তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ 

কফি খেতে খেতে কর্নেলের সঙ্গে দীপনারায়ণবাবুর মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করছিলাম। কর্নেলের মতে, মিশরীয় তক্তিটার জন্য উনি খুন হননি। তক্তিটা হাতাতে চাইলে জাহাজিবাবু সেদিনই খুন করে ওটা পেয়ে যেত, যেদিন সকালে ওঁরা দুজনে ধস্তাধস্তি করছিলেন। রাস্তা ছিল জনহীন। তাছড়া সুনয়নী বলেছেন, তাঁর বড়দার অনেক শত্রু আছে।

 

বললাম–কিন্তু পেতলের নলটা জাহাজিবাবু প্রায় এক বছর কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে পুঁতে রেখেছিল কেন, বোঝা যাচ্ছে না।

 

কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বললেন-এর একশো একটা কারণ থাকতে পারে। হয়তো খদ্দের পাচ্ছিল না। কিংবা খদ্দের আসতে কোনও কারণে দেরি করছিল। এইসব প্রাচীন পার্চমেন্ট বা চামড়ায় লেখা কিউনিফর্ম লিপির একটা নিদর্শনের দাম কোটি কোটি টাকা। আমেরিকার মতো ধনী দেশের কোটিপতিরাই এসব জিনিস নানা দেশ থেকে কিনে নিয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত জাদুঘরে রাখে। মার্কিন ধনীদের এই বাতিকটা আমি দেখেছি।

 

এই সময় ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী!

 

একটু পরে সবেগে প্রবেশ করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার। তিনি ধপাস করে সোফায় বসে আগে এক টিপ নস্যি নিলেন। তারপর নোংরা রুমালে নাক মুখে বললেন-হেভি মিস্ট্রি কর্নেলস্যার! জব্বর একখানা ক্যাস পাইছি।

 

কর্নেল বললেন–বলুন। শোনা যাক কেমন কেস।

 

গোয়েন্দাপ্রবর চাপা স্বরে বললেন-আমার মক্কেলের পুরা নাম ক্যাপটেন সৌমেন্দ্রনাথ সিংহ। উনি ক্যাপটেন এস. এন. সিংহ নামে পরিচিত। সাউদার্ন অ্যাভিনিউয়ে ওনার দোতলা পৈতৃক বাড়ি। ওপরে তিনখান ঘরে নিজের জন্য রাখছেন। নিচের তিনখান ঘর ভাড়া দিছেন। সেখানে তিনখান ঘরে মুদির দোকান, স্টেশনারি স্টোর্স আর মিষ্টির দোকান। ওনার বাড়ি এখনও দেখি না। যা শুনছি, কইলাম।

 

–কিন্তু কেসটা কী?

 

-ভদ্রলোক প্রাইভেট জাহাজ কোম্পানিতে ক্যাপটেন ছিলেন। নয় বৎসর আগে রিটায়ার করছেন। তো গত সপ্তাহে হঠাৎ ওনার সন্দেহ হইছিল, উনি যেখানে যান, ওনারে একজন লোক একটু দূর থেইক্যা ফলো করে। ওনার গাড়ি ছিল। বেইচ্যা দিছেন। তো যে তারে ফলো করে, তারে চিইন্যা রাখছেন। তাড়া করলে লোকটা পলাইয়া যায়। কিন্তু তারপর আবার ওনারে ফলো করে। উনি থানায় গিছলেন। পুলিশ কইছিল, মাইনষে বুড়া হইলে চক্ষে ভুল দ্যাখে। অরা ক্যাস লয় নাই। হাসহাসি করছিল। তো আপনি জানেন কর্নেলস্যার আমি মাসে একখান-দুইখান বিজ্ঞাপন দিই। হালদার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন দেইখ্যা উনি আইজ আমার অফিসে গেছিলেন। কইলেন, ফোনে কিছু জানাই নাই। ক্যান কী, ফোন ট্যাপ করতে পারে কেউ।

 

আমি চমকে উঠেছিলাম। চন্দ্রপুরের শম্ভু চৌধুরিও জাহাজে চাকরি করত। আর হালদারমশাইয়ের মক্কেলও জাহাজের ক্যাপটেন ছিলেন। কর্নেল আমার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন–জয়ন্ত! চুপচাপ শোনো।

 

বললাম–শুনছি তো।

 

-না। তোমার মুখের লেখা পড়ে টের পাচ্ছি, তুমি হালদারমশাইকে ডিসটার্ব করতে চাও। প্রাইভেট ডিটেকটিভ খিখি করে হেসে বললেন-জয়ন্তবাবু তার নিউজপেপারের জন্য একখান স্টোরির আশা করতেই পারেন। কিন্তু এখন না।

 

কর্নেল বললেন–এই আপনার কেস?

 

-হ্যাঁ কর্নেল স্যার! তবে আমার অফিসে আসবার সময় ক্যাপটেন সিংহ ট্যাক্সি ধরছিলেন। কইলেন, অনেক অলিগলি দিয়া আসছেন। কেউ তারে ফলো করে নাই। কিংবা করছিল। কিন্তু কইলকাতার রাস্তায় কারেও গাড়ি লইয়া ফলো করা কঠিন।

 

কিন্তু কেউ ক্যাপটেন সিংহকে কেন ফলো করবে? তার পিছনে নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। আপনি ওঁকে জিজ্ঞেস করেননি?

 

-হঃ! করছি। উনি কইলেন, কিছু বুঝতে পারেন না। আর কইলেন, লোকটা হয়তো অনেকদিন ওনারে ফলো করছে। উনি লইক্ষ্য করেন নাই। কে ওনারে ফলো করছে আর তার উদ্দেশ্য কী, আমারে তা যেভাবে হোক, জানতে হবে।

 

-ক্যাপটেন সিংহের সন্দেহ তার ফোন কেউ ট্যাপ করেছে। কাজেই ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে না। এখন সাড়ে সাতটা বাজে। শীতকাল বলে বেশি রাত্রি মনে হবে। আমি বলি কী, আপনি এখনই ক্যাপটেন সিংহের বাড়ি চলে যান। ওঁর বাড়িতে কে থাকে, ওঁর ঘরের বিশেষ কোনও জিনিসপত্র যদি চোখে পড়ে, এইসব জেনে নিন। তারপর কাল সকাল ন-টার মধ্যে এসে আমাকে জানাবেন। জাহাজের ক্যাপটেন কত-কত দেশ ঘুরে বেড়ান। তার অভিজ্ঞতাও বিচিত্র নয়।

 

ষষ্ঠী হালদারমশাইয়ের জন্য বেশি দুধ মেশানোস্পেশাল কফি আনল। গোয়েন্দাপ্রবর কফির পেয়ালা তুলে ফুঁ দিয়ে কফি পান করতে থাকলেন। লক্ষ্য করলাম, উত্তেজনায় ওঁর গোঁফের দুই ডগা মাঝেমাঝে তিরতির করে কেঁপে উঠছে।

 

কফি শিগগির শেষ করে তিনি বললেন–লোকটারে যে অন্য কেউ ক্যাপটেন সিংহের পিছনে ফলো করতে কইছে, এমনও হইতে পারে।

 

কর্নেল বললেন–এটা কি আপনার ধারণা, নাকি ক্যাপটেন সিংহ আপনাকে এ কথা বলেছেন?

 

উনি কইছিলেন। যে লোকটা ওনারে ফলো করে, তার চেহারা সাধারণ লোকের মতো। রোগা। পরনে যেমন-তেমন পোশাক। তবে কখনও প্যান্ট-সোয়েটার পরে। কখনও ধুতি-পাঞ্জাবির ওপর চাদর থাকে। কখনও পাজামা-পাঞ্জাবি-জহরকোট আর মাথায় টুপি। কিন্তু একই লোক।

 

-ক্যাপটেন সিংহ আপনাকে কী করতে বলেছেন?

 

-লোকটা কে, তার নাম-ঠিকানা খুইজ্যা বার করতে হইব। ক্যান যে ওনারে ফলো করে তা-ও যেভাবে হোক, তার কাছ থেইক্যা আদায় করতে হইব। তার পিছনে যে আছে, তারও নাম-ঠিকানা ওনার চাই। হেভি কেস!

 

কর্নেল হাসলেন। এবং আপনি বলছিলেন হেভি মিস্ট্রি! তা কত টাকার কন্ট্রাক্ট হয়েছে এই কাজে?

 

-হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন–মক্কেল নিজেই পাঁচহাজার টাকা দেবেন। অ্যাডভান্স পাঁচশো। কন্ট্রাক্ট পেপারে সই করছেন। যে ফলো করে, তারে আমি কাইলই ধরুম।

 

–তাড়াহুড়ো করবেন না হালদারমশাই! রাস্তায় যেন গণ্ডগোল বাধাবেন না। আমার মনে হচ্ছে, কেউ ক্যাপটেন সিংহের গতিবিধির ওপর কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে নজর রেখেছে।

 

ঘড়ি দেখে গোয়েন্দাপ্রবর যাই গিয়া বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন। …

 

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন–জয়ন্ত! এবার বলো তুমি কী বলার জন্য উশখুশ করছিলেন।

 

বললাম–চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবু আর হালদারমশাইয়ের মক্কেল ক্যাপটেন সিংহ–এই দুজনের মধ্যে জাহাজের ব্যাপারে সম্পর্ক আছে। দুজনেই জাহাজে নানা দেশে ঘুরেছেন।

 

–হ্যাঁ চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবু শম্ভুনাথ চৌধুরি যে বহুমূল্য প্রত্নসম্পদ হাতিয়ে কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছিল, তার প্রমাণ আমাদের হাতে এসে গেছে।

 

-আচ্ছা কর্নেল, ওই ব্রোঞ্জের তক্তিটাও তো একটা বহুমূল্য প্রত্নসম্পদ। কিন্তু ওটা দীপনারায়ণবাবু পেলেন কোথায়? আমার অনুমান, শম্ভু চৌধুরিই ওটা দীপনারায়ণবাবুকে কোনও কারণে লুকিয়ে রাখতে দিয়েছিল। রাস্তায় হাতাহাতি সম্ভবত ওই নিয়েই।

 

–অনুমান নিছক থিয়োরি। যতক্ষণ না তার প্রমাণ পাচ্ছি, তা নিয়ে জল্পনা নিরর্থক।

 

বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ব্যাগ থেকে একটা গাবদাগোবদা পুরোনো বই নিয়ে এলেন। বইটার পাতা ওলটাতে ওলটাতে তিনি বললেন–বইটা বিভিন্ন দেশে লিপির উদ্ভব এবং বিকাশের ইতিহাস। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, প্রাচীন মিশরীয় তক্তিটার ছবি আমার পরিচিত। দেখি খুঁজে পাই নাকি।

 

এইসব বই দেখলেই আমার অস্বস্তি হয়। তার ওপর কর্নেল ওর মধ্যে ঢুকে গেলে কখন যে বেরোবেন, তার কোনও ঠিক নেই। ধৈর্য ধরে প্রায় আধঘণ্টা কাটিয়ে বললাম-কর্নেল! আমি এবার উঠি।

 

কর্নেল বইয়ের পাতায় চোখ রেখে বললেন-বাহুতে বাঁধা তাগার ছবি পাচ্ছি। রামেসিসের তাগা। এতে শেয়ালঠাকুর আনুবিসের ছবি এক পিঠে। অন্য পিঠে সাপ! এটা আমেনহোতেপের বাহুর তাগা। তেমন কিছু না। রা অর্থাৎ, সূর্যঠাকুরের ছবি আর হিজবিজবিজ-বাঃ! এটা তুংক-আমন অর্থাৎ তুতানখামেনের ছবি আর হিজবিজবিজ-বাঃ! এটা তুতাংক-আমন অর্থাৎ তুতানখামেনের তাগা। বেচারা কিশোর বয়সে মিশরের রাজা হয়ে যক্ষ্মারোগে মারা পড়েছিল। তার মমি এখন কায়েরোর জাদুঘরে আছে।

 

–প্লিজ কর্নেল! আমি বাড়ি ফিরতে চাই।

 

-কী আশ্চর্য! এটা তুতাংক-আমনের বালিকা বিধবা নেকারতিতির তাগা। জয়ন্ত! জয়ন্ত! পেয়ে গেছি। নেকারতিতির গলার তক্তি। দ্যাখো, দ্যাখো!

 

বলে তিনি জ্যাকেটের ভিতর পকেট থেকে তিতলিপুরের রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ব্রোঞ্জের তক্তিটা বের করলেন। এবার আমি কৌতূহলী হয়ে উঁকি দিলাম। তক্তিটার দুই পিঠে যা খোদাই করা আছে, বইয়ের ছবিতেও হুবহু তা-ই আছে। অতএব আমাকে সল্ট লেকের ফ্ল্যাটে ফেরার কথা ভুলতে হল। বললাম–কী সব লেখা আছে, বইয়ে তা পাচ্ছেন?

 

কর্নেল কিছুক্ষণ পরে মুখ তুলে হতাশ ভঙ্গিতে বললেন–নাঃ! নেকারতিতির তক্তি ছিল সোনার। এটা ব্রোঞ্জের। তার মানে এটা নকল জিনিস। বিদেশের কিউরিয়ো শপে এরকম নকল জিনিস বা রেপ্লিকা বিক্রি হয়। তুমি দিল্লির লালকেল্লায় নিশ্চয় দেখেছ, মিনি তাজমহল বিক্রি হয়। জয়ন্ত! এটা নিছক রেপ্লিকা। মূল সোনার তক্তিতে কী লেখা ছিল, পণ্ডিতেরা তার পাঠোদ্ধার করেছেন।

 

বললাম–কী লেখা আছে, তা নিয়ে মাথাব্যথা করে কী লাভ? আপনি পার্চমেন্টে লেখা কিউনিফর্ম লিপির পাতা খুঁজে দেখুন!

 

কর্নেল বললেন–কিউনিফর্ম লিপি পশ্চিম এশিয়া, ইরাক আর পারস্যে প্রচলিত ছিল। নানা ভাষা নানারকমের পেরেক চিহ্নের সমাবেশ। কাজেই এক্ষেত্রে আমাকে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।

 

-মূল পার্চমেন্টটা দেখাবেন নাকি?

 

–মোটেও না। ওটার একটা ফোটোকপি করে নিয়ে যাব। বলব, একটা বইয়ে পেয়েছি। তবে বলা যায় না, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুতে পারে।

 

–সাপ মানে?

 

-তুমি জানো, আমি ইনটুশনের কথা বলি। ওটা একটা বিস্ময়কর বোধ। অনেক মানুষের মধ্যে এটা লক্ষ্য করেছি। তবে আমার সামরিক জীবনে গেরিলাযুদ্ধ শেখার সময় আমার এই বোধটা জন্মেছিল। বহুবার দেখেছি, কোনও বিপদ আসন্ন, তা হঠাৎ আমি টের পেয়েছি। চামড়ায় লেখা কথাগুলো অর্থাৎ, প্রাচীন পার্চমেন্ট পেতলের নল থেকে বের করেই গতরাতে দোমোহানির বাংলোতে মনে হয়েছিল, এটা বিপজ্জনক।

 

হাসতে হাসতে বললাম-ওটাও ব্রোঞ্জের তক্তির মতো নকল নয় তো?

 

-পার্চমেন্টটা আতশকাচে পরীক্ষা করে মনে হয়েছে খুব পুরোনো। অনেক জায়গায় পোকায় কেটেছে। ওতে কীটনাশক পাউডার মাখিয়ে রাখতে হবে।

 

বলে কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বললেন-কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। ড. মুখার্জি আছেন কি?…ড. মুখার্জি! নমস্কার! আশা করি সুস্থ শরীরে আছেন?…এ বয়সে ওরকম একটু-আধটু অসুখ-বিসুখ হয়েই থাকে। আমারও হয়। …মিলিটারি বডি? বাঃ! বলেছেন ভালো। কিন্তু এবার বডি ছেড়ে মিলিটারি অংশটা পালিয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, কালবিকেল চারটে নাগাদ আপনার একটু সময় হবে?..ব্যাপার আপনার কাছে সামান্য। বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত আপনি। …না, না! শুনুন! একটা গুরুতর সমস্যায় পড়েছি। আপনার সাহায্য চাই। ..ওকে, ওকে ড. মুখার্জি! ধন্যবাদ।

 

কর্নেল রিসিভার রেখে বললেন–ড. রথীশ মুখার্জির নাম শুনেছ?

 

বললাম-না। কে উনি?

 

-এটাই হয়, জয়ন্ত! প্রকৃত বিদ্বানরা প্রচারবিমুখ। তারা কাজ করেন আড়ালে। আর তাদের কাজের ফল ভোগ করে অন্য সব মানুষ।

 

আমি এবার উঠি, কর্নেল! বরং সকালে আসব।

 

কর্নেল হাসলেন। -তুমি সল্ট লেকের ফ্ল্যাটে ফিরেই হয়তো দেখবে, তোমার কাগজের কর্তৃপক্ষ তোমাকে কোথাও কোনও হাঙ্গামার খবর আনতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব এই বৃদ্ধের ডেরায় লুকিয়ে থাকো!

 

–আমার চাকরি এবার যাবে!

 

–যাবে কী বলছ? তোমাদের চিফ রিপোর্টারকে আমি জানিয়ে দেব, একটা রোমাঞ্চকর স্টোরির পিছনে তোমাকে লড়িয়ে দিয়েছি।

 

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে আমাকে এ ধরনের ঘটনার সময় রাত কাটাতে হয়। তাই এখানে আমার এক প্রস্থ পোশাক-আশাক আর দরকারি জিনিসপত্র রাখা আছে। কর্নেল প্রায়ই আমাকে সল্ট লেকের ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিয়ে তার ডেরায় থাকতে বলেন। এ যাবৎ রাজি হইনি। কারণ, কখন নিছক কোনও বিরল প্রজাতির অর্কিডের জন্য ওঁর পিছনে পাহাড়-জঙ্গলে ছুটোছুটি করে বেড়াতে হবে। …

 

সকালে ষষ্ঠীচরণের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল আমার। বাসিমুখে চা অর্থাৎ বেডটি খাওয়ার অভ্যাস আছে। বেডটি দিয়ে ষষ্ঠী হাসল। -বাবামশাই এখনও ছাদের বাগানে কাকের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। একটা হতভাগা কাক ক্যাকটাসের মধ্যে আটকে গিয়ে কেলেঙ্কারি। হাজার-হাজার কাক এসে বাবামশাইকে চাদ্দিক থেকে ঘিরে ধরেছিল। আমি ছুটে গিয়ে পটকা ফাটালুম। তারপর আধমরা কাকটা বের করে দত্তবাড়ির নিমগাছে ছুঁড়ে দিলাম। আপনি তখন বেঘোরে ঘুমুচ্ছেন। বাবামশাইয়ের দু-হাত তুলে নাচন-কোঁদন দেখলেওঃ! কুরুক্ষেত্তর!

 

বলে সে চলে গেল। ছাদের বাগানে কর্নেল একটা কাকতাড়ুয়া বসিয়েছিলেন। সেটা কি নেই?

 

প্রাতঃকৃত্যের পর পোশাক বদলে ড্রয়িংরুমে গেলাম। একটু পরে কর্নেল এলেন। -মর্নিং জয়ন্ত!

 

-মর্নিং বস! শুনলাম, আপনি কাকেঁদের সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেমেছিলেন?

 

কর্নেল অট্টহাসি হেসে ইজিচেয়ারে বসলেন। -ষষ্ঠীর খবর! ষষ্ঠী তিনটে হাইড্রোজেন বোমা ফাটিয়েছে। অতএব যোদ্ধা সে-ই।

 

একটু পরে ষষ্ঠী গম্ভীর মুখে কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে রেখে গেল। কর্নেলের হাতে এদিনের ইংরেজি-বাংলা একগাদা খবরের কাগজ ছিল। সোফার কোণে ছুঁড়ে ফেলে কফিপানে মন দিলেন। আমি কাগজগুলোয় দ্রুত চোখ বুলিয়ে তিতলিপুরের খুনের খবর খুঁজলাম। মফস্সলের সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর ছাপানোর জায়গা থাকলে ছাপা হবে। নয়তো দুমড়ে টেবিলের তলায় ফেলা হবে। নেতাগোছের কেউ খুন হলে অবশ্য অন্য কথা। দীপনারায়ণবাবুর পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন। কিন্ত তিনি নিতান্ত সাধারণ মানুষ ছিলেন।

 

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন-তুমি কী খুঁজছিলে, জানি। ধৈর্য ধরো ডার্লিং! তুমিই ওই খুনের খবর অদূর ভবিষ্যতে জমিয়ে লিখবে। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার প্রচারসংখ্যা এক লাফে বেড়ে যাবে।

 

বললাম–কিন্তু আপনি তো খুনের জায়গা থেকে চলে এলেন! আপনিই বলেন, খুনির পিছনে দৌডুনোর আগে যে খুন হয়েছে, তার পিছনে দৌডুনো উচিত।

 

কর্নেল হাসলেন-দৌড়ুনোর জন্যই তো কলকাতা ফিরে এসেছি।

 

–দীপনারায়ণবাবুর খুনের সূত্র এই বিশাল শহর কলকাতায় খুঁজে পাবেন? খড়ের গাদায় উঁচ খোঁজার ব্যাপার হবে না?

 

কর্নেল চুপচাপ কফি শেষ করে বললেন-সওয়া আটটা বাজে। এখনই একবার বেরিয়ে পড়া যাক। শিগগির ঘুরে আসব। হালদারমশাইয়ের ন-টা নাগাদ আসবার কথা। কুইক জয়ন্ত!

 

কর্নেলকে এসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা বৃথা। শুধু বলবেন–চলো তো! আমি পথ দেখাব।

 

নিচে কর্নেলের একটা খালি গ্যারাজ ঘর আছে। একসময় ওঁর একটা লালরঙের ল্যান্ডরোভার গাড়ি ছিল। পুরোনো গাড়ি। বারবার ঝামেলা বাধাত। তাই বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেই গ্যারাজে আমার ফিয়াট গাড়িটা থাকে।

 

কর্নেল গ্যারাজের তালা খুলে দিলেন। আমি গাড়ি বের করলাম। কর্নেল আমার বাঁপাশে বসে বললেন–বাইনোকুলার বা ক্যামেরার দরকার নেই। শুধু দর্শন করে আসব।

 

দারোয়ান সেলাম ঠুকে গেট খুলে দিল। তারপর কর্নেলের নির্দেশে অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে পার্ক স্ট্রিট, তারপর থিয়েটার রোডে পৌঁছুলাম। থিয়েটার বোড় আর সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের মধ্যে একটা গলিরাস্তার যোগাযোগ লক্ষ্য করলাম। সেই গলিতে কিছুটা এগিয়ে কর্নেল বাঁদিক ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। গাড়ি থেকে নেমে এতক্ষণে বুঝলাম, দীপনারায়ণবাবু যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেই ফ্ল্যাটে এখন জাহাজিবাবু বাস করে। এই ঠিকানাটা দীপনারায়ণবাবুর বোন সুনয়নী দেবী দিয়েছিলেন।

 

কাছে গাড়ি মেরামতের গ্যারাজে গিয়ে কর্নেল নাম্বার জিজ্ঞেস করে এলেন। তারপর আমাকে তিনি অপেক্ষা করতে বলে একটা বাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে গেলেন। সামনে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি দেখা যাচ্ছিল। কর্নেল সিঁড়িতে ওঠার সময় এক মুসলিম ভদ্রলোক নেমে আসছিলেন। তাঁর মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। পরনে পাঞ্জাবি আর লুঙি। গলায় একটা মাফলার জড়ানো। কলকাতায় ডিসেম্বরেও শীত তীব্র নয়। কর্নেল তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি আঙুল তুলে কিছু দেখিয়ে নেমে এলেন। তারপর আমার দিকে একবার তাকিয়ে সোজা সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের দিকে চলে গেলেন। তার হাতে একটা ব্রিফকেস ছিল।

 

একটু পরে কর্নেল নেমে এলেন। তারপর দরজা দিয়ে বেরিয়ে বললেন-ঠিকানা ঠিকই আছে। কিন্তু ওই দু-কামরা ফ্ল্যাটে থাকেন কাজি গোলাম হোসেন। পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রলোক বললেন-উনি তো এখনই বেরিয়ে গেলেন। না-ওখানে এক হিন্দু ভদ্রলোক অনেক বছর আগে থাকতেন। তারপর ফ্ল্যাটটা খালি ছিল। মালিক থাকেন দিল্লিতে। ওই ফ্ল্যাট তিনিই কাজিসাহেবকে নাকি ভাড়া দিয়েছেন। কাজিসাহেব একা থাকেন। কারও সঙ্গে মেশেন না। বদরাগি লোক বলে তাকে সবাই এড়িয়ে চলেন।

 

কর্নেল গাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে আমার বাঁদিকে বসতে যাচ্ছেন, সেইসময় তাঁর জ্যাকেটের পিছনে এক টুকরো কাগজ আঁটা দেখতে পেলাম। কাগজটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম–এটা আপনার পিঠে আঠা দিয়ে আটকানো ছিল।

 

কর্নেল কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন-জয়ন্ত! আমাকে জাহাজিবাবু বোকা বানিয়ে চলে গেছে পাশ দিয়ে। যাবার সময় আমার পিঠে এটা আটকে দিয়ে গেছে। এতে লেখা আছে, দ্বিতীয়বার এলেই মারা পড়বে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *