তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এক
সময়টা ছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। কর্নেল কোন সূত্রে খবর পেয়েছিলেন, তা জানি না। দোমোহানি নামে কোন অজ পাড়াগাঁ এলাকার জলাধারে নাকি একঝক নীল সারস এসেছে। কর্নেলের মতে, এই সারস নাকি অতিশয় দুর্লভ প্রজাতির। অতএব তাকে আমার ফিয়াট গাড়িতে চাপিয়ে দোয়োহানি যাচ্ছিলাম।
চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কে পঞ্চাশ কিলোমিটার এগিয়ে একটা ছোট্ট বাজারে পৌঁছে কর্নেলের নির্দেশে গাড়ি দাঁড় করিয়েছিলাম। সেখানে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে দুজনে চা খেলাম। কর্নেল চা পছন্দ করেন না। তিনি কফি খান, আমার হিসেবে ঘণ্টায় কমপক্ষে দু-বার। কিন্তু সেখানে কফি পাওয়া যায় না।
চায়ের দাম মিটিয়ে কর্নেল চাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন –তিতলিপুর আর কতদূরে?
চাওয়ালা একগাল হেসে বলল–স্যার! এটাই তো তিতলিপুর।
–এখান থেকেই তো দোমোহানি যাওয়া যায়?
–আজ্ঞে স্যার। চাওয়ালা আঙুল তুলে অদূরে একটা বিশাল বটগাছ আর জীর্ণ মন্দির দেখাল। ওই যে দেখছেন কাত্যায়নীতলা। ডাইনে ঘুরে চলে যান। পিচরাস্তা যেন ছাড়বেন না। তা মোটরগাড়িতে ধরুন বিশ-তিরিশ মিনিটে পৌঁছে যাবেন।
আমি কর্নেলের এই অভিযানের লক্ষ্যবস্তু বলতে শুধু জানি দুটো কথা। জলাধার আর নীল সারস। তাই নিছক কৌতূহলে কর্নেলকে এতক্ষণে জিজ্ঞেস করলাম-দোমোহানি গ্রামে বিদ্যুৎ আছে কি?
-চাওয়ালা হেসে উঠল। দোমোহানি গ্রাম নয় স্যার। দুটো নদী উত্তর আর পুবদিক থেকে এসে মিশেছে। সেখানে আগের দিন ছিল অথই জলের বিল। গরমেন্ট বছর দশেক আগে সেই বিলের চারদিকে বাঁধ দিয়ে ড্যাম করেছে। আর স্যার, ওই পথের ওপাশে যে জঙ্গল ছিল, সেটাকে করেছে ফরেস্ট।
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন–নটা পনেরো। জয়ন্ত! আর তাড়াহুড়ো নয়। আস্তে ড্রাইভ করো।
গাড়িতে উঠে বললাম-জঙ্গলে প্রজাপতি, অর্কিড, আর পাখি-টাখি দেখতে দেখতে যাবেন।
কর্নেল তাঁর প্রকাণ্ড শরীর আমার বাঁপাশে ঢুকিয়ে বললেন-তুমি পাখির সঙ্গে টাখি বললে। বলা যায় না, আমরা টাখিরও দর্শন পেতে পারি।
বলে তিনি চুরুট ধরালেন। কাত্যায়নীতলায় ডাইনে ঘুরে পূর্বমুখী একটা সংকীর্ণ পিচরাস্তায় আস্তে এগিয়ে গেলাম। কলকাতার রাস্তায় প্রায়ই এই স্পিডে আমাকে গাড়ি চালিয়ে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসে পৌঁছুতে হয়।
রাস্তাটা মসৃণ নয়। এবড়োখেবড়ো। আমাদের ডাইনে আমবাগান, ঝোপ-জঙ্গল, কোথাও পুরোনো কালের দালানকোঠার ধ্বংসস্তূপ এবং এসবের ফাঁকে তিতলিপুরের ঘর-বাড়ি চোখে পড়ছিল। মাঝে মাঝে ডাইনে একটা করে মাটির রাস্তা, একটা মোরামবিছানো রাস্তা আর পায়ে চলা রাস্তা তিতলিপুরের ভিতরে ঢুকে গেছে। কিন্তু বাঁদিকে টানা জঙ্গল। ঝোপঝাড় যত, তত উঁচু গাছ এবং শালবন। এই শীতে শালবনের চেহারা রুক্ষ, হতশ্রী। পাতা ঝরে গেছে। তবে চিরহরিৎ গাছপালা যেন তাদের দারিদ্র্য ঢেকে রেখেছে।
কর্নেল বাইনোকুলারে অর্কিড প্রজাপতি বা পাখি–আমি বলেছি পাখি-টাখি, অভ্যাসমতো খুঁজছেন। কিছুদূর চলার পর রাস্তা ডানদিকে বাঁক নিল। বাঁদিকে একটানা জঙ্গল, চাওয়ালার ফরেস্ট। ডানদিকে সিঙ্গাপুরি কলাবাগান। কখনও আমবাগান। হঠাৎ কর্নেল বললেন –ডার্লিং! তুমি টাখির কথা বলছিলে। এবার সত্যিই টাখি দেখতে পাবে। স্পিড বাড়াও।
কিছুটা এগিয়েই দৃশ্যটা চোখে পড়ল।
দুজন ভদ্রলোক রাস্তার উপর মল্লযুদ্ধ করছেন। একজনের পরনে প্যান্ট, ফুলহাতা সোয়েটার। অন্যজনের পরনে ধুতি আর গলাবন্ধ লম্বাকোট। দুজনে পরস্পরকে ধরে জাপটাজাপটি করছিলেন। তারপর ওই অবস্থায় রাস্তার পাশে ঘাসে গিয়ে পড়লেন। আশ্চর্য ব্যাপার, দুই যোদ্ধাই প্রবীণ। দুজনেরই মাথার চুল সাদা।
আমাদের গাড়ির প্রতি তাদের দৃকপাত নেই। কর্নেল সত্যিই বলেন, হিংসাজনিত ক্রোধ মানুষকে অন্ধ করে। কর্নেলের ইশারায় আমি যতটা সম্ভব নিঃশব্দে দুই মল্লযোদ্ধার প্রায় হাতবিশেক দূরে গাড়ি দাঁড় করালাম। আমি হাসছিলাম না। কারণ তাদের হুম হাম হুঙ্কার, ফোঁস ফোঁস শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ এবং পরস্পরের পোশাক টানাটানি দেখে মনে হচ্ছিল, এবার একজন। অপরজনের বুকে বসে গলাটিপে মেরে ফেলবেন।
আবার তারা উঠে দাঁড়িয়ে বিকট হুঙ্কার দিয়ে পরস্পর মল্লযুদ্ধে রত হতেই কর্নেল গাড়ি থেকে নামলেন। তারপর ক্যামেরা তাক করে এগিয়ে গেলেন। শাটার টেপার শব্দ কানে আসছিল।
এতক্ষণে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। দুই যোদ্ধারই চোখ পড়ল কর্নেলের দিকে। অমনই প্যান্ট-সোয়েটারপরা শ্যামবর্ণ ভদ্রলোক যেন দিশাহারার মতো বাঁদিকের জঙ্গলের ভিতরে সবেগে। উধাও হয়ে গেলেন। ধুতি-লংকোটপরা ফরসা ভদ্রলোকও ডানদিকে আমবাগানের ভিতরে একই বেগে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
কর্নেল তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসি হেসে বললেন তা হলে জয়ন্ত! আমরা সত্যিই একটা টাখি দেখলাম। তাই না?
গাড়ি থেকে নেমে বললাম কিন্তু কর্নেল, ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।
–কেন অস্বাভাবিক?
–আমাদের দেখে ওঁরা অমন করে পালিয়ে গেলেন কেন?
–বরং বলে আমাকে দেখে। কারণ আমি রাস্তায় নেমে ওঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
–তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু তা হলেও ওঁরা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে গেলেন। এর কারণ কী?
-তোমার কী ধারণা? একটু ভেবে বলল জয়ন্ত!
একটু ভেবে নিয়ে বাঁ হাতের ওপর ডান হাতের থাপ্পড় মেরে হাসতে হাসতে বললাম-বুঝেছি। দুজনেই দস্তুরমতো ভদ্রলোক। তাই লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে কেটে পড়লেন আর কী!
কর্নেল তাঁর সাদা দাড়ি মুঠোয় চেপে ধরে কী যেন ভাবছিলেন। বললেন-না জয়ন্ত! ক্যামেরা। আমার এই ক্যামেরাই ওঁদের পালানোর কারণ।
কথাটা এবার মনে ধরল। বললাম–হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক তা-ই। দুজনেই ভদ্রলোক। বুড়োবয়সে ওইভাবে মল্লযুদ্ধ করছেন। আর আপনি ক্যামেরায় সেই অদ্ভুত ঘটনার ছবি তুলতে যাচ্ছেন। সেই ছবি এলাকার পরিচিত লোকে দেখলে হাসাহাসি করবে। সেই ভেবেই ওঁরা রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন। কিন্তু আমি আপনার ক্যামেরার কয়েকটা ক্লিক শুনতে পেয়েছি।
কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। আমার হাতে ক্যামেরা এবং আমার উদ্দেশ্য টের পেয়েই ওঁরা পালিয়েছেন। তো-তুমি রণক্ষেত্র বললে। রণক্ষেত্রে ওটা কী পড়ে আছে?
বলে তিনি পিচরাস্তার ডানদিকে পিচ আর পাথরকুচির টুকরো উঠে গিয়ে যে ছোট্ট গর্ত হয়েছে, সেখান থেকে কী একটা জিনিস তুলে নিলেন। জিজ্ঞেস করলুম-পকেট থেকে কয়েন পড়ে গেছে। নিশ্চয়-যা যুদ্ধ চলছিল।
কর্নেল জিনিসটা তার জ্যাকেটের ভিতর-পকেটে ঢুকিয়ে রেখে গাড়িতে উঠলেন। আমিও উঠে পড়লাম। স্টার্ট দিয়ে লক্ষ্য করলাম, আমার বৃদ্ধ বন্ধুর মুখ হঠাৎ বেজায় গম্ভীর হয়ে উঠেছে। তিনি বললেন-এবার স্পিডে চলো, জয়ন্ত! দশটার মধ্যেই আমার সেচবাংলোয় পৌঁছুনোর কথা।
কিছুদূর চলার পর বাঁদিকে বাঁক নিয়ে রাস্তা সোজা এগিয়ে গেছে। এবার ডানদিকে সবুজ মাঠ এবং বাঁদিকে একই জঙ্গল–সেই ফরেস্ট টানা চলেছে। প্রায় দু কিলোমিটার পরে বাঁদিকে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে অর্থাৎ পূর্বদিকে পুরোনো আমলের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখলাম। তার নিচে স্বচ্ছজলের ঝিল। ঝিলের ওপাশে উঁচু বাঁধ। কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলাম–ওটা কি কোনও রাজারাজড়ার বাড়ি ছিল?
-হ্যাঁ। তবে বাড়ি নয়। কেল্লা। মোগল আমলের এক ফৌজদার জাহান খাঁর কেল্লাবাড়ি। ইচ্ছে হলে ওটা দেখে নিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে দরকারি বই খুঁজে দৈনিক সত্যসেবকে একটা। রিপোর্টাজ লিখে ফেলবে।
-এবার কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে, আপনার লক্ষ্য দুর্লভ প্রজাতির নীল সারস, নাকি অন্য কিছু?
কর্নেল হাসলেন। তাই বলুন! গত রবিবার ড. জয়ন্ত ঘোষাল আপনার কাছে এসেছিলেন।
-তুমি জানো না, ড. ঘোষাল একজন প্রখ্যাত ওর্নিহোলজিস্ট!
–সেটা কী?
–ওঃ জয়ন্ত! এযুগে সাংবাদিকদের সবজান্তা হওয়া দরকার। গ্রিক ভাষায় ওর্নিহো মানে পাখি।
-তার মানে ড. ঘোষাল এক পক্ষীতত্ত্ববিশারদ। মুম্বাইয়ের সালিম আলির নাম জানি!
-বাঃ! তিনি তো আর বেঁচে নেই। একজন বঙ্গসন্তান তার মতো কৃতিত্ব অর্জন করলে খুশি হব।
এবার সামনে উঁচু জমির ওপর সুদৃশ্য বাংলো ধাঁচের বাড়ি এবং উঁচু বাঁধের ওপর সারিবদ্ধ ইউক্যালিপটাস গাছের ফাঁকে বিস্তীর্ণ জল চোখে পড়ল। জলে উত্তরের বাতাসে সমুদ্রের মতো ঢেউ দেখা যাচ্ছিল। জায়গাটা আমার ভালো লাগল।
পিচরাস্তাটা বাংলোর দক্ষিণের নিচু পাঁচিলের পাশ দিয়ে এগিয়ে ডাইনে ঘুরে বাঁধের রাস্তায় মিশেছে। সেখানে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মনে হল, একটা পুরো পরিবার সাইট-সিইংয়ে এসেছে। হয়তো বাঁধের ওপর পিকনিকও করবে।
দারোয়ান গেট খুলে দিল। গাড়ি সুদৃশ্য লনে নুড়ির ওপর অদ্ভুত শব্দ করছিল। কর্নেলের নির্দেশে ডানদিকের পার্কিং জোনে গাড়ি দাঁড় করালাম। কর্নেলকে দেখে একজন রোগা মধ্যবয়সি ভদ্রলোক হন্তদন্ত এগিয়ে এসে নমস্কার করলেন। –আমি স্যার বাংলোর কেয়ারটেকার রমেন বিশ্বাস। তিনি উর্দিপরা একটা লোককে বললেন-ভৈরব! তুমি সায়েবদের লাগেজ নিয়ে এসো। আসুন কর্নেলসায়েব! আমি আপনাদের রুমে পৌঁছে দিই।
পার্কিং জোনে একটা জিপগাড়ি দেখিয়ে কর্নেল বললেন–কোনও অফিসার এসেছেন বুঝি?
রমেনবাবু চাপাস্বরে বললেন–চন্দ্রপুরের বড়োবাবু–মানে, থানার অফিসার-ইন-চার্জ রাজেন হাটি। দোমোহানির উত্তরে সরকারি জমি দখল করে কিছু উটকো লোকবসতি করেছে। তাই নিয়ে এলাকার দুটো রাজনৈতিক দলের মধ্যে রেষোরেষি চলেছে। বড়োবাবু কয়েকজন আমর্ড কনস্টেবল নিয়ে সেখানে গেছেন। বাংলোর চারটে ঘরের দুটো ঘর-বলতে গেলে উনি নিজেই জবরদখল করেছেন। ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের বাংলো। এখন হঠাৎ আমার ওপরওয়ালা কেউ এসে পড়লে আমাকেই কৈফিয়ত দিতে হবে। কিন্তু পুলিশ বলে কথা! আমি স্যার কী করি বলুন! রামে মারলে মারবে, আবার রাবণে মারলেও মারবে…!
বাংলোর চারদিকে চওড়া বারান্দা। পূর্ব-দক্ষিণের ডাবলবেড ঘরটি কর্নেলের জন্য রাখা ছিল। পূর্ব এবং দক্ষিণের বারান্দায় বসলে বিস্তীর্ণ জলাধার চোখে পড়ে। কিন্তু পূর্বদিকে উত্তরের উদ্দাম বাতাস। আমরা দুজনে দক্ষিণের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে ব্রেকফাস্ট করার পর কফি পান করছিলাম। বারান্দার নিচে রংবেরংয়ের ফুলের গাছ। তার মধ্যিখানে নুড়িবিছানো একফালি পথ। পথের শেষে গেট। উঁচু থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম, গেটের ওধারে শানবাঁধানো ঘাটের নিচে একটা সাদারঙের বোট।
.
কেয়ারটেকার রমেন বিশ্বাসের বাড়ি তিতলিপুর। অনর্গল বকবক করা ভদ্রলোকের অভ্যাস। কর্নেলকে সারা এলাকার খুঁটিনাটি খবরাখবর দিচ্ছিলেন। একবার আমি রমেনবাবুকে তিতলিপুরের কাছে রাস্তার ওপর দুই মল্লযোদ্ধা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম। কর্নেল তা টের পেয়েই চোখ কটমটিয়ে আমাকে বললেন- নীল সারস কি অত সহজে দেখা যায় জয়ন্ত? ড. ঘোষাল সাত-সাতটা দিন ঘোরাঘুরি করার পর দৈবাৎ দেখতে পেয়েছিলেন!
আমি চুপ করে গেলাম। রমেনবাবু বললেন–কী নাম বললেন কর্নেলসায়েব? ড. ঘোষাল?
কর্নেল বললেন-হা, ড. জয়ন্ত ঘোষাল। আপনার তাকে চেনার কথা। উনি এই বাংলোয় ছিলেন।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ। চিনতে পেরেছি। ঘোষালসায়েব এ মাসের গোড়ার দিকে এসেছিলেন। দিন ছ-সাত ছিলেন। কিন্তু রাত্রিটুকুই যা বাংলোয় কাটাতেন। ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন। আপনার মতো ক্যামেরা আর দূরবিন ছিল। বনবাদাড়ে আর এই ড্যামের জলে জেলেদের নৌকোয় চেপে পাখিদের ছবি তুলতে যেতেন। সঙ্গে একজন লোক দিয়েছিলাম। চন্দ্রপুরে তার বাড়ি। পাখিধরা তার পেশা স্যার! ফাঁদ পেতে পাখি ধরে কলকাতায় বেচে আসে। পুলিশের চোখে পড়লে তাকে জেল খাটতে হবে। কিন্তু পেটের জ্বালা স্যার সাংঘাতিক জ্বালা।
বললাম–কর্নেল! লোকটাকে সঙ্গী করতে পারেন! নীল সারসের খোঁজ সে নিশ্চয় রাখে।
কর্নেল কিছু বলার আগে রমেনবাবু বললেন–স্যার বললেই আমি রমজান পাখাডুকে খবর দেব।
-পাখাড়ু! অদ্ভুত পদবি তো!
রমেনবাবু হাসলেন। -হ্যাঁ স্যার। পাখি ধরে। তাই পাখাড়ু।
কর্নেল বললেন–তাকে দরকার হলে আমি আপনাকে বলব।
এই সময় বাংলোর কুকনরুঠাকুর এসে আমাদের সেলাম দিল। তারপর ট্রে-তে সাজিয়ে প্লেট, কফির পট আর কাপগুলো নিয়ে গেল। রমেনবাবুকে মুচকি হেসে চাপা স্বরে বললেন–একেই বলে ভাগ্য স্যার! তখন তিতলিপুরের জমিদারদের কথা বলছিলাম, নরু–মানে নরেন সেই বংশের ছোটোতরফের বংশধর। ওর পূর্বপুরুষের দাপটে এক সময় বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খেত! পূর্বজন্মের কাজের ফল। আর কী বলব?
কর্নেল অ্যাশট্রেতে চুরুট ঘষে নিভিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মাথায় টুপি চাপালেন। টাকে ইতিমধ্যে যথেষ্ট হিম লেগেছে মনে হল। তারপর ঘরে ঢুকে ওঁর কিটব্যাগ পিঠে এঁটে বেরিয়ে এলেন। গলায় ক্যামেরা, বাইনোকুলার ঝুলিয়ে বললেন-জয়ন্ত! তুমি বিশ্রাম করো। আমি একবার ড্যামের ওদিকে ঘুরে আসি।
তারপর তিনি পশ্চিমে সদর গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে বাংলোর নিচু বাউন্ডারি ওয়ালের ওপাশে তাকে দেখা গেল। বুঝলাম ড্যামের বাঁধের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাবেন। কতদূর যাবেন, তা তিনিই জানেন।
রমেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন-কর্নেলসায়েবেরও কি ঘোষালসায়েবের মতো পাখির নেশা আছে?
বললাম–নীল সারসের খোঁজে চললেন। এতক্ষণ কথা বলে বোঝেননি?
-তাই বটে! আপনি রেস্ট নিন স্যার! আমি নিজের কাজে যাই।
–এক মিনিট! আচ্ছা রমেনবাবু, তিতলিপুরের পাশ দিয়ে আসবার সময় রাস্তায় এক ভদ্রলোককে দেখলাম। ফরসা ঢ্যাঙা গড়ন। ধুতি আর ছাইরঙা লংকোট পরে আছেন! মাথার চুল সাদা। গোঁফদাড়ি কামানো। চেহারায় আভিজাত্য আছে। ষাটের বেশি বয়স বলে মনে হল। আর
রমেনবাবু হাসলেন। -বুঝেছি। আপনি যাকে দেখেছেন, তিনি তিতলিপুরের জমিদারদের বড়োতরফের বংশধর। দীপনারায়ণ রায়। কলকাতায় কী চাকরি করতেন শুনেছি। এখন রিটায়ার্ড। তবে মাঝে মাঝে তিতলিপুরে এসে বোনের বাড়িতে থাকেন। কিন্তু উনি কবে এসেছেন, জানি না।
উনি অন্য এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ ভদ্রলোকের পরনে প্যান্ট আর। সোয়েটার ছিল। শ্যামবর্ণ, একই বয়সের লোক। মাথার চুল সাদা। কিন্তু কাঁচাপাকা গোঁফ আছে। কী দুজনে তর্কাতর্কি হচ্ছিল মনে হল।
রমেনবাবু নড়ে উঠলেন। -বুঝেছি! বুঝেছি! চন্দ্রপুরের জাহাজিবাবু।
-জাহাজিবাবু মানে?
জাহাজে চাকরি করতেন। শম্ভুনাথ চৌধুরি। শম্ভুবাবুকে এ তল্লাটের লোকে জাহাজবাবু বলে। সত্যি বলতে কি, শম্ভুবাবুর সঙ্গে দীপনারায়ণবাবুর আত্মীয়তা আছে। সঠিক খবর জানি না। তবে চন্দ্রপুরে শম্ভুবাবুর পূর্বপুরুষও জমিদার ছিলেন।
–ওঁরা তর্কাতর্কি করলেও মনে হল, দুজনের মধ্যে বন্ধুতা আছে।
–আছে। ছোটোবেলায় দেখেছি শম্ভুবাবু ছুটি নিয়ে দেশের বাড়িতে ফিরলেই প্রায় প্রতিদিন দীপনারায়ণবাবুর সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন। তবে তর্কাতর্কি হচ্ছে দেখেছেন, ওটা স্যার স্বাভাবিক। আজকাল দেশে যা ঘটছে, তা নিয়ে মানুষে-মানুষে মতান্তর হতেই পারে। একেক গ্রামে দুটো-তিনটে করে দল হয়েছে। ওই যে বললাম মতান্তর! মতান্তর থেকে মনান্তর। তা থেকে মারামারি। খুনোখুনি! ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটোবেলায় পদ্যে পড়েছি। চলি স্যার!
বলে রমেনবাবু হন্তদন্ত বাংলোর সামনের দিকে গেলেন। দেখলাম, দারোগাবাবু সদলবলে ফিরে আসছেন। আমি ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এখানে জলাধারের আবহাওয়ায় শীতটা বড় জোরালো। কম্বল টেনে নিলাম। …
কর্নেলের ডাকে উঠে বসলাম। ঘড়ি দেখে নিলাম। একটা পাঁচ। কর্নেল বললেন–স্নান করে ঘুমোতে পারতে। বাথরুমে গিজার আছে। গরম জল পেতে।
বললাম–আপনি কতদূর ঘুরলেন?
–অনেক দূর।
–নীল সারসের খোঁজ পেলেন?
-নাঃ। তবে ফিলমের রোলটা শেষ করেছি। আজ রাত্রেই বাথরুমকে ডার্করুম বানিয়ে ফিলমগুলো ডেভেলাপ, ওয়াশ আর প্রিন্ট করে ফেলব।
বলে কর্নেল অর্থপূর্ণ হাসলেন। আমি বললাম–আমি দুই মল্লযোদ্ধার পরিচয় পেয়ে গেছি। চেহারার বর্ণনা দিতেই রমেনবাবু বললেন, ধুতিপরা লোকটি দীপনারায়ণ রায়। আর প্যান্টপরা। লোকটি-
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন–জয়ন্ত! তুমি বড্ড বোকামি করে ফেলেছ। রমেনবাবুর বাড়ি তিতলিপুরে। তুমি ওঁকে কি প্রকৃত ঘটনাটা বলেছ?
–আমার মাথাখারাপ? আমি দুজনকে রাস্তায় তর্কাতর্কি করতে দেখেছি। এই বলেছি।
কর্নেল বললেন–তাহলেও তুমি ঠিক করোনি। রমেনবাবু কী বললেন বলো!
রমেনবাবুর কাছে যা শুনেছিলাম, চাপা স্বরে তা জানিয়ে দিলাম। কর্নেলের মুখের গাম্ভীর্য তবু কাটল না। গলার ভিতরে বললেন–সমস্যা হল, রমেনবাবু আমরা এখানে থাকার সময় দৈবাৎ তার গ্রামে গিয়ে যদি দীপনারায়ণ রায়কে আমাদের পরিচয় দেন, কী ঘটবে বুঝতে পারছি না।
চমকে উঠে বললাম-কেন?
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন-যে জিনিসটা নিয়ে দুজনের মধ্যে কাড়াকাড়ি এবং শেষে ধস্তাধস্তি বেধেছিল, ওদের দুজনেরই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে, সেটা আমিই কুড়িয়ে পেয়েছি। কারণ আমিই গাড়ি থেকে নেমে ওদের ছবি তুলতে এগোচ্ছিলাম। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসটা কয়েন নয়।
–জিনিসটা তাহলে কী?
–ডিমালো গড়নের একটা ব্রোঞ্জের সিল। নাকি ওটা সিল নয়। ওতে একটা সারসের মূর্তি আছে। তা ছাড়া কয়েকটা চিহ্ন আছে। আমার মনে হয়েছে, ওটা মিশর থেকে কেউ চুরি করে এনেছে। মিশরের প্রাচীন চিত্রলিপিতে কিছু কথা লেখা আছে ওতে। জয়ন্ত! হয়তো আমরা না জেনে বিষধর সাপের ল্যাজে পা দিয়েছি। …
