শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
চোদ্দ
একেনবাবুর মাথায় যখন কিছু চাপে তখন সেটা বের করা দুঃসাধ্য। গত শনিবার গাড়িতে ওঠার সময় ওঁর হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম গোটা দুই বই নিয়েছেন পড়ার জন্য। কিন্তু আসলে সেগুলো ছিল রিচার্ডমেসোর জিনিওলজির অ্যালবাম আর নোটবুক! উনি যে এইভাবে অ্যালবাম আর নোটবুক চাইতে পারেন, তা আমি কল্পনা করিনি। হাজার হোক একটা পারিবারিক ইতিহাস, পরলোকগত স্বামীর স্মৃতিচিহ। অবভিয়াসলি এ ব্যাপারে সুভদ্রামাসি সেন্টিমেন্টাল নন, সম্ভবত জিনিওলজির ব্যাপারে ওঁর কোনো ইন্টারেস্টই নেই। রিচার্ডমেসো উৎসাহ ভরে এইসব করতেন –তাতে সুভদ্রামাসির একটা সস্নেহ প্রশ্রয় ছিল –এইটুকুই।
যাইহোক, আজ সকালে থেকে দেখি একেনবাবু নিউ ইয়র্ক টাইমসের বদলে ঐ নোটবুক আর অ্যালবাম নিয়ে মেতে আছেন। আর মাঝে মাঝেই বলে উঠছেন,… “ব্রিলিয়ান্ট, ব্রিলিয়ান্ট!”
কিছুক্ষণ এইরকম চলার পর প্রমথ আর থাকতে না পেরে বলল, “একজনের গুষ্টির খবর জেনে কী রস পাচ্ছেন বলুন তো? তার থেকে ধর্মের বই পড়ন আত্মিক উন্নতি হবে; আর জ্ঞান বাড়াতে চান তো এনসাইক্লোপেডিয়া ঘাঁটুন।”
–“আপনি না স্যার, সত্যি!” বলে একেনবাবু কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বললেন, “এই দেখুন না, কী ইন্টারেস্টিং –রিচার্ড সাহেব বার করেছেন যে সুভদ্রামাসির মায়ের কাছে শুনেছিলেন তাঁর বাবার দিকে কয়েক পুরুষ আগে একজন কেউ ইউরোপিয়ান মেয়ে বিয়ে করেছিলেন। এই তথ্য থেকে রিচার্ড সাহেব বার করেছেন যে সুভদ্রামাসির দাদুর ঠাকুরদা, যিনি দেওয়ান ছিলেন, তিনি বিয়ে করেছিলেন এক ফ্রেঞ্চ মেয়েকে। না, ভুল বললাম স্যার, দাদুর বাবা ছিলেন দেওয়ান। তাঁর বাবা ফ্রেঞ্চ মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। যাইহোক, সেই ভদ্রলোকের নামধাম সব আবিষ্কার করেছেন।”
সুভদ্রামাসির দাদুর বাবা দেওয়ান ছিলেন, না দাদুর ঠাকুরদা দেওয়ান ছিলেন ফ্রাঙ্কলি আই কেয়ার লেস। তিনি ফ্রেঞ্চ না জার্মান মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন সেটাও অবান্তর। কিন্তু তাও মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “কী করে করলেন?”
“ডিটেইল অবশ্য পরিষ্কার নয়। তবে এটা বার করতে সাহায্য করেছেন সেই বাবু পিন্টো–যাঁর কথা সুভদ্রামাসি সেদিন বললেন। নাঃ, এঁর সঙ্গে একবার দেখা করতে হচ্ছে!”
“দেখা করে কী করবেন?” আমি একটু অবাক হয়েই প্রশ্ন করলাম।
“এসব লোকের সঙ্গে একটু আলাপ পরিচয় থাকা ভালো স্যার। কখন কী কাজে লাগে!”
“দেখা করতে গেলে হয়তো ভিসিটের পয়সা লাগবে। খোঁজফোজ করে তারপর যাবেন। নইলে এসে আবার ঘ্যানঘ্যান শুরু করবেন,” পত্রিকার পাতা উলটোতে উলটোতে মন্তব্যটুকু করে প্রমথ খেলার পাতায় মন দিল।
প্রমথর এটা বলার কারণ আছে। একেনবাবুর সঙ্গে এক উকিলের আলাপ হয়েছিল একটা পার্টিতে। একেনবাবুর মাথায় সেই সময়ে ইমিগ্রেশন আইন নিয়ে নানান প্রশ্ন ঘুরছে। তার দুয়েকটা করতেই ভদ্রলোক বললেন, এই ভিড়ে তো আলোচনা হয় না, আমার অফিসে আসুন।’ একেনবাবু তার পরের দিনই গিয়ে প্রশ্নে প্রশ্নে বোঝাই করে অপরিমিত জ্ঞান নিয়ে ফিরেছিলেন। পরে উকিলের কাছে থেকে বিলটা যখন এল, তখন ওঁর মুখের অবস্থা দেখার মতো।
“কথাটা মন্দ বলেননি স্যার” একেনবাবু পা নাচাতে নাচাতে বললেন। “যা ফ্যাসাদে পড়েছিলাম সেবার!”
“ফ্রেঞ্চ মহিলার নাম কি?” কোনো কারণ নেই, প্রশ্নটা আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
“অ্যান্তনিয়েৎ এমিরোজিয়ল্ট,” একেনবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন।…”অ্যান্তনিয়েৎ খুবই চলতি নাম, তাই না স্যার? এমিরোজিয়ল্ট বোধ হয় খুব একটা চলতি পদবী নয়।”
ফ্রেঞ্চ পদবী সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। জিজেস করলাম, “আপনি সেটা জানলেন কি করে?”
“জানি না স্যার। তবে নোটবুকে মাত্র তিনজন এমিরোজিয়ন্টের কথা লেখা আছে, তাই বললাম। দেখুন না, বলে নোটবুকটা এগিয়ে দিলেন। দেখলাম সেখানে লেখা,
১) দানিয়েল এমিরোজিয়ল্ট; শেফ। x
২) এবউম এমিরোজিয়ন্ট ওয়াচমেকার। x
৩) ক্যালিস্টো এমিরোজিয়ল্ট।
তবে প্রথম দুটো নামের পাশে লাল কালি দিয়ে দিয়ে ক্রস আাঁকা। নামগুলোর ঠিক নীচে লেখা
(মে ১৪, ১৮৬০ সালের প্যারিস অবসার্ভার থেকে)
কুখ্যাত আর্ট-চোর ক্যালিস্টো জেলে বসে এখন কবিতা লিখছে। পাঠকদের অজানা নয় ছ’বছর ধরে নানান মিউজিয়াম থেকে বাউশার, ব্রিউঘেল, কানাচের মত বিখ্যাত আর্টিস্টদের ছবি থেকে শুরু করে পুরোনো মূর্তি, হিরে, জহরৎ, যাবতীয় মূল্যবান প্রত্নসামগ্রী চুরি করে এনে ক্যালিস্টো প্রাইভেট মিউজিয়াম গড়ে তুলেছিল। তিনমাস আগে ফরাসী পুলিশের তৎপরতায় ক্যালিস্টো প্রাইভেট মিউজিয়াম গড়ে তুলেছিল। তিনমাস আগে ফরাসী পুলিশের তৎপরতায় ক্যালিস্টো ধরা পড়ে এবং নিজের দোষ স্বীকার করে। সব কিছুই উদ্ধার হয়েছে, শুধু বেলজিয়াম মিউজিয়াম থেকে চুরি করা ‘দ্য লাইট’ নামের বিখ্যাত ডায়মন্ড আর কয়েকটা দামি মনি-মুক্তোর খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।
ক্যালিস্টোর কবিতার বই ছাপানোর জন্য প্রকাশকের খোঁজ করছে তার উকিল ও তার। বোন। পরের লাইনটা ফ্রেঞ্চে, বোধ হয় ক্যালিস্টোর কবিতা থেকে।
“শেষ লাইনের পাঠোদ্ধার হল না স্যার,” একেনবাবু বললেন। “মিস ফ্রান্সিস্কাকে একবার দেখাতে হবে।”
“কী, দেখি?” পত্রিকা ফেলে নোটবুকটা আমার কাছ থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে ভুরুটুরু কুঁচকে প্রমথ পড়ল, “রেখে দিও মোর শূন্য চায়ের পাত্র, ব্রিজের বাঁকে বাঁকে।”
জিজ্ঞেস করলাম, “তুই আবার ফ্রেঞ্চে এত ওস্তাদ হলি কবে?”
“সে খবরে তোর কী দরকার?”
“যা বললি তার কোনো অর্থ হয়?”
“আমি তো শালা লিখিনি।”
প্রমথর সঙ্গে তর্ক করা বেশির ভাগ সময়েই বৃথা।
“আর হ্যাঁ, নীচে লেখা আছে প্যারিস পাব্লিকেশন্স –এটা বুঝতে পারছিস তো? না এরও কোনো অর্থ হয় না?” প্রমথ আরেক বার খোঁচা দিল।
সেটাকে পাত্তা না দিয়ে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার কী মনে হয়, ক্যালিস্টোর এই বোনকেই কি সুভদ্রামাসির পূর্বপুরুষ বিয়ে করেছিলেন?”
“পসিবল স্যার,” অন্য নামদুটোতে লাল কালি দিয়ে ঢাঁড়া দেওয়া হয়েছে। তবে স্যার আমি একটু কনফিউসড!”
“কিসের জন্য?”
“অ্যান্তনিয়েতের বাবা-মার নাম নেই কেন? মানে চার্চ বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রির রেকর্ড থেকে যদি নাম পাওয়া যায়, তাহলে সে নামটা তো পাওয়া যাবে।”
“সেটা জানতেই আপনি ঐ জিনিওলজিস্টের কাছে যাবার প্ল্যান করছিলেন নাকি? এই তিনটে লোকের নাম বললেন, তাদের একজন তো বাবা হতে পারে।”
“হলে স্যার, ক্রস মারা থাকত না।” ভেবেছিলাম জিনিওলজির ব্যাপারটার এইখানেই পরিসমাপ্তি। তা নয়। আমাকে সোমবার লাঞ্চের সময় বললেন, “স্যার, যাবেন নাকি একবার?”
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায়?”
“ঐ যে মিস্টার পিন্টোর কাছে।”
“মিস্টার পিন্টো!”
“আঃ, স্যার, আপনি ভীষণ ভুলে যান, জিনিওলজি স্পেশালিস্ট!”
“সত্যিই যাবেন তার কাছে?”
“স্যার, যদি একটু টিপস ফিপস পাওয়া যায়। আপনাকে কখনো বলিনি স্যার, আমারও এক পূর্বপুরুষ ইউরোপে গিয়েছিলেন –দেশে ফেরেননি। যদি তার খোঁজ জোগার করতে পারি, মন্দ হবে না।”
“কে সেই পূর্বপুরুষ?”
“স্যার, আমার ঠাকুরদার কাকা।”
জানি এগুলো ছুতো। একেনবাবু নতুন কোনো কিছু শুনতে পেলেই সে বিষয় আরও জানতে চান। বাস্তবিকই ওঁর জ্ঞানতৃষ্ণা প্রবল।
দেখলাম এ ব্যাপারে আমার অপেক্ষায় না থেকে উনি অনেকটাই এগিয়েছেন। অর্থাৎ বাবু পিন্টোর ফোন নম্বর সুভদ্রামাসির কাছ থেকে জোগাড় করেছেন। শুধু তাই নয়, মিস্টার পিন্টোর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও করেছেন –দুপুর তিনটে নাগাদ। উনি জানেন যে সোমবার আমার ক্লাস শুধু সকালে। ঐ দিনটাতে বাদবাকি সময় আমি বাড়িতেই থাকি। প্রমথ সোমবার সকালে যায়, ফেরে দেরিতে। একথা প্রমথ জানলে ওঁকে নিয়ে এত হাসিঠাট্টা করত, সেইজন্যেই বেছে বেছে উনি সোমবারই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছেন।
বাবু পিন্টোকে দেখলে দেশি বলে ভুল হবে। নিজেই জানালেন, ওঁর পূর্বপুরুষেরা এককালে ছিলেন মুম্বইয়ে বাসিন্দা। বাবুর ঠাকুরদা স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে নিয়ে ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন ইজরায়েলের জন্মলগ্নে। বাবুর জন্ম, পড়াশুনো সবকিছু ইজরায়েলে। একটু তাড়াতাড়ি কথা বলেন। অ্যাকসেন্টটা এমন যে বুঝতে একটু অসুবিধা হয়। যাই হোক, রির্চাড মেসোকে খুব ভালোই মনে আছে বাবুর।
“খুবই ডিফিকাল্ট কেস,” বললেন বাবু। “কারণ ভারতবর্ষে কোথাও ভালো রেকর্ড পাওয়া যায় না। ল্যান্ড রেকর্ড খোঁজা মানে প্রাণান্ত। এদেশের চার্চে বহু রেকর্ড থাকে। হিন্দু মন্দিরে কিছুই থাকে না! খ্রীশ্চান আর ইহুদীরা ফ্যামিলি বাইবেলে পূর্বপুরুষদের পরিচয় লিখে রাখে। হিন্দুদের সেই ঘ্রাডিশন নেই। আসলে এর মূলে আপনাদের ‘লাইফ ইজ এ রিবার্থ কনসেপ্ট। যদি আবার জন্মাই, তবে এত খবর লিখে রেখে লাভ কী? পার্সোনাল রেকর্ড বাদ দিন, ভারতবর্ষের হিস্টোরিক্যাল রেকর্ডসও হিন্দুরা রাখেনি। এখন যেটুকু হচ্ছে, সবই ওয়েস্টের ইনফ্লুয়েন্সে।”
কথাটা পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু সত্যের একটা ছাপ যে নেই তা অস্বীকার করা যায় না। ভাগ্যিস প্রমথ সঙ্গে ছিল না! নিজে দেশকে উঠতে বসতে গাল দেবে, বাইরের কেউ নিন্দা করলেই তার বাপান্ত করে ছাড়বে। আজ থাকলে বাবুর সঙ্গে মাথা ফাটাফাটি হয়ে যেতো।
একেনবাবু জানতে চাইলেন, সুভদ্রামাসির ইউরোপিয়ান পূর্বপুরুষের কথা।
“ও ইয়েস,” বাবু বললেন। “ওটা বেশ ইন্টারেস্টিং। যদুর মনে পড়ছে রিচার্ডের স্ত্রীর গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার মিস্টার গুপ্তা ফ্রান্সে আসেন। হোল্ড অন…” বলে বাবু কম্পিউটারে কি সব সার্চ করতে শুরু করলেন। খানিক বাদে বললেন, “হ্যাঁ, পেয়েছি…সেখানে তিনি একটি ইউরোপিয়ান মেয়েকে বিয়ে করেন এবং ওঁদের একটি বাচ্চাও হয়। মেয়েটি বাচ্চা হবার পর কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যায়। ভদ্রলোক তার এক বছর বাদে বাচ্চাকে নিয়ে ইন্ডিয়া ফিরে যান।”
সেই বাচ্চাই হল সুভদ্রামাসির দাদুর বাবা, যিনি দেওয়ান ছিলেন। ভদ্রলোক আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। এগুলো সব নোটবুকের তথ্য। বাবু পিন্টোর এখানে আসার পথে একেনবাবু নানান বকবকানির মধ্যে এটা শুনেছি। তবে এ বিষয়ে আরও কিছু তথ্য বাবুর কম্পিউটারে নিশ্চয় আছে। আমি দূর থেকে কম্পিউটার স্ক্রিনটা দেখতে পাচ্ছিলাম, গুটি গুটি অজস্র ইনফরমেশনে ভরা। বাবু সেখান থেকে সংক্ষেপে বলছেন।
“এগুলো বার করলেন কোত্থেকে স্যার?” একেনবাবু মুগ্ধ হয়ে প্রশ্ন করলেন।
“ওয়েল,” বলে হাসলেন বাবু, “আমার ট্রেড-সিক্রেট আপনাকে বলব কেন?” তারপর বললেন, “জাহাজের প্যাসেঞ্জার লিস্টের রেকর্ড দেখে। হাসপাতালের রেকর্ড দেখে, ম্যারেজ রেজিস্ট্রির রেকর্ড দেখে। এগুলো সহজ উত্তর। কিন্তু সেগুলো জোগাড় করলাম কোত্থেকে –সেটা হবে জটিল উত্তর।”
লোকটা অবশ্যই নিজের ব্যাবসা জানে।
“মহিলা, মানে ওঁর স্ত্রীর ব্যাকগ্রাউন্ড কী স্যার?”
“নট দ্যাট গুড। বাবা কী করত তার সন্ধান আমি পাইনি। অল্প বয়সেই মারা যায়। বড়ো ভাই আর্ট চোর, মিউজিয়াম থেকে বহু দামি দামি জিনিস চুরি করত। শেষে ধরা পড়ে জেলেই মারা যায়।”
“আপনি শিওর?”
“হয় ভাই, নয় মেয়েটার প্রাক্তন স্বামী। তবে প্রাক্তন স্বামী হলে এক্স-ওয়াইফের দ্বিতীয় বিয়েতে সাক্ষী হওয়াটা একটু আনইউজুয়াল তাই না?”
“মানে ম্যারেজ রেজিস্ট্রিটা আপনি দেখেছেন স্যার?”
উত্তরে বাবু পিন্টো মুচকি হাসলেন।
“মহিলাটি কী করতেন?”
“শি ওয়াজ এ মেড। সম্ভবত মিস্টার গুপ্টার বাড়িতেই কাজ করত। মিস্টার গুপ্টা ওয়াজ এ রিচ ম্যান।”
আমি বলে ফেললাম, “আপনার তো মনে হয় আরও অনেক ইনফরমশন আছে এদের সম্পর্কে। স্ক্রিন ভর্তি লেখা।”
“তা আছে, ইনফরমেশন রাখা আমার ব্যবসায়। ইনফরমেশন ইজ মানি।”
প্রকারন্তরে বুঝিয়ে দিলেন –যা বলছি তাই যথেষ্ট ছোকরা!
একেনবাবু ওঁর ঠাকুরদার কাকার কথা তুলতে বাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী নাম ছিল তাঁর?”
“রাধানাথ, রাধানাথ চৌধুরী।”
বাবু পিন্টোর হাত দ্রুত চলে। সঙ্গে সঙ্গে নামটা উনি কম্পিউটারে ঢোকালেন। তারপর বললেন, ওঁর কোম্পানি সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সেটাতে যথেষ্ট খরচা আছে। যথেষ্ট খরচা কথাটায় একেনবাবুর মুখের ভাব লক্ষ্য করে, বাবু বললেন, “এগুলোতে সত্যিই খরচা অনেক। আপনি তো ডিরেক্ট ফ্যামিলি ট্রি-র খোঁজ করছেন না, খুব বেশি খরচা করতে হয়তো চাইবেন না। যদি চান, আই উইল বি হ্যাপি টু ডু ইট ফর ইউ।”
.
ফেরার পথে একেনবাবু বললেন, “বেশ কঠিন কাজ –কাগজপত্র ঘেঁটে খবরগুলো উদ্ধার করা, তাই না স্যার?”
“আপনি বাবুর সব কথা বিশ্বাস করেন, না ভাঁওতা দিয়ে টু-পাইস কামাচ্ছেন?”
“টাইমিংটা স্যার মিলছে। সুভদ্রামাসি আর তাঁর মা নলিনীদেবীর জন্মের তারিখ রিচার্ডসাহেবের ডায়েরিতে আছে ১৯৪৭ আর ১৯২২। মাসিমার দাদুর তিরিশ বছর বয়সে নলিনীদেবী জন্মালে দাদুর জন্ম ১৮৯২ সালে। একই ভাবে হিসাব করলে দাদুর বাবার জন্ম ১৮৬২ সালে। রিচার্ডসাহেবের ডায়েরিতে প্যারিস অবসার্ভারের যে খবরটা আছে, সেটা ১৮৬০ সালের। তখন হয়তো ক্যালিস্টোর বোনের সঙ্গে মাসিমার দাদুর ঠাকুরদার বিয়ে হয়েছিল বা হচ্ছে।”
একেনবাবু যে পিছনে পিছনে এত অঙ্ক কষছেন সেটা বুঝিনি।
“না স্যার, জিনিওলজি বার করার কাজটা মোটেও সহজ নয়, একেনবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “নো ওয়ান্ডার স্যার আপনাদের রিচার্ডমেসো সুভদ্রামাসির বাবার দিকের কিছু বারই করতে পারেননি।”
“পারেননি?”
“নাঃ, ওঁর বাবার নামের পরে একটা বিরাট গোল্লা লাগিয়ে কোয়েশ্চেন মার্ক দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু মায়ের নামের পরে একেবারে A+ মার্ক। প্রচুর ইনফরমেশন আছে।”
“অধ্যাপক মানুষ, নিজেকেও গ্রেড করেছেন,” আমি হেসে বললাম। “আমার চেষ্টাতেও ঐ গোল্লাই জুটবে, স্যার,” একেনবাবু একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললেন।
