নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো (কর্নেল সমগ্র) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
রাজপুরোহিত এবং হুমকি
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নিবিষ্ট মনে একটা বই পড়ছিলেন। হঠাৎ বইটা বুজিয়ে টেবিলে রেখে বললেন, সভ্যতার সঙ্গে বর্বরতার সম্পর্ক যেন অচ্ছেদ্য। বর্বরতা ছাড়া সভ্যতা হয়তো টেকে না।
একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। দেখলাম, তার চুরুট থেকে আর সেই নীল ধোঁয়ার আঁকাবাঁকা রেখাটা নেই। তার মানে, চুরুটটা কখন নিভে গেছে। তাঁর সাদা দাড়িতে একটুকরো ছাই এখনও আটকে আছে। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে তিনি অভ্যাসমতো চোখ বুজে টাকে হাত বুলোচ্ছেন। বললাম, বর্বরতাকে কি সত্যিই সভ্যতার মধ্যে আবিষ্কার করলেন? নাকি ওই বইয়ে কথাটা ছাপানো আছে?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, না জয়ন্ত! বইটা পড়তে পড়তে কথাটা আমার মাথায় এল।
কী বই ওটা?
কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে দেয়ালঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন। তারপর হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী!
তার প্রিয় পরিচারক ষষ্ঠীচরণ ভেতর থেকে সাড়া দিল, যাচ্ছি বাবামশাই!
চারটে পাঁচ বেজে গেছে। কর্নেল দাড়ি থেকে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বিরক্ত মুখে বললেন। ষষ্ঠীর এই একটা অদ্ভুত স্বভাব। মিসেস অ্যারাথুনের বেড়ালটাকে দেখতে পেলেই ওর মাথা খারাপ হয়ে যায়। জানালার পাশে লাঠি হাতে ওঁত পেতে থাকে। নির্বোধ আর কাকে বলে? ও বুঝতেই পারে না অত মোটাসোটা একটা বেড়াল জানলার গ্রিল গলিয়ে ঘরে ঢুকবে কী করে?
কথা শেষ হওয়ার আগেই ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি আর স্ন্যাক্স নিয়ে এই ড্রয়িং রুমে ঢুকেছিল। সে টেবিলে ট্রে রেখে গোমড়ামুখে বলল, আমি কি বেড়াল দেখছিলাম? অবেলায় খুব মেঘ করেছে। বিষ্টি হলেই কেলেঙ্কারি। রাস্তা একেবারে নদী হয়ে যাবে।
কথাটা বলে সে তেমনি গোমড়ামুখে চলে গেল। বললাম, আপনি একটু আগে সভ্যতা আর বর্বরতার কথা বলছিলেন। সভ্যতার প্রতীক এই কলকাতার রাস্তা এক পশলা বৃষ্টিতে সত্যিই নদী হয়ে যায়। বোঝা যাচ্ছে, ষষ্ঠীও সভ্যতার মধ্যে বর্বরতাকে আবিষ্কার করেছে। কারণ বৃষ্টির কলকাতাকে আর সভ্য বলেই মনে হয় না।
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে কফিতে মন দিলেন। তার কয়েক মিনিট
অবশ্যি এভাবেই এসে পড়ে। তিনতলায় কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরটা আবছা আঁধারে ভরে গিয়েছিল। ষষ্ঠী চুপচাপ এসে সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন, হু। বর্বরতা তোমাকে সম্ভবত আজ রাতের মতো আটকে দিল। না-পারবে তোমার পত্রিকা অফিসে যেতে, না-পারবে সল্টলেকে বাড়ি ফিরতে। তবে হ্যাঁ–ডিনারে তুমি সভ্যতার স্বাদ পাবে। ষষ্ঠী তোমাকে ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন খাওয়াবে।
আঁতকে উঠে বললাম, সর্বনাশ! অফিসে না ফিরলেই নয়। রিপন স্ট্রিটে পুলিস রেডের খবরটা খুব জরুরি। আমারই ভুল। কেন যে হঠাৎ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।
তুমিই বলছিলে রেড ধরে পুলিস কোনও চোরাই মাল পায়নি!
তা পায়নি। তবে এটাও তো একটা খবর।
কর্নেল ভুরু কুঁচকে তাকালেন। পুলিসের নিছক রেড করাও কি একটা খবর? জয়ন্ত! আজকাল দেখছি খবরের কাগজের যা মতিগতি, ষষ্ঠীর হাতে মিসেস অ্যারাথুনের বেড়ালটা দেবাৎ আক্রান্ত হলেও সেটা একটা খবর হয়ে উঠবে। তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সুনাম এভাবে নষ্ট করা উচিত নয়।
এই সময় ডোরবেল বাজল। একটু পরে ষষ্ঠী এসে বলল, এক পুরুতঠাকুর এসেছেন বাবামশাই!
কর্নেল তার দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে বললেন, তুই কী করে জানলি পুতঠাকুর এসেছেন?
ষষ্ঠীচরণ হাসল। চেহারা দেখেই মানুষ চেনা যায়। পুরুতঠাকুর কি আমি কখনও দেখিনি?
খুব হয়েছে। নিয়ে আয়।
এরপর যিনি কর্নেলের এই জাদুঘরসদৃশ ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন, তাঁকে দেখামাত্র বুঝলাম ষষ্ঠী চিনতে ভুল করেনি। আগন্তুক বয়সে প্রৌঢ়। তার গায়ে সাদা উত্তরীয় জড়ানো, পরনে খাটো ধুতি, কপালে লাল তিলক এবং খুঁটিয়ে ছাঁটা চুলের কেন্দ্রে গিট দিয়ে বাঁধা শিখাও আছে। পৈতে তো আছেই। নমস্কার করে কাঁচুমাচু মুখে তিনি বললেন, আমি কর্নেল সায়েবের সঙ্গে কিছু প্রাইভেট কথা বলতে চাই।
বলুন!
ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বিনীতভাবে বললেন, কথাটা প্রাইভেট।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আলাপ করিয়ে দিই। জয়ন্ত চৌধুরী। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক। আমাকে কেউ যা কিছু গোপন কথা বলুন, জয়ন্তর তা অজানা থাকবে না।
ভদ্রলোক আমাকে নমস্কার করে বললেন, আমার সৌভাগ্য! সত্যসেবক পত্রিকায় আপনার লেখার মাধ্যমেই কর্নেল সায়েবের পরিচয় পেয়েছি। আপনাদের কাগজের অফিস থেকে কর্নেল সায়েবের ঠিকানা জোগাড় করে সোজা এখানে চলে এলাম। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
কর্নেল বললেন, আপনি গাড়িতে এসেছেন দেখছি।
আজ্ঞে হ্যাঁ। পুরুতমশাইয়ের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। কাগজে যা পড়েছি, ঠিক তা-ই। আপনি সত্যিই
না। অন্তর্যামী নই। আপনি একটুও ভেজেননি। এই বাড়ির নীচে পোর্টিকো আছে। যাই হোক, যা বলার শিগগির বলুন। কারণ রাস্তায় জল জমে গেলে আপনার গাড়ি ফেঁসে যাবে।
পুরুতমশাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। চাপা গলায় বললেন, আপনি মোহনপুরের রাজবংশের কথা শুনে থাকবেন। দমদম এরিয়ায় ওঁদের একটা প্যালেস আছে। নামেই এখন মোহনপুর প্যালেস। জরাজীর্ণ খাঁ খাঁ অবস্থা। ওই বাড়িতে ওঁদের আরাধ্য দেবতা শ্রীবিষ্ণুর মন্দির আছে। সেই মন্দিরের সেবাইত আমি। আমার নাম নরহরি ভট্টাচার্য।
বেশ। কী ঘটেছে বলুন?
ভট্টাচার্যমশাই আরও চাপা গলায় বললেন, কথাটা কুমারবাহাদুরকে বলতে সাহস পাইনি। উনি বৃদ্ধ মানুষ। তার ওপর গত মাসে বাথরুমে পড়ে গিয়ে পক্ষাঘাত রোগে শয্যাশায়ী। ওঁর বউমা ছন্দা আমাকে বাবার মতো ভক্তি শ্রদ্ধা করে। তাই তাকেই শুধু জানিয়েছি! কুমারবাহাদুরকে জানাতে নিষেধ করেছি। তো ছন্দা আমাকে পুলিসের কাছে যেতে বলেছিল। কিন্তু ভেবে দেখলাম
সংক্ষেপে বলুন। বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে।
মন্দিরের লোহার দরজা ব্রিটিশ আমলে সায়েব কোম্পানির তৈরি। ওতে একটা অদ্ভুত তালা আছে। সেই তালা কীভাবে খুলতে হয়। তা জানেন শুধু কুমারবাহাদুর আর আমি। তো সম্প্রতি কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি, শ্রীবিষ্ণুর বুকের কাছে একটা রেখা ফুটে উঠেছে। কিন্তু তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, নিরেট সোনার মূর্তির রঙ কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। এত বছর ধরে আমি শ্রীবিষ্ণুর সেবা করছি। কিন্তু এমন তো কখনও দেখিনি! তাই মনে একটা খটকা লেগেছে।
আপনার খটকা কি এই যে, আসল মূর্তিটা কেউ হাতিয়ে নিয়ে অবিকল-একই চেহারার একটা নকল মূর্তি বসিয়ে রেখেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ঠিক ধরেছেন। কুমারবাহাদুর জানতে পারলে সর্বনাশ হবে। আপনি যদি দয়া করে আসল মূর্তিটা উদ্ধার করে দেন, প্রাণে বেঁচে যাব।
কুমারবাহাদুরের ছেলে, মানে ছন্দাদেবীর স্বামী কী করেন?
মৃগেন্দ্র গত বছর ক্যান্সারে মারা গেছে। সে একটা কোম্পানিতে বড় পোস্টে চাকরি করত। তার মৃত্যুর পর ছন্দা শ্বশুরমশাইয়ের কাছেই আছে। একমাত্র সন্তান ছিল মৃগেন্দ্র।
যে গাড়িতে এসেছেন, সেটা কার?
মৃগেন্দ্রর গাড়ি। গাড়িটা ছন্দা স্বামীর স্মৃতি বলে বেচে দেয়নি। নিজেই ড্রাইভিং শিখেছে।
এবং আপনিও ড্রাইভিং শিখেছেন!
নরহরি ভট্টাচার্য আড়ষ্টভাবে একটু হেসে বললেন, আজ্ঞে, এ বয়সে ড্রাইভিং শেখা শক্ত। তবে বাধ্য হয়েই শিখতে হয়েছে। ছন্দা তো সবসময় শ্বশুরমশাইয়ের সেবাযত্ন নিয়ে ব্যস্ত। মাইনে দিয়ে ড্রাইভার পোষারও ক্ষমতা নেই। তাই ছন্দা আমাকে তাগিদ দিয়েছিল। কিন্তু আপনি দেখছি, সত্যিই
না। আপনার হাতে গাড়ির চাবি দেখতে পাচ্ছি। যাই হোক, আর দেরি করবেন না। রাস্তায় জল জমে যাচ্ছে।
ভট্টাচার্যমশাই উঠে দাঁড়ালেন। আবার নমস্কার করে বললেন, ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। লোহার কপাট না ভাঙলে মন্দিরে চোর ঢোকা অসম্ভব। দয়া করে যদি একবার পায়ের ধূলো দেন, ভালো হয়। এই নিন। মোহনপুর প্যালেসের ঠিকানা আমি লিখে এনেছি।
ভাঁজ করা একটা কাগজ দিয়ে রাজবাড়ি পুরোহিত দ্রুত প্রস্থান করলেন। দেখলাম, কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতস কাচ বের করে ঠিকানাটা খুঁটিয়ে দেখছেন। একটা ঠিকানা পড়ার জন্য আতস কাচ কেন দরকার হল বুঝতে পারলাম না।
উঠে গিয়ে জানলার পর্দা সরিয়ে নীচের রাস্তার অবস্থা দেখে এলাম। বৃষ্টি সমানে ঝরছে। তবে এখনও রাস্তায় বেশি জল জমেনি। এখনই বেরিয়ে পড়তে পারলে অফিসে না ফিরে বরং ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস হয়ে সল্টলেকে ফিরতে পারতাম।
কর্নেল আতস কাচ এবং ঠিকানাটা ড্রয়ারে রেখে বললেন, তুমি কী চিন্তা করছ, তা বুঝতে পারছি জয়ন্ত! কিন্তু তুমি ইলিয়ট রোড থেকে যদি বা বেরুতে পারো, মল্লিকবাজারের সামনে জ্যামে আটকে যাবে। কারণ আমি দেখেছি, এই সময়টাতে ওখানে প্রতিদিন ট্রাফিক জ্যাম হয়। এদিকে বৃষ্টি পড়লেই সব গাড়ি যেন বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এখন তুমি যদি শর্টকাটে যেতে চাও, তোমাকে ই এম বাইপাসে পৌঁছুতে দরগা রোড ধরতে হবে। সেখানে ততক্ষণে একহাঁটু জলে। তোমার পেট্রোল কার ফেঁসে যাবে। কাজেই চুপটি করে বসো।
অগত্যা চুপটি করেই বসে রইলাম। কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে আরেক পেয়ালা কফির হুকুম দিয়ে সেই গাব্দা বইটা টেনে নিলেন। এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম, বইটার নাম দি মিসটিরিয়াস বাটারফ্লাই।
আমার বৃদ্ধ বন্ধুর অবিশ্যি পাখি-প্রজাপতি-ক্যাক্টাস-অর্কিড এসব বিষয়ে প্রচণ্ড বাতিক আছে। কোথাও বাইরে গিয়ে বিরল প্রজাপতির খোঁজে দিনভর টো টো করে ঘোরেন। কিন্তু রহস্যময় প্রজাপতি ব্যাপারটা বুঝলাম না। কিছুক্ষণ পরে ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল এবং চোখ নাচিয়ে ফ্রায়েড রাইস-চিকেনের আভাসও দিল। কর্নেলের দৃষ্টি বইটার পাতায়। বৃষ্টি কখনও জোরে কখনও আস্তে প্রকৃতির অর্কেস্ট্রা শোনাচ্ছে।
কফি খেতে খেতে হঠাৎ মোহনপুর রাজবাড়ির বিষ্ণুমূর্তির কথা মনে পড়ে গেল। আজকাল দামি রত্নের মূর্তি বলেও নয়, যে-কোনও মূর্তি প্রাচীন হলেই বিদেশে চড়া দামে পাচার হয়ে যায়। তবে এই মূর্তিটা নাকি নিরেট সোনার। যদি কোনও চোর সেটা হাতিয়ে থাকে, সোনা বেচেই সে বড়লোক হয়ে যাবে।
কতক্ষণ পরে টেলিফোনের শব্দে আমার চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে গেল। কর্নেল বললেন, ফোনটা ধরো জয়ন্ত!
ফোন তুলে সাড়া দিতেই কেউ ধমক দিল, এই ব্যাটা বুড়ো ঘুঘু! মরণ ফাঁদ পাতা আছে। সাবধান!তার পরই লাইন কেটে গেল। ফোন রেখে কর্নেলের দিকে তাকালাম। আমার বুকটা ধড়াস করে কেঁপে উঠেছিল। তখনও কাঁপুনি থামেনি।
কর্নেল মুখ তুলে একটু হেসে বললেন, কেউ হুমকি দিল তো? বাহ! খুব ভালো।…
