ঋজুদা এবং ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

তিন

গত শনিবারে আজ্জু মহম্মদের বিরিয়ানি পার্টির আগে যেখানে থেমেছিল ঋজুদা, সেখান থেকে এই শনিবারে শুরু হল। ঋজুদা বলল, টুটিলাওয়ার জমিদার ইজাহারুল হক-এর বাড়ি থেকে যখন আমরা বেরোলাম চারজনে তখন চারটে বাজে। নাজিম সাহেবের দোয়াতে দুপুরের খাওয়াটা খুবই বেশি হয়ে গেছিল। তিত্বরের কাবাব, হরিণের চাঁব, সীমারিয়ার পাঁঠার কলিজা ভাজা, মুরগির কারি আর বাসমতি চাল-এর ভাত। মুসলমানেরা কখনওই টক খায় না। কেন খায় না, তা আরও বড় হবার পরে জেনেছিলাম।

সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। শীতের বিকেলের বন থেকে এক আশ্চর্য মিশ্র গন্ধ ওঠে। মিশ্র বলছি এই জন্যে যে, তাতে মিষ্টি, তিক্ত, কটু, কষায় সব রকমের গন্ধ মিশে থাকে। পথের ধুলোর মিষ্টি গন্ধ তাতে যোগ হয়। আমাদের দেশের মাটির গন্ধ, ভারতবর্ষের গন্ধ, এমন গন্ধ কোনও দেশের মাটিরই নেই।

সূর্যটা ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার অদৃশ্য হাত যেন দুটি কানের পেছনে বরফের পুলটিস লাগিয়ে দেয়। মনে হয়, সেই হাত দুটি ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে যেমন করে সেদিন সকালে সেই অচেনা লোক দুটোর কান এবং নাকও কেটে নিয়েছিল, তেমনি করেই আমাদের নাক ও কানও বুঝি কেটে নেবে।

সীমারিয়ার দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে চাতরা যাবার পুরনো অব্যবহৃত পথটার সামনে এসে আমরা দু’দলে ভাগ হয়ে গেলাম। এই পথেই গতবারে দূর থেকে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়েকে দেখেছিলাম আমি।

সুব্রতকে নিয়েই বিপদ বেশি। কারণ তার বাবাই তখন পুরো হাজারিবাগ জেলার পুলিশ সাহেব, অর্থাৎ এস.পি.। আর তখনকার হাজারিবাগ জেলা ছিল মস্ত বড়। এখন তো কোডারমাটোডারমা আরও কত জেলা হয়েছে। তখন ছোটনাগপুরের মধ্যে ছিল মাত্র চারটি জেলা রাঁচি, হাজারিবাগ, সিংভূম আর পালাম। যে-অঞ্চলে ডাকাতি করে মানুষ খুন করে বেড়াচ্ছে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে গত ছ’মাস হল, যে-অঞ্চলে অন্তত বার চারেক সশস্ত্র পুলিশের বিরাট বাহিনীর সঙ্গে পিপ্পাল পাঁড়ে ও তার দলবলের সংঘর্ষ হয়েছে এবং তাতে চারজন পুলিশ নিহত হয়েছে এবং পনেরোজন আহত, পাঁচজন ডাকাতও নিহত হয়েছে, আহত কত হয়েছে জানা যায়নি, কারণ তারা আহত সঙ্গীদের ফেলে যায়নি, নিয়ে গেছিল সঙ্গে করে।

চাতরার এক ডাক্তার, পুলিশের গুলিতে আহত ডাকাতদের চিকিৎসা করবেন না বলাতে তাঁকে গুলি করে মেরে দেয় পিপ্পাল পাঁড়ে। সেই এম.বি.বি.এস. ডাক্তার, নামধারী দুবে, নাকি গরিবদের উপরে খুবই অত্যাচার করত। তাই তাকে মেরে দেওয়ায় পিপ্পাল পাঁড়ের শাপে বর হয়েছে। চাতরার সব গরিব পিপ্পাল পাঁড়ের দলে চলে গেছে। সরকার থেকে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের মাথার জন্যে দশ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পঞ্চাশের দশকের দশ হাজার টাকা আজকের দশ লাখ টাকার সমান।

এই প্রকৃত গরিব-দরদি গুণটি আছে বলেই পিপ্পাল পাঁড়েকে পুলিশ সহজে কবজা করতে পারছে না। সে ডাকাত বটে কিন্তু সে নিজের জন্যে ডাকাতি করে না। ডাকাতি করে অত্যাচারীদের বাড়িতে, খুন করে অন্যায়কারীদের। এবং লুটের মাল সব গরিবদের মধ্যেই বিলিয়ে দেয়, অস্ত্রশস্ত্র কিনতে ও নিজেদের খাওয়া-দাওয়ার জন্যে যে টাকা লাগে, তা রেখে। তাই স্থানীয় কোনও মানুষের কাছ থেকে পিপ্পাল পাঁড়ে বা তার দলবলকে ধরবার জন্যে পুলিশ কোনও সাহায্য পায় না। তা ছাড়া পুলিশ চিরদিনই আমাদের দেশে গরিবদের উপরেই অত্যাচার করেছে আর বড়লোকদের সেলাম ঠুকেছে। তাই গরিবের সমর্থন তারা পায় না।

এই অবধি একটানা বলেই, ঋজুদা নিভে-যাওয়া পাইপটা ধরিয়ে বলল, তোরা কি কেউ বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তর দপ্তর’ পড়েছিস? না পড়ে থাকলে অবশ্যই পড়বি। আর পড়বি ‘আনন্দমঠ’। যে উপন্যাস থেকে আমরা বন্দেমাতরম’ মন্ত্র আর গান পেয়েছি।

তা কমলাকান্তর দপ্তরে কী আছে?

বঙ্কিমচন্দ্র, যিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তিনি সেখানে এক চরিত্রের মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন, আইন! সে তো তামাশামাত্র! বড়লোকেরাই পয়সা খরচ করিয়া সে তামাশা দেখিতে পারে।

বঙ্কিমচন্দ্রের সময় থেকে কত বছর হয়ে গেছে কিন্তু আইন আজও তাই আছে বলতে গেলে। যার পয়সা নেই, সে বিচার পায় না। আইন নিজের হাতে নেওয়াটা বে-আইনি। একথা সকলেই জানে। কিন্তু যেখানে আইন গরিবদের দেখে না, ভিন্ন মত ও দলের মানুষদের কাছে আইনের দরজা যখন বন্ধ, তখনই সমাজে পিপ্পাল পাঁড়েদের আবির্ভাব হয়, প্রাচীন ইংল্যান্ডের রবিনহুড-এর মতো, অথবা আজকের ভারতের নকশালদের মতো। যা কিছুই ঘটে, তার পেছনে কারণ থাকেই। ক্রিয়া হলেই প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। তাই আইনের চোখে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে জঘন্যতম অপরাধী হলেও তার সম্বন্ধে সবকিছু জানাশোনার পর তার প্রতি আমার এক দুনিবার আকর্ষণ জন্মে গেছিল। তাকে গুলি করে মারার চেয়েও তাকে জানার এক অদম্য ইচ্ছা জেগেছিল মনে।

তা তো হল কিন্তু তোমার বন্ধু সুব্রত চ্যাটার্জির কথা কী যেন বলতে গিয়ে অন্য পথে চলে গেলে কেন?

ঋজুদা হাসল।

বলল, বয়স হচ্ছে যে, তা বেশ বুঝতে পারছি। কথার খেই হারিয়ে যায়। তা ছাড়া এই সব কথা তো আজকেরও নয়। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকের কথা। সব কথা ঠিকমতো মনেও নেই।

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, সুব্রত যেহেতু হাজারিবাগের পুলিশ সাহেবের ছেলে, তাকে যদি পিপ্পাল পাঁড়ে একবার ধরে ফেলতে পারে তাহলে সারা পুলিশ ফোর্সকে চরম বেইজ্জতি করা হবে। তারপর সুব্রতকে খুন করার হুমকি দিয়ে তার যেসব সঙ্গী পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে তাদের ছেড়ে দেবার দাবিও জানাতে পারে। ভরসার কথা এই যে, সুব্রত, নাজিম সাহেবের খোকাবাবু, যে হাজারিবাগের এস. পি. মিস্টার সত্যচরণ চ্যাটার্জির বড় ছেলে তা ইজাহারের খিদমদগারেরা আর কাড়য়ারা ক’ভাই ছাড়া কেউই জানে না। কিন্তু পিপ্পাল পাঁড়ের চর তো সবজায়গাতে ছড়ানো আছে। কথাটা তার কানে যাওয়াটা আশ্চর্যের নয়। হাঁকোয়া শিকারে আশেপাশের নানা গ্রামের যে সব মানুষেরা হাঁকোয়া করছে তাদের কারও কানে কথাটা গেলেও বিপদ ঘটতে পারে।

এই অবধি বলেই, থেমে গিয়ে ঋজুদা রিমোট কন্ট্রোল কলিং বেল-এর সুইচটা টিপল।

কী হল আবার?

দুঃসাহসী ভটকাই জিজ্ঞেস করল ঋজুদাকে।

গদাধরদা এসে দাঁড়াতেই ঋজুদা বলল, আরেক কাপ করে চা খাওয়াবে না গদাধরদা আমাদের?

নিঃচ্চয়।

বলল গদাধরদা। বলেই, চলে যাচ্ছিল। ঋজুদা বলল, শোনো, সঙ্গে একটু চিজ-ও দিও। হট-ব্রেড থেকে এনেছিলাম যে সকালে। ওদের জন্যই তো এনেছিলাম।

গদাধরদা বলল, আর চিকেন পেটিস?

ঋজুদা। তুমি চেপে যাচ্ছিলে।

দুঃসাহসী অসভ্য ভটকাই আবার বলল।

ঋজুদা হেসে বলল, আমার কী? আজেবাজে জিনিস খেয়ে পেট ভরা। তোদের জন্য আজ গদাধরদা কী রাঁধছে জানিস ডিনারে?

কী?

তোরাই জিজ্ঞেস কর।

আমি বললাম, কী গো গদাধরদা! খোলসা করে বলবে তো। আগে তো আমরা আসতেই নিজেই গড়গড় করে মেনু বলে দিতে।

সে তোমরা দু’জনে যখন আসতে, মানে তুমি আর তিতির। এই ভটকাই দাদা তো একাই সব কথা বলে, অন্যে কী বলবে।

ভটকাই বলল, ছিঃ। ছিঃ। উ্য টু বুটাস!

গদাধরদা বলল, চিকেনের মোমো, ভেটকি স্যালাড, হোয়াইট সস দিয়ে, আর পর্ক-এর গুলাশ।

এখানকার শুয়োর নয়। অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার বন্ধু স্টিভ পাঠিয়েছে জাহাজে করে। গুলাশটাও হাঙ্গেরিয়ান স্টাইলে রান্না। হাঙ্গেরিয়ান কনসাল অমিয়দার কুক-এর কাছে গিয়ে শিখে এসেছে তোদের খাওয়াবে বলে। গুলাশ’ অবশ্য বিফ-এরই ভাল হয়। তা হিন্দুর ছেলেমেয়েদের জাতটা গদাধরদা নিজে হাতে মারতে রাজি নয়।

কে অমিয়দা? ঋজুদা?

আরে অমিয় গুপ্ত। কলকাতার শেরিফ ছিলেন না? বেঙ্গল ইনিসিয়েটিভ-এর চেয়ারম্যান।

ও।

মহা বিজ্ঞর মতো বলল, ভটকাই।

কোন স্টিভ ঋজুদা? স্টিভ ওয়া?

তিতির বলল।

আজ্ঞে না। ওয়া নয়। স্টিভ হলেই কি ওয়া হতে হবে?

গদাধরা চলে গেলেই আমি আর তিতির বললাম, ঋজুদা শুরু করো আর ভটকাই দয়া করে চুপ করো।

হ্যাঁ। সেই কারণেই নাজিম সাহেব সুব্রতকে নিয়ে তিতিরবটের মারার জন্যে উলটোদিকের টাঁড় আর ঝাঁটিজঙ্গলের দিকে চলে গেলেন। আমি আর গোপাল গিয়ে ঢুকলাম ওল্ড চাতরা রোড-এ, যেপথে সেবারে কাক-ভভারে পিপ্পাল পাঁড়ের দেখা পেয়েছিলাম আমরা।

ছাড়াছাড়ি হওয়ার সময়ে গোপাল বলল, আমাদের ফিরতে রাত হবে। খাসির উমদা বিরিয়ানি, মধ্যে বটি কাবাব দেওয়া আর তিতিরের রোস্ট যেন রেডি থাকে নাজিম সাহেব। আমরা ডাকাত শিকারে যাচ্ছি। বহতই পরিশ্রম করে ফিরব।

আর না ফিরলে?

আমি বললাম, শোকসভার বন্দোবস্ত করবেন। ইয়াগারির।

বলেই, আমি আর গোপাল ওই রাস্তাতে ঢুকে পড়লাম। গোপাল বন্দুকের ক্ল্যাম্পে টর্চটা ফিট করে নিল। আমার টর্চটা জার্কিনের বাঁ পকেটে ছিল। ডান পকেটে ছ’টা গুলি। সবই এল. জি। দু’ ব্যারেলে দুটো পোরা আছে। আমরা কিছুই শিকার করব না। বাঘই দেখি আর হরিণ কি পাখি, গুলির শব্দ করব না। আমরা পিপ্পাল পাঁড়ের খোঁজেই যাচ্ছি। মনে মনে আমি আর গোপাল ঠিক করেছিলাম।

তারপর? বলল ঋজুদা। আমার শুনতেই হাত ঘেমে যাচ্ছে। ওই বয়স থেকেই তুমি আর তোমার বন্ধুরা কীরকম ডেয়ার-ডেভিল ছিলে। ভাবলেও ভয় করে।

তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, কেন? তোরাই বা কি কম ডেয়ার-ডেভিল? স্কুলে পড়তে পড়তেই তো রুদ্র, তুই আর ভটকাইও আমার সঙ্গে দেশ-বিদেশ কম জায়গাতে জীবন বিপন্ন করিসনি? যারা পারে, তারা পারে প্রথম থেকেই।

বলল, তারপরে।

আমি বললাম।

সেই রাস্তাটা ব্যবহার হয় না। গাড়ি বা বাস কিছুই চলে না। কখনও-সখনও চোরাশিকারিরা জিপ নিয়ে এসে ঢেকে রাতে। তাও ডাকাতের ভয়ে আজকাল তারাও আসে না। প্রাণ যাবার ভয় তো আছেই, বন্দুক-রাইফেলও বেহাত হয়ে যাবে। বন্দুক-রাইফেল বেহাত হওয়ার হ্যাঁপা প্রাণ যাওয়ার হ্যাপার চেয়েও অনেকই বেশি।

মাঝে মাঝেই ঘাস গজিয়ে গেছে। জঙ্গল দখল নিয়েছে। পথের দুপাশ থেকে জঙ্গল এগিয়ে আসছে পথকে গ্রাস করে। উপরেও গাছগাছালির ডালপালার চাঁদোয়া। তারই ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে বিদায়ী সূর্যের আলোতে লাল হয়ে-যাওয়া আকাশের টুকরো-টাকরা দেখা যাচ্ছে। একটা কোটরা হরিণ খুব ভয় পেয়ে ডাকতে ডাকতে ডানদিকের জঙ্গলের গভীরে দৌড়ে গেল। ময়ূর ডেকে উঠল কেঁয়া-কেঁয়া করে, বুকের মধ্যে চমক তুলে। দুর থেকে বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটে হুতুম প্যাঁচা দুরগুম দুরগুম দুরগুম করে ডেকে উঠল। আস্তে আস্তে পাখ-পাখালির স্বর, কলকাকলি, স্তিমিত হয়ে আসছে। অন্ধকার নেমে আসছে, আর সঙ্গে সঙ্গে শীতের প্রকোপই বাড়ছে।

টর্চ না-জ্বালিয়ে যেতে পারলেই ভাল ছিল। টর্চ জ্বাললেই দূর থেকে তা দেখা যাবে। কোথায় পিপ্পাল পাঁড়ের পাহারাদার বা স্নাইপার ঘাপটি মেরে আছে তা কেজানে!

আধমাইলটাক যেতেই বনের মধ্যে থেকে মনে হল যেন সামনে জঙ্গল কিছুটা জায়গাতে ফাঁকা হয়ে এসেছে। হয়তো কখনও বনবিভাগ কপিস-ফেলিং করেছিল। অন্ধকার সুড়ঙ্গর বাইরের দিকে এগোলে যেমন আলোর আভাস চোখে পড়ে প্রথমে, তারপর ক্রমশ আলো বাড়তে থাকে, সেই সুড়ঙ্গেরই মতো অন্ধকার পথের মধ্যে দিয়ে যথাসাধ্য নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে যেতে তেমনই মনে হল আমাদের।

অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এলাকাতে পৌঁছবার আগে আমরা গাছের নীচের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সামনে এবং ডাইনে-বাঁয়ে ভাল করে নজর করে দেখলাম। তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। তবুও আমরা পথের দুপাশে দু’জনে অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে রইলাম। চোখ যখন দেখে না, তখন কান শুনলেও শুনতে পারে।

মিনিট তিন-চার অমন দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ যেন শুনতে পেলাম যে দূরে একজন মানুষ খুব জোরে জোরে কাশছে। অনেকক্ষণ ধরে কাশল মানুষটি। এদিকে কোনও গ্রাম আছে বলে শুনিনি। দেখাও যাচ্ছে না কোনও গ্রামের চিহ্ন। এই গভীর জঙ্গলে পরিত্যক্ত পথের পাশে একলা মানুষ কী করতে আসতে পারে সবরকম জানোয়ারে-ভরা এই গভীর জঙ্গলে? আর ডাকাত তো আছেই!

গোপাল আর আমি ফিসফিস করে পরামর্শ করে আরও মিনিট দশেক ওখানে অপেক্ষা করব ঠিক করে পথের পাশের একটি শিলাস্তৃপের পাথরের উপরে বসলাম। পাথর নয়তো বরফের চাঙর। পেছন জমে গেল। ইতিমধ্যেই শিশির পড়তে শুরু করেছে।

আরও দশ মিনিট অপেক্ষা করলে কেন?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

করলাম, কারণ তখনও পশ্চিমাকাশে যদিও লাল মুছে গেছিল, অস্পষ্ট সাদাটে ভাবটা ছিল, পিপ্পাল পাঁড়ের কোনও স্কাউট কোনও গাছের উপরে মাচাতে যদি বসে থাকেও, পুরো অন্ধকার হয়ে গেলে সে বা তারা আমাদের অত সহজে দেখতে পাবে না। আমরাও তো শিকারি। সবরকম সাবধানতা নিয়েই আমরা এগোব। যে ঝুঁকি এড়ানো যায়, তা এড়ানো গেলে, এড়ানোই ভাল। জেঠুমনি সবসময়েই বলতেন।

গাঢ় অন্ধকার নেমে এলে আমরা দুজনে ছাড়াছাড়ি হয়ে খুব সাবধানে এক পা এক পা করে, যেদিক থেকে কাশি শুনেছিলাম সেই দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। খুবই আস্তে আস্তে। শিশির পড়তে শুরু করেছে তাই শুকনো পাতার উপরে পা পড়ায় তখন আর মচমচানি উঠছে না।

তারপরে?

তিতির বলল।

ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ মিটার এগিয়ে যাওয়ার পরে এক বিপদের সূত্রপাত হল। একটি ল্যাপউইঙ্গ, এদিকে ইয়ালো-ওয়াটেলড ল্যাপউইঙ্গই বেশি, অন্ধকারে তো আর ডানার রং চেনার উপায় ছিল না, হট্টিটি-হুঁট, হট্টিটি-হুঁট করে আমাদের মাথার ওপরে ডাকতে ডাকতে উড়তে লাগল। জঙ্গলের মধ্যে বা ফাঁকা জায়গাতে মানুষ বা শ্বাপদ চলাচল করলেই ওরা এমন করে ডেকে বনের প্রাণীদের সাবধান করে যে দেয় তা তো তোরা জানিসই। বনের প্রাণীদের সাবধান করে করুক কিন্তু পিপ্পাল পাঁড়েও যে সাবধান হয়ে যাবে, সেই ছিল বিপদ।

তারপর? তোমরা কী করলে?

আমরা থেমে গেলাম। কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে গেলাম যেখানে যে ছিলাম।

মনে হল, যেদিক থেকে কাশির শব্দ শুনেছিলাম সেদিক থেকে একাধিক মানুষের অস্পষ্ট কথাবার্তাও ভেসে আসছে। আরও একটু এগোতেই বোঝা গেল ওই দিকে একটি দোলা মতো জায়গা আছে। সেখানে জলও নিশ্চয়ই আছে। সেখানে আগুন জ্বালিয়েছে কারা যেন।

আমরা খুব সাবধানে সেদিকে এগোতে লাগলাম লেপার্ড-ক্রলিং করে। ওই শীতেও পরিশ্রমে আর উত্তেজনায় আমাদের জামা ও মাথার চুল ভিজে গেল।

আরেকটু এগোতেই দেখি পাঁচ-ছ’টি মোষ এক জায়গাতে শুয়ে-বসে জাবর কাটছে আর একজন মানুষ তাদের সামনে আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করছে। পাছে বাঘ এসে হামলা করে। এই আগুন মোষেদের নিরাপত্তার জন্যে।

আর যাই হোক, এরা সম্ভবত ডাকাত নয়, মনে হল আমাদের।

লোকটি জড়ো করা শুকনো ডালে আগুন জ্বালতেই সেই আগুনে সে আমাদের দুই মূর্তিমানকে দেখতে পেল। পেয়েই, ভয়ের চোটে চেঁচিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় জনাদশেক মানুষ আমাদের দিকে এগিয়ে এল। তাদের দুজনের হাতে জ্বলন্ত কাঠ ছিল, অন্য সকলের হাতেই টাঙ্গি। মশালের মতো জ্বলন্ত কাঠ হাতে করে তারা এগিয়ে এল। টাঙ্গির ইস্পাতের ফলাগুলো মশালের আগুনে ঝকঝক করে উঠল।

আমাদের হাতে বন্দুক দেখে তারা অবশ্য একটু ঘাবড়ে গেল। ভাবল হয়তো, বাঘের রাজ্যে এই ঘোগরা আবার কারা?

তারপর?

গোপালই তাড়াতাড়ি বলল, বুদ্ধি করে, তিতির মারতে ঢুকেছিলাম টুটিলাওয়াসীমারিয়ার সড়ক ছেড়ে এই বনে। পথ ভুলে গেছি। টুটিলাওয়াতে যাব কোন পথে?

ওরা বলল, আইয়ে আইয়ে খোকাবাবুলোগ, জারা বৈঠকে যাইয়েগা। ঠাণ্ডা বহতই হ্যায়।

তারপর বলল, আমরা তো এখানে থাকি না। আমরা থাকি চান্দোয়া-টোড়িতে। কাল থেকেই গাছ কাটব। আমরা সব কাঠুরে। কাঠ কেটে টুকরো করে মোষের গাড়িতে লাদাই করে চান্দোয়া-টোড়িতে নিয়ে যাব। সেখানে ঠিকাদারের কাঠ-চেরাই কল আছে। আবার ফিরে আসব। আজই আমরা এসে পৌঁছেছি। কালকে পাতার ঘর বানিয়ে নেব। আজ রাতটা আগুনের পাশে বসেই কাটাতে হবে।

তারপর বলল, আপনারা কি খাবেন কিছু?

কী খাব?

আমরা গরিব লোক বাবু। রাতে আমরা শুখা-মহুয়া সেঁকে খাব একটু নুন দিয়ে।

একজন বলল, আমার কাছে একটু ছাতু আছে। চানার ছাতু।

তোমরা দিনে ক’টাকা মজুরি পাও?

একট টাকা হুজৌর। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি কাজ। যাদের মোষের গাড়ি আছে তারা গাড়ি ভাড়া পাবে চব্বিশ ঘণ্টাতে দু’ টাকা। তাদের গাড়ি চালানো ও কাঠ লাদাই করার মজুরিও তারই মধ্যে।

তোমাদের এই ঠিকাদারের নাম কী?

তাঁর নাম মালদেও পাণ্ডে। তিনি মস্ত বড়লোক হুজৌর। চান্দোয়া-রাঁচি-ডালটনগঞ্জ লাইনে তাঁর বাস চলে। ঘোড়া আছে। রংদার দোতলা মোকান।

এখানে যে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের রাজত্ব তা কি তোমরা জানো?

তা জেনেই তো আসা! যদি পাঁড়েজির সঙ্গে মোলাকাত হয়ে যায় তো আমাদের কপাল ফিরে যাবে।

কেন?

পাঁড়েজির বড় দয়া গরিবদের উপরে। নিজেও তো গরিবেরই ছেলে। অত্যাচারিত। দেখা হলেই উনি আমাদের অনেক টাকা-পয়সা দেন। আমাদের অভাব-অভিযোগের কথা মন দিয়ে শোনেন।

তোমাদের ঠিকাদার মালদেও পাণ্ডে পিপ্পাল পাঁড়ের কথা জানে কি?

জানে বইকী। জানে বলেই তো নিজে না এসে আমাদের লাগিয়েছে। জানে বলেই তো জান-এর ভয়।

তোমরাও তো ডাকু বনে যেতে পারো। ভাল খাবে, ভাল পরবে।

আমি বললাম।

ওদের মধ্যে বয়স্ক যে নেতা গোছের মানুষটি, সে হাসল। বলল, হাঃ! আমাদের কি সেই হিম্মৎ আছে বাবু! ডাকু কি ইচ্ছে করলেই কেউ হতে পারে! ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের বয়স মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ। এইরকম মালদেও পাণ্ডেরই মতো এক জঙ্গলের ঠিকাদার তার বাপকে খুন করেছিল, দিদিকে আর মাকে পুড়িয়ে মেরেছিল। তারপরই না, পালিয়ে বাঁচা পিপ্পাল পাঁড়ে ডাকু হয়ে যায়। তার মাথার উপরে দশ হাজার টাকা ইনাম। তবু সরকার তাকে ধরতে পারছে না। তবে একদিন তো ধরা সে পড়বেই। জ্যান্ত আর মৃত। কতদিন লড়বে সরকারের বিরুদ্ধে?

ধরাই যদি পড়বে তবে ডাকু হল কেন?

হল, আমাদের মতো জন্মদুখি মানুষদের চোখে একটু স্বপ্ন জাগাতে, যুগ যুগ ধরে এই সব অত্যাচারী জমিদার আর পয়সাওয়ালাদের এই গোলামি করা যে ঠিক নয়, সেই কথা বোঝাতে।

আরেকজন বলল, আমরা তো মানুষ নই হুজৌর। আমরা জানোয়ার। নইলে এত কষ্ট সয় আমাদের! পিপ্পাল পাঁড়ে কী করে মাথা উঁচু করে মানুষের মতো বাঁচা উচিত তাই শিখিয়ে দিল আমাদের। আমরা যদি নাও পারি এই দাসত্বর বাঁধন ছিঁড়তে, আমাদের ছেলেমেয়েরা হয়তো ভবিষ্যতে পারবে। এই বা কম কী!

তোমরা পিপ্পাল পাঁড়েকে দেখেছ?

দেখব না কেন? সে তো আমাদেরই ছেলে। বাচ্চা ছেলে। কিন্তু আমাদের প্রণম্য। আমরা প্রার্থনা করি ভগবানের কাছে যে আমাদের ঘরে ঘরে একজন করে পিপ্পাল জন্মাক।

তারপর ওদের মধ্যে একজন বলল, আপনারাও তো ছেলেমানুষ, খোকাবাবু, আপনারাও দেখছি বহুত হিম্মৎদার। এই বয়সি ছেলেদের এমন জঙ্গলে রাতের বেলা ঘুরে বেড়াতে দেখিনি কখনও, যদিও আমরা জঙ্গলেরই মানুষ। অবশ্য আমাদের কাছে তো বন্দুক থাকে না।

গোপাল বলল, অত্যাচারের নানা রকম হয় চাচা। শহরেও আমাদের উপরে অত্যাচার করার লোকের অভাব নেই। গরিব বড়লোক শব্দগুলোর মানেও এক এক জায়গাতে একেক রকম। অত্যাচার, অন্যায়, সব জায়গাতেই আছে, থাকে, তবে তাদের চেহারা আলাদা আলাদা এই যা।

আমি বললাম, তা ছাড়া হিম্মৎ ব্যাপারটা তো পিপ্পাল পাঁড়ের কাছ থেকে শেখবারই। আমাদের আপনারা একবার তার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পারেন?

ওরা একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।

তারপর সেই সর্দার-মতো মানুষটি বলল, তার রাহান-সাহান সে যে নিজেই জানে না। খোঁজ লাগাতে হবে। আপনারা কোথায় আছেন?

আমরা উঠেছি ইজহারুল হক-এর বাড়ি টুটিলাওয়াতে।

ওরা এবার চনমনে হয়ে উঠল।

একজন বলল, তাঁরাও তো বহতই অত্যাচারী।

আরেকজন বলল, ইজাহার সাহেব মানুষ ভাল। তাঁর পূর্বপুরুষেরা খারাপ ছিলেন। তারপর বলল, ওখানেই নাকি হাজারিবাগের পুলিশ সাহেবের ছেলে এসে উঠেছিল। আপনারা, মানে আপনাদের মধ্যে কি…।

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না না, আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। আমার এই বন্ধুর বাবার বাড়ি আছে হাজারিবাগ শহরে, গয়া রোডে। পুলিশ সাহেবের ছেলে এসেছিল ঠিকই, তবে সে তত আজই বিকেলে চলে গেছে ফিরে।

এই সরল মানুষগুলোর কাছে মিথ্যেকথা বলতে ভারী ঘোট লাগছিল নিজেকে। কিন্তু কী করা যাবে। সুব্রতকে তো বাঁচাতে হবে।

যদি চলে গিয়ে থাকেন তো বেঁচে গেছেন হুজৌর। আমরা শুনেছি যে পিপ্পাল পাঁড়ে পুলিশ সাহেবকে ‘শিখলাবার জন্যে তাঁর ছেলেকে গুম করে দেবে বলে, ঠিক করেছিল। তা করলে, আমাদের সকলেরই বিপদ হত হুজৌর। পিপ্পালের তো কিছু হবে না।

কেন? তোমাদের কীসের বিপদ?

তার কাছে ঘেঁষা তো পুলিশের কর্ম নয়। পুলিশ পড়বে হাতিয়ারহীন, গরিব, অসহায় আমাদেরই উপরে। কত রকম অত্যাচার যে হবে! পিপ্পাল আর কতজনকে বাঁচাবে? তাই আমরা সেই কথাই আলোচনা করছিলাম। পুলিশ সাহেবের বেটা যত তাড়াতাড়ি পুলিশ সাহেবের বাংলোতে ফিরে যায়, ততই তার মঙ্গল, আমাদেরও মঙ্গল।

গোপাল বলল, সে চলে গেছে।

তারপর বলল, কালকে আমরা আবার আসব. দিনের বেলাতেই। পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে দেখা কি হবে?

আপনারা মানে?

মানে, আমরা দুজন।

কাল এলে কী করে হবে? খোঁজ তো লাগাতে হবে। সে তো কখনওই দু’রাত কোনও এক জায়গাতে থাকে না।

কাল ছেড়ে পরশু আসুন বরং দিনের বেলাতে। তবে খালি হাতে আসবেন।

বন্দুক-টন্দুক নিয়ে আসবেন না। আর একথা কারওকে বলবেন না। কারওকেই। তাহলে কিন্তু পিপ্পাল আমাদেরই খতম করে দেবে।

আমি বললাম, আমরা অত নীচ নই। তাই আসব আমরা পরশু, দিনের বেলাতে।

গোপাল ন্যাকামি করে বলল, এখন পথ চিনে ফিরে যাই কী ভাবে?

সেই সর্দার একজনকে বলল, এই গাঙ্গেয়া, একটা জ্বলন্ত কাঠ হাতে নিয়ে খোকাবাবুদের পথটা দেখিয়ে দিয়ে আয়।

বারবার খোকাবাবু বলাতে আমাদের রাগ হয়ে যাচ্ছিল।

লোকটার গায়ে একটা ছেঁড়া ফতুয়া, পরনে মোটা খেটো ধুতি। পায়ে টায়ার-সোলের চটি। একবেলা খেতে পায়। এই আমার দেশের গড়পড়তা মানুষ। আর আমাদের ফুটানির শেষ নেই। তাও আমাদের আরও চাই, আরও চাই।

ভাবছিলাম, আমি।

তারপরে?

ভটকাই আর তিতির সমস্বরে বলল।

আর কী? পথ তো আমরা জানতামই। গাঙ্গেয়া আমাদের সঙ্গে কিছুটা আসার পরই আমরা বললাম, বুঝতে পেরেছি। আমাদের সঙ্গে টর্চ আছে, ঠিক চলে যাব। তোমার কাঠ নিভে গেলে এই বাঘের জঙ্গলে তোমারই ফিরতে অসুবিধে হবে তুমি ফিরে যাও।

ও বলল, পররনাম হুজৌর।

আমি আমার মানিব্যাগ খুলে, জন্মদিনে জেঠুমনির দেওয়া যে একশো টাকার নোটটি সযতনে ইনস্যুরেন্স-এর মতো রেখে দিয়েছিলাম গত ন’মাস ধরে, সেটা গাঙ্গেয়ার হাতে দিয়ে…

দিতেই সে ভীষণ প্রতিবাদ করে উঠল।

আমি বললাম, আগামীকাল তোমরা সকলে ডাল আর ভাত খেয়ো।

গাঙ্গেয়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল খুশিতে।

বলল, সকালে ফরেস্ট-গার্ড আসবে মার্কামারা গাছ দেখিয়ে দিতে। তারপরই কাজ শুরু হবে। সকালে নয়, আমরা রাতে খাব। মাটির হাঁড়িতে ডাল-ভাত ফুটিয়ে নেব। শুধু ডাল-ভাতই নয় মহুয়াও খাব, নাচব, গাইব। আপনারা কি আসবেন?

গোপাল বলল, দেখি।

গাঙ্গেয়া ফিরে গেলে আমরা টর্চ জ্বেলেই চাতরার পুরনো পথ দিয়ে ফিরে যেতে লাগলাম। অনেকক্ষণ কোনও কথা সরল না আমাদের মুখে।

আমি বললাম, ওরা কি রোজ ভাত খায় না?

রোজ? কী বলল তুমি! বিয়ে-চুড়োতে খায়।

আর ডাল?

ডালও তো বিলাসিতা। বাজরা বা মকাই-এর রুটি খায়। সরগুজার তেল দিয়ে কখনও কিছু তরকারি রাঁধে। বনের মূল ও ফল খায়। শুকনো মহুয়া। পশুর জীবনের সঙ্গে ওদের জীবনের বিশেষ তফাত নেই ঋজু।

আমি চুপ করে পথ চলতে লাগলাম।

ফিরে গিয়ে কী কী উমদা খাবার খাব আমরা, তাই ভাবছিলাম।

ভাবছিলাম, একশো টাকা দিয়ে একদিন ডাল-ভাত খাওয়ালেই এদের সমস্যার কোনও সুরাহা হবে না। যেদিন আমার দেশের সব মানুষ দু’বেলাই ডাল-ভাত খেতে পারবে, সেদিন যত তাড়াতাড়ি আসে, ততই ভাল। এদের জন্যে অশিক্ষিত ডাকু পিপ্পাল পাঁড়েও যেমন ভাবছে, আমাদের সকলেরও ভাবতে হবে। আমরা দেশের কতজন? এরাই তো আসল দেশ, আসল ভারতবর্ষ। যতদিন এদের অবস্থা না ফিরছে ততদিন দেশ একটুও এগোতে পারবে না।

গোপাল বলল, সুব্রতকে আজ রাতারাতিই হাজারিবাগে ফেরত পাঠাতে হবে।

আর আমরা?

আমরা থেকে যাব। দেবদর্শন করে দেবতাকে প্রণাম করে তারপরই ফিরব।

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।

কথাটা আমার মনে পড়ে গেল। জেঠুমনি প্রায়ই বলতেন এই লাইন দুটি, গায়ত্রী মন্ত্রেরই মতো।

ভটকাই বলল, তাতো হল কিন্তু তুমি তো বাঘটার কথা আর কিছুই বললে না, তাকে টপকে চলে গেলে ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের কাছে। অতবড় বাঘটা মারতে না পেরে আপসোস হচ্ছিল না।

হচ্ছিল। আবার হচ্ছিলও না। বাঘটা কেন মারলাম না তাতো তোদের বলেইছি। সব শিকারিদের দলেই একজন করে মহম্মদ নাজিম থাকলে দেশ থেকে। আজ কি বাঘ লোপ পেতে বসত!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *