ছয়
অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল দোমোহানি সেচবাংলোয় পাওয়া হুমকির চিঠিটার সঙ্গে আজকের চিরকুটের লেখা আতশ কাচের সাহায্যে পরীক্ষা করেছিলেন। দুটো লেখাই একজনের। কর্নেল চিঠি আর চিরকুটটা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চুরুট টানছিলেন। চোখ যথারীতি বন্ধ।
বলেছিলাম–জাহাজিবাবু লিখেছিল আপনাকে চেনে। তাহলে এই রিস্ক নিল কেন সে? ওকে তো আবার ওই ফ্ল্যাটে ফিরতে হবে। লোকটা যদি সত্যিই আপনার প্রকৃত পরিচয় জেনে থাকে, তাহলে তার এ-ও জানার কথা, আপনি তার পিছনে পুলিশ লাগিয়ে দেবেন।
কর্নেল বলেছিলেন–পুলিশ নিজে থেকেই ওখানে হানা দেবে। কারণ চন্দ্রপুর থানার ওসি রাজেনবাবু নিশ্চয় লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে খবর পাঠিয়েছেন। তুমি সাংবাদিক। তোমার জানার কথা, পুলিশ সহজে কোনো বাড়তি কাজে হাত লাগায় না। পুলিশেরও আজকাল অনেক অসুবিধে আছে। কোথায় হাত দিতে গিয়ে কোন রাজনৈতিক গার্জেনের ছোবল খাবে!
-কেন? আপনি ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার আপনার বিশেষ স্নেহভাজন মি. অরিজিৎ লাহিড়িকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিন!
এখনও সে-সময় আসেনি। আমি চাই না পুলিশ এখনই জল ঘোলা করুক। তাতে মূল রহস্য আর কোনওদিনই জানা যাবে না। আমাকে নিজের পদ্ধতিতে এগোতে হবে। হালদারমশাই আসুন। তারপর পুরো ব্যাকগ্রাউন্ডটা কী রকম, তা হয়তো বোঝা যাবে। …
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদারের আবির্ভাব ঘটল সাড়ে নটায়। সবেগে ঢুকে ধপাস করে বসে বললেন-হেভি মিস্ট্রি। তাই এটু দেরি হইয়া গেল।
কর্নেল বললেন- বলুন হালদারমশাই!
হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে যা বললেন, তা এই :
অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপটেন এস এন সিংহ সাউদার্ন অ্যাভিনিউতে বাড়ির দোতলায় একা থাকেন। তার একমাত্র ছেলে থাকে আমেরিকার বস্টনে। সে সেখানে বিয়ে করেছে। বছরে একবার এসে বাবাকে দেখে যায়। ক্যাপটেন সিংহের রান্না আর কাজকর্ম করে দিয়ে যায় একজন ঠিকে ঝি। এই মেয়েটি থাকে লেকের ধারে একটা বস্তিতে। রাস্তায় দিকের ঘরটা ক্যাপটেন সিংহের ড্রয়িং রুম। দেশবিদেশের নানারকম শিল্পদ্রব্যে সাজানো। ভিতরের দরজা দিয়ে গেলে শোবার ঘর। সেখানে আলমারি-ঠাসা বই আর দেওয়ালে টাঙানো আছে তার পারিবারিক ছবি। তৃতীয় ঘরটা কিচেন আর ডাইনিং। কিচেনের অংশটা পাটিশন করা আছে।
কথায়-কথায় ক্যাপটেন সিংহ বলেছেন, সারাজীবন ঘরছাড়া হয়ে কাটিয়েছেন। তাই তার বন্ধুবান্ধব নেই। আত্মীয়-স্বজন কলকাতার নানা জায়গায় থাকেন। তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ কম। অবসরজীবনে তিনি স্থানীয় একটা ক্লাবের সদস্য হয়েছিলেন। ক্লাবটা উঠে গেছে। তবে পাড়ায় কয়েকজন তাঁর বয়সি ভদ্রলোকের সঙ্গে বন্ধুতা আছে। প্রতিদিন ভোরে তাদের সঙ্গে লেকের ধারে হাঁটাহাঁটি করে আসেন। ঠিকে ঝি আসে বেলা আটটা-সাড়ে আটটায়।
হালদারমশাই জানতে চেয়েছিলেন, গতিবিধি জানার জন্য তার পিছনে লোক লাগানোর কোনও কারণ আছে বলে কি তিনি মনে করেন? ক্যাপটেন সিংহ বলেন, তেমন কোনও কারণ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে বছর দশেক আগে তার এক সহকর্মী তাকে একটা প্যাকেট রাখতে দিয়েছিলেন। তখন তিনি জাহাজে ছিলেন। জাহাজটা আসছিল মিশরের পোর্ট সইদ বন্দর থেকে বোম্বে। তারপর কলকাতা। তার সেই সহকর্মীর নাম ছিল অজয়েন্দু রায়। বোম্বে আসার পথে আরব সাগরে জাহাজটার তলায় ফাটল ধরে ডুবতে থাকে। বিপদসংকেত পাঠান তিনি। বোম্বে বন্দর থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ পৌঁছোয়। কিন্তু তখন জাহাজটার পিছন দিক ডুবে যায়। অনেক নাবিক প্রাণ হারায় জলের তলায়। মোড়কটা ক্যাপটেন সিংহের ব্যাগে ছিল। ব্যাগটা তিনি সবসময় কাছে। রাখতেন। তিনি উদ্ধার পান। কিন্তু অজয়েন্দু রায়ের আর খোঁজ পাননি। জাহাজে মিশরের তুলো বোঝাই ছিল। সব নষ্ট হয়ে যায়। বোম্বেতে কিছুদিন থাকার পর ক্যাপটেন সিংহ তার কোম্পানির আর একটা ছোটো মালবাহী জাহাজ নিয়ে কলকাতা বন্দরে আসেন। তারপর প্যাকেটটা বাড়িতে রেখে খিদিরপুর ডকে নিজের কাজে ফিরে যান।
অজয়েন্দু রায়ের অধীনে একজন অফিসার ছিলেন। তাঁর নাম শম্ভুনাথ চৌধুরি। তিনি ক্যাপটেন সিংহের কাছে অজয়েন্দুবাবুর গচ্ছিত প্যাকেটের কথা কীভাবে জানতে পেরেছিলেন, এটাই আশ্চর্য! প্রায়ই এই লোকটা তার কাছে প্যাকেটটা দাবি করত। অন্যের জিনিস তিনি কেন দেবেন শম্ভুবাবুকে? তিনি ওঁকে ধমক দিয়ে বলতেন, তেমন কোনও প্যাকেট অজয়েন্দুবাবু তাঁকে দেননি। তারপর তো চাকরি থেকে ক্যাপটেন সিংহ অবসর নেন। দু-বছর আগে একদিন তিনি ব্যাংকে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে তাঁর ঠিকে-ঝি সুশীলার কাছে শোনন, এক ভদ্রলোক তার খোঁজে এসেছিলেন। তাঁকে সুশীলা ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখেছিল। তারপর কখন ভদ্রলোক চলে গেছেন, সুশীলা দেখতে পায়নি। ক্যাপটেন সিংহ সুশীলাকে বকাবকি করেন। তবে সুশীলার দোষ ছিল না। তাঁকে তিনি বিশ্বাস করেন। তাই বাড়ির চাবি তাকে দিয়ে যেতেন। কারণ সুশীলা সব ঘর পরিষ্কার করত। মেঝে মুছত। যাই হোক, দিনে তার কথাটা মাথায় আসেনি। রাত্রে তিনি সন্দেহবশে বেডরুমে তার খাটে বিছানার তলা খোঁজেন। প্যাকেটটা ম্যাট্রেসের তলায় রাখা ছিল। সেটা উধাও। হয়ে গেছে।
সুশীলার কাছে আগন্তুক ভদ্রলোকের চেহারার যে বিবরণ তিনি পান, তাতে তিনি চিনতে পারেননি ভদ্রলোককে। তার মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ছিল। পরনে টাই-সুট ছিল। তিনি পাইপ খাচ্ছিলেন।
এমন সাহেব-মানুষকে সুশীলা ড্রয়িংরুমে বসতে দেবে, এটা স্বাভাবিক। ব্যাংকটা কাছেই। কাজেই ক্যাপটেন সিংহের শিগগির বাড়ি ফেরার কথা। তবে তারপর থেকে সুশীলার হাতে চাবি দিয়ে তিনি বেরোন না। সুশীলা ঘর পরিষ্কার এবং রান্না করে চলে যাওয়ার পর তিনি দরকার হলে বাইরে যান। …
হালদারমশাইয়ের কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু কর্নেলের কথা বলার আগে আমার কোনও কথা বলা উচিত হবে না। চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবুর সঙ্গে হালদারমশাইয়ের মক্কেলের একটা যোগসূত্র তাহলে পাওয়া গেল। ক্যাপটেন সিংহকে অজয়ে রায় যা রাখতে দিয়েছিলেন, তা জাহাজবাবুই যে ছদ্মবেশে চুরি করে নিয়ে যায়, তা-ও স্পষ্ট হল। জিনিসটা যে পিতলের নলে রাখা পার্চমেন্ট, তা-ও বোঝা গেল। শুধু বুঝতে পারলাম না, এতদিন পরে কে ক্যাপটেন সিংহের গতিবিধির ওপর নজর রেখেছে? তার উদ্দেশ্যই বা কী?
হালদারমশাই ব্রেকফাস্ট করে এসেছেন। কর্নেল ও আমি ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। তারপর কফি আনল ষষ্ঠীচরণ। হালদারমশাই ফুঁ দিয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললেন–দুইখান পয়েন্ট আমার মাথায় আইয়া পড়ছে। কমু?
কর্নেল বললেন-বলুন।
সুশীলা রোজ ঘর পরিষ্কার করত। সে নিশ্চয় প্যাকটেখান বিছানার তলায় দেখছিল। তার লগে শম্ভুনাথ চৌধুরি ছদ্মবেশে গোপনে যোগাযোগ করছিল। সুশীলা ক্যাপটেন সিংহেরে মিথ্যা কইছে। গোপনে সেই টাকার লোভে প্যাকেটখান শম্ভুনাথের দিছে। ক্যাপটেন সিংহ সুশীলার বিশ্বাস কইরা ঠকছেন। এই হইল গিয়া প্রথম পয়েন্ট।
–দ্বিতীয় পয়েন্ট?
গোয়েন্দাপ্রবর চাপা স্বরে বললেন–ক্যাপটেন সিংহ আমার মক্কেল। কিন্তু তিনি আমারে কিছু কথা নিশ্চয় গোপন করছেন। আমার মনে হয় কী জানেন কর্নেল স্যার? কমু?
নিশ্চয়। কী মনে হয়, তা খুলে বলুন।
–অজয়ে রায় ক্যাপটেন সিংহেরে প্যাকেটখানা রাখতে দেন নাই। সিংহসায়েবই অজয়েন্দুবাবুর থেক্যা ওটা চুরি করছিলেন। জাহাজডুবির সময় অজয়েন্দুবাবুরে উনিই সম্ভবত আরব সমুন্দুরে ধাক্কা মাইরা ফেলছিলেন।
কর্নেল হাসলেন। তারপর অজয়ে রায় কোনও ভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং ক্যাপটেন সিংহ তাঁকে জিনিসটা ফেরত দেননি বা দিতে পারেননি। কারণ প্যাকেটটা চুরি গিয়েছিল-
কর্নেলের কথার ওপর আমি বললাম–সময়ের কথা ভুলে যাচ্ছেন। জাহাজডুবি হয়েছিল দশবছর আগে। আর ক্যাপটেন সিংহের ঘর থেকে প্যাকেটটা শম্ভুনাথ হাতায় দু-বছর আগে। বেঁচে থাকলে অজয়েন্দুবাবু প্যাকেটটা এতবছর ধরে দাবি করতে আসেননি কেন?
হালদারমশাই বললেন-ক্যাপটেন সিংহ আমারে কিছু কথা গোপন করছেন।
কর্নেল বললেন-হ্যাঁ। আপনার অনুমান যুক্তিসঙ্গত। তবে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল, এতদিন পরে ক্যাপটেন সিংহের গতিবিধির উপর যে নজর রেখেছে, সে কি অজয়েন্দুবাবুর চর? অজয়েন্দুবাবু কি বেঁচে গিয়েছিলেন এবং কোনও কারণে দশবছর চুপচাপ ছিলেন? কী সেই কারণ?
আমি বললাম–কিন্তু তিনি চর লাগিয়েছেন কেন? সরাসরি নিজে ক্যাপটেন সিংহের সামনে। যাচ্ছেন না কেন?
হালদারমশাই বললেন-কর্নেলস্যার! এইজন্যই কইছিলাম হেভি মিস্ট্রি। আমার মক্কেল আমারে কথা গোপন করলে আমি তারে ক্যানসেল কইরা দিমু।
কর্নেল বললেন–না হালদারমশাই! আপনার কেসে আমারও ইনটারেস্ট আছে। কেন আছে তা পরে বলব। আপাতত ক্যাপটেন সিংহের কাছে আপনার জানা দরকার, কে তাকে ফলো করে। আপনি ওঁকে রাস্তায় হেঁটে যে কৌশলে হোক, লোকটাকে দেখিয়ে দিতে বলবেন। সাবধান! উনি যেন পিছু ফিরে ইশারায় না দেখান। শুধু মুখের কথায় লোকটার বর্ণনা দেন। হালদারমশাই! চিয়ার আপ! আপনি চৌত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করেছেন। অবসরের সময় আপনি ছিলেন ডিটেকটিভ ইনস্পেকটার। আপনাকে বেশি কথা বলতে চাই না। তবে প্লিজ, হঠকারিতা করবেন না!
উত্তেজনায় গোয়েন্দাপ্রবরের গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপছিল। তিনি বললেন-না, না কর্নেলস্যার। লোকটা ক্যাপটেন সিংহরে ফলো করে। এবার আমি অরে ফলো করুম।
বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর যাই গিয়া বলে সবেগে প্রস্থান করলেন।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে টাকে হাত বুলোতে থাকলেন। একটু পরে টেলিফোন বাজল। অমনই কর্নেল চোখ খুলে সিধে হয়ে হাত বাড়ালেন টেলিফোনের দিকে। তারপর রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। -বলছি। …মি. হাটি! মর্নিং! বলুন। …হ্যাঁ। কাজি গোলাম হোসেন থাকেন। আমি সকালেই গিয়েছিলাম ওখানে!…কাজিসাহেবকে না পাওয়ারই কথা। …কেন একথা বলছি? মি. হাটি, লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টকে বলুন, সাদা পোশাকে কাজিসাহেবের ডেরার কাছে যেন সারাক্ষণ অন্তত দুজন সশস্ত্র লোক মোতায়েন থাকে। …হা, ঠিক ধরেছেন। ওই কাজিসাহেবই পাজি জাহাজিবাবু। .. হ্যাঁ। শিয়োর। আর একটা কথা। আপনি লালবাজারকে বলুন, কড়েয়া থানা থেকেও যেন কাজিসায়েবের দিকে নজর রাখা হয়। .. হ্যাঁ। ওটা কড়েয়া থানা এলাকায় পড়ে। …ঠিক আছে। উইশ ইউ গুড লাক!…
রিসিভার রেখে কর্নেল আবার ধ্যানস্থ হলেন। বললাম–তাহলে আমরা চলে আসবার পরই লালবাজার থেকে অফিসার গিয়েছিলেন?
–হুঁ।
-জাহাজিবাবু মহা ধূর্ত। ও এখন কিছুদিন গা ঢাকা দেবে। পাড়ায় নিশ্চয় ওর পোয্য গুণ্ডা-মস্তান আছে!
–অজয়েন্দুবাবুর ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, অর্থাৎ উনি যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন? উনি বেঁচে না থাকলে অন্য কেউ কি পার্চমেন্টটার কথা জানত? সে-ই কি ক্যাপটেন সিংহের ওপর নজর রেখেছে, যাতে উনি জিনিসটা কাকেও বেচলে সে জানতে পারবে?
–হুঁ।
এবার আমার জ্ঞানবুদ্ধির ফিরে এল। কর্নেলের এই মানে উনি আমার কথা শুনছেন না। এই হুঁ-র সঙ্গে আমি দীর্ঘকাল পরিচিত। তাই চুপ করে গেলাম। খবরের কাগজ টেনে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম।
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল হঠাৎ চোখ খুলে সিধে হয়ে টেবিলের ড্রয়ার টানলেন। একটা নোটবই বের করে পাতা ওলটাতে থাকলেন। তারপর টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। সাড়া এলে ইংরেজিতে বললেন–ইন্ডিয়ান শিপিং কর্পোরেশন?…আমি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মি. অসীম সোমের সঙ্গে কথা বলতে চাই। …আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। ইয়া! কলোনেল!
প্রায় তিন মিনিট পরে সাড়া এল, তা বুঝলাম। কর্নেল বললেন–মি. সোম!…হা, সেই সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধই বটে! আমি আপনার সাহায্যপ্রার্থী। …ধন্যবাদ। তবে বিষয়টা একটু জটিল। আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতো। আপনি নোট করে নিলে ভালো হয়। …দশবছর আগেকার ঘটনা। জাহাজের নাম জানি না। তবে দেশি জাহাজ। কাজেই আপনাদের কাছে পুরোনো রেকর্ডে খোঁজ মিলতে পারে। পোর্ট সইদ থেকে জাহাজটা আসছিল বোম্বে। মিশরের উৎকৃষ্ট তুলো বোঝাই ছিল। … হ্যাঁ। জাহাজটার তলায় কী ভাবে ফাটল ধরে আরব সাগরে ডুবে গিয়েছিল। সেই জাহাজের ক্যাপটেনের নাম ছিল এস এন সিংহ। সৌমেন্দ্রনাথ সিংহ। এটাই জাহাজটা শনাক্ত করার একটা পয়েন্ট। …ও কে! সেই জাহাজে একজন অফিসার ছিলেন অজয়েন্দু রায়। তিনি নাকি বোম্বে থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ সেখানে পৌঁছুনোর আগেই সমুদ্রে তলিয়ে যান। .না। লাইফ জ্যাকেট পরার সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা জানি না। মোট কথা তিনি নাকি নিখোঁজ হয়ে যান। ..ক্যাপটেন সিংহ এখন অবসরপ্রাপ্ত। আমার বয়সি বৃদ্ধ। তাকে আমি চিনি। তার কাছেই এই ঘটনা শুনেছি। … হ্যাঁ। তিনিই বলেছেন, অজয়েন্দু রায় আরব সাগরে ডুবে মারা পড়েন। কিন্তু আমার জানার বিষয় শুধু একটা। মাত্র একটা। ..হা অজয়ে রায় সম্পর্কে আপনাদের পুরোনো রেকর্ডে কোনও তথ্য আছে কিনা। থাকলে কী সেই তথ্য?…তা সময় লাগুক। প্লিজ মি. সোম! এটা খুব জরুরি। … হ্যাঁ। একটা কে আমার হাতে এসেছে বইকি। যথাসময়ে আপনাকে জানাব। …ধন্যবাদ মি. সোম। অসংখ্য ধন্যবাদ। …
রিসিভার রেখে কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরালেন। বললাম-বাঃ! এই একটা কাজের কাজ করলেন। কিন্তু জাহাজবাবু শম্ভুনাথ চৌধুরির নামটা ওঁকে দিলেন না কেন?
কর্নেল ধোঁয়ার মধ্যে বললেন-জয়ন্ত! কান টানলে মাথাও আসে। …
লাঞ্চের পর সবে অভ্যাসমতো ডিভানে একটু ভাতঘুম দিতে শুয়েছি, হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছিলাম, কর্নেলের ডাকে উঠে বসতে হল। উনি সহাস্যে বললেন–মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে এসো। সাড়ে তিনটে বাজে। বিকেল চারটেতে ড. রথীশ মুখার্জির সঙ্গে দেখা করার কথা। উনি থাকেন ওল্ড বালিগঞ্জ প্লেসে। শিগগির রেডি হয়ে নাও…
ওল্ড বালিগঞ্জ প্লেসে একটা পাঁচিলঘেরা বাড়ির গেটের সামনে কর্নেল নামলেন। দেখলাম, তাঁকে সেলাম ঠুকে দারোয়ান গেট খুলে দিল। মন দিয়ে এগিয়ে কর্নেলের নির্দেশে একপাশে গাড়ি দাঁড় করালাম। দোতলার বারান্দা থেকে এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ, মাথায় কর্নেলের মতো টাক, দাড়ি নেই, কিন্তু একটুখানি গোঁফ আছে, পরনে পাঞ্জাবির ওপর শাল জড়ানো, সহাস্যে বললেন–আসুন! আসুন কর্নেলসায়েব!
নিচে একটি মধ্যবয়সি লোক দাঁড়িয়ে ছিল। সে নমস্কার করে কর্নেল ও আমাকে নিচের ঘরে নিয়ে গেল। বসার ঘর। কিন্তু চারদিকে শিলিং অবধি র্যাকে বই ঠাসা। বসার ঘর থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে কর্নেলের হাত ধরে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক টানতে টানতে একটা ঘরে ঢোকালেন। এ ঘরটাও বইয়ে ঠাসা। এক প্রান্তে বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিল। পিছনে জানালা। বিকেলের এক চিলতে রোদ এসে টেবিলে পড়েছে। বই ছাড়া ঘরে এখানে-ওখানে টুলের ওপর নানারকম মূর্তি চোখে পড়ল।
কর্নেল আমার সঙ্গে ড. মুখার্জির আলাপ করিয়ে দিলেন। ড. মুখার্জি সেই লোকটাকে শিগগির কফি আনতে বললেন। আমরা তার মুখোমুখি বসলাম।
ড. মুখার্জি মুচকি হেসে বললেন–আপনাকে দেখলেই রহস্যের গন্ধ পাই। এখনও পাচ্ছি।
কর্নেল হাসলেন। –এবারও লিপিরহস্য!
-কী লিপি?
–পার্চেমেন্টে লেখা কিউনিফর্ম লিপি।
ড. মুখার্জি সকৌতুকে চাপা স্বরে বললেন–গুপ্তধন? আমি বলি গুপ্তধন ইজ লুপ্তধন! দেখি আপনার পার্চমেন্ট।
কর্নেল বললেন-সমস্যা হল, মূল পার্চমেন্টটা হাতে পাইনি। ফোটোকপি এনেছি। বলে তিনি জ্যাকেটের ভিতর পকেট থেকে পার্চমেন্ট স্কোলের মতো গুটিয়ে রাখা একটা একই সাইজের ফোটো বের করে ওঁর হাতে দিলেন।
ড. মুখার্জি ব্যথভাবে ফোটোকপিটা সোজা করে টেবিলল্যাম্পের আলোয় চারটে কাচের পেপারওয়েট চারকোণে চাপা দিলেন। তারপর প্রকাণ্ড আতশ কাচ দিয়ে কিছুক্ষণ লিপিগুলোর, দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টে ড. মুখার্জিকে লক্ষ্য করছিলেন। একটু পরে বললেন–পাঠোদ্ধার সম্ভব কি?
ড. মুখার্জি বললেন–ওপরে বামকোণে এই রেখাগুলো কারুকার্য নয়। আরবি লিপিতে লেখা আছে : আল-কাহিয়রা কাজিনাত আত্-তুহাত্। তার মানে, কায়রো মিউজিয়াম। আল-কাহিরোকে আমরা বলি কায়রো।
-তাহলে এটা কায়রো জাদুঘরের পার্চমেন্ট? কিন্তু লিপি তো কিউনিফর্ম! মিশরে এ লিপি তো প্রচলিত ছিল না বলেই জানি। আপনি অবশ্য আমার চেয়ে আরও বেশি জানেন।
এই সময় সেই লোকটা ট্রেতে কফি আর বিস্কুট নিয়ে এল। টেবিলে ট্রে একপাশে রেখে সে চলে গেল। ড. মুখার্জি বললেন–আপনারা কফি খান। আমি একটু আগে খেয়েছি। এক মিনিট! বলে তিনি পাশের র্যাক থেকে একটা প্রকাণ্ড বই দুহাতে টেনে আনলেন। তারপর সেটার সূচিপত্র। দেখে একটা পাতা বের করলেন। কয়েকটা পাতা উলটে তিনি হাসলেন। পেয়েছি এটা হিটাইট লিপি। বর্তমান তুরস্কের বোগাজ কই নামে একটা পাহাড়ি জনপদে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে উনিশ শতকে পাপিরাসে লেখা একটা চিঠি উদ্ধার করা হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে হিটাইট অর্থাৎ হাত্তির রাজা সুপ্পিলুলিউমাসকে মিশরের কিশোর রাজা তুত-আংক-আমন অর্থাৎ তুতানখামেনের অকালমৃত্যুর পর তাঁর বিধবা বালিকাবধূ নেকারতিতি এই চিঠিতে অনুরোধ করেছিলেন, তিনি পুনর্বিবাহ করতে চান। কিন্তু মিশরে তার অনেক শত্রু আছে। তাই তিনি হাত্তিদেশের একজন বর চান। কিন্তু কর্নেলসায়েব! প্যাপিরাসে লেখা সেই চিঠির এটা একটা নকল কপি। মূল প্যাপিরাসে লেখা চিঠিটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রত্নবিদ উইলিয়াম রাইট পার্চমেন্টে এই কপি করেন। …
