শিব্ব আমাদের এগিয়ে দিল একটু। তারপর ছায়ামূর্তিরই মতো মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। অন্ধকারে দণ্ড আর আমি জঙ্গলের গভীরে ফিরে জানোয়ার-চলা পথটি ধরলাম।
ফিসফিস করে দণ্ডকে শুধোলাম, ওই ভুতুড়ে লোকটি কে হে?
ওর নাম শিব্ব। শুনলে তো!
তোমার কে হয়?
আমার ভাই।
ভাই? কখনও দেখিনি তো। কীরকম ভাই?
দেশের ভাই। মাটির ভাই। সবচেয়ে কাছের ভাই।
ওঃ। আমি বললাম।
আজকে একটা খুব বড় গল্ব মেরে দাও তো, ঋজুবাবু। কথা ঘুরিয়ে ও বলল।
বড় গল্ব তো গত সপ্তাহেই মেরেছি। খামোকা বাইসনের মতো অতবড় জানোয়ার মেরে কী হবে দণ্ড? আমাদের খেতে তো অত মাংস লাগবে না। তাছাড়া বাইসনের বা নীলগাইয়ের মাংস আমি তো খাই না। এ তো অন্যায়।
কিসের অন্যায়? দণ্ডধর ডাকুয়ার চোখ অন্ধকারে আবার বাঘের মতো দপ করে জ্বলে উঠল। ও বলল, জানো ঋজুবাবু এই শিব্ব মাংস খেয়েছিল গত বছরের আগের বছর যখন আমরা এখানে শিকারে এসে একটা বড় শম্বর মারি। তারপরে আর কোনওরকম মাংসই ও খায়নি। গত সপ্তাহে তোমার মারা গল্বর মাংস অবশ্য খেয়েছিল পেট পুরে। মাছ খেয়েছিল গত দু বছরে মাত্র তিন-চারদিন। ভীমধারার দহে কখনও-সখনও কুঁচো মাছ জমে। তাও দাবিদার অনেক। টিকরপাড়ার কনট্রাক্টর। খাইয়েছিলেন এখানকার গ্রামের সব্বাইকেই গত বছরে তাঁর জঙ্গলে খুব ভাল কাঠ বেরিয়েছিল বলে।
হেসে বললাম, মাছ-মাংস তো কত লোকেই খায় না।
দণ্ডধর দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, তা খায় না বটে, কিন্তু তারা তো অন্য অনেক কিছু খায়। দুধ খায়, মাখন খায়, ঘি খায়, তরি-তরকারি, ফলমূল, ডাল-ভাত কত কী খায়!
শিব্ব কী খায়। শিব্বও তো এ-সব খায়। ঘি-মাখন না হয় নাই খেল!
শিব্ব? তাচ্ছিল্যের গলায় দণ্ড বলল। দিনে একবেলা, একহাঁড়ি খুদের মধ্যে জল আর আফিঙের একটু গুঁড়ো মিশিয়ে সেদ্ধ করে খেয়ে থাকে ও আর ওর বৌ। পেটের পিলেটা দেখলে না, পাঁচ-নম্বরি ফুটবলের মতো। আর বছরের জামা কাপড়? একটা পাঁচ টাকা দামের গামছা দু ভাগ করে কেটে গায়ে দেয় ও পরে শিব্ব। সারা বছর। একটা বারো টাকা দামের শাড়ি পরেই ওর বউ বারোটা মাস কাটিয়ে দেয়। করবে কী? ওদের সঙ্গে তুমি কাদের তুলনা করছ ঋজুবাবু?
আমি চুপ করে ছিলাম।
দণ্ড বলল, একটা গল্ব মারলে কতগুলো গ্রামের লোক মাংস খেতে পারে তার ধারণা তো তোমার আছে। নিজের চোখে দেখোনি? কত পাহাড়-নদী পেরিয়ে মেয়ে-পুরুষরা গত সপ্তাহে-মারা বাইসনটার মাংস নিতে এসেছিল? কত ঘন্টা তারা ধৈর্য ধরে বসেছিল।
কিন্তু আমার পারমিটে যে মোটে একটাই বাইসন ছিল। গত সপ্তাহে তা তো মেরেইছি দণ্ডধর। অন্যায় হবে না বনবিভাগের পারমিটের বাইরে শিকার করলে?
দণ্ডধর দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ আমার দুচোখের উপর পাঁচ ব্যাটারির টর্চটা ফোকাস করল। যেন আমিই কোনও সাংঘাতিক শ্বাপদ। আলোর তোড়ে আমার চোখদুটো বুজে এল। তারপর ওর মুখটা আমার বাঁ কানের কাছে এনে ফিসফিস করে দণ্ড বলল, একটা বড় ন্যায়ের জন্যে পাঁচটা ছোট অন্যায় করার মধ্যে কোনওই পাপ নেই। এ-গ্রামের এবং অন্য অনেক গ্রামের লোককে সমানভাবে মাংস ভাগ করে দেব আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। তুমি দেখো। কত মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাবে তুমি! সে কি আনন্দের নয়? পুণ্যের নয়? সব পুণ্য বুঝি কেতাবি আইন মানারই মধ্যে?
