টাঁড়বাঘোয়া (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
টিকায়েত একটা শিশু গাছে মাচা বেঁধে বুড়ির মৃতদেহের কাছে বসেছিল গিয়ে। তবে, গাছটা থেকে মড়িটা বেশ দূরে।
যে-লোকরা টিকায়েতকে মাচায় চড়িয়ে ফিরে এসেছিল বিকেল বিকেল তাদের মুখেই শুনলাম যে, টিকায়েত মড়ির উপরে বাঘকে মারবার আশা রাখে না। মড়িতে যাওয়া অথবা ফেরার পথেই বাঘকে মারবে এমন আশা করছে সে। একনলা গ্রীনার বন্দুকের নলের সঙ্গে তিন ব্যাটারীর টর্চ লাগিয়ে নিয়েছে ক্ল্যাম্পে। গ্রীনার নামকরা বন্দুক। ডাবলিউ, ডাবলিউ, গ্রীনার। ইংরেজদের কোম্পানী 1 টিকায়েতের বন্দুকের বত্রিশ ইঞ্চি লম্বা ব্যারেল। রেঞ্জও ভাল। বাঘ যদি কাছাকাছি আসে তবে লেথা বল্-এর গুলি বাঘের ভাইটাল জায়গায় লাগলে বাঘ যে মরবে না, এমন কথা বলা যায় না।
আস্তে আস্তে পলাশবনার পশ্চিম দিগন্তে লালটুলিয়া পাহাড়ের আড়ালে সূর্য বিদায় নিল। আমি সারাদিন ঘুমিয়েছি। রাতে আমিই পাহারা দেব। টেড ঘুমোবে ঘরের বাইরে চৌপাইতে। তেঁতুলতলাতে ছায়া জমবে ঘন হয়ে কৃষ্ণপক্ষের রাতে। একটু চাঁদও উঠবে শেষ রাতে। তাই সেখানে ঘুমোলে ঘুম চিরঘুমও হতে পারে। ঘরের মধ্যে টিরিদাদা ঘুমোবে।
কিন্তু টিরিদাদা কি ঘুমোতে পারবে? টিকায়েতের পাঠানো যবের ছাতু ঘি, কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে যে লিট্টি বানিয়েছিল, তা খেয়ে এই গরমে আমাদের তো প্রাণ আঁই-ঢাঁই। আমার তাও দেশী পেট–মামাবাড়ি গিরিডিতে লিট্টি-ফিট্টি খাওয়া অভ্যেস আছে। কিন্তু বেচারী টেড-এর অস্ট্রিয়ান পেটে এই লিট্টি যে কোন আলোড়ন তুলছে তা টেডই হাড়ে হাড়ে বুঝছে। দেখি সে। পেটে ভিজে গামছা জড়িয়ে চৌপাইতে বসে হাঁসফাঁস করছে আর টিরিদাদাকে। দোষারোপ করছে।
রাত আটটা বাজতে না বাজতেই গ্রামের সমস্ত শব্দ মরে গেল। ভাঁটা পড়লে, সুন্দরবনের ট্যাকে যে এক গভীর, বিষণ্ণ অথচ যে-কোনও সাংঘাতিক ঘটনার জন্যে তৈরি এক নিভৃত নীরবতা নেমে আসে তার সঙ্গে এই মানুষখেকো বাঘের রাজত্বের স্তব্ধ নীরবতার তুলনা চলে। গ্রামের কুকুরগুলোও। যেন কেমন ভয়ার্ত গলায় ডাকছে। একটা বড় হুতোম পঁাচা উড়ে গেল দুরগুম। দুরগুম দুরগুম করে ডাকতে ডাকতে তেঁতুলতলার অন্ধকার ছেড়ে। দূরে, দুটি ছোট পেঁচার ঝগড়া বাধল যেন কী নিয়ে। কিঁচি কিচি কিচ কিচি কিচি কিচর আওয়াজ করতে করতে ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে বেড়াতে লাগল ওরা। কিন্তু মনে হল, ওদের মামলা সেই রাতে নিষ্পত্তি হওয়ার নয়।
টিরিদাদা ঘর থেকে হাই তুলে বলল, হায় রাম! হায় রাম!
তারপরই সুর করে গুনগুনিয়ে তুলসীদাস আবৃত্তি করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর টিরিদাদা এবং টেড দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘরের বাইরে দেওয়ালের কাছে আমার চৌপাইটা টেনে এনে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে বসে থাকলাম আমি, আমার দু উরুর উপরে আমার প্রিয় রাইফেলটা আড়াআড়ি করে রেখে। এই রাইফেলটা টেড-এর দেশে তৈরি। ম্যানলিকার শুনাব। ক্যালিবার পয়েন্ট থ্রি-সিক্স। এই দিয়ে আমি ছায়াকেও মারতে পারি, অন্ধকারে দৌড়ে যাওয়া জংলি ইঁদুরকেও, এমনই বোঝা-পড়া হয়ে গেছিল আমার রাইফেলটার সঙ্গে বারো বছর বয়স থেকে। এই রাইফেলটা যদি কথা বলতে পারত তাহলে তোমাদের অনেক অনেক গল্প বলতে পারত। গল্প নয়; সত্যি কথা সব।
দূরের মহুয়া গাছগুলোর নীচে.শম্বরের দল মহুয়া কুড়িয়ে খাচ্ছে। হাওয়াতে মহুয়ার গন্ধ আর করৌঞ্জের গন্ধ ভাসছে। হঠাৎ মহুয়াতলাতে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। বোধহয় ভালুকদের সঙ্গে মহুয়ার ভাগ নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে শম্বরদের।
তোমরা কি কখনও ভাল্লুকদের গাছে চড়তে দেখেছ? দেখলে হেসে কূল পাবে না। ওরা পেছন দিক দিয়ে গাছে ওঠে। কেন যে অমন করে ওঠে তা জিগগেস করার ইচ্ছে আছে অনেকদিনের কিন্তু একটাও বাংলা বা ইংরিজী জানা ভাল্লুকের সঙ্গে দেখা-না-হওয়ায় জিগগেস করা হয়ে ওঠেনি। ওদের নিজেদের ভাষায় শব্দ বড় কম এবং আমাদের অভিধানে তাদের মানেও লেখা নেই।
টিকায়েত কী করছে এখন কে জানে। এমন অন্ধকার চারদিকে যে, মনে হয় অন্ধকার মুখে-চোখে থাপ্পড় মারছে। দু’হাত দিয়ে অন্ধকারের চাদর সরিয়ে দেখতে চাইলেও কিছুই দেখা যায় না।
গরমের দিনে জঙ্গলে হাওয়া বয় একটা। শুকনো লাল হলুদ পাতা ঝরিয়ে পাথরে আর রুখু মাটিতে গড়িয়ে. সেই হাওয়া ঝর ঝর সড় সড় শব্দ তুলে বেগে বয়ে যায় দমকে দমকে। তখন টিরিদাদার ভাষায় : যত সব কাটুনেওয়ালা জানোয়ারদের চলাফেরার ভারী সুবিধা। শব্দের মধ্যে, মর্মরধ্বনির মধ্যে তাদের। পায়ের শব্দ শুনতে পায় না কি না অন্য অহিংস্র জানোয়ারেরা।
নিস্তব্ধ বনে জঙ্গলে যখন হাওয়া থাকে না, নিথর হয়ে থাকে যখন আবহাওয়া, তখন একটা ঝরা-পাতা মাটিতে পড়ার আওয়াজকেও বোমা পড়ার আওয়াজ বলে মনে হয়। জংলী ইঁদুর বা গিরগিটি মরা ঘাস পাতার উপর দিয়ে দৌড়ে গেল বুঝি। যখন চোখ কোনও কাজে লাগে না তখন কান দিয়েই দেখতে হয়।
এই অন্ধকার, তারা-ফোটা হালকা নীল সিল্ক শাড়ির মতো উদ্বেল আকাশ যেন উড়তে থাকে মাথার উপরে আদিগন্ত চাঁদোয়ার মতো। হাওয়াতে তারারা কাঁপে, মনে হয় মিটমিট করে। দারুণ লাগে তখন তাকিয়ে থাকতে। অন্ধকারের এক দারুণ পুরুষালী মৌনী রূপ আছে। তোমরা যদি মনের সব জানলাগুলো খুলে দিয়ে, ইন্দ্রিয়ের আন্তরিকতা দিয়ে সেই রূপকে অনুভব করার চেষ্টা করো, তাহলে নিশ্চয় তা অনুভব করতে পারবে। এমন সব অন্ধকার রাতেই তো আলোর তাৎপর্য, আলোর আসল চেহারাটা বোঝা যায়। অন্ধকার নইলে, আলো আলোকিত করত কাকে?
দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে এসব ভাবছি। টেড রীতিমত নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। ওর নাক ডাকলে অদ্ভুত একটা ফিচিক্ ফিচিক্ করে আওয়াজ হয়। সাহেবদের ব্যাপারই আলাদা। আর ঘরের মধ্যে টিরিদাদা! ঐ রোগা সিঁড়িঙ্গে চেহারা হলে কী হয়, ওর নাক-ডাকা শুনলে মনে হয় ধাঙ্গড়পাড়ার কোনও কোঁৎকা শুয়োরকে বুঝি কেউ জলে ডুবিয়ে মারছে।
টাঁড়বাঘোয়া যদি কাছাকাছি এসে পড়ে তবে নির্ঘাত টিরিদাদার জন্যেই আসবে এবং তাহলে টিরিদাদার কারণেই বাঘকে গুলি করার সুযোগ পাব।
কিন্তু বাঘ যদি সত্যিই এসে পড়ে তাহলেও কি গুলি করা মানা! টিকায়েতকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। কথা ছিল, আমরা বাঘ মারতে যাব না তিনদিন। কিন্তু বাঘ যদি আমাদের মারতে আসে তাহলে কী করব সে কথা আমাদের “জেন্টলমেনস্ এগ্রিমেন্টে” লিখতে ভুল হয়ে গেছে। মহা চিন্তার কথা হল।
জঙ্গলের মধ্যে ডিউ-উ-ডু-ইট পাখি ডাকছে উড়ে উড়ে। ঐ পাখিগুলো যখন আকাশে উড়ে বেড়ায় তখন ওদের লম্বা পা দুটি শূন্যে আলতো হয়ে ঝোলে লম্পট করে, ভারী মজার লাগে দেখতে। এদের চোখ এড়িয়ে রাতের জঙ্গলে কোনও কাটুনেওয়ালা জানোয়ার অথবা মানুষের চলাফেরা করা ভারী মুশকিল। কী দেখল পাখিগুলো কে জানে?
এখন ঐ টিলার কাছে অন্ধকার কেমন ঘন হয়েছে তাই ভাবছিলাম। টিকায়েত মাচাতে একাই বসেছে। তবে, দুপাশের দুটি গাছে তীর-ধনুক নিয়ে তার দুই অনুচর বসেছে। টিকায়েতের মাচাটাই নাকি সবচেয়ে নিচু। নিচু না হলে গুলি করতে অসুবিধা হয়। তবে বেশি নিচু হলে বিপদও থাকে। বিশেষ করে, মানুষখেকো বাঘের বেলাতে। সেই রঙ্গমঞ্চে এখন কী প্রতীক্ষা আর তিতিক্ষার সঙ্গে বসে আছে পলাশবনা গ্রামের রাজা আমাদের টিকায়েত, কে জানে!
বসে বসে এই সব ভাবছি। আর ঘুমিয়ে যাতে না পড়ি সে কথা নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, ঠিক এমন সময় আমাদের সোজা সামনে প্রায় মাইল খানেক ভিতরে গভীর জঙ্গলের ভিতর থেকে বাঘের ডাক শোনা গেল। উম–আও–
গভীর রাতের সমস্ত শব্দমঞ্জরী, পিউ-কাঁহা পাখির ক্রমাগত ডাক, পেঁচাঁদের চেঁচানি সব মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল। এই জন্যেই বাঘকে বলে, বনের রাজা। সে কথা বললে বনের সব প্রাণী চুপ করে থাকে সম্ভ্রমে : সম্মানে।
বাঘ যেদিক থেকে ডাকল সেই দিকে তাকিয়ে আছি, ঠিক সেদিক থেকে অন্য একটা বাঘের ডাক ভেসে এল। এই ডাকটা অনেক বেশি গম্ভীর, ভারী এবং জোর। মনে মনে ভাবলাম, ঐ দ্বিতীয় বাঘটাই টাঁড়বাঘোয়া।
হঠাৎ দেখি টেড উঠে বসেছে চৌপাইয়ে।
আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ কচলে বলল, বাঘেরা কি মিছিল করে বেরুল নাকি?
আমি বললাম, শ–শ–শ
এমন সময় প্রথম বাঘটা আবার ডাকল এবং ডেকে দ্বিতীয় বাঘটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। একদল হনুমান হুপ—হুপ–হুপ ডাক ছেড়ে পাতাঝরা গাছেদের ডালে ডালে ঝাঁপাঝাঁপি শুরু করে দিল।
টেড বলল, দুজনে মিলে বুড়ি আর টিকায়েত যেদিকে আছে সেদিকে যাচ্ছে। বুঝলি।
আমি বললাম, তাই-ই তো মনে হচ্ছে।
টেড বলল, টিকায়েত দুটো বাঘকে সামলাবে কী করে একা? তারপর মাচাও তো শুনলাম বেশি উঁচু করেনি।
আমি বললাম, সে সেই-ই বুঝবে। তুই চুপ করে শুয়ে পড় না।
কেন? চল্ না আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়ি। বাঘেদের আওয়াজ যখন শোনা গেল তখন চল্ স্টক করি।
আমি বললাম, এই অন্ধকারে? মানুষখেকো বাঘের পেছনে পায়ে হেঁটে! দিনে হলে তাও কথা ছিল।
তারপরই বললাম, আমার একটাই জীবন। জীবনটাকে আমি খুবই ভালবাসি। আত্মহত্যার মধ্যে আমি নেই।
টেড বলল, তুই ভীতু।
তবে তাই।
টেড আবার শুয়ে পড়ল।
ডানদিক থেকে একটা কোটরা হরিণ ক্রমাগত ডাকতে লাগল ভয় পেয়ে। তার ব্বাক—ব্বাক–ব্বাক ডাক জঙ্গলে-পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসতে লাগল আমার মাথার মধ্যে। ডিউ-উ-ডু-ইট পাখিগুলো ডিউ-উ-ডু-ইট, ডিউ-উ-ডু-ইট করে ডাকতে ডাকতে ডানদিকে উড়ে উড়ে সরে যেতে লাগল।
চোখ কান সজাগ রেখে আমি বসে রইলাম। একটু পরই আবার টেডের ফিচিক ফিচিক করে নাক ডাকার আওয়াজ শুনতে পেলাম। টিরিদাদার নাক ডাকা এখন বন্ধ। কী হল কে জানে।
ডিউ-উ-ডু-ইট পাখিগুলোর ডাক ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। ওরা অনেক ডানদিকে চলে গেছিল ততক্ষণে। কে জানে, বাঘ দুটো এখন কোথায়? টিকায়েতই বা কী করছে? অত নিচুতে মাচাটা বাঁধা ঠিক হয়নি। দু দুটো বড় বাঘ। তায় মানুষখেকো।
ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম, রাত তিনটে বেজে গেছে। আমার বসে থেকে থেকে খুবই ঘুম পেয়ে গেছিল। শেষ রাতের ফুরফুরে হাওয়া, মহুয়া আর করৌঞ্জের মিষ্টি গন্ধ; ঘুমের দোষ নেই। পাছে ঘুমিয়ে পড়ি, তাই উঠে পায়চারী করতে লাগলাম রাইফেল হাতে। একবার পেছন ফিরতেই মনে হল একটা ছায়া যেন সরে গেল তেঁতুলতলার পাশ থেকে। টর্চ ফেলে দেখলাম, শেয়াল। একজোড়া। আলো পড়তেই ওদের দু-জোড়া চোখ জ্বলে উঠল লাল হয়ে। পরক্ষণেই ওরা চলে গেল।
আস্তে আস্তে পুবের আকাশের অন্ধকারের ভার হাকা হতে লাগল। অন্ধকারেরও যে কতরকম রঙ, কতরকম ঘনতা, তা ভাল করে নজর করে দেখলে দেখা যায়। অন্ধকারের গায়ের কালো, ফিকে হতে হতে জোলো দুধের মতো সাদাটে হয়ে যাবে আস্তে আস্তে, তারপর মিহি সিঁদুরের হালকা গুঁড়োর মতো রঙ লাগবে আকাশের পুবের সিঁথিতে। আরও পরে, আসামের পাকা কমলালেবুর রঙের মতো লাল হবে। তারপর রোদ উঠলে আলোর রঙকে আর আলাদা করে চেনা যাবে না। সূর্যের সাত রঙ মাখামাখি হয়ে উজ্জ্বল দিনের শরীরে বিশ্বচরাচরকে আলোকিত করে তুলবে। রাতের পাখিরা, রাতের প্রাণীরা ঘুমুবে; দিনের পাখি, প্রজাপতি, নানান প্রাণী জেগে উঠবে। ভোরের মিষ্টি ঠাণ্ডায় আর দিনের আলোর অভয়-আশ্বাসে কচি পাতা ছিঁড়ে খাবে চিতল হরিণের দল। শম্বরেরা গাঢ় জঙ্গলের ভিতরে কোনও নালার ছায়াতে গিয়ে ঢুকবে। শুয়োরেরা নেমে যাবে পাহাড়তলীর খাদে। রাতভর পেটভরে খাওয়ার পর চিৎপটাং হয়ে পড়ে থাকবে এ ওর ঘাড়ে ঠ্যাং তুলে দিয়ে।
ভোর হয়ে আসছে, এমন সময় পরপর দু-দুটো গুলির আওয়াজ কানে এল। প্রথম গুলিটা থেকে পরের আওয়াজটা দু মিনিট মতো ব্যবধানে হল।
তারপর সব চুপচাপ।
টেড গুলির শব্দে লাফিয়ে উঠল। টিরিও বাইরে এল। কথা না বলে, কাঠের উনুনে চায়ের জল চাপাল। তারপর বালটিতে করে জল আর হাতে করে ঘটি নিয়ে এল আমাদের জন্যে।
টেড বলল, দেখলি, তোকে বলেছিলাম, মিছিমিছিই এলাম আমরা। টিকায়েতই মেরে দিল দু-দুটো বাঘ। তার কথা রাখল। এবার চল, টিকায়েতের মাঠরী আর চা খেয়ে মহুয়ামিলনে ফিরি আমরা। আর এখানে থেকে কী করব?
আমি বললাম, গাঁয়ের লোকেরা একটা শম্বর মেরে দিতে বলেছিল যে, ওদের। বলেছিল, বহুদিন ভাল করে মাংস খায় না ওরা! কথা দিয়েছিলাম, একটা শম্বর মেরে দেব ওদের খাওয়ার জন্য। মাংস ওদের দিয়ে, আমরা চামড়াটা নিয়ে চলে যাব।
টেড বলল, বুঝলি, এবার একটা সুটকেশ বানাব আমি, তুই শম্বর মারলে।
তারপর বলল, কিন্তু এই এমনভাবে বলছিস যে, মনে হচ্ছে গাঁয়ের লোকে তোর জন্যে যেন শম্বর গাছতলাতে বেঁধে রেখেছে?
আমি বললাম, বেঁধে রাখবে কেন? বাঘ মরে গেছে তো আর ওদের জঙ্গলে যেতে ভয় নেই কোনও। ওরা জঙ্গলের সব খবরই রাখে। জানোয়ারদের বাহা সাহা-এরও। ওরা হাঁকোয়া করবে আর জায়গামতো আমরা রাইফেল নিয়ে দাঁড়ালেই মারা পড়বে শম্বর।
তা হতে পারে।
বলেই, টেড বলল, আমি তাহলে একটু ঘুরে আসছি।
তারপর বলল, টিরিদাদা এক ঘটি জল দাও জঙ্গলে ঘুরে আসি।
আমি বললাম, খালি হাতে যাস না, রাইফেলটা নিয়ে যা।
টেড বলল, রাইফেল আর কী হবে? বাঘ তো মরেই গেছে।
টেড আর টিরিদাদা ঘুম থেকে উঠে পড়ার পর আমার দু চোখে ঘুম যেন ভেঙ্গে এল।
চৌপাইটা টেনে নিয়ে আমি শুয়ে পড়লাম।
টিরিদাদা চা আর মাঠরী এনে ডাকল আমাকে।
চোখ মেলে দেখলাম, টেড ফিরে আসছে জঙ্গল থেকে।
হঠাৎ টিরিদাদা দূরে চেয়ে বলল, ও কী? কারা অমন দৌড়ে আসছে?
টেড ও আমি তাকালাম ওদিকে। ততক্ষণে গ্রামের অনেক লোক আমাদের কাছে চলে এসেছে। আমাদের যখন সকাল, গ্রামের লোকের তখন অনেক বেলা। দুটো লোক ডানদিক থেকে দৌড়ে আসছে আর টিকায়েতের সাদা ঘোড়াটাকে লাগাম ধরে কে যেন নিয়ে চলেছে ঐ লোকগুলোর দিকেই। টিকায়েতের সহিস হবে।
ছুটে-আসা লোক দুটোর সঙ্গে যখন ঘোড়া আর সহিসের দেখা হল তখন ওরা সকলে মিলে একসঙ্গে আমাদেরই দিকে জোরে ফিরে আসতে লাগল। সহিস, যে ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ঐদিকে এতক্ষণ, সে-ও ঘোড়ার পিঠে উঠে জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে ওদের আগে আগেই আমাদের কাছে এসে পৌঁছে গেল।
ঘোড়া থেকে নেমেই সহিস বলল, খা বন্ গীয়া সাহাব। খারা বন্ গীয়া। ভারী খারা।
গ্রামের লোকেরা উঁচু নিচু নানা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, খারা বন্ গীয়া হো ও-ও-ও-ও, খাতরা বন্ গীয়া।
আর সেই ডাকের সঙ্গে সঙ্গে পি পিল্ করে ছেলে বুড়ো মেয়ে সবাই দৌড়ে এল এদিকে।
সহিস, আমাদের দুঃসংবাদটা দিয়েই জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল টিকায়েতের বাড়িতে খবরটা দিতে। ততক্ষণে সেই ছুটে আসা লোক দুটোও আমাদের কাছে পৌঁছে গেছে।
ওরা এসেই ধ্বপ্ করে মাটিতে বসে পড়ল। ওরা যা বলল, তার সারমর্ম হল। এই
বাঘ দুটো সারারাত টিলার অন্য পাশে ছিল। ওদের সামনে দিয়ে একবারও যায়নি। ওদের অনেক পেছন দিয়ে ঘুরে গিয়ে টিলার পেছনে পৌঁছেছিল, তাই টিকায়েতের গুলি করার সুযোগ আসেনি। টাঁড়বাঘোয়া নয়, অন্য বাঘটা বোধহয় কোনও হরিণ-টরিণ মেরে থাকবে। সেটাকে ওরা দুজনে মিলে টেনে মিয়ে গেছিল টিলার পেছনে। কোনও কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজ পেয়েছিল ওরা। টিলার কাছাকাছি অন্ধকার এত ঘন ছিল যে, চোখে নিজেদের হাত-পা-ই ওরা নিজেরা দেখতে পাচ্ছিল না অন্ধকারে। দূরের কিছু দেখার কথাই ওঠে না। সারারাত বাঘ দুটো জানোয়ারটার মাংস হেঁছেড়ি করে হাড় কড়মড়িয়ে খেয়েছে আর মাঝে মাঝে গোঁ গোঁ করেছে। বুড়ির মৃতদেহ যেখানে পড়েছিল সেখানে কিন্তু একবারও আসেনি একটা বাঘও, সারা রাতে।
যখন প্রায় ভোর হয়ে এসেছে, তখন টাঁড়বাঘোয়া আস্তে আস্তে, হয়তো মুখ বদলাবার জন্যেই বুড়ির পা আর মাথা যেখানে পড়েছিল সেইদিকে এগিয়ে এসে বুড়িকে খেতে শুরু করল। বিরাট বাঘটাকে তখন আবছা আলোতেও দেখা যাচ্ছিল। আবছা-আলোতে খুব ভাল করে অনেকক্ষণ ধরে নিশানা নিয়ে টিকায়েত গুলি করে। গুলি লেগেছিল টাঁড়বাঘোয়ার গায়ে। ঠিক কোন্ জায়গায় তা ওরা বলতে পারবে না।
গুলি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঘটা একটা সোজা লাফ দিয়ে উপরে উঠল প্রায় পনেরো ফিট। তার পরে ধপ্পাস করে পড়ল নীচে, ডিগবাজী খেয়ে। পড়েই আর এক লাফে টিলার আড়ালে চলে গেল একটুও শব্দ না করে। আর সঙ্গে সঙ্গে বাঘিনী বেরিয়ে এসে যেখানে টাঁড়বাঘোয়ার গায়ে গুলি লেগেছিল, ঠিক সেখানেই এসে দাঁড়াল। টিকায়েত ততক্ষণ ফোঁটা গুলিটা বদলে নিয়েছিল। বাঘিনী এসে দাঁড়াতেই টিকায়েত আর গুলি করল। চমৎকার গুলি। গুলিটা পাশ ফিরে দাঁড়ানো বাঘিনীর বুকে লাগল। বুকে লাগতেই একবার যেন পড়ে যাচ্ছে বলে মনে হল বাঘিনীটা কিন্তু তারপরেই টিকায়েতের মাচা দেখতে পেয়ে জোরে কিছুটা নিচু হয়ে দৌড়ে এসেই সোজা লাফ মারল মাচার দিকে। গুলি পাল্টাবার সময়টুকুও পেল না আর টিকায়েত। দোনলা বন্দুক থাকলে মেরে দিত নিশ্চয়ই আরেকটা গুলি। কিন্তু এক লাফে সোজা এসে পড়ল মাচাতে তারপর টিকায়েতের গলা কামড়ে মাচা ভেঙে দুজনে নীচে পড়ল। নীচে পড়তেই, টিলার আড়াল থেকে টাঁড়বাঘোয়া জোরে দৌড়ে এসে টিকায়েতকে কামড়ে ধরল তারপর দুজনে টানাটানি করে তাদের চোখের সামনেই টিকায়েতের হাত-পা সব আলাদা করে ফেলল।
টেড বলল, বেঁচে ছিল টিকায়েত তখনও। বেঁচে আছে?
ওরা বলল, টিকায়েতের ঘাড় কামড়ে ধরতেই সে মরে গেছিল।
টেড আবার বলল, তোমরা তীর ধনুক নিয়ে কী করছিলে? মারতে পারলে তীর? মজা দেখতে গেছিলে নাকি তোমরা?
প্রথম লোকটা বলল, যতক্ষণ বুঝিনি যে, টিকায়েত মরে গেছে ততক্ষণ মারিনি। যেই বুঝলাম যে, সে আর বেঁচে নেই তক্ষুনি আমরা দুজনেই সমানে তীর মারতে লাগলাম। যদিও তখন চোখের সামনে ঐ দৃশ্য দেখে আমাদের বেহুঁশ অবস্থা। তবুও তিন-চারটে করে তীর লেগে থাকবে এক একটা বাঘের গায়ে।
আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, তারপর কী হল?
তারপর? বলেই, লোকটা চুপ করে থাকল।
দুটো লোকেরই চোখ মুখ দেখে মনে হল যে ওরা বোধহয় পাগল হয়ে গেছে, বা হয়ে যাবে এক্ষুনি।
একজন বলতে গেল, তারপর…
বলেই, থেমে গিয়ে দু হাত দিয়ে উঠোনের ধুলো মুঠিতে ভরে আবার ফেলতে লাগল।
অন্যজন থমথমে নিচু গলায় বলল, তারপর টিকায়েতের একটা হাত শুধু ফেলে রেখে, টিকায়েতকে দু টুকরো করে দু জনে মুখে করে নিয়ে টিলার আড়ালে চলে গেল।
এইটুকু বলেই, লোকটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
ভয়ে আতঙ্কে ওরা দুজনেই তখন কাঁপছিল।
আমরাও স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কী বলব, কেমন করে বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না।
টেড বলল, এখনও কি বাঘ দুটো ওখানেই আছে?
অন্য লোকটা বলল, তা কি করে বলব?
সেই সময় টিকায়েতের এগারো সন্তানের মধ্যে পাঁচজন হাজির হল এসে আমাদের সামনে। পাঁচটিই ছেলে, বড় ছেলেটির বয়স হবে চোদ্দ-পনেরো। সে কেঁদে হাতজোড় করে টেডকে বলল, সাহাব, মেরা বাবুজী কী খুকা বদলা লিজিয়ে আপনোগোঁনে। ইয়ে গাঁওকে যিনা আদমি হ্যায়, যিনা ধন-দৌলত হ্যায় সব আপলোগোঁকা দে দুংগা। বদলা লিজিয়ে সাহাব।
বলেই, ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল।
টিরিদাদা তখনও চা আর রেকাবীতে মাঠরী নিয়ে দাঁড়িয়েছিল স্ট্যাচুর মতো আমাদের পাশে।
টেড তাড়াতাড়ি গামছা ছেড়ে শর্টস আর খাকী বুশ কোট পরে নিল। নিয়ে ওর ফোর-ফিফটি-ফোর হান্ড্রেড ডাবল ব্যারেল রাইফেলটা নিয়ে, বেরিয়ে এল ঘর থেকে। বুক পকেটের খোপে খোপে ছটি গুলি ভরে নিল। দৃ ব্যারেলে দুটি ভরল। আমি তো তৈরিই ছিলাম। সারা রাত জেগে ছিলাম, এককাপ চা খেয়ে গেলে ভালই হত। কিন্তু তখন চা খাওয়ার মতো মনের অবস্থা ছিল না।
কিন্তু টিরিদাদা ও গাঁয়ের লোকেরাও আমাদের জোর করল। বলল, কখন ফিরবেন তার ঠিক নেই। ফিরতে ফিরতে রাতও হতে পারে।
ফিরতে যে না-ও পারি, সে কথা আর মুখে কেউই বলল না।
বলল, চা-এর সঙ্গে ভাল করে নাস্তাও করে যান।
নাস্তা-ফাস্তা করার মতো অবস্থা তখন একেবারেই ছিল না আমাদের। শুধু মাঠরী দিয়ে চা খেলাম। টিকায়েতেরই পাঠানো মাঠরী। এতক্ষণে আমবা যেভাবে মাঠরী খাচ্ছি সেইভাবে টাঁড়বাঘোয়া আর তার সঙ্গিনী টিকায়েতের শরীরটাকে খাচ্ছে হয়তো। ঈস্! ভাবা যায় না, জলজ্যান্ত লোকটা!
দুজনের কাঁধে দুটো জলের বোতল দিয়ে দিল টিরিদাদা। আমরা সকলের কাছে বিদায় নিয়ে এগোলাম।
কয়েক পা এগিয়েছি, এমন সময় একটি চব্বিশ-পঁচিশ বছরের লোক দৌড়ে এসে আমাদের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সকলে বলল, ওর বৌকেই নিয়ে গেছিল টাঁড়বাঘোয়া প্রথম দিন।
লোকটার হাতে একটা মস্ত চকচকে টাঙ্গী। কাঁধে তীর ধনুক। ও বলল, আমাকে সঙ্গে নিন আপনারা। আমি টাঁড়বাঘোয়ার মাথায় নিজে হাতে টাঙ্গী মারব। টাঙ্গী মেরে আমার বাসমতীর মৃত্যুর বদলা নেব।
আমরা চলতে চলতেই ওকে অনেক বুঝিয়ে, তারপর ফেরৎ পাঠালাম।
টিরিদাদা গ্রামের শেষ পর্যন্ত এল। আমরা দুজনেই ওর মুখের দিকে চাইলাম।
বললাম, চলি টিরিদাদা।
টিরিদাদার মুখটাকে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল।
কী যেন বলতে গিয়েও বলতে পারল না। বোধহয় ও আমাদের যেতে মানা করবে ভেবেছিল। তারপর গ্রামের এতগুলো লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে, টিকায়েতের ছেলের কান্না-ভেজা মুখের দিকে চেয়ে বলল, এসো, এসো। যাওয়া নেই, এসো।
তারপর জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, তোমাদের জন্যে ফাস্টক্লাস ভাত আর মুরগীর ঝোল বেঁধে রাখব। এসেই, চান করে খেতে বসে যাবে। যাও, দেরী কোরো না ফিরতে। আমি কিন্তু না খেয়ে বসে থাকব তোমাদের জন্যে।
গ্রামের লোকের কাছে শুনলাম যে, টিকায়েতের মা এখনও বেঁচে আছেন। উনি এবং টিকায়েতের স্ত্রীও হয়তো কাল বিকেলে এমনি করেই টিকায়েতকে বিদায় দিয়েছিলেন।
আমি খুবই উত্তেজনা বোধ করছিলাম। মানুষখেকো বাঘের অভিজ্ঞতা এর আগে কখনও হয়নি। তারপর আবার একসঙ্গে দু-দুটো আহত বাঘ-বাঘিনী। টাঁড়বাঘোয়ার পায়ের দাগ দেখে এবং বর্ণনা শুনেই তো তার চেহারা সম্বন্ধে অনুমান করে নিয়েছিলাম। বাঘিনী টাঁড়বাঘোয়ার চেয়ে ছোট, কিন্তু সেই-ই তো মাচায় উঠে ধরেছে টিকায়েতকে। এখন দুজনেই গুলি খেয়ে যে কী সাংঘাতিক হয়ে আছে কে জানে?
টেড নিচু স্বরে বলল, টিকায়েত কিন্তু খুবই ভাল শিকারী। ভোরের আবছা-আলোতে দু দুটো বাঘকেই উনি, গুলি করেছিলেন ভাইটাল জায়গাতে। কিন্তু, এই জন্যেই আমি সব সময় বলি তোকে যে, হেভী রাইফেল ছাড়া বন্দুক নিয়ে বাঘ মারতে আসা বড় বিপদের। তোর রাইফেলটাও এবার কলকাতায় ফিরে বদলে নে তুই। পায়ে হেঁটে বাঘের মোকাবিলা করতে সব সময়েই হেভী রাইফেল নিয়ে যাওয়া উচিত। ঐ গুলি দুটি যদি রাইফেলের হত তবে বাঘ বাবাজীরা ঐখানেই শুয়ে থাকত। তবে টিকায়েত বাঘিনী মাচায় উঠতেই দ্বিতীয় গুলি হয়তো করে ফেলতে পারত। এই সব কারণেই ওঁকে মানা করেছিলাম একনলা বন্দুক না-নিয়ে যেতে। শুনলে না। কী আর করব আমরা?
তারপর বলল, তাছাড়া, আমার দৃঢ় বিশ্বাস গুলিগুলো খুবই পুরনো ছিল। কে জানে কোথা থেকে কিনেছিল। গুলি ভাল থাকলে সত্যি সত্যিই দু দুটো বাঘই বেচারী মারতে পারত। নিজেও মরত না।
আমি বললাম, দুজনে একসঙ্গে থাকলে কিন্তু হবে না টেড। টিলাটার কাছে গিয়ে আমাদের আলাদা হয়ে যেতে হবে। তুই কার পিছনে যাবি? টাঁড়বাঘোয়া? না বাঘিনী?
টেড বলল, আমরা মারতে পারলেও, দুটো বাঘের একটাও তো আমাদের কারোরই হবে না, কারণ প্রথম রক্ত তো টিকায়েতের গুলিতেই বেরিয়েছে।
আমি বললাম, তা ঠিক।
তোমরা হয়তো জানো না যে, শিকারের অলিখিত আইনে বলে, যার গুলিতে প্রথম রক্তপাত ঘটবে, শিকার তারই। যদি কোনও শিকারীর গুলি বাঘের লেজে লেগেও রক্ত বেরোয় এবং বাঘ সাক্ষাৎ যম হয়ে থাকে, তবুও যে শিকারী। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সেই বাঘকে অনুসরণ করে গিয়ে মারবেন বাঘ সেই শিকারীর হবে না। যিনি লেজে গুলি করে রক্ত বের করেছিলেন, তাঁরই হবে। সকলেই মেনে নেবেন যে, বাঘ প্রথম জনই মেরেছেন।
চারদিকে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, এ তো আর বাহাদুরী বা হাততালির ব্যাপার নয়। বাঘ কার হল, তারও ব্যাপার নয়। পাহাড় জঙ্গলের গভীরে একটি ছোট্ট গ্রামের সব কটি মানুষ তাদের বাঁচা-মরা, তাদের আশা-ভরসা, তাদের সব বিশ্বাস আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে আন্তরিকভাবে, চোখের জলে। আমাদের বয়স এবং অভিজ্ঞতা কম হলেও, আমরা যাতে তাদের বিশ্বাসের যোগ্য হতে পারি, তাদের চিরদিনের কৃতজ্ঞতাভাজন হতে পারি তারই চেষ্টা করতে হবে।
আমরা কি পারব এই কঠিন কাজের যোগ্য হতে?
আমরা দুজনেই নিজের নিজের মনে সে কথা ভাবছিলাম। মুখে কথা ছিল। কারোরই। যদি বিপদমুক্ত করতে পারি ওদের তবেই না আমাদের মান থাকবে আর যদি না পারি?
নাঃ, সে সব ভাবনা এখন থাক।
টেউ বলল, এখন ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কাল সকালে টিকায়েতকে অমন করে না বললেও পারতাম। আমি কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম যে এত তাড়াতাড়ি আমার রসিকতা সত্যি হবে?
কি বলেছিলি তুই?
বলিনি? যে, কালই আপনাকে দাহ করতে হবে আমাদের?
কুয়োতলাটা পেরিয়ে গিয়েই হঠাৎ টেড ঘুরে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে বলল, এক সেকেন্ড দাঁড়া। টস্ করছি। যে জিতবে, সেই টাঁড়বাঘোয়ার দায়িত্ব পাবে যে হারবে সে বাঘিনীর। ওক্কে?
আমি বললাম, ওক্কে।
আসলে আমাদের দুজনেরই ইচ্ছা ছিল যে টাঁড়বাঘোয়ার পিছনেই যাই। সে-ই যে নাটের গুরু।
টেড বলল, তোর কী।
আমি বললাম, টেল!
টেড অনেক উঁচুতে ছুঁড়ে দিল আধুলিটা। মাটিতে পড়েই কিছুটা গড়িয়ে গিয়ে লাল ধুলোর মধ্যে একটা শালের চারার গোড়াতে আটকে গেল সেটা। আটকে যেতই উল্টে গেল!
আমরা দুজনেই সেখানে পৌঁছে দেখলাম, টেল রয়েছে উপরে। হেড নীচে।
টেড আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।
আমরা দুজনেই জানতাম যে বে-জায়গায় গুলি-লাগা বাঘ সাক্ষাৎ যম হয়ে ওঠে। তার কারণ, যতক্ষণ বাঘের চারটি পা এবং মুখ এবং মস্তিষ্ক ঠিক থাকে। ততক্ষণ বাঘ পুরোপুরি সমর্থ। তার উপর পেটে গুলি লাগলে প্রচুর যন্ত্রণার কারণে তার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে থাকে। সেই দিক দিয়ে দেখলে টাঁড়বাঘোয়া এখন বাঘিনীর চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহতার চেহারার বিরাটত্ব বাদ দিয়েও! বাঘিনীর গুলি লেগেছে বুকে–অবশ্য তোক দুটো ভুলও বুঝতে পারে–ভুল বোঝা একটুও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি ঠিক বুঝে থাকে, তাহলে বাঘিনীর লাংস কিংবা হার্টে গুলি লাগা অসম্ভব নয়। হার্টে লাগলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মরে যাওয়ার কথা। লাংসে লাগলে কিছুক্ষণ বাঁচে। লাংসে গুলি লাগলে বাঘের গায়ের থেকে যে রক্ত বেরোয়, তাতে ফেনা দেখা যায় অনেক সময়। ওখানে গেলেই বোঝা যাবে। কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে এই যে, দুটি বাঘই খুব সম্ভব মানুষখেকো এবং সদ্য আহত।
অতএব…
সাবধানে, চারদিকে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর এসে গেছি আমরা।
এবার টিলাটার কাছাকাছি এসে পড়েছি। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে টিলাটা। সকালের রোদ মাথা উঁচু করে আছে। আর একটু এগোতেই মাচাটার ভগ্নাবশেষ দেখা গেল। চৌপাইয়ের চারটে পায়া ঠিক আছে। দড়ি ছিঁড়ে এবং পাশের এক দিকের কাঠ ভেঙে মাচাটা গাছটা থেকে তখনও নীচে ঝুলছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। ভোরের ফিফিসে হাওয়া আর ছাতারেদের ডাক ছাড়া।
আর একটু এগিয়ে যেতেই আমি আর টেড দুজনেই চমকে উঠলাম।
একটু দূরেই বুড়ির একটি পা পড়ে আছে। নীলরঙা বড়বড় মাছি ভন্ ভন্ করছে তাতে। এত দুর্গন্ধ যে, কাছে যাওয়া যায় না।
আর মাচার থেকে একটু দূরে, সোজা, কি যেন একটা জিনিস পড়ে আছে। টেডকে ইঙ্গিতে চারপাশে নজর রাখতে বলে আমি এগিয়ে গিয়ে দেখতে গেলাম জিনিসটা কী?
