রুআহা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ছয়

পরদিন আমি আর তিতির হোটেল থেকে আর বেরোলাম না। ঋজুদার কথামতো বসে বসে ভাল করে তানজানিয়া এবং বিশেষ করে রুআহা ন্যাশনাল পার্কের ম্যাপ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম।

ঋজুদা ব্রেকফাস্টের পরই বেরিয়ে গেছিল। এল প্রায় রাত সাড়ে নটার সময়। বলল, কাল ব্রেকফাস্টের পর আমরা রওয়ানা হব। কিন্তু হোটেল থেকে চেক-আউট করব না। যাতে কেউ না বুঝতে পারে যে আরুশা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।

কাল থেকেই আমাদের অভিযানের প্রথম পর্ব শুরু হবে– এই ভাবনায় রোমাঞ্চিত হয়ে নানা কথা ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়লাম।

ভোরে উঠে তৈরি হয়ে নিয়ে, যার যার ঘরে ব্রেকফাস্ট খেয়ে আগে তিতির, তারপর ঋজুদা এবং সবশেষে আমি পনেরো মিনিটের ব্যবধানে হোটেল ছেড়ে বাইরে এলাম, যেন বেড়াতে বেরুচ্ছি বা শপিং-এ যাচ্ছি। তানজানিয়ান মিরশ্যাম কোম্পানির সামনে আমরা আলাদা আলাদা ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছবার মিনিট দশেক পরেই ঋজুদা আজ একটা সাদা-রঙা ভোকসওয়াগন কম্বি গাড়ি নিজে চালিয়ে এল। আমরা খদ্দের সেজে দোকানের ভিতরে মিরশ্যামের পাইপ, অ্যাশ-ট্রে ইত্যাদি নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। তিতির সত্যি খদ্দের হয়ে গিয়ে একটা মিরশ্যামের পাইপ কিনল ঋজুদার জন্য। আর-একটা ওর বাবার জন্য।

বাইরে ঋজুদাকে দেখতে পেয়েই আমরা দাম-টাম মিটিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম। আবার মাকুউনির রাস্তায়। মাকুউনির মোড়ে যখন পৌঁছেছি এবং মোড় ছেড়ে ডান দিকের কাঁচা রাস্তায় ঢুকব তখন ঋজুদা বলল, একটু পরেই একটা ব্যাপার ঘটবে, তোরা চমকে যাস না যেন!

গাড়ি ঋজুদাই চালাচ্ছিল।

কাঁচা রাস্তায় কিছুদূর যেতেই দেখি পথের পাশে একটা কাটা-গাছের গুঁড়িতে বসে ওয়ানাবেরি সিগারেট টানছে, পরম নিশ্চিন্তিতে।

তিতির বলল, রুদ্র, দ্যাখো।

আমি আগেই দেখেছিলাম। ব্যাটার কোমরের কাছে বুশশার্টের নীচটা ফুলে ছিল। যন্ত্র বাঁধা আছে, সন্দেহ নেই। আমিও কোমরে হাত দিলাম। তিতির উত্তেজনা এবং উৎকণ্ঠায় ঠোঁট দিয়ে অদ্ভুত একরকম চুঃ চুঃ শব্দ করতে লাগল। গ্রামের লোক হাঁসকে ধান দিয়ে যেভাবে ডাকে, তেমন করে। ওয়ানাবেরির দিকেই তাকাব না তিতিরের দিকে, বুঝে উঠতে পারলাম না।

ঋজুদা তিতিরকে বাঁ দিকের পেছনের দরজাটা খুলতে বলে ওয়ানাবেরিকে বলল, জুউ হাপা। কারিব্যু!

তিতির ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকল। ওয়ানাবেরি এসে তিতিরের পাশে বসে বলল, জাম্বো!

আমরা বললাম, সিজাম্বো।

ঋজুদা ইংরেজিতে বলল, তোদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দি। এ আমাদের বন্ধু। এর নাম ডামু। ডামু মানে, তিতির হয়তো জানে; রক্ত। সোয়াহিলিতে।

তিতির বলল, ওর নাম তো ওয়ানাবেরি।

ওয়ানাবেরি হাসল। বলল, ওয়ানাবেরি! ওয়ানাকিরি!

যেখানে পরশু আমরা প্লেনের জন্য থেমেছিলাম এবং লাঞ্চ খেয়েছিলাম, সে জায়গাটা এখনও দূরে আছে। তিতির বলল, তোমার গল্পটা কিন্তু সেদিন পুরো বলোনি আমাদের। আজকে বলো।

ওয়ানাবেরি হাসল।

তোমার সিগারেটের বড় বদগন্ধ। তিতির আবার বলল।

আমার গায়ে যে আরও বেশি গন্ধ। সেজন্যই সিগারেট খেয়ে গায়ের গন্ধ চাপা দিই।

ঋজুদা, কোনো গাড়ি আমাদের ফলো করছে কিনা দেখে নিয়ে বলল, তুইই চালা রুদ্র। অনেকক্ষণ চালিয়েছি একটানা। একটু পাইপ খাই ওয়ানাবেরির পাশে বসে। তুই সামনে চলে যা তিতির। তোকে তুই করেই বলব আজ থেকে। যাকে বলে, তুই-তোকারি।

আমি গিয়ে স্টিয়ারিংয়ে বসলাম। তিতির সামনে এল। আমার পাশে।

ঋজুদা পাইপ ধরিয়ে বলল, বলো ডামু, তোমার গল্প বললো, শোনাই যাক।

ওয়ানাবেরি মেঘগর্জনের মতো গলায় শুরু করল, অনেকদিন আগে, মৃত্যু একটি নাদুসনুদুস মোষের গলায় দড়ি বেঁধে মাঠে-প্রান্তরে হেঁটে যাচ্ছিল। এবং কাকে সে নিয়ে যাবে পরপারে তাই ভাবছিল। একজন খুউব গরিব লোক ছিল সেখানে। তার নাম ছিল বুইবুই। মানে, মাকড়সা।

আরেঃ। তুমি যখন হোটেলের শপিং-আর্কেডের পাশ থেকে বেরুলে সেদিন, একটা লোককে বুইবুই বলে ডাকলে না? যে লোকটা গুলি খেয়ে মরল তার নামও কি বুইবুই? আমি শুধোলাম।

হ্যাঁ। ঠিকই ধরেছ। তবে, সে অন্য বুইবুই।

হাঁটতে হাঁটতে মৃত্যুর সঙ্গে বুইবই-এর দেখা হল। মৃত্যু বলল, এই মোষটা তুমি নিতে পারো, কিন্তু কেবল একটি শর্তে। শর্তটি হল এই যে, আজ থেকে এক বছর পরে আমি যখন ফিরে আসব তখন যদি তুমি আমার নাম ভুলে যাও তাহলে তখন কিন্তু তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। কোনো ওজর-আপত্তিই চলবে না। বুইবুই কতদিন খেতে পায় না, তার বউ-ছেলেও না-খেয়েই থাকে; তাই সঙ্গে সঙ্গে সে রাজী হয়ে গেল। ভাবল, নাম মনে রাখা কী এমন কঠিন ব্যাপার! নাদুসনুদুস মোষকে দড়ি ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে মোষটাকে কেটে কয়েকদিন ধরে জোর ভোজ লাগাল। বুইবুই তার স্ত্রী আর ছেলেকে বলল, তোমাদের একটা গান শেখাচ্ছি। রোজ এই গানটা গাইতে ভুলো না—ওয়ানাবেরি! ওয়ানাকিরি!

তারপর ছ’মাস যব আর ভুট্টা গুঁড়ো করতে করতে, গম থেকে খোসা ঝাড়তে ঝাড়তে, কুয়ো থেকে জল তুলতে তুলতে, খেতে যব আর বজরার চাষ করতে করতে, মাটি থেকে মিষ্টি আলু খুঁড়তে খুঁড়তে সবসময় ঐ গানটিই গাইতে লাগল বুইবুইয়ের ঘরের মানুষেরা।

সাত মাসে এসে ওয়ানাবেরি কথাটাই শুধু মনে থাকল তাদের। ওয়ানাকিরি কথাটি ভুলেই গেল।

আট মাসে সে কথাটিও আর মনে থাকল না। থাকল শুধু সুরটি। আর ন’ মাসের মাথায় গান এবং সুর দুই-ই ধুলোর মধ্যে ধুলোর মতোই মিশে গেল। কিন্তু অবশেষে একদিন যেমন সব বছরই শেষ হয়, সেই বছরও শেষ হল। তিনশো পঁয়ষট্টি দিন যখন শেষ হল, শেষ প্রহরে, শেষ মুহূর্তে কে যেন বুইবুইয়ের ঘরের দরজায় টোকা দিল।

বুইবুই চেঁচিয়ে বলল, কে রে! কে?

আমি! মৃত্যু! আমার নাম কি মনে আছে তোমার?

এক সেকেণ্ড। একটু দাঁড়াও। আমি ভাঁড়ারের মধ্যে তোমার নামটি লুকিয়ে রেখেছি। নিয়ে আসছি এখুনি। একটু সময় দাও। দৌড়ে সে বৌয়ের কাছে গিয়ে বলল, সেই গানটা? গানটা মনে আছে তোমার?

বৌ বলল, আছে। ডিনডিন–ডিনগুনা।

বুইবুই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ফিরে এসে বলল, তোমার নাম তো ডিনডিন-ডিনগুনা।

তাই-ই বুঝি! আমার নাম তাই! চলো আমার সঙ্গে। বলেই, বুইবুইকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে চলল মৃত্যু। তার বৌ কাঁদতে লাগল। মৃত্যু বুইবুইকে কিছুদূর নিয়ে যাবার পর তার ছেলে পিছন পিছন দৌড়ে এসে একটা গাছে চড়ে তার হাত দুখানি মুখের কাছে জড়ো করে বলল, বাবা, ওয়ানাবেরি! ওয়ানাকিরি! ওয়ানাবেরি! ওয়ানাকিরি!

ভয়ে আধমরা বুইবুই বিড়বিড় করে উঠল, ওয়ানবেরি, ওয়ানাকিরি!

মৃত্যু বুইবুইকে ছেড়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেল দিগন্তের কুয়াশায়।

একটু চুপ করে থেকে ডামু বলল, আসলে সব ভাল ছেলেরাই জানে যে, বাবা মরে গেলে, বাবার ধার তাকেই সব শুধতে হবে। তাই বাবাকে যতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়, ততই ভাল।

গল্প শেষ করে ডামু আরেকটা সিগারেট ধরাল।

তিতির বলল, এটা আফ্রিকার কোন উপজাতিদের মিথ? মাসাইদের?

না। হসাদের।

ততক্ষণে আমরা পরশুর জায়গায় পৌঁছে গেছি। গাড়িটা পথ ছেড়ে ভিতরে ঢুকিয়ে লুকিয়ে রাখলাম, ঋজুদা যেমন করে রেখেছিল। ঋজুদা ঘড়ি দেখে ট্রাভেলার্স চেকের তাড়া বের করে খসখস করে চেক সই করল। তারপর ডামুকে বলল, আমরা চলে গেলে তুমি চেকটা ভাঙাবে। গাড়ি ফেরত দেবে না। রাস্তার মধ্যে গাড়ি রেখে গাড়ির মধ্যে গাড়ি ভাড়ার টাকা একটা খামে ভরে রেখে দেবে। গাড়িটা এমন জায়গায় রাখবে যে, কার-রেন্টাল কোম্পানির খুঁজে নিতে একটুও অসুবিধা যাতে না হয়। তারপর, হোটেলে একটা ফোন করে বলবে যে, আমরা লেক মানিয়ারাতে বেড়াতে গেছি। কাল সন্ধে নাগাদ ফিরে আসব। ঘর ছাড়ছি না কেউই। পরশু দিন ডাকে ওদের টাকা পাঠিয়ে দেবে আরুশা থেকেই। কত বিল হয়েছে ফোনে জেনে নিয়ে। তোমার পরিচয় দেবে না যে, এ-কথা নিশ্চয়ই বলার দরকার নেই। তারপর কী করতে হবে তা তো সব তোমার জানাই আছে।

হ্যাঁ। ডামু বলল।

এবার আমাদের নামিয়ে দিয়ে তুমি চলে যাও। প্লেনটা আর গাড়িটা কেউ একসঙ্গে না দেখলেই ভাল। আমরা একটুও দেরি করব না। প্লেন ল্যাণ্ড করার সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ব এবং সঙ্গে সঙ্গেই রওয়ানা হব।

ডামু আমাদের ওল দ্য বেস্ট জানিয়ে, গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল।

আমি বললাম, একে আবার কোত্থেকে জোটালে ঋজুদা? আরেকজন ভুষুণ্ডা হবে না তো এ?

আশা করছি, হবে না। এ ছাড়া আর কী বলা যায়? ও এক সময় টর্নাডোর দলে ছিল। এই সবই করত। অনেক মানুষ, এমন কী গেম-ওয়ার্ডেনও খুন করেছে। কিন্তু এ বছরের গোড়াতে ওর স্ত্রী এবং দুটি ছেলেমেয়ে সাত দিনের মধ্যে ইয়ালো-ফিভারে মারা যাওয়াতে ওর মনে হয়েছে ও পাপ করেছে বলেই এমন সর্বনাশ হল। তাই ও পাপক্ষালন করতে চাইছে তাদের পুরো দলটাকে ধরিয়ে দিয়ে। ওদের দলের জাল সারা পৃথিবীতে ছড়ানো। বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলারের কারবার করে এরা। বেলজিয়ান, অ্যামেরিকান, আফ্রিকার এশিয়ান এবং অ্যামেরিকান ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে ওদের। ওরা মাল পাঠায় মাফিয়া আইল্যাণ্ডের উল্টোদিকের দরিয়া থেকে স্টিমারে করে সমুদ্রের চোরা পথে এবং কার্গো প্লেনে করে। এত বড় একটা অর্গানাইজেশন যে ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। ওদের দলে শিকারি তো আছেই। তাদের কাছে অটোমেটিক ওয়েপনস আছে। আর আছে স্নাইপারস্। যাদের হাতের টিপ অসাধারণ। দূর থেকে, গাছ বা পাহাড়ের আড়াল থেকে টেলিস্কোপিক লেন্স লাগানো লাইট রাইফেল দিয়ে তারা গেম-ওয়ার্ডেন, অন্য চোরা শিকারের দলের লোক এবং তাদের শত্রুদের নিধন করে।

ঋজুদার কথা শেষ হতে না হতেই দূরাগত প্লেনের এঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল। দেখতে দেখতে একটি অতিকায় হলুদ পাখির মতো ছোট্ট প্লেনটি এসে নামল। তারপর ট্যাক্সিং করে এসে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তেঁতুলগাছ থেকে কিছুটা দূরে থামল। দড়ির সিঁড়ি নামিয়ে দিল ওয়াটসন। আমরা উঠতেই দরজা বন্ধ করে টেক অফ করল।

ঋজুদা বলল, ডোডোমাতে কি তেল নেবার দরকার হবে?

ওয়াটসন বলল, হবে। তোমাদের অন্য সব বন্দোবস্ত পাকা করা আছে। ডোডোমাতে মিনিট পনেরো-কুড়ি দাঁড়িয়ে চলে যাব ইরিঙ্গা। রাতটা যাতে হোটেলে তোমাদের থাকতে না হয় তারও বন্দোবস্ত করছি। তবে ইরিঙ্গা থেকে অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে যেতে হবে। সঙ্গে একটি মেয়েকে দিয়ে দেব। তিতির তো আছেই সঙ্গে, আর একজন মেয়ে থাকলে তোমাদের দলটাকে দেখে কারো সন্দেহ হবে না। যা সব জিনিসপত্র তোমাদের বইতে হবে, তাতে দুটি ল্যাণ্ডরোভার তোমাদের দরকার। আসলে ইবুগুজিওয়ার ফেরি পেরোবার সময় রুআহা পার্কের গার্ডকেই বলে দিতে পারতাম কিন্তু গার্ডদের মধ্যে অনেকেই টর্নাডোর দলের কাছ থেকে রীতিমত মাস-মাইনে পায়। ঘুষে ঘুষে ছয়লাপ করে রেখেছে। সেই ভয়েই তোমাদের ইণ্ডিপেন্টেলিই যেতে হবে এবং অফিসিয়ালি তোমাদের কোনোরকম সাহায্য করা যাবে না।

মেয়েটি ফিরবে কী করে?

ওকে তোমরা সেম্বেতে নামিয়ে দেবে। ওখানে দুদিন থেকে ও অন্য একদল টুরিস্টের সঙ্গে ফিরে আসবে। ও সেম্বেতে সকলকে বলবে যে, তোমরা রুআহাতে থাকবে না, জিওগ্রাফিকাল এক্সপিডিশানে এসেছ, রাজোয়া ন্যাশনাল পার্কে চলে যাবে। সেখান থেকে লেক ট্যাঙ্গানিকা।

ইরিঙ্গার শহরগুলিতে একটি ছোট্ট বাংলোয় রাতটা কাটিয়ে দাঁড়কাকদেরও ঘুম ভাঙার আগে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আফ্রিকান মেয়েটি আমরা রওয়ানা হবার মিনিট-দশেক আগে আমাদের বাংলাতে এসে পৌঁছল। সে পিকিং-এ (বেজিং) পড়াশুনা করেছে। এখন সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কের সেরোনারাতে জুওলজি নিয়ে রিসার্চ করছে। ওর গবেষণার বিষয় হচ্ছে উটপাখি। মেয়েটির নাম শাশা। বয়সে আমাদের চেয়ে বছর-দশেকের বড়। মিষ্টি দেখতে। কিন্তু চুলে কাঁচালঙ্কার মতো খুদে খুদে বিনুনি বানিয়েছে। ওই নাকি আফ্রিকান হেয়ারস্টাইলের চূড়ান্ত। ধনেপাতা জোগাড় করা গেলে কয়েকগাছি কাঁচালঙ্কা কেটে নিয়ে ফুলকপি দিয়ে কই মাছ রান্না করে জম্পেশ করে খাওয়া যেত। এখন অনেকদিন এসব খাওয়া-দাওয়া স্বপ্নের ব্যাপার হয়েই রইবে। কী খাব, কোথায় থাকব এবং আমরাই কোনো বন্যপ্রাণী অথবা চোরাশিকারিদের খাদ্য হব কি না তা ভগবানই জানেন।

ইরিঙ্গা থেকে ইডাডি বলে একটা ছোট্ট জায়গায় যখন এসে পৌঁছলাম তখন পুবের আকাশে লালের ছটা লাগল। এখন কলকাতায় হয়তো রাত এগারোটা-বারোটা। একটা কফির দোকান সবে খুলেছিল। কফি খেলাম আমরা এক কাপ করে। ঋজুদা একটি ল্যাণ্ডরোভার চালাচ্ছে। তিতির ঋজুদার সঙ্গে। আমার সঙ্গে শাশা। শাশা নানান গল্প করতে করতে চলেছে। ওকে একবার চোরাশিকারিরা ধরে নিয়ে গেছিল। সাতদিন ওদের খপ্পরে ছিল সে। অনেক অত্যাচারও করেছিল ওরা, তবে প্রাণে মারেনি। কী করে ওদের হাত থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছিল শাশা, তা নিয়ে একটি দুর্দান্ত বই লেখা যায়। তারপর থেকেই পৃথিবীর তাবৎ চোরাশিকারিদের উপর জাতক্রোধ জন্মে গেছে। শাশার। আমাকে বলছিল, তোমরা যদি এই চক্র ভাঙতে পারো তাহলে প্রেসিডেন্ট নিয়েরে তোমাদের বিশেষ পুরস্কার দেবেন এবং তানজানিয়ার সমস্ত প্রকৃতিপ্রেমী তোমাদের সংবর্ধনা দেবে। তবে, বড় বিপজ্জনক কাজে যাচ্ছ তোমরা। ভগবান। তোমাদের সহায় হোন। আর কিছুই আমার বলার নেই।

ইরিঙ্গা জায়গাটা পাহাড়ি। উচ্চতা পাঁচ হাজার ফুটের বেশি। ইরিঙ্গা থেকে ক্রমাগত পশ্চিমে চলেছি আমরা। ইডাডি ছাড়িয়ে এসে ঝকঝকে আলোভরা ভর-সকালে এবারে গ্রেট রুআহা নদীর সামনে এসে পড়লাম। এখানে ফেরি আছে। ইবগুঁজিয়াতে ফেরি করে আমাদের ল্যাণ্ডরোভারসমেত নদী পেরুলাম আমরা। পেরিয়েই রুআহা ন্যাশনাল পার্কে ঢুকে পড়লাম। ইরিঙ্গা হচ্ছে আফ্রিকান হেহে উপজাতিদের মূল বাসস্থান। ইরিঙ্গা ছাড়ার পরই আমরা নামতে আরম্ভ করেছিলাম। এই জঙ্গলকে বলে মিওযো। ঐ সব অঞ্চলে জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে চাষ করেছে হেহেরা দেখলাম। নানারকম ফসল করে ওরা শিফটিং কাল্টিভেশান করে। আমাদের দেশে যেমন জুম্ চাষ হয় তেমন। মেইজ, সরঘাম, কাসাভা, কলা, নানারকম ডাল, তামাক ইত্যাদির চাষ আছে দেখেছিলাম পথে।

যে-ফেরিতে করে গাড়িসুদ্ধু নদী পেরুলাম আমরা, সেটা খুব মজার। আমাদের দেশেও অনেক জায়গায় ফেরিতে নদী পারাপার করেছি জিপসুদ্ধু, কিন্তু এমন ফেরি কোথাওই দেখিনি। ফেরিটা মাঝিরাই চালায় কিন্তু পাটাতনটা চুয়াল্লিশ গ্যালন তেলের ফাঁকা টিনের উপর বসানো। অদ্ভুত নৌকো। নদী পেরুনোর পর মাইল-চারেক গিয়েই সেম্বে। রুআহা ন্যাশনাল পার্কের হেড-কোয়ার্টার। নানা জায়গা থেকে পথ এসেছে সেম্বেতে। এখান থেকে গ্রেট রুআহা আর মাওয়াগুশি এবং এমডনিয়ার উপত্যকায় চলে গেছে সব কাঁচা রাস্তা। গ্রেট রুআহাতে সারা বছরই জল থাকে। কিন্তু এমডনিয়া আর মাওয়াগুশি শীতকালে শুকিয়ে যায়। তখন এ নদী দুটির বুকে জিপ বা ল্যাণ্ডরোভার চালিয়ে যোরাফেরা যায়। কখনও কখনও ফোর-হুইল ড্রাইভের জন্যে স্পেশ্যাল গিয়ার। চড়াতে হয় বটে, কিন্তু সাধারণত দরকার হয় না। এখন আফ্রিকাতে শীতকাল। তাই এই দুই বালি-নদীর মধ্যবর্তী কমব্রেটাম-অ্যাকাসিয়ায় ভরা জঙ্গলের মধ্যে নানা বনপথ আঁকাবাঁকা হয়ে চলে গেছে এখন সারা জঙ্গলকে কাটাকুটি করে।

বনপথের যে-কোনো মোড়ে এসে দাঁড়ালেই আমার অ্যামেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার সেই লাইনগুলো বারবার মনে পড়ে। ঋজুদার মুখেই প্রথম শুনি কবিতাটি। ঋজুদার খুব প্রিয় কবিতা। দ্যা রোড নট টেকেন।

I shall be telling this with a sigh
Somewhere ages and ages hence
Two roads diverged in a wood, and I
took the one less travelled by,
And that has made all the difference.

যে পথে অনেকে গেছে, মানুষের পায়ে পায়ে আর জিপের চাকার দাগে যে-পথ চিহ্নিত সে-পথে গিয়ে কী লাভ? যে-পথ কেউ মাড়ায় না, যে-পথে চলতে গেলে পায়ের বা জিপের চাকার নীচে পথ-লুকিয়ে রাখা শুকনো পাতা মচমচ্ শব্দ করে পাঁপড় ভাজার মতো গুঁড়ো হতে থাকে, যে-পথের বাঁকে বাঁকে বিস্ময়, বিপদ এবং কৌতূহল, সেই রকম পথেই তো যেতে হয়। জীবনেও যেমন দশজনের মাড়ানো পথে গিয়ে মজা নেই কোন, জঙ্গলেও নেই।

সেম্বেতে শাশা নেমে গেল। এখনও আমরা ছদ্মবেশেই আছি। নিশ্চয়ই ঋজুদার নির্দেশে নিজেদের আসল চেহারায় ফিরে যেতে হবে আমাদের। তবে, কবে, কোথায়, কখন তা ঋজুদাই জানে।

শাশা নেমে যাবার আগে ওর সঙ্গে সেম্বেতে ব্রেকফাস্ট করলাম আমরা।

ঋজুদা বলল, ভাল করে খেয়ে নে। এর পর কখন খাওয়া জুটবে আজকে তার ঠিক কী? ব্রেকফাস্ট সেরে, সেম্বে থেকে বেরিয়ে কিছুটা এসে ঋজুদা গাড়ি থামাল। আমি গাড়ি থেকে নেমে ঋজুদার গাড়ির কাছে গেলাম। ল্যাণ্ডরোভারের বনেটের উপর রুআহ ন্যাশনাল পার্কের ম্যাপটা খুলে মেলে ধরে ভুসভুস্ করে পাইপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভাল করে ম্যাপটা দেখতে লাগল ঋজুদা। যখনই খুব মনোযোগের সঙ্গে কিছু করে, তখনই ভীষণ গম্ভীর দেখায় ঋজুদাকে। কপালের চামড়া কুঁচকে যায়। তখন দেখলে মনে হয় মানুষটা একেবারেই অচেনা। তিতিরও গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিল। আমরা তিনজন ঝুঁকে পড়ে ম্যাপটা দেখছিলাম। ঋজুদা পকেট থেকে একটা মোটা হলুদ মার্কার পেন দিয়ে দাগ দিতে লাগল। বলল, তোদের ম্যাপগুলো বের করে একভাবে দাগ দিয়ে রাখ।

ম্যাপ-দাগানো শেষ হলে ঋজুদা স্টিয়ারিং-এ বসল। এবার বড় রাস্তা ছেড়ে একটা প্রায়-অব্যবহৃত পথে ঢুকে পড়ল সামনের ল্যাণ্ডরোভার।

.

ভারী চমৎকার লাগছিল। আফ্রিকার কালো মাটি, আকাশ-ছোঁয়া সব বড় বড় তেঁতুলগাছ। অ্যাকাসিয়া আলবিডা। কিন্তু যত গভীরে যেতে লাগলাম ততই জঙ্গলের প্রকৃতি বদলাতে লাগল। তেঁতুল আর অ্যাকাসিয়া অলিবিডা, নদীর কাছাকাছি বেশি ছিল। এবার পথটা পাহাড়ে চড়তে শুরু করল। বুঝলাম, আমরা কিমিবোওয়াটেঙ্গে পাহাড়ের দিকে চলেছি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়টা দেখা গেল বাঁ দিকে। দুপুর শেষ হয়-হয় এমন সময় আমরা এমবাগি হয়ে মাওয়াগুশি বালি-নদীর পথ ছেড়ে আরো বাঁ দিকে একটি পথে ঢুকে এসে এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম যে, তার তিনদিকে তিনটি ছোট পাহাড়। সেই সব পাহাড়ের নাম ম্যাপে নেই। পাহাড়ের খোলের ছায়াচ্ছন্ন জঙ্গলে কিছুক্ষণ এগিয়ে পেছিয়ে মনোমতো একটি জায়গা দেখে ঋজুদা বলল, আজকের মতো এখানেই ক্যাম্প করা যাক।

সেই অন্ধকার থাকতে স্টিয়ারিং-এ বসেছি। কোমর টনটন করছিল। যাত্রা শেষ হওয়ায় ভাল লাগল। ল্যাণ্ডরোভার দুটিকে এমনভাবে রাখলাম, যাতে ঐ অব্যবহৃত পথ থেকেও কারো চোখে না পড়ে।

তিতির শুধোল, এই পাহাড়গুলোর নাম নেই ঋজুকাকা?

নাই-ই বা থাকল। দিতে কতক্ষণ? মধ্যের বড় পাহাড়টার নাম রাখা যাক নাইরোবি। আমাদের নাইরোবি-সর্দারের নামে। ডান দিকেরটার নাম টেডি মহম্মদ, আমাদের বন্ধুর নামে, যে গতবারে গুগুনোণ্ডম্বারের দেশের অভিযানে প্রাণ হারিয়েছিল।

আর তৃতীয়টা? মানে বাঁ দিকেরটা?

ঋজুদা আমার দিকে ফিরে বলল, কী নাম দেওয়া যায় জেনারেল?

বললাম, নাম দাও তিতির। অসীম সাহসী মেয়ে, বাঙালি মেয়েদের গর্ব তিতিরের নামে।

ফাইন্। ঋজুদা বলল।

তিতির খুব খুশি হল। কিন্তু মুখ লাল করে বলল, আহা!

ঋজুদা বলল, আর সময় নেই সময় নষ্ট করবার। তিতির আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার জানে। কিন্তু তাঁবু খাটাতে জানে না। তাড়াতাড়ি তাঁবু খাটিয়ে ফেল। তারপর রাতের খাওয়ার বন্দোবস্ত করলেই হবে।

আমি আর তিতির ল্যাণ্ডরোভারের পেছন খুলে একটা তাঁবু বের করছি, ঋজুদা বনেটের উপর উঠে বসে পাইপ খাচ্ছে আর চারদিক দেখছে মনোযোগ দিয়ে, এমন সময় হঠাৎ প্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ করে হাতি ডেকে উঠল কাছ থেকেই।

ঋজুদা বলল, খাইছে! এরা আবার কী কয় রে? যার জন্যে চুরি করি, সেই কয় চোর!

আমি তাঁবু ফেলে রেখে তাড়াতাড়ি রাইফেল বের করতে গেলাম।

ঋজুদা বলল, তাঁবু খাটা। রাইফেল, গুলি এবং অন্যান্য সব সরঞ্জাম কোথায় কোন গাড়িতে রেখেছে তা সব চার্ট দেখে মিলিয়ে মিলিয়ে বের করতে হবে। কোনো ভয় নেই। খুদে হাতিয়ার তো যার যার পকেটেই আছে। ওরা বেশি তেড়িমড়ি করলে তুই একটা গান শুনিয়ে দিস। তোর বেসুরো গানের এফেক্ট ফোর-সেভেন্টি ফাইভ ডাবল-ব্যারেল রাইফেলের গুলির চেয়েও জোরদার হবে। হাতিরা জানে যে আমরা হাতি মারতে আসিনি, হাতিমারাদের মারতে এসেছি। ওরা তোকে আর তিতিরকে গার্ড অব অনার দিল বৃংহণ করে। কিছুই বুঝিস না কেন?

তিতিরকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। স্বাভাবিক। এর আগে চিড়িয়াখানায় পোষা হাতির পিঠে চড়ে আইসক্রিম খেয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। বুনো হাতি এত কাছ থেকে এমন জঙ্গলে প্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ বাজাবে তা ওর কাছে একটু উত্তেজনা তো হবেই।

একটা তাঁবু খাটানো হলে ঋজুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, অন্যটা কোথায় লাগাব?

ঋজুদা কী ভাবল। তারপর বলল, আমার ইচ্ছে আছে, পাহাড়ের কোনো গুহাতে বা পাহাড়ের উপরের কোনো লুকোনো সমতল জায়গায় ডেরা করব। আজ আর বেশি ঝামেলা করিস না। প্রথম রাত। আমি গাড়িতেই থাকব। তোদের পাহারা দেব। তোরা দুজন তাঁবুতে শো। কালকে ভেবেচিন্তে দেখা যাবে।

হঠাৎ আমাদের পিছনের ঝোপে খরখর সরসর আওয়াজ হল। একই সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম আমরা। তাকাতেই দেখলাম, কী একটা কালো জানোয়ার গোঁয়ারের মতো ঝোপঝাড় ভেঙে দুদ্দাড় শব্দ করে দৌড়ে চলে গেল দৃষ্টির বাইরে মুহূর্তের মধ্যে।

তিতির একদম চুপ। চলে-যাওয়া জন্তুটার পথের দিকে হাঁ করে চেয়ে ছিল ও। আবার হাতি ডাকল প্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁকরে।

আমি বললাম, ভাল দেখতে পেলাম না। কী ওটা ঋজুদা? ওয়ার্টহগ?

না। সেরেঙ্গেটিতে এই জানোয়ার দেখিসনি। যদিও এদের চেহারাও অনেকটা ওয়ার্টহগের মতো। তবে এদের ওয়ার্টগুলো অনেক ছোট। এদের বলে বুশ-পিগ। রুআহা ন্যাশনাল পার্কে এদের প্রায়ই দেখতে পাবি। এবারেও যদি আমাদের গাড়ি নিয়ে কেউ চম্পট দেয় বা আমাদের ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয় প্রাণ নিয়ে, তাহলে এরাই হবে প্রধান খাদ্য। ছোটখাটো চেহারার একটিকে দেখে ঘাড়ে একটি থার্টি-ও-সিক্স রাইফেলের বা শটগানের বুলেট ঠুকে দিবি–ধপ্পাস্ করে পড়ে যাবে। ফার্স্ট ক্লাস বার-বি-কিউ হবে। তবে বেজায়গায় গুলি লাগলে এরাও আমাদের দিশি শুয়োরের মতো সাংঘাতিক বেপরোয়া হয়ে যায়। দিশি কি বিদেশি সব শুয়োরের জানই খুব শক্ত, কইমাছের প্রাণের মতো, আর ভীষণ একরোখা হয় এরা। জায়গামতো ধরতে না পারলে চিতা, লেপার্ড এবং সিংহকেও এরা বাবা-কাকার ডাক ছাড়িয়ে ছাড়ে।

তিতির বলল, ঋজুকাকু, তুমি যে বলেছিলে, উত্তর বাংলার বামনপোখরিতে আমাদের প্রমথেশ বড়ুয়ার ছোট ভাই প্রকৃতীশচন্দ্র বড়ুয়া, মানে লালজিকে এত ভাল করে চেনো, ওঁকে বলো না কেন আফ্রিকাতে এসে হাতি ধরতে? এত হাতি এখানে?

ঋজুদা আমার দিকে তাকাল। বলল, তিতিরকে বল।

আমি বললাম, জেনে রাখো, আফ্রিকান হাতি কখনও পোষ মানে না। কখনও না। আর চেহারায় ভারতীয় হাতিদের থেকে তারা বহুগুণ বড় হয়। হাতি ধরা হয় পোষা-হাতিদের সাহায্য নিয়ে আমাদের দেশে। এখানকার হাতি পোষই মানে না যখন, তখন হাতি ধরা হবে কী করে? আর যদি খেদা বা অন্য কোনো উপায়েও ধরা হয় তাহলেও একটি হাতিও তো কাজে লাগবে না। বন্দিদশাতে রাখলে ওরা না খেয়ে মরে যাবে তবু ভাল, কিন্তু পোষ কখনোই মানবে না। এই আফ্রিকান হাতিদের মতো স্বাধীনতাপ্রিয় জানোয়ার খুব কম আছে।

বেলা পড়ে আসছিল। শীতটা বাড়ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে যাবে। তিনদিকের পাহাড় আর পাহাড়তলির জঙ্গল আস্তে আস্তে রাতের জন্যে তৈরি হচ্ছিল।

আমি বললাম, রাতে খাওয়া-দাওয়ার কী হবে?

ঋজুদা পকেট থেকে চার্ট বের করে বলল, তোর গাড়িতে, পোর্টসাইডে, টিনড ফুড আছে। কয়েক ক্রেট মিনারাল ওয়াটারও আছে। যতদিন না আমরা জঙ্গলে জলের পাশে স্থায়ী আস্তানা গাড়ছি, ততদিন মিনারাল ওয়াটারই খেতে হবে জলের বদলে।

তিতির বলল, তোমার লিস্টে স্টোভ আছে?

আছে।

চাল-ডাল?

তাও আছে।

ঘি?

ঘি!

চার্টে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমি বললাম, খাঁটি গব্যঘৃত? ভেবেছটা কি? কিন্তু তোমার জন্যে দেখছি তাও আছে। মাত্র এক টিন। এক কেজি।

ব্যসস। তাহলে আমি খিচুড়ি বানিয়ে দিচ্ছি তোমাদের।

প্রথম রাতেই আগুন জ্বালানো কি ঠিক হবে? আমাদের বন্ধুরা যে ধারেকাছেই নেই তা তো বলা যায় না? আগুন যদি তারা দেখে ফেলে?

ঠিক বলেছিস। ঋজুদা বলল।

নো-প্রবলেম। তাঁবুর মধ্যে, তাঁবুর পর্দা বন্ধ করে রেঁধে দেব স্টোভ জ্বালিয়ে। তাঁবুটা গরমও হবে তাতে। তিতির উত্তর দিল।

ঋজুদা বলল, দ্যাটস্ নট আ ব্যাড আইডিয়া। তবে? দ্যাখ, রুদ্র! তিতির না এলে তোকে এরকম জায়গায় এই কৃষ্ণ মহাদেশে কেউ মুগের ডালের খিচুড়ি খাওয়াতে পারত?

সেটা ঠিক। বলতেই হল আমায়। আফটার অল খিচুড়ি বলে কতা!

প্রথম রাতটা ভালয় ভালয়ই কাটার কথা ছিল। উৎপাতের মধ্যে একটা হাতির বাচ্চা আমাদের তাঁবুর খুব কাছে চলে এসেছিল। হঠাৎই আবার কী মনে করে ফিরেও গেল।

তিতির যখন তাঁবুর মধ্যেই স্টোভ জ্বালিয়ে খিচুড়ি রাঁধছিল, আর সঙ্গে বেকন-ভাজা, টিন থেকে বের করে, দারুণ গন্ধও ছেড়েছিল খিচুড়ির, তখন আমি ওর সঙ্গে বসে গল্প করছিলাম পেঁয়াজ ছাড়াতে ছাড়াতে। পেঁয়াজ ছাড়ানো কি ছেলেদের কাজ! এমন চোখ-জ্বালা করে না!

ঋজুদা পর্দা-ফেলা তাঁবুর বাইরে ল্যাণ্ডরোভারের বনেটের উপরই গায়ে ফারের কলার-ওয়ালা অলিভ গ্রিন জার্কিন পরে মাথায় বেড়ে টুপি চাপিয়ে আমাদের কথা শুনছিল আর মাঝে মাঝে টুকটাক কথা বলে আমাদের কথায় যোগ দিচ্ছিল।

এই রুআহা ন্যাশনাল পার্কে হিপোপটেমাস্ নেই ঋজুদা?

ঋজুদাকে শুধোলাম।

না থাকলেও বা ক্ষতি কী? তুই যে পরিমাণ মোটা হচ্ছিস, জোলো জায়গা দেখে তোকে তাতে ছেড়ে দিলেই তিতিরের হিপ্পো দেখা হয়ে যাবে।

না। সিরিয়াসলি। বলো না?

এখানে একটা জায়গা আছে, তার নাম ট্রেকিমবোগা। সেখানে প্রায়ই ওদের দেখা যায়। সেখানে আমাদের যেতেও হবে। ট্রেকিমবোগা কথাটার মানে হচ্ছে, হেহে ভাষায়-মাংস রান্না। মানেটা বুঝলি তো? চোরা শিকারিরা ওখানে রীতিমত মৌরসি-পাট্টা গেড়ে বসত আগে। হয়তো এখনও বসে। তাদের ক্যাম্প পড়ত এবং পট-হান্টিং করে তারা সেই মাংস রান্না করে খেত।

পট-হান্টিং মানে? তিতির বলল।

খানার জন্য শিকারিরা যতটুকু শিকার করে তাকে পট-হান্টিং বলে। জঙ্গলে তো আর মাংস বা মুরগির দোকান থাকে না। কোনো জঙ্গলেই থাকে না। অবশ্য চোরা শিকারিরা কি আর শুধুই পট-হান্টিং করত, তারা ম্যাসাকারই করত রীতিমত।

হঠাৎ তিতির চিৎকার করে উঠল, মারো, মারো, মারো, রুদ্র; শিগগির মারো।

কী মারব তা বুঝতে না পেরে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম আমি কোমর থেকে পিস্তল খুলে নিয়ে।

তিতির বলল, আঃ, দেখতে পাচ্ছ না? কী তুমি?

তিতিরের মারো-মারো রব শুনে ঋজুদাও পর্দা ঠেলে তাঁবুর মধ্যে ঢুকল। ঢুকেই, চট করে এগিয়ে গিয়ে পায়ের যোধপুরী বুট দিয়ে মাটির সঙ্গে থেঁতলে দিল দুটো কালো বিছেকে। পেল্লায় বিছে। সাধারণত আফ্রিকাতে যে লাল বিছে দেখেছি তাদের চেয়ে সাইজে এরা অনেক বড় এবং লাল মোটেই নয়। কালো। টর্চ ফেলে ভাল করে দেখি, তাঁবুর মধ্যে অসংখ্য গর্ত। ঠিক গোল নয়, কেমন লম্বাটে-লম্বাটে গর্ত।

ঋজুদা নিজের মনেই বলল, পাণ্ডানাস বিছে। তারপর বলল, এদের বিষ কম। কামড়ালে রে মাম্মা, রে বাব্বা করতে হবে বটে, তবে প্রাণে নাও মরতে পারিস। আরো যদি বেরোয় তাহলে না মেরে সটান খিচুড়ির হাঁড়িতে চালান করে দিস তিতির। নয়তো, বেকনের সঙ্গে ভাজতেও পারিস। ফার্স্ট ক্লাস খেতে। কম্যাণ্ডো ট্রেনিং-এর সময় একবার আমি খেয়েছিলাম, তবে দেশে। দেশের জিনিসের স্বাদই আলাদা। বিছেও বড় মিষ্টি লেগেছিল। বুঝলি।

আমরা যখন তাঁবুর মধ্যে খেতে বসেছি তখন তিনজনেই কান খাড়া রেখেছিলাম। যেহেতু ডান হাতের কর্ম করার সময় ডান হাতটি ব্যস্ত থাকবে, যার যার ছোট অস্ত্র কোমর থেকে খুলে পাশে শুইয়ে রেখেছিলাম, যাতে প্রয়োজন হলেই খিচুড়ি-মাখা হাতেই তুলে নেওয়া যায়।

খেতে খেতে তিতির বলল, যাদের খোঁজে আমরা এসেছি, তারা ত্রিসীমানায় নেই। থাকলে এতক্ষণে তারা জেনে যেত।

আমি বললাম, ঋজুদা, তুমি অন্ধকারে বসে পাইপ টেনো না। বড় জ্যাঠাকে খেমকরনের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি স্নাইপার কেমন সিগারেটের আগুন দেখে কপালের মধ্যিখানে গুলি করে শেষ করে দিল, মনে নেই?

হুঁ।

হঠাৎ বাইরে কিসের আওয়াজ শোনা গেল। সকলে খাওয়া থামিয়ে কিসের আওয়াজ তা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। আওয়াজটা গাছ থেকে আসছে। সঙ্গে ভয়ার্ত পাখির কিচিরমিচির। অনেক পাখির গলা একসঙ্গে। অথচ চিতা বা লেপার্ড গাছে চড়লে এর চেয়ে ভারী হত আওয়াজটা। ঋজুদা একটুক্ষণ উত্তীর্ণ হয়ে থেকে বলল, খা, খিচুড়ি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। দারুণ রেঁধেছে কিন্তু তিতির। যাই-ই বলিস্।

তা তো বুঝলাম। কিন্তু আওয়াজটা কিসের ঋজুকাকা?

ঋজুদা খিচুড়ি গিলে বলল, দ্যাখ, বাঁদরমাত্রই বাঁদরামো করে। কিন্তু এই বাঁদরগুলো শুধু বাঁদরই নয়, রীতিমত ত্যাঁদোড়। এই ধোঁয়াটে-ধূসর রঙের আফ্রিকান বাঁদরগুলোর নাম ভারভেট। অথবা গ্রিভেট। এদের জুওলজিক্যাল নাম হচ্ছে, সাকোপিথেকাস অ্যাথিওপস্। সোয়াহিলি নাম, টুম্বুলি। শব্দ শুনে মনে হল ত্যাঁদোড় বাঁদর দুটো গাছে উঠে পাখিদের ডিম খাবার মতলব করছিল।

কী পাখি? আমি শুধোলাম।

সে কী রে রুদ্র! ডাক শুনেও চিনতে পারলি না? স্টার্লিং। সেরেঙ্গেটিতে এত শুনেছিস।

ঠিক তো! মনে পড়ল আমার। তিতিরকে বললাম, পুব-আফ্রিকায় কত রকমের স্টার্লিং পাখি আছে জানো তিতির? সাঁইত্রিশ রকমের। তার মধ্যে এই রুআহাতে অবশ্য দু রকমই বেশি দেখতে পাওয়া যায়।

সুপার্ব আর অ্যাশি। ঋজুদা যোগ করল।

তিতির বলল, এই সমস্ত এলাকা আগে হেহেদের ছিল? ওদের দেশ কেড়ে নিল কারা?

জার্মানরা। আবার কারা? পুরো পুব-আফ্রিকার নামই তো ছিল আগে জার্মান ইস্ট-আফ্রিকা। এখন যেখানে রুআহা ন্যাশনাল পার্ক, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই পার্ককেই বলা হত সাবা ন্যাশনাল পার্ক। জার্মানরাই করে গেছিল। কিন্তু তারও আগে আঠারোশো আটানব্বই সনে হেহেদের বিখ্যাত সর্দার মকাওয়ায়ার সঙ্গে জোর যুদ্ধ হয়েছিল জার্মানদের। জার্মানদের কাছে হেহেদের তুলনাতে অনেক আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ছিল। সুতরাং তারাই জিতেছিল। এখন তানজানিয়ান পার্লামেন্টের যিনি স্পিকার, তাঁর নাম হচ্ছে অ্যাডাম সাপি মকাওয়ায়া। তিনি হচ্ছেন সেই হেহে-সর্দারেরই নাতি। অ্যাডাম সাপি মকাওয়ায়া তানজানিয়ান ন্যাশনাল পার্কস-এর জন্যে যে অছি পরিষদ বা ট্রাস্ট আছে, তার একজন ট্রাস্টিও।

বাইরে হঠাৎ যেন শব্দ হল আবারও ঋজুদা কান খাড়া করে শুনল। আমরাও। ঋজুদা হঠাৎ এঁটো আঙুল ঠোঁটে লাগিয়ে আমাদের চুপ করতে বলল। তাঁবুর গায়ের চতুর্দিকে কারা যেন ভারী পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। একবার তাঁবুর একটা দিক একটু দুলে উঠল। মনে হল তাঁবুটা এক্ষুনি আমাদের মাথার উপর ভেঙে পড়বে। ঋজুদা তাড়াতাড়ি তিতিরের নিভিয়ে-দেওয়া স্টোভটা জ্বালিয়ে হঠাৎ তাঁবুর পর্দা উঠিয়ে দু হাতে স্টোভটা তুলে ধরে আমাদের ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে এঁটো-হাতে সার-সার বিছের গর্তের উপর বসিয়ে রেখে চলে গেল। বাংলায় বলতে লাগল, ও গণেশ! গণেশ বাবা। বাড়ি যা লক্ষ্মীটি। নইলে আমাদের সাহানিয়া দেবীকে নালিশ করে দেব। যা বাবা। বাবারা আমার। লক্ষ্মী মানিক আমার!

আশ্চর্য। দেখতে দেখতে ওরা যেন সরে গেল। আরও কিছুক্ষণ বাইরে তাঁবুর চারপাশে ঘুরে ঋজুদা ফিরে এসে বলল, নে তিতির, আবার গরম কর খিচুড়ি। সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

তিতির শুধোল, বাইরে কী এসেছিল ঋজুকাকা?

আমি বললাম, কটা ছিল?

হাতি। গোটা দশ-বারো। ভারী সভ্য-ভব্য দল।

স্টোভের আলোতে দেখলাম তিতিরের মুখটা কালো হয়ে গেছে। হঠাৎ বাইরের অন্ধকার রাতকে খানখান করে দিয়ে ইদোম উল্লাসে হাঃ-হু-হুঃ-হাঃ হাঃ-হু-হু-হাঃ করে হায়না চিৎকার করে উঠল যেন তিতিরকে আরও বেশি ভয় পাওয়ানোর জন্যে।

বাহাদুরি করার অবশ্য কিছু নেই। আমাদের দেশের মতোই আফ্রিকান হায়নাদের ডাক রাতে যদি কেউ জঙ্গলের মধ্যে বসে শোনে তার ভয় না লেগে পারে না।

ভয় আমারও করছিল। কিন্তু সে কথা আর বলি! হাসি-হাসি মুখ করে তিতিরকে বললাম, দাও এবার। গরম হয়ে গেছে এতক্ষণে।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল হ্যাঁক হ্যাঁক হ্যাঁক করে ডাকা ধনেশ পাখিদের গলার স্বরে। তাঁবুর দরজা খুললাম। তিতিরের দিকে তাকিয়ে দেখি গুঁড়িসুড়ি মেরে অসহায়ের মতো শুয়ে আছে বেচারি স্লিপিং ব্যাগে। শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। কপালের কাছে এক ফালি নরম রোদ এসে পড়েছে। ওকে না-উঠিয়ে তাঁবুর বাইরে এলাম। শয়ে-শয়ে স্টার্লিং তাদের ডানায় রোদ ঠিরিয়ে ওড়াউড়ি করে বেড়াচ্ছে। আরও কত পাখি। সকলের নাম কি জানি? ঋজুদাকে দেখলাম না। স্কাউটিং করতে গেছে নিশ্চয়ই। জিপের ছাদ আর বনেটটা তখনও শিশিরে ভিজে আছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপ সেই সিক্ততা নিঃশেষে শুষে নেবে।

জিপের সামনে ঝোলানো ভিস্তির জলে মুখ ধুয়ে আমিও একটু এদিক-ওদিক ঘুরে নিলাম। আমরা একে ছাগল বলি। জল ভরলে এগুলোকে ছাগল-ছাগলই মনে হয়, অনেক মানুষকে যেমন জল না-ভরেও ছাগল-ছাগল দেখায়, তেমনি। মুখ ধোব কী? এত ঠাণ্ডা হয়ে ছিল জল যে, তা দিয়ে মুখচোখ ধুতেই চোখদুটো সদ্য খোসা ছাড়ানো লিচুর মতো ফ্যাকাসে-সাদা গোল্লু-গুল্লু হয়ে গেল আর সাধের মুখখানি একেবারে আফ্রিকার রিলিফ ম্যাপের চেহারা নিল। জিপের আয়নায় নিজেকে দেখেই এত মন খারাপ হয়ে গেল যে, বলার নয়।

এই ধনেশ পাখিগুলো গাছের গর্তে এবং বিশেষ করে বাওবাব গাছের ফোকরে বাসা বাঁধে। এদের সোয়াহিলি নাম, ঋজুদার কাছে শুনেছি, হণ্ডো-হণ্ডো। জুওলজিকাল নাম হচ্ছে, ভন ডার ডিকেনস্ হর্নবিল। ধনেশের ইংরিজি নাম হর্নবিল। আমাদের দেশের জঙ্গলে দু’রকমের ধনেশ দেখেছি। ওড়িশার মহানদীর দু’পাশের জঙ্গলে, বিহারের সিংভূমের সারাণ্ডার জঙ্গলে–যাকে বলে দ্য ল্যাণ্ড অব সেভেন হান্ড্রেড হিলস্ এবং মধ্য প্রদেশের জঙ্গলে। আমরা বলি বড়কি ধনেশ, ছোটকি ধনেশ। গ্রেটার অ্যাণ্ড লেসার ইণ্ডিয়ান হর্নবিলস। জার্মান পুব-আফ্রিকার জার্মান সাহেব ভন ডার ডিকেনস বোধ হয় এই পাখি প্রথম দেখেন এখানে। ইংরেজদের যেমন লর্ড, জার্মানদের ভন্।

দু-একটা পাখি-টাখি কি এখনও অনাবিষ্কৃত নেই? থাকলে, ভন্ রুদ্র অথবা মাদমোয়াজেল তিতিরের নামে তাদের নামকরণ করা যেত। জার্মানরা কি সে সুযোগ দেবে আমাদের? এমন গুণী এবং পাগল জাত এরা যে, যেখানে গেছে সেখানকার সবকিছুকেই খুঁটিয়ে দেখে, চেখে, আবিষ্কার, পুনরাবিষ্কার করে রেখে গেছে। আমাদের জন্যে কোনো কিছুই রেখে যায়নি তারা, বাহবা নেওয়ার জন্যে।

হঠাৎ দেখি, একদল হলদে-রঙা বেবুন সিংগল ফাইলে মার্চ করে আমার দিকেই আসছে। এমন হলুদ বেবুন যে হয়, তা কখনও জানতাম না। প্রথমে মনে হল জণ্ডিস্ হয়েছে বোধ হয়। লিভারের ন্যাবা রোগেই বেচারিদের এমন ন্যালাখ্যাপা অবস্থা। তারপরই মনে হল তাইই কি? এত বেবুনের একসঙ্গে জণ্ডিস হওয়াটা একটু আশ্চর্যের ব্যাপার।

আমি যখন তাদের স্বাস্থ্যচিন্তায় ভরপুর ঠিক তক্ষুনি লক্ষ করলাম যে, ওঁদের চোখমুখের চেহারা মোটেই বন্ধুভাবাপন্ন নয়। বে-পাড়ায় মস্তানি করতে আসা ছোকরার প্রতি পাড়ার ছেলেদের যেমন মনোভাব, বেবুনগুলোর মুখচোখের ভাব অনেকটা সেরকম। ব্যাপার বেগতিক দেখে আমি তাঁবুর দিকে ফিরতে লাগলাম। আমার ভয় লেগেছে বুঝতে পেরে ন্যাবাধরা হলুদ বেলুনের মতো বেবুনগুলো যেন খুব মজা পেল। খিচিক্ চিচিক্ চিচিক খিচিক করে চেঁচাতে চেঁচাতে তারা আমার দিকে ধেয়ে এল।

মনে-মনে ও ঋজুদা গো! কোথায় গেলে গো! এত বড় শিকারিকে শেষে বাঁদরে খেলে গো! বলে নিঃশব্দ ডাক ছাড়তে ছাড়তে প্রায় দৌড়ে গিয়ে তাঁবুর মধ্যে ঢুকতে যাব এমন সময় তিতিরের সঙ্গে একেবারে হেড-অন্ কলিশান। তিতির কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ওকে ঠেলে ভেতরে সরিয়ে তাঁবুর দরজা বন্ধ করলাম। ততক্ষণে ইয়ালো বেবুনের প্লেটুন এসে গেছে। তাঁবুর দরজা একটু ফাঁক করে আমি আর তিতির টিকিট না-কেটেই সার্কাস দেখতে লাগলাম।

চার-পাঁচজন করে সটান দাঁড় করানো জিপ দুটোর মধ্যে ঢুকে পড়ল। সর্বনাশ! চোক, সাইড লাইট এ-সবের সুইচ নিয়ে টানাটানিও করতে লাগল। স্টিয়ারিংটা ধরে এদিক-ওদিক ঘোরাতে লাগল। তারপর টাইট দেখে খিচিক করে আওয়াজ করে জিপের সামনের সিটে রাখা ঋজুদার পাইপটা একজন গম্ভীরসে তুলে নিল। নিয়ে, প্রথমে বাঁ পায়ের পাতা চুলকোল একটু, তারপর কালো রঙের কলা ভেবে খেতে গিয়েই মুখে পোড়া তামাক ঢুকে যাওয়াতে রেগেমেগে কটাং করে কামড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ডানহিলের পাইপ ফটাস করে ফেটে গেল। ভাঙা অংশটা বিড়ির মতো দু’বার ফুঁকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার তারা জিপ থেকে নেমে পড়ল। যে পাইপ খাচ্ছিল সেইই মনে হল পালের গোদা। সব পালের গোদাদের বোধহয় পাইপ খুবই পছন্দ, যেমন আমাদের পালের গোদারও!

তারা একদিক দিয়ে গেল, ঋজুদাও অন্যদিক দিয়ে এল। সাতসকালে এ কী বিপত্তি!

ঋজুদা বলল, চল্ চল্। তাঁবু তোল। এক্ষুনি আমাদের যেতে হবে। এখান থেকে আধ মাইল দূরেই হাতির রাস্তা। ঐ রাস্তাতে পোচারদের যাতায়াতের চিহ্ন আছে। আজকের মধ্যেই আমরা একটা পাকাপোক্ত ক্যাম্প না করে ফেলতে পারলে একেবারে বোকার মতো ওদের হাতে পড়তে হবে।

ঋজুদাকে তিতির বলল, এগুলো কী বেবুন ঋজুকাকা? রুদ্র বলছিল ওদের নাকি জণ্ডিস হয়েছে?

ডানহিলের পাইপটার অমন দুর্গতি এবং তখনকার টেনশানের মধ্যেও ঋজুদা হেসে ফেলল।

বলল, রুদ্রটাকে নিয়ে পারা যায় না। কী কল্পনা! ওরা ঐরকমই হয়। ওদের নামই ইয়ালো-বেবুন। সোয়াহিলি নাম হচ্ছে নিয়ানি। জুওলজিকাল নাম, পাপিও সাইনোসেকালাস।

পাপী যে সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। তাঁবুর খোঁটা ওঠাতে ওঠাতে আমি বললাম।

সব গোছগাছ হয়ে গেলে ঋজুদা আর তিতির ঋজুদা যে জিপ চালাচ্ছিল তাতে উঠল। পেছনের জিপটাতে আমি।

তুই আগে যা রুদ্র। দশ কিলোমিটার গিয়ে দাঁড়াবি।

কোন্ দিকে যাব? রাস্তা বলতে তো কিছু নেই কোনোদিকে।

কালকে যে পাহাড়টার নাম রাখলি তুই টেডি মহম্মদ, সেই দিকে যাবি আস্তে আস্তে, খানাখন্দ, কাঁটা-টাঁটা বাঁচিয়ে। খুব সাবধানে যাবি। পিস্তলটার হোলস্টার খুলে রাখিস, যাতে বের করতে সময় না লাগে।

ওকে! বলে আমি জিপ স্টার্ট করে এগিয়ে গেলাম। বোধ হয় পঞ্চাশ গজও যাইনি, আমার জিপের আয়নায় দেখলাম তিতির ঋজুদার পাশে বসে তিড়িং করে লাফাচ্ছে। এমন জোরে লাফাচ্ছে যে, ওর মাথা ঠেকে যাচ্ছে জিপের ছাদে। আর ঋজুদা জিপ থামিয়ে দিয়ে হো-হো করে হাসছে।

ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করতে হচ্ছে। এঞ্জিন বন্ধ করে জিপ থেকে নেমে তিতিরের দিকে গিয়ে বললাম, কী হল? হলটা কী?

চুপ করো। অসভ্য! বলল তিতির।

হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। এই অসভ্য কথাটা মেয়েরা যে কতরকম মানে করে ব্যবহার করে, তা ওরাই জানে। এই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম যে, অসভ্য বলে ও আমার উপর অহেতুক রাগ দেখাল। রাগকে আবার অহেতুক বললে ওরা চটে যায়। অহেতুক রাগের আর-এক নাম হচ্ছে অভিমান। নাঃ, বাংলা ভাষাটা, বিশেষ করে বাঙালি মেয়েদের মুখে একেবারে দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে দিনকে দিন।

এমন সময় তিতির হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে নামল প্রায় আমার ঘাড়েই। অন্যদিক দিয়ে ঋজুদা। ঋজুদা তখনও হাসছিল। হাসি থামিয়ে আমাকে বলল, রুদ্র, ড্যাশবোর্ডের পকেট থেকে ঝাড়ন বের করে তিতিরের সিটটা ভাল করে মুছে দে। তিতিরকেও একটা ঝাড়ন বের করে দে। বেচারি!

ব্যাপার-স্যাপার কিছুই বুঝতে না-পেরে আমি বোকার মতো ঝাড়ন বের করলাম। একটা তিতিরকে দিলাম। অন্যটা দিয়ে তিতিরের সিটটা মুছতে লাগলাম। বিতিকিচ্ছিরি গন্ধ। একেবারে অন্নপ্রাশনের ভাত উগরে আসবে মনে হতে লাগল। তিতির দেখলাম ঝাড়নটি নিয়ে একটা গাছের আড়ালে চলে গেল।

ঋজুদাকে ফিসফিস করে শুধোলাম, ব্যাপারটা কী?

ব্যাপার আইসক্রিম! এতক্ষণ আমার পাইপ ভেঙে দিয়ে গেছে বলে খুব আনন্দ করছিল ও, প্রথম ক্ষতিটার চোট আমার সম্পত্তির উপর দিয়েই গেল বলে, কিন্তু সিটে বসেই বলল, সিটের উপর এত শিশির পড়ল কী করে? তোমার সিটও কি ভেজা ঋজুকাকা?

না তো! আমি বললাম।

তবে? আমার সিট ভিজে চুপচুপ করছে। ঈঃ, কী গন্ধ রে বাবা! মাগো! কী এসব সিটের উপর?

ডান হাতের আঙুল ভেজা সিটে একবার চুঁইয়ে নাকের কাছে এনে গন্ধ নিলাম। ওকে শুধোলাম, বেবুনরা কি এই সিটেও বসেছিল?

তিতির বলল, হ্যাঁ। তিন-চারটে বসেছিল পাশাপাশি–প্যাসেঞ্জারদের মতো।

ওদের দোষ কী? জঙ্গলে তো এমন সুন্দর বন্ধ-টন্ধ বাথরুম পায় না ওরা সচরাচর। তাও তোর ভাগ্য ভাল যে বড় কিছু…

ম্যাগো! ব্যাব্যাগো! ও মাই গড–বলে তিড়িং তিড়িং করে লাফাতে লাগল তিতির।

ঋজুদা থামতেই আমিও বলে উঠলাম ওয়াক্ থুঃ। তুমি আমাকে দিয়ে মোছালে? ঈসস!

তুই তো মুছেই খালাস। তিতিরের কথা ভাব তো! বেচারির পিঠ-পা সব একেবারে হলদে বেবুনের স্মৃতিবিজড়িত হয়ে গেছে!

এমন সময় হঠাৎ ‘কূঃ’ করে সংক্ষিপ্ত চাপা একটা ডাক ভেসে এল আমাদের পেছন দিকের কোনো গাছ থেকে। বাঁ দিকে, আমাদের কাছ থেকে প্রায় দুশো গজ দূরের কোনো গাছের উপর থেকে ‘কূঃ’ বলে কে যেন সাড়াও দিল।

ঋজুদার মুখচোখের চেহারা পালটে গেল। আমি দৌড়ে গিয়ে স্টিয়ারিং-এ বসলাম। ঋজুদাও স্টিয়ারিং-এ বসে তিতির যেদিকে গেছে সেই দিকে জিপটা নিয়ে গেল। জিপ স্টার্ট করেই আমি আয়নায় দেখলাম যে তিতিরও দৌড়ে এসে উঠল ঋজুদার পাশে। যতখানি সাবধানে এবং যতখানি জোরে পারি চালাতে লাগলাম জিপ।

এবড়ো-খেবড়ো পথ। পথ মানে, জিপের চাকা যেখান দিয়ে গড়িয়ে দিচ্ছি সেই ফালিটুকুই। সামনে নজর রাখছি, টেডি মহম্মদ পাহাড়টা যেন হারিয়ে না যায়। মাঝে মাঝেই গাছগাছালির আড়ালে পড়ে যাচ্ছে পাহাড়টা।

দু কিলোমিটার মত আসার পর বাঁ দিকে একটা শুকনো নদী পেলাম। জিপ নদীতে নামিয়ে দেব কি না ভাবছি, কারণ নদীরেখা বারবার চলে গেছে ঐ পাহাড়ের দিকেই। নদীতে নামিয়ে দিলে অনেক তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে। পেছন থেকে ‘কূ’ দিল কারা? তাদের ‘কূ’ যে আমাদের কু বয়ে আনবে সে-বিষয়ে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই।

এখন পেছনে তাকালে কিমিবোওয়াটেঙ্গে পাহাড়শ্রেণী চোখে পড়ছে। সামনের বালি-নদীটা নিশ্চয়ই মাওয়াগুশি বালি-নদীর কোনো শাখা হবে।

দেখতে দেখতে ঋজুদাও এসে গেল। আমি আঙুল দিয়ে ইশারা করে শুধোলাম, নদীতে নামাব কিনা জিপ। ঋজুদা ইশারায় পরমিশান দিতেই স্পেশ্যাল গিয়ার চড়িয়ে নিয়ে নামিয়ে দিলাম। একেবারে অধঃপতন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’ বইটি বড়দের বই হলেও, কায়দা করে মার লাইব্রেরি থেকে ম্যানেজ করে পড়ে ফেলেছিলাম। তাতে একটি জম্পেস্ ডায়ালগ আছে। সুশোভনকে নুটু মোক্তার বললেন, ছিঃ ছিঃ তোমার এত বড় অধঃপতন? সুশোভন বললেন, পতন তো চিরকাল অধঃলোকেই হয় নুটুদা, কে আর কবে ঊর্ধ্বলোকে পড়েছে বল?

তরতর করে জিপ চলতে লাগল। এখন আর কাঁটা-টাটার ভয় নেই। তবে টিউব যে কখন পাংচার হবে তা টিউবই জানে। খারাপ মানুষ স্টিয়ারিং-এ বসলে ওরা জায়গা বুঝে পাংচার হয়। প্রত্যেক গাড়ির টিউবই মানুষ চেনে। সামনেই নদীটা একটা বাঁক নিয়েছে, হঠাৎ। দূরের টেডি মহম্মদ পাহাড়টা আস্তে আস্তে কাছে আসছে। মনে হচ্ছে বেশ বড় বড় গুহা আছে পাহাড়টাতে। সকালের রোদে দূর থেকে তাদের উপর আলোছায়ার খেলা দেখে মনে হচ্ছে কোনো ভাল ক্যামেরাম্যান বা আর্টিস্ট আমাদের সঙ্গে থাকলে এই আলোছায়ার খেলা নিয়ে এক আশ্চর্য কবিতা লিখতে পারতেন। ফোটোগ্রাফি বা ছবি সবই তো আলোছায়ারই খেলা। নদীর দু পাশে আবার অন্ধকার-করা নিবিড় তেঁতুলগাছ। ঠাকুমার চেয়েও বয়সে কত বড় হবে এরা প্রত্যেকে। এদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে ইচ্ছে করে। যে-কোনো মহীরুহ দেখলেই মনে হয়, যেন ইতিহাসের সামনে, কথা-কওয়া অতীতের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মন আপনা থেকেই শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে। সকলের হয় কিনা জানি না। ঋজুদাই আমার সর্বনাশ করল। তার কাছ থেকে এমন এমন সব রোগের ছোঁয়াচ এল আমার ভিতরে যা এ-জীবনে কোনো ওষুধেই সারবে আর।

এদিকে অনেক তালগাছও দেখছি। মা টবের মধ্যে নানারকম ক্যাকটাই করেন। ফুলের গাছের মতো সেগুলো বাইরের বাগানে না-রেখে বসবার ঘরে, বারান্দাতে রাখেন। এখানে একরকমের ক্যাকটাই দেখলাম। তাকে, ক্যাকটাই না বলে দ্য গ্রেট-গ্রেট গ্র্যাণ্ডফাদার অব ওল ক্যাকটাই বলা ভাল। এই গাছগুলোর নাম ক্যান্ডালাব্রা। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলেন, ইউফোবিয়া ক্যানডালাব্রাম্। আফ্রিকার ইউফোরবিয়াই নতুন সভ্য পৃথিবীর ক্যাকটাই। গণ্ডাররা এর কাঁটা খেতে খুব ভালবাসে। বুদ্ধি মোটা না হলে কি আর অমন চেহারা হয়?

গণ্ডারের কথা ভাবতে ভাবতেই যেই নদীটার বাঁকে পৌঁছেছি এসে, অমনি দেখি, ঠিক সেই বাঁকের মুখেই নদীর বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন দুই বিশাল মিস্টার অ্যাণ্ড মিসেস গণ্ডারিয়া। তাদের কাঁধে বসে আছে হলুদরঙা এবং লাল-ঠোঁট পোকা-খাওয়া পাখি। অক্স-পেকার।

জিপ দেখেই বদখত্ চিৎকার করে পাখিগুলো গণ্ডারদের পিঠ ছেড়ে উড়ে গেল। এবং গণ্ডার দুটো জিপটাকে আরেকটা সাংঘাতিক গণ্ডার ভেবে খপর-খাপর আওয়াজ তুলে অত্যন্ত আনকুথলি, আনস্মার্টলি নদীর বুক ছেড়ে জঙ্গলে চলে গেল। পেছনে চেয়ে দেখলাম, ঋজুদার জিপও আমার জিপের হাত-তিরিশেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তিতির জিপের মাথার পর্দার জানলা খুলে দাঁড়িয়ে উঠে অনিমেষে দেখছে। গণ্ডারের মতো কুৎসিত জানোয়ারের কুৎসিততম লেজ যে এত কী দেখবার আছে জানি না! পারেও তিতির!

আর একটু এগোলেই টেডি মহম্মদ পাহাড়ের নীচে পৌঁছে যাব। ঋজুদা ঠিক জায়গাই বেছেছে মনে হচ্ছে ক্যাম্পের জন্যে। পাহাড়টা ন্যাড়ামতো উপরে, কিন্তু গায়ে গাছগাছালি আছে নানারকম। আছে গুহার চারপাশেও। অথচ পাহাড়ের নীচে বেশ কিছুদূর অবধি ফাঁকা। কারণটা কী তা ওখানে গেলেই বোঝা যাবে। হয়তো হাতিদের যাতায়াতের পথ আছে–গাছপালা সামান্য যা ছিল পথে, উপড়ে দিয়েছে তারা। যাই হোক, পাহাড়ের কোনো গুহাতে যদি আস্তানা গাড়ি আমরা, তাহলে নীচটা ফাঁকা থাকাতে ঐ পাহাড়ের কাছে আমাদের চোখ এড়িয়ে কেউই আসতে পারবে না।

গণ্ডারগুলো দৌড়তে দৌড়তে আবার আমাদের দিকেই মুখ করে এগিয়ে আসছে। আসলে ইচ্ছে করে হয়তো নয়; নদীটা এমন ভাবে বাঁক নিয়েছে যে, ওদের পথের কাছাকাছি কেটে গেছে সে পথ। এইরকম গণ্ডার কিন্তু গুগুনোগুম্বারের দেশের সেরেঙ্গেটি প্লেইসে দেখিনি। এদের বলে ব্ল্যাক রাইনো। আর সেরেঙ্গেটির গণ্ডারদের বলে হোয়াইট রাইনো। আসলে ব্ল্যাক রাইনোর গায়ের রঙ কিন্তু কালো নয়, যেমন নয় হোয়াইট রাইনোর গায়ের রঙ সাদা। হোয়াইট কথাটা ওয়াইড-এর বিকৃতি। এখানকার গণ্ডারদের মুখ অনেক চওড়া হয় সেরেঙ্গেটির, মানে, গুগুনোগুম্বারের দেশের গণ্ডারদের চেয়ে। কেন চওড়া হয়, তা সহজে বোঝা যায়। কারণ এখানকার গণ্ডাররা চরে-বরে খায় গোরু-মোষের মতোই, অর্থাৎ যাদের ইংরিজিতে বলে গ্রেজার। আর সেরেঙ্গেটির গণ্ডারের জিরাফের বা অ্যান্টিলোপদের মতো কাঁটাগাছ বা পাতা-পুতা গাছ মুড়িয়ে খায়, যাদের ইংরিজিতে বলে ব্রাউজার। গণ্ডাররা চোখে কম দেখে, ভটকাই-এর দাদুর মতো, কিন্তু ঘ্রাণ এবং শ্রবণশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। নাকের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও ভটকাই-এর দাদু কাউকেই চিনতে পারেন না। কিন্তু পাশের বাড়ির মেয়ে বান্টি শীতের দুপুরে ধনেপাতা কাঁচালঙ্কার সঙ্গে কদবেল মেখে খেলে, অথবা ভটকাই ছাদে বসে পরীক্ষার আগের দিন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইংল্যাণ্ডের টেস্ট ম্যাচের রিলে অত্যন্ত ক্ষীণ ভল্যমে শুনলেও যেমন তিনি ঠিক গন্ধ পান এবং শুনতে পান, গণ্ডারদের ব্যাপার-স্যাপারও অনেকটা তেমনি।

ভটকাইটাকে খুবই মিস করছি। অ্যালবিনো’র রহস্য ভেদ করার সময়ও বেচারা আসতে পারল না। আর এবারে উড়ে এসে জুড়ে বসল তিতির। যেন বায়না নিয়ে যাত্রাগান করতে এলাম আমরা। ফিমেল ক্যারেকটার ছাড়া ত’ জমবে না।

ওরে ওরে ভটকাই,
আয় তোকে চটকাই
জাপটিয়ে ধরি তোকে সোহাগে,
তিতির কাবাব হবে,
লিখন কে খণ্ডাবে?
উইমেনস লিব?
যত খটকাই!

আহা! বাল্মীকির মতোই রুদ্র রায়চৌধুরীর মুখ দিয়েও অকস্মাৎ কবিতা বেরিয়ে গেল। বন-পাহাড়ের এফেক্টই আলাদা! যে-শাখায় বসে সেই শাখাই কাটছিলেন মহাকবি কালিদাস; সেই শাখারই অন্যদিকে যে রুদ্র নামের কোনো মহাকপি বসে সেই মুহূর্তে লেজ নাচাচ্ছিল না এমন কথা তো শাস্ত্রে লেখা নেই। কপির কবিতা বলে কতা! এক্কেবারে জমজমাট, ফুলকপিরই মতো।

নদী পেরিয়ে যেখানে এলাম সেখানে পাড়টা কম নিচু এবং গণ্ডারদের যাতায়াতের কারণে প্রায় সমতলই হয়ে এসেছে। পেরিয়ে, টেডি মহম্মদ পাহাড়ের দিকে চলতে লাগলাম। মিনিট-কুড়ির মধ্যেই জায়গাটাতে পৌঁছে গেলাম। ঋজুদা হর্ন না-দিয়ে জোরে চালিয়ে আমাকে ওভারটেক করে আগে আগে গিয়ে দুটি পাহাড়ের মাঝের সমতল জমির ফালিটুকুর মধ্যে ঢুকে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। পিছনে পিছনে আমিও পৌঁছলাম।

.

চমৎকার জায়গা। এখানে যদি আমরা পার্মানেন্ট ক্যাম্প করি তাহলে এক হেলিকপ্টার অথবা প্লেন ছাড়া কেউই আমাদের দেখতে পাবে না। আর পাহাড়ের মাঝামাঝি আমাদের মধ্যে যদি কেউ জঙ্গলের মধ্যে হাইড-আউট বানিয়ে নিয়ে বাইনাকুলার নিয়ে পাহারা দেয় তাহলে তো কেউ আসতেই পারবে না কাছে। তবে, বিপদ হবে, পাহাড় টপকে কেউ যদি আসে। পাহাড়ের ওপাশে কী আছে? কেমন জঙ্গল? নদী আছে কি নেই? তা পরে দেখতে হবে।

ঋজুদা জিপ থেকে নেমে কোমর থেকে হেভি পিস্তলটা খুলে সাইলেন্সারটা লাগিয়ে নিল। মুলিমালোঁয়ায় অ্যালবিনোর রহস্যভেদের পর থেকে এই পিস্তলটা খুবই প্রিয় হয়ে উঠেছে ঋজুদার। গুহা আছে পর পর তিনটে। একটা বড়। দুটো ছোটো। ঋজুদার পিছন পিছন আমরাও এগোতে লাগলাম পিস্তল খুলে নিয়ে।

বড় গুহাটার দিকে উঠছি এমন সময় বাজ-পড়ার মতো গদ্দাম আওয়াজ করে গুহার মধ্যে থেকে সিংহ ডাকল।

খাইছে!

বাজ-পড়ার আওয়াজের মতো ডেকেই, ন্যাদস্-ন্যাদস করে আরামে কোমর দুলিয়ে চলা পশুরাজ হঠাৎই বিদ্যুতের ঝলকানির মতো অতর্কিতে ছুটে বাইরে এল। তার পেছনে পেছনে তিনটি সিংহী। একমুহূর্ত, ঋজুদা একাই নয়, আমরা তিনজনই তা দেখে থমকে দাঁড়ালাম। ঋজুদা, আমি এবং তিতির হাত সামনে লম্বা করে ট্রিগারে আঙুল ছুঁইয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কী যে মনে করে, তারাই তা জানেন, বেড়াল-পরিবারের কুলীনরা পোষা বেড়ালেরই মত সদলবলে পাথর টপকে-টকে নেমে পাহাড়ের খোল পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

তিতির বলল, একদম ছোটমাসির বেড়ালটার মতো। নেকু-পুষু-মুনু! আমার মনে হচ্ছিল, কাছে গিয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে ঘুঞ্চু-মুনু পুঞ্চু-মুনু করে আদর করে দি!

আমার কথা বন্ধ হয়ে গেছিল ওকে দেখে। ঘুঞ্চু-মুনু পুঞ্চু-মুনুরা যে কী জিনিস তা তো তিতিরসোনার জানা নেই! উঃ! অসীম ক্ষমতা ওর। দ্য গ্ৰাণ্ডমাদার অব ওল। নেকুপুষুমুনুজ।

গুহাটার মুখে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে ঋজুদা ভাল করে দেখেশুনে নিল। তারপর ঢুকে পড়ল।

মনে মনে পূর্ণকাকার মতো বললাম, বোমশঙ্কর।

বেশ বড় গুহা। আমাদের জিনিসপত্র সমেত তিনজনের চমৎকার কুলিয়ে যাবে। ভাবা যায় না! সেলামি নেই, এমনকী ভাড়াও নেই; কলকাতার বাড়ির দালালরা যদি এ গুহার খোঁজ পেত! কোথা থেকে যেন আলোও আসছে মনে হল। একটু এগোলেই বোঝা যাবে। এমন সময় আমার পেছন পেছন আসা তিতির ইরি বিবি রে, ইরি মিমি রে, কী ই-ই-ই-ই-দুর পচা গন্ধ রে বাব্বা-আ-আ-আ বলে প্রায় কেঁদে উঠল।

ঋজুদা এবার ধমকে দিল, স্টপ ইট তিতির।

বিরক্ত গলায় বলল, আমরা কি পিকনিক করতে এসেছি বলে তোর ধারণা?

তিন-দিক-বন্ধ গুহার মধ্যে সিংহ আর সিংহীদের গায়ের এবং কতদিনের মলমূত্রের গা-গুলোনো বিটকেল গন্ধ, তার উপর আবার ঋজুদার ধমক। তিতির ই-ই-ই-ই করে কাঁদতে লাগল।

হাত না-নাড়িয়ে হাততালি দিলাম মনে মনে। ঠিক হয়েছে। ঠিক হয়েছে।

গুহার ভিতরটা সমুদ্র থেকে তোলা গোয়ার পোর্ট-আগুয়াড়া হোটেলের ছবির মতন। হুবহু এক। সামনেটা গোলাকার–আগুয়াড়া ফোর্টেরই মতো– তারপর একটা হাত চলে গেছে বাঁয়ে, একটা ডাইনে। ডান এবং বাঁ দিক থেকে পাথরের ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। অনেক ফাঁক-ফোক আছে। তবে ভরসার কথা, সেগুলো পাশে। বৃষ্টি পড়লে বা শিশির ঝরলে সরাসরি গায়ে পড়বে না। রোদও লাগবে না।

ঋজুদা বলল, ফার্স্ট ক্লাস। ক্যান্ডালাব্রার ডাল কেটে নিয়ে রুদ্র ও তিতির এক্ষুনি খেজুরের ডালের মতো ঝাঁটা করে নিয়ে গুহাটাকে ভাল করে ঝাঁট দিয়ে বসবাসের যোগ্য করে তোল। আমাদের আজকের মধ্যেই এখানে সব খুলে-মেলে বসে কাল থেকে কাজ শুরু করতে হবে। প্রস্তুতিতেই তো অনেক দিন চলে গেল। আর সময় নেই সময় নষ্ট করবার।

গুহা থেকে বাইরে বেরোতে বেরোতে তিতির বলল, সিঁংহ-সিঁংহিরা তোঁ ফিঁরে আঁসবে সঁন্ধেবেলায়, তঁখন?

বললাম, এ গুহা তখন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারদের দখলে। ফিঁরে এঁসে দেঁখুকই না!

গুহার মুখে পৌঁছে গেছি প্রায় আমরা, হঠাৎ ঋজুদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলল। বলেই, আমাকে ও তিতিরকে দুপাশে সরে যেতে বলে, নিজে ঐ দুর্গন্ধ নোংরার মধ্যে শুয়ে পড়ে পিস্তলটা সামনে ধরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কী যেন দেখতে লাগল।

এবারে আমরাও দেখতে পেলাম। একটা খাকি-রঙা জিপ এসে লেগেছে আমাদের জিপদুটোর একেবারে পাশে। বলা বাহুল্য যে, আমাদের ওরা ফলো করেই আসছিল এতক্ষণ। একজন হাতে রাইফেল নিয়ে গুহার মুখের দিকে নিশানা নিয়ে জিপে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর দুজন লোক, হাতে টুয়েলভ বোরের শটগান নিয়ে গুহার দিকে উঠে আসছে। ওদের মধ্যে একজন বেঁটেখাটো, গায়ে খাকি পোশাক, অন্যজন প্রায় উলঙ্গ, সাড়ে-ছ ফিট লম্বা, মিশকালো, মাথায় রঙিন পাখির পালক-গোঁজা আফ্রিকান। তার যা চেহারা, তাতে আমাকে আর তিতিরকে নিয়ে দু হাতে লোফালুফি করতে পারে ইচ্ছে করলেই। খুব অন্যায় হয়ে গেছে আমাদের। পথেই যে আমাদের অ্যামবুশ করেনি, এইই ঢের।

তিতির ফিসফিস করে বলল, শ্যাল আই?

নো। নো। বলল ঋজুদা। গলা আরও নামিয়ে বলল, এখানে শব্দ করা একেবারেই চলবে না। তারপরই দুহাত দিয়ে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল ধরে জিপের কাছে দাঁড়ানো বুক-টানটান লোকটার বুকের দিকে প্রথমে নিশানা নিল। পিস্তলের পক্ষে বেশ বেশি দূরত্বেই আছে লোকটা। সে লোকটাও লম্বা-চওড়া, তবে খাকি পোশাক পরা।

কী হল বোঝার আগেই ব্লপ করে একটা আওয়াজ হল ঋজুদার পিস্তলের মাজল থেকে। এবং সঙ্গে সঙ্গে লোকটা হাঁটু মুড়ে পড়ে গেল। পড়বার সময় তার রাইফেলের নলের ঠোকা লাগল জিপের বনেটের সঙ্গে। জোর শব্দ হল তাতে।

যে লোকদুটো গুহার মুখের দিকে আসছিল তারা নীচের লোকটার পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে, কোনো গুলির আওয়াজ না-পেয়ে এবং কাছে কাউকে না-দেখে, একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে ঐ লোকটার দিকে দৌড়ে যেতে লাগল।

বনপাহাড়ের সব লোকেরই ভূত-প্রেতের ভয় আছে। আমাদের দেশের লোকের যেমন আছে, আফ্রিকার লোকদেরও আছে। ঋজুদা, বাঁ হাতটা ছেড়ে দিয়েই, পিস্তলটাকে একবার ডাইনে আরেকবার বাঁয়ে নিয়ে পরপর ট্রিগার টানল। ব্লপ, ব্লপ। পেছন থেকে গুলি খেয়ে লোকদুটো যেন শূন্যে একটু লাফিয়ে উঠে সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল। ওদের মধ্যে ঐ প্রায়-উলঙ্গ লোকটি পড়ে গিয়েও বন্দুকটা তুলে ধরেছিল গুহার মুখের দিকে, কিন্তু তার বন্দুক-ধরা হাত নেতিয়ে গেল। হেভি পিস্তলের গুলি তার ফুসফুস ভেদ করে গেছিল। অন্য লোকটার নিশ্চয়ই হৃদয়ে গুলি লেগেছিল। সে এমনভাবে বাঁ হাতটা মুচড়ে পড়েছিল যে, দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন জন্মমুহূর্ত থেকেই ঘুমুচ্ছে অমন করে।

তিতির চাপা গলায় বলল, আই! ঋজুকাকা! তুমি তো দেখছি জেমস্ বণ্ড! ইরিব্বাবা।

ঋজুদা উত্তর না দিয়ে বলল, আমি হাত দিয়ে ইশারা না করলে তোরা বাইরে আসবি না। বলেই, পিস্তলে তিনটি গুলি ভরে নিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। গুহার মুখটা প্রায় আড়াল করে দু পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ছিল ঋজুদা। তার দু পায়ের ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখা যায় বাইরের, তাইই দেখছিলাম।

মিনিট-দুই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর ঋজুদা বাঁ হাত নেড়ে ইশারা করল আমাদের। আমরা বাইরে যেতেই খুব উত্তেজিত হয়ে বলল, রুদ্র, অনেক কাজ এখন তোর। যা বলছি, চুপ করে মনোযোগ দিয়ে শোন।

হাতে সময় বেশি ছিল না। ঋজুদা সংক্ষেপে যা বলল গুহা ছেড়ে নেমে আসতে আসতেই শুনে নিলাম সব। ওদেরই জিপে আমি আর ঋজুদা ধরাধরি করে রক্তাক্ত লোক তিনটিকে তুলে দিলাম। তিতিরও এগিয়ে এসেছিল সাহায্য করতে কিন্তু অত রক্ত দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল। করেই, সরে গিয়ে মাটিতে বসে পড়ল দু’হাতে মুখ ঢেকে।

আমি জানতাম এরকম হবে। ওর দোষ নেই। যখন শিকার করি তখনও ট্রফির ঘাড়ে বা বুকে দূর থেকে দারুণ মার্সম্যানের মতো একখানা গুলি ঠুকে দিয়ে তাকে ধরাশায়ী। হতে দেখে ভাল লাগে। নিজেকে নিজেই মনে মনে পিঠ চাপড়াই। কিন্তু তারপর শিকার করা জানোয়ারের কাছে যেতে বড়ই খারাপ লাগে। রক্ত বড় খারাপ দৃশ্য। কতবার মনে হয়েছে, প্রাণ নেওয়া তো সহজ, প্রাণ দেওয়ার ক্ষমতা কি আমার আছে? আর এ জানোয়ার নয়, এরা যে মানুষ; যারা পাঁচ মিনিট আগেও আমার চেয়েও অনেক বেশি জীবন্ত ছিল।

এত কথা ভাবলাম যতক্ষণে, ততক্ষণে ওদের জিপের স্টিয়ারিং-এ বসে আমি সেই বালিনদীর কাছে চলে এসেছি। কিন্তু আমরা যেখান দিয়ে নদী পেরিয়েছি সেখান দিয়ে পার হলে চলবে না। আমাদের ক্যাম্প ওদের দলের অন্যদের চোখে পড়ে যাবে। তাই নদীর পাড় দিয়ে আস্তে আস্তে চলেছি, নদীতে নামার মতো এবং উলটোদিকে ওঠার মতো জায়গা দেখলেই নামব। নদী পেরিয়ে গিয়ে তারপর জোর জিপ চালাতে হবে, দুটি কারণে। বেশি দেরি হলে জিপময় রক্ত ভরে গেলে, তা পথে চুঁইয়ে পড়বে। এবং রক্তের চিহ্ন রয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, মৃতদেহগুলো সমেত জিপটা অনেক দূরে কায়দা করে ফেলে রেখে আমাকে পায়ে হেঁটেই একা একা পথ চিনে ফিরে আসতে হবে গুহায়। যদি জঙ্গলে পথ হারিয়ে যাই! পথই তো নেই, তার পথ! সব জায়গাকেই পথ বলে মনে হয় এসব জায়গায়। যে-কোনো জঙ্গলেই।

জিপটা চালিয়ে মোটেই আরাম নেই। বোধহয় শক-অ্যাবসর্বার গেছে। সর্বক্ষণ ঘড়াং ঘড়াং আওয়াজ করছে এবং পেছনে মরা মানুষগুলো সমেত যা-কিছু আছে সব কিছুই ঝাঁকাচ্ছে। নদীরেখাকে পাশে রেখে মাইল-দুয়েক গিয়ে একটা পথ পেলাম। এক্কেবারে ফার্স্ট ক্লাস। কলকাতার রেড রোডের মতো। হাতিদের যাতায়াতের পথ। হাতিদের যাতায়াতের পথ দেখেই তো পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট বা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের এঞ্জিনিয়াররা পথ বানান।

নদী পেরিয়ে এলাম। একবার পিছনে তাকালাম। টেডি মহম্মদ পাহাড়টা ভাল করে দেখে নিলাম। নদী আর পাহাড়টার মাঝে মস্ত একটা বাওবাব গাছ আছে। ফেরার পথে এই গাছটাকে দেখেই নিশানা ঠিক করতে হবে। পূর্ণিমা চলে গেছে আরুশাতেই। চাঁদ উঠবে সেই অনেক রাতে। তারার আলো আর আমার তিন-ব্যাটারির টর্চই একমাত্র ভরসা। সামনে তাকালে জঙ্গলের মাথার উপরে দিগন্তে কিমিবোয়াটিঙ্গে পাহাড়শ্রেণী দেখা যাচ্ছে। ঋজুদা বলেছিল, যে পথ ছেড়ে দিয়ে কাল আমরা এসেছি, সেই বড় পথের উপরে জিপটাকে রেখে দিয়ে আসতে। যাতে লোকগুলোর সঙ্গীরা ন্যাশানাল পার্কের লোকেরা তাদের দেখতে পায়। নইলে হায়নায় আর শেয়ালে ছিঁড়ে খাবে এদের। শকুনও আছে। যদি এরা কাছাকাছি গাঁয়ের লোক হয় তাহলে কবর পাবে অন্তত। ঋজুদার তো বটেই, আমারও খারাপ লাগছিল ভীষণ। প্রথমেই তিন-তিনটি মানুষ খুন করতে হল। অথচ আমরা নিরুপায়। জঙ্গলের নিয়ম হচ্ছে সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট। হয় মারো, নয় মরো। মাঝামাঝি রাস্তা এখানে কিছু খোলা নেই।

দুপাশে ক্যাণ্ডালাব্রা ঝোপ। বড় বড় কম্মিফোরা গাছ। একরকমের কম্মিফোরা আছে তাদের বলে কম্মিফোরা উগোজেনসিস্। হেহেদের মতো গোগো বলে একরকমের আফ্রিকান উপজাতি আছে। তারা যেখানে থাকে সে অঞ্চলকে বলে উগোগো। ঐ অঞ্চলে এ জাতীয় কম্মিফোরা বেশি দেখা যায় বলে ঐ গাছের ঐরকম নাম হয়েছে। কম্মিফোরা ছাড়াও কমব্রেটাম, অ্যাকাসিয়া এবং অ্যাডানোসোনিয়া জাতের গাছ আছে। এই অ্যানোসোনিয়াই হল বাওবাব। যাদের আরেক নাম আপসাইড-ডাউন ট্রিজ। ব্রাকিস্টেগিয়া গাছেদের মতোই বছরের বেশির ভাগ সময়ই এরা পাতাহীন থাকে। কিন্তু বৃষ্টি নামার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই এরা বুঝতে পারে যে, বৃষ্টি আসছে। তখন পাতা ছাড়তে থাকে। বৃষ্টির জল যাতে সারা বছরের মতো ধরে রাখতে পারে। প্রকৃতি যে কত রহস্যই গোপন করে রাখেন তাঁর বুকের মধ্যে তার খোঁজ কজন রাখে?

ন্যাড়া-মুখের কতগুলো গো-অ্যাওয়ে পাখি গাছের ডাল বেয়ে কাঠবিড়ালির মতো দৌড়ে উপরে উঠে গেল জিপটা দেখে। এদের গায়ের পালক হালকা ছাই আর সাদাটে-সবুজ রঙের হয়। এরা হচ্ছে টুরাকো জাতীয় পাখি। সামনেই একটা নাম-না-জানা গাছের নীচে প্রকাণ্ড একটি ইল্যাণ্ড ছবির মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরা হরিণ নয়। অ্যান্টিলোপ। সোয়াহিলিতে এদের বলে পফু। লম্বাতে প্রায় ছ’ ফিটের মতো হবে। ওজনেও কম করে সাত কুইন্টল হবে কম-সে-কম। জিপ দেখেও ইল্যাণ্ডটা পালাল না। একটু নড়েচড়ে উঠল শুধু! ওর পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন দেখি, কে বা কারা শটগান দিয়ে গুলি করে তার চোখদুটোকে খতম করে দিয়েছে। বুকেও একটা দগদগে ক্ষত। এক্ষুনি হয়তো পড়ে মরে যাবে। যারা এমন নৃশংস হতে পারে, তাদের মেরে ঋজুদা কিছুই অন্যায় করেনি। মনটা একটু হালকা লাগতে লাগল।

ঋজুদা প্রায়ই একটা কথা বলে। চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াসের কথা। বলে, ইফ উ্য পে ইভিল উইথ গুড, হোয়াট ডু উঁ পে গুড উইথ? আমাদেরও এরকম কথা আছে, শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ। যে শঠ, তার সঙ্গে শঠতা করলে দোষ নেই। যে মন্দ, তাকে মন্দ ব্যবহারই দিতে হয়। আর ভালকে ভাল।

ঘণ্টা-দুয়েক জিপ চালিয়ে আসছি। কেবলই ভয় হচ্ছে, রাস্তা হারালাম না তো? ফিরতে পারব তো পথ চিনে? এদিকে সেই বড় রাস্তাও একেবারে বেপাত্তা।

জিপটা একটু আড়াল দেখে দাঁড় করালাম। পিঠের রাক-স্যাক থেকে ম্যাপটা বের করে দেখলাম। কম্পাসটা বের করে তার সঙ্গে মিলিয়ে মনে হল আমি যেন অনেকই বেশি চলে এসেছি ইবিগুজিয়া নদীর দিকে। সর্বনাশ হয়েছে। আমাকে কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে তো নির্ঘাত ফাঁসিতে লটকে দেবে। আইন নিজের হাতে নেওয়ার অধিকার কারোই নেই।

এমন সময় হঠাৎ একটা জিপের শব্দ কানে এল।

হৃৎপিণ্ডর ধুকধুকানি থেমে গেল আমার। কম্পাস আর ম্যাপ উঠিয়ে নিয়ে একদৌড়ে গিয়ে আমি ঝোপঝাড়ের ভিতরে লুকিয়ে পড়লাম। আস্তে আস্তে জিপের এঞ্জিনের শব্দটা জোর হল। বিজাতীয় ভাষায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে কারা যেন আসছে জিপ চালিয়ে। মড়ার মতো নিস্পন্দ হয়ে দেখতে লাগলাম আমি। লোকগুলো আফ্রিকান। ভাগ্য ভাল যে ঝোপঝাড়ের আড়ালে রাখা জিপটাকে অথবা আমাকে ওরা কেউই নজর করল না। জিপটা অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর তার শব্দ পর্যন্ত মরে গেল; পেট্রল-এঞ্জিনের উৎকট গন্ধ, জিপের চাকায়-ওড়া ধুলোর গন্ধ, সব কিছু বুনোফুলের গন্ধে আবার চাপা পড়ে গেল। আমি বেরিয়ে এসে জিপটা যেখান দিয়ে গেল, সেখানে কোনো পথ আছে কি না দেখতে গেলাম। সর্বনাশ! এইটেই ত’ বড় পথটা! যে-কোনো মুহূর্তে এখানে ন্যাশনাল পার্কের গাড়ি অথবা বুকে ক্যামেরা ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টুরিস্টভর্তি ভোক্সওয়াগন কম্বি, অথবা ল্যাণ্ডরোভার অথবা জিপ এসে উপস্থিত হতে পারে।

ফিরে গিয়ে লোকগুলোর দিকে তাকালাম। সেই দৈত্যর মতো দেখতে, মাথায় পালক-গোঁজা আফ্রিকান লোকটি মুখ হাঁ করে রয়েছে। আর একটা নীল জংলি মাছি তার মোটা কোলাব্যাঙের মতো ঠোঁটের উপর উড়ে উড়ে বসছে। হাত-পা ছড়িয়ে জমাট-বেঁধে যাওয়া মেটের মতো রঙের থকথকে রক্তের মধ্যে ওরা তিনজনে শুয়ে আছে। আমার বমি পেতে লাগল। তাড়াতাড়ি স্টিয়ারিং-এ বসে জিপটা চালিয়ে বড় রাস্তার উপর এনে দাঁড় করালাম। তারপর রাক্-স্যাক থেকে কাগজ বের করে ভটকাইয়ের প্রেজেন্ট করা উইলসন কোম্পানির একটা বলপয়েন্ট পেন দিয়ে বড় বড় করে ইংরিজিতে লিখলাম : চোরাশিকার যারা করবে তাদের এই শাস্তি। চোরাশিকারিরা সাবধান। নীচে লিখলাম : বুনো জানোয়ারদের দেবতা–টাঁড়বারো।

টাঁড়বারো আসলে আমাদের দলের কোড নেম। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বড়কর্তা, প্রেসিডেন্ট নিয়েরেই জানেন শুধু। এবং জানেন পুলিশের বড়কর্তা।

লেখা শেষ হতে বনেটের উপর একটি পাথর চাপা দিয়ে কাগজটিকে টানটান করে মেলে রেখে ওখান থেকে ভোঁ-দৌড় লাগালাম আমি। ওদের একজনেরও রাইফেল বা বন্দুক আমাকে নিতে মানা করেছিল ঋজুদা। কিন্তু এতখানি পথ আমাকে একা ফিরতে হবে। পথে ভুলে যাব কি না তারও কোনো ঠিক নেই। শুধুমাত্র পিস্তল সম্বল করে যেতেও মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু কী করব? ঋজুদার কথা অমান্য করার সাহস ছিল না।

শেষবারের মতো একবার ওদের দিকে তাকিয়ে, কেওড়াতলায় যখন শব নিয়ে যায় হরিধ্বনি দিয়ে, তখন পথে পড়লে যেমন নমস্কার করি, তেমনই হাত তুলে মৃতদের শেষ নমস্কার জানিয়ে টিকিয়া-উড়ান দৌড়লাম। এখন জিপটা থেকে নিজেকে যত তাড়াতাড়ি এবং যত দূরে সরিয়ে নিতে পারি, ততই মঙ্গল। তবে বড় রাস্তাতে চোরাশিকারিরা আসবে না কোনোমতেই। এলে আসবে গেম-ওয়ার্ডেন এবং ট্যুরিস্টরা। লোকগুলোকে না মেরে অন্তত একজনকেও ধরতে পারলে তাদের ঘাঁটি কোথায় তা জানা যেত। কিন্তু লোকগুলো যে আমাদের মারতেই এসেছিল। ইরিঙ্গা অথবা ইবিগুজিয়া থেকেই আমাদের পিছু নিয়েছিল কিনা তাই বা কে জানে!

অনেকক্ষণ দৌড়ে যখন হাঁফিয়ে গেলাম তখন একটা গাছতলায় বসলাম একটু। ঘেমে-যাওয়া গায়ে শীতের হাওয়া লাগতে খুব আরাম লাগছিল। গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে চোখ বুজলাম। মিনিট-পনেরো না জিরোলে চলবে না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এত সব গা-শিউরানো ঘটনা ঘটে গেল যে বলার নয়। এদিকে বেলা দুপুর গড়িয়ে গেছে।

জঙ্গলের, বোধহয় পৃথিবীর সব জঙ্গলেরই, একটা নিজস্ব গায়ের গন্ধ আছে। সেই গন্ধ দিনে ও রাতের বিভিন্ন প্রহরে, বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন। যার নাক আছে, সেইই শুধু তা জানে। বিভূতিভূষণ তাঁর বিভিন্ন লেখাতে বাংলার পল্লী প্রকৃতির শরৎকালের গায়ের গন্ধর বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, শরতের তিক্ত-কটু-গন্ধ। কী দারুণ যে লিখেছেন। শরতের আসন্ন সন্ধ্যায় ভারতের সমস্ত বনের গা থেকেই ঐ রকম গন্ধ বেরোয়। শীত, নিঃশব্দে নেমে আসে কাঁধের দু’পাশে এসে দু’কান মোচড়াতে থাকে। আর নাক ভরে যায় তিক্ত-কটু-গন্ধে। কোথায় বিভূতিভূষণের বারাকপুর আর ঘাটশিলা, ধারাগিরি আর ফুলডুংরি আর কোথায় এই কৃষ্ণ মহাদেশের রুআহা। অথচ কত মিল, অমিলের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে ছন্দোবদ্ধ হয়ে জড়িয়ে আছে একে অন্যকে। আমি তো এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এলাম আফ্রিকাতে। বিভূতিভূষণ তো একবারও আসেননি। বাংলার পল্লী প্রকৃতি ছেড়ে পূর্ণিয়া আর সিংভূমের সারাণ্ডার জঙ্গলেই ঘুরেছেন বারবার। কিন্তু লবটুলিয়া ছইহার, মহালিখাপুরের পাহাড়, সরস্বতী কুণ্ড, কুন্তী, রাজা দোবরু পান্না–এসব প্রাকৃতিক চিত্র ও চরিত্র সকলে কি আঁকতে পারেন? আর ‘চাঁদের পাহাড়’? বাঘা বাঘা লেখকরাও বারেবারে আফ্রিকাতে এসেও আর একখানি ‘চাঁদের পাহাড়’ কি লিখতে পারবেন?

‘চাঁদের পাহাড়’ বলে সত্যিই কিন্তু একটি পাহাড় আছে এখানে। রুয়েঞ্জারি রেঞ্জে। পাহাড়টির ছবি দেখেছি আমি ঋজুদার কাছে। ‘মাউনটেইন অব দ্য মুন’।

একদল স্টার্লিং পাখি ডাকছে, উড়ছে, বসছে। রোদ চমকাচ্ছে ওদের ডানায় ডানায়। শীতের দুপুরের নিবিড়, নিথর, ভারী গন্ধ চারিয়ে যাচ্ছে ওদের ওড়াউড়িতে। ভারী ভাল লাগছে।

কিন্তু আর সময় নেই। উঠে পড়ে, কিমিবোয়াটিঙ্গে পাহাড়শ্রেণীর দিকে একবার পিছন ফিরে দেখে, টেডি মহম্মদ পাহাড়টা কোন্ দিকে হবে আন্দাজ করে নিয়ে রওয়ানা হলাম। আধঘণ্টা পরে আবার ম্যাপ খুলে কম্পাস্ বের করে পথ শুধরে নিতে হবে।

আমাদের দলের কোড নেমও কিন্তু বিভূতিভূষণের উপন্যাস ‘আরণ্যক’ থেকে নেওয়া। টাঁড়বারো হচ্ছেন বুনো মোষদের দেবতা। যারা মোষ শিকার করতে আসে টাঁড়বারো তাদের ব্যর্থ করেন মোষদের শিকারীর বন্দুকের কাছে না যেতে দিয়ে। দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন বনপথে। অলগারনন ব্ল্যাকউডের বইয়েও ছোট্টবেলায় এরকম এক দেবতা বা আধিভৌতিক ব্যাপারের কথা পড়েছিলাম। একজন মুজ শিকারী তাঁর কোপে পড়েছিলেন। আমাদের ঋজুদার বিশেষ পরিচিত লালজি–প্রমথেশ বড়ুয়ার ছোট ভাই, হাতিদের দেবী সাহানিয়াকে দু-তিনবার দেখেছেন নাকি। সেই দেখার কথা ওঁর সম্বন্ধে লেখা ‘হাতির সঙ্গে পঞ্চাশ বছর’ বলে একটি বইয়ে উল্লেখও আছে। সাহানিয়া দেবী অল্পবয়সী একটি সুন্দরী নেপালী মেয়ে। কথা বলেন না, হাসেন শুধু। ঋজুদা এখানে আসার কয়েকদিন আগেই উত্তরবঙ্গের বামনপোখরি ও গোরুমারা স্যাংচুয়ারির কাছে মূর্তি নদীর পাশে লালজির এখনকার ক্যাম্পে গেছিলেন। লালজি নাকি ঋজুদাকে বলেছেন যে, ওঁর ধারণা ঐ নেপালী মেয়েটি রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর জঙ্গল বুক-এর মংলুরই মতো, হাতিদের দ্বারা ছোট্টবেলা থেকে পালিত কোনো নেপালী মেয়ে। একবার যাব লালজিকে। দেখতে ঋজুদার সঙ্গে, ইচ্ছে আছে।

আর সাহানিয়া দেবী? দেখা কি দেবেন আমাকে?

কম্পাস বের করে একবার দেখে নিলাম ঠিক যাচ্ছি কি না। যে-নদী চলে গেছে টেডি মহম্মদ পাহাড়ে, আমাদের ক্যাম্প তার পাশ দিয়ে। নদীরেখা ধরে হেঁটে গেলে বাওবাব গাছটা এবং পাহাড়টা চোখে পড়বেই। আশা করি। দিনের আলো থাকতে থাকতে পৌঁছতেই হবে। খুব জোরে হাঁটতে লাগলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *