বাঘের মাংস (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

বসে আছি তো বসেই আছি। শিব্বর সেই কেলে নাড়তে কী ছিল কে জানে। কেমন ঘুম-ঘুম পাচ্ছে! হাত-পা অবশ-অবশ লাগছে। মনে হচ্ছে, আমার হাতদুটো বেহাত হয়ে গেছে।

ফিসফিস্ করে দণ্ডকে সে-কথা জিজ্ঞেস করলাম।

ও মাথা নেড়ে বলল, রাইফেলের গুলির চেয়েও মারাত্মক। আস্তে-আস্তে দেখবে এর ফল। সফট-নোজড় বুলেটের মতোই ক্রিয়া। হঁ!

ক্রিয়ার কথা শুনে পুলকিত হলাম। কিন্তু তারপর কর্মটা যে কী হবে, সেইটেই দেখার।

একদল চিতল হরিণ এল। নুন চাটল খসখসে জিভ দিয়ে খচর-খচর করে। চলে গেল। আমাদের পেছনে খানিকটা দূরে হাতির একটি ছোট দল চরে খাচ্ছিল। ডালপালা ভাঙার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। হাতিদের পেটে সবসময়েই যজ্ঞিবাড়ির উনুনের মতো কত কী সব রান্না হয়। নিস্তব্ধ জঙ্গলে। অনেকদূর থেকেই সেই ফোঁসফোঁস, ভুটুর-ভাটুর আওয়াজ শোনা যায়। ওরা বাঁশ ভাঙছে মটাস-মটাস করে। হাতিরা আছে। কিন্তু নীলগাই অথবা বাইসন কারও দলেরই দেখা নেই। নীলগাইকে ওরা বলে ঘড়িং। আর বাইসন বা ইন্ডিয়ান গাউরকে বলে গন্ধ। একদল শুয়োর, ধাড়ি-বাচ্চা, মদ্দা-মাদিতে ভরপুর, জোরে দৌড়ে পার হয়ে গেল নুনিটা। কিসের এত তাড়া ওদের কে জানে! ঘন্টা-দেড়েক বসে থাকার পর কেবলই মনে হতে লাগল অনেক জানোয়ারই যেন জঙ্গলের কিনারা অবধি আসছে কিন্তু নুনিতে নামছে না। বিভিন্ন জানোয়ারের পায়ের শব্দ পাচ্ছি স্পষ্ট পাথুরে জমিতে। তারপরই আওয়াজগুলো আশ্চর্যজনকভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে। নুনির কিনারা অবধি আসার আওয়াজ পাচ্ছি। কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোনও আওয়াজই কানে আসছে না। আশ্চর্য ব্যাপার! দণ্ডধরকে ফিসফিস করে শুধোলাম, এখানে তুমি আগে এসেছ কখনও?

নাঃ। সংক্ষিপ্ত জবাব দিল ও।

আমার মনে, কু-ডাক দিচ্ছিল। মনে হচ্ছে, জায়গাটায় আশ্চর্য সব ব্যাপার-স্যাপার ঘটে। তবে, ভয় করছিল না; কৌতূহল হচ্ছিল খুব। মাথাটাও খুব ভার-ভার মনে হচ্ছিল। এরকম কখনও আগে বোধ করিনি। অন্ধকারে চোখের সামনে ময়ূরের পালকের মতো রঙ দেখছিলাম ঝলঝলক। হঠাৎ খুব বড় একটা একলা-শিঙাল শম্বর ঘা-ঘাক করে ডাকতে ডাকতে প্রচণ্ড জোরে পুবদিক থেকে পশ্চিমে দৌড়ে নুনিটা পার হয়ে গেল। মুখ উঁচু করে ডালপালাওয়ালা প্রকাণ্ড শিংটাকে পিঠের উপর শুইয়ে পাথরের উপর পায়ের খুরে খটখটানি আওয়াজ তুলে। এবং তার সামান্য পরেই একটা বড় বাঘ নিঃশব্দে জঙ্গলের গভীর থেকে লাফ মারল। নুনিটার মাঝখানে লাফিয়ে পড়েই ঘাপটি মেরে বসে যেন ঝোপঝাড় ভেঙে শম্বরটার চলে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে লাগল দু-কান খাড়া করে। বাঘ কিন্তু সচরাচর এমন ফাঁকায় আসে না। সবসময়ই আড়ালে-আবডালে চলে ছায়ার মতো। জাত-শিকারি সে। আমাদের দিকে ব্রড-সাইড ছিল বাঘটির। আমার পারমিটের বাঘ এখনও মারা হয়নি। দণ্ডধরের সঙ্গে আমার যেন মনে-মনে কথা হল টেলিপ্যাথিতে। দণ্ডধর মুখে কথা না বলে আমার পিঠে খোঁচা দিল। মুহূর্তের মধ্যে রাইফেল তুললাম আমি। কিন্তু চোখ ঝাপসা। মগজ ফাঁকা। পায়ে দলদলি। হাত বেহাত।

আমার মাথার মধ্যে কে যেন বলল, এ একেবারেই ঠাকুরানির দান। এই বাঘ। দণ্ডধর আলো ফেলল সঙ্গে-সঙ্গে। দু চোখ খুলে বাঘের বুকে নিশানা নিয়ে গুলি করলাম। এবং সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটল। নুনির চতুর্দিক থেকে পাগলাঘন্টির মতো কিন্তু গৃহস্থ বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর সময় যেমন নিচুগ্রামে ঘন্টা বাজে তেমন, অনেক ঘণ্টা একসঙ্গে বেজে উঠল। অসংখ্য লোক হাত নেড়ে-নেড়ে যেন সেই ঘণ্টা বাজাচ্ছিল। সেই ঘণ্টার আওয়াজের সঙ্গে রাইফেলের গুলির আওয়াজ এবং বাঘের চাপা গর্জনের আওয়াজ মিশে গেল। কিছু বোঝার আগেই দেখলাম একলাফে বাঘ উধাও। তারপর যাকে সে একটু আগে শিকার করবে বলে তাড়া করেছে বলে মনে হয়েছিল সেই শম্বরের মতো সে-ও জঙ্গল ঝোপঝাড় লণ্ডভণ্ড করতে করতে উধাও হয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে ঘণ্টাধ্বনিও থেমে গেল। হঠাৎ গুলির শব্দে রাতের বনে যে-সব বাঁদর ও নানারকম পাখি চেঁচামেচি করে উঠেছিল, তারাও হঠাৎ থেমে গেল। অথচ, এমন হঠাৎ তারা থামে না কখনও।

দণ্ডধর আমার পিঠে আঙুল দিয়ে আবার খোঁচা মেরে উঠতে বলল।

ঠিক দশটার সময় বাঘটাকে গুলি করেছিলাম। দণ্ডধরকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল। খণ্ডিয়া মানে জখম বাঘ যেদিকে গেছে তার বিপরীত দিকে ভীমধারার উঁচু মালভূমির দিকে আমরা এগোতে লাগলাম।

বেশ কিছুদূর এসে দণ্ডধর বলল, ঠিক দশটার সময় তুমি বাঘটাকে গুলি করেছিলে, তাই না?

হবে। ঘড়ি তো দেখিনি! কিন্তু ঘন্টাগুলো কী ব্যাপার?

দণ্ডধর ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, কথা বোলো না। চুপ

আরও কিছুটা গিয়ে ও বলল, শিব্বকে কান ধরে পিটব আমি। এখানের ঠাকুরানি যে এমন জাগ্রত এ-কথা সে বলে তো দেবে! আমাদের প্রাণ চলে যেত একটু হলে। জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে চুল পাকালাম এমন আজব ব্যাপার কখনও দেখিনি বা শুনিনি। এখন দ্যাখো। এ যদি সত্যি বাঘ হয়, মায়ার বাঘ না হয় তবে কাল এই খণ্ডিয়া বাঘ আমাদের অশেষ কষ্ট দেবে। একে খুঁজে বের করে মারতে হবে। এভাবে তো আর ছেড়ে রেখে চলে যাওয়া যাবে না।

চলতে চলতে বললাম, মায়ার বাঘ মানে?

বাঃ! রামায়ণে মায়ামৃগের কথা পড়োনি! ঠাকুরানি পঞ্চাশ হাতে ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন আর মায়া বাঘ হাজির করতে পারেন না? আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। আচ্ছা, নানা জানোয়ারের নুনিতে আসার শব্দ পেয়েছিলে তুমি?

বললাম, হ্যাঁ। কিন্তু ফেরার কোনও আওয়াজ পাচ্ছিলাম না। আশ্চর্য!

ঠিক! তখনই আমাদের ঐ নুনি ছেড়ে চলে আসা উচিত ছিল। আমি ভাবলাম, তোমাকে কোনওমতে রাজি করিয়েছি একটা বড় গল্ব মারতে, চলে গেলে, যদি কাল আবার তুমি মত পাল্টে ফেলো? আমার লোভেই এমন হল। এখন কাল কী আছে কপালে, তা ঠাকুরানিই জানেন।

ভীমধারার মালভূমিতে এদিক দিয়ে উঠতে হলে অত্যন্ত চড়াই বেয়ে উঠতে হয়। ঐ শীতেও আমরা ঘেমে গেলাম। উত্তেজনায় শরীরে ও মস্তিষ্কেও সাড় ফিরে এসেছিল। কিন্তু নিচ দিয়ে যাওয়ার সাহস ছিল না। গুলি-লাগা খণ্ডিয়া বাঘ কোথায় ওৎ পেতে বসে থাকবে কৃষ্ণপক্ষের রাতের নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে তা কে জানে! ওদিকে জঙ্গল অত্যন্ত ঘনও। এবং এখন গভীর রাত। তার উপরে দণ্ডধর বলেছে : ঠাকুরানির বাঘ!

ভীমধারার মালভূমির উপরে পৌঁছে একটু দম নিলাম আমরা। কুলকুল করে বয়ে চলেছে পরিষ্কার জল চ্যাটালো পাথরের বুক বেয়ে অনেক ধারায় ভাগ হয়ে সমান্তরাল রেখায়। কিছুটা গিয়েই আমাদের বাঁদিকে প্রপাত হয়ে পড়েছে। তারার আলোতে পরিষ্কার মালভূমিটিকে স্বর্গীয় বলে মনে হচ্ছে। আমরা জলের কাছে এসে রাইফেল, বন্দুক, টর্চ সব পাথরের উপর শুইয়ে রেখে আঁজলা ভরে জল খেলাম। দণ্ডধর আলোয়ানটাকেও নামিয়ে রাখল পাথরের উপরে। জল খেয়ে, মুখে, চোখে, ঘাড়ে, ঠাণ্ডা জল দিয়ে আমরা যখন উঠে দাঁড়িয়ে বন্দুক রাইফেল তুলে নেওয়ার জন্যে পেছনে ফিরেছি, দেখি আমাদের সম্পত্তিগুলো আর আমাদের মধ্যে আড়াল করে কালো পাহাড়ের মতো একটি এরা বাইসন দাঁড়িয়ে আছে। নিথর হয়ে। তার চোখ আমাদের দিকে।

আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেছি দুজনেই। খালি হাত। এত বড় বাইসন এ-অঞ্চলেও কখনও দেখিনি। পুরুনাকোট-টুকার বাইসনদের নাম আছে সারা ভারতবর্ষে। কিন্তু তবু এ-অঞ্চলেও এত প্রাচীন বাইসন কখনও দেখিনি। তার গায়ের কালো রঙ বয়সের দরুণ যেন পেকে বাদামি হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে সাদা জায়গাটা, হাঁটু ও পায়ের কাছের সাদা জায়গাগুলো পরিষ্কার দেখাচ্ছে। নীলাভ দ্যুতি ছড়ানো তারাভরা কালো আকাশের পটভূমিতে নিথর হয়ে মহাকালের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। যেন, পাথরে গড়া মূর্তি।

হঠাৎই দণ্ডধর হাঁটু গেড়ে বসে হাতজোড় করে বিড়বিড় করে কী সব বলতে লাগল অস্ফুটে। আর আমি অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম। অত বড় বাইসনটা পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে এঙ্গে যে শব্দ হত তা বহুদূর থেকেই শোনা যেত। এইখানে অত বড় তৃণভোজী জানোয়ারের লুকিয়ে থাকার মতো কোনও আড়ালও ছিল না। মাংসাশী জানোয়ারেরা লুকোবার অনেক কায়দা জানে। কিন্তু এরা তা জানে না। এও কি ঠাকুরানিরই কারসাজি! এ এখানে কখনওই ছিল না আমরা যখন জল খেতে নামি ঝরনাতে। আমরা জল খেতে নামার পরেও আসা একেবারেই অসম্ভব ছিল।

দণ্ডধর কী সব বলেই চলল। আবারও হঠাৎ সববেত ঘন্টাধ্বনি হল জোরে জোরে। এ যেন কৃষ্ণপক্ষের ঘোরা রাত নয়, যেন কোজাগরী পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলোয় ঘরে ঘরে কমলাসনার পুজো হচ্ছে। পরক্ষণে হঠাৎই ঘণ্টা থেমে গেল। এবং এত বড় বাইসনটিও উধাও হয়ে গেল। চোখের নিমেষে।

দণ্ডধর মাটিতে থেবড়ে বসে পড়ল। ট্যাঁকের বটুয়া থেকে বের করে। একমুঠো গুণ্ডি ঢেলে পান সাজল একটা। পানটা মুখে পূরল। আমিও ওর পাশে বসে পাইপে ঠেসে তামাক পুরে বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিয়ে মাথা পরিষ্কার করার চেষ্টা করতে লাগলাম। পাগল-টাগল হয়ে যাব না তো? কী কুক্ষণে এবার এখানে এসেছিলাম! তাইই ভাবছিলাম।

বাংলোয় ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়লাম। কাল সকালের কথা ভাবতেই গায়ে জ্বর আসছিল। আহত বাঘকে অনুসরণ করে এর আগে অনেকবারই মেরেছি। এই সব মুহূর্তেই শিকারির স্নায়ু, সাহস, ধৈর্য আর অভিজ্ঞতার পরীক্ষা হয়। তাতে, সত্যিকারের শিকারির উত্তেজনাই বাড়ে। একরকমের আনন্দও হয়। যে আনন্দের কথা শুধু শিকারিরাই জানেন। কিন্তু ভয় করে না। শিকারের সমস্ত আনন্দ তার বিপদেরই মধ্যে। কিন্তু খণ্ডিয়া বাঘকে নিয়ে ঠাকুরানি যে কী খেলা খেলবেন তা তিনিই জানেন।

শুয়ে শুয়ে শুনতে পাচ্ছিলাম, দণ্ডধর, ভীম, দুর্যোধন, ওরা সকলে মিলে ফিসফিস করে ঠাকুরানির নানারকম অলৌকিক কীর্তিকলাপের কথা আলোচনা করছে। তারপরই দুর্যোধন খালি গলায় রাতের জঙ্গল মথিত করে উদাত্ত স্বরে আবেগভরে গান ধরল :

দয়া করো দীনবন্ধু, শুনে যাউ আজদিন
করজোড়ে তুম পাদে করছি মু নিবেদন
সত্য শান্তি প্রদায়ক, দুষ্ট দণ্ড বিধায়ক
রুকমিনী প্রাণনায়েক প্রভু পতিতপাবন।

অনাদি অনন্ত হরি নৃসিংহ মুরতি ধরি
হিরণ্য দৈত্যকু মারি বুক কৈল বিদারণ।

দোয়াপর যুগরে হরি গুপ্তে বরি গুপপুরী
দুষ্ট কংসকু নিবারি রজা কল উগ্রসেন
ভারতভূমি মধ্যরে সুদর্শন ধরি করে
পাণ্ডবংক ছলে হরি, কৌরবে কল দহন
কলি যুগে জগরনাথ বিজে চক্ৰহস্ত
সাধিয়ে পউঠি অন্ন আপে করুছ ভবন
তুমে এ সংসারে সার, আভি সব মায়া ঘর
কুতাংত ডর উঠরো কহে দীন জনহীন।

দুর্যোধনের গলার সুন্দর ভক্তিকম্পিত জগন্নাথ-বন্দনার গান শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল চেঁচামেচিতে। বাইরে এসে দেখি অনেক মেয়ে-পুরুষ জমা হয়েছে বাংলোর সামনে। তারা সমস্বরে অনুযোগ করছে, তম্বে এট্টা কঁড় করিলু বাবু? সে বড় বাঘটাকু খণ্ডিয়া করিকি ছাড়ি দেলু? আম্মেমানে ঝাড়া দেইবাকু যাউ পারি নান্তি। কঁড় হব্ব এব্বে?

মানে, তুমি এটা কী করলে বাবু? বড় বাঘটাকে আহত করে ছেড়ে রাখলে? আমরা জঙ্গলে প্রাতঃকৃত্য পর্যন্ত করতে যেতে পারছি না। কী হবে এবারে?

দেখলাম, দণ্ডধর তাদের শান্ত করে বলল, এক্ষুনি হাঁকা করব আমরা। খণ্ডিয়া বাঘকে মেরে তবেই মুখে জলদানা দেব। বাঘটা কোথায় আছে যারা দেখেছে তারা চলো আমাদের সঙ্গে। মেয়েরা আর ছোটরা বাদে।

এমন সময় দেখা গেল, গামছা-পরা একটা হাড়সাল নোক আসছে গেট পেরিয়ে। দণ্ডধর ভাল করে দেখে বলল, আরে, শিব্ব না?

কাল রাতের অন্ধকারেই তাকে দেখেছিলাম। দিনের আলোয় আমার চেনার কথা নয়। তার পেছনে পেছনে কঙ্কালসার একটি নারীমূর্তিকেও আসতে দেখলাম।

শিব্ব কাছে এলে, তাকে পাশে ডেকে দণ্ডধর কী সব জিজ্ঞেস করল। দণ্ডধরকে খুবই উত্তেজিত দেখাচ্ছিল।

শিব্ব বলল, সেও যাবে হাঁকা করতে। খণ্ডিয়া বাঘ যদি মারা পড়ে, তাহলে গল্বর মাংসর বদলে বাঘের মাংসই খাবে। বাঘের মাংস তো কী, তাই-ই সই। মাংস তো!

ভাবছিলাম, বাঘের মাংস চিবোনোই যায় না। রবারে কামড় দিলে দাঁত যেমন লাফিয়ে ওঠে তেমন করেই লাফিয়ে ওঠে দাঁতের পাটিও। বাঘের তলপেটের কাছে যতটুকু চর্বি থাকে তা তো লোকে বাঘের চামড়া ছাড়ানো হলে কাড়াকাড়ি করেই নিয়ে নেয় ওষুধ বানাবার জন্যে। শিব্ব তার এই জিরজিরে চোয়াল আর আফিংয়ে গুঁড়ো আর কন্দসেদ্ধ খাওয়া পেট নিয়েও বাঘ খাবার আশা রাখে দেখে তাজ্জব হয়ে গেলাম।

আধঘণ্টার মধ্যেই কেরোসিনের টিন, শিঙে, ঢোল, করতাল এবং টাঙ্গি ও তীর-ধনুক নিয়ে প্রায় জনা-পঞ্চাশেক লোক জমে গেল। কিন্তু অধিক সন্ন্যাসিতে গাজন নষ্ট হওয়ার ভয়। একথা দণ্ডধরকে বলতেই সে বেছে-বেছে জনাকুড়ি লোককে সঙ্গে নিল। বাকি যারা, তারা তাদের বউ শালিদের সামনে রিজেটেড হওয়াতে প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করল মনে হল।

দণ্ডধরকে শটগানটা দিয়েছি। ডান ব্যারেলে লেথাল বল এবং বাঁ ব্যারেলে স্ফেরিক্যাল বপুরে। আরও চারটে গুলি নিয়েছে সে শার্টের পকেটে। আমি নিয়েছি ফোর-সেভেন্টি-ফাইভ ডাবল-ব্যারেল। সফট-নোজড গুলি নিয়েছি চারটি সঙ্গে।

এখন কথাবার্তা কম। প্রায় নিঃশব্দে সিঙ্গল ফরমেশানে এগিয়ে গিয়ে ভীমধারার নদী পেরিয়ে নদীটা যেখানে অন্য একটা-নালা হয়ে সরে গেছে গ্রামের দিকে, সেখানে এসে দণ্ডধর অবস্থাটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল। বাঘের পায়ের দাগ এবং নদীর পাশের সঁড়িপথের কোনও-কোনও জায়গায় শুকিয়ে-যাওয়া রক্তের দাগও পাওয়া গেল। তারপর ওদের সঙ্গে ফিসফিস করে পরামর্শ করে আমাকে সঙ্গে নিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল দণ্ডধর। বুঝলাম, বিটাররা নালার মধ্যে নামবে দুপাশের পাড়ের জঙ্গলে জঙ্গলে গিয়ে। তারপর পেছন থেকে হাঁকা করবে যাতে বাঘটা তাড়া খেয়ে এদিকে আসে।

বসার মতো তেমন ভাল জায়গা নেই এদিকে। দণ্ডধর আমাকে একটা জায়গায় আড়াল করা কালো বড় পাথর দেখিয়ে নিজে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে একটা পিয়াশাল গাছে উঠে গেল তরতর করে কাঠবিড়ালির মতো। ততক্ষণে বিটাররা আমাদের ফেলে দু ভাগে ভাগ হয়ে চলে গেছে নালার ওদিকের পাড়ে-পাড়ে হেঁটে।

সময় এতই অল্প যে ব্যাপারটা যে কী দাঁড়াবে বুঝতে পারছিলাম না। কথা ছিল, ভীম প্রথমে শিঙা বাজিয়ে সকলকে হাঁকা শুরু করার সঙ্কেত দেবে। ভীম আছে বাঁ-দিকের পাড়ে-পাড়ে যে-দলটি গেছে-তাদেরই মঙ্গে। পাথরে বসে সামনে থেকে আগাছার বেড়া হাত দিয়ে ফাঁক করে দেখে নিলাম নালা দিয়ে বাঘ যদি দৌড়ে যায় তাহলে তাকে মারা যাবে কি না? মনে হল, যাবে। তবে বাঘের সঙ্গে আমার তফাত থাকবে মাত্র হাত পাঁচেকের। উপায় নেই। তা ছাড়া দিনের বেলায় হাতে এই মাত্র রাইফেলের দু ব্যারেলে দুটি সফ্ট-নোজন্ড গুলি থাকলে এবং ঠাকুরানির ঘণ্টা আবারও না বাজলে, খণ্ডিয়া বাবাজিকে খণ্ডিত হতেই হবে।

যাতে নালার মধ্যেটা আর একটু ভাল করে দেখতে পারি, তার জন্য পাথরটার আরও একটু পেছনে উঠে এলাম। পেছনেই একটা গুহমতো। তার মধ্যে থেকে বাড়দের গায়ের বোঁটকা গন্ধ আসছে। শীতের সকাল, তখনও গাছ-পাতা বালি-পাহাড়ে শিশিরে ভেজা। তুলোর মতো শিশির-পড়া মাকড়সার জালে আর বুনো নাম-না-জানা ফুলের উপর সকালের রোদ পড়াতে হাজার হাজার হিরে ঝলমলিয়ে উঠছে। যে একবার এই হিরের খনির খোঁজ পেয়েছে সে আর কলকাতার সাতরান্দাস ধালাম, পি সি চন্দ্র বা বম্বের জাভরি ব্রাদার্সের হিরে ছুঁয়েও দেখবে না।

টুঁই পাখি ডাকছে পেছন থেকে। দূর থেকে বড়কি ধনেশের ডাক আসছে অস্পষ্ট। এক ঝাঁক টিয়া সকালের রোদ-ঠিকরানো জঙ্গলের সবুজকে টুকরো করে লাল ঠোঁটে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঝকঝকে নীল-নির্জন আকাশে।

বড় শান্তি এখন এইখানে।

হঠাৎ ভীমের শিঙা বেজে উঠল। আরম্ভ হল হাঁকাওয়ালাদের চিৎকার। কেরোসিন-টিন পেটানোর আওয়াজ। হাততালি। অদৃশ্য এবং বাস্তব ও কল্পিত সমস্ত শত্রুদের প্রতিই সম্ভাব্য এবং অসম্ভাব্য সবরকম গালাগালি। আওয়াজটা এগিয়ে আসছে। গাছে-গাছে টাঙ্গির মাথা দিয়ে বাড়ি.মেরেও ওরা আওয়াজ করছে।

এমন সব সময়েই রক্ত শিরায় শিরায় একটু জোরেই ছোটাছুটি করতে থাকে। হাতের পাতা ঘামতে থাকে। ছেলেবেলায় এই উত্তেজনা আরও অনেক বেশি হত। যত দিন যাচ্ছে, ততই একে কিছুটা কায়দা করতে পারছি বলে মনে হচ্ছে। বিটাররা যে-গতিতে এগোচ্ছে, সেই গতিতে এগিয়ে এলে এবং হাঁকা পূর্ব-পরিকল্পনামতো হলে বড়জোর দশমিনিটের মধ্যেই আমার সামনের নালা দিয়ে বাঘের যাওয়া উচিত। কাল রাতের গুলিটা খুবসম্ভব ডান পায়ে লেগেছে। এবং পায়ের নীচের দিকে, মানে হাঁটুর আর থাবার মধ্যে। শিব্ব যে নাড়ু খাইয়েছিল তা সাধারণ নাড়ু নিশ্চয়ই নয়। অসাধারণও নয়। সে-নাড়ুর নাম দেওয়া উচিত জ্ঞানহরণ। কালো দেখতে এবং মিষ্টি-মিষ্টি গন্ধ। খাওয়ার পর থেকেই খুব পিপাসা পাচ্ছিল আমার। দণ্ড বলেছিল যে বাংলোতে ফিরে দুধ খেতে হবে আমাদের। ওকে মনে করিয়ে দিতে। কী ব্যাপার তখন বুঝিনি। কিন্তু বাঘটার উপর যখন দণ্ড রাতে টর্চের আলো ফেলেছিল, তখন একটা বাঘ নয়, অনেকগুলো বাঘ দেখেছিলাম আমি। নুনিময়ই বাঘ। ছোট বাঘ, বড় বাঘ, মেজো বাঘ, সেজো বাঘ, বাঘে বাঘে বাঘারি! গুলি যে কোন্ বাঘকে করেছিলাম এবং কোন্ বাঘে লেগেছিল তা বুঝিনি।

আজ সকালে ঘুম ভাঙতে চাইছিল না। রাতে নানারকম স্বপ্নও দেখেছিলাম। দেখি একজন তাঁতি শান্তিপুরের সেই কাঁচা রাস্তাটার পাশে বসে লাল-নীল সবুজ সুতো দিয়ে কোনও সুন্দরীর জন্য যেন দারুণ আঁচলের আর পাড়ের এক শাড়ি বুনছে। এখনও ঘুম লেগে আছে আমার চোখে। টুকটুকে বউয়ের জন্যে যেন দারুণ আঁচলের আর পাড়ের এক শাড়ি বুনছে। এখনও ঘুম লেগে আছে আমার চোখে। হাঁকা শেষ হলে আজকে দণ্ডধর আর শিব্বকে এ নিয়ে ভাল করে জেরা করতে হবে। কেন এবং কী জিনিস খাইয়েছিল ওরা আমাকে। একটু হলে আমার প্রাণ নিয়েই টানাটানি হত। বাঘের সঙ্গে ইয়ার্কি!

এমন সময় হঠাৎই বাঘের গর্জন শোনা গেল। সর্বনাশ। বাঘ বিটারদের লাইন ভেঙে ফিরে যাচ্ছে বলে মনে হল সকলের ভয়ার্ত চিৎকারে। ওদের সঙ্গে ভীম আর দুর্যোধন আছে। ভীমের হাতে আমার শটগানটাও আছে; বদলে থ্রি-সিক্সটি-সিক্স রাইফেলটা নিয়েছে দণ্ড। দুর্যোধনের হাতেও আছে একটি সিঙ্গল ব্যারেল লাইসেন্সবিহীন মাজল-লোডার।

কয়েক সেকেন্ড পরেই শটগানের একটি গুলির পরেই আওয়াজ হল। বাঘের ঘন ঘন গর্জনে এবারে গাছপালা সব পড়ে যাবে মনে হল পাহাড় থেকে খসে। সঙ্গে-সঙ্গে হাঁকাওয়ালাদেরও সমবেত ভয়ার্ত চিৎকার, দণ্ড রে! এ দণ্ডধর! ডাকুয়াবাবু! ঋজুবাবু! কাম্ব সারিলা! সে খণ্ডিয়াটা তাংকু মারি দেলে! শিব্বকু! সে কি আউ বাঁচিছি? গল্লা রে, গল্লা।

আমি নালা ধরে দৌড়তে লাগলাম ঊর্ধ্বশ্বাসে। দণ্ডও তরতরিয়ে পিয়াশাল গাছ থেকে নেমে এসে আমার সঙ্গে দৌড়ল। ঘটনার জায়গাতে পৌঁছে দেখি, নালার বালি আর পায়ের পাতা-ভেজা জলে শিব্ব পড়ে আছে। টাটকা রক্তের ঝিরঝিরে স্রোতে ভিজে যাচ্ছে বালি আর জল। ওর ঘাড় আর মাথাটাকে বাঘটা ডাঁশাপেয়ারার মতোই চিবিয়ে দিয়ে চলে গেছে। শিব্বর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে নাড়ি দেখল দণ্ড। দেখেই, ছেড়ে দিল।

আমার এত অপরাধী লাগল নিজেকে! কাল যদি বাঘটার বে-জায়গায় গুলি করে তাকে খণ্ডিয়া না করতাম তবে তো এমন হত না। এই মৃত্যুর সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমারই একার। মানুষ খুন করারই মতো অপরাধ এ। আমি আর কোনও কথা না বলে হাঁকাওয়ালারা বাঘ যেদিকে লাফিয়ে চলে গেছে বলল, সেইদিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম।

দেখলাম, নালার পাড়টা দুলাফে পেরিয়ে গেছে বাঘটা। রক্ত বেশি পড়েছে। এখানে। প্রথম থেকেই বালিতে পায়ের দাগ দেখে এবং ঘাসপাতায় রক্ত যেখানে যেখানে লেগেছে সেই সব জায়গার উচ্চতা দেখে গুলির চোটটা কোথায় হতে পারে তা অনুমান করেছিলাম। পায়ের থাবার দাগ অবিকৃতই ছিল, কিন্তু ডানপায়ের সামনের থাবার দাগটা অন্য পায়ের থাবার তুলনায় ছিল অস্পষ্ট। এটা বাঘ নয়, সব ঠাকুদার ঠাকুর্দা। তাছাড়া শিব্বকে যখন ধরে বাঘটা তখন বিটারের মধ্যে অনেকে এবং একজন গাছে-বসা স্টপারও বাঘটাকে চোখে দেখেছিল। তারা সকলেই বলছিল যে ডান পায়ের হাঁটু একদম ভেঙে গেছে। ফুলেও গেছে পা-টা।

নালাটা খুব সাবধানে পেরোলাম। এখানে হরজাই জঙ্গল। কুচিলা, বেল, অর্জুন, করম, পালধুয়া, হাড়কঙ্কালি, পুটকাসিয়ার লতা। না-নউরিয়া এবং আরও নানারকম ঝোপ-ঝাড়। একটা পাথরের স্তূপের পাশ দিয়ে বাঘটা জঙ্গলে ঢুকে গেছে রাইফেলের ব্রিচ খুলে গুলি দুটোকে আর একবার দেখে নিলাম। পাপটা আমার। সুতরাং প্রায়শ্চিত্তও একা আমাকেই করতে হবে।

আহত বাঘকে অনুসরণ করে মারার মধ্যে যে বিপদের আশঙ্কা এবং উত্তেজনা থাকে তাই-ই শিকারিদের গর্বিত করে তোলে। যে-সব প্রাণী-দরদী সমস্ত শিকারকেই একধরনের নীচ স্পোর্টস বলে মনে করেন, তাঁদের বোধহয় ঠিক ধারণা নেই যে শিকার ব্যাপারটা সকলের জন্যে নয়। এবং শিকারিও নানারকমের হয়ে থাকেন। আইন মেনে বিপজ্জনক জানোয়ার শিকার করার মধ্যে কোনও লজ্জা আছে বলে কখনও মনে হয়নি। বরং শিকার, একজন শিকারিকে হয়তো মানুষ হিসেবেও অনেক বড় করে। দেশকে চেনায়, দেশের সাধারণ মানুষদের সম্পর্কে জানবার সুযোগ দেয়, তাদের প্রতি দরদী করে তোলে, যা খুব কমসংখ্যক শহুরে লোকের পক্ষেই সম্ভব। যে-সময়ের কথা বলছি সে সময়ে শিকার করার মধ্যে কোনও অন্যায়বোধও ছিল না। জানোয়ার প্রচুর ছিল এবং চুরি করে শিকার করতাম না আমরা।

অনেকেরই ধারণা যে মাচায় বসে বা হাঁকোয়াতে একটি বাঘ মেরে দেওয়া। বোধহয় খুবই সোজা। কিন্তু যাঁরা জানেন, তাঁরাই জানেন যে, There are many a slips between the cup and the lips. এবং এই কথাটা শিকারের বেলা কতখানি প্রযোজ্য। একজন শিকারি যেভাবে ব্যর্থতাই হল সাফল্যের সিঁড়ি এই কথাটি হৃদয়ঙ্গম করেন এবং নিজের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন তা বোধহয় অন্য ধরনের খুব কম খেলোয়াড়ের পক্ষেই সম্ভব।

আজকে কিন্তু মনটা খুবই দুর্বল লাগছে। ভয়ও লাগছে ভীষণ। বাঘ যে কত ক্ষমতাবান, তার গলার স্বরে যে পৃথিবী সত্যিই কাঁপে, তার সামনের দুটি পায়ে যে সে কতখানি বল রাখে, তা যারা জানে, বাঘকে ভয় না করে তাদের কোনও উপায়ই নেই। শিব্বর রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন ঘাড়, মুখ আর মাথাটা মনে পড়ছিল, আর আমার নিজের মাথা তখনও ঘুরছিল। কিন্তু এখন মাথা ঠিক না রাখতে পারলে আমার মাথার অবস্থাও শিব্বর মতোই হবে।

পাথরের স্তূপটার আড়ালে বাঘটার পক্ষে লুকিয়ে থাকা খুবই সম্ভব। তাই, যেদিক দিয়ে বাঘটা সেদিকে গেছে, সে-দিক দিয়ে না এগিয়ে, অনেক ঘুরে বাঁ-দিক দিয়ে এগোলাম এক-পা এক-পা করে। নিঃশব্দে। সেই মুহূর্তে ডান পায়ের অবস্থার কথা একেবারেই ভুলে গেলাম। যা-পরে রাতে শুয়েছিলাম তাই পরেই চলে এসেছিলাম আমরা। পায়ে রবারের হাওয়াই চটি। নিঃশব্দে চলতে অসুবিধা হচ্ছিল না। তবে, গোড়ালি আর পায়ের পাতায় কাঁটা ও ঘাসের খোঁচা লাগছিল! আস্তে-আস্তে বড় গাছের আড়াল নিয়ে নিয়ে অনেকখানি এগিয়ে এলাম বাঁদিকে।

জমিটা ওখানে পৌঁছে নরম চড়াই হয়ে একটি টিলার দিকে উঠে গেছে। আরও একটু এগিয়ে গেলাম টিলার দিকে। যাতে সেখানে পৌঁছে ঐ কালো পাথরের ভ্রুপের পেছনটা পরিষ্কার দেখতে পাই। বাঁ-দিকে একটি ময়ূর ও চারটি ময়ূরী চরছিল। ওরা আমাকে দেখতে পায়নি। তবু, খুবই ঘাবড়ে গেলাম। ময়ূররা যেমন বাঘ দেখলে কেঁয়া কেঁয়া করে ডেকে ভয় পেয়ে উড়ে গাছে গিয়ে বসে, জঙ্গলের গভীরে কাছাকাছি মানুষ দেখলে তাই-ই করে। ওরা আমাকে দেখতে পেলেই ওদের আওয়াজে বাঘ বুঝতে পারবে। বনের রাজার কাছে। বনের কোনও খবরই গোপন থাকে না।

ভাগ্য ভাল। ময়ূরগুলো আমাকে অনেকক্ষণ পর্যন্ত লক্ষই করল না। করল, কারণ এদিকে তারা মুখই ফেরাল না। যারা সাপ ধরে খায়, তাদের চোখ ভীষণই তীক্ষ্ণ। এদিকে মুখ ফেরালেই ওরা দেখতে পেত আমাকে। কিন্তু না-ফিরিয়ে পেখম ছড়িয়ে চরতে-চরতেই ওরা নালার দিকে নেমে গেল। নালা তখন শান্ত। আমাদের দলের অন্য সকলেই ততক্ষণে হতভাগা শিব্বর প্রাণহীন শরীরটি নিয়ে টুকা গ্রামের দিকে চলে গেছে। বোধহয় দণ্ডধরেরই নির্দেশে। দণ্ডও হয়তো গেছে ওদের সঙ্গে।

একটি সুবিধামতো জায়গাতে পৌঁছে বড় একটি অর্জুন গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নিলাম। ফোর-সেভেন্টি ডাবল-ব্যারেল রাইফেলটির ব্যালান্স চমৎকার। বইতে একটুও কষ্ট হয় না। তবুও ভীত এবং উত্তেজিত অবস্থায় তাকেও খুব ভারী বলে মনে হচ্ছিল।

জখম ডান-পায়ের তলাটাও দপদপ্ করছিল দাঁড়িয়ে পড়লেই। আমারই এই হচ্ছে, তাহলে না-জানি খণ্ডিয়া বাঘটার কতই কষ্ট হচ্ছে রাইফেলের গুলিতে ভাঙা পায়ের জন্য। যত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটার হেস্তনেস্ত হয় ততই ভাল।

নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিকে খুব আস্তে-আস্তে মাথা ঘোরাতে লাগলাম। নাঃ, কোথাও কোনও চিহ্ন নেই বাঘের। খুব সম্ভব সে কোনও নিভৃত জায়গার খৈাঁজে গেছে। কিন্তু, যেখানেই যাক তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত! ফোর-সেভেন্টি রাইফেলের গুলিতে পা ভেঙে গেলে বাঘের পক্ষে বাঁচা মুশকিল। মরার আগে আরও অনেক মানুষ মেরে এবং বড় যন্ত্রণার মধ্যে গড়াগড়ি দিয়ে তিল তিল করে তাকে মরতে হবে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে খুঁজে বের করতেই হবে। তা ছাড়া কোনও জন্তুকেই এমন কষ্ট দেওয়ার অধিকার কোনও শিকারির নেই।

শিব্বর উপর খুবই রাগ হচ্ছিল আমার। দণ্ডর উপরেও। কী যে নাড় খাওয়াল কাল রাতে! ঐ নাড় না-খেলে এমনভাবে গুলিও করতাম না এবং গুলি হয়তো অমন বে-জায়গাতেও লাগত না। শিব্বকে হয়তো মরতে হত না এমন করে। বাঘটার আঘাত এমন মারাত্মক মোটেই হয়নি যে, সে একেবারে অকেজো হয়ে গেছে। ভাবলাম, এখানে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে বরং জঙ্গলের কী বলার আছে তা শোনা যাক। জঙ্গলের পাখি আর জানোয়াররাই বলে বাঘের গতিবিধির কথা। কিন্তু যেহেতু তার চলচ্ছক্তি পুরোপুরিই আছে তাই অল্প সময়ের মধ্যে সে অনেক দূরে চলে যেতে পারে। অবশ্য, নাও যেতে পারে। কারণ, দণ্ডধর বলছিল এই জঙ্গলেই ওই বাঘের বাড়ি। তাই নুনিতে গুলি খেয়ে সে এখানেই ফিরে এসেছে।

বাঘটা গুলি খেয়ে অন্য জঙ্গলে গেলেও আমাদের তাকে খুঁজে বের করতেই হত। সে যদি বাংলোর কাছের জঙ্গলে না আসত তবে নুনিতে ফিরে গিয়ে আজ সকালে তার খোঁজ শুরু করতেই হত। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে আমাদের কষ্ট কমই হচ্ছে। সবই হত যদি না শিব্ব…

শিব্বর রক্তাক্ত শরীরটার ছবি বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। গা গুলিয়ে উঠছিল আমার। মাঝে-মাঝে ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল দৌড়ে বন বাংলোর নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাই। বাঘটাঘ মারা আমার কর্ম নয়। এই খণ্ডিয়া বাঘ নিশ্চয়ই যমের দূত। পুরো ব্যাপারটাই কাল রাত থেকে একটা দুঃস্বপ্নের মতো চেপে বসে আছে মনে। শরীরও আদৌ সুস্থ নেই।

দণ্ডধরই বা গেল কোথায়? আমার চেয়ে ওর অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। সাহসও বেশি। এই সময়ে, এই জঙ্গলে, ও আমার পাশে থাকলে অনেক বেশি জোর পেতাম।

অর্জুন গাছটার নীচে বসে পড়লাম আমি। পাইপটা পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করলাম। লাইটারটা বাংলোর ঘরের টেলেই পড়ে আছে। তাড়াতাড়িতে আনা হয়নি। একজন হাঁকাওয়ালার দেশলাই চেয়ে নিয়েছিলাম।

গভীর জঙ্গলে একটি দেশলাইকাঠি জ্বাললেও অঅঅঅনেকই শব্দ হয়। এবং সবচেয়ে বড় কথা সেই শব্দ বনের স্বাভাবিক শব্দ নয়। হালকা-বেগুনি খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা পরে ছিলাম। আসা উচিত হয়নি এমন করে। এই পোশাকে ক্যামোফ্লেজ করা যায় না, তা ছাড়া সারাদিনই হয়তো এই বাঘের পেছনেই ঘুরতে হবে আমাকে আজ। কে জানে!

রাইফেলটা আড়াআড়ি করে দুপায়ের উপরে রেখে পাইপটা ধরালাম, দেশলাই জ্বেলে। বাঘ যেখানেই থাকুক সে আমার খুব কাছে নেই। শব্দ শুনে সে যদি তেড়ে আসে তাহলে তো ভালই। গুলি করার সুযোগ পাব। সে আসতে আসতে রাইফেল তুলে নিতে যে পারব, সে-বিশ্বাস আমার ছিল। চোখ সামনে সজাগ রেখে, দেশলাইটা জ্বেলে পাইপ ধরালাম। নাঃ। কোথাও কোনও সাড়াশব্দ নেই।

একজোড়া বেনেবউ বসে ছিল ঐ পাথরের স্কুপের ওপাশের একটি বুনো জামগাছের ডালে। তারা দুজনে হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে ডানা ফরফর করে উড়ে গেল উল্টোদিকে। চমকে উঠে জ্বলন্ত পাইপ পকেটে পুরে ফেলে রাইফেলের স্মল অব দ্য বাট-এ হাত ছোঁয়ালাম।

আবার সব চুপচাপ। আমার পেছনের ছায়াচ্ছন্ন গভীর জঙ্গল থেকে সমানে একটি কপারস্মিথ পাখি ডেকে যাচ্ছি। আর তার সঙ্গী সাড়া দিচ্ছিল অনেক দূর থেকে। দিনের বেলায় এদের ডাক জঙ্গলের নানারকম শব্দের মধ্যে অন্যরকম শোনায়। আশ্চর্য এক গা-ছমছমে ভাব আছে এই পাখির ডাকে।

এবার একঝাঁক টিয়া উড়ে এসে বসল ঐ পাথরের স্তূপেরই কাছের একটি গাছে। কিন্তু বসেই সঙ্গে সঙ্গে আবার ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ করে উড়ে গেল।

এবারে আমার সন্দেহ হল। উঠে দাঁড়ালাম। এবং খুব সাবধানে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলাম এক গাছের আড়াল থেকে অন্য গাছের আড়াল নিয়ে। স্তূপটার কাছাকাছি এসে রাইফেল রেডি পজিশনে ধরে খুব সাবধানে এগিয়ে যেতেই দেখলাম বাঘটার পেছনের একটি পায়ের সামান্য অংশ আর লেজ মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে ঝাঁটি-জঙ্গলের মধ্যে।

দেরি হয়ে গেছিল। ভালভাবে নিশানা না নিয়ে আহত বাঘকে আবারও বে-জায়গায় গুলি করার কোনও ইচ্ছাই ছিল না আমার।

বাঘটা নালাতেই নেমে গেল আবার। নালার দিকে সরে এসে দাঁড়াব কি না ভাবছি এমন সময় আমার ঠিক পেছনে শুকনো পাতা-মাড়ানো আওয়াজে চমকে উঠে পিছন ফিরলাম। দেখি, দণ্ড। নীল লুঙ্গি দুভাঁজ করে কোমরে গোটানো। গায়ে সেই হলুদ শার্ট। খালি পা। হাতে থ্রি সিক্সটি-সিক্স রাইফেলটি। নীল লুঙ্গির গায়ে ছোপ-ছোপ লাল রক্ত লেগে আছে। শিব্বর রক্ত।

দণ্ড আমার দিকে চেয়ে চোখ দিয়ে শুধোল, কোনদিকে?

কথা না বলে আঙুল দিয়ে ওকে দেখালাম। ইশারায় বোঝালাম যে বাঘ আবার নালায় নেমে যাচ্ছে ঝাঁটি-জঙ্গলের আড়াল নিয়ে। মতলবটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

দণ্ড ইশারাতে বলল যে এবার বাঘের পেছন পেছন যাব আমরা। দুজন আছি। বাঘকে এবার আমাদের দিকে চার্জ করে আসতে প্ররোচনা দেওয়াই ভাল হবে। তার চেহারা দেখামাত্র দুজনে একসঙ্গে গুলি করব। এখন আর ব্যাপারটা স্পোর্টসের পর্যায়ে নেই। তার যন্ত্রণা থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া যেমন দরকার শিব্বর মৃত্যুর বদলা নেওয়াও তেমনই দরকার। যদিও সে খণ্ডিয়া না হলে শিব্বকে আদৌ মারত না। দোষটা পুরোপুরিই আমার।

অন্যায় আমরা অনেকেই করি। জীবনে সবসময় ন্যায়ই করছেন এমন ভাব দেখান যাঁরা তাঁরা ঘোরতর ভণ্ড। মানুষ মাত্রই দোষগুণে ভরা। অন্যায় সকলেই করে। কেউ জেনে কেউ না-জেনে। যে ভাবেই করুন না কেন, অন্যায় যে আমরা করেছি, সেটা স্বীকার যদি করি, তাহলে বোধহয় দোষের অনেকখানিই লাঘব হয়ে যায়।

আমিই আগে আগে চললাম। কারণ আমার হাতেই হেভি রাইফেল। কিন্তু দণ্ডর অভিজ্ঞতা, সাহস ও বাঘ সম্বন্ধে জ্ঞান আমার চেয়ে অনেক বেশি। ঝাঁটি-জঙ্গলে একটু গিয়েই বাঘ নালায় নেমেছে এক লাফে। বোধহয় অসমান পাথুরে জঙ্গলের চেয়ে নালার সমান নরম বালিতে ভাঙা-পা নিয়ে হাঁটতে তার সুবিধে হবে ভেবেই সে নালায় নেমেছিল।

গত সপ্তাহে এ-দিকেই শুয়োর মারতে এসেছিলাম। নালার এই অংশটা অজানা ছিল না। আরও একটু আগে গিয়ে নালার মধ্যে একটু দহর মতো আছে। জায়গাটা ছায়াচ্ছন্ন। দু পাশ দিয়ে ঘন জঙ্গলে ঝুঁকে পড়ে চাঁদোয়ার মতো সৃষ্টি হয়েছে নালার উপরে সেখানে। দহতে জল আছে সামান্য।

নালায় নামতেই রক্তের দাগের সঙ্গে বাঘের পায়ের দাগও আবার পেলাম। লাফিয়ে নামতে বেচারার কষ্ট যেমন হয়েছে তেমনি রক্তও পড়েছে অনেকখানি। ওকে হাঁটাচলা করতে না হলে রক্ত-পড়াটা অন্তত এতক্ষণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বনের এই জানোয়ারদের জীবনীশক্তি এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতে সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষমতা অবিশ্বাস্য।

কিছুটা গিয়েই নালাটা হঠাৎ একটা বাঁক নিয়েছে বাঁ-দিকে। এবং সেখানে নালার বুকে অনেক বড় বড় পাথর জড়ো হয়ে আছে। গত বর্ষায় কী তারও আগের বর্ষায় বানের তোড়ে ভেসে এসেছিল হয়তো। আহত বাঘের পক্ষে ঐ সব পাথরের যে-কোনও একটার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদৌ অসম্ভব নয়। নালার বাঁকটার মুখ থেকে যাতে বেঁকে-যাওয়া নালাটা পুরোপুরি দেখতে পাই, সেইজন্যে একেবারে ডান প্রান্তে চলে গেলাম। গিয়ে, সাবধানে আস্তে আস্তে মাথা দুপাশে ঘুরিয়ে সমস্ত জায়গাটা তীক্ষ্ণ চোখে দেখলাম, নিশ্চল পায়ে দাঁড়িয়ে।

ঐখানে দাঁড়িয়েই হঠাৎ লক্ষ করলাম যে, নালার বালিতে ঐ বাঁকের পরে বাঘের থাবার আর কোনও দাগ নেই। বাঘটা বাঁকের মুখে এসেই নালার ডানপাড়ে উঠে গেছে আবার এক লাফে। বোধহয় আমরা যে তাকে অনুসরণ করছি, তা বুঝতে পেরেছে। অথবা এমনিতেই ও গভীর জঙ্গলে নিরুপদ্রব কোনও আশ্রয়ের খোঁজে গেছে।

কী করব ভাবছি। দুতিন সেকেন্ড সময়ও কাটেনি, হঠাৎই পেছন থেকে দণ্ডর ভয়ার্ত চিৎকার শুনলাম : বাঘঘ্র : ডান পাখখেরে।

সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকে মুখ ঘুরিয়েই দেখি বাজ পড়ে পুড়ে যাওয়া একটা শিমুল গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে বাঘটা আমার উপর লাফিয়ে পড়ার জন্যে জমির সঙ্গে লেপ্টে শুয়ে থাকার মতো করে বসে আছে। লেজটা পেছনে লাঠির মতো সোজা সমান্তরাল হয়ে আছে। আমার চোখের সঙ্গে তার চোখের দৃষ্টি যখন মিলল তখন অনেকই দেরি হয়ে গেছে। সেটি ক্যাচটি ঠেলারও সময় পেলাম না। সে ততক্ষণে লাফ দিয়েছে। কিন্তু বাঘটা লাফাবার সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে দণ্ডর হাতের রাইফেল গুডম্ করে গর্জে উঠল। হলুদকালোয় ডোরাকাটা একটি সাইক্লোনের মতোই বাঘটা কানে তালা লাগানো বুক কাঁপানো গর্জন করে উড়ে এল আমার উপর। রাইফেল কাঁধে তুলে আমি একলাফে এগিয়ে গেলাম কিছুটা, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম বাঘের ছোঁয়া এড়াবার চেষ্টাতে। বাঘটা চার হাত পা এবং লেজসমেত যখন আমার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল তখনই রাইফেল সুইং করে ট্রিগার, টেনে দিলাম প্রায় তার বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে।

এত সব ঘটনা ঘটতে কিন্তু লাগল মাত্র কয়েক মুহূর্ত।

হেভি রাইফেলের রিপোর্টে সমস্ত বন-পাহাড় গমগম করে উঠল। বাঘটা আছড়ে পড়ল জলের মধ্যে ঝপাং করে। জল ছিটকে উঠল চারদিকে। নালার দহের পাড়ে একটা ছোট্ট নীল মাছরঙা মরা গাছের ডালে বসে ছিল। গুলির আওয়াজে ও বাঘের গর্জনে অন্য অনেক পাখির সঙ্গে সেও গলা মিলিয়ে ভয়ার্ত গলায় ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল।

বাঘটা জলে পড়েই এক মোচড়ে শরীরটাকে বিদ্যুতের মতো ঘুরিয়ে আবারও আমাকে ধরার জন্যে তেড়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে আমার ও দণ্ডর আর-এক রাউণ্ড গুলি গিয়ে তার বুকে ও মাথায় লেগেছে। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে।

খালি রাইফেল হাতে আমি বাঘটার দিকে চেয়ে রইলাম। সেও চেয়ে রইল। আমার দিকে। তার কষ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে এল। তার দুচোখ লাল হয়ে ধীরে ধীরে বুজে এল। সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। মনে হল আমারই মতো ওরও খুব ঘুম পেয়েছে।

মনটা ভীষণই খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। রাইফেলের ব্যারেলটা একটা পাথরের উপরে রেখে বাট্টা বালিতে পুঁতে বালিরই মধ্যে বসে পড়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে পাইপটা আবার বের করে ধরালাম। দণ্ড পাশে এসে বসল।

আজ দণ্ড না থাকলে আমার অবস্থা এতক্ষণশঙ্কর মতোই হত। কথাটা মনে পড়ে যাওয়ায় ভয়ে আমার গায়ে কাঁপুনি এল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *