তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এগার
স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যে জাহাজিবাবু শম্ভুনাথ চৌধুরি কাজিসায়েবের ছদ্মবেশে কর্নেলের জ্যাকেটে ভয়-দেখানো কথা লেখা কাগজের টুকরো এঁটে পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল, যাকে প্রায় দশ বছর ব্যাপী কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দারা খুঁজে হন্যে হয়েছেন, এমনকী কলকাতার লালবাজারের ঘুঘু গোয়েন্দারাও এযাবৎ যার টিকিটিও দেখতে পাননি, সে যেন আজ কর্নেলের কাছে স্বমূর্তিতে ধরা দেওয়ার জন্য তিতলিপুরের জঙ্গলে এসে অপেক্ষা করছিল।
মাঝে মাঝে বহু ঘটনা দেখে আমার মনে হয়েছে, কর্নেলের যেন কিছু অলৌকিক শক্তি আছে। আজ আবার তা বিশ্বাস করার মতো ঘটনা ঘটল। এ কথাটা কর্নেলকে বললেই তার বিখ্যাত অট্টহাসি শুনতে পাব। কাজেই চুপ করে থাকাই উচিত।
হালদারমশাইয়ের কথায় আমার সম্বিৎ ফিরল। তিনি বললেন–এই লোকটা সুশীলার সাহায্যে ক্যাপটেন সিংহের ঘর থেইক্যা দামি জিনিস চুরি করছিল? কী কাণ্ড! আর ডানহাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা ক্যান?
কর্নেল সহাস্যে বললেন–কারও সঙ্গে আবার মল্লযুদ্ধ করেছে।
অবাক গোয়েন্দাপ্রবর বললেন–আবার মানে? আগেও কি
তাকে থামিয়ে কর্নেল বললেন–যথাসময়ে সব শুনবেন। প্রথম মল্লযুদ্ধের ছবিটাও আপনাকে দেখাব। মি. হাটি! আপনি তা হলে জাহাজিবাবুকে নিয়ে যান। ওর পেট থেকে কিছু বেরোয় কি না দেখুন। আমরা ফরেস্ট বাংলোয় গিয়ে একটু বিশ্রাম করে নিই। ফরেস্ট বাংলোয় টেলিফোন আছে তো?
মি. হাটি বললেন–আছে। এই বাংলোটা সেচবাংলোর চেয়ে সুন্দর। মৌরীনদী পেরিয়ে এসেছেন। সেই নদীর ধারেই ফরেস্ট বাংলো। নদীটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দোমোহানি জলাধারে গিয়ে মিশেছে। আচ্ছা, চলি কর্নেলসায়েব। সময়মতো দেখা করব।
কর্নেল বললেন–জাস্ট আ মিনিট মি. হাটি! একটা কথা আছে।
দুজনে একটু তফাতে গিয়ে চুপিচুপি কী কথা বললেন। এদিকে জাহাজিবাবুর কোমরে এবং দুই দড়ি বেঁধে কনস্টেবলরা ততক্ষণে জিপের পিছনের দিকে ঢুকিয়েছে।
পুলিশের জিপ চলে যাওয়ার পর কর্নেল বললেন-ফরেস্ট বাংলোয় যাওয়ার আগে একটা কাজ সেরে নেওয়া যাক হালদারমশাই! আপনি জুতোর ছাপ দেখে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই ছাপগুলো কোথায় প্রথমে আপনার চোখে পড়েছিল, একবার দেখে নিতে চাই।
হালদারমশাই রাস্তা থেকে ডাইনে জঙ্গলের দিকে কয়েক পা এগিয়ে কর্নেলকে সেই ছাপ দেখালেন। কর্নেল হাঁটু মুড়ে বসে আতশ কাচ দিয়ে কিছু দেখার পর পাশের একটা ঘন ঝোপের কাছে গেলেন। বললেন-হালদারমশাই! শম্ভুনাথ চৌধুরি সম্ভবত এখানে কিছু খুঁজতে এসেছিল। মাই গুডনেস! লক্ষ্য করছেন কি, ঝোপের ওপর রক্তের ছাপ এখনও স্পষ্ট। শিশিরে কিছুটা ধুয়ে দিলেও ছাপগুলো রয়ে গেছে!
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন-লোকটার হাতে ব্যান্ডেজ দেখলাম! কর্নেল স্যার! আর হাতে কেউ .. গুলি করছে! তাই না?
-ঠিক ধরেছেন। গুলি খেয়ে পালিয়ে গিয়ে জাহাজবাবু কোথাও ব্যান্ডেজ বেঁধে নিয়েছে। চেনা কোনও ডাক্তারের কাছে গিয়ে থাকবে। কিন্তু আজ এখানে কী খুঁজতে এসেছিল সে?
কর্নেলের কথা শুনে হালদারমশাই জায়গাটা খুঁজতে শুরু করলেন। গাড়িতে হেলান দিয়ে দুই গোয়েন্দার কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছিল, অন্য কেউ দেখতে অবাক হয়ে ভাবত, দুই পাগল এখানে এসে জুটল কোথা থেকে?
কিছুক্ষণ পরে গোয়েন্দাপ্রবর ঘন ঘাসের ভিতর থেকে কী একটা জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন-পাইছি! কর্নেল স্যার! পাইছি!
তিনি কর্নেলের কাছে গিয়ে জিনিসটা দেখালেন। এবার দেখতে পেলাম, ওটা একটা ফায়ার, আর্মস। কর্নেল ওটা পরীক্ষা করে দেখে বললেন-সিরাউন্ডার রিভলবার! হুঁ, বিদেশি অস্ত্র। পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবার। জাহাজিবাবুর হাতে কেউ গুলি করার সময় এটা ছিটকে পড়েছিল। সে আজ খুঁজতে এসেছিল অস্ত্রটা। পুলিশের গাড়ি থেকে জঙ্গলের আড়ালে ওত পেতে বসেছিল। তারপর আমরা এসে গেলাম এবং আপনি জুতোর ছাপ আবিষ্কার করে এগিয়ে গেলেন। পুরো ঘটনাটা অঙ্কের মতো কষে ফেলা যায়।
-হঃ! বলে উল্লসিত প্রাইভেট ডিটেকটিভ লম্বা পায়ে গাড়ির কাছে এলেন। একটিপ নস্যি নিয়ে খিক খিক করে হাসলেন। -জয়ন্তবাবু কিছু বোঝলেন?
আমিও বললাম-হঃ!…
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কর্নেলের নির্দেশমতো এগিয়ে ডানদিকে একটা মোরাম বিছানো সংকীর্ণ রাস্তায় চললাম। চন্দ্রপুরগামী পিচরাস্তা বাঁদিকে এগিয়েছে। আমরা এবার ঘন জঙ্গলের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। দুধারে ল্যাম্পপোস্ট এবং টেলিফোনের তার দেখা যাচ্ছিল। মিনিট সাতেক পরে সেই নদীর ওপর ছোটো ব্রিজ দেখা গেল। ব্রিজে উঠতে যাচ্ছি, হঠাৎ কর্নেল বললেন-জাস্ট আ মিনিট জয়ন্ত! একটু থামো।
কর্নেল নেমে গাড়ির পিছনদিকে রাস্তার ডানদিকে উঁচু একটা গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপরই দ্রুত এসে গাড়িতে উঠে বললেন–চলল! জিজ্ঞেস করলাম–কী দেখতে গিয়েছিলেন?
-অর্কিড।
এখানে অর্কিড? এটা তো পাহাড়ি এলাকা নয়।
জয়ন্ত! পরগাছা বললে তুমি বুঝবে। আসলে অর্কিড দুরকম হয়। ভূমিজীবী আর পরজীবী। পরজীবী অর্কিডকেই আমরা পরগাছা বলি!
পিছনে হালদারমশাই মন্তব্য করলেন-কর্নেলস্যারের লগে-লগে ঘুরলে নলেজ বাড়ে।
ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে সুদৃশ্য ফরেস্ট বাংলো চোখে পড়ল। একটা উঁচু জায়গার ওপর রঙিন ছবির মতো বাংলার পিছনের অংশ দোতলা। সামনে খোলা ছাদে বসে রাত্রিকালে অরণ্যের সৌন্দর্য দেখা যাবে।
হালদারমশাই বললেন–এ জঙ্গলে বাঘ-ভালুক নিশ্চয় আছে। হাতিও থাকতে পারে। তাই না কর্নেলস্যার!
কর্নেল বললেন–বাঘ, ভালুক, হাতি যদি না-ও থাকে, ভূতপ্রেত অবশ্যই আছে।
আমরা দুজনে হেসে ফেললাম। একটুখানি চড়াইয়ের উঠে বাংলোর গেট। গেটের সামনে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট পরা এক সুদর্শন আমার বয়সি যুবক দাঁড়িয়ে ছিলেন। করজোড়ে নমস্কার করে তিনি সহাস্যে বললেন–আমি এই ফরেস্টের রেঞ্জার সৌম্য চক্রবর্তী! কর্নেলসায়েব! আমি ভাবিনি চর্মচক্ষে আপনাকে দেখতে পাব। ভিতরে গাড়ি রাখার গ্যারাজ আছে। প্লিজ! ভিতরে আসুন। …
আমাদের জন্য দোতলার প্রশস্ত ঘরটি খালি রাখা হয়েছিল। সৌম্যবাবুর কথা শুনে বুঝতে পেরেছিলাম চন্দ্রপুর থানার ওসি রাজেন্দ্র হাটিই এ ব্যবস্থা করেছিলেন। এখানে মাঝে মাঝে পর্যটক আসে। দল বেঁধে কিংবা একা। তবে শীতের সময় খুব কম লোকই বেড়াতে আসে। গত শরতে সব ঘর নাকি ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। এটা ফরেস্ট বাংলো হলেও পর্যটন দফতরের সুপারিশে পর্যটকদের থাকতে দেওয়া হয়। নদীর দুধারে ঘন জঙ্গল শরৎকালে সবুজ হয়ে ওঠে। নদীর ধারে পিকনিক করারও অনুমতি দেওয়া হয়। তা ছাড়া শখের অ্যাডভেঞ্চারের জন্য মোগল ফৌজদার জাহান খাঁর কেল্লাবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আছে। প্রায় ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে কেল্লাবাড়ি ছিল। পূর্বপ্রান্তে দোমোহানির কাছে এখনও কিছু অংশ অটুট আছে, তা আমার দেখা হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপ বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে আছে। হালদারমশাই বাঘ-ভালুকের খবর জানতে উদগ্রীব ছিলেন।
সৌম্যবাবু বললেন–ভালুক না থাকলেও বাঘ আছে। একদল হরিণ এনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বুনো শুয়োর, হনুমানের পাল, শেয়াল, সাপ এসব প্রাণীর নির্ভয় আশ্রয় এই জঙ্গল।
কফি পানের পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে খোলা ছাদে গেলেন। তারপর বাইনোকুলারে চারদিক দেখতে থাকলেন। হালদারমশাই নস্যি নিয়ে বারান্দায় বসলেন। আমি বিছানায় চিৎপাত হলাম।
শীতের দিনের আয়ু কম। বেলা দেড়টার মধ্যে নিচের তলায় ডাইনিংরুমে খাওয়াদাওয়ার পর খোলা ছাদের ওপর চেয়ারে বসে রোদের আরাম নিচ্ছিলাম এবং কর্নেল চুরুট ধরিয়ে চোখ বুজে যেন ঝিমোচ্ছিলেন, এমন সময় একজন পরিচালক এসে খবর দিল, কর্নেলসায়েবের টেলিফোন আছে।
কর্নেল তখনই চলে গেলেন। তারপর হালদারমশাই বললেন–যত ভাবছি, তত জট পাকাইয়া যায়। আচ্ছা জয়ন্তবাবু, আপনি কী কন, শুনি!
বললাম–কী ব্যাপারে?
গোয়েন্দাপ্রবর চাপা স্বরে বললেন-কর্নেল কইলেন জাহাজিবাবু ডানহাতে হরিবাবু গুলি করছে। এদিকে সুশীলা ট্যাক্সিতে বইয়া ছিল। তার মাথার পিছনে গুলি লাগল কেমনে? জাহাজিবাবু অরে গুলি করার জন্য রিভলবার তাক করছিল এবং গুলিও হয় তো করছিল। তারপর হরিবাবু অর হাতে গুলি করল। এখন কথা হইল গিয়া সুশীলাকে প্রায় পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি করছে কেউ। নাঃ! অঙ্ক মিলছে না।
এমন যদি হয়, সুশীলা কোনও কারণে গাড়ি থেকে নেমে সেই ঝোপটার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল?
সুশীলা নামবে ক্যান? ক্যাপটেন সিংহরে কি অন্য গাড়িতে লইয়া গেছে হরিবাবু?
–হালদারমশাই! কলকাতায় একটা লাল মারুতি কয়েকবার আমার গাড়িকে ফলো করে বেড়াচ্ছিল। এমনকি গতকাল সকালে হাই ঝোপটার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল?
–সুশীলা নামবে ক্যান? ক্যাপটেন সিংহরে কি অন্য গাড়িতে লইয়া গেছে হরিবাবু?
–হালদারমশাই! কলকাতায় একটা লাল মারুতি কয়েকবার আমার গাড়িকে ফলো করে বেড়াচ্ছিল। এমনকী গতকাল সকালে হাইওয়েতে তিতলিপুরের মোড় পর্যন্ত ফলো করেছিল।
হালদারমশাই নড়ে বসলেন। –তাহলে অঙ্ক ঠিক। হরিবাবুর একটা লাল মারুতি থাকতেই পারে। কোনও কারণে সেই গাড়ির বদলে ট্যাক্সি ভাড়া করছিলেন হরিবাবু। মারুতির ডাইভারেরে হরিবাবু ট্যাক্সিটারে ফলো করতে কইছিলেন। কিন্তু মারুতি বদলে ট্যাক্সি লইলেন ক্যান?
এরপর প্রাইভেট ডিটেকটিভ আরও কিছুক্ষণ অঙ্ক কষতে থাকলেন বা তার থিয়োরি দাঁড় করাতে মগ্ন হলেন। ততক্ষণে রোদের আরামে আমার চোখে ভাত-ঘুমের টান এসে গেছে।
কর্নেলের আবির্ভাবে ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল। কর্নেল নিশ্চয়ই হালদারমশাইয়ের জল্পনা শুনতে পেয়েছিলেন। সকৌতুকে বলে উঠলেন-হালদারমশাই ট্যাক্সির পিছনে একটা লাল মারুতি এনে দাঁড় করিয়েছেন। বাঃ, এটা মন্দ না। জয়ন্তের কী মত হালদারমশাই?
বললাম–আমার কোনও মত নেই। হালদারমশাইয়ের থিয়োরি ওটা।
-হালদারমশাই! ও সি রাজেন্দ্রবাবুর কথাটা খেয়াল করে শোনেননি মনে হচ্ছে!
গোয়েন্দাপ্রবর উত্তেজিতভাবে বললেন–কী কথা?
–চন্দ্রপুর থেকে ব্রেকভ্যান এনে ট্যাক্সিটা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার সহজ মানে, ট্যাক্সিটি ওইখানে পৌঁছে বিগড়ে গিয়েছিল। ড্রাইভার তাকে চালু করতে পারেনি।
আমি ও হালদারমশাই এক গলায় বলে উঠলাম–তাই তো!
কর্নেল চেয়ারে বসে বললেন–ততক্ষণে ক্যাপটেন সিংহের জ্ঞান ফেরার কথা। ট্যাক্সি চালু করা গেল না দেখে হরিবাবু, সুশীলা আর ভগত গাড়ি থেকে নেমেছিল। ক্যাপটেন সিংহকেও নামানো হয়েছিল। ওই অবস্থায় এটাই স্বাভাবিক।
হালদারমশাই বললেন–সুশীলা যদি সেই বোপটার কাছে জঙ্গলের দিকে পিছন ফিরিয়্যা খাড়াইয়া থাকে, তা হইলে জাহাজিবাবুর গুলি প্রায় পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জে তার মাথার পিছনে লাগবার কথা। কী কন?
–আপনার থিয়োরি ঠিক। এবার দরকার অন্য একটা গাড়ি। বিগড়ে যাওয়া ট্যাক্সির কাছে বেশিক্ষণ তো দাঁড়ানো ঠিক হত না। কারণ হরিবাবু ক্যাপটেন সিংহকে জোর করে কোথায় ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কিডন্যাপের ব্যাপার।
কথাগুলো কর্নেল কৌতুকের ভঙ্গিতে বলছিলেন। হালদারমশাই কিন্তু গম্ভীর মুখে শুনছিলেন। এবার উৎসাহে বললেন–ঠিক। ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার! এইজন্যই আমি জয়ন্তবাবুরে কইছিলাম, এর পর দরকার একখান গাড়ি।
একটু হেসে বললাম–গাড়িটা অবশ্যই লাল মারুতি।
কর্নেল সায় দিলেন। -হুঁ। লাল টুকটুকে মারুতি।
গোয়েন্দাপ্রবর দ্বিগুণ উৎসাহে বললেন–জাহাজিবাবু অ্যাটাক করছিল। সুশীলা মরল। হরিবাবুর পালটা গুলিতে জাহাজবাবুর হাত জখম হইল। রিভলভার ঘাসে গিয়া পড়ল। তখন সে পলাইয়া গেল। এখন কথা হইল গিয়া জাহাজবাবুর এই এলাকায় দলবল থাকতে পারে। কী কন?
–শুনেছি আছে।
–সেইজন্য হরিবাবুদের ওখান থেইক্যা তখনই পলাইয়া যাওনের কথা। হঃ! আর একখান গাড়ি না পাইলে হরিবাবুরা পলাইবে ক্যামনে?
এসব কচকচি বা জল্পনা-কল্পনা আর আমার ভালো লাগছিল না। বললাম–ওসব কথা থাক
কর্নেল। কে ফোন করেছিল জানতে ইচ্ছে করছে।
কর্নেল বললেন–চন্দ্রপুর থাকা থেকে ও. সি. রাজেন্দ্র হাটি আমাকে যেতে বললেন। জাহাজিবাবুকে জেরা করে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। সে নাকি তিতলিপুরে সুনয়নী দেবীর খোঁজখবর নিতে যাচ্ছিল। রাস্তায় যানবাহন পায়নি। হঠাৎ ওই ট্যাক্সিটা এসে তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ট্যাক্সিরই কোনও লোক তার দিকে গুলি ছোঁড়ে। সে ভয় পেয়ে জঙ্গলের ভিতর পালিয়ে যায়। আর-সুশীলা নামে কোনও মেয়েকে সে চেনে না। কোনও মেয়েকে সে ট্যাক্সিতে দেখেনি। তার মৃতদেহও দেখেনি।
বললাম–তা হলে কখন বেরোবেন? চন্দ্রপুর থেকে রাত্রিবেলা জঙ্গলের পথে ফিরে আসতে হবে। এখনই বেরিয়ে পড়া উচিত।
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন-জয়ন্তবাবুর চিন্তার কারণ নাই। থানা থেইক্যা পুলিশফোর্স আমাগো এসকর্ট কইর্যা আনব।
কর্নেল বললেন–মি. হাটিকে বলেছি, আপনারা জাহাজিবাবুকে জেরা চালিয়ে যান। আজ আমি থানায় যাচ্ছি না। ফরেস্ট বাংলোর দিকে আসবার সময় একটা গাছের ডালে আশ্চর্য প্রজাতির একটা অর্কিড দেখেছি। পায়ে হেঁটেই সেখানে যাব। জয়ন্ত ইচ্ছে করলে ভাতঘুম দিয়ে নিতে পারে।
বললাম–আর ভাতঘুম আসবে না। আপনার সঙ্গে অর্কিড দেখতে যাব।
গোয়েন্দাপ্রবর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–আমিও যামু! কর্নেলস্যার! গাছের ফাঁকে দেখছিলাম, একখান উঁচু দেউড়ি এখনও খাড়াইয়া আছে। দেখতে ইচ্ছা করে। …
সেজেগুজেই বেরুতে হল। কারণ এখানে শীতের প্রকোপ যেন দোমোহানি এলাকার চেয়ে বেশি। অবশ্য এমনও হতে পারে, এই কয়েকদিনে শীতের দাপট বেড়েছে। দোমোহানি সেচবাংলোয় থাকলে হয়তো শীতের কামড়ে জব্দ হয়ে যেতাম। কারণ ওখানে বিস্তীর্ণ একটা জলাধার আছে।
ব্রিজ পেরিয়ে মোরামবিছানো রাস্তায় আমরা হেঁটে যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল সেই গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। গাছটা বিশাল এবং গুঁড়ি থেকে শাখাপ্রশাখা পর্যন্ত মোটা লতা তাকে জড়িয়ে ধরেছে। লতাটার পাতা চওড়া। গুঁড়িকে ঢেকে ফেলেছে।
বিকেলের জঙ্গলে ছায়া ঘন হয়ে আছে। আমি অর্কিডটা খুঁজছিলাম। হালদারমশাই এদিকে-ওদিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সম্ভবত জাহাজিবাবুর সাঙ্গোপাঙ্গদের খুঁজছিলেন। তার ডান হাত প্যান্টের পকেটে। অর্থাৎ তিনি তার ফায়ার আর্মসের বাঁটে হাত রেখেছেন। কিন্তু কেউ ঝোপঝাড় বা গাছের আড়াল থেকে গুলি ছুঁড়লে তিনি কী করবেন?
কথাটা ভেবে আমার শরীরে মুহূর্তে আতঙ্কের শিহরন জাগল। এদিকে কর্নেল রাস্তা থেকে নেমে পিঠের কিটব্যাগের চেন টেনে একটা ছোটো কাটারি বের করলেন। ওটা একটা জাঙ্গল-নাইফ-যা তার সামরিক জীবনের একটা স্মারক বলে তিনি গর্ব করেন। কাটারির গড়ন কতকটা ভোজালির মতো। সেটা দিয়ে তিনি গুঁড়িতে জড়িয়ে থাকা লতা-পাতা ছাঁটতে শুরু করলেন।
এবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম–কোথায় আপনার অর্কিড? লতাপাতার ভিতরে লুকিয়ে আছে নাকি?
কর্নেল জবাব দিলেন। না গুঁড়ির পিছনে জঙ্গলের দিকে মাটি পর্যন্ত লতাপাতার খানিকটা অংশ হেঁটে ফেলে আপন মনে বললেন-। যা ভেবেছিলাম, ঠিক তা-ই।
হালদারমশাই কাছে গিয়ে বললেন–কী কর্নেলস্যার?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন–বিদ্যুতের তার।
-অ্যাঁ?
-আসার সময় বাইনোকুলারে ব্যাপারটা চোখে পড়ছিল। বলে কর্নেল রাস্তায় উঠে। এলেন। -ওই দেখুন! এই গাছটার উপরের ডালপালা ঘেঁটে বিদ্যুতের চারটে লাইন গেছে ফরেস্ট বাংলোর দিকে। ওই তারগুলো যাতে গাছের কোনও অংশের সঙ্গে ছোঁয়া না লাগে, তাই গাছটার অনেকটা অংশ কেটে রাখা হয়েছে। বাতাসে বা ঝড়ের সময় দৈবাৎ গাছটার কোনও অংশের সঙ্গে ছোঁয়া লাগলেই ট্রান্সফর্মার জ্বলে যাবে। কারণ সজীব উদ্ভিদ বিদ্যুৎ পরিবাহী। এবার লক্ষ্য করুন। দুটো লাইন অর্থাৎ নেগেটিভ-পজিটিভের সঙ্গে নন-কন্ডাক্টিভ রবারে মোড়া একটা তার জোড়া আছে। সেই তার গাছের লতাপাতার আড়াল দিয়ে মাটিতে এসে ঢুকেছে।
গোয়েন্দাবর গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে বললেন-কী কাণ্ড! মাটির তলা দিয়্যা ইলেকট্রিক লাইন চুরি করছে কেউ। কর্নেলস্যার! জঙ্গলের মধ্যে তাহলে কোনও ঘরে বিদ্যুৎ লইয়া গেছে।
আমি বললাম-হয়তো ফরেস্টগার্ডদের কোনও গোপন ঘাঁটি আছে জঙ্গলে। কাঠচোরদের জন্য গার্ডরা সেখানে পাহারা দেয়।
কর্নেল বললেন-জঙ্গলে এমন পাহারার ব্যবস্থা থাকতেই পারে। কিন্তু সে-খবর রেঞ্জার সৌম্যবাবু ছাড়া বাংলোর কেউ সম্ভবত জানে না। সৌম্যবাবু তো দুপুরে জিপ নিয়ে চন্দ্রপুরে তাঁর অফিসে চলে গেছেন।
হালদারমশাই বললেন-কর্নেল স্যার! ফরেস্টগার্ডদের ঘাঁটি খোঁজার দরকার কী?
দরকার আছে। কিন্তু ঘন জঙ্গলে সেই ঘাঁটিটা কোথায়, তা খুঁজে বের করা কঠিন। বোদ কমে আসছে।
–তা হইলে আমরা মাটি খুঁড়িয়া তারটারে ফলো করি?
কর্নেল হেসে উঠলেন। -কাজটা অন্তত হাফডজন মজুরের। কোদাল দরকার। বলে তিনি রাস্তার উত্তরদিকে–যেদিক থেকে আমরা ফরেস্ট বাংলোতে এসেছিলাম, সেই দিকটা দেখতে থাকলেন। বললেন–উত্তর থেকে বাতাস বইছে। কী একটা শব্দ শুনলাম যেন। থানা থেকে মি. হাটি জিপে চেপে আসছেন নাকি?
তারপরই তিনি চাপাস্বরে বলে উঠলেন ফের-মাই গড! লাল মারুতি!
হালদারমশাই ও আমি এক গলায় বললাম–কই? কই?
-বাঁদিকে জঙ্গলে ঢুকে গেল। জয়ন্ত! হালদারমশাই! রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে আমাদের নামতে হবে। ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে এগোব। কুইক! বলে কর্নেল রাস্তা থেকে নেমে জঙ্গলে ঢুকলেন। আমরা তাকে অনুসরণ করলাম।
