দুই
ও হ্যাঁ। অ্যালবিনো বাঘ শিকারের নেমন্তন্ন পেয়ে যখন গেছিলাম গাড়িতে মুলিমালোয়াতে।
হাজারিবাগ জেলাতেই গেছিলি। শহরে তো আর থাকিনি।
তা অবশ্য থাকিনি। পাস করেছিলাম।
হাজারিবাগ শহরের মতো সুন্দর শহর ছোটনাগপুরে বেশি নেই। সুন্দর এখনও আছে, তার কারণ রেললাইন এখনও পৌঁছয়নি সেখানে। পুব দিক থেকে হাজারিবাগ রোড স্টেশনে নেমে সারিয়া হয়ে নবাব শের শাহর গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড পৌঁছে, বগোদর হয়ে হাজারিবাগে আসা যাবে গাড়িতে বা বাসে। আর কোডারমা স্টেশনে নেমে, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের বরহি থেকে ঝুমরি-তিলাইয়া ও তিলাইয়া ড্যাম হয়ে হাজারিবাগ ন্যাশনাল পার্ক-এর পাশ দিয়ে, পদ্মার রাজার বাড়ির পাশ দিয়েও এসে পৌঁছনো যায়। ওপথে দূরত্ব খুবই কম। আবার রাঁচি হয়েও আসা যায়। রাঁচি-হাজারিবাগ রোড হয়ে, রামগড় পেরিয়ে। ওপথে দূরত্ব অবশ্য বেশি পড়ে। কিন্তু তা হলেও, একবার পৌঁছতে পারলে সব পথকষ্ট উশুল।
হাজারিবাগের তিনদিকে তিন পাহাড়। কানহারি, সিলওয়াড় আর সিতাগড়া। এই সিতাগড়াতে যখন মানুষখেকো বাঘ বেরিয়েছিল তখন আমি, গোপাল আর সুব্রত, নাজিম সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে সেই বাঘ মারার জন্যে অনেক হরকৎ করেছিলাম। বাঘটা অবশ্য মেরেছিল সুব্রতই আমরা হাজারিবাগ থেকে কলকাতাতে চলে আসার পরে। একটা গোরু মেরেছিল বাঘটা। সুব্রত আর ইজাহারুল হক দু’জনে শাল গাছে মাচা বেঁধে বসেছিল দিনে দিনেই। সেই বাঘ মারার গল্প আছে ‘সিতাগড়ার মানুষখেকো’তে।
যা বলছিলাম, আমি গোপাল আর নাজিম সাহেব, আঙ্গুর বাবা নাজিম সাহেব, ইজাহারুল-এর জমিদারি টুটিলাওয়াতে গেছিলাম শিকারে। সেবারে গিয়ে শুনলাম পুরো এলাকা জুড়ে একজন ডাকাত দৌরাত্ম্য করছে গত দু’মাস ধরে। তার বাড়ি নাকি গয়া জেলার হান্টারগঞ্জে। টোপি-পরানো গাদা বন্দুক দিয়ে সে শিকার করে বেড়াত হান্টারগঞ্জ জৌরি-সিজুয়াহারা থেকে ওদিকে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড-এর উপরের ডোভি আর তার থেকে এদিকে চাতরা, এমনকি বাঘড়া মোড় পর্যন্ত।
এত জায়গার নাম বললে যে, সবই গুলিয়ে গেল।
আমি বললাম।
আচ্ছা দাঁড়া, ওই প্যাডটা আন, একটা ম্যাপ এঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
ভটকাই টেবল থেকে ঋজুদার নিজের আঁকা লেটারহেড সমেত চিঠি লেখার প্যাডটা নিয়ে গেল আর কলমদানিটা। ঋজুদার কলমদানিতে রোজ কলম বদল হয়, ফুলদানিতে যেমন ফুল। কম করে গোটা দশেক নানারকম নানাদেশি কলম থাকলে এক লাইনও লিখতে পারে না ঋজুদা। চিঠিও না। পৃথিবীর সব কলমই আছে ঋজুদার কাছে। ইংলিশ ওয়াটারম্যান, আমেরিকান পাকার এবং শেফার্স, জাপানি পাইলট, সুইস সারানডাশ, যুগোশ্লাভিয়ান হার্টিগ, জার্মান পেলিকান এবং ম ব্লাঁ। তবে ম ব্লাই সবচেয়ে প্রিয় ঋজুদার। কলমদানি থেকে মেরুন-রঙা একটি ম ব্লা কলম তুলে নিয়ে মোটা নিব দিয়ে ঋজুদা লম্বা লম্বা টানে একটা ম্যাপ এঁকে নীচে নীচে জায়গাগুলোর নাম লিখে আমাদের দিকে এগিয়ে দিল।
ততক্ষণে ভটকাই ফিরে এসেছে নীচে ঋজুদার ড্রাইভার কাম-ম্যানেজার কাম-ক্যাশিয়ার মাধবদাকে পান আনতে বলে দিয়ে। ভটকাইও দেখল ম্যাপটা মনোযোগ দিয়ে। তারপর আজ্জু মিঞার দিকে এগিয়ে দিল। ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, আঙ্গুর এসব জায়গা নখদর্পণে। ও নাজিম মিঞার ছেলে। বাবার সঙ্গে সাত বছর বয়েস থেকে ও শিকারে যাচ্ছে।
ভটকাই লজ্জিত হয়ে বলল, সরি, সরি, মিঞাসাহেব।
এবারে বলো। ম্যাপ দেখা হয়েছে আমাদের। তিতির বলল।
ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের বয়স তখন পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। আমার আর গোপালের বয়সও তখন কুড়ির নীচে। গোপাল আর সুব্রত আমার চেয়ে এক দেড় বছরের বড় ছিল। সুব্রতর বাবা শ্রী সত্যচরণ চ্যাটার্জি তখন হাজারিবাগ জেলার পুলিশ সাহেব। চেহারাও তেমন ছিল। লম্বা-চওড়া, ইয়া-ইয়া গোঁফ। তখন ঘোড়ায় চড়ে ইনসপেকশানে যাবার দিন চলে গেছে। জিপে করেই যেতেন। তখন হাজারিবাগ জেলার এলাকা ছিল বিরাট। পুরোটাই জঙ্গল-পাহাড়ময়।
এ কথা শুনে আমরা খুবই উত্তেজিত হলাম যে আমাদের চেয়ে বয়সে সামান্য বড় একটা দেহাতি ছেলে পুরো জেলা কাঁপিয়ে দিয়েছে ডাকাতির পর ডাকাতি করে। আর শুধু হাজারিবাগ জেলাই তো নয়, গয়া জেলাতেও তার আধিপত্য। এমনকি যার নামে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায়, সেই চ্যাটার্জি সাহেব এস. পি. ও লবেদম হয়ে যাচ্ছেন ওইটুকু পুঁচকে ছোঁড়াকে ধরতে।
আমরা যদি পিপ্পাল পাঁড়েকে ধরতে পারি তো পটনার সব কাগজে ছবি পর্যন্ত বেরোবে এবং সরকার থেকে ইনাম তো মিলবেই।
গোপাল উত্তেজিত হয়ে বলল।
ইনাম মানে কী?
ভটকাই বলল।
আরে! হিন্দি ছবির পোক ইনাম মানেও জানো না?
তিতির বলল।
পোক মানে? কী সব খারাপ ভাষা ব্যবহার করছ মেয়ে হয়ে!
পোক মানে, পোকা।
অ। তবে আমি জানি ইনাম মানে কী।
তবে জিজ্ঞেস করলে যে?
রুদ্র জানে কিনা পরখ করছিলাম।
আমি বললাম, আবার শুরু করলি ভটকাই।
এমন সময়ে মাধবদা পান হাতে এসে ঢুকল। চালু ভটকাই পাছে আবার উঠতে হয় দরজা খুলতে তাই দরজাটা ভেজিয়েই রেখেছিল।
আরে গদাধরকে পানটা দাও মাধব। রুপোর রেকাবিতে একটু আতরজল ছিটিয়ে এনে দেবে। ওপরে ভিজে মলমল-এর ঢাকনিও দিয়ে দেয় যেন। নইলে পান তো শুকিয়ে যাবে। সব পান তো আর এখুনি খাবে না আজ্জু।
হায়! হায়! ইন্তেজামকি কোঈ কম্মি নেহি।
আজ্জু মহম্মদ, তারিফ করা গলাতে বলল ঋজুদাকে।
ঋজুদা পাইপে এক টান লাগিয়ে বলল, না হোগা কেইসে? ম্যায় তো তুমহারা আব্বাকা চেলাই না হ্যায়। ইয়ে সব খাতিরদারি তারিকা তো উনোনেই শিখলায়া হামলোগোঁকো। আহ! ক্যা জিন্দাদিল, মনমৌজি আদমি থে তুমহারা আব্বাজান। তুমলোগোঁনে কুছ নেহি হো উনকি সামনা।
ম্যায়নে থোরি বোলা কভভি যো, ম্যায় আব্বাকি বরাবর হু।
বলল, মিঞাসাহেব।
বলো ঋজুদা, থামলে কেন?
ভটকাই ডিরেইলড ট্রামকে লাইনে ফেরাল।
আমরা পৌঁছবার পরদিন বিকেলে সুব্রতও এসে পৌঁছল। পুলিসের জিপে করে। সঙ্গে আজাহারও। আজাহার ওরও বন্ধু ছিল। গোপালের তো ছিলই।
নাজিম সাহেব, তাঁর ডিপারে-দেওয়া হেডলাইটের মতো বড় বড় চোখ দুখানি জ্বেলে দিয়ে বললেন, লাও! আভভি তো খাই বন গ্যয়া।
কেন?
তিতির জিজ্ঞেস করল ঋজুদাকে।
আরে! ডাকাত যদি একবার জানতে পারে যে, পুলিশসাহেব, যিনি ডাকাতের খুপড়ি নিজে হাতে উড়িয়ে দেওয়ার জন্যে প্রায়ই চাঁদমারিতে গিয়ে রিভলভারের হাত আরও ভাল করছেন, তাঁরই বড় ছেলে এই জঙ্গলে ডাকুর সঙ্গে টকরাতে এসেছে, তাহলে সুরবোহোর দারুণই বিপদ। সঙ্গে আমাদেরও। আমরা যদি বলি যে, আমরা ভাল্লুকের আর বাঘের সঙ্গে খেলতে এসেছি, ওর সঙ্গে খেলব না তবে কি ও ছাড়বে? বলবে, ফিক্সচারে এ ম্যাচ থাক আর না থাক খেলতেই হবে। ইয়ে তো সাচমুচহি খাতরা কি বাত ইয়ার! সুরবোতোকে যদি ও ধরে নিতে পারে তবে তো কেল্লা ফতে। ওকে জানে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে স্বয়ং পুলিশ সাহেবকে পর্যন্ত একেবারে ল্যাজেগোবরে করে দিতে পারবে তখন পিপ্পাল পাঁড়ে।
সুরবোতোটা আবার কে?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
আজ্জু মহম্মদ বলল, খোকাবাবুই থা সুরবোতো বাবুকি ঘরওয়ালা নাম।
আমরা হেসে উঠলাম।
ঋজুদা বলল,হাসবার কী আছে? ওরা বাপ-বেটাতে প্রথম দিন থেকেই সুব্রতকে সুরবোতোবাবু বলে। তিতিরের ছোট মামি যেমন উত্তেজিত হলেই দরজাকে দজরা জরদাকে ‘জদরা’ বলে। কী? বলে না?
তিতির হাসল। বলল, হ্যাঁ। ঠিক বলেছ। বলে।
তারপর?
ভটকাইও বলল, তারপর?
প্রথম দিন সারা সকাল আমি আর গোপাল টুটিলাওয়ার চারপাশের জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করে নালার বালিতে, পথের লাল ধুলোতে কোন কোন জানোয়ারের পায়েদাগ দেখা যায়, তা খুঁজে বেড়ালাম। টুটিলাওয়া যেন পাখিরই স্বর্গরাজ্য। ময়ূর, তিতির, বটের, কালি-তিতির, আসকল, পাকা বটফল খেতে-আসা ঝাঁকে ঝাঁকে বুনো সবুজ-পায়রা বা হরিয়ালে পুরো এলাকাটা ভর্তি। উড়ো-পাখিদের পায়ের দাগ অবশ্য মাটিতে পাওয়া যায় না, ময়ুর বটের বা তিতিরের যেমন পাওয়া যায়। কালি-তিতিরও ঝোপে বসে থাকে, মাটিতে অধিকাংশ সময়েই থাকে না। পায়ের দাগেই বুঝলাম মস্ত একদল শুয়োরও আছে। ধাড়ি-মাদিবাচ্চা মিলিয়ে প্রায় দেড়শো-দুশোর দল।
কাড়ুয়া আর আসোয়া দুই ভাই জঙ্গলের অন্য দিকটা সার্ভে করে ফিরে এসে বলল, শম্বর, নীলগাই, চিতল হরিণ, কোটরা তো আছেই তবে ভাল্ অর্থাৎ ভাল্লুকেরই আড্ডা ও জায়গাটা। সবসময়ে সাবধানে জঙ্গলে ঢুকবেন। তা ছাড়া চিতাও আছে এক জোড়া, বেশ বড়। আর বড় বাঘ একটা।
সুব্রত জিজ্ঞেস করল, কত বড়?
কাভুয়া বলল, মনে হচ্ছে সীতাগড়া বাঘের মতোই বড় হবে। বলেই নিজের কোমরের কাছে ডান হাতের পাতা ঠেকিয়ে বলল, বড়কা বাঘোয়া বাবু, ডাবল বাঘোয়া।
আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। কিংকর্তব্য? যে জঙ্গলে বাঘের হদিশ পাওয়া গেছে সে জঙ্গলে অন্য জানোয়ারের খোঁজ কোনও শিকারিই করে না।
তবে?
কাড়ুয়া বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হেসে বলল আমাকে, একঠো বড়কা শুয়ার পিটা দে ঋজুবাবু। মজা আয়ে গা।
গোপাল বলল, বানায়গা কাঁহা। মানে, রাঁধবে কোথায় শুয়োর?
কাহে? হিয়াই।
সুব্রত ধমকে বলল, ভ্যাট।
তারপর বলল, নাজিম সাব ঔর ইজাহার সাব ক্যা হারাম খাইয়ে গা?
সঙ্গে সঙ্গে ভুল বুঝতে পেরে, জিভ কেটে বলল কাতুয়া, তব জঙ্গলহিমে বানা লেগা। গাঁওওয়ালা ভি সব খায়েগা।
এই গ্রামে অধিকাংশই মুসলমানের বাস তবে হিন্দু একেবারেই নেই, তা নয়। মুসলমানেরা সব জায়গাতেই সংখ্যাতে জিওমেট্রিক প্রগ্রেশনে বাড়ে। তাই এতদিনে এখন হয়তো মুসলমান আর হিন্দুর অনুপাত ৪:১ হয়ে গেছে। কেয়ারে আজ্জু ভাই?
ঋজুদা শুধোল আজ্জু ভাইয়াকে।
সো, হোনে ভি শকতা।
আজ্জু মহম্মদ বলল।
কাড়ুয়া বলল, আর যদি কেউ নাও খায় তবে আমরাই রাম-লক্ষণ (কাতুয়া-আসোয়া) দু’ভাইয়ে সেঁটে দেব। পুরো শুয়োর।
কেন? আমরা কী দোষ করলাম? আমরা শুয়োর খেলে তো আর আমাদের হারাম’ হবে না।
গোপাল বলল।
তাই তো। রামচন্দ্রও তো বন্য বরাহ খেতেন। তা ছাড়া, জঙ্গলের শুয়োর ফল-মূল-জঙ্গলি কচু এসব খায়। তারা তো আর ধাঙ্গর বস্তির শুয়োরের মতো গু খায় না।
ভটকাই ফুট কেটে বলল।
ল্যাঙ্গোয়েজ! ল্যাঙ্গোয়েজ!
তিতির বলল।
গু-এর ইংরিজি কী? গু কে গু বলব না, তো কী বলব তবে?
জিনিসটাকে আরও নাড়িয়ে দিয়ে বলল, হতভাগা ভটকাই।
বাথরুম বললি না কেন?
আমি বললাম।
ইডিয়ট। বাথরুম কি খাওয়ার জিনিস? তোর তো বুদ্ধিই ওরকম।
ভটকাই রিটৰ্ট দিল।
তিতির বলল ভটকাইকে, বলতে পারতে পার্জিংস।
ফর্জিং? সে কি? সে তো হাওড়ার ঢালাই কারখানাতে হয়। ডাবু ধরে বসে থাকে একদল আর অন্য দল লোহা গলিয়ে ঢালে।
ভটকাই বলল অবাক হয়ে।
ধ্যাৎ। বললাম, পার্জিংস purgings শুনলি ফরজিং। তিতির বলল।
তারপরে বলল, বলতে পারতে night soil
নাইট-সয়েল মানে বুঝি গু?
আঃ ভটকাই। চেঞ্জ দ্য সাবজেক্ট।
ঋজুদা ধমক দিয়ে বলল।
তারপর গোপাল বলল, তাই হবে। আমরা জঙ্গলেই ক্যাম্প ফায়ার করে নদনদে চর্বি-ভরা সাকলিং-পিগ-এর বার-বি-কিউ করব। আর পরদিন pork vin daloo রাঁধব। বাজরার রুটির সঙ্গে জমে যাবে একেবারে।
বাঃ। বাঃ। ফাসক্লাস।
আমি বললাম। মানে, তোদের ঋজুদা বলল আর কী!
ঋজুদা তারপর একটুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে চুপ করে রইল। বোধহয় অনেক পুরনো কথা মনে পরে গেল তার। তারপর বলল তারিফের গলাতে, গোপালটা রাঁধত ভারি ভাল। আর দারুণ দারুণ সব মনগড়া নাম দিত ওর সব রান্নার। আমি ছিলাম দলের মধ্যে সবচেয়ে বড় অকর্মা। শুধু খেতে পারতাম আর তারিফ করতে পারতাম।
সেটাও তো খুবই দরকার। প্রশংসা না পেলে কোনও কাজই কি কারও করতে ইচ্ছে করে? না, ভাল লাগে?
তা অবশ্য ঠিক। প্রশংসাই হচ্ছে আসল উদ্দীপক ব্যাপার।
তা যাই হোক, আমরা সকাল থেকে বারোটা অবধি জঙ্গল চষেছিলাম। পা ব্যথা করছিল। তাই গোপাল কাড়ুয়ার হাতে তার বন্দুকটা দিয়ে আর দুটি অ্যালফাম্যাক্স-এর পৌনে তিন ইঞ্চি এল.জি. দিয়ে বলল, কাড়ুয়া, যেমন চেহারার শুয়োর খেতে ইচ্ছে করে তেমনই মেরে নিয়ে আয়। বিকেল-বিকেল।
দুটি গুলি দিলেন যে!
একটি শুয়োর মারার জন্য আর অন্যটা শুয়োর যাতে তোদের টু না মারতে পারে সে জন্যে।
আমরা হেসে উঠলাম।
ও ও। আমি ভেবেছিলাম দুটো মারার জন্যে বুঝি দুটো দিলেন।
ঠিক আছে। তাই হবে। তোমাদেরটা তোমাদের মতো মেরো, আমরা যেটা খাব সেটা যেন ছোট এবং চর্বিনদনদে হয়। নইলে ভাল বার-বি-কিউ হবে না।
বে-ফিক্কর রহিয়ে হুজৌর। পাক্কা চার বাজি নিকলেগা ঔর সুরজ বুড়তে বুড়তেহি লেকর আয়েগা।
ওরা চলে গেলে, নাজিম সাহেব এবং ইজহারুল কনফারেন্সে বসলেন আমাদের সঙ্গে। ঠিক হল, বাঘের হদিশ যখন পাওয়া গেছে ওখান থেকে দু’মাইল গভীরে ওল্ড চাতরা রোডের ওপাশে তখন কাল সকালে একটা হাঁকা করলে কেমন হয়?
ইজাহার বলল, হাঁকাতে শম্বর যদি বেরোয়, তবে একটা শম্বর মেরে দিলে বস্তির গরিব মানুষেরা আনন্দ করে খেতে পারে। অবশ্য বাঘ মারার পরেই। ওরা তো আর হাটে পাঁঠা কিনে খেতে পারে না। মুরগিও পায় না খেতে। প্রোটিন বলতে তো ওদের এই শিকারই একমাত্র প্রোটিন।
ঠিক আছে।
আমরা তিনজনে একসঙ্গে বলে উঠলাম।
সেই মতো প্ল্যানও হয়ে গেল। দুপুরের খাওয়ার পরে শীতের রোদের মধ্যে বেতের চেয়ার পেতে বসে একটা ছকও করে নিলাম। নিজামুদ্দিন এবং তার চেলাদেরও ডাকা হল। তাদের নাম, একরাম আর বুধাই। যেসব জায়গাতে বাঘ দিনের বেলা শুয়ে থাকতে পারে তার একটা আন্দাজ দিল কাভুয়া। সেই পাহাড়টার উলটোদিক থেকে হাঁকোয়া করলে বাঘ ঘুম ভেঙে পাহাড়ের ওই পাশ দিয়ে নেমে এসে নীচের মহুলান-নালা পেরিয়ে এদিকে আসার খুবই সম্ভাবনা। যেখান দিয়ে বাঘের নদী পেরুবার সম্ভাবনা প্রবল সেইখানেই ষাট গজ মতো দূরে দূরে চারটে মাচা বানাতে হবে। আর দু’পাশে স্টপার’ রাখতে হবে, যাতে বাঘ ডানদিকে, বাঁদিকে চলে যেতে চাইলে তারা গাছে বসে আওয়াজ করে বাঘকে মাচা যেদিকে বাঁধা, সেদিকেই যেতে বাধ্য করে।
ইজাহার বলল, সে নিজামুদ্দিনের সঙ্গে থাকবে হাঁকাওয়ালাদের ঠিক মতো চালনা করার জন্যে। শিকারিদের মাচাতে বসবে না। ইজাহার পাহাড়ের মাথায় একটা মস্ত শিমুল গাছের নীচে দাঁড়াবে যাতে তাকে নদীর দিক থেকে এবং পাহাড়ের ওদিক থেকেও দেখা যায়। মানে, আমরাও দেখতে পারি আর নিজামুদ্দিনরাও দেখতে পারে। ইজাহারের গায়ে লাল-রঙা জ্যাকেট থাকবে, যাতে সহজেই তাকে দেখা যায়। কাঁধে থাকবে থ্রি-সেভেন্টি-ফাইভ ম্যাগনাম রাইফেল। তবে ইজাহার সত্যিই চায় যে, বাঘটা আমি, গোপাল এবং সুব্রত আমাদের তিনজনের মধ্যে একজনই মারি। নাজিম সাহেব বসবেন মধ্যের মাচাটায়। বাঘ মারার জন্যে যতটা নয়, আমাদের (উনি আমাদের ছওড়াপুত্তান’ বলে ডাকতেন) দেখভাল করার জন্যে এবং যৌবনের মস্তি’তে যাতে আমরা বাহাদুরি করতে গিয়ে প্রাণ না হারাই তাও দেখতে। ফাদার-মাদার কি দোয়া’ ইন গ্রেট কোয়ানটিটি, সঙ্গে করে, উনি সশরীরে আমাদের যম-এর যম হয়ে স্বমহিমায় মধ্যিখানে একেবারে বিরাজ করবেন।
রাতে নাজিম সাহেব, সকালে নিজেরই শিকার করা বনমোরগের মাখা-মাখা ঝোল, আর তিতিরের কাবাব বানালেন। পটনা থেকে আনানো বাখরখানি রোটি, মোটা কাপড়ে মুড়ে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তাই দিয়ে খেলাম। আহা! কী স্বাদ! সঙ্গে পুদিনার চাটনি। সীমারিয়া থেকে লোক পাঠিয়ে বালুসাহিও আনিয়েছিল ইজাহার। সুইট-ডিশ হিসেবে। কাড়ুয়া, আসোয়ারা গ্রামেই খাবে মহাভোজ। তাদের শিকার করা শুয়োরটিকে কাটাকুটি তারা জঙ্গলেই করেছে। আমাদেরটা গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। শেয়াল কুকুর হায়না বা চিতার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে। আমরা কাল বার-বি-কিউ করব। শুনলাম যে,কাড়ুয়াদের শুয়োরটা দাঁতাল এবং মস্ত বড়। কাল মহুয়া খাওয়া হবে, শুয়োরের মাংসের ঝোল দিয়ে গোঁনি বা সাঁওয়া ধানের ভাত খাওয়া হবে তারপর ওরা সারারাত নাচ-গান করবে। তার উপরে বাঘ যদি মারা পড়ে, তবে তো কথাই নেই। আমাদের কাছ থেকে মোটা বখশিস পেয়ে ওদের আনন্দ আরও ভরাট হবে।
রাতের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। বাইরে যাওয়াই যায় না এমনই ঠাণ্ডা। হাজারিবাগ, রাঁচি আর গয়া জেলাতে তখন এমন ঠাণ্ডা পড়ত যে, তা বলার নয়। তবু জঙ্গলে এসে ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসলে মন খারাপ হয়ে যায়। তখন তো আমরা ছাত্র। শীতের ভাল জামাকাপড়ও তেমন ছিল না। কিন্তু টগবগে যৌবন ছিল। যা থাকলে, শীতকে শীত, গরমকে গরম, মনেই হয় না। কোনও কষ্টকেই কষ্ট বলে মনে হয় না তখন।
ক্যাম্পফায়ারের সামনে বসে আছি আমরা তিনজনে। জুতোসুদ্ধ পা আগুনের কাছে রেখে। ফুটফাট করে আগুনে কাঠ পুড়ছে আর ফুলকি উঠছে কাঠ নাড়া দিলেই। আগুনের শিখার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখ কেমন যেন আটকে যায় আগুনে। ঘোর লেগে যায়। আগুনের মধ্যে সূর্যের সাতরং খেলা করে আর তা দেখতে দেখতে মন চলে যায় কোথায় না কোথায়। কত বিচিত্র সব ভাবনা আসে।
ভাবছিলাম, কাল বাঘটা কি বেরোবে হাঁকাতে? না বেরোলে এত মানুষের এত শ্রম এবং আমাদের অর্থদণ্ডও বৃথা যাবে। হাঁকাওয়ালাদের তো রোজ’-এর টাকা দিতে হবে। সে আমরাই দিই আর ইজাহারই দিক। তবে যাঁরাই কখনও শিকার করেছেন তাঁরাই জানেন যে, ‘নিশ্চিত’ বলে কোনও ব্যাপার নেই শিকারে। Failures are the pillars of success! জেঠুমনি বলতেন। এই কথাটা শুধু শিকারের বেলাতেই প্রযোজ্য নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই এই কথাটি প্রযোজ্য। শিকার করতে করতে এমন এমন জিনিস শিখেছি যা আমার পরবর্তী জীবনের পাথেয় হয়েছে। পেছন ফিরে তাকালে খুবই ধন্য মনে করি নিজেকে। সেই সব রাত ও দিনের প্রতি গভীর এক কৃতজ্ঞতার বোধও নড়েচড়ে ওঠে।
এখন কৃষ্ণপক্ষ। একফালি চাঁদ উঠবে। তাও সেই মধ্যরাতে। চারদিকে ফুটফুটে অন্ধকার। তবে আকাশভরা তারা আছে। দুটো পেঁচা ঝগড়া করছে উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে, কিচি-কিচি-কিচর-কিচর-কিচর। পাশে ঝাঁটিজঙ্গলের উপরে ঘুরে ঘুরে ডিড-উ-ডু-ইট পাখি ডাকছে: ডিড-উ-ডু-ইট? ডিড-উ-ডু-ইট? ডিড-ড্য-ডু-ইট?
কে যে কী করেছে তা আমরা জানি না। কাকে যে সারারাত ওই হাড়কাঁপানো শীতের রাতে ওরা উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে এই প্রশ্ন করে যায়, বড় জানতে ইচ্ছে করে। বন-পাহাড়ে এমন অনেক রহস্য চিরদিনই ছিল, আছে, এবং থাকবেও যার উত্তর সম্ভবত কেউই পাবে না কোনও দিনই।
জনাব ইজাহারুল হক, নাজিমুদ্দিন এবং হাঁকাওয়ালাদের নিয়ে পুবের আকাশ লাল হওয়া মাত্রই বেরিয়ে গেছে। গভীর জঙ্গলে জঙ্গলে দু’ মাইল যাবে তারপর মহুলান-নালা পেরিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে হাঁকাওয়ালারা পাহাড়ের ওপারে নেমে যাবে। আর ইজাহার কাছিম-পেঠা পাহাড়টার শিরদাঁড়ার উপরের সেই প্রাচীন শিমুল গাছের নীচে বড় বড় কালো পাথরের যে স্তূপ আছে, তার উপরে তার লাল-জ্যাকেট পরে বসে থাকবে। মাচায়-বসা আমাদের কাছ থেকে রেডি আছি’ এই সংকেত পেলে, সে তার লাল রুমাল নেড়ে পাহাড়তলির হাঁকাওয়ালাদের সঙ্গে থাকা নিজামুদ্দিন আর তার দুই চেলা একরাম আর বুধাইকে নির্দেশ দেবে যাতে হাঁকা শুরু করে ওরা।
ওরা রওয়ানা হয়ে যাবার ঘণ্টাখানেক পরে আমরা চা আর বিস্কিট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ওদের এক ঘণ্টার lead দিলাম এই জন্যে যে, হাঁকাওয়ালারা খুব তাড়াতাড়ি হাঁটলেও ওদের পাহাড়ের ওপারে গিয়ে পৌঁছতে কমপক্ষে ঘণ্টা দেড়েক লাগবেই। আমরা আধঘণ্টার মধ্যে মহুলান-নালার পাশে বাঁধা মাচাতে পৌঁছে যাব।
চেলা বুধাইকে রেখে গেছে নিজামুদ্দিন আমাদের মাচাতে নিয়ে যাবার জন্যে। ওরাই গতকাল বিকেলে গিয়ে মাচা বেঁধেছে। কাড়ুয়া আর আসোয়া ইজাহারের সঙ্গেই গেছে। ইজাহারের গান-বেয়ারার হয়ে গেছে আসোয়া।
আর কাড়ুয়া থাকবে নিজামুদ্দিনের সঙ্গে। অত্যন্ত অভিজ্ঞ আর ভাল শিকারি কাভুয়া। যদি কোনও বিপদ হয়, যদি বাঘ হাঁকাওয়ালাদের লাইন ভেঙে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করে, তাই হাঁকাওয়ালাদের সঙ্গেও এক বা একাধিক ভাল শিকারির থাকাটা খুবই প্রয়োজন। কাড়ুয়া সঙ্গে তার টোপিওয়ালা মুঙ্গেরি গাদা বন্দুকটি তো এনেইছে–উপরন্তু নিজামুদ্দিনের একনলা লাইসেন্সড বন্দুকও আছে ম্যানটন কোম্পানির।
ইজাহারের বাড়ি ছাড়ার দশ মিনিটের মধ্যে আমরা ঘন হরজাই জঙ্গলে পৌঁছে গেলাম গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে, কুলথি আর কিতারির ক্ষেত পেরিয়ে। এদিকে বেশিই অসন গাছ। পন্নন, করম, প্রাচীন জংলি আম, ঢওটা, ডিটোর, কুসুম, পইসার, মহুয়া, শিমুল ইত্যাদিও আছে। মহুলান গাছ হয় উঁচু পাহাড়ে। মহুলান গাছের পাতা চালান যায় দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে মন্দিরে। দোনা’ বানাতে লাগে নাকি! এখানে একটাও নেই। অথচ নালার নামটা যে কেন মহুলান হল তা বোঝা গেল না।
নালাতে পৌঁছে আমরা মাচাতে উঠে বসলাম। একটা কাঠের মই বানিয়ে রেখেছিল ওরা। সেটা দাঁড় করানো ছিল মধ্যের মাচা বাঁধা গাছের সঙ্গে, যেটাতে নাজিম সাহেব বসবেন। নাজিম সাহেবের সঙ্গে তাঁর নতুন-কেনা আমেরিকান .৪০৪ জেফরি রাইফেল। সুব্রতর .৪০৫ আমেরিকান উনচেস্টার রাইফেল। আন্ডার লিভার। দুটিই সিঙ্গল ব্যারেল। সুব্রতর রাইফেলে প্রতিটি গুলি ছোঁড়ার পর ঘটা-ঘং-ঘটা-ঘং আওয়াজ করে ম্যাগাজিনে গুলি রিচার্জ করতে হয়। বাঘ মারতে ওই রাইফেল নিয়ে যাওয়া সত্যিই বিপজ্জনক। যদি প্রথম গুলিতেই বাঘ অক্কা না পায় তবে বাঘ রাইফেল রিচার্জ করার শব্দ শুনে শিকারি কোথায় আছে তা সঙ্গে সঙ্গে জেনে যেতে পারে এবং আক্রমণও করতে পারে।
গোপাল আর আমার তখন কোনও রাইফেল-টাইফেল ছিল না। আমার ছিল ডাবল ব্যারেল গ্রিনার বন্দুক। ডাব্লু-ডাব্লু গ্রিনার বত্রিশ ইঞ্চি ব্যারেল। আর গোপালের আঠাশ ইঞ্চি ব্যারেলের ম্যানটন বন্দুক। ডাবল ব্যারেল। দু’জনের ১২ বোরের। গোপাল আমার চেয়ে দৈর্ঘ্যে অনেকই কম ছিল। বত্রিশ ইঞ্চি ব্যারেলের বন্দুক ওর পক্ষে কায়দা করা মুশকিলও ছিল।
বুধাই বসল নাজিম সাহেবের সঙ্গে। আমরা সবাই ঠিকমতো মাচায় বসে গেলে এবং একে অন্যের অবস্থান ঠিকমতো দেখে নেবার পর নাজিম সাহেব তাঁর গলার লাল-সবুজ চেক-চেক মাফলার নাড়িয়ে পাহাড়ের টঙে বুড়ো শিমুলের নীচে কালো পাথরের তূপে বসে থাকা ইজাহারকে সংকেত দিলেন। ইজাহারও সংকেত পাওয়া মাত্র দাঁড়িয়ে উঠে পেছন ফিরে ওদিকে লাল রুমাল নাড়ল নিজামুদ্দিন একরাম আর কাড়ুয়াকে নির্দেশ দিয়ে যে, হাঁকোয়া শুরু করো।
মাচাতে বসার আগে নাজিম সাহেব আমাদের বলেই দিয়েছিলেন যে, যে আগে বাঘকে রৈঞ্জের মধ্যে এবং সুবিধেমতো পাবে সেই অন্যের জন্যে অপেক্ষা না করে গুলি চালাবে। বাঘ যদি আহত হয়, সঙ্গে সঙ্গে না-পড়ে গুলি খেয়ে, তাহলে তারপরই অন্যরা তাদের রেঞ্জের মধ্যে এলে গুলি করতে পারে। তবে কোনও ক্রমেই রেঞ্জের বাইরে থাকলে এবং ভালভাবে মারার সুযোগ না থাকলে, দূর থেকে গুলি করবে না।
হাঁকোয়া শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। হাতের পাতা ঘেমে ওঠে। নিশ্বাস দ্রুত হয়ে যায়।
আমরা কেউই কারওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না কিন্তু কে কোন দিকে এবং কতদূরে আছে তা জানতাম।
কথা বলা বারণ। অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হলে পাখির ডাকের মতো কু’ শিষ দিয়ে তা করতে হবে। এবং কোনওমতেই হাঁকোয়া শেষ না হয়ে যাওয়া অবধি, হাঁকাওয়ালারা মাচা-বাঁধা গাছের একেবারে নীচ অবধি না এলে মাচা থেকে নামা চলবে না।
অভিজ্ঞ শিকারি মাত্রই জানেন যে, বাঘ অথবা চিতা অনেক সময়ে হাঁকাওয়ালাদের একেবারে সামনে সামনে হেঁটে আসে এবং হাঁকোয়া যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, যখন হাঁকাওয়ালাদের দেখা যাচ্ছে, তখনই তারা শিকারিকে সমূহ বিপদে ফেলে আড়াল থেকে বেরোয়। তখন হাঁকাওয়ালাদের বাঁচিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বাঘ বা চিতাকে গুলি করা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের অভিজ্ঞ মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আমাদের মাথা গরম, তার উপরে ছেলেমানুষ।
সুব্রত বসেছিল বাঁদিকের শেষ মাচাতে। তারপরে গোপাল। তারপরে নাজিম সাহেব ও বুধাই এবং ডানদিকে সবচেয়ে শেষে আমি। চারটি মাচার দূরত্ব ছিল ষাট গজ মতো করে। তার মানে, সুব্রত আমার থেকে প্রায় আড়াইশো গজ দূরে ছিল।
হাঁকা আরম্ভ হয়ে গেছে। তুমুল চিৎকারে অদৃশ্য শত্রু ও স্ত্রীর ভাইকে যথেচ্ছ এবং যাচ্ছেতাই গালাগালির সঙ্গে ক্যানেস্তারা বাজিয়ে, শিঙে ফুঁকতে-ফুঁকতে এবং টাঙ্গির হাতল দিয়ে গাছের কাণ্ডতে বাড়ি মারতে মারতে হাঁকাওয়ালারা পাহাড়ে উঠে আসছে। বাঘ তখন পাহাড়ের ওদিকের ঢালে না এদিকের ঢালে আছে, তা কেউই জানে না।
স্টপার ছিল চারজন, নদীর ওপারের গাছে আমার এবং সুব্রতর ডাইনে ষাট গজ দূরে। বাঘ যদি আমাদের মাচার দিকে না এসে ডাইনে বাঁয়ে ভাগলবা হবার চেষ্টা করে তাহলে তারা গাছের ডালে টাঙ্গি দিয়ে ঠকঠক করে আওয়াজ করবে অথবা হাততালি দেবে, অথবা কাশবে, যাতে বাঘ বিরক্তি এবং ভয়ে, যাত্রাপথ বদলে আমাদের দিকেই আসে।
হাঁকাওয়ালারা পাহাড়ের মাথাতে উঠে এসেছে। এবারে দেখা যাচ্ছে তাদের। তার মানে, বাঘ ওদিকের ঢালে ছিল না। কাড়য়া আর আসোয়ার খবর যদি ঠিকই হয় তাহলে বাঘ এদিকের ঢালের কোথাও আছে। পাহাড়ের এদিকের গায়ের মাঝখানে একটা খাঁজ। তার মধ্যে একটা ঘন জঙ্গলাবৃত গিরিখাত। এবং সেই খাতটা এসে ঠেকেছে মহুলাননালাতে। ওই গিরিখাতের মুখের সামনেটাকে পুরো ঘিরে মাচা বাঁধা হয়েছে এমনই মনে করে যে, বাঘ তাড়া খেয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ওই গিরিখাতের আশ্রয়ে পৌঁছে সেখান দিয়ে এগিয়ে এসেই ওই ঝামেলার পাহাড়কে ত্যাগ করতে চাইবে। এবং পাহাড় ছেড়ে যাবার সময়ে সে যখন কালো পাথর-ভরা মহুলান-নালাটি পেরুবে তখনই সেই সামান্য জল থাকা, অপেক্ষাকৃত ন্যাড়া জায়গাতে বাঘকে আমরা দেখতে পাব এবং সুবিধেমতো গুলি করব।
প্ল্যানে কোনও খুঁত ছিল না। এখন বাঘটা এলে হয়।
বাঘ শিকারে এই অলিখিত নিয়ম চালু আছে চিরদিনই যে, যে-শিকারি সবচেয়ে আগে বাঘের শরীর থেকে রক্তপাত ঘটাবে সে বাঘ তারই। মানে, যদি কোনও আনাড়ি শিকারিও বাঘের ল্যাজে বা অন্য কোনও বাজে জায়গাতে গুলি করে তাকে আহত করে তাকে সাক্ষাত যম-এ রূপান্তরিত করে এবং তার দোসর অন্য শিকারি প্রাণ বিপন্ন করে–এমনকি নিজের প্রাণ দিয়েও সেই আহত বাঘকে পায়ে হেঁটে গিয়ে মারে, তবুও সেই বাঘ, বাঘের শরীরের প্রথম রক্তঝরানো শিকারির বাঘ বলেই গণ্য হবে।
হয়তো এই নিয়মের কোনও মানে নেই। আবার আছেও। sportsmanship বলতে অনেক কিছুই বোঝায়। এই শব্দটি আগে ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস, শিকার ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সম্মানের ছিল। একজন sportsman-কে সকলেই sportsman বলেই শ্রদ্ধা করতেন। ক্রিকেটের মাঠে ক্রিজ-এ দাঁড়িয়ে যদি ব্যাটসম্যান বোলারের কোনও মারাত্মক বলে পরাজিত হতেন কিন্তু দৈবক্রমে আউট হওয়া থেকে বেঁচে যেতেন, তখন তিনি আঙুল তুলে বোলারকে সম্মান জানাতেন। ব্যাটসম্যানও যদি কোনও কঠিন বলকে মুন্সিয়ানার সঙ্গে খেলে বাউন্ডারি পার করতেন তখন বোলার তাঁকে অভিনন্দন জানাতেন। sport ব্যাপারটা আনন্দের ছিল, আদর্শের ছিল, চরিত্র-গঠনের ছিল, মারামারি আর টাকা রোজগারের কল ছিল না। বিজ্ঞাপনদাতাদের হইহই ছিল না সেই সব ক্ষেত্রে, ছিল sponsor-দের রবরবা। এখন কোনও sports-ই আর sport নেই। মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলেও বাঙালি খেলোয়াড় ক্রমশ কমে আসছে। এখন যেন-তেন-প্রকারে জিততে হবে, কি খেলার মাঠে, কি জীবনে, তা চুরি-জোচ্চুরি করেই হোক, কি যে ভাবেই হোক–ইংরেজিতে যাকে বলে by hook or by crook! এবং এখন জীবনের সব ক্ষেত্রেই nothing succeeds like success!
এই অবধি বলেই, ঋজুদা চুপ করে গেল। মনে হল ঋজুদার মন খারাপ হয়ে গেল এই অপ্রিয় প্রসঙ্গ এনে ফেলে। মুখ নিচু করে পাইপের ছাই ঝেড়ে অ্যাশট্রেতে ফেলতে লাগল প্রয়োজনের চেয়ে বেশিক্ষণ ধরে।
তিতির বলল, ক্ষমা করে দাও এখনকার এই তথাকথিত টাকা-সর্বস্ব খেলার মাঠের ‘সৈন্যদলকে। আর শহর ছেড়ে আবার ফিরে চলো টুটিলাওয়াতে। আমরা যে হাঁকাওয়ালাদের হল্লা-গুল্লা শুনতে পাচ্ছি, বাঘটা যে এখুনি বেরিয়ে পড়বে তোমাদের সামনে। এখন পাইপ খেলে কি চলে?
মনে হচ্ছে তোমার চা চাই ঋজুদা। কটায় দিতে বলব গদাধরদাকে?
না না এখুনি কি? এক ঘণ্টা তো মোটে হল খেয়ে উঠেছি। গদাধরদাকে বলে আয় ঠিক চারটের সময় দেবে।
তারপরই বলল, একটু পরই যা না বাবা। বেচারা এত আপত্তি সত্ত্বেও বাবুর্চির রান্না বিরিয়ানি খেয়ে মুষড়ে আছে, হয়তো একটু ঘুমোচ্ছে, কেন বিরক্ত করবি এখন।
দাঁড়াও না, কেসটা কী একটু দেখি আসি।
বলেই ভটকাই উঠে গেল। গেল, আসলে পরিবেশটাকে হালকা করতে।
একটু পরই ফিরে এসে বলল, একেই বলে স্পোর্টসম্যানশিপ!
কেন?
আরে দুজনে দু’জনকে জড়িয়ে ধরে যা গল্পটা করছেনা। টেপ-রেকর্ডারটা দাও না ঋজুদা, টেপ করে রাখি।
ভাগ। গদাধরা হিন্দি-উর্দুর হ’ও জানে না ‘উ’ও জানে না।
আরে সেইটাই তো হচ্ছে মজা। একজন হাজারিবাগী হিন্দি চালাচ্ছে অন্যজন দোকনো বাংলা। আহা!
কীরকম?
গদাধরদা–একটো মদনটাকি পাকি চেল, বুজেচো আজমল ভাই, তা লৌকো ডাঙ্গাতে ভিড়িয়ে আমি তো দেগে দিনু বন্দুক তার উপরে।
আজমল মিঞা–হাঁ! বন্দুকোয়া চালা দিয়া আপনে গদা ভাইয়া? মগর উও জানোয়ার থাকেয়া? বাঘোয়াসে ভি খতরনাক? মদনটাকি কি বারেমে ম্যায় তো কভভি শুনা নেহি। বহতই জঙ্গলমে খানা পাকায়া আজতক। ইয়া আল্লা! মগর মদনটাকি পাকি কি নাম তো কভভি শুনা নেহি।
গদাধরদা–আরে মরণ! শুনবে কেমন কইরে। মদনটাকি কি আমাদের সোঁদরবন ছাড়া অন্য জায়াগাতি দেকা যায় না কি! আরে কি বলো কিগো ওই দাড়িওয়ালা বাঘোয়া-ফাগোয়া। বাঘের কতা বলতিচি নাকি? কোতায় বাঘ আর কোতায় মদনটাকি। গোবিন্দ। গোবিন্দ।
আমরা ভটকাই-এর অঙ্গভঙ্গী সহকারে গদাধরদা আর আজমল ভাই-এর কথোপকথনের বয়ান শুনে হেসে গড়াগড়ি খেলাম। আম্মু ভাই হয়তো পুরোটা বুঝতে পারল না কিন্তু হাসির বেলাতে পুরাই হাসল।
হাসি থামলে, বলল, ভটকাই ভাইয়া, পানকি রেকাবি জারাসে লাও ইধর।
ঋজুদা পাইপে দু’টান লাগিয়ে দিল, হাসির হররা থামলে।
তিতির বলল, এবার আবার ব্যাক টু টুটিলাওয়া।
ঋজুদা আজ্জু মহাম্মদকে বলল, দেখা আজ্জু? কৈইসা সব চেলা বানায়া?
হাঁ ঋজুবাবু। স্রিফ চিলাই তো নেহি। চেলি ভি হ্যায়।
বিলকুল।
বলল, ভটকাই ঋজুদার পক্ষে।
ঋজুদা বলল, হাঁকাওয়ালারা সব কাছিম-পেঠা পাহাড়টার শিরদাঁড়াতে পৌঁছনোর পর নিজামুদ্দিন, একরাম আর কাড়ুয়ার সঙ্গে আজাহার আর আসোয়াও দলে ভিড়ল। তারপর মেদিনী কাঁপিয়ে রণহুংকার দিতে দিতে তারা নেমে আসতে লাগল পাহাড় বেয়ে।
এতক্ষণ ময়ূর, বনমোরগ আর তিতিরের ডাকে বন সরগরম হয়েছিল। এবার সেই গিরিখাত থেকে একবার বাঘ ডাকল। সমস্ত বন-পাহাড় গমগম করে উঠল। হাঁকাওয়ালাদের চিৎকার চেঁচামেচি সব স্তব্ধ হয়ে গেল এক মুহূর্তে। পাখিরাও থেমে গেল। বাঘকে বনের রাজা এমনি এমনি বলে না। সে যে সত্যিই রাজা তা তার রাজত্বে গিয়ে তাকে দেখলে বা ডাক শুনলে তবেই বোঝা যায়। চিড়িয়াখানার বাঘের খাঁচার লোহার শিক-এর ফাঁক দিয়ে ছাতা গলিয়ে যে সব মাখন-মাখন জামাইবাবু শালির কাছে নিজেকে অসমসাহসী বলে প্রমাণ করতে চায়, তাদের এই রকম জঙ্গলে এনে ছেড়ে দিতে হয়।
ভটকাই বলল, এমনি ছাড়লে হবে থোরি। গোটা ছয়েক একস্ট্রা পায়জামা দিয়ে তবে না ছাড়তে হবে।
চুপ কর ভটকাই।
আমি বললাম। তারপর?
বাঘটা একবার বিরক্তির ডাক ডেকেই থেমে গেল। কিন্তু বাঘ ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই দুড়দাড় শব্দ করে একদল শম্বর ঝোপঝাড় ভেঙে ওই গিরিখাত থেকেই উঠে এল। এসে নদী পেরোল আমাদের সামনে দিয়ে পাঁচটা ডো এবং একটা স্ট্যাগ।
সে সব আবার কী জানোয়ার?
ভটকাই ইন্টারাপট করল।
আরে পুরুষ হরিণকে বলে stag আর হরিণীকে বলে doe. তাও জানিস না? তুই জানিসটা কী?
আমি বললাম।
doe, a deer, ray, a drop of golden sun… শোনননি Sound of Music-এ?
তিতির বলল।
হ্যাঁ তো। মনে পড়েছে। আমি খালি ভুলে যাই সব।
ভটকাই বলল, অ্যাপলজেটিকালি।
সরি ঋজুদা, বলো।
তিতির বলল।
স্ট্যাগটা আমার মাচার সামনে বেরোল। কিন্তু বাঘ মারতে এসেছি, তাই গুলি করলাম না।
কেন?
বাঃ গুলির শব্দ শুনে বাঘ সাবধান হয়ে যাবে না।
ও। তাই তো।
শম্বরগুলোর পরে এক জোড়া মস্ত ভাল্লুক ধীরে সুস্থে বেরিয়ে এল। ভাল্লুক, বাঘকে কেয়ার করে না। গায়ে বাঘের মতো জোর সব ভালুকের না থাকলেও গোঁয়ার্তুমিতে কম যায় না। সাহসেরও অভাব নেই তাদের। বাঘও ওদের ঘাঁটায় না, যদি না বাঘের মারা পশুর মড়ির কাছে এসে ওরা ঝামেলা করে।
যে ডাকটা বাঘ ডাকল সেটা রাগের চিৎকার নয়, ব্যথার চিৎকারও নয়, শুধু বিরক্তিতে আমরা যেমন আঃ করে উঠি সেই আওয়াজ। তাতেই গোপাল যেদিকে বসেছিল সেই দিকের একটা মস্ত তেঁতুলগাছ থেকে গোটা কয় ছোট বাঁদর ভয় পেয়ে ধ্বপাধ্বপ করে মাটিতে পড়ে গেল ডাল ছেড়ে হাত ফসকে। মাটিতে পড়েই পড়ি-কি-মরি করে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড় লাগাল। দুটো তো বাঘ যেদিকে, সেদিকেই দৌড়ে গেল অন্ধর মতো।
এদিকে হাঁকাওয়ালাদের মিলিত চিৎকার আর আওয়াজে কান ফাটার উপক্রম হল আমাদের। কিন্তু বাঘটা যেখানে আছে, সেখানে হাঁকাওয়ালারা নামতে পারবে না। আত্মহত্যা করার ইচ্ছে না থাকলে সেই ঘোরান্ধকার নিচ্ছিদ্র খাদে কোনও শিকারিও যাবে না। সেই খাদের অন্য কোনও মুখ যদি থেকে থাকে তবে বাঘ সেদিক দিয়ে বেরিয়ে চলেও যেতে পারে।
আসলে নিজামুদ্দিন, একরাম আর বুধাই অথবা বাঘটাও এই অঞ্চল যত ভাল জানে, কুসুমভা থেকে আসা কাতুয়া আর আসোয়া অত ভাল চেনে না। অথচ থাবার দাগ দেখে তার হদিশ করেছিল তারাই। মাচাগুলো যদি নিজামুদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করে করা হত এবং বাঘ-এর ‘রাহান-সাহান’আরও ভাল করে নজর করে দু’-একদিন পরে বাঁধা হত, তবে হয়তো ভাল হত। কিন্তু ডাকু পিপ্পাল পাঁড়েই সব গোল পাকাল। সেও তো বাঘ। এই বাঘকে শিকার করার পরেই না সেই বাঘের পেছনে যাওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এই সব ভাবছি, এমন সময়ে হঠাৎ বাঘ এসে নদীর অফফ-হোয়াইট বালি আর কালো পাথরের মাঝখানে তিরতির করে বয়ে যাওয়া জলের সামনে দাঁড়াল। বাঘের মতো বাঘ বটে। তাকে দেখে, আমার অবস্থাও গাছ থেকে পড়ে-যাওয়া বাঁদরের মতোই হল। অতবড় বাঘ যে এখনও পৃথিবীতে আছে সে সম্বন্ধে কোনও ধারণাই ছিল না আমার। ক্যামেরাটা বাঁদিকে আর বন্দুকটাকে ডানদিকে রেখেছিলাম। কিন্তু বাঘকে দেখে এমনই ‘থ’ বনে গেলাম যে, না পারলাম বন্দুক ওঠাতে, না ক্যামেরা। অথচ বাঘ আগে দেখিনি বা মারিনি, তা তো নয়!
বাঘটা দাঁড়িয়েছিল আমার আর নাজিম সাহেবের মাঝামাঝি জায়গায়। দু’জনের মাচা থেকেই তিরিশ গজ মতো দূরত্বে। গুলি করলে এবং গুলি জায়গা মতো লাগলে বাঘ হয়তো ওখানেই পড়ে যেত। বাঘ মারার মতো কঠিন কাজ যেমন নেই, তেমন সোজা কাজও নেই।
সারারাত শিশির পড়াতে গাছেদের পাতা তখনও ভিজে রয়েছে একটু একটু। সোনার মতো রোদ এসে পড়েছে সেই চকচকে পাতাদের গা থেকে পিছলে। হাজারিবাগ জেলার বাঘেদের গায়ের রং একটু পাটকিলে হয়। পাটকিলের ওপর কালো ডোরা। মুখের নীচে একটু দাড়ি মো। রোদের মধ্যে তার কানের সাদা গোল দাগ দুটো আর মাথা আর চোখের নীচের সাদা অংশ চমৎকার দেখাচ্ছে। বাঘটা জেনেছে যে, কিছু লোক ঝামেলা করতে এসেছে কিন্তু ও জানে না যে গাছের উপরে পরপর চারজন শিকারি বসে আছে এই সুন্দর সকালে তাকে মারবার জন্যে। এবং তাকে যুদ্ধ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়েই।
পায়ে দাঁড়িয়ে যদি আমরা তাকে মারতে চাইতাম তবেই না বোঝা যেত! পৃথিবীতে কোনও প্রাণী যে তারও বিপদ ঘটাতে পারে, এক বুনোকুকুরের দল ছাড়া, বা তারও ভয় পেতে হবে এমন কোনও প্রাণী যে আছে আদৌ, একথা বাঘ ভাবতে পর্যন্ত পারে না। তাই সে কোনও সংকোচ, ভয় বা দ্বিধা না করে নদীতে এসেই পেছনে যে শোরগোল তা বুঝতে পেরেই একটা বড় কালো পাথরের আড়াল নিয়ে ওদিকে ঘুরে তাকাল। গোলমালটা এবার কাছে চলে এসেছে।
হঠাৎ নাজিম সাহেব তার নতুন .৪০৪ রাইফেল দিয়ে গুলি করলেন, বাঘের গায়ে নয়, বাঘের থেকে দশহাত সামনে জলের উপরে। আর সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে। উঠলেন, কোঈভি গোলি মত চালাইয়েগা।
বুধাই ওঁর চেয়েও গলা চড়িয়ে আমাদের নাম ধরে ধরে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ঋজুবাবু, গোপালবাবু, সুরবোতোবাবু গোলি মত চালানা। কিন্তু বাঘ বুধাই-এর বাণী শোনার জন্যে দাঁড়াল না। তার যা দেখার ও বোঝর সে বুঝে নিয়েছে। এক লাফে সে আমার সামনে দিয়ে স্টপারদের লাইনের ডানদিকের গভীর জঙ্গলে চলে গেল। সেই জঙ্গল একটি পাহাড়ের পায়ের কাছে। বাঘ যে সেই পাহাড়েই আপাতত যাবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। তাকে মারতে চাইলে এখুনি উলটোদিক থেকে সেই পাহাড়ে হাঁকা করলে তাকে আবারও মারার সুযোগ পাওয়া যাবে।
ততক্ষণে ইজাহারুল হক নদীতে নেমে এসেছে। সে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, ঈ কা বাত নাজিম মিঞা? বাঘোয়া মারনাহি নেহি থা তো হামলোগোঁকো ইতনা জারমে সুব্বে সুব্বে অ্যায়সি পরিসান কাহেলা কিয়া আপনে? আজিব আদমি হ্যায় আপ।
ইজাহারের চেয়েও বেশি বিরক্ত হয়েছিল নিজামুদ্দিন, একরাম, কাড়ুয়া আর আসোয়া। হাঁকাওয়ালারা খুশিই ছিল কারণ অতবড় বাঘকে আহত করলে বাঘ যদি হাঁকাওয়ালাদের লাইন ভেঙে পেছনে চলে যেতে চাইত তবে তাদের মধ্যে একাধিক জন আহত তো হতই মরেও যেতে পারত। বাঘ তো কোনও ট্রাফিক পুলিশের হাত মানে না। সে কখন যে কোন দিকে যাবে, তা শুধু সে নিজেই জানে।
মাচা থেকে আগে নাজিম সাহেব নামলেন। তারপরে একে একে আমরা। সকলে একসঙ্গে হলে নাজিম সাহেব একটা গোল পাথরে বসে পকেট থেকে সিগারেট পাকানোর কাগজ বের করে পাকাতে লাগলেন। ক্যাপস্টান টোব্যাকো কাগজে পাকিয়ে খেতেন উনি। সিগারেটটা পাকানো হলে, লাইটার জ্বেলে কুটুং করে আগুন ধরালেন।
বত ক্যা হ্যায়?
বাঁ হাতের তিনখানা আঙুল নেড়ে গভীর বিরক্তির সঙ্গে বলল, গোপাল।
নাজিম সাহেব বললেন, জী তো খুশ হো গ্যয়া? বাঘ দিখকর? ক্যা? হুয়া ক্যা নেহি?
হাঁ উতো হুয়া, মগর…
মগর-ফগর নেহি। শিকারি হো কর দুসরা শিকারিকো ইজ্জত দেনা চাহিয়ে। ঈয়ে শের মারনেকা লিয়ে নেহি থা। সালাম করনেকো লিয়ে থা। হামলোগোঁনে সালাম বাজায়া। ইনশাল্লাহা! উসকি উম্মর হাজার সাল বনে। ইয়ে শের হিন্দুস্তাঁকা ঘামণ্ড হ্যায়। আপলোগোঁকি বালবাচ্চা-পোতা-পোতিকো দেখনে কি লিয়ে ইসকো বাঁচাকে রাখনাহি চাহিয়ে বন্দুক রাইফেল কি ঘোড়া দাবানেমেহি শিকারি নেহি বন পাতা ইনসান। যযা ইনসান জানতি হ্যায়, ঘোড়া কব দাবেগা, ঔর কব নেহি, শিকারি ওবহি হ্যায়।
বলেই চুপ করে গেলেন নাজিম সাহেব।
এটুকু বলেই ঋজুদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। সেদিনের সেই টুটিলাওয়ার জঙ্গলের শীতের সকাল যেন তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল।
বুঝলাম না।
বলল, ভটকাই।
আমরাও যে খুব ভাল বুঝলাম এমন নয়।
ঋজুদা বলল, তোদের একটু আগে স্পোর্টসম্যানশিপ-এর কথা বলছিলাম, এই হল সেই স্পোর্টসম্যানশিপ। যদি সম্মান করার মতো প্রতিপক্ষ হয় তবে তাকে সম্মান জানানোই প্রকৃত স্পোর্টসম্যানের লক্ষণ।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, দ্যাখ, আজকে বাঘ বাঁচাবার জন্যে কত কিছু হরক হচ্ছে, অভয়ারণ্য, বাঘ-প্রকল্প, ওয়ার্ল্ড-ওয়াইল্ডলাইফ-ফান্ড ইত্যাদি কত কি হয়েছে। তখন তো বাঘের সংখ্যা ছিল অগণ্য। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। কিন্তু তখন শিকারিদের মধ্যে যদি নাজিম সাহেবের মতো অনেক শিকারি থাকতেন তবে বাঘেদের সংখ্যা এমন ভাবে কমে যেত না। না। সরকার মাথা ঘামিয়েছে তখন এ নিয়ে, না শিক্ষিত শিকারিরা। আর দ্যাখ, আজ্জু মহাম্মদের বাবা নাজিম সাহেব তো ইংরেজি-মিডিয়াম স্কুলে লেখাপড়া করেননি, কলেজেও যাননি। অথচ কত বড় শিক্ষিত মানুষ ছিলেন তিনি!
তা নাজিম সাহেব গুলিটা করেছিলেন কেন?
বাঃ। বাঘকে ভয় পাওয়াতে। মাচা চেনাতে। শিকারিরা যে গাছে বসে থাকে অমন লুকিয়ে, তা জানাতে। যাতে ভবিষ্যতে অমন ভুল সে আর না করে।
বাঘটার অত বয়স আর এটুকুও শেখেনি!
তিতির বলল।
তা কী আর করা যাবে। বাঘটা হয়তো তোর মতো ভাল স্কুলে পড়েনি। সবাই কি আর সবই জানে। তুই এই বয়সেই যা জানিস অনেকে বুড়ো বয়সে পৌঁছেও তা জানে না। কিন্তু বাঘটা বুড়ো একেবারেই ছিল না। অভিজ্ঞও ছিল না। কৈশোর আর যৌবনের চৌকাঠে পৌঁছেই তার ওই চেহারা। তাহলে বোঝ, সে কেমন বাবার ছেলে ছিল।
ভটকাই বলল, বাঘকা বেটা, সিপাহিকো ঘোড়া, কুছ নেহি তো থোড়া ঘোড়া, বাপ’কে ‘বাঘ’ বানিয়ে দিয়ে।
বাঘটা যে বয়স্ক নয় তা তোমরা বুঝতে পেরেছিলে?
তিতির জিজ্ঞেস করল ঋজুদাকে।
আমরা থোড়াই বুঝেছিলাম। বুঝেছিলেন, নাজিম সাহেব। অনেক ছেলেমানুষকেই বুড়ো মনে হতে পারে দেখে, আবার অনেক বুড়োকে ছেলেমানুষ।
অনেক এঁচড়ে পাকাও থাকে। ছেলেমানুষ হয়েও যারা বুড়ো।
কীরকম?
যেমন ভটকাই।
আমি বললাম।
তিতির বলল, টুটিলাওয়ার বাঘের গল্প তো শেষ হল এবার ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের গল্পটা বলল। সেটাই তো আসল।
সবই আসল। আজমল-এর বটিকাবাব দেওয়া বিরিয়ানি আর গুলহার কাবাব আর চাঁব আর রেজালা যা খেয়েছি না! একেবারে আইঢাই করছে শরীর। তোমরা সব এখানে বসে গল্প করো, চা খাও, সঙ্গে টা, আমি গিয়ে একটু শুয়ে নিই। আজ্জু মিঞাও শোবে না কি?
না। আমি বরং একটু নাখুদা মসজিদ ঘুরে আসি। আজকে একবারও নামাজ পড়া হল না অথচ আজ জুম্মাবার। মগরিব-এর নামাজটা অন্তত পড়ে আসি। আব্বা বেঁচে থাকলে রাগ করত খুব।
নিশ্চয়ই যাবে। দিনের মধ্যে ঈশ্বর বা আল্লাকে বেশিবার মনে করতে পারলে তো ভালই, একবার অন্তত তো করাই উচিত মনে মনে। যাও ঘুরে এসো। মাধবকে নিয়ে যাও। তোমার পানও নিয়ে যাও।
তারপরই বলল, ও ভাল কথা, রাতে কী খাবে?
আজ্জুভাই উঠে নাগরা জুতোতে পা গলাতে গলাতে বলল, কুচ্ছো নেহি। স্রিফ চারবটি পাঁচনল, হামদর্দ দাবাখানা কি।
সে কি! তা বললে হয়! রাবড়ি একটু খেতেই হবে। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। এই সৈন্যদলের জন্যে মুরগির ফিশ-ফাশ করবে গদাধরদা। তোমার আজমলকেও তো ভাল করে খাওয়াবে গদাধরদা। সে কি এতই অভদ্র?
আমরা কিন্তু কালই যাব ঋজুবাবু ভেস্টিবিউলে। কোডারমাতে নেমে, বাসে যাব হাজারিবাগ। আজকাল তাতেই সুবিধা। তো,অব চলে হাম।
যাও।
কিন্তু আজমলকে দেখিয়ে আনবে না কলকাতার নাখুদা মসজিদ?
সাহি বাত। ঠিকই তো। আবার কবে আসবে কলকাতায়!
ভটকাই বলল, আমি ডেকে আনছি।
ওরা চলে গেলে ঋজুদা সত্যি সত্যিই শুতে চলে গেল। আজকাল ঋজুদা যেন কেমন বুড়ো হয়ে যাচ্ছে।
ঋজুদা শুতে গেলে ভটকাই বলল, কান খুলে মন দিয়ে শোনো ‘ওড়াপুত্তানেরা। তোমরা আমার কথার মধ্যে একটাও কথা বোলো না আমি তোমাদের ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে আমার এনকাউন্টারের গল্পটা বলছি।
