বাঘের মাংস (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

বেলা এগারোটা নাগাদ অবধি ঘুমিয়ে উঠেছি। খুব ভোরে উঠেই চলে গেছিল দণ্ড রফিককে সঙ্গে করে নিয়ে। ট্রাকে, কুলিদেরও নিয়ে গেছিল। সুরবাবুকে বলে। আমার ঘুম ভাঙার পর ও জিপ নিয়ে হৈ-হল্লা করতে করতে ফিরে এল। সঙ্গে একটা কুটরা হরিণ। হরিণটাকে দেখিয়ে বলল, তোমাদের কালীঘাটের পাঁঠার মতো ঝোল রাঁধব আজকে। সিম্পিল রান্না। মাংসের ঝোল আর ভাত।

খেয়ে খেয়েই দণ্ড মরবে একদিন, যদিও ওর যা কার্যকলাপ, তাতে বাঘের কামড় খেয়ে মরাটাই অনেক বেশি স্বাভাবিক বা বাঞ্ছনীয় ছিল। দণ্ড বোধহয় কামড় খেয়ে মরার চেয়ে সুস্বাদু সব খাবার জিনিস কামড়ে খেয়ে মরাটা অনেক ভাল বলে সাব্যস্ত করেছে।

ঘর থেকে চেয়ার বের করে রোদে এনে দিল দণ্ড। আমি বসলাম। এখন গরম জামা কাপড় খুলে ফেলেছি। আস্তে আস্তে শরীর গরম হয়ে উঠছে। রাত-শিশিরের ওসে-ভেজা ভারী ধুলো রোদের ওমে গরম হয়ে, পাতাঝরানো রুখুশুখু হাওয়ায় সবে উড়তে আরম্ভ করেছে। বাংলোর হাতার উল্টোদিকের জঙ্গল থেকে বড়কি ধনেশ ডাকছে কুচিলাগাছ থেকে। হ্যাঁক-হ্যাঁক, হ্যাঁক-হ্যাঁক করে। গ্রেটার ইন্ডিয়ান হর্নবিলকে এখানে বড়কি ধনেশ বলে। আর লেসার ইন্ডিয়ান হর্নবিলকে বলে, ছোটকি ধনেশ। হোমিওপ্যাথিতে বিখ্যাত ওষুধ আছে নাক্সভমিকা। এই নাক্সভমিকা ওষুধ তৈরি হয় কুচিলা থেকেই। এই গাছগুলোর পাতার মাঝখানটিতে একটু সাদাটে রঙ থাকে। হাল্কা সাদা। অনেক সময় বড়কি ধনেশরা যখন মগডালে বসে থাকে, তখন তাদের বুকের সাদা আর পাতার সাদায় এমনভাবে মিশে যায় যে পাখিরই বুক না পাতারই মুখ, তা ঠাহর করতে অসুবিধে হয়; বিশেষ করে অন্ধকার পাহাড়তলি অথবা গভীর ছায়াচ্ছন্ন জঙ্গলে।

এই বড়কি ধনেশরা বড্ড আওয়াজ করে। তা তারা যেখানেই থাক না কেন! তাই এদের শিকার করা বেশ সোজা। এদের তেল দিয়ে কবিরাজমশাই এবং হাকিমসাহেবরা বাতের ওষুধ বানান।

ছোটকি ধনেশদের বেশি দেখা যায় ভালিয়া গাছে বসে ফল খেতে। কুচিলার মতো ভালিয়াও একরকমের বন্য গাছ। ওদের ভালিয়া গাছে বসে থাকতেও দেখা যায় বলে ছোটকি ধনেশদের নাম এখানে ভালিয়া-খাই। প্রকাণ্ড বড় বড় বাদামি কাঠবিড়ালিগুলো চিঙ্ক-চিঙ্ক-চিঙ্ক আওয়াজ করতে করতে বড় বড় গাছের এ-ডাল থেকে ও-ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে ডাল ঝাঁকিয়ে শীতের রোদ-পিছলানো চিকন উজল পাতার পথে পথে ঝরনার মতো শব্দ করে ঘূর্ণা হাওয়ায় রোদকণা উড়িয়ে ছড়িয়ে সমস্ত জঙ্গলকে মুখর প্রাণবন্ত করে তুলেছে। অদৃশ্য, কোনও দারুণ-জুয়ারির গায়ক যেন সমস্ত প্রকৃতিকে অসংখ্য বাজনার মতো ভরপুর সুরে বেঁধে নিয়ে গাইছেন :

প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে,
অলস রে, ওরে, জাগো জাগো ॥
শোনো রে চিত্তভবনে অনাদি শঙ্খ বাজিছে–
অলস রে, ওরে জাগো, জাগো ॥

চুপ করে সেই শীতের পাহাড়-জঙ্গলে ফ্যাকাসে মাটির ধূলি-ধূসর সড়কে হাওয়ার অলিগলিতে ঝরাপাতার নাচের দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে তাকিয়ে বসে আছি। দণ্ড, ভীম, দুর্যোধন এবং আরও অনেকের চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই আমার কানে আসছে না। কুচিলা-খাঁইদের ডাক, বাদামি কাঠবিড়ালিদের চিকন চিঙ্কচিঙ্ক, ঝরা-পাতার মচমচানি, সবুজ টুঁই, মসৃণ মৌটুসিদের শিস্ আর হাওয়ার ফিসফিস্ সব মিলেমিশে এমন এক ভিডিও-স্টিরিওর এফেক্ট হচ্ছে আমার অবচেতনে যে তা বুঝিয়ে বলতে পারি এমন কলমের জোর আমার নেই। কোনওকালে হবেও না। জঙ্গলের মধ্যে এলে এই সবই উপরি পাওনা। বোনাস। যদি কখনও বিনা আন্দোলনে এই বোনাস পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করো তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ জঙ্গলে এসে, তাহলে জানবে যে, তোমরা ভাগ্যবান।

বড় চমৎকার এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম। হঠাৎই কানের কাছে দণ্ডধরের ডাকে সেই ঘোর কেটে গেল।

বলল, সে কুটুরা দেইকি আউ কঁড় রাঁধিবু? ঝোল্ ত হউচি। টিকে কষা মাংস ভি হেল্লে মন্দ হইথান্তি না। কহন্তু আইজ্ঞা। কঁড় করিবু?

বিহ্বল ছিলাম অন্য এক দেবদুর্লভ জগতে। চলে এলাম মাংসের ঝোল আর কষা-মাংসের রাজ্যে। দণ্ডধর ডাকুয়াও একরকমের বিহ্বলতা আমার।

যদিও একেবারেই অন্যরকমের।

একটা বড় বাঘ, বাইসনের বাচ্চা ধরেছিল কাল রাতে। ধরে অনেকদূর টেনে নিয়ে গেছে বাইসনদের দলের চোখ এড়াতে, বাইসন-চরুয়া মাঠ পেরিয়ে। খাড়া পাহাড়ের গায়ে একটা গুহার মধ্যে নিয়ে গিয়ে তাকে রেখেছিল। আমি রোদে বসে থাকতে থাকতেই দণ্ডর ইনফরমাররা খবর নিয়ে এল। দণ্ড বলল, নিশ্চয়ই কাল রাতের বাঘটার কাজ।

বললাম, আমার পায়ের যে হাল, তাতে খাড়া পাহাড়ে চড়ার অবস্থা একেবারেই নেই। অন্য কোনও কিল করুক তখনই মাচায় বসা যাবে। নইলে, পরে হাঁকা করার বন্দোবস্ত কোরো।

ও বলল, তা হলে সন্ধেবেলা কী করবে? সন্ধেবেলাও কি বাংলোয় বসে আগুনের পাশে বই পড়বে? বই-ই পড়বে তো কলকাতাতেই পড়তে পারতে! বই পড়ার জন্যে এত কষ্ট করে এতদূর ঠেঙিয়ে আসার দরকারটা কী ছিল?

পায়ের অবস্থাটা দেখলে না?

দেখেছি। শিকারে এলে এমন কত কী হয়! যাবে কি না বলো।

তুমি তো মহা অবুঝ!

আমি অবুঝ? না তুমি? কাল কী খাবে? আজ না হয় কুটরা হল?

খাওয়াই কি সব দণ্ড?

দণ্ডধর হতাশ হয়ে দুহাত দুদিকে কাঁধসমান তুলে ঢেউ খেলিয়ে বলল, আল্লো। মু আউ কঁড় কহিবি! কিচ্ছি কহিবাকু নাই।

অনেক তর্কাতর্কির পর শেষ রফা হল যে, বন্দুকটা নিয়ে এক চক্কর হেঁটে আসব সন্ধের পর। সঙ্গে ফোর-সেভেন্টি ডাবল ব্যারেল রাইফেলটাও নেব। যদি কোনও অভদ্র অসভ্য বড় জানোয়ার ঘাড়ে এসে পড়ে তবে তার গায়ে ঠেকিয়েই দেগে দেব। কালকে ক্যাম্পে সকলের খাওয়ার জন্যে কিছু পট-হান্টিং-এর জন্যেই যাওয়া। ও বলল, যিব্বি আর আসিবি। টিকে বুলি বুলিকি পলাই আসিবি চঞ্চল।

বিকেল হল। জঙ্গলে শীতকালে দ্রুতগতি চিতার মতো বিকেল আসে হরিণীর মতো দুপুরকে তাড়া করে। ক্রমশই তাদের ব্যবধান কমে আসতে থাকে। তারপর হঠাৎই সন্ধে এসে মস্ত হলুদ দিগন্তজোড়া বাঘেরই মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে কালো থাবা চালায় তাদের দুজনেরই উপর। রাত নামে। সব কালো হয়ে আসে।

আমাদের দণ্ডধরের শীতকালীন শিকারের পোশাকের একটু বর্ণনা দেওয়া দরকার। পায়ে একটি ডাকব্যাকের গামবুট। নিম্নাঙ্গে কাছা-কোঁচা গোঁজা। এইমারি কি সেই-মারি ভঙ্গিতে পরা খাটো ধুতি। ঊর্ধ্বাঙ্গে হলুদরঙা হাফশার্ট। তারও উপরে ঘোরতর মারদাঙ্গা লালরঙের একটি আলোয়ান। ওর নুয়াগড়ের বাড়ি ছেড়ে যতদিন জঙ্গলে এসে থাকে দণ্ডধর ততদিন দাড়ি কামায় না। কাঁচা-পাকা, খোঁচা-খোঁচা দাড়ি মুখময়। এবং মিটিমিটি হাসি। হাসির ফাঁকফোকর দিয়ে গুণ্ডি-পানের গন্ধ। এই সন্ধেয় বাঁ কাঁধে লাঠির মতো করে শোয়ানো ফোর-সেভেন্টি ডা ব্যারেল রাইফেলটি। ডান হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ।

রেডি হয়ে এসেই ও বললে, চালুন্ত আইজ্ঞা। চঞ্চল যিবি, চঞ্চল আসিবি। গুলি বাজ্জিবে কী প্রাণ যিব্বে।

কিছুটা গিয়ে ভীমধারার ঝরনা পেরিয়ে বাঁ-দিকে ঢুকে গেলাম আমরা। তখন সবে অন্ধকার হয়েছে। আলো না-জ্বেলে দণ্ড আগে আগে চলেছে। আমার লোকাল গার্ডেন, ফ্রেন্ড অ্যান্ড ফিলসফার। জঙ্গলে কৃষ্ণপক্ষ রাতেও তারাদের আলো থাকে। তবে সে-আলোর সুবিধা পাওয়া যায় শুধু জলের ধারে বা ফাঁকা জায়গাতেই। কৃষ্ণপক্ষের রাতে জঙ্গলের গভীরে একবার ঢুকে পড়লে, তারা তেমন কোনও কাজে আসে না। তবু জানোয়ার-চলা সুঁড়িপথটা দেখা যাচ্ছিল একটু একটু, আবছা। অন্ধকারে, মায়ের খুব কাছে শুয়ে আলোনিবনো ঘরে মায়ের মাথার সিঁথি যেমন দেখতে পাও তোমরা, তেমন।

মিস্টার ডাকুয়া চলেছে তো চলেছেই। আমি ভেবেছিলাম, জলের পাশে কচি ঘাসে বুঝি চিতল হরিণের খোঁজে চলেছে সে। অথবা টুল্বকা গাঁয়ের শেষ সীমানাতে বিবি-ডালের খেতে শম্বরের দলের খোঁজে। দণ্ডধরের পূর্ব-চিহ্নিত কোনও বিশেষ শুয়োরেরও খোঁজেও হয়তো হতে পারে। কিন্তু ব্যাপার-স্যাপার দেখে সেরকম আদৌ মনে হচ্ছে না। অথচ শিকার যাত্রায় বেরিয়ে পড়ার পর দণ্ডধরের গতিবিধি সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করি এমন দুঃসাহস আমার আদৌ ছিল না। অধমের পায়ের অবস্থার কথাও ও বিলক্ষণই জানে। মনের অবস্থা জানে না এমনও নয়। সব জেনেশুনেই ও এমন হেনস্থা করছে আমার। অ্যালগারনন ব্ল্যাকউডের একটা দারুণ বই দিয়েছিল দেবু। সেই বইটা অর্ধেক পড়ে রেখে এসেছি। মনটা আমার এখন সেই মূজ-শিকারির বুকপকেটে গোঁজা আছে। মনে হচ্ছে মিস্টার ডাকুয়ার হাতে পড়ার চেয়ে ডাকাতের হাতে পড়াও অনেক ভাল ছিল।

এখনও টর্চটা একবারও জ্বালায়নি ও। উদ্দেশ্য, গভীর সন্দেহজনক। আমার ডান-পাটা যাতে চিরদিনের মতোই যায়, তারই বন্দোবস্ত পাকা করতে চায় বোধহয়।

হঠাৎই দেখলাম সামনে জঙ্গলটা ফাঁকা হয়ে এল। যেন ভোজবাজিতে। সামনে অনেকখানি সমান ফাঁকা জায়গা। কোনওকালে ক্লিয়ার-ফেলিং হয়েছিল সেগুনের। তারপর জংলি ঘাস জবরদখল নিয়েছে। ফাঁকা জায়গাটার কাছে পৌঁছে দণ্ড মুখে দু আঙুল পুরে শিস্ দিল একবার। ফাঁকা জায়গাটার ওপাশের জঙ্গল থেকে অন্য কেউ শিস দিয়ে উত্তর দিল। তারার আলোয় দেখলাম ও-পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটি প্রায়-উলঙ্গ ছায়ামূর্তি টলতে টলতে আমাদের দিকে আসছে। লোকটা যখন কাছে এল তখন দেখলাম তার পরনে একটি ছেঁড়া গামছা। গায়েও একখানি গামছা। দণ্ড কথা না বলে, তার আলোয়ানের নীচ থেকে একটি থলি বের করে লোকটিকে দিল। বলল, ভাল করে খাস্। পেট ভরে।

লোকটা বলল, হঁ।

কষা মাংস আর রুটি আছে।

হঁ। লোকটা আবার বলল।

তারপর দণ্ড আমাকে কিছুটা পাইপের তামাক দিতে বলল লোকটাকে। দিলাম। খৈনির মতো হাতে ডলে ঠোঁটের নীচে দিয়ে দিল লোকটা সঙ্গে-সঙ্গে।

অন্ধকারেও ওর পাঁজরের হাড় গোনা যাচ্ছিল। দণ্ডধর ওকে জিজ্ঞেস করল ঘড়িংয়ের পায়ের দাগ সে দেখেছে কি না! লোকটা বলল, একটু এগিয়েই একটা নুনি আছে। সেখানে শম্বর, ঘড়িং, গন্ধ, সব নিয়মিত আসে। বাঘও আসে তাদের পেছন-পেছন। নুনির পাশে একটা ঝাঁকড়া শিশুগাছ আছে। তার নীচে বড় বড় পাথর, আর ঝোপঝাড়। তার আড়াল নিয়ে বোসো গিয়ে নির্ঘাত শিকার। কিন্তু সাবধান! বেশি রাত অবধি থেকো না ওখানে ভুল করেও।

কেন? দণ্ডধর শুধোল, কোমরের বটুয়া থেকে আরেকটা গুণ্ডিপান মুখে ফেলে।

ঠাকুরানি আছেন ওখানে।

দণ্ডধর গালাগালি দিয়ে বলল, আফিং খেয়ে খেয়ে আফিংখোর, তোর মগজটা একেবারেই গেছে রে, শিব্ব।

না রে, দণ্ড। আমার কথা শুনিস্। নইলে বিপদ হবে। লোকটা ভয়-পাওয়া গলায় বলল।

দণ্ডধর ডাকুয়াকে বিপদের ভয় দেখাস না। তুই এখন বউয়ের সঙ্গে কুটরার কষা-মাংস আর রুটি খা গিয়ে যা পেট ভরে। সঙ্গে সেগুন-পাতায় পোড়া আমলকীর আচারও আছে।

শিব্ব নামক লোকটি ফিসফিস করে বলল, খাবে নাকি?

দণ্ড যেন খুব অনিচ্ছার সঙ্গেই বলল, দে।

বাড়ি চল তাহলে।

শিব্বর সঙ্গে একটু হেঁটে হেঁটে ওর কুঁড়ের কাছে গেলাম আমরা। এক ঘটি জল এনে ও দণ্ডকে কী যেন খেতে দিল। নাড়ুর মতো দেখতে। কিন্তু কালো। দণ্ড আমাকেও দিল দুটো। বলল, খেয়ে নাও কথা না বলে।

কী? জিনিসটা কী?

প্রসাদ। ঠাকুরানির কাছে যাচ্ছ, শিব্বর কথা শোনো। ভাল ছাড়া খারাপ হবে না কোনও।

নাড়ুদুটো জল দিয়ে বাধ্য ছেলের মতো খেয়ে ফেললাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *