মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(৮)
ভ্যানকুবার থেকে ক্রুজ শিপটা প্রথম যাচ্ছে কেচিক্যানে-এ। পথটা দীর্ঘ, পুরো দু-দিন লাগবে। তবে এন্টারটেনমেন্টের এত বন্দোবস্ত –শো, থিয়েটার, এক্সারসাইজ, মিনি গলফ, ক্যাসিনো ভিন্ন ভিন্ন রুচির যাত্রীদের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন। কারোর পক্ষেই সময়টা দীর্ঘ বলে মনে হবে না। আর আমাদের মতো কিছু লোক, যারা বই পড়ে বা আরাম কেদারায় সমুদ্র দেখেই খুশি তারা তো আলস্য ভরে খেয়ে বসেই সময় কাটিয়ে দিতে পারবে। একটা দিন তো দেখতে দেখতে কেটে গেছে। পরের দিনের বেশির ভাগ সময়েই আমি ডেকে বসে বই পড়ে কাটালাম, মাঝে মাঝে সমুদ্রের দিকে তাকাচ্ছিলাম। ভাগ্যে থাকলে সেখানে নাকি তিমির দেখা মেলে। একেনবাবু কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আমার কোনো ধারণাই নেই। প্রমথ ক্যাসিনোতে একবার ব্ল্যাক জ্যাক ট্রাই করে দেখবে বলেছিল। কিন্তু ৪০ ডলারের বেশি খরচা করবে না, আগে থেকেই স্থির করে রেখেছে। একেনবাবু সেখানে যাননি জানি, টাকা পয়সা নিয়ে কোনও রিস্ক উনি নেন না।
হঠাৎ শুনি একেনবাবুর ব্যস্তসমস্ত কণ্ঠস্বর। “একি স্যার, আপনি এখনও এখানে বসে আছেন! আমরা তো ডাইনিং রুমের সামনে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি!…
“আরে সত্যিই তো, সাড়ে ছটা বেজে গেছে! চলুন, চলুন।”
ডাইনিং রুমে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট টেবিলে যখন বসেছি, তখন দেখলাম টিম ঘরে ঢুকছেন। ওঁকে দেখা মাত্র প্রমথ পাকড়াও করতে ছুটল। প্রমথ আমাদের টেবিলটি দেখাতে উনি আমাদের দিকে তাকালেন। আমরা হাত নাড়লাম। প্রমথকে কী জানি বললেন। ফিরে এসে প্রমথ বলল, “আসছেন। কয়েকজন কলিগের সঙ্গে খাবেন বলে কথা দিয়েছেন। তবে আমাদের সঙ্গে ডেসার্ট খাবেন বললেন।”
একেনবাবু হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা স্যার ব্যাসারথ কী ধরণের পদবি?”
“আমার কোনো ধারণাই নেই। নাম যখন টিম, নিশ্চয় ক্রিশ্চান। জিজ্ঞেস করুন না, আপনার যখন এতই জানার ইচ্ছে।”
“তা অবশ্য করা যায় স্যার।” মাথা নাড়ালেন একেনবাবু।
খানিকবাদে টিম এলে একেনবাবু বললেন, “আচ্ছা স্যার, আমি আর বাপিবাবু আলোচনা করছিলাম, আপনার পদবিটা খুব আন-ইউয়াল। ইন্ডিয়াতে এই নামের পদবি কোথাও শুনিনি।”
টিম একেনবাবুর প্রশ্নের উত্তরে মুচকি হেসে বললেন, “আপনি কি ভেবেছিলেন, আমি ইন্ডিয়ান?”
“আপনি ইন্ডিয়ান নন, স্যার!”
“আমরা অরিজিনালি ত্রিনিদাদের লোক, তবে তিন পুরুষ ধরে আমেরিকায় আছি।”
“ত্রিনিদাদের ইতিহাসটা আমি ভালো করে জানি না,” আমি বললাম। “তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনেক ক্রিকেট প্লেয়ার ইন্ডিয়ান ডিসেন্টের। আমার এক ছাত্রী ছিল ত্রিনিদাদের মেয়ে –নাম ছিল ক্যারলীন গোবেরধন।”
“নিশ্চয় অরিজিনালি গোবর্ধন ছিল স্যার।”
“তা হতে পারে।”
একেনবাবু উৎসাহ পেয়ে টিমকে বললেন “আপনারা হয়তো ছিলেন বসির- সেটাই বাসারাথ হয়ে গেছে। অথবা বাশার– সেখান থেকেও হওয়া সম্ভব।”
টিম হেসে ফেললেন।
হাবিজাবি অনেক গল্প হল। টিমকে আমাদের সঙ্গে দেখে চমৎকার স্পেশাল কেক আমাদের টেবিলে এল। কেকটা যখন খাচ্ছি টিম বললেন, তিনি কালকেই কেচিক্যানে নেমে যাচ্ছেন। সেখান থেকে প্লেন ধরে বাড়ি। এ যাত্রায় আর দেখা হবে না।
আমরা সবাই বিমর্ষ হলাম। ভারি চমৎকার মানুষ। আমি আমার কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, “নিউ ইয়র্কে তো দেখা হতে পারে।”
“হ্যাঁ স্যার,” একেনবাবু বললেন, “সেই মূর্তির গল্পটা তো শেষ হল না?”
“কেন হবে না?” বলে ওঁর একটা কার্ড আমাকে দিলেন। “ফিরে গিয়ে ফোন করবেন। আমার স্ত্রীও খুব খুশি হবেন আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হলে।”
অ্যালাস্কা বেড়ানোর কথা আর লিখলে এটা পুরো ভ্রমণ কাহিনি হয়ে যাবে। সেটাও লেখা যায় অবশ্য, কিন্তু এটা লিখছি অন্য কারণে। তাই দিন দশেক বাদে নিউ ইয়র্ক থেকেই গল্পটা আবার শুরু করি।