এই অবধি বলেই, আমাকে আর কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই রাইফেলটা ধপ্পাস্ করে আমার কাঁধে ফেলে দিয়ে বলল, চলো। আজ নুনিতে বসে বড্ড গল্ব মারব আমরা।
জলের গভীরে বসে দন্ডধর ডাকুয়ার কথা অমান্য করার সাহস তখন কেন, কোনওসময়ই আমার ছিল না। তা ছাড়া, কতই বা বয়স তখন আমার। বড়জোর বাইশ-তেইশই হবে। কলেজ থেকেই পাইপ ধরেছিলাম। অন্য কিছুর জন্যে নয়, পয়সা খরচ প্রায় একেবারেই নেই বলে। দণ্ডধর জেঠুমণিকে পর্যন্ত ডোন্টকেয়ার করত আর আমি তো কোন ছার।
ফোর-সেভেন্টি রাইফেলটা কাঁধে ঠিক করে তুলে নিলাম। কেন, বুঝলাম বাংলোতে থ্রি-সিক্সটি-সিক্স ম্যানকিলার শুনার রাইফেলটা (আমার প্রিয় রাইফেল) থাকতেও ও ইচ্ছে করেই ফোর-সেভেন্টি ডাবল ব্যারেল রাইফেলটা নিয়ে এসেছিল। এটি অনেক বেশি শক্তিশালী রাইফেল। জেরি নাম্বার টু। মোক্ষম মার। বড় জানোয়ার মারতে এতেই সুবিধা।
আর কোনও কথা না বলে নুনিতে এসে পৌঁছলাম আমরা। আমাদের দেশের এবং অন্য অনেক দেশের জঙ্গলের গভীরেই এরকম কিছু জায়গা থাকে যেখানে মাটিতে নুন থাকে। জংলি তৃণভোজী জানোয়ারেরা সেই নুন চাটতে আসে। ছোট্ট হরিণ থেকে গণ্ডার সবাইই চাটে। ইংরিজিতে একেই বলে সল্ট-লিক। অনেক জায়গায় বনবিভাগ বস্তা বস্তা নুন ফেলেও কৃত্রিম নুনি বানান অথবা স্বাভাবিক নুনির এলাকা বাড়ান।
শিব্বর কথামতো নুনিতে পৌঁছে আমরা ঐ ঝাঁকড়া শিশুগাছের নীচেই আড়াল নিয়ে বসলাম ঝোপঝাড়ের পেছনে। নুনির উপরের আকাশ ফাঁকা। মাঝের ঘাস, শিশিরে ভিজে গেছে। কোনও বড় জানোয়ার জঙ্গলের আড়াল ছেড়ে নুনিতে এসে দাঁড়ালে তাকে মারা কঠিন হবে না, আলো ছাড়াই। কিন্তু দণ্ড বলল, কোনওই চিন্তা নেই। আমি আলো দেব তোমার ডান কাঁধের উপর দিয়ে রাইফেলের ব্যারেলের উপরে, যাতে ব্যাক্সাইট ফ্রন্টসাইট দুইই দেখতে পাও। মারবে আর পড়ে যাবে। গুলি বাজ্জিবে কী প্রাণ যিব্বে। তারপর তোমাকে আর পায়ের ব্যথা নিয়ে হেঁটে যেতে হবে না। আমিই কাঁধে করে বাংলোতে নিয়ে যাব।
তুমি নিজেই কেন মারছ না দণ্ডধর? তুমি তো আমার চেয়ে হাজারগুণ ভাল শিকারি?
দণ্ড হাসল। বলল, তুমি ঋজুবাবু কত ক্ষমতাবান লোক; বড়লোক। জেঠুমণির ভাইপো। আইন-কানুন সব তোমাদের হাতে ভাঙলেই মানায় ভাল। তোমাকে কেউই কিছু বলবে না। কিন্তু যদি আকাশের তারারাও দেখে ফেলে যে এইসব গ্রামের লোকদের একদিনের জন্যে মাংস খাওয়াবার জন্যে, ইংরিজিতে তোমরা পোচিন্ কী বলো যেন; তাই করে নিজে হাতে একটি ঘড়িং বা গন্ধ মেরেছি আমি; নুয়াগড়ের ভিখারি ডাকুয়ার ছেলে এই সমান্য মানুষ দণ্ডধর ডাকুয়া, তাহলেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের খাতায় আমার নাম উঠে যাবে। আমাকে, আমার ছেলেকে, এমনকী আমার নাতিকে পর্যন্ত অপরাধী থাকতে হবে তাদের কাছে। যুগযুগান্ত ধরে কান মুলতে হরে। নাকে খত দিতে হবে। তুমি আর আমি কি এক হলাম ঋজুবাবু? আইন তোমাদের কাছে তামাশা, আর আমাদের কাছে তা ফাঁসি।
তোমার বক্তৃতার চোটে তো কোনও জানোয়ার এদিকে আর আসবে বলে একটুও মনে হচ্ছে না দণ্ডধর।
এইই চুপ করলাম। ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে দণ্ডধর বলল। একটু পরই আবার রাতের জঙ্গলকে চমকে দিয়ে বলল, আসবে না তো যাবে কোথায়? আমি কি গুণ্ডিপান না-খেয়ে থাকতে পারি? গুড়াখু দিয়ে দাঁত না মেজে পারি?, তুমি পারো পাইপ না খেয়ে? নেশা বলে ব্যাপার। জানোয়ার নুনিতে আসতে বাধ্য। খুব বড় সাইজের একটা দেখেশুনে একেবারে মোক্ষম মার মারবে কিন্তু। অনেক মণ মাংস হয় যাতে। ফসকিয়ে যায় না যেন!
