শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

চব্বিশ

একেনবাবু পিজ্জা নিয়ে ফিরলেন একটু দেরি করেই। আসতেই প্রমথ ওঁকে ঝাড়লো, “কি মশাই, খাওয়াবেন বলে মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি! আটটার সময় ডিনার টাইম আর আপনি ন’টার সময়ে হেলতে দুলতে আসছেন?”

আমি বললাম, “চুপ কর, ওঁর নিশ্চয় একটা এক্সকিউজ আছে।”

“তা আছে স্যার।” পিৎজার বাক্সটা খুলতে খুলতে বললেন, “আপনার জন্য পেপারোনি আর অনিয়ান, আর প্রমথবাবুর জন্য সসজে আর মাশরুম।”,

“আর আপনি?”

“আমি স্যার আপনাদের দু’জনের কাছ থেকেই একটু শেয়ার করব।”

“ও, আপনি ভ্যারাইটি খাবেন, আর আমাদের জন্য সিঙ্গল আইটেম। বলিহারি হোস্ট আপনি।”

“কী মুশকিল স্যার, আপনি সসেজ মাশরুম ভালোবাসেন বলেই তো স্পেশালি আনলাম।

“তা হোক, আমিও আপনার মতো ভ্যারাইটি খাব।”

“নিশ্চয় খাবেন স্যার।”

আমি বললাম, “আপনার এক্সকিউজটা কি, সেটা তো বললেন না?”

“ও হ্যাঁ স্যার। তার আগে আপনার ছবিটা রেখে আসি।” বলে একেনবাবু ছবির খামটা আমার ঘরে রাখতে গেলেন।

এটাও একেনবাবুর বৈশিষ্ট্য, গল্পের আগে একটা সাসপেন্স ক্রিয়েট করতে ভালোবাসেন। চট করে কিছু না বলে সময় নেওয়া। তবে আমরা ওঁর অপেক্ষায় না থেকে পিৎজার একটা স্লাইস তুলে তার সদ্বব্যবহার শুরু করলাম। অতি সুস্বাদু পিৎজা। খুঁতখুঁতে প্রমথ মানল।

“নাঃ, ভালো মালই এনেছেন। তারপর পিজা-বক্সের ডালা উলটে নাম দেখে বলল, টমি’জ। আগে খেয়েছিস?”

একেনবাবু ইতিমধ্যে ফিরে এসেছেন। বললেন, “কেমন লাগছে স্যার?”

“দারুণ, কোত্থেকে খবর পেলেন দোকানটার?”

“বল্লভ শাহ-র কাছ থেকে।”

“বল্লভ শাহ! লোকটা তো সাসপেক্টেড মার্ডারার! তাঁর সঙ্গে আপনার এত দহরম মহরম শুরু হল কবে থেকে?” প্রমথ প্রশ্ন করল।

“দহরম-মহরম নয় স্যার, হঠাৎ দেখা টাইমস স্কোয়ারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় ভালো পিজ্জা পাওয়া যায়। উনি বললেন টমি’জ। লোকে চেনে ডমিনোজ, পিজ্জা হাট –এইসব। কিন্তু অথেন্টিক পিজার স্বাদ চাইলে টমি’জ-এর জুরি নেই।”

“অথেন্টিক মানে কি? পিজা তো এক এক জায়গায় এক এক ধরণের সিসিলিয়ান স্টাইল, নেওপলিটান, পিৎজা রোমানা –কিসের কথা বলছেন?”

“তা তো বলতে পারব না স্যার। উনি বললেন অথেন্টিক, আমিও সেটাই রিপিট করলাম।”

“অথেন্টিক হোক বা না হোক, অতি উত্তম পিঞ্জা,” আমি বললাম। “তা বল্লভ শাহর খবর কি? পুলিশ যে এখনও ওঁকে ধরেনি, কী ব্যাপার?”

“বেশ দুশ্চিন্তাতে আছেন স্যার। ওঁর ধারণা কেউ ওঁকে চক্রান্ত করে ফাঁসাচ্ছে।”

“সেই কেউ-টা কে?”

“সেটা উনি জানেন না স্যার। তবে কয়েকটা ইন্টারেস্টিং কথা বললেন।”

“যেমন?”

“রোহিত রয়ের বান্ধবী মিস আইলিন সম্পর্কে বেশ কিছু খবর জানলাম।”

“কী জানলেন?”

“দাঁড়ান, আগে একটা পিৎজা নিই।”

একেনবাবু প্লেটে পিঞ্জার একটা স্লাইস চাপিয়ে তার উপর ক্রাশড রেড-পেপার ছিটিয়ে লালে লাল করে কামড় বাসালেন।

তারপর চিবোতে চিবোতে বললেন, “মিস আইলিন স্যার, সত্যিই একটা ক্যারেক্টার।”

আমরা দুজনেই সপ্রশ্নে ওঁর দিকে তাকালাম।

“তিনি স্যার প্যারালাল প্রেম চালাচ্ছিলেন।”

“কার সঙ্গে?”

“নামটা বললেন না, তবে লোকটা ওয়ালস্ট্রিটের এক ব্যাঙ্কার।”

“মাই গড! রোহিত রয় জানতেন?”

“জানতেন কিনা বল্লভ শাহ শিওর নন। বোধহয় সন্দেহ করছিলেন।”

“সেটা ভাবার কারণ?”

“কারণ বল্লভ শাহকে মিস্টার রয় কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে মাঝে মাঝেই মিস আইলিন অদৃশ্য হয়ে যান। বল্লভ শাহর মতে, একটু বিরক্ত হয়েই।”

“বল্লভ শাহ কী করে জানলেন যে মিস আইলিন আরেকজনের সঙ্গে প্রেম করছেন?”

“সেটা বললেন না, তবে লোকটা সত্যিই রিসোর্সফুল স্যার।”

“আপনার কি মনে হয় মিস আইলিন এখন সেই ব্যাঙ্কারের কাছেই আছেন?”

“পসিবল স্যার।”

“বল্লভ শাহ কি পুলিশকে সেটা বলেছেন?”

“মনে হয় না স্যার। তবে ভালো করে সব কিছু জানতে পারব কালকে। আমার কাছে আসছেন কোনো একটা ব্যাপারে পরামর্শ নিতে।”

“আমার তো মনে হয় আপনার চেয়ে একজন উকিলের পরামর্শ নেওয়াটাই ওঁর পক্ষে আশু প্রয়োজন,” প্রমথ বলল।

“তাও নিশ্চয় নিচ্ছেন স্যার।”

তারপর মিস আইলিন আর বল্লভ শাহর প্রসঙ্গ থেকে হঠাৎ এক-শো আশি ডিগ্রী ঘুরে একেনবাবু প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা স্যার, মিস সুজাতা কতদিন মাসিমার বাড়িতে আছেন?”

“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

“এমনি মনে হল স্যার। মাসিমা ওঁকে খুবই পছন্দ করেন। নিশ্চয় অনেক দিন ধরে আছেন।”

“ইউ মে বি রাইট,” আমি বললাম। “ফ্র্যাঙ্কলি এ নিয়ে কোনোদিন সুপ্রভামাসির সঙ্গে কথা হয়নি। আমার জিজ্ঞাসা করার কোনো কারণও ঘটেনি।”

“তা তো বটেই স্যার।”

“আপনি ফোন করে জিজ্ঞেস করুন না। প্রশ্নটা যখন মাথায় জেগেছে, ওটা না জানা পর্যন্ত তো ছটফট করবেন!”

“আরে না স্যার। হঠাৎ মনে হল কথাটা, এদেশে তো এরকম সচারাচর দেখা যায় না।”

হঠাৎ হঠাৎ একেনবাবুর কিছু মনে হয় না, কিন্তু এ নিয়ে আর প্রশ্ন করা হল না।

প্রমথ বলল, “ঐ যাঃ, আপনাকে বলতে গেছি স্টুয়ার্ট সাহেবের অফিস থেকে একটা মেসেজ আপনাকে দিতে বলেছে।”

“কী স্যার?”

“কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে যে চিঠিটার খোঁজ আপনি করতে বলেছিলেন, তার খবর ওরা নিয়েছে। উত্তর হল, হ্যাঁ, কিছুদিন আগে ইন্ডিয়া থেকে একটা চিঠি এসেছিল প্রফেসার রিচার্ড সাহেবের কাছে।”

“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”

“এর অর্থটা কি? আমি তো মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না।”

“সেটা উনিই জানেন,” প্রমথ বলল। “নিশ্চয় পরে একদিন জানতে পারব, যদি দয়া করেন।”

“আপনারা সত্যি স্যার, এত লেগপুল করেন।” কিন্তু মনে হল একেনবাবু খবরটা পেয়ে বেশ খুশি হয়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যাপারটা কি?”

“বলব স্যার, বলব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *