তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

দশ

শিপিং কর্পোরেশনের ম্যানেজার অসীম সোম কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার রেখে তার দিকে ঘুরে বসলেন। মি. সোম একটু হেসে বললেন–অজয়েন্দু রায়ের সঙ্গে কোনও এক সুশীলা দাসীকে মার্ডারের সম্পর্ক নেই তো?

 

কর্নেলও হাসলেন। –আছে।

 

–বলেন কী কর্নেল সরকার!

 

যথাসময়ে সব আপনাকে জানাব।

 

ঘড়ি দেখে মি. সোম উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–চলি তাহলে। আজ সন্ধ্যায় আমাদের ক্লাবে একটা ডিনার পার্টি আছে। আপনাকে খামটা দিয়ে সেখানে যাব ভেবেছিলাম। একটু দেরি হয়ে গেল। …

 

অসীম সোম চলে যাওয়ার পর বললাম–একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল তাহলে। যে-সুশীলার সাহায্যে হরিবাবু ক্যাপটেন সিংহকে কিডন্যাপ করেছে, তাকেই হরিবাবু কেন গুলি করে মারল?

 

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে অভ্যাসমতো চোখ বুজলেন। বুঝলাম, আমার এই প্রশ্ন নিয়ে তিনি আপাতত আলোচনায় রাজি নন।

 

কিছুক্ষণ করে ডোরবেল বাজল। তারপর সবেগে প্রবেশ করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই। তাঁকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। কর্নেল চোখ খুলে বললেন-বলুন হালদারমশাই!

 

হালদারমশাই জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন-সুশীলা থাকত একটা তেরপলের ঝোপড়িতে। একজন কইল, সুশীলা তার ঝোপড়ি পাঁচু মিস্ট্রিরে বিক্রি কইর‍্যা দ্যাশে গেছে। পাঁচু মিস্ট্রিরে জিগাইলাম সুশীলার দ্যাশ কোথা? পাঁচু কইল, সে-খবর তার জানা নাই!

 

-আপনাকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে কেন?

 

গোয়েন্দাপ্রবর এক টিপ নস্যি নেওয়ার পর আস্তে বললেন–ক্যাপটেন সিংহর বাড়ি গিছলাম। পুলিশ ওনার ঘরের তালা ভাইঙ্গ্যা ঢুকছে। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সেই নরেশবাবুরে দেখলাম। আমারে দেইখ্যা উনি কইলেন, ঘরে ক্লোরোফর্মের কড়া গন্ধ ট্যার পাইছেন।

 

তার মানে ক্যাপটেন সিংহকে ক্লোরোফর্মের সাহায্যে অজ্ঞান করেছিল ওরা?

 

-হ্যাঁ। ঠিক কইছেন কর্নেল স্যার।

 

আপনি কি কফি খাবেন? কফি নার্ভ চাঙ্গা করে হালদারমশাই!

 

হালদারমশাই এবার মুচকি হেসে বললেন–খামু। কিন্তু আসল ঘটনা এখনও কই নাই। শোনেন কর্নেল স্যার! চৌতিরিশ বৎসরের পুলিশ-লাইফ যার, তারে ফান্দে ফেলে কোন হালায়?

 

কর্নেল ভুরু কুঁচকে বললেন–আবার কি কেউ আপনাকে আক্রমণ করেছিল?

 

–হঃ। ক্যাপটেন সিংহর বাড়ির পিছনে একটা গলি দিয়া শর্টকাট করছিলাম। গলিতে আলো কম ছিল। হঠাৎ পাশ থেইক্যা কে আমারে কইল, আপনি মি. হালদার না? আপনার লগে কথা আছে। একটু দাঁড়ান। আমি যেই তার দিকে ঘুরছি, সে চিত্তকার করল, চোর! চোর! তারপর আমার গলার কাছে সোয়েটার চাইপ্যা ধরল। এদিকে তার চিৎকার শুইন্যা আরও লোকে চিৎকার করছিল। চোর! চোর! আমি তখনই তার ফান্দ ট্যার পাইছি। তার প্যাটে একখান লাথি মারলাম। হালা মাটিতে পড়ল। অমনি আমি দৌড় দিলাম। পিছনে পাড়াসুন্ধু চিৎকার করছিল, চোর! চোর।

 

কর্নেল হেসে ফেললেন। -হ্যাঁ। আপনি ঠিকই বলেছেন। ওটা একটা ফাঁদই বটে। কলকাতায় এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কোনও শত্রুকে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলার জন্য চোর! চোর চিৎকার ভালো কাজ দেয়। লোকেরা কিছু না বুঝেই বেচারাকে পেটাতে শুরু করে।

 

বললাম-হালদারমশাই তাহলে খুব বেঁচে গেছেন!

 

হালদারমশাই বললেন–আমারে পেটায় কে? পকেটে রিভলভার ছিল। দুরাউন্ড গুলি ছুঁড়লেই লোকেরা–হঃ! কী যে কন জয়ন্তবাবু!

 

ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল। চুপচাপ কফি খেয়ে প্রাইভেট ডিটেকটিভের উত্তেজনা থিতিয়ে গেল। আবার একটিপ নস্যি নিয়ে তিনি বললেন–লোকটা হরিবাবুর স্যাঙাত। কিন্তু আশ্চর্য লাগে কর্নেলস্যার, সে আমার নাম জানল কীভাবে?

 

কর্নেল এবার গম্ভীর হয়ে বললেন-বোঝা যাচ্ছে, হরিবাবু ক্যাপটেন সিংহের দিকে নজর রাখার জন্য ভগত ছাড়াও আরও কাকেও বেছে নিয়েছিল। সে এমন লোক, যে ক্যাপটেন সিংহের বাড়ির কাছাকাছি থাকে। সম্ভবত সুশীলাকে সে চেনে। যাই হোক, এবার কাজের কথা বলি।

 

হালদারমশাই বললেন–যেখানে যাইতে কইবেন, যামু।

 

–হালদারমশাই! উত্তেজিত হবেন না যেন। মাথা ঠান্ডা রেখে শুনুন।

 

–কন কর্নেল স্যার।

 

–কিছুক্ষণ আগে চন্দ্রপুর থানা থেকে খবর পেয়েছি, চন্দ্রপুর যাওয়ার পথে তিতলিপুর জঙ্গলের ধারে সেই ট্যাক্সিটা পাওয়া গেছে। সুশীলাকে কেউ মাথার পিছনে গুলি করে মেরে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়েছে। ট্যাক্সিডাইভারকে পাওয়া যায়নি। খালি ট্যাক্সিটা রাস্তার ধারে দাঁড় করানো আছে।

 

গোয়েন্দাপ্রবর গুলিগুলি চোখে কথাগুলো শুনছিলেন। গোঁফের দুইভাগ তিরতির করে কাঁপছিল। এবারে জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন–হরিবাবু না। অরে মারছেন ক্যাপটেন সিংহ। ওনার ফায়ার আর্মস থাকা স্বাভাবিক। জ্ঞান ফেরার পর ক্যাপটেন সিংহ সুশীলারে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দিচ্ছেন।

 

আমি বললাম-হরিবাবুর তা হলে কী হল?

 

–তারেও মারছেন ক্যাপটেন সিংহ।

 

–তার সঙ্গে ভগত ছিল!

 

–প্রাণভয়ে ভগত পলাইয়া গেছে। ট্যাক্সিড্রাইভারও পলাইয়া গেছে।

 

–ক্যাপটেন সিংহ নাকি অসুস্থ এবং বৃদ্ধ মানুষ। তিনি হরিবাবুর লাশের কি ব্যবস্থা করেছেন তা হলে?

 

ঘটনাস্থলে গিয়া ক্লু খুঁজলেই মিলব। শিয়োর! তাই না কর্নেল স্যার?

 

কর্নেল চুরুট টানছিলেন। একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন-হালদারমশাই ঠিকই বলেছেন। ঘটনাস্থলে না গেলে কিছু বোঝা যাবে না। হালদারমশাই! এবার বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিন। তারপর কাল সকাল আটটার মধ্যে আমার এখানে চলে আসবেন। আপনার এবার বিশ্রাম দরকার। খুব ধকল গেছে। ….

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার আস্তেসুস্থে বেরিয়ে গেলেন। তারপর কর্নেল টেবিল-ল্যাম্পের আলো জ্বেলে মি. সোমের দিয়ে যাওয়া খামটা খুললেন। ভিতরে টাইপ-করা দু শিট কাগজ ছিল। ওতে শিপিং কর্পোরেশনের এক অফিসার অজয়েন্দু নারায়ণ রায়ের জাহাজি জীবন সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য আছে।

 

কর্নেল দু শিট কাগজে দেওয়া তথ্যগুলো অন্তত বার তিনেক পড়ার পর সোজা হয়ে বসলেন। আমার দিকে ঘুরে বললেন–ভদ্রলোক যেন আরব্য উপন্যাসের একটি চরিত্র। আশা করি, জয়ন্ত আরব্য উপন্যাস পড়েছে?

 

-পড়েছি। স্রেফ রূপকথা। তবে পড়তে ভালো লাগে। বিশেষ করে সিন্দবাদ নাবিকের উপাখ্যানগুলো রোমাঞ্চকর।

 

কর্নেল হাসলেন। –বাঃ সিন্দবাদ নাবিক! অজয়েন্দু নারায়ণ রায়ের জাহাজি জীবনটাও কতকটা ওইরকম মনে হল। অবশ্য জাহাজ কোম্পানির তথ্যে এ ধরনের ইশারা আছে মাত্র। কোনও বড়ো বন্দরে তাদের জাহাজ নোঙর করে বেশ কিছুদিন কোনও কারণে আটকে থাকলে অজয়েন্দুশম্ভুনাথ চৌধুরিকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে যেতেন। এটা জাহাজ কোম্পানির অফিসার বা কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়মবিরোধী কাজ। কিন্তু ক্যাপটেন সুশীলকুমার সিংহ তাদের গার্জেন। হা-ক্যাপটেন সিংহের দেশের বাড়ি ছিল চন্দ্রপুর।

 

-বলেন কি! ওই কাগজ দুটো আমাকে দিলে পড়ে আনন্দ পেতাম।

 

কর্নেল খামটা সকৌতুকে টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে মিটিমিটি হেসে বললেন–এখন বেশি কিছু জানতে নেই। জানলে চূড়ান্ত চমকের মজা থেকে বঞ্চিত হবে। মুখে-মুখে বরং যা বলি, শুনতে পারো।

 

অগত্যা বললাম–কাকেও হাতের তাস আগেভাগে দেখান না আপনি। তো ঠিক আছে। মুখেই বলুন।

 

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন-ক্যাপটেন এস কে সিংহের দেশের বাড়ি ছিল চন্দ্রপুরে। অজয়ে তার বাল্যবন্ধু।

 

–এসব কথা কি মি. সোমের দেওয়া কাগজে লেখা আছে?

 

–মোটেই না।

 

–আমি চোখ না খুলে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন–ওই তথ্য থেকে একটা স্কেচ এঁকেছি। শুনতে ইচ্ছে হলে শোনো।

 

হাসতে হাসতে বললাম-ঠিক আছে। বলে যান।

 

-ক্যাপটেন সুশীল কুমার সিংহের সুপারিশে অজয়ে চাকরি পেয়েছিলেন। শম্ভুনাথ চৌধুরি চাকরি পেয়েছিল অজয়ের সুপারিশে। ওরা দুজনে কোম্পানির নিয়মকানুন না মেনে কোথায়-কোথায় চলে যেত, তা আগেই বলেছি। নিয়মকানুন বিরোধী হলেও জাহাজের লগবুকে ক্যাপটেন সিংহকে সে-কথা লিখে রাখতে হত। কারণ বাইরে গিয়ে বিপদ-আপদ হলে জাহাজ কোম্পানিকেই ঝক্কি সামলাতে হবে। যাই হোক, বছর দশেক আগে একটা জাহাজ মিশরের পোর্ট সইদ ভারত থেকে কলকারখানার যন্ত্রাংশ নিয়ে গিয়েছিল। মাল খালি হলে সেই জাহাজে মিশরের তুলো বোঝাই করার কথা। আমেদাবাদের কাপড়কলের অর্ডার ছিল। তুমি জানো মিশরের তুলো ইজিপ্সিয়ান কটন নামে বিশ্বখ্যাত। তো তুলো আসতে দেরি হচ্ছিল। এই অছিলায় অজয়েন্দু শম্ভুনাথকে সঙ্গে নিয়ে কায়রোতে তুলো কোম্পানির অফিসে যান। দুদিন পরে ওঁরা জাহাজে ফিরে আসেন। তারপর তুলো এসে বন্দরে পৌঁছোয়। সেই তুলো বোঝাই করে জাহাজ বোম্বাই ফিরে আসছিল। আগস্ট মাস। বোম্বাই থেকে আঠারো নটিক্যাল মাইল দূরে ঝড়ের মুখে জাহাজডুবি হয়। ক্যাপটেন সিংহ রবারে ভেলায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে অজয়েন্দু বা শম্ভুনাথ ছিল না। এদিকে বোম্বাইয়ে তার আগে মিশর সরকারের অভিযোগ অনুসারে ভারত সরকার গোয়েন্দাবাহিনী তৈরি রেখেছিলেন। মিশরের অভিযোগ ছিল, ওই তুলোর জাহাজের দুজন অফিসার জাদুঘর থেকে অমূল্য প্রাচীন সম্পদ চুরি করে পালিয়েছে। তাদের সাহায্যকারী ইব্রাহিম বেগকে মিশর সরকার গ্রেফতার করেছিল। ইব্রাহিম ধোলাইয়ের চোটে ওই দুই ভারতীয়ের পরিচয় দিয়েছে।

 

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেন। বললাম-তারপর?

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন নিশ্চয় ওরা দুজনে এমন কিছু আঁচ করে থাকবে। তা না হলে জাহাজডুবির পর আর তাদের খোঁজ পাওয়া যাবে না কেন? মালবাহী জাহাজ। লোকজন তত বেশি ছিল না। রবারের নৌকো ছাড়াল কয়েকটা হালকা কাঠের বোটও ছিল। রবারের পোশাকও ছিল, যাতে হাওয়া ভরলে ফুলে ওঠে। সমুদ্রে ভেসে থাকা যায়।

 

-তার মানে সবাই উদ্ধার পেয়েছিল। শুধু অজয়েন্দু আর শম্ভুনাথের খোঁজ পাওয়া যায়নি?

 

-হ্যাঁ, প্রায় দশ বছর এই দুজন লোক কোম্পানির খাতায় মৃত হলেও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সি বিআই-এর খাতায় জীবিত। কয়েক বার খোঁজ পেয়েও সি বি আই তাদের ধরতে পারেনি। মি. সোম ফুটনোটে এইসব কথা লিখে দিয়েছেন। আর একটা মূল্যবান তথ্য আছে। মি. সোমের কোম্পানির একজন জাহাজি অফিসার নাকি খিদিরপুর ডকে হংকংয়ের একটা জাহাজে শম্ভুনাথ চৌধুরিকে দেখতে পেয়েছিলেন। সে জাহাজ থেকে একটা বোটে নেমে ডকইয়ার্ডে এসেছিল। সেই অফিসার তাতে চার্জ করতেই শম্ভুনাথকে আড়াল করে তার গ্যাংয়ের লোকেরা। তারপর বেচারা নিরীহ অফিসারকে সেই গুণ্ডারা মারধর করে। সেই সুযোগে শম্ভুনাথ উধাও হয়ে যায়।

 

বলে কর্নেল ঘড়ি দেখলেন। –জয়ন্ত, সাড়ে নটা বেজে গেছে! এ রাতে শিগগির ডিনার খেয়ে। শুয়ে পড়া যাক, সকালে বেরুতে হবে। বলে তিনি ডাকলেন-ষষ্ঠী!..

 

ষষ্ঠীচরণ আড়াল থেকে নিশ্চয় কর্নেলের কথা শুনছিল। কিচেনের দিক থেকে সে সাড়া দিয়ে বলল–সব রেডি বাবামশাই!…

 

সকালে কথামতো হালদারমশাই এসে পৌঁছেছিলেন। আমরা তখনই বেরিয়ে পড়েছিলাম। কর্নেল বলেছিলেন, পথে কোথাও ব্রেকফাস্ট করা যাবে।

 

তিতলিপুরের মোড় পেরিয়ে কর্নেলের নির্দেশে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। ডানদিকে টানা জঙ্গল। বাঁদিকে কখনও মাঠ, কখনও গ্রাম। কিছুক্ষণ পরে হাইওয়ে যেখানে বাঁদিকে ঘুরে গেছে, সেখানে একটি মোটামুটি চওড়া পিচরাস্তা জঙ্গলের ভিতরে দিয়ে এগিয়েছে। কর্নেল বললেন–আমরা ফরেস্ট বাংলোতে উঠব।

 

হালদারমশাই জিজ্ঞেস করলেন–সেই ট্যাক্সিখান কি এই রাস্তায় আইতেছিল?

 

-হ্যাঁ। এই জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে চন্দ্রপুর যেতে হয়। বলে তিনি বাইনোকুলারে চোখ রাখলেন। একটু পরে বললেন-জঙ্গলে এখনও কুয়াশা। তাই খালি চোখে পুলিশের গাড়ি দেখা যাবে না। বললাম–বাইনোকুলারে পুলিশের গাড়ি দেখতে পাচ্ছেন?

–পাচ্ছি। থানার ওসি রাজেন্দ্র হাটি জিপের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

 

এবার একটা ছোটো জলভরা নদীর ব্রিজ দেখা গেল। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে পুলিশের জিপ দেখতে পেলাম। বাঁদিকে রাস্তাটা ঘুরে গেছে। সেদিকে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছিল। সমৃদ্ধ গ্রাম বা গ্রামনগরী। বলা যায়। কারণ, অনেক পাকাবাড়ি আর যানবাহন চোখে পড়ল। কর্নেল বললেন–পশ্চিমে একটা পাকা সড়ক আছে। শর্টকাটে হাইওয়েতে পৌঁছোনো যায়। তাই এই রাস্তা এমন নির্জন হয়ে আছে।

 

ও সি রাজেন্দ্র হাটি সহাস্যে বললেন-মর্নিং কর্নেল সরকার।

 

কর্নেল হাসলেন। -মর্নিং হাটি। আশা করি, আমাদের দেরি হয়নি?

 

মোটেও না।

 

আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। কর্নেল প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদারের সঙ্গে মি. হাটির আলাপ করিয়ে দিলেন। তারপর বললেন–সেই ট্যাক্সিটা কি থানায় নিয়ে গেছেন?

 

ও সি বললেন-হ্যাঁ। রাত্রেই ওটা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই জঙ্গলের ধারে পড়ে থাকলে গাড়িচোররা ওটাকে হাপিস করে দিত। এই এলাকার চোর-ডাকাত দমন করা কঠিন। এই জঙ্গল আর পনেরো কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের বর্ডার।

 

–চলুন। ঘটনাস্থলটা দেখি।

 

ডানদিকে একটু এগিয়ে মি. হাটি বললেন-সুশীলা দাসীর বডি এই ঝোপের ধারে পড়ে ছিল। আর ট্যাক্সিটা ছিল এখানে রাস্তার কাছাকাছি। সম্ভবত গাড়ির মধ্যে ধস্তাধস্তি হচ্ছিল। ড্রাইভার ট্যাক্সির ব্রেক না চাপলে নিচের ওই খালে গিয়ে পড়ত।

 

হালদারমশাই বললেন–হ্যাঁ। ঠিক কইছেন। ঝোপের অবস্থা দেইখ্যাই তা বুঝছি।

 

দেখলাম, সুশীলার লাশ যেখানে পড়ে ছিল, সেখানে এখনও রক্তের ছোপ। শিশিরে অবশ্য রক্তের রং ফিকে হয়ে গেছে। ততক্ষণে কর্নেলের গোয়েন্দাগিরি শুরু হয়ে গেছে। ইতস্তত তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনও হাঁটু মুড়ে বসে আতশ কাচে কী দেখছেন। হালদারমশাইও অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঘোরাঘুরি করছেন।

 

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মি. হাটি আমাকে সহাস্যে চাপা স্বরে বললেন–আমাদের পক্ষ থেকে তন্নতন্ন খোঁজা হয়েছে। এবার দেখা যাক, কর্নেলসাহেব কোনও ক্ল পান নাকি।

 

হালদারমশাই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মি. হাটি বললেন–ভদ্রলোকের মাথায় ছিট আছে মনে হচ্ছে। ওভাবে কোথায় যাচ্ছেন উনি?

 

একটু হেসে বললাম–ঠিক ধরেছেন মি. হাটি। উনি আপনার মতো পুলিশ অফিসার ছিলেন। কিন্তু মাথায় ছিট আছে। কর্নেলেরও আছে। ওই দেখুন, কর্নেলও অদৃশ্য হলেন।

 

মি. হাটি এবার একটু গম্ভীর মুখে বললেন–আমরা অবশ্য জঙ্গলে ঢুকিনি। ঢোকার কোনও কারণও ছিল না। ওঁরা কীসের জন্য জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলেন বুঝতে পারছি না।

 

মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর মি. হাটি একজন সশস্ত্র কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে কর্নেল যেদিকে, সেদিকে চলে গেলেন।

 

আরও দশ মিনিট পরে দেখলাম, হালদারমশাই হন্তদন্ত বেরিয়ে আসছেন জঙ্গল থেকে। জিজ্ঞেস করলাম–কী ব্যাপার হালদারমশাই?

 

গোয়েন্দাবরের পোশাক শিশিরে ভিজে গেছে। উত্তেজিতভাবে তিনি বললেন–জুতার ছাপ ফলো করছিলাম। একখানে দেখলাম পুরানকালের ধ্বংসস্তূপ।

 

-হ্যাঁ। এই জঙ্গলের মধ্যে মোগল আমলের একটা কেল্লাবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আছে। কিন্তু কর্নেল কোথায়? তাকে দেখতে পাননি?

 

–নাঃ। ধ্বংসস্তূপের আড়ালে কে য্যান খাড়াইয়া ছিল। আমি শুধু শুনলাম শুকনা পাতার ওপর দৌড়াইয়া পালানোর শব্দ। জয়ন্তবাবু! এখনই মি. হাটি যদি পুলিশফোর্স লইয়া-বলেই তিনি অবাক হলেন। -অ্যাঁ? মিঃ হাটি গেলেন কই?

 

-জঙ্গলে। কর্নেলকে ফলো করে গেছেন উনি।

 

হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন-মিসটিরিয়াস কারবার।

 

ওঁদের ফিরতে যত দেরি হচ্ছে, তত আমার উদ্বেগ বাড়ছিল। অবশেষে ওঁদের দেখতে পেলাম। ও সি মি. হাটি একজন লোকের সোয়েটার ও শার্টের কলার চেপে ধরে টানতে টানতে তাকে আনছেন। ভদ্রলোক বলাই উচিত তাকে। কাছাকাছি এলে আমি তাকে চিনতে পারলাম। এই ভদ্রলোকই দীপনারায়ণবাবুর সঙ্গে দোমোহানিগামী রাস্তায় মল্লযুদ্ধ করছিলেন। সেই ছবি কর্নেল তুলেছিলেন। কাজেই আমার চিনতে দেরি হল না। ইনিই সেই শম্ভুনাথ চৌধুরি! অদ্ভুত ব্যাপার! এখন এই জঙ্গলে ঢুকে কী করছিলেন জাহাজিবাবু?

 

কাছে এসে কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন–জাহাজবাবু দৌড়ে আসছে দেখে আমরা দু-পাশে দুটো স্কুপের আড়ালে ওত পেতেছিলাম। ইনি একেবারে আমাদের ওপর এসে পড়লেন।

 

হালদারমশাই বলে উঠলেন–আমার সাড়া পাইয়া এই লোকটাই দৌড় দিছিল। ..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *