ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(১)
শুক্রবার, মে ১৩, ২০১১
“আজকাল স্যার, আমেরিকায় থাকার কোনও গ্ল্যামার নেই”, সকাল বেলায় কফি খেতে খেতে একেনবাবু তাঁর সুচিন্তিত মতামত পেশ করলেন।
“মানে?” প্রমথ প্রশ্ন করল। “মানে স্যার, আজকাল যদু-মধু সবাই আমেরিকায় থাকে।”
“আপনার আস্পর্ধা তো কম নয়, আপনি আমাকে আর বাপিকে যদু মধুর দলে ফেলছেন! জানেন, বাপি পড়াতে না পারলেও, একজন প্রফেসর, তাও হেঁজিপেঁজি কলেজে নয়–নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে। আর আমিও একজন বিজ্ঞানী, গবেষকও বলতে পারেন।”
“কী যে বলেন স্যার, আপনারা কেন? আমি বলছি এইসব লটারি-তে ইমিগ্রেশন পাওয়া লোকেদের কথা। ম্যানহাটানে একটা ট্যাক্সিতে উঠুন, দেখবেন ফিফটি পার্সেন্ট ড্রাইভার বাংলাদেশী।”
“বাংলাদেশী মানেই যদু-মধু? এদিকে তো তারেক আলীকে দেখলেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হন! তারেক বাংলাদেশী নয়?”
“কী মুশকিল স্যার, আমি লটারিতে আসা বাংলাদেশীদের কথা বলছি।”
“আমি শুনেছি কী বলেছেন, ফিফটি পার্সেন্ট ট্যাক্সি ড্রাইভার বাংলাদেশী… তা, আপনি ট্যাক্সিতে উঠলেন কবে? দূরে কোথাও যেতে হলেই তো গাড়ি করে নিয়ে যাবার জন্যে বাপির খোশামুদি শুরু করেন।”
“শুনছেন স্যার”, একেনবাবু আমাকে সাক্ষী মানলেন। “ট্যাক্সিতে না উঠলে যেন ড্রাইভারের মুখ দেখা যায় না।”
“না, ভালো করে যায় না। আর কী ধরণের ডিটেকটিভ আপনি? শার্লক হোমস হলে বলতেন, বাইরে থেকে যে কয়েকটা ট্যাক্সির ড্রাইভারকে অস্পষ্ট দেখেছি, তাদের কয়েকজন মনে হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার লোক। এক আধটা বাঙালিও তাদের মধ্যে থাকতে পারে।”
সকালে আমাদের ব্রেকফাস্টটা এইরকম আগড়ম-বাগড়ম বকে কাটে। একটা বেফাঁস কথা বলেন একেনবাবু। প্রমথ সেটা নিয়ে তুমুল তর্ক বাধায়। একেনবাবু আমাকে সাক্ষী মানেন। প্রমথ আমাকেও তুলোধোনা করে। এইসব বকবকানির মধ্যেই আমরা নিউ ইয়র্ক টাইমস পড়ি। প্রমথ কয়েক পট কফি বানায়। ছুটির দিনে ডিম, সসেজ, বেকন, ইত্যাদি অনেক কিছু থাকে। কাজের দিনে শ্ৰেফ টোস্ট, ডোনাট বা মাফিন দিয়ে সকালের কফি পর্ব শেষ হয়।
প্রমথ আর একেনবাবুর উচ্চস্বরে তর্কাতর্কি কানে এলেও আমার চোখ আজ অন্যদিকে ছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটা সংক্ষিপ্ত খবর:
হোবোকেনে পরিত্যক্ত কাগজের কারখানার পাশে একটি মৃতদেহ পাওয়া গেছে। মৃতের নাম অশোক দুবে, বয়স বছর তিরিশেক। গায়ে গুলির আঘাত, মনে হচ্ছে হোমিসাইড।
নাম যখন অশোক দুবে, নিশ্চয় ভারতীয়। হোবোকেন অবশ্য নিউ ইয়র্ক শহরে নয়। ম্যানহাটানের পশ্চিম পাশ দিয়ে হাডসন নদী বয়ে গেছে, তার উলটো পারে। এক বন্ধুর বাবা-মা ওখানে থাকতেন বলে হোবোকেনে বার কয়েক গেছি। বছর পঁচিশেক আগে তাঁদের বাড়ির সামনেই একটি ভারতীয় ছেলে নভরোজ মোদি খুন হয়েছিল। খুন করেছিল
‘ডট-বাস্টার’ নামে একটা রেসিস্ট গ্যাং, যাদের কাজ ছিল ভারতীয়দের হেনস্থা করা। ভারতীয় মেয়েরা কপালে টিপ বা ডট দেয় বলে নিজেদের বলত ডট-বাস্টার। নভরোজ হত্যার পর স্থানীয় ভারতীয়দের দলবদ্ধ আন্দোলন আর পত্র-পত্রিকার লেখালেখিতে হোবোকেন পুলিশ অ্যাকশন নিতে বাধ্য হয়। তারপর বহুদিন কোনও ভয়াবহ ঘটনা ঘটেনি। গত বছর আবার এক ভারতীয় খুন হল হোববাকেনের কাছে জার্সি সিটিতে। এবারও খুনি কতগুলো কম-বয়সী সাদাদের গ্যাং। এক বছরের মধ্যে আবার এই মৃত্যু। তাহলে কি সেই ডট বাস্টার পুনর্জন্ম নিল?
অশোক দুবে নামটা চেনা চেনা লাগছিল। প্রমথকে জিজ্ঞেস করলাম, “হ্যাঁরে, অশোক দুবে বলে কাউকে চিনতিস?”
প্রমথ একটু অবাক হয়ে বলল, “হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
“পত্রিকায় দেখছি অশোক দুবে বলে একজন খুন হয়েছে। কে জানে এটাও হেট ক্রাইম কিনা!”
“দেখি।” প্রমথ কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে খবরটা পড়ল। তারপর বলল, “আমারও চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু ঠিক প্লেস করতে পারছি না।”
দুজনেই খানিকক্ষণ ভাবার চেষ্টা করলাম। ইতিমধ্যে পত্রিকাটা একেনবাবুর হাতে চলে গেছে। একেনবাবুকে প্রমথ একটু খোঁচা দিল, “কি মশাই, খুব তো গোয়েন্দাগিরি করেন, চেনেন একে?”
“না, স্যার।”
এমন সময়ে একটা ফোন। ধরলেন একেনবাবু। ইদানীং ওঁর ফোনই সবচেয়ে বেশি আসে, তাই ফোন বাজলে সেটা ধরার প্রথম দায়িত্ব একেনবাবুর। একেনবাবুর ‘হ্যাঁ ম্যাডাম’, ‘ঠিক আছে ম্যাডাম’, ইত্যাদি শুনে বুঝলাম ফোনটা কোন মহিলার।
ফোন শেষ করে এসে বসতেই প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “সাত সকালে এক সুন্দরীর ফোন, ব্যাপারটা কী?”
“সুন্দরী নয় স্যার, বিপাশা মিত্র।”
“বিপাশা মিত্র! মানে সোশ্যালাইট বিপাশা মিত্র?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“তাঁকে বলছেন সুন্দরী নয়, আপনার আস্পর্ধার তো সীমা নেই দেখছি?”
“কী মুশকিল স্যার, তাই বললাম নাকি?”
“তাছাড়া আবার কী বললেন? আমি কি বাংলা বুঝি না, না আপনি বাংলা ভাষা জানেন না?”
“তুই থামবি?” প্রমথকে একটা ধমক লাগিয়ে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “হঠাৎ ফোন করলেন কেন?”
‘গুনি একটা ঝামেলায় পড়েছেন স্যার।”
“সে তো বুঝতেই পারছি, কিন্তু ঝামেলাটা কী?”
“গত সপ্তাহে যে বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে এত হইচই হল, সেটা অদৃশ্য হয়েছে।”
“অদৃশ্য হয়েছে?”
“সেটাই ম্যাডামের মনে হচ্ছে।”
যাঁরা আমেরিকার সোশ্যাল সিন-এর খবর রাখেন না, তাঁরা হয়তো বিপাশা মিত্রকে চিনবেন না। কিন্তু পিপলস ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে ভোগ, গ্ল্যামার, স্টার– হেন পত্রিকা নেই যেখানে বিপাশা মিত্রের ছবি আর খবর নিয়মিত বেরোয় না। চেহারা? ইস্ট আর ওয়েস্টের পারফেক্ট কম্বিনেশন, স্টানিং বিউটি! পৈত্রিক সূত্রে ম্যানহাটানের ইস্ট সাইডে অনেকগুলো বড় বড় বাড়ির মালিক। নিউ ইয়র্কে রিয়েল এস্টেটের এখন যা দাম, তাতে নিঃসন্দেহে বিলিয়নিয়ার।
গতমাসে একটা বিশাল এক্সিবিশন ‘ওয়ার্ল্ড অফ লর্ড বিষ্ণু’-র আয়োজন করেছিল এশিয়া ইনস্টিটুট। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগৃহীত বিষ্ণুর ছবি, মূর্তি, বই, পুঁথি ইত্যাদির প্রদর্শনী। আমরাও গিয়েছিলাম দেখতে। সেখানে কম্বোডিয়া থেকে পাওয়া বারোশো বছরের পুরোনো একটা পাথরের বিষ্ণুমূর্তি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। পারিবারিক সংগ্রহশালা থেকে বিপাশা মিত্র কয়েক দিনের জন্যে ওটা এশিয়া ইনস্টিট্যুটকে ধার দিয়েছিলেন। মূর্তিটা তেমন বড় নয়, কিন্তু সত্যিই খুব সুন্দর। গাঢ় ছাই রঙা গ্র্যানাইট পাথরে তৈরি। গা-টা একেবারে মসৃণ, আর নিখুঁত কারুকাজ। এটা নাকি অ্যাঙ্কোর ভাটের কাছে কোনও একটা ভাঙ্গা মন্দিরে ছিল। মূর্তিটির উৎসস্থল নিয়ে পরে বেশ বিতর্কও হয়েছিল। নিউ ইয়র্কের আর্ট-ক্রিটিক জন হেক্টারের মতে, মূর্তিটা কম্বোডিয়ার নয়, দক্ষিণ ভারতের। আর বারোশো বছরের নয়, বড়জোর আটশো বছরের পুরোনো। জন হেক্টার হেঁজিপেঁজি লোক নন, এককালে দাপুটে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার ছিলেন। তাই ধরে নিতে হয়, ওঁর মতামতটা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। হেক্টারের দাবি ওঁর কাছে এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ আছে। কিন্তু অনেকে সেটা মানেননি। বিশেষ করে এশিয়া ইনস্টিট্যুটের যিনি কিউরেটর, তোশি আকাহাশি। তাঁর সঙ্গে জন হেক্টারের দীর্ঘ পত্ৰযুদ্ধ হয়ে গিয়েছে এই নিয়ে।
“বিপাশা মিত্র আপনার খবর পেলেন কী করে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের কাছ থেকে স্যার।”
ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট নিউ ইয়র্ক পুলিশের বড় কর্তা। বেশ কয়েক বছর আগে ম্যানহাটানের মুনস্টোন মিস্ট্রি নিয়ে পুলিশ যখন হিমশিম খাচ্ছিল, তখন একেনবাবু রহস্যটা উদ্মাটন করেছিলেন। সেই থেকে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট একেনবাবুর গুণমুগ্ধ।
“পত্রিকায় তো এই চুরির খবর বেরোয়নি!”
“নিউজ মিডিয়া বোধহয় এখনো খবরটা পায়নি স্যার। যাইহোক, ওঁর অফিসে একবার যেতে বলেছেন।”
“তার মানে এই সুযোগে আপনি বিপাশার সঙ্গ পাবেন? বউদির পারমিশনটা নিয়ে রাখবেন আগে থেকে। খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে একটা কেচ্ছা হবে।” প্রমথ মন্তব্য করল।
“কী যে বলেন স্যার, ছি ছি, কোথায় বিপাশা মিত্র আর কোথায় আমি। তার ওপর এই তো চেহারা।”
“বিউটি এন্ড বিস্ট বলে একটা কথা আছে, শোনেননি?”
“তুই থামবি,” আমি প্রমথকে আবার ধমক লাগালাম। “কবে যেতে হবে আপনাকে?”
“শুধু আমি কেন স্যার, আমরা সবাই যাব। উনি চান আজ বিকেলেই চারটে নাগাদ আমরা যেন আসি।”
