ঋজুদা এবং ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

সাত

গিরধর-এর দোকানে হিং-এর কচুরি, ছোলার ডাল আর কালাজামুন খেতে গিয়েই জানা গেল যে, কাল মাঝরাতে পিপ্পাল পাঁড়ে এবং তার দলবল শেখ রমজান মিঞার বাড়িতে হামলা করেছিল। রমজান মিঞার ছাগলের ব্যবসা এবং সুদের ব্যবসা ছিল। সে বহু দূর দূর ট্রাকে করে ছাগল পাঠাত। তা ছাড়া অনেক জমি ছিল। কোঠা বাড়ি, জিপ গাড়ি। অনেক গরিবকে খরার সময়ে টাকা ধার দিয়ে প্রচণ্ড চড়া সুদ লাগিয়ে তাদের জমি-জিরেত, গয়নাগাঁটি, গোরু-মোষ সব কবজা করে আসছে সে বহুদিন হল। তার উপরে তার দুটো সেয়ানা ছেলে ইমরান আর আক্রাম গরিবের উপরে নানারকম অত্যাচারে তার বাবারও উপর দিয়ে যায় নাকি। রমজান মিঞার সর্বস্ব তো লুটে নিয়েইছে পিপ্পাল, লোহার সিন্দুক ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে তার থেকেও সবই নিয়ে গেছে। তার বড় ছেলের ডান কান আর ছোট ছেলের বাঁ কানটা কেটে নিয়ে গেছে।

পিপ্পাল পাঁড়ে কি কানের লতির চচ্চড়ি খায় নাকি?

আমি বললাম।

গোপাল বলল, হতে পারে। আমরা কচুর লতির তরকারি খাই আর ও কানের লতির চচ্চড়ি খেতেই পারে, কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা আর হলুদ দিয়ে। তা ছাড়া, তার বিবি ও দুই পুত্রবধূরই সামনে রমজান মিঞার লুঙ্গিটাও খুলে নিয়েছে। তার মধ্যে সোনা-রুপোর সব গয়না বেঁধে নিয়ে গেছে। যতক্ষণ না সব কাজ শেষ হয়েছে, ততক্ষণ রমজান মিঞাকে দু’কান হাতে ধরিয়ে উদোম করে মেয়েদের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। অন্য কোনও শারীরিক ক্ষতি করেনি তার। শুধু যাবার সময়ে, পেছনে এক লাথি আর মাথায় একটা উড়নচাঁটি মেরে চলে গেছে।

আমি আর গোপাল যতই পিপ্পাল পাঁড়ের কথা শুনছি ততই তার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। একটা ওরিজিনাল লোক বটে। এরকম ডাকুর সঙ্গে টক্কর দিয়েই তো আরাম।

তিতির বলল, ঋজুকাকা, তোমরা সেবারে স্কুল-ফাইন্যাল পরীক্ষা দিলে সবে। এখনকার মা-বাবারা তো স্কুল-ফাইন্যাল পাশ ছেলেদের নিয়ে পুতুপুতু করে নিজেরাই গাড়ি বা ট্যাকসিতে করে তাদের ভর্তি করাতে নিয়ে যায়। খোকাবাবুরা কী করবে, কী পরবে, কী খাবে সেই চিন্তাতেই তো তাদের ঘুম চলে যায় চোখের আর তোমরা ওই বয়সেই এমন ডেয়ার-ডেভিল হলে কী করে।

ডেয়ার-ডেভিল যারা, তারা ছেলেবেলা থেকেই হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সাহস বরং কমে আসে।

গোপাল বলত, আমার বাবাও যদি জেঠুমনির মতো হতেন। জেঠুমনি আমার আদর্শ পুরুষ।

কেন অমন বলত গোপালকাকা?

বলত, কারণ জেঠুমনি বলতেন, শুধু পড়াশোনা করে কিছু হবে না। সব কিছু করতে হবে। স্কোয়ার হতে হবে জীবনে। শুধু বাঙালি মায়েরাই ছিলেন এমন আগে। এখন বাবারাও তেমন হয়েছেন।

কেমন?

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন না? সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ। বাঙালি করে, মানুষ করোনি’। তখন সাত কোটি ছিল সাতশো কোটি হতে বেশি দেরি নেই। তবে পুতুপুতু করে খোকাদের আঁচলের তলায় আগলে রাখার দিন চলে গেছে। আমার এক বন্ধু ছিল বিনোদানন্দ ঝা। সে বলত, আররে ঋজু, বাঙালি, আদমি বনতা বাঙালকা বাহার যা কর’। কথাটা বোধহয় মিথ্যে বলত না। যে সব বাঙালিরা প্রবাসে আছেন, বাংলার বাইরে চাকরি, ব্যবসা ও শিল্প করেছেন, তাঁরা অধিকাংশই সফল। তোদর এখন এই সব নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।

তুমি এবার নিজেই ডিরেইলড হচ্ছ ঋজুদা, লাইনে ফেরো।

ভটকাই বলল।

হ্যাঁ। আসল কথাটা তো বলা হয়নি তোদের।

কী কথা?

আরে গিরধর-এর দোকানে নাস্তাপানি করে যখন বানোয়ারির দোকানে পান খেতে গেছি, তখনই ব্যাপারটা জানা গেল।

আর কত পান খাবে?

সে কথা আর বলিস না। দেড়মাস লেগেছিল পানের লাল ছোপ দাঁত থেকে ওঠাতে আর ঠোঁটদুটো ফেটে চৌচির হয়ে গেছিল।

এবারে বলো, কী তোমার কথা।

হ্যাঁ। যে পিপ্পাল-এর সঙ্গে গতরাতে আমাদের দেখা হয়েছিল, সে পিপ্পাল ডাকু নয়।

মানে?

হ্যাঁ। তার নাম পিপ্পালপ্রসাদ। সে লোকটা গুণ্ডা প্রকৃতির। কথায় কথায় হাত চালিয়ে দেয়, তিরিক্ষি তিরিক্ষি কথা বলে, বিনা কারণে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করে। তবে সে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে আদৌ নয়। ডাকুর নাকি ছোটখাটো চেহারা, মানে রোগা-পাতলা। নিরামিষ খায়। লম্বাতে নাকি গোপালের মতো হবে। ভারি মিষ্টি ব্যবহার, মিতভাষী কিন্তু কেউ ত্যাণ্ডাই-ম্যাণ্ডাই কি বেগড়বাই করলে তার রাইফেল বা রিভলবার থেকে গুলি চালিয়ে খুপরি উড়িয়ে দিতে এক মুহূর্ত দেরি করে না।

শুনে তো আমরা থ! আমার তখনই মনে পড়ল, সেই কাক-ভোরে দেখা তার চেহারাটার কথা।

সফর আলি স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলল বানোয়ারিকে, তুম ঠিকে বোল রহা হ্যায় ভাইসাব?

আররে! পান এগিয়ে দিতে দিতে বানোয়ারি বলল, যো ডাকু কি শরপর দশ হাজারি ইনাম লাগা হুয়া হ্যায় তার এমন বোকামি হবে যে নিরস্ত্র অবস্থায় সাইকেল চড়ে এবং একা একা আমার দোকান থেকে পান খেতে আসবে? তা ছাড়া ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে পান খায়ই না। সে খুব ধার্মিক লোক। সকাল সন্ধে মা দুর্গার পুজো করে। কখনও দুর্বল বা নিরপরাধীর উপরে অত্যাচার, এমনকি খারাপ ব্যবহারও করে না। পিপ্পালপ্রসাদ অভ্র খাদানে যা পয়সা করেছে তার চেয়ে বেশি করেছে গোমোবারকাকানা লাইনে ওয়াগন ভেঙে কয়লা চুরি করে। তারপরে যেখানে রেললাইনই নেই ধারেকাছে, সেই সীমারিয়াতে এসে মস্ত বাগানওয়ালা বাড়ি করে থেবড়ে বসেছে। চাতরার দিকে তার মস্ত ভাণ্ডারও আছে। বড়লোক খুব। কিন্তু অত্যন্তই অসভ্য। ওর সঙ্গে ডাকুর কোনও তুলনাই চলে না।

পিপ্পাল পাঁড়ের মাথার উপরে দশ হাজার ইনাম কেন?

ওর নামে পঁচিশটা খুন, পঞ্চাশটা ডাকাতির মামলা ঝুলছে। পঁচিশটার মধ্যে পাঁচটা খুন পুলিশ। তিনজন কনস্টেবল, একজন জমাদার আর একজন এ.এস.আই।

বানোয়ারি বলল।

কোথাকার এ.এস.আই?

বারিয়াতুর। তাই তো যে পিপ্লালকে জ্যান্ত বা মৃত হাজির করতে পারবে কোতোয়ালিতে তাকেই দশ হাজার টাকা দেওয়া হবে। পরে। বিশেষ অনুষ্ঠান করে। টাকাটা দেবেন চিফ-মিনিস্টার সত্নারায়ণ সিনহা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *