শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

দুই 

আমরা বেরোলাম প্রায় আড়াইটে নাগাদ। প্ল্যান ছিল ফ্রান্সিস্কাকে ওর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তুলে নিয়ে যাব। কিন্তু একেবারে শেষ সময়ে সেটা বাতিল করতে হল। শুক্রবার ফ্রান্সিস্কার একটা ইমপর্টেন্ট এক্সপেরিমেন্ট ছিল, যেটা ভন্ডুল হওয়ায় আজকে আবার করতে হচ্ছে! প্রমথ বলল, “ভালোই হল, ইংরেজিতে বকবক করতে হবে না।”

 

ওটা মুখের কথা, বুঝলাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

 

সুভদ্রামাসি থাকেন নিউ জার্সির উত্তর দিকে লেক ভালহাল্লা বলে একটা জায়গায়। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল পঁয়ত্রিশ দূরে। নিউ জার্সি যেতে হলে হাডসন নদী পার হতে হয়। ব্রিজ বা টানেল দুটোই নেওয়া যায়। সেবার গিয়েছিলাম লিঙ্কন টানেল দিয়ে। এবার ধরলাম জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ। কিন্তু এমনই কপাল, পড়লাম জ্যামে। পাক্কা পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল শুধু ব্রিজ পার হতে। তারপর হাইওয়ে আই-৮০ ধরে মন্টভিল শহরে পৌঁছোতেই বাজল প্রায় চারটে। তখনও বেশ কিছুটা পথ বাকি।

 

লেক ভালহাল্লা মন্টভিল শহরের পাশে একটা পাহাড়ি শহরতলি। পাহাড়ের নীচে ভালহাল্লা লেক। তার পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে গাড়ি যাবার রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে প্রায় আধমাইল গেলে, বাঁদিকে পড়ে সুভদ্রামাসির বাড়ি। এখানকার বাড়িগুলোর চারপাশে অনেকটা করে জায়গা। সামনে অল্প একটু ফুলের বাগান ছাড়া পুরোটাই গাছপালায় ভর্তি। বেশ জঙ্গল জঙ্গল চেহারা। আমি গাছপালা খুব একটা ভালো চিনি না। প্রমথ কিছু চেনে, অন্তত দাবি করে চেনে বলে। আমাদের কয়েকটা গাছ আর ঝোঁপ চেনাল। ওক, উইপিং উইলো, বার্চ, ডগউড, ফরসিথিয়া, আরও বেশ কয়েকটা নাম –এখন আর মনে পড়ছে না।

 

একেনবাবু দেখলাম একেবারে মুগ্ধ। আমাকে বললেন, “সত্যি স্যার, প্রমথবাবুর এ ব্যাপারে দেখছি অগাধ জ্ঞান। অ্যামেজিং!”

 

গাছপালা দেখতে দেখতে আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম।

 

“এই বাড়ি পার হয়ে চলে যাচ্ছিস যে!” প্রমথর চিৎকারে চমক ভাঙল।

 

“সরি,” বলে গাড়িটা ব্যাক করে, সুভদ্রামাসির ড্রাইভওয়েতে ঢোকালাম।

 

বেল বাজিয়ে দেখি এক সায়েব দরজা খুলেছে। সেরেছে, বাড়ি ভুল করলাম নাকি! প্রমথ চেঁচিয়ে উঠেছিল বলে, বাড়ির নম্বরটাও দেখিনি। প্রমথও মনে হল একটু হতচকিত। একেনবাবুর মুখ দেখে অবশ্য কিছুই বোঝা যায়না, কারণ উনি সবসময় একটা স্টেট অফ কনফিউসানের মধ্যে থাকেন!

 

আমাদের অবস্থা দেখে ভদ্রলোক মনে হল যেন একটু অ্যামিউজড। দরজাটা পুরোপুরি খুলে দিয়ে একটু সরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আসুন, উনি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।”

 

দরজা দিয়ে ঢুকলেই একটা ছোট্ট ফয়ার, আর তার বাঁ পাশে হল বসার ঘর। সুভদ্রামাসি সেখানেই ছিলেন।

 

“এসো, এসো, এত দেরি হল কেন? আমি তো ভাবলাম তিনটে চারটের মধ্যেই চলে আসবে।”

 

“সেই ভাবেই বেরিয়েছিলাম, কিন্তু জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজে আজ জ্যাম।”

 

“সেটাই রোহিত বলল, নিশ্চয় ব্রিজ বা টানেলে আটকা পড়েছ,” সুভদ্রামাসি পরিষ্কার বাংলাতেই বললেন।

 

“এসো, তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। এ হল রোহিত, রোহিত রয়। এককালে রিচার্ডের রিসার্চ অ্যাসিস্টেন্ট ছিল। এখন অবশ্য ও একজন বিগ শট।”

 

আরে, ইনি তো বাঙালি! শুধু দেখতে সাহেবের মতো আর কথা বলেন ইংরেজিতে।

 

“একদম বাজে কথা, বিশ্বাস করবেন না,” বলে রোহিত এগিয়ে এসে একে একে আমাদের সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। আমি আর প্রমথ নিজেদের পরিচয় দিলাম।

 

সুভদ্রামাসি বললেন, “এদের একজন ফিজিক্সে ডক্টরেট, আরেকজন কেমিস্ট্রিতে।”

 

রোহিত চোখ কপালে তুলে বললেন, “আপনারা তো জিনিয়াস! বুঝলেন, ফ্রেশম্যান ইয়ারে ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি –দুটো সাবজেক্টই ছিল আমার নাইটমেয়ার। কোনোমতে সি মাইনাস পেয়ে পাশ করেছি। এমন কি এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখি, আবার ফিজিক্স কেমিস্ট্রি পরীক্ষা দিতে বসেছি, কিন্তু একটা প্রশ্নও বুঝতে পারছি না –ঘেমে নেয়ে অস্থির।”

 

“আপনি স্যার ভীষণ ফানি!” একেনবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন।

 

“দাঁড়ান, দাঁড়ান, আপনিও ফিজিক্স?”

 

“আর ইউ ম্যাড স্যার! আমার এঁদের মতো ডিগ্রি ফিগ্রি নেই –আমার বিদ্যে বি.এ পর্যন্ত।”

 

রোহিত কিছু বলার আগেই প্রমথ বলল, “আমাদের একেনবাবু একটু বিনয়ী। উনি ফিজিক্স কেমিস্ট্রির অনেক ঊর্ধে –ক্রিমিনোলজির লোক।”

 

রোহিত সেটা শুনে খুব উৎসাহিত হলেন, “সত্যি! একদিন তাহলে আপনার সঙ্গে ভালো করে আলাপ করব। ঐ সাবজেক্টের কিছুই জানি না, কিন্তু খুব ফ্যাসিনেশন আছে।”

 

রোহিতের পরিচয় পরে আরেকটু বিশদ করে পেলাম। মা জার্মান। চেহারাটা মায়ের দিক থেকেই পেয়েছেন। জন্ম জার্মানিতে, তবে বড় হয়েছেন এদেশে। বাঙালির ছেলে হওয়া সত্ত্বেও, বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ ছেলেবেলাতে ছিল না। ভারতবর্ষে প্রথম গেছেন বাবার মৃত্যুর পর, যখন কলেজে পড়তে ঢুকেছেন। পরে অবশ্য অনেকবারই গেছেন। একবার সুভদ্রামাসি আর রিচার্ডমেসোর সঙ্গেও গিয়েছিলেন। অ্যানথ্রপলজিতে আন্ডার গ্রাজুয়েট করে মাস্টার্স করছিলেন, কিন্তু নেশা ছিল ফোটোগ্রাফির। তাই পড়াশুনো ছেড়ে হয়ে গেলেন ফ্রিলান্স ফোটো জার্নালিস্ট। সারা বিশ্ব ঘুরে ঘুরে ছবি তোলেন, আর সেই সম্পর্কে আর্টিকেল লেখেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, লাইফ, টাইমস ইত্যাদি বড়ো বড়ো ম্যাগাজিনেও ওঁর তোলা ছবি আর লেখা ছাপা হয়েছে। রোহিত অবশ্য বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না। ওঁর ফিয়াসে সেদিনই আসছেন লন্ডন থেকে। তাঁকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে চলে গেলেন।

 

রোহিত চলে যেতে আমরা সবাই বসার ঘরে আরাম করে বসলাম। সুভদ্রামাসি দেখলাম রোহিতকে খুব স্নেহ করেন। বললেন, “অনেক গুণ ছেলেটার। এই বাড়িটা ওই আমাদের খুঁজে দিয়েছিল। ও অবশ্য বলে আমাদের নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টের উপর লোভ ছিল বলে এই খোঁজাখুঁজিগুলো করেছে। তারপর যখন রিচার্ডের ক্যানসার ধরা পড়েছে তখনও প্রচুর সাহায্য করেছে আমাদের।”

 

“তোমাদের সেই নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে উনি থাকেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

 

“হ্যাঁ, ওটা কিনেছে। কিন্তু থাকে আর ক’দিন, বাইরে বাইরেই তো ঘুরছে! এই তো আবার থাইল্যান্ড যাচ্ছে –ওখানকার জঙ্গলে গিয়ে ছবি তুলবে। এক্কেবারে মাথার স্থির নেই। একবার এটা করে –একবার ওটা ধরে। যাক, এবার এই বৃটিশ মেয়েটার সঙ্গে ভাব হয়েছে। যদি একটু ঠান্ডা হয়।”

 

সুভদ্রামাসির বসার ঘরটা সত্যিই বিশাল। সিলিংটা খুব উঁচু –যাকে এদেশে বলে ক্যাথিড্রাল সিলিং। সিলিং-এর দুই দিকে দু’টো বড়ো বড়ো স্কাইলাইট। একদিকে বিশাল একটা ফায়ার প্লেস। তার দুপাশে দেয়াল জুড়ে অনেক রকমের মুখোশ। আমি আর প্রমথ অবশ্য এগুলো দেখেছি। একেনবাবু এই প্রথম এলেন। সেগুলোর দিকে উনি বার বার তাকাচ্ছেন দেখে সুভদ্রামাসি বললেন, “এটা ছিল রিচার্ডের শখ। ঘুরে ঘুরে এগুলো সংগ্রহ করেছে।”

 

একেনবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে মুখোশগুলো দেখতে লাগলেন। তারপর ঘরটা একবার চক্কর দিয়ে চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, “আপনার বাড়িটা কিন্তু ম্যাডাম আউট অফ দ্য ওয়ার্লড।”

 

“আমাকে তুমি মাসিমা ডেকো,” সুভদ্রামাসি বললেন। “কিন্তু বাড়িটা তো এখনও দেখইনি!”

 

“না না যতটুকু দেখেছি ম্যাডাম, মানে মাসিমা –সত্যি, এরকম জায়গা নিউ ইয়র্কে থেকে কল্পনা করা যায় না।”

 

“দেখেছেন,” সুভদ্রামাসিকে বলল প্রমথ, “বাপির অ্যাপার্টমেন্টের কিরকম নিন্দা করছেন!”

 

“আরে ছি ছি স্যার, নিন্দা কখন করলুম? আপনি না স্যার, সত্যি!”

 

সুভদ্রামাসি সস্নেহে হেসে বললেন, “চলো একেন, তোমাকে বাড়িটা দেখিয়ে দিই।”

 

“আপনার কষ্ট হবে না তো?”

 

“আরে একটু কষ্ট হোক। হাঁটা চলা না করলে, পরে আরও কষ্ট হবে। আমাকে বরং ওই লাঠিটা দাও।”

 

তিন পা-ওয়ালা একটা লাঠি সোফার একপাশে কার্পেটের ওপর শোয়ানো ছিল। একেনবাবু সেটা তুললেন। সুভদ্রামাসিকে সোফা থেকে উঠতে আমি একটু সাহায্য করলাম। দেখলাম লাঠি নিয়ে সুভদ্রামাসি বেশ সহজেই হাঁটতে পারছেন। কিচেনে সুভদ্রামাসির কুক সুজাতা তখনও রান্না করছেন। কেরালার মহিলা, বেঁটে শক্তপোক্ত চেহারা। কোঁকড়া চুল টানটান করে খোঁপায় বাঁধা। মুখটা গোলগাল। তবু কোথায় যেন একটা কাঠিন্য আছে।

 

“সুজাতাকে তো তোমাদের মনে আছে?” আমরা মাথা নাড়লাম। একেনবাবুর সঙ্গে সুজাতার পরিচয় করিয়ে দিলেন সুভদ্রামাসি। “আমার বহুদিনের সাথি সুজাতা– সুখে দুঃখে সব সময়ে আমার পাশে আছে।”

 

সুভদ্রামাসি সত্যিই খুব সুইট। সুজাতা ওঁর কুক-কাম-হেল্পার, কিন্তু যতটুকু আমি দেখেছি কথায় / বার্তায় কে মনিব কে কর্মচারী –সেটা বোঝার উপায় নেই।

 

সুজাতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই আপ্লুত স্বরে একেনবাবু বললেন, “ফুড স্মেলস ভেরি গুড।”

 

“থ্যাঙ্ক ইউ।”

 

কিচেনের সঙ্গে লাগোয়া ব্রেকফাস্টের জায়গা। সেখান থেকে ফ্যামিলি রুমে যাওয়া যায়। বসার ঘর দিয়েও যাওয়া যায়। বসার ঘরটা বাইরের অভ্যাগতদের জন্য। বিশেষ পরিচিতরা ভেতরে ফ্যামিলি রুমেই বসে। সেখানেও একটা ফায়ার প্লেস। ঘরের একদিকে শুধু কাঁচের দেয়াল। সেখান থেকে গাছপালা জঙ্গল দেখা যায়। উলটোদিকের দেয়ালে একটা সুন্দর স্ক্যান্ডেনেভিয়ান স্টাইলের এন্টারটেইনমেন্ট সেন্টার। তার একদম নীচে রয়েছে ডিভিডি প্লেয়ার। মাঝখানে বেশ বড়ো একটা টিভি। একেবারে উপরের তাকে সুদৃশ কাঁচের জারের মধ্যে একটা ছোট্ট নারীমূর্তি –সাইজে ইঞ্চি পাঁচ-ছয়ের মতো হবে। উপরটা সোনার নীচটা রূপোর, খুবই আন-ইউসুয়্যাল!

 

“আগে তো এটা দেখিনি, উপরটা কি সত্যিই সোনার?” প্রমথ প্রশ্ন করল।

 

“গোল্ড-প্লেটিং,” সুভদ্রামাসি উত্তর দিলেন। “আগে বেডরুমে ছিল, তাই দেখনি।”

 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোত্থেকে কিনলে?”

 

“এর বয়স এক-শো বছরেরও বেশি। আমার দাদুর বাবা তাঁর বৌমা, মানে আমার দিদিমাকে দিয়েছিলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, “এটার আবার একটা হিস্ট্রি আছে। মধ্যে এটা একবার চুরিও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে চোরই আবার এটা ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়।”

 

“বেশ অদ্ভুত চোর! কবে চুরি হয়েছিল?”

 

“সে আমার জন্মের আগের ঘটনা। এটা থাকত ঠাকুরঘরে –একটা কাঠের বাক্সের মধ্যে। বাক্সটা আরও পুরোনো, আমার দাদুর ঠাকুমার বাক্স! মায়ের যেদিন বিয়ে, সেদিন সকালে দিদিমা ঠাকুর ঘরে গিয়ে দেখেন বাক্সটা উধাও। এই মূর্তিটা ছিল মায়ের ভীষণ প্রিয়। তাই দিদিমা বলেছিলেন মা যখন শ্বশুরবাড়িতে যাবে, তখন এটাও সঙ্গে যাবে। চুরি গেছে শুনলে মা ভীষণ কষ্ট পাবে বলে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মাকে কিছু জানাননি দিদিমা। মা শ্বশুরবাড়ি চলে যাবার পর কয়েকদিন বাদেই তুলো আর কাপড়ে মুড়ে মূর্তিটা কেউ জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ফেলে পালিয়ে যায়।”

 

“ভেরি স্ট্রেঞ্জ ম্যাডাম… মানে মাসিমা,” একেনবাবু বললেন।

 

“আমার দিদিমা আমায় বলেছিলেন, চোর নিশ্চয় ভেবেছিল, এটা লক্ষ্মীমূর্তি। জাগ্রত লক্ষ্মী চুরি করলে ঘরে অলক্ষ্মী আসে। সেই ভয়েই ফেরৎ দিয়েছিল ওটা।”

 

“ননসেন্স!” প্রমথ বলল। “আপনি এসব বিশ্বাস করেন?”

 

“ছেলেবেলায় করতাম, এখন আর করি না। এখন মনে হয় ওটা কোনো প্র্যাকটিক্যাল জোক –চেনাজানা কেউ করেছিল। তবে দাদুর নাকি খুব মন খারাপ হয়েছিল বাক্সটার জন্য। ওটা ছিল দাদুর ঠাকুমার। দাদুর বাবা যখন খুব ছোটো তখন উনি মারা যান। মারা যাবার সময়ে নাকি বলে গিয়েছিলেন, ওটা যেন ছেলেকে দেওয়া হয়।”

 

ফ্যামিলি রুমের যেদিকে কাঁচের দেওয়াল তার লাগোয়া দেয়ালে একটা নীচু বিল্ট-ইন বইয়ের আলমারি। তার নীচের দুটো তাকই বইয়ে ঠাসা। আলমারির উপরে সুন্দর ফ্রেমে বন্দি দুটো ফোটো, পাশে একটা চামড়া দিয়ে বাঁধানো খাতা, আর তার ওপরে একটা বেশ মোটা ডয়েরি বা নোটবই। চামড়ায় বাঁধানো খাতার উপরে বড়ো করে লেখা “আওয়ার ফ্যামিলি’। ফোটোগ্রাফ দুটোর একটা রিচার্ডমেসোর, অফিসে বসে কাজ করছেন। আরেকটা কম বয়সি একটা ছেলের। অনুমান করলাম সুভদ্রামাসির সেই অ্যাডপ্টেড ছেলে। দেয়ালে বেশ কয়েকটা ফ্যামেলি পোর্ট্রেট টানানো। সুভদ্রামাসির বাবা-মা আর দাদু-দিদিমার ছবি। সুভদ্রামাসির কাছে শুনলাম যে রিচার্ডমেসো নাকি কাঠের কাজ করতে খুব ভালোবাসতেন। উনি নিজেই কাঠের ফ্রেম তৈরি করে ছবিগুলোকে লাগিয়েছেন।

 

প্রমথ ফিসফিস করে বলল, “রিচার্ডমেসো নিশ্চয় শ্বশুরকে দেখতে পারতেন না।”

 

আমি অবাক চোখে তাকাতে বলল, “দেখছিস না, দাদু-দিদিমার ছবি বাঁধিয়ে রেখেছেন,

 

কিন্তু ঠাকুরদা-ঠাকুরমা মিসিং!”

 

“চুপ কর, ইডিয়ট।” আমি বিরক্ত হয়ে বললাম।

 

সুভদ্রামাসির দাদুর ছবিটা ইন্টারেস্টিং। মাথায় পাগড়ি বাঁধা –বেশ রাজকীয় ছবি। সুভদ্রামাসির কাছে শুনলাম যে উনি এবং ওঁর বাবা –দুজনেই মধ্যপ্রদেশে কোনো এক রাজ্যের দেওয়ান ছিলেন। রিচার্ডমেসোর সম্পর্কে আরও একটা জিনিস সুভদ্রামাসির কাছে। জানলাম। কাঠের কাজ ছাড়া রিচার্ডমেসোর আরেকটা ব্যাপারে বিরাট উৎসাহ ছিল –সেটা হল জিনিওলজি। দুই পরিবারের ফ্যামিলি-ট্রি তৈরি করছিলেন তিনি।

 

‘আওয়ার ফ্যামিলি’ বলে যে বাঁধানো খাতাটার কথা লিখেছি –সেটা হল ওঁর সেই কাজের অসমাপ্ত ফসল।

 

“কাজটা তো খুব সহজ ব্যাপার নয়,” আমি বললাম।

 

“ঠিকই বলেছ। আমেরিকা বা ইউরোপে হয়তো একটু সহজ। ওদের চার্চে খোঁজ করলে অনেক খবরই উদ্ধার করা যায়। অবশ্য তার জন্য নানান জায়গায় যেতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তো সেই সুবিধা নেই। শুনেছি পুরীর পান্ডাদের কাছে কিছু খবর থাকে। যাই হোক, ওটাই ছিল ওর হবি। একজন প্রফেশনাল জিনিওলজিস্টের সাহায্যও মাঝেমধ্যে নিয়েছে। আমি বলতাম শুধু শুধু পয়সা নষ্ট করছ। ও বলত, পয়সা কার জন্য রেখে যাব বলে।” কথাটা বলতে বলতে সুভদ্রামাসির মুখটা কেমন যেন করুণ হয়ে গেল। নিশ্চয় ছেলের কথা মনে পড়ছে।

 

আমি আলোচনার মোড় ঘোরানোর জন্য খানিকটা অভদ্রের মতোই বলে ফেললাম, “সুভদ্রামাসি, আমার কিন্তু খিদে পেয়ে যাচ্ছে।”

 

“হ্যাঁ, চলো, সুজাতা নিশ্চয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

 

কী খেলাম সেটা বর্ণনা করে পাঠকদের চটিয়ে দিতে চাই না। এটুকু বলতে পারি ওই খাওয়ার জন্য ৩৫ মাইল কেন, আমি ১০০ মাইল যেতেও রাজি।

 

খাওয়াদাওয়ার পরে সুভদ্রামাসি একটা খাম বার করে আমায় দিলেন। “এটা তোমার মা-কে দিও, খুশি হবে।”

 

“কী এটা দেখতে পারি?”

 

“নিশ্চয়।”

 

খাম থেকে বের হল একটা ব্ল্যাক-এন্ড-হোয়াইট ছবি। দুই কিশোরী গলা জড়াজড়ি করে বসে আছে। তাদের সামনে ছোটো বাক্সের উপর যেটা শোয়ানো, সেটা চিনতে অসুবিধা হল না –কাঁচের জারের মধ্যে রাখা নারীমূর্তিটা।

 

“এঁরা কারা বললো তো?” সুভদ্রামাসি জিজ্ঞেস করলেন।

 

“তোমার ছোটোবেলার ছবি?”

 

“না, আমার মায়ের আর তোমার দিদিমা’র।”

 

“মাই গড, এত পরিষ্কার ছবি!” আমি সত্যিই একেবারে হতবাক। আমাদের বাড়ির পুরোনো অ্যালবামে মায়ের ছেলেবেলার ছবি আছে। আমার দিদিমার বিয়ের ছবিও আছে। কিন্তু সেগুলোর এত বিবর্ণ চেহারা, এই ছবির সঙ্গে কোনো তুলনাই হয় না। এরকম চমৎকার রেসলুশ্যান, ভালো ক্যামেরা ছাড়া এখনও পাওয়া যায় না।

 

সুভদ্রামাসি বললেন, “এটা একটা পুরোনো ছবি, আমার কাছে ছিল। রোহিত কাউকে দিয়ে কম্পিউটার আর কীসব ব্যবহার করে এটা করিয়েছে।”

 

“অ্যামেজিং স্যার, ট্রলি অ্যামেজিং!” ছবিটা হাতে নিয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে একেনবাবু বললেন।

 

“মা সত্যিই ভীষণ খুশি হবে এটা পেয়ে। কবে এটা করালে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 

“তোমাদের যেদিন ফোন করলাম, সেদিনই এটা পেলাম। তখনই ভাবলাম ভালোই হল –তুমি যাচ্ছ, তোমার হাত দিয়েই ছবিটা পাঠিয়ে দেব। একটা চিঠিও আছে ওর মধ্যে –মাকে মনে করে দিও।”

 

আমরা যখন সুভদ্রামাসির বাড়ি থেকে ফিরলাম, তখন রাত প্রায় বারোটা। একেনবাবু ঘুমকাতুরে, এগারোটা বাজতে না বাজতেই বিছানা নেন। সকালে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে সুভদ্রামাসির গল্প হল। ছবিটার কথাও উঠল।

 

একেনবাবু বললেন, “বুঝলেন স্যার ছবিটা দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ছিল ‘লাইট অফ এশিয়া’র কথা।”

 

“তার মানে?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

 

“মানে হিমাংশু রাইয়ের ফিল্ম ‘লাইট অফ এশিয়া’-র কথা বলছি স্যার। ওই ফিল্মের কতগুলো স্টিল ছবি একটা জার্মান ওয়েবসাইটে কিছুদিন আগে দেখেছিলাম। সেগুলোও ছিল এরকম স্পষ্ট। অথচ স্যার ঐ একই ফিল্মের স্টিল অন্য কোনো বইয়ে দেখুন। সেই ছবিগুলোতে মানুষ বসে আছে না হনুমান –বোঝার উপায় নেই।”

 

“আপনি মশাই এত ওয়েবসাইট দেখতে শুরু করলেন কবে থেকে?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল। “ এমনি তো ভাব দেখান, কম্পিউটার ইন্টারনেট –কিছুই আপনার মাথায় ঢোকে না!”

 

“সত্যি স্যার, প্রমথবাবু এমন করেন না!” একেনবাবু অনুযোগ-ভরা চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। প্রমথকে বললেন, “আমি কি স্যার টেকনোলজির কিছু জানি নাকি? আপনারাই তো যা সার্ফ করতে শিখিয়েছেন। ছবিটা হঠাৎ চোখে পড়েছিল তাই বললাম।”

 

“গুড, তাহলে শুনুন, ব্যাপারটা কি,” প্রমথ বিজ্ঞের মতো বলল। “এগুলোকে বলা হয় ডিজিটাল এনহ্যান্সিং। এনলার্জড ছবিকে অসংখ্য ছোটো ছোটো বিন্দু বা পিক্সেল দিয়ে ভাগ করে, নানা রকম অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সেই বিন্দুগুলোর রং বেশি কালচে বা বেশি সাদা করা হয়। ফলে ছবির রেসলুশন বেড়ে যায়।”

 

প্রমথর এই বিজ্ঞ বিজ্ঞ কথা আমি অনেক সময়ই বুঝি না। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় পুরো গুলতাপ্পি চালাচ্ছে। আমি একেনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললাম, “কিছু বুঝলেন মশাই?”

 

“আবছা আবছা বুঝছি স্যার। উনি বড়ো কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করেন।”

 

আমি প্রমথকে চ্যালেঞ্জ করলাম, “তুই এত জানলি কোত্থেকে?”

 

“এটা সবাই জানে। তুই যে জানিস না তোর লজ্জা পাওয়া উচিত। আবার ফিজিক্স। পড়াচ্ছিস!”

 

একেনবাবুর চিন্তা ইতিমধ্যেই অ্যাজ ইউসুয়্যাল বোঁ করে অন্যদিকে চলে গেছে, “বেশ আছেন স্যার আপনারা, কেমন দুজনে দেশে যাচ্ছেন!”

 

“তা আপনি গেলেও তো পারেন, আপনার পা কে বেঁধে রেখেছে!” আমি বললাম।

 

“কী যে বলেন স্যার। এই সময়ে গেলে পনেরো-শো ডলারের ধাক্কা।”

 

“আপনিও তো মশাই মহা হাড়-কেপ্পন!” প্রমথ বলল, “দাঁও মেরে মোটা অঙ্কের ফুলব্রাইট বাগিয়েছেন –সেখান থেকে পনেরোশো ডলার খসাতে পারেন না।”

 

“দেখুন স্যার, আমার দিকে অসহায় মুখ করে তাকিয়ে একেনবাবু বললেন, “প্রমথবাবু খালি আমাকে ফুলব্রাইটের খোঁচা দেন –যেন আমি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাচ্ছি।”

 

“ওর কথা শুনবেন না,” আমি বললাম। “তাছাড়া আমরা চলে গেলে একজনকে তো অ্যাপার্টমেন্টটা সামলাতে হবে!”

 

“তাহলে?” একেনবাবু সমর্থন পেয়ে প্রমথকে উদ্দেশ্য করে বললেন।

 

“তাহলে থাকুন, শুধু শুধু আফশোস করছেন কেন! হ্যাঁ দেখবেন, এটাকে একটা খাটাল বানিয়ে ফেলবেন না। আপনার যেরকম জিনিসপত্র ছত্রাকার করে রাখার হ্যাবিট।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *