হনিমুন লজ (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

এক

 

শ্রুতি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল, সোমক ব্যালকনিতে বসে সিগারেট টানছে। শ্রুতি ব্যস্তভাবে বলল, এ কী! তুমি এখনও তৈরি হওনি?

 

সোমক একটু হাসল। আমি যাচ্ছি না।

 

যাচ্ছ না মানে? শ্রুতি চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। হঠাৎ আবার কী হল তোমার?

 

কিছু না। আসলে ভিড় হইচই ছোটাছুটি আমার ভালো লাগছে না। সোমক মুখটা করুণ করল। ভেবে দেখলাম, যে জন্য এখানে তুমি আর আমি এসেছি, তার সঙ্গে এই প্রোগ্রামটা ঠিক যেন ফিট করছে না।

 

আশ্চর্য! শ্রুতি জোরে শ্বাস ছাড়ল। কাল রাত্রে প্রোগ্রামটা তুমিই করেছ।

 

হুঁ! করেছিলাম। কিন্তু সোমক হঠাৎ থেমে গিয়ে দূরে দৃষ্টিপাত করল।

 

ব্যাপারটা একটু খুলে বলবে?

 

না না! তেমন কিছু নয়। সোমক হাত বাড়িয়ে শ্রুতির একটা হাত নিল। আস্তে বলল, হনিমুনে এসে ভিড়ে তোমাকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে না।

 

তার চোখে হাসি ছিল এবং কণ্ঠস্বরে প্রেম। কিন্তু শ্রুতি চটে গেল। কোনও মানে হয়? ওঁরা কী ভাববেন বলো তো? সাড়ে ছটা বেজে গেছে। সবাই নীচে অপেক্ষা করছেন। আর হঠাৎ তুমি বলছ যাবে না।

 

প্লিজ শ্রুতি! বরং তুমি ওঁদের সঙ্গে যাও। বলো, আমার শরীর একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখানে এসে হিম লাগিয়ে জ্বরমতো হয়েছে।

 

আমি সত্যি কিছু বুঝতে পারছি না।

 

তুমি বোঝবার চেষ্টা করছ না। কাল রাত্রে ধারিয়া ফস্ দেখতে যাওয়ার কথা যখন তুলি, তখন আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমরা হনিমুনে এসেছি।

 

সোমক শ্রুতিকে কাছে টেনে আদর করার ভঙ্গি করল। কিন্তু শ্রুতি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, প্রশ্নটা ভদ্রতার। তুমিই প্ল্যান-প্রোগ্রাম করলে। এখন আমরা যদি ওঁদের সঙ্গে না যাই, ব্যাপারটা মোটেও ভালো দেখাবে না। তা ছাড়া ওঁরাও তো হনিমুনে এসেছেন।

 

সোমক জোরে হাসল। সবাই নয়। কেউ কেউ। যাই হোক, ভদ্রতারক্ষার খাতিরে তুমি ওঁদের সঙ্গ দাও।

 

শ্রুতি বিরক্ত হল। কী বলছ তুমি!

 

হ্যাঁ। তুমি বরং যাও। আমি এখানে চুপচাপ বসে প্রকৃতি দেখি। জাস্ট ভদ্রতার খাতিরে অন্তত ঘণ্টা দু-তিন তোমার বিরহ-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারব। তবে প্লিজ, যাবার সময় একটা চুমু-টুমু দিয়ে যাও।

 

শাট আপ! চুমু-টুমু অত শস্তা?

 

হনিমুনে ওটা খুবই শস্তা–যাকে বলে ড্যাম চিপ।

 

সোমক উঠে দাঁড়িয়ে শ্রুতিকে টেনে ঘরে ঢোকাল। তারপর যখন সে ওকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন কেউ দরজায় নক করল। শ্রুতি ছিটকে সরে গিয়ে দরজা খুলল।

 

দরজার সামনে কুমকুম দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, পায়েলদি পাঠালেন। সবাই লনে অপেক্ষা করছেন। ওঁর হাজব্যান্ড ভদ্রলোক একটা জিপ ম্যানেজ করেছেন।

 

শ্রুতি আস্তে বলল, এদিকে আমার হাজব্যান্ড ভদ্রলোকের হঠাৎ শরীর খারাপ।

 

কুমকুম সোমকের দিকে তাকিয়ে বলল, জিপে বসে যাবেন। পায়ে হেঁটে তো যেতে হচ্ছে না আর।

 

সোমক কাঁচুমাচু মুখে বলল, কাল রাত্রে খোলা আকাশের নীচে বসে ছিলাম। অক্টোবরের শেষাশেষি এখানে বড় হিম পড়ে যায়। ঠাণ্ডা লেগে একটু জ্বরমতো হয়েছে। সারা শরীরে ব্যথা। তো শ্রুতি আমাকে ফেলে রেখে যেতে চাইছে না। আপনি ওকে টেনে নিয়ে যান বরং।

 

কুমকুম বলল, ঠিক আছে। শ্রুতিদি আসুন। জাস্ট ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ফিরে আসব আমরা। জানেন শ্রুতিদি? চমনলালজি বলছিলেন, ধারিয়া ফলসের কাছে। নাকি প্রি-হিস্টোরিক এজের কিছু কেভ-পেন্টিং খুঁজে পাওয়া গেছে। একটা ডাইনোসরের ছবি পর্যন্ত! ভেরি ইন্টারেস্টিং নয়?

 

শ্রুতি সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। সোমক হাসল। জুরাসিক পার্ক ফিল্মের প্রভাব! মার্কিন কালচার ক্রমশ আন্তর্জাতিক মডেল হয়ে উঠছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনরাই উফো দেখতে হিড়িক ফেলে দিয়েছিল। এখন উফো-হুঁজুগ তো ঝিমিয়ে পড়েছে। ডাইনোসর-হুঁজুগ মাথাচাড়া দিয়েছে। বলে সে শ্রুতির দিকে ঘুরে চোখের ঝিলিক ফেলল।

 

শ্রুতি হ্যান্ডব্যাগটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল। তার চলে যাওয়ার ভঙ্গিতে ক্ষোভ ছিল।

 

সোমক দরজা বন্ধ করে ব্যালকনিতে গিয়ে বসে পড়ল। সিগারেটটা টানতে গিয়ে দেখল, ফিল্টার টিপে পৌঁছে আগুন নিভে গেছে। সে ওটা নীচে ছুঁড়ে ফেলল। এদিকটাতে খাড়া পাথরের নৈসর্গিক দেওয়াল। তবে দেওয়ালের ফাটলে রঙ্গনা ফুলের মতো অজস্র বুনো লাল ফুলে ঢাকা ঝোপ গজিয়ে আছে। তার নীচে ঢেউখেলানো উপত্যকা। কোথাও ঘন ঘাস ঝোপঝাড় উঁচু-নিচু গাছের জঙ্গল। আবার কোথাও নগ্ন পাথুরে মাটি। কাছে ও দূরে নীল-ধূসর পাহাড় কুয়াশায় কিছুটা অস্পষ্ট।

 

কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর সোমক জোরে শ্বাস ফেলল। তার ধারণায় ভুল ছিল না। ফস্ দেখতে শ্রুতি যেতই এবং গেল। অনির্বাণ নামে যে লোকটা পায়েলকে বিয়ে করেছে, শ্রুতি তাকে চেনে। শুধু চেনে না, যেন কোনও সময়ে বেশ ঘনিষ্ঠতাও ছিল। জলপ্রপাত দেখতে যাওয়ার প্রোগ্রাম করে সোমক আসলে বুঝতে চেয়েছিল, শ্রুতির প্রতিক্রিয়াটা এখন কেমন–কেন না পায়েল ওই লোকটাকে বিয়ে করেছে।

 

লোকটার বয়স পায়েলের চেয়ে অন্তত পনের বছর বেশি। সোমকের এটা অনুমান। পায়েল পঁচিশ বছরের যুবতী! তা হলে অনির্বাণ রুদ্র চল্লিশ। বলিষ্ঠ আঁটোসাঁটো গড়ন। সে নাকি কলকাতার কোনও বড় কোম্পানির চিফ একজিকিউটিভ। তবে সে খুব আলাপী আর হাসিখুশি প্রকৃতির লোক। সবতাতেই উৎসাহী আর নাকগলানো। সব সময় বকবক করে।

 

কিন্তু আশ্চর্য লাগে, পায়েল ব্যানার্জির মতো মেয়ে ওকে বিয়ে করে বসল কেন? আরও একটা আশ্চর্য, সোমক ও শ্রুতি বিয়ের পর যেখানে হনিমুনে এসেছে, ওরাও সেখানে হনিমুনে চলে এসেছে। কাকতালীয় যোগাযোগ? শ্রুতি রাত্রে বলছিল, সে জানত না পায়েল বিয়ে করেছে এবং সে নাকি অবাক হয়েছে। ওকে এখানে দেখে। অনির্বাণ সম্পর্কে শ্রুতির ব্যাখ্যা হল, ও তার দাদা ধৃতিমানের বন্ধু।

 

কে জানে কী ব্যাপার! শুধু এটাই স্পষ্ট যে, শ্রুতি ও অনির্বাণ রুদ্রের মধ্যে ভালোরকমের জানাশোনা আছে। পায়েলের সঙ্গে কথাবার্তায় শ্রুতির যেন কিছু ঈর্ষার আভাস লক্ষ্য করেছে সোমক।

 

আবার এও ঠিক, পায়েলকে এখানে তার স্বামীর সঙ্গে হনিমুনে আসতে দেখে সোমকও মনে মনে রুষ্ট আর ঈর্ষান্বিত। পায়েল সোমককে ল্যাং মেরেছিল। টানা তিন বছর চুটিয়ে প্রেম করাটা যে পায়েলের নিছক খেলা,। বুঝতে পারেনি সোমক। প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রণা খুব তীব্রগভীরে একটা ক্ষত থেকে যায়।

 

সোমক আবার একটা সিগারেট ধরাল।

 

ছোটনাগপুর শিল্পাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত ও ছোট শিল্পকেন্দ্র ধারানগর। সেখান থেকে প্রায় পাঁচ কিমি দূরে এবং ধারিয়া নদীর তীরে একটা টিলার মাথায় এই হনিমুন লজ। কাছাকাছি কোনও বসতি নেই। বছর দুই আগে এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী এই দোতলা লজটি তৈরি করেছেন। ইতিহাসের অধ্যাপক চমনলালের সঙ্গে এখানে এসে আলাপ হয়েছে সোমকের। তিনি বলছিলেন, তার যৌবনে এখানে একটা পাথরের পুরনো বাংলো ছিল। বাংলোর মালিক ছিলেন ফাদার পিয়ার্সন। তখন সেই পাদ্রি ভদ্রলোক অথর্ব বৃদ্ধ। কেউ এসে থাকতে চাইলে ঘর ভাড়া দিতেন। এখনকার মতো বিদ্যুৎ ছিল না। টেলিফোন থাকার কথা তো ভাবাই যায় না। চমনলালজি বিয়ের পর সেই বাংলোতে হনিমুনে এসেছিলেন। তো এতকাল পরে রাজেন্দ্র অগ্রবাল বাংলোর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দোতলা বাড়ি তৈরি করেছেন। বিদ্যুৎ আর টেলিফোনের ব্যবস্থাও হয়েছে। সে-খবর পেয়ে চমনলাল সস্ত্রীক এসে পড়েছেন স্মৃতির টানে।

 

একসময় চারদিকে ঘন জঙ্গল ছিল। বুনো জন্তু-জানোয়ারও ছিল প্রচুর। হনিমুনে এসে রীতিমতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল চমনলালজির। এখন এখানে প্রকৃতির সেইসব চমকপ্রদ সৌন্দর্য আর বিভীষিকা নেই। তবু স্থানটির আকর্ষণ আছে। বিশেষ করে এই শেষ শরতে আবহাওয়া যেমন মনোরম, ধারিয়া নদী আর ছোট ছোট উপত্যকার সৌন্দর্যও চোখ-জুড়োনো। নব বিবাহিত যুবক-যুবতীদের হনিমুনের জন্য যে নির্জনতা আর স্বাধীনতা দরকার, তা এখানে অপরিমিত।

 

ইতিহাসের প্রাক্তন অধ্যাপক ভদ্রলোকের বয়স প্রায় সত্তর বছর। তার স্ত্রী রজনীদেবীর বয়সও ষাটের ওধারে। কিন্তু দুজনেই শক্তসমর্থ। যুবক-যুবতীদের সঙ্গে আলাপ জমাতে পটু।

 

হনিমুন লজের একতলায় দুটো এবং দোতলায় পাঁচটা স্যুইট। এ ছাড়া আধুনিক কেতায় নীচে ডাইনিং, লাউঞ্জ এসবও আছে। রিসেপশন কাউন্টার আছে। ম্যানেজার রঘুবীর রায় অতিশয় সজ্জন মানুষ। তিনি হাসতে হাসতে বলছিলেন, এখানে হনিমুনের জন্যই সবাই আসে। তবে এ ব্যাপারে কড়াকড়ি কোনও নিয়ম নেই। একা কেউ এসে থাকতেও পারেন। স্যুইট খালি থাকলে তো তাকে না বলা যায় না। আগামী এক সপ্তাহ ধরে কোন সুইট খালি থাকছে না। এখন কোনও দম্পতি হনিমুনে এলে দুঃখের সঙ্গে তাকে না বলতেই হবে। অবশ্য ধারানগরের কাছাকাছি অনেক হোটেল আছে।

 

সিগারেট শেষ করে সোমক উঠল। প্রায় পৌনে সাতটা বাজে। আবহাওয়ায় শীতের আমেজ আছে। রাত-পোশাক ছেড়ে সে প্যান্ট-শার্ট পরে নীচে গেল। ম্যানেজার রঘুবীর লাউঞ্জের সামনে বড় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মর্নিং স্যার বলে সম্ভাষণ করলেন। আপনি ফল্স্ দেখতে গেলেন না?

 

সোমক বলল, না। শরীর ভালো নেই।

 

ডাক্তারের দরকার হলে বলবেন স্যার।

 

বলব।

 

সোমক লনে নেমে ডানদিকে ঘুরে বাগানে গেল। সবুজ ঘাসে ঢাকা মাটি। এখানে-ওখানে পাথরের মসৃণ বেদি আর কাঠের বেঞ্চ। চৌকে! বা গোল রঙিন মরশুমি ফুলের কয়েকটা বাগিচা এবং কোথাও কোথাও ঘন পাতায় ভরা বেঁটে দেশি-বিদেশি গাছ। এটা লজের দক্ষিণ দিক। কোণে একটা গাছের তলায় বেঞ্চে এক যুবতাঁকে দেখে সোমক থমকে দাঁড়াল।

 

গতরাত্রে লাউঞ্জে সোমক ওকে এক যুবকের সঙ্গে দেখেছিল। ডিনারের আগে অনির্বাণ রুদ্র সাইট-সিইং প্রোগ্রাম নিয়ে আলোচনার সময় ছোটখাটো ককটেল পার্টি মতো দিয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে যা হয়। কড়া ও মিঠা পানীয়ের গ্লাস হাতে যথেচ্ছ হইহল্লা, অতিউৎসাহীদের একটু নাচানাচি, ওয়েস্টার্ন পপ মিউজিক। চমনলালজির মতো মানুষও নিজের স্ত্রীর সঙ্গে নাচতে চাইছিলেন। কিন্তু রজনীদেবীর অনিচ্ছা। অগত্যা পায়েল বৃদ্ধের সঙ্গে নাচল। অনির্বাণ শ্রুতির সঙ্গে নাচতে চাইছিল। কিন্তু সোমক শ্রুতিকে ছাড়েনি। কুমকুম তার স্বামী দীপকের নাচের জুড়ি। শেষের দিকে দীপক ধপাস করে কুশনে বসে পড়লে অনির্বাণ কুমকুমকে পেয়ে যায়। দীপকের একটু নেশা হয়েছিল।

 

আর হ্যাঁ–সে সময় এই যুবতী তার সঙ্গীকে নিয়ে একটু তফাতে বসে ছিল। অনির্বাণ পরস্পরের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় ওদের লক্ষ্য করেনি। সোমকের মনে হয়েছিল, যারা দলে মিশতে চায় না, তাদের টানাটানির অর্থ হয় না, তা ছাড়া ভুল করে অপমানজনক কথা বলে বসতেই পারে।

 

কাল রাতের পুরো ছবিটা মনে ভেসে এসেছিল সোমকের। এখন সকালে যুবতীটি এখানে একা চুপচাপ বসে আছে এবং ওর সঙ্গীটি নেই। দাম্পত্যকলহ নাকি?

 

অবশ্য যারা এই লজে আসে, তারা সবাই দম্পতি কি না বলা কঠিন। প্রেমিক প্রেমিকা স্বামী-স্ত্রী সেজেও আসতে পারে। রঘুবীর বলছিলেন এসব কথা। বলছিলেন, তেমন কোন জুটি এলেও তার কী করার আছে?

 

এই বাগানে সোমক নির্জনতা চেয়েছিল। সে একটু বিরক্ত হয়ে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই যুবতী অপ্রতিভ ভঙ্গিতে ইংরেজিতে বলল, আপনি ইচ্ছে করলে এখানে বসতে পারেন।

 

সোমক বলল, নাহ। আপনাকে ডিসটার্ব করা উচিত হবে না।

 

কেন একথা বলছেন?

 

আপনি সম্ভবত আপনার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছেন। সোমক একটু হাসল। হনিমুন লজের নাকি একটা রোমান্টিক ট্রাডিশন ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে।

 

আমি কারও জন্য এখানে অপেক্ষা করছি না। কাজেই এক্ষেত্রে কোনও রোমান্টিসিজম নেই।

 

আপনার স্বামী কি কোথাও বেরিয়েছেন? বলেই সোমক মুখটা একটু কাচুমাচু করল। সরি! আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে চাই না।

 

নাক গলানো কেন হবে? প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক। ভোরে শোভন কোথায়। বেরিয়েছে। আমাকে বলে যায়নি!

 

সোমক তাকাল। একটু পরে আস্তে বলল, তাই বুঝি? তাহলে তো এটা উদ্বেগের বিষয়।

 

যুবতী ঠোঁটের কোনায় হাসল। নাহ্। ওর জন্য আমার কোনও উদ্বেগ নেই। আপনারা অনেকেই কলকাতা থেকে এসেছেন!

 

হ্যাঁ। আপনারা?

 

বার্নপুর থেকে। আমার নাম ঋতুপর্ণা রায়। পর্ণা নামে সবাই ডাকে। আমার বাবার বাড়ি কলকাতায় ছিল। বাড়িটা আর নেই। তাই কলকাতা যাওয়া হয় না। আগের মতো।

 

সোমক এগিয়ে গিয়ে বেঞ্চে বসল। আমি সোমক চ্যাটার্জি। আমার স্ত্রী শ্রুতি একটু আগে দল বেঁধে জলপ্রপাত দেখতে গেল। আমি যাইনি। আসলে ভিড় হইহল্লা আমার পছন্দ নয়।

 

কাল রাতে লাউঞ্জে ককটেল পার্টিতে আপনি নাচছিলেন।

 

সোমক শুকনো হাসি হাসল। ওটা নিছক ভান বলতে পারেন। একালীন সংস্কৃতির পাল্লায় পড়েছিলাম। তো আমরা বাংলায় কথা বলছি না কেন? আমরা দুজনেই বাঙালি!

 

ঋতুপর্ণা হাসল না। এবার বাংলায় বলল, একালীন সংস্কৃতির পাল্লায় আমাকে সব সময় পড়তে হয়। তাছাড়া আমার স্বামী শোভন রায় আমেরিকায় পড়াশুনা করে এসেছে। মার্কিন ইংলিশ বলে। কদাচিৎ বাংলা।

 

কিন্তু উনি কাল রাতে আমাদের পার্টিটা এড়িয়ে থাকলেন। আমরা যা করছিলাম, তা মার্কিন কালচার।

 

ঋতুপর্ণা একটু চুপ করে থাকার পর বলল, কাল ওর মন ভালো ছিল না।

 

তাই বুঝি?

 

হ্যাঁ। কতকটা আপনার মতো।

 

কেন?

 

একটু আগে বললেন না?

 

কী বললাম বলুন তো?

 

ভিড় হইহল্লা আপনার পছন্দ নয়। তাই স্ত্রীর সঙ্গে ফলস্ দেখতে গেলেন না। তার মানে, আপনার মন আজ আজ ভালো নেই।

 

সোমক সিগারেটে শেষ টান দিয়ে চপ্পলের তলায় নেভাল। তারপর আস্তে শ্বাস ছেড়ে বলল, আসলে আমরা হনিমুনে এসেছি। এটা ভুলে যাওয়া উচিৎ নয়।

 

ঠিক। দুজন বাদে আমরা সবাই হনিমুনে এসেছি।

 

দুজন বাদে? আপনি লক্ষ্য করেছেন দেখছি!

 

আপনি করেননি?

 

হুঁ। করেছি। দোতলায় আমার পাশের স্যুইটে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আছেন। পাদ্রিদের মতো চেহারা। ম্যানেজার বলছিলেন, রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। সাম কর্নেলকী যেন নামটা! দেখলে বিদেশি মনে হয়।

 

নীচের সুইটে এক অবাঙালি মহিলা একা আছেন।

 

হ্যাঁ। সুভদ্রা ঠাকুর। আলাপ তাঁর সঙ্গেও হয়নি। ম্যানেজার বলছিলেন, উনিও নাকি চমনলালজির মতো স্মৃতির টানে এখানে এসেছেন। ওঁর স্বামীওঃ! সে একটা সাংঘাতিক গল্প মনে হয়।

 

বলুন না শুনি!

 

সোমক একটু চুপ করে থাকার পর বলল, প্রায় পঁচিশ বছর আগে এখানে ছিল ফাদার পিয়ার্সনের বাংলো। সুভদ্রা দেবী স্বামীর সঙ্গে হনিমুনে এসেছিলেন। ধারিয়া ফসে বেড়াতে গিয়ে কী ভাবে মিঃ ঠাকুর নাকি পা হড়কে প্রপাতের; জলে পড়ে যান। আশ্চর্য ব্যাপার হল, তার ডেডবডি পাওয়া যায়নি।

 

ঋতুপর্ণা চমকে উঠল। সে কী!

 

প্রপাতের নীচে একটা লেক মতো আছে। সেখানে নাকি প্রচুর কুমির থাকত। পুলিসের মতে, ডেডবডি কুমিরে খেয়ে ফেলেছে।

 

তাই ভদ্রমহিলাকে ছিটগ্রস্ত মনে হচ্ছিল।

 

সোমক সিগারেটের প্যাকেট বের করে বলল, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে?

 

তেমন কিছু না। ওই গেট খুলে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। চোখে চোখ পড়লে বললেন, জলপ্রপাতের ভূত দেখতে যাচ্ছেন। ইচ্ছে করলে আমি ওঁর সঙ্গে যেতে পারি। পায়েচলা রাস্তায় ধারিয়া ফস্ এখান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার। কখন গেলেন উনি?

 

আধঘণ্টা আগে।

 

সোমক একটু হাসল। আপনি ওঁর সঙ্গে গেলে পারতেন!

 

কেন?

 

আপনার স্বামী ফিরে এসে আপনাকে খুঁজে পেতেন না। বেশ একটা শোধ নেওয়া হত।

 

ঋতুপর্ণা কথাটা কানে নিল না। সে সোমকের মুখের দিতে তাকিয়েছিল। হঠাৎ বলে উঠল, আপনাকে আমি দেখেছি। ভীষণ চেনা মনে হচ্ছে। ঠিক মনে করতে পারছি না।

 

বার্নপুরে আমি কখনও যাইনি।

 

ঋতুপর্ণা চঞ্চল হয়ে উঠল। না না! আপনাকে দেখেছি। আচ্ছা, আপনি কি বিজ্ঞাপনে মডেলিং করেন?

 

সোমক আস্তে বলল, ঠিক ধরেছেন। কয়েকটা টিভি ফিল্মেও হিরোর রোল করেছি।

 

তাই বলুন! কাল রাতের পার্টিতে আপনাকে দেখে আপনার ভয়েস শুনে একবার মনে হয়েছিল—-

 

ও কথা থাক। আপনার স্বামী শোভনবাবু সম্পর্কে আমার কেন যেন উদ্বেগ হচ্ছে। উনি কী করেন?

 

ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু ওর জন্য আপনার উদ্বেগের কারণ নেই। ও একটু খেয়ালি। ঋতুপর্ণা উঠে দাঁড়াল। বরং চলুন না আমরা নদীর ধারে গিয়ে বসি। কী? আপত্তি আছে?

 

সোমক একটু ইতস্তত করার পর উঠে দাঁড়াল। বেশ তো! চলুন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *