শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

কুড়ি

রোহিত রয়ের যেদিন ফিউনারেল সেদিন সকালে একেনবাবুর ফোন এল ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের কাছ থেকে। আমরা তখন সবে কফি নিয়ে বসেছি। ফোন পেয়ে কফিটফি ফেলে কিছু না বলেই একেনবাবু বেরিয়ে গেলেন।

সাড়ে এগারোটার সময় আমি, প্রমথ, আর ফ্রান্সিস্কা যখন ফিউনারেলে যাচ্ছি তখনও উনি ফেরেননি। আমাদের ফিউনারেলে যাবার প্ল্যান ছিল না। কিন্তু সুভদ্রামাসি গতরাত্রে ফোন করে বললেন উনি ফিউনারেলে যাবেন। জানতে চাইলেন আমরা যাব কি না। তখন আর ‘না’ বলতে পারিনি, আমরা গেলে নিশ্চয় ওঁর ভালো লাগবে। সুভদ্রামাসিই ফিউনারেল হোমের ঠিকানাটা দিলেন। ম্যানহাটানে নয়, টাপান জি ব্রিজের কাছে “স্লিপি হলো” বলে একটা ছোট্ট শহরে।

ফিউনারেলে অনেক লোক এসেছে। ভিউইং হলে বসার জায়গা নেই। আমরা লবির এক পাশে এসে দাঁড়ালাম। ফ্রান্সিস্কা এরই মধ্যে ফিউনারেল হোমের এক অ্যাটেন্ডেন্টকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে চেয়ার ম্যানেজ করে সুভদ্রামাসির পাশে গিয়ে বসতে পারল। ভেতরে ইউলজি শুরু হয়েছে। সেটা শেষ হলে শেষ দর্শনের জন্য একে একে সবাই যাব। অন্যমনস্ক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিলাম, কী হাবিজাবি ভাবছিলাম, নিজেরই খেয়াল নেই। হঠাৎ প্রমথ বলল, “একেনবাবুও এসেছেন।” তাকিয়ে দেখি একেনবাবু আর ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট বাইরের দরজা দিয়ে লবিতে ঢুকছেন।

আজ এখানে সবারই বেশভূষা ফর্মাল। ছেলেরা গলায় টাই ঝুলিয়ে স্যুট পরে এসেছে। একেনেবাবুই ব্যতিক্রম। যেভাবে বাড়ি থেকে সকালে বেরিয়েছিলেন এসেছেন সেভাবেই। নস্যি রঙের সোয়েটার আর তার ওপরে হালকা খয়েরি রঙের অলওয়েদার কোট –টমেটো, মাস্টার্ড ইত্যাদির সসে রঞ্জিত হয়ে যেটা মাল্টি-কালার্ড।

আমাদের দেখতে পেয়ে একেনবাবু কাছে এসে দাঁড়ালেন। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট ঢুকলেন ভিউইং হলে।

প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? সাতসকালে হুড়মুড় করে বেড়িয়ে গেলেন?”

একেনবাবু বললেন, “আর বলবেন না স্যার, আরেকটা সমস্যা।”

“কী সমস্যা?”

“এখানে বলা যাবে না স্যার।” তারপর একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, “সবাই স্যার স্যুট-টুট পরে এসেছেন।”

“আমি স্যুট পরেছি ঠিকই, কিন্তু প্রমথ এসেছে স্পোর্টস জ্যাকেট চাপিয়ে, টাই-ফাইও লাগায়নি। আমি অবশ্য বলেছিলাম, “ফিউনারেলে যাচ্ছিস, সবাই টাই পরে থাকবে।”

ও পাত্তা দেয়নি। উলটে বলেছে, “তুই হচ্ছিস কনফর্মিস্ট, সকলের সঙ্গে তাল রেখে চলার চেষ্টা করিস।”

আমি এই সুযোগে প্রমথকে টিপ্পনি কাটার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না। একেনবাবুকে বললাম, “আপনি হচ্ছেন সত্যিকারের নন-কনফর্মিস্ট, প্রমথ শুধু মুখে তড়পায়!”

শুনে প্রমথর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, “রাস্কেল।”

ভিউইং-এর লাইন শুরু হয়েছে। লম্বা লাইন, আস্তে আস্তে এগোচ্ছে। আমরা গিয়ে যখন ক্যাসকেডের সামনে পৌঁছলাম তখন ঘর প্রায় ফাঁকা। রোহিত রয় শুয়ে আছেন। বলা উচিত ওঁর দেহটা শুয়ে আছে। পরণে নেভি-ব্লু স্যুট, গলায় একটা লাল রঙের নক্সা কাটা টাই। মুখটা প্রশান্ত। কপালে গুলি লেগেছিল শুনেছিলাম। কিন্তু তার কোনো চিহ নেই। মর্টিশিয়ান তার যাদুতে সবকিছু অদৃশ্য করে দিয়ে রোহিত রয়কে তাঁর পুরোনো নিখুঁত অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছে। প্রাণটাই শুধু ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম ক্যাসকেডের সামনে, প্রমথর ঠেলা খেয়ে এগিয়ে গেলাম। মৃতদেহ দেখা আমার থেকেও ও বেশি অপছন্দ করে।

একটু দূরে সুভদ্রামাসি আর একজন সাদা মহিলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। অনুমান করলাম, রোহিত রয়ের মা হিলডা। সন্তানহারা দুই নারী! ফ্রান্সিস্কা সুভদ্রামাসির একটা হাত ধরে আছে। সুজাতাও সেখানে দাঁড়িয়ে।

সুভদ্রামাসির কাছে যেতে আস্তে আস্তে বললেন, “আমি এখন বাড়ি যাব।” আমি হাত বাড়িয়ে সুভদ্রামাসির আরেকটা হাত ধরলাম। আমার আর ফ্রান্সিস্কার হাতে ভর দিয়ে উনি এগোতে থাকলেন। তারপর একমুহূর্তের জন্য থেমে হিলডাকে ডাকলেন। হিলডা কাছে আসতে আমাদের হাত ছেড়ে দিয়ে হিলডাকে জড়িয়ে ধরলেন। হিলডাও। ওঁদের আলিঙ্গন শেষ হবার পর, হিলডা বললেন, “আমি কয়েকদিন আছি, তোমার কাছে আসব।”

“এসো।” মাথা নাড়লেন সুভদ্রামাসি।

মনে হল, এক পুত্রের মৃত্যুতে ঘটেছিল যে বিচ্ছেদ, তার সমাপ্তি হল অন্য পুত্রের মৃত্যুতে!

সুভদ্রামাসিকে গাড়িতে তুলে নিজেদের গাড়ির দিকে এগোচ্ছি, দেখলাম বাবু পিন্টো গাড়িতে উঠলেন। একেনবাবু হাত নেড়ে চেঁচিয়ে বললেন, “ভালো আছেন স্যার? চিনতে পারছেন?”

একেনবাবুকে একবার যে দেখেছে, তার চিনতে না পারার কথা নয়। বাবু পিন্টো মাথা নেড়ে বললেন, “নিশ্চয়, আপনি ভালো তো?”

আমাদের গাড়িটা বাবু পিন্টোর গাড়ির কয়েকটা গাড়ি পরে। আমরা ওঁর কাছাকাছি যেতে, বাবু গাড়ির কাঁচ নামিয়ে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার গ্রেট আঙ্কেলের ব্যাপারে আর কিছু এগোল?”

“না স্যার, এখনও কিছু করতে পারিনি।”

“আমি দুয়েকটা লিড পেয়েছি। একদিন যোগাযোগ করবেন, বলে দেব।”

“সো কাইন্ড অফ ইউ স্যার, সো কাইন্ড অফ ইউ। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই যোগাযোগ করব।”

“এনি টাইম,” বলে বাবু পিন্টো চলে গেলেন। বাবু-র চোখ লাল, বেশ একটু বিধ্বস্ত মনে হল। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু, সেটাই স্বাভাবিক।

প্রমথ বাবু পিন্টোকে চিনত না। লোকটা কে বলাতে মন্তব্য করল, “টোপ।”

“তার মানে স্যার?”

“বুঝলেন না, এক টুকরো খবর দেবে। সেটা গিলে আপনি হ্যাংলার মতো আরও খবর চাইবেন। তখন বলবে পয়সা লাগবে।”

“কী যে বলেন স্যার!”

প্রমথ বলল, “ঠিকই বলি। এবার আসল কথাটা বলুন তো আজ সকালে বেড়িয়েছিলেন কেন?”

একেনবাবু বললেন, “আরেকটা মার্ডার। একই স্টাইলে।”

“তার মানে?”

“যেরকম বুলেট মিস্টার রয়ের শরীরে পাওয়া গেছে, ঠিক সেরকম টোয়েন্টি-টু ক্যালিবারের মার্কিংলেস বুলেট। ক্ষতর সাইজও সাধারণ বুলেটে যা হওয়া উচিত, তার চাইতে বেশি। একেবারে আইডেন্টিকাল কেস!”

“লোকটি কে?”

“দিলীপ পারেখ।”

“তারমানে ভারতীয়?”

“হ্যাঁ স্যার।”

“কী করত সে?”

“একটা স্পেশালিটি শপে কাজ করতেন। সেখানেই কেউ এসে খুন করেছে।”

“আজ সকালে?”

“না, মনে হচ্ছে কাল রাত্রে। দিলীপ অনেক রাত পর্যন্ত দোকানে বসে কাজ করতেন।”

এইভাবে প্রশ্ন আর উত্তর না লিখে একেনবাবুর কাছে মোটামুটি যা উদ্ধার করলাম সেটা বরং লিখি।

দিলীপ পারেখ গুজরাতের আহমেদাবাদ থেকে বছর চারেক আগে এদেশে এসেছিল। কম্পিউটার গ্রাফিক্সে ট্রেনিং ছিল, নিজের ফিল্ডে চাকরি না পেয়ে একটা স্পেশালিটি শপে সেলসম্যানের চাকরি করত। সেইখানেই রোহিত রয়ের সঙ্গে ওর আলাপ। রোহিত রয় অ্যাড-এজেন্সির জন্য ছবি তৈরি করতেন। কিন্তু সব সময়ে সেগুলো রিয়েল হত না, বিভিন্ন ছবির অংশ ব্যবহার করে কম্পোজ করা হত। এডিটিং করা হতো এমন সযত্নে যাতে খুবই ন্যাচেরাল লাগে।

দিলীপের কম্পিউটার গ্রাফিক্সের ট্যালেন্ট দেখে রোহিত ওকে কাজে লাগান। দিনের ডিউটি শেষ হলে রোহিত রায়ের ডিজিটাল লাইব্রেরি থেকে ছবি বেছে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন মাফিক ছবি দিলীপ তৈরি করত। দিলীপের কম্পিউটারে এই ধরণের বেশ কিছু হাফ-কমপ্লিট কম্পোজিশান পুলিশ পেয়েছে। ঠিক কি ধরণের ছবি পুলিশ পেয়েছে, একেনবাবু বিস্তারিত জানেন না। তবে ওঁর ধারণা, পুলিশের থিওরি হল, দিলীপও সম্ভবতঃ রোহিতের সঙ্গে ব্ল্যাকমেইলের ব্যাপারে যুক্ত ছিল। রোহিত রয়ের বাড়ির কম্পিউটারে পুলিশ যে কয়েকটা আপত্তিকর ছবি পেয়েছে, তার এডিটিং-এর কাজ মোটেই পেশাদারি নয়। দিলীপের কম্পিউটারের ছবিগুলো অনেক উচ্চস্তরের। এটা সম্ভব যে রোহিত নিজে

ভালো ছবি তুললেও, ওঁর এডিটিং-এর কাজ দিলীপই করত। উনি দিলীপকে শুধু কম্পোজিশনটা বলে দিতেন। ফিনিশিং-এর ব্যাপারটা দিলীপের হাতে থাকত। এই থিওরিটা সত্যি হলে দুজনের মৃত্যুই সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। একেনবাবু যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন আমার মনে পড়ল যে রোহিত আমাকে বলেছিলেন যে ওঁর একজন অ্যাসিস্টেন্ট আছে। সেই অ্যাসিস্টেন্টই নিশ্চয় দিলীপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *