শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
একুশ
আমি আগে ভাবতাম শুধু আমাদের দেশেই ডানহাত জানে না বাঁ-হাত কী করছে। দেখলাম আমেরিকাতেও তাই। পুলিশ যার খোঁজ করছে ক্রিমিন্যাল বলে, সে দিব্যি ইমিগ্রেশনের বেড়াজাল ডিঙিয়ে এদেশে ওদেশ করছে। ইমিগ্রেশনের লোকরা যাদের পাকড়াও করছে, পুলিশ আবার তাদের খবর রাখে না। আমি হয়তো একটু সরলীকরণই করছি। কিন্তু মাত্র ক’দিন আগে যে লোকটা জেলের কয়েদি ছিল, সেই আব্দুল এদেশ ছেড়েছে চলে গেছে না আছে সেই সহজ প্রশ্নটার উত্তর না মেলার আর কোনো কারণ থাকতে পারে না।
পুলিশ টম ক্যাসিডিরও কোনো খোঁজ পায়নি। ব্রুকলিনে যেখানে থাকত, সেখানে নেই। কোথায় গেছে বাড়িওয়ালা জানে না। একেনবাবুর কথায় মনে হল পুলিশ অ্যাকটিভলি ওকে খুঁজছে না। সম্ভবতঃ ব্ল্যাকমেইল অ্যাঙ্গেল থেকেই পুলিশ এই হত্যাকান্ড দুটোকে দেখছে।
প্রমথ রাত্রে ডিনার খেতে খেতে একেনবাবুকে চেপে ধরল, “আপনার কী মনে হয় মশাই, মার্ডারটা ব্ল্যাকমেইল সংক্রান্ত?”
“হু নোজ স্যার।”
“হু নোজ মানে! আপনি ডাকসাইটে ডিটেকটিভ, আমাদের গর্ব। আপনি দ্যুম করে ‘হু নোজ’ বললে তো চলবে না।”
“শুনছেন স্যার প্রমথবাবুর কথা,” আমার দিকে তাকিয়ে একেনবাবু বললেন।
“শুনবে না কেন, প্রমথ বলল। “ও-তো কালা নয়। কিন্তু আপনি মশাই আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না কেন?”
“পুলিশ তো মনে হয় ব্ল্যাকমেইল থিওরির দিকেই এগোচ্ছে।”
“আর আপনি?”
“আমি আর অন্য কী ভাবব বলুন স্যার। ঢাল নেই তলোয়ার নেই, আমি তো নিধিরাম সর্দার।”
একেনবাবুর ক্ষোভের কারণটা আমি জানি। দু’দিন ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট ছুটিতে আছেন। ওঁর ডেপুটি রবার্ট, যাঁর পদবীটা ঠিক মনে করতে পারছি না –একেনবাবুকে একেবারেই পছন্দ করেন না। সেখান থেকেই নিশ্চয় কোনো থাবা-টাবা খেয়েছেন।
তবে প্রমথ ছাড়ল না। বলল, “ঢাল-তলোয়ার নেই কেন? বাপির মতো অ্যাসিস্টেন্ট আপনার। আমি আছি। চাইলে ফ্রান্সিস্কাকেও দলে নিতে পারেন।”
“এটা ভালো বলেছেন স্যার। আপনারা সত্যি সত্যি দলে থাকলে, অন্যকে ঘোড়াই কেয়ার করি।”
“গুড। এবার বলুন, পুলিশ কেন ব্ল্যাকমেইল থিওরির দিকে এগোচ্ছে।”
“সঠিক বলতে পারব না স্যার। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট তো নেই। তবে যেটুকু শুনলাম, তা হল দিলীপ পারেখের ‘বস’ বল্লভ শাহ বলে একটি লোকের উপর পুলিশের সন্দেহ পড়েছে। তাঁকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”
এই বল্লভ শাহর কথাই বোধহয় রোহিত রয় সেদিন বলেছিলেন। “উনি কি নানান ধরণের বিজনেস করেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ স্যার।”
“তাঁকে সন্দেহ করার কারণ?”
“একটা কারণ, বাজারে ওঁর খুব একটা সুনাম নেই।”
“মানে ঠগ-জোচ্চুরি করেন, তা ঝেড়ে কাশুন না,” প্রমথ বলল। “কীসের ব্যাবসা ওঁর?”
“অনেক কিছুর স্যার, ভিডিও স্টোর থেকে শুরু করে, হোটেল, ডায়মন্ড, অ্যান্টিক, ট্রাভেল এজেন্সি।”
“এর মধ্যে ঠগ-জোচ্চুরি কোথায়?”
“ঠগ-জোচ্চুরি উনি কতটা করেন সেটা পরিষ্কার নয়। তবে যাদের সঙ্গে উনি কারবার করেন, তাদের অনেকেই শেডি ক্যারেক্টার। কয়েকজনের ক্রিমিন্যাল রেকর্ডও আছে। আর ওঁর হোটেলটারও দুর্নাম আছে।”
নিশ্চয় নারীঘটিত ব্যাপার মিন করছেন। এই ধরণের প্রসঙ্গ এলে একেনবাবুকে ইশারায় বুঝে নিতে হয়।
“তাই যদি হয়, তাহলে পুলিশ এতদিন ওকে ধরেনি কেন?” প্রমথ প্রশ্ন করল।
“ধরত স্যার। ধীরে ধীরে তদন্তের জাল গুটিয়ে আনছিল।”
“কিন্তু এর সঙ্গে খুনের সম্পর্ক কি?” এবার আমার প্রশ্ন।
“সেটাই বলছি স্যার। রোহিত রয় যেদিন খুন হন, তার আগের রাতে বল্লভ শাহ রোহিতের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন। বল্লভ শাহর বক্তব্য শ্রেফ গল্প করতে। কিন্তু যেটা সবচেয়ে সন্দেহজনক, সেটা হল রোহিত রয় খুন হবার দিন সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ বল্লভ শাহ রোহিত রয়ের বিল্ডিং-এ এসেছিলেন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী মৃত্যু ঘটেছিল আটটা থেকে ন’টার মধ্যে। তার মানে মৃত্যুর সময়ে বল্লভ শাহ ঐ বিল্ডিং-এ ছিলেন।”
“মাই গড!” আমি বললাম। “কিন্তু পুলিশ এতদিন সেটা জানতে পারেনি কেন?”
“কারণ বিল্ডিং সিকিউরিটির কাছে কোনো রেকর্ড ছিল না। পুলিশ জানতেও পারত না, বল্লভ শাহকে প্রশ্ন না করলে।”
“কেন গিয়েছিলেন তার কোনো জবাবদিহি আছে?” প্রমথ জানতে চাইল।
“বল্লভ শাহ বলছেন, সকালে বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে উনি খেয়াল করেন যে ওঁর গাড়ির চাবি মিসিং। গাড়ির চাবিটা একটা ছোট রিং-এ লাগানো থাকে। সেই রিংটা আবার আটকানো থাকে ওঁর বড় চাবির রিং-এ। এর আগেও এরকম হয়েছে যে গাড়ির চাবির রিংটা বড় রিং থেকে খুলে পড়ে গেছে। তাই এবার গাড়ির চাবির রিং না পেয়ে বল্লভ শাহর মনে হয়েছিল, ওটা নিশ্চয় রাতে রোহিতের ফ্ল্যাট থেকে আসার সময়ে লিফটে ঢোকার মুখে পড়ে গেছে।”
“লিফটে ঢোকার মুখে কেন?” প্রমথ প্রশ্ন করল।
“কারণ স্যার, উনি সেই সময়ে ঝন্ন করে একটা আওয়াজ পান। কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক ওঁর মাথায় আসেনি ওটা চাবির আওয়াজ।”
“পকেট থেকে চাবি কী করে পড়ে যায়! পকেট ফুটো থাকলে অবশ্য অন্য কথা। এটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য এক্সপ্লানেশন নয়।” আমি মন্তব্য করলাম।
“পুলিশেরও একই প্রশ্ন ছিল। ওঁর উত্তর, উনি সবসময়ে চাবির ডগা দিয়ে লিফটের বোতাম টেপেন। বোতাম টেপার পরে পকেটে চাবি রাখার সময়ে নিশ্চয় রিংটা খুলে পড়ে যায়।”
আপাতভাবে এটা অস্বাভাবিক আচরণ মনে হলেও, এটা কিন্তু শীতকালে অনেকেই করে। আমিও মাঝেমাঝে করি। শীতকালে কার্পেটের উপর হেঁটে এসে লিফটের বোতাম কিংবা দরজার মেটাল হ্যাঁন্ডেলে হাত দিলে প্রায়ই শক খেতে হয় স্ট্যাটিক ইলেক্ট্রিসিটির জন্যে। চাবির ডগা ঠেকালে সেখানেই স্পার্কটা হয়, গায়ে শক লাগে না।
আমি বললাম, “ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট তো নেই, আপনি এত খবর জোগাড় করলেন কী করে?”
“বল্লভ শাহই আমাকে বললেন স্যার। পুলিশের হাতে হেনস্তা হবার পর আমাকে ফোন করেছিলেন। কার কাছে জেনেছেন, আমি নাকি ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের দোস্ত। তাই বোধ হয় ভেবেছেন ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে ওঁর সাইডটা আমি বুঝিয়ে বলব।”
“আপনার কি মনে হয় উনি সত্যি কথা বলছেন?”
“গোলমাল নিশ্চয় কিছু আছে। ঠিক বুঝছি না, খামোখা কেন উনি বলতে গেলেন সকালে মিস্টার রয়ের বিল্ডিং-এ যাওয়ার কথা!”
“কারণ সিকিউরিটির লোকেরা ওঁকে দেখেছিল বলে।” প্রমথ মন্তব্য করল।
“সিকিউরিটির লোকেরা দেখে থাকলে স্যার অনেক আগেই পুলিশ ওঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করত।”
হঠাৎ আমার একটা প্রশ্ন জাগল, “আচ্ছা একেনবাবু, রোহিত রয়ের বিল্ডিং- লবিতে কোনো সিকিউরিটি ক্যামেরা নেই?”
“আছে স্যার। তবে রোহিত রয়ের মার্ডারের তিনদিন আগে থেকে তার রেকর্ডার খারাপ হয়ে গিয়েছিল। নতুন রেকর্ডার কেনা হয়েছে, কিন্তু ইনস্টল করা হয়নি।”
“কিন্তু সেই তথ্যটা তো বল্লভ শাহর জানার কথা নয়।”
“তা নয়। কিন্তু তিনি খুন করে থাকলেও পুলিশকে তা প্রমাণ করতে হবে। মার্ডারের সময়ে উনি উপস্থিত ছিলেন বলে শুধু শুধু পুলিশকে সাহায্য করবেন কেন?”
“দিলীপ যখন খুন হয়, তখন বল্লভ শাহ কোথায় ছিলেন?” প্রমথ প্রশ্ন করলো।
“উনি বলছেন বাড়িতে ছিলেন। সন্ধ্যা ছ’টায় দিলীপ পারেখকে দোকানে রেখে উনি বাড়ি ফেরেন। তারপর আর বাড়ি থেকে বেরোননি। ন’টা নাগাদ বাইরে থেকে খাবার আনিয়েছিলেন। ক্লান্ত লাগছিলো বলে খেয়েদেয়ে দশটার মধ্যে শুয়ে পড়েন।”
“এটা তো ওঁর গল্প, প্রমথ বলল।
“রাইট স্যার। তার ওপর উনি অবিবাহিত, অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকেন। যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, সেখানে আবার কোনো সিকিউরিটি গার্ড নেই। সুতরাং তিনি যে ঘরেই ছিলেন তার কোনো প্রমাণ নেই। হি হ্যাঁস নো অ্যালিবাই।”
এরপর একেনবাবু যা বললেন সেটা হল ওঁর স্পেকুলেশান। পুলিশ নিশ্চয় অনুমান করছে রোহিত রয় আর দিলীপের সঙ্গে বল্লভ শাহও ব্ল্যাকমেইল রিং-এ ছিলেন। হয়তো বখরা নিয়েই এঁদের মধ্যে ঝগড়া লেগেছিল। পাপকাজের বন্ধুরা যখন শত্রু হয়, তখন হয় সেই শত্রুর নাশ, নয় নিজের বিনাশ।
“আমার মনে হচ্ছে, আপনি পুলিশের সঙ্গে ঠিক একমত হতে পারছেন না।”
“তা নয় স্যার। তবে কিনা খোঁজ নিয়ে জানলাম মারা যাবার আগে পর্যন্ত দিলীপ পারেখের আচরণ খুব স্বাভাবিক ছিল। আই অ্যাম লিটল কনফিউজড স্যার।”
এর মধ্যে কী এমন কনফিউশনের আছে বুঝলাম না। তবে একেনবাবুর কথাবার্তা অনেক সময়েই হঠাৎ ক্রিপ্টিক হয়ে যায়!
