার কারণ আছে। ওরা নিজেরা জানলে তবে না জানাবেন। জগবন্ধুদার এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে ভীমগদাতে তাই তার যাতায়াত ছিল এখানে। ভীমগদার মানুষেরাই শুধু জানে এই প্রপাতের কথা। প্রপাতটির নাম হচ্ছে বাঁশপাতি। নদীর নামও তাই। আর খাদের গহন উপত্যকার নাম হাতিডিহ। ভটকাইকে জগবন্ধুদাই বলেছিল। হাতিডিহ এবাং বাঁশপাতি নদীর কাছেও কোনো মানুষ আসে না। এসব পবিত্র স্থান। ঈশ্বরের স্থান। বাঁশপাতির নদীর জলে ভীমগদার কোনো লোক পা দেয় না। ভীম নাকি এ প্রপাতের নিচের দহতে গণ্ডুষ ভরে জল পান করেছিলেন একসময়।
ঋজুদা তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, কোন্ সময়?
তা আমি জানি না।
ঋজুদা চাপা গলাতেই ধমক দিয়ে বলল, আমাদের দেশের বন-পাহাড়ের গাঁ-গঞ্জের লোক না হয় যা খুশি তাই বিশ্বাস করতে পারে। তা বলে তুইও বিনা প্রশ্নে, বিনা যাচাইয়ে যা শুনবি তাই বিশ্বাস করে নিবি?
আমি লজ্জিত হলাম।
তারপর বললাম, রামায়ণ সিরিয়ালের যা এফেক্ট হবে দেখবে। এবার শহরের লোকেরাও সব বিশ্বাস করবে।
রামায়ণ মহাভারত থেকে শেখারও অনেক আছে। কিংবদন্তী ও কল্পনাটা বাদ দিয়ে শেখারটুকু শিখলে ক্ষতি কি? তাছাড়া এই যে পুষ্পকরথ, নানারকম সাঙ্ঘাতিক সাঙ্ঘাতিক সব বাণ, এসব তো আজকের দিনে সত্যি হয়েছে। নানা আকারের নানা সাইজের জেট প্লেন, নানা ধরনের মিসাইলস্ এসব তো আর কল্পনার নয়। আমাদের দেশ হয়ত এক সময় রাশিয়া, আমেরিকা, পশ্চিম জার্মানি এবং চীন থেকে অনেকই এগিয়ে ছিল এইসব ক্ষেত্রে। কে বলতে পারে!
আমি বলতে গেলাম
ঋজুদা বাধা দিয়ে বলল, জায়গাটা একটু ইনভেস্টিগেট করে আসি। বলেই, নামতে লাগল উৎরাই বেয়ে। এদিক দিয়েই তাও নামা যায়, ওদিকে একবারেই খাড়া নেমেছে পাহাড়। নানা লতা গুল্ম অর্কিড়ে ছাওয়া তার গা। মাঝে মাঝে লাল ক্ষতর মত দগদগে পাথর দেখা যাচ্ছে। লৌহ-আকর।
ঋজুদা বলল, দ্যাখ কোন্ সময়ে কেউ হয়ত এখানে ওপেন-পিট মাইনিং করে লোহা বের করতে চেষ্টা করেছিল।
আমি বললাম লৌহ আকর তো এমনিই খুঁড়ে খুঁড়ে বের করে, ম্যাঙ্গানিজও তাই, কয়লা বা অভ্রখনির মত তো সুড়ঙ্গ বা ইনক্লাইন মাইন করতে হয় না।
লজ্জা পেয়ে ঋজুদা বলল, ঠিক বলেছিস। আমি ভুল বলেছিলাম।
ঋজুদার এই একটা মস্ত গুণ। কখনই দোষ করলে অস্বীকার করে না। জীবনে যারা বড় হয় তাদের সকলেরই বোধহয় এই গুণটি থাকে।
সবাধানে নিচে নামতে লাগলাম আমরা। ওদিকে হাতির বৃংহণ শব্দ বেড়েই চলতে লাগল কিছুক্ষণ যতির পর। এবং সেই যতি কিন্তু একেবারে নির্ভুলভাবে দেওয়া হচ্ছিল।
ঋজুদা বলল, আশ্চর্য? এমনটি কখনও শুনিনি কোনো জঙ্গলেই। তবে একথা ঠিক এমন ঘটনার কথা বছর তিরিশ আগে বেঙ্গল ক্লাবের লাইব্রেরি থেকে বাবার আনা একজন আফ্রিকান হোয়াইট হান্টারের লেখা বইতে পড়েছিলাম। উনি জাম্বেসী নদী, লেক নিয়াসা এই সব অঞ্চলে শিকার করতেন। ভদ্রলোকের নাম ছিল গাই মলডুন। রাল্ফ থমসন বলে একজন শিল্পীর আঁকা চমৎকার সব ছবিও ছিল সেই বইটিতে। বইটির নাম দ্যা ট্রাম্পেটিং হার্ড। তার মধ্যে একটি অধ্যায় ছিল আ ক্লোজলি গার্ডেড সিক্রেট হাতি-মায়েদের লুকিয়ে থাকার জায়গা ছিল তা। আফ্রিকানরাও কিন্তু বিশ্বাস করতো। এই অন্ধকার গা-ছমছম পবিত্র জায়গা থেকে হাতিদের বৃংহণ শুনলে তারা ভাবত কোন আধিভৌতিক ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে। সমস্ত গ্রামের মানুষ রুদ্ধশ্বাস-ভয়ে অপেক্ষা করত কখন ঐ অবিরত গর্জন থামে। কোনো বাড়িতে রান্না হত না। ছেলেমেয়রা ভয়ে খেলত উঠোনে কি ধূলিমলিন পথে। গাঁয়ের মুরগিগুলো পর্যন্ত কঁক কঁক করতে ভুলে যেত।
আমি বললাম, একটু বাঁ দিক ঘেঁষে চল। হাতির দল যদি থাকে ওখানে তো আমাদের দেখতে পাবে সোজা গেলে।
ঋজুদা বলল, চল তাই। তবে সম্ভবত হাতির দল ওখানে নেই। আছে কয়েকটি মেয়ে হাতি যারা মা হবে। একটি দুটি বুড়ি হাতিও থাকতে পারে সঙ্গে। তারা ধাইমা।
আমি বললাম, নিনিকুমারীর বাঘ ফেলে তুমি এখন হাতিদের মায়েদের দিকে চললে?
ঋজুদা বলল, নিনিকুমারীর বাঘ তো আমাদের তার বাড়ির নাম্বার বা রাস্তার নাম দিয়ে যায়নি। জঙ্গলে যখন তখন যা কিছু ঘটতে পারে। কোথায় যে কার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানাই নেই। বাঘ যে হাতির বাচ্চা খেতে খুব ভালবাসে তা বুঝি জানিস না? অমন নধর মাংস। গাবলু-গুবলু। শুঁড়ও তখনও নরমই থাকে। হাতির বাচ্চা হচ্ছে বাঘের রসগোল্লা।
তাই?
হ্যাঁ। সাবধানে দেখে নাম। পড়ে যাবি পা হড়কে। পাথর ঘাস সব যে ভিজে আছে এখনও।
কিছুটা নেমেই ঋজুদা নিবে-যাওয়া পাইপটা থেকে ছাই ঝেড়ে ফেলল এমনভাবে, যাতে হাওয়া কোনদিকে তা বোঝা যায়। হাওয়া ওদিক থেকেই এদিকে আসছিল।
ঋজুদা বলল, বাঁচা গেল। হাতিদের দৃষ্টিশক্তি তেমন ভাল না। কিন্তু ঘ্রাণশক্তি সাঙ্ঘাতিক ভাল।
যতই আমরা নেমে সেই বাঁশপতির নদীর উপত্যকার কাছাকাছি আসতে লাগলাম ততই বন ক্রমশ ঘন থেকে ঘনতর হতে লাগল। আদিম সব গাছ। কসিস, মিটকুনিয়া নিম, জংলী আম এবং কাঁঠাল। নানারকম জ্বালকাঠ।
এদিকে হাতির বৃংহণ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল।
ঋজুদা বলল, খুব সাবধানে চল। আড়াল নিয়ে নিয়ে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে যখন আমরা নদীটা পেরিয়ে প্রায় নিচ্ছিদ্র জঙ্গলে ঢুকলাম, এদিকে বাঁশের বনও ছিল নানারকম; আগেই বলেছি; তখন মনে হল সামনে একটা গভীর গোলাকৃতি খাদ আছে। জঙ্গলে ভরা এবং অন্ধকার। এক এক পা করে আমরা খাদের ধারের কাছে গিয়ে লেপার্ড-কলিং করে এগোতে থাকলাম। নিঃশব্দে। ঋজুদা আমার আগে ছিল। হঠাৎ ডান হাতটা পেছনে প্রসারিত করে প্রায় শোওয়া অবস্থাতেই আমাকে আঙুল দিয়ে ইশারা করল। অতি সাবধানে এগিয়ে গিয়ে দেখি ছ’টি হাতি গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে একটি হাতিকে। এবং তারা পালা করে শুড় সামনের দিকে সমান্তরাল রেখায় সোজা তুলে ডাকছে। মধ্যের হাতিটিও মাঝে মাঝে ডাকছে। আমাদের দেশে তো বটেই আফ্রিকাতেও এমন হাতির ডাক শুনিনি। ডাক শুনেই নাড়ি ছেড়ে যাবার উপক্রম হল।
অনেকক্ষণ আমরা তাদের ভাল করে দেখার পর আবার বুকে হেঁটে হেঁটে পেছোলাম। পেছিয়ে এসে আবার দাঁড়িয়ে উঠে আমরা সন্তর্পণে হাতিডিহকে পেছনে ফেলে এগোলাম।
বাঁশপাতি নদী পেরনোর পর ঋজুদা বলল, এরকম দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি তবে গাই মালড়ুনের বইয়ে এরই কাছাকাছি এক দৃশ্যের কথা ছিল। প্রকৃতির বুকের মধ্যে যে কতরকমই রহস্যই থাকে।
হাতিগুলোর একটারও দাঁত ছিল না কিন্তু। একটার ছিল ছোট দাঁত।
সবকটিই যে মাদী হাতি।
একটার যে দাঁত ছিল!
ওটিও মাদী। মাদী হাতিরও তো দাঁত থাকে। ভুলে গেছিস।
বাঁশপতি নদীকে ডাইনে রেখে আমরা নিনিকুমারীর বাঘের পায়ের দাগের জন্যে মাটিতে নজর রেখে চলতে লাগলাম। এ যেন খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজা। এমনভাবে যেতে যেতে যে বাঘের পায়ের দাগ কখনও পাব তা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না। অথচ তা ছাড়া করারও কিছু ছিল না।
চল পাহাড়টা পেরিয়ে ওপারে যাই।
চলো। বলে, আমরা আবার পাহাড় চড়তে লাগলাম।
পাহাড়ের চুড়োয় পৌঁছে দুজনেরই হাঁফ ধরে গেল। কতগুলো রক্-শেলটার ছিল সেখানে। ভীমবৈঠকার মত। তারই একটার নিচে বসা গেল। বোঁটকা গন্ধ বেরোচ্ছিল সেই রক-শেলটারের ভেতর থেকে। আমার মনে হল গন্ধটা বাঘের গায়ের। বাদুড়ের বাসা থাকলেও অমন গন্ধ বেরোয়। কিন্তু সেখানে বাদুড় দেখলাম না।
ঋজুদা বলল আমরা ঘণ্টা তিনেক হল জিপ ছেড়েছি। মনে হচ্ছে কত যুগ হল। একটু চায়ের বন্দোবস্ত করতে পারিস? আমি আমার ন্যাপস্যাক নামিয়ে রেখে তার ওপর রাইফেলটা শুইয়ে রেখে কিছু খড়কুটো পাওয়া যায় কী না দেখতে যাব এমন সময় ঋজুদা বলল, রাইফেলটা সঙ্গে নিয়ে যা।
কয়েক গজ গেছি। শুকনো পাতা ও কাঠকুটো কুড়োচ্ছি আর আমার টুপির মধ্যে ভরছি নিচু হয়ে হয়ে। রাইফেলটা কাঁধে ঝোলানোই আছে। এমন সময় হঠাৎ আমার মনে হল আমাকে যেন কেউ আড়াল থেকে দেখছে। মনে হতেই, আমি স্থির হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। মুহূর্তের মধ্যে রাইফেলটাকে হাতে নিলাম এবং ঠিক সেই সময় পাঁচ ছটা বনমুরগি ভীষণ ভয় পেয়ে আমার সামনে ডানদিকে ঘড়ির কাঁটা তিনটেতে যেখানে থাকে, সেই কোণ থেকে কঁককঁক করে একসঙ্গে উড়ে গেল। বড় বড় দাড়িওয়ালা হলদেটে বুড়ো প্রকাণ্ড একটা রামছাগল যেন মুখটা এক ঝলক একটা অর্গুন ঝোপের আড়াল থেকে আমাকে দেখিয়েই ছায়ার মত সরে গেল। আমি রাইফেল আনসেফ করে আস্তে আস্তে সেদিকে এক পা এক পা করে এগোলাম। পাতাপুতা খড়খুটো ভরা টুপিটা ওখানেই পড়ে রইল।
যেখানে মুরগিগুলো ছিল সেখানে পৌঁছে দেখলাম চারটে ডিম। কিন্তু সেই রামছাগলের মত জিনিসটা কি তা খোঁজার চেষ্টা করছি যখন দুচোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণতম করে তখন দেখলাম যে একটি বাইগবা গাছের আড়ালে আস্তে আস্তে প্রকাণ্ড একটি বাঘের পেছন মিলিয়ে গেল। ঋজুদাকে খবরটা দেবার জন্যে পেছন ফিরতেই দেখি ঋজুদা। আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
চা খাওয়া মাথায় উঠল আমাদের। আমি যথাসম্ভব নিঃশব্দে বড় বড় পা ফেলে গিয়ে আমার রাক-স্যাক আর টুপিটা ঝেড়ে ঝুড়ে তুলে নিয়ে এসে দেখি যে ঋজুদা এগিয়ে গেছে অনেকখানি। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আমি ঋজুদার পেছনে এগোলাম।
ঋজুদা কিন্তু ঐ বাইগবা গাছটা অবধি গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমি গিয়ে পাশে, দাঁড়াতেই প্রায় তিনশো গজ দূরে আকাশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো। দেখি শকুন উড়ছে চক্রাকারে।
ঋজুদা বলল, চল্ ফিরে যাই। ঠাকুরানী যখন আন্ডাই সাপ্লাই করলেন তখন ওমলেট আর চা খেয়ে নিয়েই যা করার তা করা যাবে।
ফিরতে ফিরতে আমি বললাম, কি করবে?
ঋজুদা বলল ওমলেট আর চা খেয়ে বেলা তিনটে সাড়ে তিনটে অবধি এখানেই এই শেলটারে রেস্ট করব কারণ সারা রাত জাগতে হবে হয়ত আমাদের।
ব্যাপারটা কী হতে পারে আমি অনুমান করতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু কিছু বললাম না।
ঋজুদাকে শুধোলাম, তুমি আমার পেছনে এলে কি করে?
ঐ মুরগিগুলোর কঁকককানি শুনেই। ওদের ভাষায় কোনও অস্পষ্টতা ছিল না।
চা-টা বেশ ভালই বানিয়েছিলাম বেশি করে কনডেন্সড মিল্ক ঢেলে। আর ওমলেটও বানিয়েছিলাম ছোট সসপ্যানটাতে। লঙ্কা বা পেঁয়াজ ছিল না। শুধুই নুন।
ঋজুদা বলল, একটু চিঁড়ে ছেড়ে দে মধ্যে। লোকে চিকেন-ওমলেট খায় আমরা চিড়ে-ওমলেট খেলাম।
ঘড়িতে যখন সোয়া তিনটে তখনই ঋজুদা বলল, চল্ ওঠা যাক।
দুজনে আস্তে আস্তে পাহাড়টার ঢাল বেয়ে নামতে লাগলাম যেদিকে শকুনদের উড়তে দেখেছিলাম সেদিকে। কাক-উড়ানে চাইলে দূরত্ব বোঝা যায় না। উৎরাই অথবা চড়াইয়ে নামা ওঠার সময়ে পাথর ও কাঁটাঝোপ, খাদ ও খাড়া পাড় এড়িয়ে নামতে নামতে বা এগোতে এগোতে বোঝা যায় যে পথ কত দূরের।
ঘাড়ে রোদ পড়ছিল পেছন থেকে। বেশ আরাম লাগছিল। সমতলের একটু আগে পাহাড়ের ঢালের শেষভাগে এসে ঋজুদা ফিস্ ফিস্ করে বলল, তুই বাঁদিকের ওই পাথরটার আড়াল নিয়ে বসে সামনে নজর রাখবি। আমি ডান দিক দিয়ে ঘুরে জায়গাটাতে পৌঁছচ্ছি।
ঋজুদা ডানদিকে সরে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতেই আমি রাইফেল ডান ঊরুর উপরে রেখে হাঁটু গেড়ে বসলাম। একটা পাথরে হেলান দিয়ে এবং শরীরটাকেও ঐ পাথরটার যতখানি সম্ভব আড়ালে রাখা যায় তাই রেখে। ঋজুদা চলে যাবার পরই লক্ষ করলাম যে আমি যেখানে বসে আছি তার হাত দশেক দূর দিয়ে একটা গেম-ট্র্যাক বা জানোয়ার চলা পথ বাঁদিক থেকে ডানদিকে গেছে। মনে হল ডানদিকে গিয়ে পথটা মিলেছে বাঁশপাতি নদীতে।
ঋজুদাকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। হেমন্তর বিকেলের বনের স্তব্ধ ছায়া ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। হেমন্ত আর শীতের বেলা কিশোরীর কানের দুলের মত। কখন যে হঠাৎ পড়ে যায়, এক মুহূর্ত আগেও বোঝা যায় না। যাঁরা তা পড়তে দেখেছেন তাঁরাই শুধু জানেন।
আমার পেছনে একটা কুচিলা-খাঁই। গাছে বসে আরও অনেকগুলো কুচিলা-খাঁই বা গ্রেট ইন্ডিয়ান হর্নবিলস্ হ্যাঁক হ্যাঁক হুঁক্কো হুঁক্কো হুঁক্কো করে ডানা ঝটপট করতে করতে নড়েচড়ে বসে ঝগড়া করছে। সামনের ঢাল থেকে মাঝে মাঝে শকুনের ঝগড়ার আওয়াজ আসছে। শকুনরা এখন আর গাছে নেই। তার মানে বাঘ ধারেকাছে নেই মড়ির। কী মেরেছে বাঘ, তা কে জানে। শকুনদের আওয়াজ আসছে আমি যেখানে বসে আছি সে জায়গার বেশ দূর থেকে।
বসে আছি। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে এপাশ ওপাশ দেখছি খুব আস্তে আস্তে। আলো কমে আসছে। ঋজুদার কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে জায়গামতো পৌঁছল কিনা কে জানে!
হঠাই আমার বাঁদিকে কোনো জানোয়ারের পায়ের আওয়াজ হল। পাথরের আড়ালে বসে থাকায় আমার বেশ কাছে না এলে জানোয়ারটাকে দেখা যাবে না। তবে বাঘ বা হরিণ জাতীয় কোনো জানোয়ার বোধহয় নয়। পাথুরে জমিতে শোনা আওয়াজটা অন্যরকম। কিন্তু বেশ ওজন আছে জানোয়ারটার। আওয়াজটা জোর হতে হতে আওয়াজকারী আমার চোখের সামনে এল। মস্ত বড় একটা দাঁতালো শুয়োর। এত বড় দাঁতাল কমই দেখেছি। উচ্চতাতেও সে প্রায় বাঘের মত। আমাকে দেখতে পায়নি। হাওয়া আসছে উপত্যকা থেকে যদিও, তাকে যদি হাওয়া আদৌ বলা যায়। এই হাওয়াতে ঋজুদার পাইপের ধোঁয়াই সরে। একটুও ধুলোবালি বা রুমাল নড়ে না। প্রশ্বাসের চেয়েও হালকা হাওয়া। শুয়োরটা চলে গেল।
একটু পরে আবার শব্দ। অন্য কোনো জানোয়ার আসছে। এও বাঘ অথবা হরিণ জাতীয় নয়। এবং এও শুয়োরের চেয়ে ছোট জানোয়ার। আওয়াজ শুনে মনে হল বড় সাপ অথবা বেজি। অথবা শজারু কী গুরান্টি বা মাউস-ডিয়ারও হতে পারে। যখন পাথরের আড়ালে থাকা আমার সামনে সে এল তখন দেখলাম একটি মাঝারি আকারের শজারু। কাঁটাগুলো শোয়ানো আছে।
সেও নিজের মনে চলে গেল।
ঠিক তখনই হঠাৎই শকুনরা যেখানে অদৃশ্য হয়ে (কিন্তু অশ্রাব্য হয়ে নয়) ছিল সেখানে। একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। পরক্ষণেই বড় বড় ডানাতে সপ্ সপ আওয়াজ করতে করতে তাদের বিচ্ছিরি দগদগে ঘা-এর মত লাল লম্বা গলা উঁচিয়ে পড়ি কি মরি করে তারা চারদিকের গাছে উঠে পড়ল। সেসব গাছে পাতা কম। একটা বাজ-পড়া পত্রশূন্য সাদা মসৃণ শিমুল গাছ ছিল। তাতেই উঠল বেশি। যেন বিনা পয়সার হোয়াইট-স্ট্যান্ডে বসে খেলা দেখবে।
ঋজুদাকে দেখে উড়ল কি? না অন্য কিছু দেখে? বাঘ দেখে? কে জানে?
শকুনদের হুড়োহুড়ি করে ওড়ার পরই সব আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পেছনের রক-শেলটারের চারদিকে ঝাঁটি-জঙ্গল থেকে ঝিঁঝিঁর ডাক ভেসে আসছে। সন্ধ্যে নামতে আর দেরি নেই খুব। ঘড়িতে দেখলাম সোয়া পাঁচটা বেজে গেছে। কী করে এতক্ষণ সময় যে কাটল বোঝা গেল না।
শকুনদের ঝাঁপাঝাঁপির আওয়াজের আড়ালে অন্য একটা সংক্ষিপ্ত আওয়াজ যেন চাপা পড়ে গেল মনে হল। আওয়াজটা কিসের এবং আদৌ কোনো আওয়াজ কিনা, তাও ঠিক বোঝা গেল না।
হেমন্ত এবং শীতের সন্ধ্যের মধ্যে এক ধরনের ভয়াবহতা থাকে। বিশেষ করে বনে-পাহাড়ে। মনে হয় নিজের জারিজুরি আর চলবে না। বনের হাতে বাঁধা দিতে হবে নিজেকে নিঃশর্তে। তবে পাহারাদারেরা হাত পা-বেঁধে কোনো অন্ধকার পুরীর উতলা রাজকন্যার কাছে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তা অন্ধকারের চররাই জানে। আর মিনিট পনেরর মধ্যেই অন্ধকার ঘন হয়ে উঠবে। পশ্চিমাকাশে ধ্রুবতারাটা ইতিমধ্যেই পোলভল্ট চ্যাম্পিয়নের মত অন্য সব তারাদের মাথা ছাপিয়ে উঠে মৃদু সবুজ জার্সি পরে জ্বল জ্বল করছে। তারাটা দেখা যাচ্ছে একটা গেণ্ডুলি গাছের পাতার মধ্যে দিয়ে। ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। কত রকম পাখি যে ডাকছে থেকে থেকে। কেউ একা, কেউ দোকা; কেউ দল বেঁধে। এই ওদের সন্ধ্যারতি। অন্ধকার থাকতে আবার আলোর স্তব করে সূর্যকে পথ দেখিয়ে ধরায় আনবে ওরা।
হঠাৎই আমার পেছন থেকে, যেদিকে রক-শেলটার, সেদিক থেকে একটা হায়না বুক কাঁপিয়ে ডেকে উঠল হাঁ হাঁ হাঁ করে। ডাকটা চমকে দিয়ে গেল।
এবারে ঝোলা থেকে টর্চটা বের করার সময় হয়েছে মনে হল। ঋজুদা যাওয়ার সময় এখানে বসে থাকতে বলে গেল অথচ সন্ধ্যে হলে কী করব বলে গেলো না। হয়ত ভেবেছিল, সন্ধ্যে হবার অনেক আগেই ফিরে আসতে পারবে।
সূর্য ডোবার পরও অনেকক্ষণ পশ্চিমাকাশে আলোর আভা থাকে। সূর্য তখনও ডোবেনি। আলো থাকবে আরও আধঘণ্টা মত। কী করছ ভাবছি, ঠিক এমন সময় শকুনদের ঝাপটা ঝাপটির আওয়াজ যেখান থেকে হয়েছিল সেইখান থেকে ঋজুদার রাইফেলের গদ্দাম আওয়াজ পেলাম।
গুলির শব্দ শুনেই মনে হল গুলি পাহাড়ে বা পাথরে বা মাটিতে পড়েছে। যার উদ্দেশ্যে ছোঁড়া তার গায়ে রাইফেলের স্ট্রাইকিং পিনের শব্দ আর গুলি যেখানে লাগে তার শব্দ একসঙ্গে কানে এলে অনেক গুলি বিভিন্ন টার্গেটে ছুঁড়তে ছুঁড়তে সকলেরই এ সম্বন্ধে এক ধরনের ধারণা গড়ে ওঠে।
অধীর আগ্রহে আর উত্তেজনায় আমি তৈরি হয়ে বসে রইলাম। গুলি যদি ঋজুদা নিনিকুমারীর বাঘকেই করে থাকে এবং তা ঋজুদা মিস করে থাকে আর নিনিকুমারীর বাঘ এই গেমট্র্যাক ধরেই দৌড়ে আসে তবে আমার গুলি খেয়ে তাকে গেমট্র্যাকের উপরেই শুয়ে পড়তে হবে। আমার দশ হাত সামনে দিয়ে যাবে অথচ আমার গুলি খাবে না এরকম অতিথিপরায়ণতা ঋজুদা আমাকে শেখায়নি।
কিন্তু ঋজুদার গুলি আবারও মিস হল কেন?
এত সব ভাবনা কিন্তু ভেবে ফেললাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। এবং যেমন ভেবেছিলাম, গুলির শব্দর সঙ্গে সঙ্গেই বাঘের প্রায় নিঃশব্দ-শব্দ শুনতে পেলাম গেম-ট্র্যাকের কাঁকরের উপরে। তবে দূরে। কিন্তু কয়েকটা লাফের পরই নিস্তব্ধ হয়ে গেল সে শব্দ। একেবারে মৃত্যুর মত নিঃস্তব্ধতা। বাঘ গতি পরিবর্তন করেছে।
আমি ভাবছি তার গায়ে ঋজুদার গুলি লাগেনি। কিন্তু আমার তো ভুলও হতে পারে! আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে অত্যন্ত ভয়মেশানো উত্তেজনা নিয়ে পেছনে তাকালাম আমি। আর পিছনে তাকিয়েই আমার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল। যে পাথরে পিঠ দিয়ে আমি বসেছিলাম সেটা সোজা উঠে গেছে পৌনে তিন থেকে তিন মিটার। তার উপরে কিছুটা পাথর সমান। বাঘ যদি নিঃশব্দে আমার পিছনে এসে ঐ পাথর থেকে লাফিয়ে পড়ে তো আমি বোঝার আগেই সে আমার ঘাড়ে পড়ে টুঁটি কামড়ে ধরবে।
পিছনটা দেখে নিয়ে সামনে তাকাতেই গেম-ট্র্যাকে আবার পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। উৎকর্ণ হয়ে রাইফেলের ট্রিগার গার্ডে হাত ছুঁইয়ে বসে রইলাম আমি। এমন জানোয়ারের শব্দ কখনও শুনিনি। সাবধানী পায়ে সে আসছে। থেকে থেকে। এসে গেল। এসে গেল। তর্জনীটিকে এমন জায়গায় রাখলাম যাতে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তা ট্রিগার টানতে পারে।
পরক্ষণেই আঙুল নামিয়ে নিলাম। ঋজুদা!
ঋজুদার রাইফেলটি কাঁধে ঝোলানো, আমাকে দেখতে পেয়ে দাঁড়াল। বলল, চল্ ফিরে যাই। কলকাতায় ফিরে যাব। এই ভৌতিক ব্যাপারের মধ্যে আমি নেই আর। চার মিটার দূর থেকে দিনের আলোয় ধীরে সুস্থে এইম নিয়ে মারা গুলি বাঘের বুকে লাগল না, লাগল বাঘ টপকে গিয়ে পিছনের পাথরের চাঁই-এ। আমি কি আনাড়ি? একবার নয়, দু’বার নয়, এতবার! না না আমি শিকারী। ওঝা নই। আমার দ্বারা এইসবের পিছনে লেগে থাকা আর সম্ভব নয়।
হতাশায় এবং নিজের উপর ঘেন্নায় গজগজ করতে করতে ঋজুদা আমার পাশে বসে পড়ে পাইপ ভরতে লাগল পাথরটাতে হেলান দিয়ে। যে পাথরে আমি হেলান দিয়ে বসেছিলাম, এতক্ষণ, সেই পাথরে।
বাঘটা এ দিকেই তো আসছিল! মনে হল পায়ের শব্দ শুনলাম। নিনিকুমারীর বাঘই। অ্যাবসল্যুটলি স্যুওর। নইলে তো গুলি খেয়ে সে বাঘ ওখানেই পড়ে থাকত। বাঘ যেদিকেই থাক আমি আর ইন্টারেস্টেড নই। আবার দেখতে পেলেও আমি মারব না।
ঋজুদা বসে পড়ল বলেই আমি ঋজুদার দিকে মুখ করে উঠে দাঁড়ালাম। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে যাবে। ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে বড় একটা টান লাগালো। গোল্ডব্লক তামাকের মিষ্টি গন্ধে ভরে গেল জায়গাটা।
আমি কিন্তু রাইফেল কাঁধে নিইনি। ডানহাতেই ধরা ছিল। ঋজুদার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই ভিতর থেকে, আমার ভিতর থেকে কে যেন বলল এই! এই! এই!
টুপি পরা ছিল আমার। এক-ঝটকায় মাথা তুলেই দেখি বাঘ যেখান থেকে আমার উপর লাফাতে পারে বলে ভেবেছিলাম ঠিক সেইখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে নিচে। সামনের হাঁটু দুটো ভাঁজ করছে আস্তে আস্তে। এইবার লাফাবে।
ধুত্তোর! নিনিকুমারীর বাঘের আজ এসপার কি ওসপার। এইরকম কিছু দাঁতে দাঁত চেপে বলেই আমি এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে রাইফেল এক ঝটকাতে তুলেই গুলি করলাম। আমার বাঁহাত এসে পড়ে স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের নলে লাগানো হোল্ডিংকে সাপোর্ট করার জন্যে। ততক্ষণে বাঘও লাফিয়েছে কিন্তু লাফাবার আগে আমার রাইফেলের গুলি গিয়ে লেগেছে তার গায়ে।
লাফাবার সময়ে তার আমাদের ধরার চেয়ে তার নিজের পালানোর ইচ্ছেটাই প্রবলতর ছিল বলে মনে হল। নইলে, সে আমাদের টপকে ঐ গেমট্র্যাকের দিকে মাটিতে নামত না। বাঘের লাফানোর সঙ্গে সঙ্গেই গোড়ালির ওপরে আমি ঘুরে গিয়েছিলাম। এবং সে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে আমাদের দিকে চার্জ করে আসার আগেই আমার দ্বিতীয় গুলি গিয়ে তার গলায় লেগে শ্বাসনালী ছিঁড়ে ঘাড় দিয়ে বেরিয়ে গেল। লাঠি-খাওয়া সাপের মত সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে, তার স্পর্ধা-ভরা মাথা ধুলোয় লুটিয়ে। তারপর কাঁপলো কিছুক্ষণ থরথর করে। আমি বোল্ট টেনে রিলোড করে আরেকটা গুলি করতে যাচ্ছিলাম। ঋজুদা পিছন থেকে বললো গুলি নষ্ট করিস না, রুদ্র।
এত কাণ্ড যে ঘটে গেল, ঋজুদা কিন্তু তার পাশে শুইয়ে রাখা রাইফেলে হাত পর্যন্ত ছোঁয়ায়নি। তার বাঁ হাতটা ছিল মাথার পিছনে বালিশের মত করে রাখা। আর ডানহাত ছিল পাইপে।
ঋজুদা ডাকল। এদিকে আয়।
কাছে যেতেই আমার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে টেনে আমাকে বুকের মধ্যে নিয়ে টুপিটা এক উড়নচাঁটিতে ফেলে দিয়ে মাথার চুল টেনে আদর করে আমার মুখটা নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা গালে ঘষে দিল।
বললাম, দোষ আমার নয়।
কার?
–তোমার?
–মানে?
ভটকাই কিন্তু এসে অবধিই তোমাকে বারবার বলেছিল যে একটা পুজো দাও ঠাকুরানীর কাছে। ওর সব ইনফরমেশান আসে একেবারে হর্সেস মাউথ থেকে। ওর ইন্টেলিজেন্স ওয়ার্কের কোনও তুলনা নেই। ও আমাকে কিন্তু বলেছিল যে, এই বাঘ মারলে মারবো আমি কি তুই। ঋজু বোসের নো চান্স।
কেন? ঋজুদা খুব অবাক হয়ে শুধোলো।
ঠাকুরানী ঋজু বোসের উপর প্রচণ্ড চটিতং। রাইট ফ্রম দ্যা বিগিনিং।
ওকে কে বলল?
ঋজুদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
সে কী আর বলেছে আমাকে। ভটকাই বলে, কক্ষনো সোর্স অফ ইনফরমেশান ডাইভালজ করবি না। করলেই তো তোর ইম্পর্ট্যান্স কমে গেল।
তা এখন কী করতে বলবে আমাকে মিঃ ভটকাই?
এখন বলবে যথাশীঘ্র এই জায়গা থেকে কেটে পড়। বাড়ি ফিরে গ্র্যান্ড স্কেলে সত্যনারায়ণের পুজো দিতে হবে ছাদে। সিন্নির বেলা খরচে কোনোরকম কার্পণ্য করলে চলবে না কিন্তু।
ঋজুদা উঠে পড়ে হাসল, বলল, তথাস্তু। তারপর বলল, বের কর টর্চ।
হ্যাঁ! এও যে নিনিকুমারীর বাঘ, তারই বা ঠিক কি?
না। এবারে কোনো ভুল হয়নি মনে হয়। একটা কুড়ি বাইশ বছরের মেয়েকে খাচ্ছিল বাঘটা। বোধহয় দুপুরের দিকেই কাছাকাছি কোনো বসতি থেকে মেরেছে।
টর্চটা জ্বেলে দেখলাম বাঘের মুখ গোঁফ দাড়ি সব রক্তে লাল হয়ে আছে।
ঋজুদা বলল, ইয়েস। এই সেই কালপ্রিট।
তারপরই বলল, আকাশের দিকে রাইফেলের নলের মুখ করে তোর ম্যাগাজিন খালি করে দে তো। যে গ্রামের মেয়ে, তাদের আসা দরকার। আর চল্ ওখানে গিয়ে বড় করে আগুন করতে হবে একটা। নইলে ওরা জানবে কী করে, যে আমরা কোথায় আছি?
চলো। বলে, আমি এগোলাম।
চলতে চলতে আমার বাঁশপাতি নদীর পাশের সেই হাতির দলটির কথা মনে হচ্ছিল।
হাতি মায়েদের বাচ্চার কী হল?
ঋজুদা বলল, কিল্-এর একেবারে কাছে যাওয়ার দরকার নেই। কাছাকাছি পাথর-টাথর দেখে বসার জায়গা ঠিক করে আগুন কর। সারারাত থাকতেও হতে পারে এখানে। শেয়ালে হায়নায় মেয়েটাকে টানাটানি যাতে না করে সেটুকু দূর থেকে দেখলেই চলবে শুধু। আগুনটা করতে হবে একটু উঁচু জায়গাতে, যাতে সেখান থেকে মৃত নিনিকুমারীর বাঘ এবং মেয়েটি এই দুজনের উপরেই নজর রাখা যায়। আশা করি তোর গুলির শব্দ শুনেই গ্রামের লোকেরা বুঝবে কী ঘটেছে।
গুলি করলি না! কী রে!
এই করছি। বলেই চারটি গুলি করে আমি ম্যাগাজিন খালি করে দিলাম।
তারপর রাতের অন্ধকারে আমি আর ঋজুদা এগিয়ে চললাম।
আমরা অবশ্য একা ছিলাম না। ততক্ষণে চাঁদও এসে জুটেছিল। এবং এই অঞ্চলের অগণ্য অসহায় মানুষের আশীর্বাদ।
