বাঘের মাংস (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দণ্ড হাত পাতুল। বলল, টিক্কে তামাকু।

তামাক দিয়ে বললাম, আজ তোমার জন্যেই আমার প্রাণটা বাঁচল দণ্ড।

নিচু গলায় দণ্ড বলল, আমি প্রাণ বাঁচাবার কে? সবই ঠাকুরানির দয়া!

ততক্ষণে অতগুলো গুলির শব্দ আর বাঘের গর্জন শুনে গ্রাম থেকে অনেকে দৌড়ে এসেছিল। সবচেয়ে আগে দেখা গেল দুর্যোধনকে। তার হাতে আমার দোনলা শটগানটি। সে সাবধানে আমাদের খোঁজে অন্যদের চেয়ে আগে-আগে এগিয়ে এসেছিল। আমাদের বসে থাকতে দেখেই হাত দিয়ে পেছনে ইশারা করল। এবং পরক্ষণেই চিৎকার করে বলল, মরিচি! বাপ্পালো বাপ্পা! কেত্বে বড্ড বাঘটা মঃ।

দৌড়ে এল ওরা সকলেই। হুড়োহুড়ি করে। পুরুষদের পেছনে পেছনে মেয়ে ও বাচ্চারাও। দণ্ড, পাইপের টোব্যাকোটা হাতে খৈনির মতো মেখে, মুখে ফেলার আগেই হাতে-হাতে বাঘের গোঁফ সব উধাও হয়ে গেল। দুর্যোধন চেঁচামেচি শুরু করে দিল।

বাঘকে বয়ে বাংলোর হাতায় নিয়ে আসার ভার দুর্যোধনের উপরে দিয়ে আমি আর দণ্ড বাংলোর দিকে হেঁটে চললাম। বাঘ মরেছে। এবারে শিব্বর মৃতটা আমার মনে ফিরে এল। গভীর গ্লানি আর পাপবোধ ভারী করে তুলল আমার মাথা।

চলতে চলতেই দণ্ড বলল, শিব্ব! বাঘু খাইবাপাঁই হাঁকা করিবাকু এইঠি আসিথেল্লে। আউ বাঘঘটা, তাংকু খাই নেল্লে। তার বড্ড ক্ষুধা থিল্লা।

কার? শিব্বর আবার কার? অন্য মাংস না পেয়ে বাঘের মাংসই খাবে বলে হাঁকা করবার জন্যে লাফিয়ে লাফিয়ে এল আর তাকেই খেল বাঘে! বডই খিদে ছিল শিব্বর। মাংসর উপর দারুণ লোভ ছিল ওর! পরের জন্মে ঠাকুরানির দয়ায় ও হয়তো বাঘ হয়েই জন্মাবে। আশ মিটিয়ে মাংস খাবে তখন। কে জানে, সবই ঠাকুরানির ইচ্ছা।

প্রসঙ্গ বদলাবার জন্যে বললাম, আচ্ছা দণ্ড, সেদিন কিসের নাড়ু খাইয়েছিল বলো তো শিব্ব আমাদের? ওই নাড়ু না-খেলে বাঘের পায়ে গুলি করে তাকে খণ্ডিয়াও করতাম না আর না করলে শিব্ব তার হাতে মারা যেত না। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে রহস্যময়। রাতের নুনিতে এবং ভীমধারার মধ্যে ঐ আশ্চর্য ঘন্টা বাজা। সবই কি স্বপ্ন? মনের ভুল? ঐ মাটি খুঁড়ে-ওঠা পেল্লায় বাইসন! কাল রাতের সব কিছুই!

দণ্ড দাঁড়িয়ে পড়ে লাল চোখে আমার দিকে চেয়ে বলল, কী বলতে চাইছ তুমি?

কিছুই বলতে চাইছি না। জানতে চাইছি শুধু।

ঐ নাড়ু সিদ্ধির নাড়। আর যা-কিছুই রহস্যময় ব্যাপার-স্যাপার কাল ঘটেছে তার কিছুই স্বপ্ন নয়। সব সত্যি। ও সব ঐ ঠাকুরানির লীলাখেলা। শিব্ব জেনেশুনেও আমাদের ঠাকুরানির ঠাঁইয়ে গল্ব মারবার জন্যে পাঠিয়েছিল বলেই হয়তো ঠাকুরানিই বাঘের রূপ ধরে এসে তোমাকে দিয়ে বে-জায়গায় গুলি করিয়ে নিজে খন্ডিয়া হয়ে শিব্বকে মেরে গেলেন। ঠাকুরানিকে নিয়ে জঙ্গলের যে-সব লোক তামাশা করে, তাদের শেষ এই-ই হয়। কে জানে? পেট পুরে যাতে মাংস খেতে পারে তার জন্যে এই মরা বাঘের আত্মাটা ঠাকুরানি শিব্বকেই দিয়ে দেবেন হয়তো। শিব্ব বাঘ হয়ে যাবে। তাঁর লীলা, তিনিই জানেন।

ঠাকুরানির বাঘ আর নুনির রহস্যময় ব্যাপার-স্যাপার, সব কিছুরই মূলে তাহলে ওই সিদ্ধির নাড়ু! ছি ছি!

দণ্ডর কথা আমি কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু ওদের অনেক কথাই আমি এবং আমরা বোধহয় বুঝি না। এই শিব্ব এবং দণ্ড, ভীম, দুর্যোধন, টুকা বন-বাংলোর চৌকিদার, বেঁটেখাটো ছোট্ট বলিরেখাময় গোল মুখের খুকি, এরা এক অন্য জগতের মানুষ। এদের আমরা কখনও বুঝিনি, বুঝি না এবং বুঝবও না। এরাও বোঝে না আমাদের। আমাদের এই দুই জগতের মাঝে একটা সাঁকো থাকলে বোধহয় ভাল হত।

দণ্ড বলল, শিব্বর বউয়ের জন্য আমাদের তো কিছু করা উচিত? কী বলো?

নিশ্চয়ই। আমি বললাম। কিন্তু তোমার কী মনে হয়? কী করা উচিত?

ওকে গ্রামে কিছু জমি কিনে দাও। ওদের তো ছেলেমেয়ে নেই। বউটার বয়সও বেশি নয়। ওর আবার বিয়ে দিতে বলব গ্রামের লোকদের শিব্বর শোক মরে গেলে। তুমি দুশো টাকা দেবে? জেঠুমণির কাছ থেকে চেয়ে? তাইই যথেষ্ট। দুশো টাকা কী কম টাকা! ওরা কেউই একসঙ্গে কখনও দুটো টাকা চোখে দেখেনি।

দুশো টাকা? একজন মানুষের জীবনের দাম মাত্র এইটুকু?

বললাম, হাজার টাকা দেব জেঠুমণিকে বলে। যেন একজন মানুষের জীবনের দাম হাজার টাকা! আবার বললাম, আর সুরবাবুদের বলে দেব যে, শিব্বর বউকে এবং ও যদি আবার বিয়ে করে তো তবে তাকেও যেন একটা চাকরি করে দেন ওঁরা ওদের ক্যাম্পে।

আমি আর দণ্ড যখন টুল্লকা বাংলোর হাতাতে ঢুকলাম তখন দেখলাম বাংলোর সামনেই ডানদিকে যে বড় উঁচু সাদাটে পাথরটা আছে সেই পাথরের উপর শিব্বর বউ বসে রোদ পেয়াচ্ছে পা ছড়িয়ে। কী সান্ত্বনা দেব ওকে জানি না। কী করে সামনে গিয়ে দাঁড়াব আমি?

শিব্ব? ওর কাছে পৌঁছে দণ্ড জিজ্ঞেস করল। মানে, মৃতদেহের কথা।

নিরুত্তাপ গলায় বউ বলল, তাংকু নেই গল্লে…

স্বামীকে ওরা সকলে নিয়ে গেল অথচ তার গলাতে একটুও দুঃখের আভাস পেলাম না। অবাক হলাম।

পরক্ষণেই শিব্বর বউ বলল, বাবু, তুমি কি কখনও বাঘের মাংস খেয়েছ? শিব্বর তো খাওয়া হল না কিন্তু আমি খাব বলে বসে আছি। বাঘ কখন কাটা হবে? চামড়া ছাড়ানোর পর?

স্তম্ভিত হয়ে গেলাম আমি। উত্তর না দিয়ে ঘরে গেলাম। মেয়েটার বোধহয় মাথাই খারাপ হয়ে গেছে।

বাঘের মাংস আমি জেঠুমণির সঙ্গে একবারই খেয়েছিলাম। নাগাল্যাণ্ডের মোককচঙের কাছের এক গ্রামে। চিবোনো যায় না। দাঁতের পাটি লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের এই বনজঙ্গলের বড় গরিব, ক্ষুধাতুর, সরল, সাধারণ মানুষগুলোর জীবনযাত্রা ও চাওয়া-পাওয়ার আসল রকমটি দেখে ও জেনে আমার মনে হল বাঘের মাংস হজম করার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ওদের আসল দুরবস্থার সত্যটি হজম করা।

রাইফেলটা ঘরে রেখে বারান্দার চেয়ারে এসে বসলাম। চৌকিদার খুকি, চা নিয়ে এল। শিব্বর বউকেও একটু চা দিতে বললাম ওকে।

খুকি আপত্তি জানিয়ে বলল, শিব্বর বউ তো পুরো আধ-হাঁড়ি খিচুড়ি খেয়েছে। কালকের খিচুড়ি বেঁচেছিল অনেক।

কখন খেল? অবাক হয়ে শুধোলাম ওকে।

শিব্বকে অংগুলে নিয়ে গেল যখন ওরা ট্রাকে করে তারপরেই নিরিবিলিতেই খেয়েছে। বিরক্ত করার কেউই ছিল না। পেট পুরে খেল।

চায়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে অবিশ্বাসী চোখে খুকির মুখের দিকে চেয়ে রইলাম।

জঙ্গল থেকে বাংলোর দিকে ফেরার পথে একটু আগেই দণ্ড বলছিল যে আমাদের কাছে ভাগ্যিস জিপ এবং ট্রাক আছে তাই আজই শিব্বর পোস্টমর্টেম হবে হয়তো। না, তবু আজ হবে না। আজ যে রবিবার। কাল হবে। কিন্তু যখন মোষের গাড়িতে চাটাই-মুড়ে মৃতদেহ নিয়ে যেতে হয়, কেউ গাছ-চাপা পড়লে বা বাঘ, হাতি বা বাইসনের হাতে মরলে তখন অংগুলে পৌঁছে পোস্টমর্টেম হতে হতে অনেকসময় সাতদিনও লেগে যায়। বাঘের হাতে মরেও নিস্তার নেই। তারপর পড়তে হয় পুলিশের হাতে। বাঘের চেয়েও বিপজ্জনক তারা।

খুকিকে বললাম, তোমাদের আপনজন মরলে তোমরা শোক করো না? দুঃখ লাগে না তোমাদের?

খুকি আমার কথা শুনে খুব জোরে হেসে উঠল। বলিরেখাভরা কপাল কুঁচকে উঠল। ফোকলা দাঁতের মধ্য দিয়ে হাসির টুকরো-টাকরা লাফিয়ে আসতে চাইছিল বাইরে। কিন্তু সামলে নিয়ে তার চোখ আমার চোখে রেখে বলল, ঋজুবাবু শোকটোক দুঃখ-টুঃখ সব তোমাদের মতো বড় মানুষদেরই জন্যে। আমাদের ওসব বিলাসের সময় কোথায়? প্রতিটি দিনই আসে বড় দাপটে। এক-একটা ঝড়ের মতো। ডানাভাঙা পাখির মতো গুঁড়িয়ে দিয়ে যায়, আমাদের দিন গুজরান করতেই প্রাণান্ত। আমরা তাইই তো গাই : দয়া করো। দীনবন্ধু শুভে যাউ আজ দিন, করজোড়ে তুমপাদে করুছি এ নিবেদন। এই এমনি করেই কেটে যাচ্ছে দিন। তোমরা যে কদিন আছ, ভাল খাচ্ছি-দাচ্ছি, তোফা আছি। চলে গেলেই আবার যে কে সেই।

বলেই খুকি রান্নাঘরে চলে গেল।

চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে বসে সামনে তাকিয়ে ছিলাম। শীতের হাওয়ায় পাতা ঝরে যাচ্ছে গাছ থেকে। হাওয়ার সওয়ার হয়ে ব্যালেরিনার মতো ঘুরতে ঘুরতে উড়তে-উড়তে মাটিতে নামছে তারা। ঝরঝর করে ঝরনার মতো শব্দে পাথরের উপর দিয়ে সেই পাতার পাল তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাখাল হাওয়াটা।

পাতার মতো দিনও ঝরে। ঝরাপাতার মতো দিন। আমার দেশবাসীর দিন। আমার ভাইবোনের দিন। ঠাকুরানির জঙ্গলের বাঘে-চিবোনো এই সাধারণ শিব্ব, তার বউ, ভীম, দুর্যোধন, এবং অসংখ্য অজানা অচেনা মানুষদের প্রত্যেকেরই দিন।

বাঘের মাংসের মতো দিন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *