শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১১)

পাড়ায় দেখলুম সদানন্দবাবুর যেমন আমার মতো কিছু শুভার্থী আছেন, তেমনি শত্রুও নেহাত কম নেই। বরং শত্রুর সংখ্যাই বেশি। তার কারণ অবশ্য আর কিছু-ই নয়, ঈর্ষা। সদানন্দবাবুর অবস্থা যে তাঁর প্রতিবেশীদের তুলনায় কিছুটা সচ্ছল সে-কথা আমরা আগেই বলেছি। যে-কথা বলা হয়নি, সেটা এই যে, স্রেফ সেই সচ্ছলতার কারণেই অনেকে তাঁর উপরে বিশেষ সন্তুষ্ট নন। ভাড়াটে খুন হয়েছে, আর খুনি হিসেবে সদানন্দবাবুকেই পুলিশ সন্দেহ করছে, এই কথাটা চাউর হতে খুব দেরি হল না। শুনে তাঁরা বলাবলি করতে লাগলেন, ঠিক হয়েছে, ব্যাটা যেন ধরাকে সরা জ্ঞান করছিল। এখন বোঝো ঠ্যালা। যেমন কর্ম তেমনি ফল! অর্থাৎ তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন যে, অপকর্মটা সদানন্দবাবুই করেছেন, আর তার ফল ভোগ না-করেও তাঁর নিস্তার নেই।

মনটা ভাল নেই। রাত হয়েছে, কোনওক্রমে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় এসে শুয়ে পড়েছি, কিন্তু ঘুম আসছে না। ব্যাপারটা নিয়ে যত ভাবছি, মন যেন ততই আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সদানন্দবাবুর মুখখানা বারবার ভেসে উঠছে আমার চোখের সামনে। খানাতল্লাসির পর্ব শেষ হবার পর পুলিশ যখন তাঁকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়, তখন যে তাঁকে কী অসহায় দেখাচ্ছিল।

যা দিয়ে একটা মানুষের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া যায়, তল্লাসি করে এমন জিনিস নেহাত বম পাওয়া যায়নি। ইট, পাথর, নোড়া, রেঞ্চ আর হাতুড়ি তো বটেই, একটা বেশ মোটামতন শাবলও পাওয়া গিয়েছে। সবই সদানন্দবাবুর সম্পত্তি। তল্লাসিটা প্রথমদিকে চলেছিল উপর-উপর। পরে উইটনেস রেখে বাক্স-প্যাঁটরা- সিন্দক-আলমারি সবই হাঁটকে দেখা হয়। তাতে যেমন নকুলের মাছের আড়তে একগাদা বাটখারা পাওয়া যায়, তেমনি সদানন্দবাবুর আলমারি থেকেও একটা এক-কিলো ওজনের বাটারা বেরিয়ে পড়ে। তবে, সবচেয়ে বেশি মুশকিল বাধিয়েছে ওই লোহার-বল-বসানো লাঠিটাই। সামন্ত সম্ভবত ধরেই নিয়েছেন যে, ওই লাঠি দিয়েই নকুলের মাথা ফাটানো হয়েছিল। তাঁর কথা শুনে অন্তত সেইরকম মনে হয়।

খুনি হিসেবে যে সদানন্দবাবুকেই তিনি সন্দেহ করছেন, সেটাকে অবশ্য অস্বাভাবিকও বলা যায় না। তিনি বাড়িওয়ালা। ভাড়াটের উপরে তিনি প্রসন্ন ছিলেন না। ভাড়াটে যাতে উঠে যেতে বাধ্য হয়, তার জন্যে জল দেওয়া বন্ধ করেছিলেন, এমনকি ইলেকট্রিক লাইনও কেটে দিয়েছিলেন একদিনের জন্যে। তার উপরে আবার নকুলের লাশের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল তাঁকেই। সামন্তের সন্দেহ তো হতেই পারে।

সন্দেহের একটা কাঁটা যে আমার মনেও খচখচ করছিল না, তা-ই বা কী করে বলি। একদিকে যেমন সদানন্দ বাবুর অসহায় দুখখানা আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল, অন্যদিকে তেমনি বারবার আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল সদানন্দবাবুর সেই কথাটা, বৃহস্পতিবার সকালে আমার বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় যা তিনি খুব উত্তেজিতভাবে আমাকে বলে গিয়েছিলেন।

কী বলেছিলেন সদানন্দবাবু? ভাড়াটে তাড়াবার জন্যে দরকার হলে যে গুন্ডা লাগাতেও পিছপা হবেন না, শুধু এইটুকু বলেই তো ক্ষাও হননি তিনি, সেইসঙ্গে যোগ করেছিলেন এই ভয়ঙ্কর কথাটা যে, গুন্ডা লাগাবারই বা দরকার কী, “এই যে লাঠিটা দেখছেন না, এটাই যথেষ্ট, এইটে দিয়েই ওর মাথা ফাটিয়ে ছাড়ব।”

তা হলে কি শেষপর্যন্ত সেই কাজই তিনি করলেন? করা যে অসম্ভব, তাও বলা যাচ্ছে না। শারীরিক সামর্থ্যের দিক থেকে তো নয়ই। ভদ্রলোকের একমাত্র অসুবিধা চোখ নিয়ে। ছানি কাটিয়েছন ঠিকই….কিন্তু দৃষ্টির সেই আগের মতো জোর আর ফিরে পাননি। তবে শরীর এখনও রীতিমতো মজবুত। এই যে এতদিন এখানে আছি, সদানন্দবাবুকে একদিনও বিছানায় পড়ে থাকতে দেখলুম না। জ্বর নেই, জারি নেই, সর্দি নেই, কাশি নেই, ছেলেছোকরাদের মতোই টগবগে টনকো-তাজা স্বাস্থ্য, তাই নিয়ে একটু জাঁকও করেন, লোহার বল বসানো ওই লাঠিটা দিয়ে একটা নেড়িকুত্তার মাথাও ফাটিয়ে দিয়েছেন, মানুষের মাথা ফাটানোই বা তবে একেবারে অসম্ভব হবে কেন? বিশেষ করে সিঁড়ির দু’ধাপ উপরে যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখান থেকে তো কাজটা আরও সহজ হবার কথা। গঙ্গাধর সামন্ত এই ব্যাপারটার উপরে দেখলুম খুবই জোর দিচ্ছেন।

কিন্তু সত্যিই কি কাজটা সদানন্দবাবু করেছেন? ভাড়াটেকে তুলে দেবার জন্য জল আর লাইটের লাইন কেটে দিয়েও যখন সুবিধে হল না, তখন তাকে খুনই করে বসলেন? ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিলুম না। এক-একবার মনে হচ্ছিল যে, বিচিত্র কী, মানবচরিত্র বড়ই জটিল, বড়ই রহস্যময় ব্যাপার, তার কতটুকুই বা বুঝি আমরা? এ তো প্রায় সমুদ্রে ভাসমান সেই হিমশৈলের মতোই, জলের উপরে যার সামান্য অংশই আমরা দেখতে পাই, আর বেশির ভাগটাই গোপন থেকে যায় জলের তলায়। সদানন্দবাবুর ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই ঘটেছে। তাঁর চরিত্রের খুব সামান্যই আমি দেখেছি, বাদবাকিটার সম্পর্কে কোনও ধারণাই আমার ছিল না। বাইরে তিনি সদানন্দ, হাস্যময়, পরোপকারী প্রতিবেশী, কিন্তু ভিতরে ভিতরে হয়তো খুবই নিষ্টুর। এতই নিষ্ঠুর যে, একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলতেও তাঁর হাত কিছুমাত্র কাঁপেনি।

এক-একবার এইরকম ভাবছিলুম আমি, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হচ্ছিল যে, না, এটা সম্ভব নয়, এটা হতে পারে না। সদানন্দবাবুর পক্ষে কাউকে খুন করা একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার।

ভদ্রলোক এখন থানা-হাজতে রয়েছেন। আজ আর আমি অফিসে যাইনি। বারোটা নাগাদ লাশ সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করা হল। তারপর জিপে তুলে সদানন্দবাবুকে নিয়ে যাওয়া হল থানায়। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমি আর শম্ভুবার্ এই দৃশ্য দেখলুম। শম্ভুবাবুর অবস্থাও আমারই মতো। সদানন্দবাবুকে তিনিও বিশেষ শ্রদ্ধা করেন, ভালবাসেন। বললেন, “কী করা যায় বলুন তো?”

করবার কিছুই ছিল না। একে শনিবার, তায় বেলা একটা বাজে। তাই জামিনের ব্যবস্থা করা যায়নি। কালও করা যাবে না। যা-করবার সোমবারে করতে হবে।

এখন একমাত্র ভরসা ভাদুড়িমশাই। ভাগ্য ভাল যে, তিনি কলকাতায় রয়েছেন। সদানন্দবাবুকে যে আমি উপকারী একজন বন্ধু হিসেবে গণ্য করি, সকালে ফোনেই সে-কথা ভাদুড়িমশাইকে আমি জানিয়েছিলুম। নিজে আসতে না পারলেও নিশ্চয় সেইজন্যেই তিনি কৌশিককে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আর বাসন্তী যদি খুব মিনতি করে বলি যে, এই খুনের তদন্তের ভার তাঁকে নিতেই হবে, তা হলে কি দরকার হলে আরও কিছু দিন তিনি কলকাতায় থেকে যাবেন না? মনে তো হয় থেকে যাবেন।

কৌশিকের উপরেও আমার আস্থা অবশ্য নেহাত কম নয়। বয়স মাত্র ছাব্বিশ সাতাশ, কেমিস্ট্রিতে এম. এসসি. করে আর চাকরি-বাকরির চেষ্টা করেনি, মামার লাইন ধরেছে। অর্থাৎ গোয়েন্দাগিরিতে তার অভিজ্ঞতা মাত্র চার-পাঁচ বছরের। কিন্তু এরই মধ্যে যে কিছুটা নাম করেছে, তাতে বোঝা যায় যে, ছেলেটার অভিজ্ঞতা যতই কম হোক, বুদ্ধিটা পাকা। মেদবর্জিত ছিপছিপে লম্বা চেহারা, গায়ের রং বাবার মতো ফর্সা নয়, মায়ের মতো তামাটে। আর অসম্ভব রকমের ধারালো চোখ দুটি দেখে তার মামার কথাই বারবার আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল।

নেবুতলার ঘটকবাড়ির জোড়া-খুন নিয়ে যে মামলা চলছিল, কৌশিকের পাকা বুদ্ধির প্রমাণ তাতেই প্রথম পাওয়া যায়। এ হল গত বছরের ঘটনা। তার আগেও সে খুচরো কয়েকটা কাজ করেছিল বটে, কিন্তু এটাই ছিল তার ব্রেক-থ্র। এই মামলায় যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সে এত নিপুণভাবে সাজিয়ে দিয়েছিল যে, নিশ্চিত প্রাণদন্ড থেকেও ‘সন্দেহের অবকাশে’ খুনের আসামিদের বাঁচিয়ে দেবার ব্যাপারে যিনি সিদ্ধহস্ত, সেই দুদে ব্যারিস্টার সুধাকান্ত মজুমদারও ঘটক অ্যান্ড চৌধুরি এন্টারপ্রাইজের জুনিয়ার পার্টনার অমরেশ চৌধুরিকে কিছুতেই খালাস করিয়ে আনতে পারেননি। আদালতের রায়ের যে অংশটাকে ওবিটার ডিক্‌টাম বলা হয়, হাইকোর্টের প্রবীণ জজ আবদুল কুরেশি তাতে কৌশিকের কর্মনৈপুণ্য ও কর্তব্যনিষ্ঠার খুব প্রশংসাও করেছিলেন। বলেছিলেন, স্রেফ পুলিশ বিভাগের গাফিলতির জন্যই অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের কাজে অস্বাাবিক দেরি হয়ে যায়, আর তারই পরিণামে লোপাট হয়ে যায় অনেক সাক্ষ্যপ্রমাণ। ফলে, নেহাতই সন্দেহের অবকাশে আসামিদের সে-সব ক্ষেত্রে মুক্তি না দিয়ে আদালতের উপায় থাকে না। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে সাক্ষ্যপ্রমাণ অতি দ্রুত সংগ্রহ করা হয়েছে, এবং যথাসময়ে সেগুলি দাখিল করবার ব্যাপারেও কোনও শৈথিল্য ঘটেনি বলেই সমাজের পক্ষে অতিশয় বিপজ্জনক ও অত্যন্ত নৃশংস এক অপরাধীকে সেই শাস্তি দেওয়া গেল, যা তার প্রাপ্য ছিল।

মিঃ জাস্টিস আবদুল কুরেশির রায় পাঠ করায় অনেকে অবাক হয়েছিলেন। আমি হইনি। তার কারণ সে ভাদুড়িমশাইয়ের ভাগ্নে। মামার ওণ যে কিছু-না-কিছু সে পাবেই, তা যেন আমি ধরেই নিয়েছিলুম। আসলে হত্যাকান্ডের ধরন দেখে খুনির চরিত্র কীভাবে অগ্রিম আন্দাজ করে নিতে হয়, হত্যার ফলে কে কোন দিক দিয়ে কতটা উপকৃত হচ্ছে, সেইটে বুঝে নিয়ে তদন্তের একটা ছক কীভাবে তৈরি করে নিতে হয়, এভিডেন্স কীভাবে সংগ্রহ করতে হয়, এবং মামলা কীভাবে কোন পথ ধরে এগোতে পারে, সে-দিকে খেয়াল রেখে যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণকে সাজাতেই বা হয় কীভাবে, মামার কাছেই কৌশিক সে-বিষয়ে যৎপরোনাস্তি তালিম পেয়েছে। সুতরাং তদন্তের ব্যাপারে সে যে কোনও পর্যায়েই কোনও ফাঁক রাখবে না, এটাই স্বাভাবিক।

নেবুতলার কেসটাতে সে মার্ডার-ওয়েপনটিও একেবারে ঝটিতি উদ্ধার করে, এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দেয় যে, অস্ত্রটি আর কিছুই নয়, আসলে সেটা অমরেশ চৌধুরিরই অফিস ঘরের কলমদানের মধ্যে অতিশয় যত্নে রাখা একটা নকশা-কাটা বিদেশি পেপার-নাইফ। নিহত ঘটক-দম্পতিই যে বিদেশ থেকে ঘুরে এসে ধারালো সেই কাগজ-কাটা ছুরিটি অমরেশ চৌধুরিকে উপহার দিয়েছিলেন, কাগজে এই ঘটনাটা সেদিন ‘নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস’ বলে বর্ণিত হয়েছিল।

পাঁচ-নম্বর বাড়ির ক্ষেত্রে যে মার্ডার-ওয়েপন কোনটা তা এখনও জানা যায়নি। গঙ্গাধর সামন্ত অবশ্য ধরেই নিয়েছেন যে, লাশের পাশে যে লাঠিটা পড়ে ছিল, লোহার বল বসানো সেই লাঠি দিয়েই নকুলচন্দ্রের মাথা ফাটানো হয়েছে। তবে কৌশিকের মুখের ভাব দেখে মনে হল, সামন্তের এই সিন্ধান্ত সে ঠিক মেনে নিতে পারছে না। ঘটনাস্থল থেকে সে যখন চলে আসে, তাকে এগিয়ে দিতে আমিও তখন সদর দরজা পর্যন্ত এসেছিলুম। সেইসময়ে সে আমাকে বলে যে, সামন্তমশাই যা ভাবছেন, কেসটা তত সহজ-সরল নয়। তাতে আমি বলি, “তোমার কী মনে হয়, বলো তো। সদানন্দবাবুই খুনি?” প্রশ্ন শুনে কৌশিক একটুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপরে বলে, “উনি যে খুব বিপদে পড়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই।

কৌশিক তার মারুতিতে উঠে স্টার্ট দেবার আগে ভাদুড়িমশাই সম্পর্কেও দুটো-একটা কথা হল। জিজ্ঞেস করেছিলুম, “তোমার মামাবাবু এবারে কী কাজ নিয়ে এসেছেন?” তাতে কৌশিক একগাল হেসে বলল, “আর বলবেন না কিরণমামা, একটা রেসের ঘোড়ার ব্যাপার।”

“তার মানে?”

“তা হলে শুনুন। মাদ্রাজ থেকে একটা রেসের ঘোড়াকে নাকি কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু মধ্যপথে ট্রেনের ওয়াগন থেকে সেটা হাপিস হয়ে যায়। ঘোড়ার মালিক কলকাতার এক বিরাট ব্যবসায়ী। বিস্তর টাকা খর্চা করে সে মামাবাবুকে কলকাতায় নিয়ে আসে। গ্র্যান্ডে তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু মামাবাবুকে তো আমার চেয়ে আপনি অনেক ভাল জানেন, তিনি গ্র্যান্ডে উঠলেন না, এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আমাদের ওখানে চলে এলেন। তা রেসের ঘোড়া উদ্ধার করবার জন্যে মামাবাবুকেই দেখলুম একেবারে রেসের ঘোড়ার মতো ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। ক’টা দিন যা ধকল গেল ওঁর সে আর বলবার নয়।”

“ঘোড়াটা উদ্ধার হয়েছে?”

“বিলক্ষণ। কাজ কমপ্লিট; ঘোড়া এখন তার মালিকের আস্তাবলে। ব্যাপার কী জানেন, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে মধ্যপথে একটা স্টেশনে একজন লোক ওয়াগন থেকে ঘোড়াটাকে নামিয়ে নিয়েছিল। হেঁজিপেঁজি লোক নয়, তারও প্রচুর পয়সা, মস্ত কারবার। মামাবাবুর তদন্তে তার জারিজুরি যখন ফাঁস হবার উপক্রম, তখন সে নিজেই এসে ঘোড়াটা ফেরত দিয়ে যায়। শুধু তার একটা অনুরোধ, স্ক্যান্ডালটা যেন খবরের কাগজ টের না পায়…..ওঃহো কথাটা আপনাকে বলে ফেললুম। আপনিও যে খবরের কাগজের লোক, তা আমার মনেই থাকে না।”

“কাল সকালে তুমি বাড়িতে থাকছ তো?”

“আপনি আসছেন আর আমি থাকব না?” কৌশিক হেসে বলল, “নিশ্চয় থাকব। আসবেন কিন্তু……উইদাউট ফেইল। …. মামি আর পারুলকেও নিয়ে আসুন। মা খুব বলছিল।”

বললুম, “পারুলের পরীক্ষা, তাই যেতে পারবে না। আর তোমার মামিই বা ওকে ছেড়ে এখন যায় কী করে?”

“ঠিক আছে, আপনিই আসুন।”

গলি থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে টার্ন নিল কৌশিকের গাড়ি। আমি আবার ভিতরে চলে এলুম।

শুয়ে শুয়ে এই সব কথাই ভাবছি। ঘুম আসছে না। কৌশিককে বিদায় দিয়ে ফিরে আসবার পরে গঙ্গাধর সামন্ত যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটা মোটেই আশাপ্রদ নয়। সামন্ত বলেছিলেন, “প্রাইভেট ডিটেকটিভদের সম্পর্কে পুলিশের নাকি একটা অ্যালার্জি থাকে। কই মশাই, আমার তো কোনও অ্যালার্জি নেই। দরকার হলে ওঁদের সাহায্য নেব বই কি। তবে কিনা দরকার হবে বলে মনে হয় না। এ তো একেবারে জলের মতো সোজা ব্যাপার।”

ডাক্তার গুপ্ত কোনও কথা বলেননি। চুপ করে ছিলেন। তবে সামন্তের কথা শুনেই আমি বুঝতে পেরে গিয়েছিলুম যে, ভদ্রলোক মনঃস্থির করে ফেলেছেন। যে সিদ্ধান্ত করেছেন, তার আর নড়চড় হবার উপায় নেই।

এইসব ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলুম আমি।

.

পারুল এসে যখন আমার ঘুম ভাঙাল, তখন প্রায় আটটা বাজে। বলল “মা খুব রাগারাগি করছে, বিছানা ছেড়ে এবারে উঠে পড়ো বাবা।”

আম’কে তুলে দিয়ে পারুল আবার পড়তে চলে গেল। বাসন্তী ইতিমধ্যে ঘরে এসে ঢুকেছিল। বলল, “বাজার করতে হবে না? চটপট মুখ-হাত ধুয়ে বেরিয়ে পড়ো। তোমাকে রওনা করিয়ে দিয়ে আমি একবার ও-বাড়ি যাব।”

“কেন, ও-বাড়িতে আবার কী হল?

“নতুন-কিছু হয়নি। ওদের কাজের মেয়েটা একটু আগে একবার এসেছিল। বলল, কুসুমদি সারা রাত ঘুমোননি, সকালেও খুব কান্নাকাটি করছেন।”

“তা তো করবেনই। আজ রবিবার, ফলে আজ জামিনের ব্যবস্থা করা যাবে না। হুট করে যে কেন ওঁকে ধরে নিয়ে গেল। ভদ্রলোক কি তাঁর বাড়ি আর বউ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন?”

বাসন্তী বলল, “আর কথা নয়, বাথরুমে যাও, তারপর বাজার করে নিয়ে এসো। তোমার নাহয় নেমন্তন্ন রয়েছে, আমাদের তো মুখে কিছু দিতে হবে। এদিকে বাড়িতে সব বাড়ন্ত। অন্তত মাছটাও যদি থাকত তো আজকের দিনটা চালিয়ে নিতুম। নাও চটপট বেরিয়ে পড়ো। তুমি বাজারে গেলে সেই ফাঁকে আমি কুসুমদির কাছ থেকে একটু ঘুরে আসব।”

বাথরুমে ঢুকে পড়লুম। বুঝতে পেরেছিলুম যে, বাসন্তীর গলা এখন ক্রমেই চড়তে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *