অন্য শিকার (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
মাঝরাতের গা-ছমছম জঙ্গলে বুড়হাবাঘটা নদীর পাড় ছেড়ে ঘাসবনে নেমে এল মাঘ মাসের শিশিরভেজা বরফের মতো মাটি আর ঘাসের গভীরে। মাটি আর ঘাসের সঙ্গে যেমন করে একমাত্র বাঘেরাই মিশে যেতে পারে, তেমন করেই সে মিশে গিয়ে বুকে হেঁটে-হেঁটে তাঁবুটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, অন্ধকারের বুকে অন্ধকারতর নিঃশব্দ এক দুঃস্বপ্নের মতো, থেমে থেমে; শামুকের চেয়েও আস্তে আস্তে। বুড়হা-বাঘার পেছনে, ফ্রিজ খুললে যেমন ঠাণ্ডা ধোঁয়া বেরোয়; তেমনই বরফের ধোঁয়া উঠছে শীতের রাতে প্রায়-জমে-যাওয়া বাজারের স্লেট-রঙা জল থেকে।
নদী কথা বলছে রাতের বনের সঙ্গে, তারাদের সঙ্গে; যে-ভাষা শুধু নদী, বন আর তারারাই জানে।
তাঁবুর আর নদীর ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে এবারে বুড়হা-বাঘা। নদীর এপারের জঙ্গলের গভীর থেকে কপার-স্মিথ পাখি ডাকছে। টাকু-টাকু-টাকু-টাকু-টাকু। তার দোসর সাড়া দিচ্ছে নদীর ওপার থেকে। হঠাৎই পঞ্চমীর চাঁদ উছলে উঠল সেগুনবনের মাথার উপর। হাতির কানের মতো বড় বড় শিশিরভেজা সেগুনপাতাদের উপর পড়ে, মাঘী-পঞ্চমীর চাঁদের আলো পিছলে যেতে লাগল। কোনও কালো কুচকুচ গোঁ যুবকের হিমেল মৃতদেহেরই মতো রাতের শিশিরভেজা ভোঁর ঘাসের মাঠটিকে, ভেজা চাঁদের ঘোলা আলো মুহূর্তের মধ্যে কোরা কাপড়ে ঢেকে দিল যেন!
সেই শীতার্ত, ভিজে, পিছল রাতে ফিসফিস করে কারা যেন বলে উঠল : রাম নাম সত হ্যায়। রাম নাম সত হ্যায়!
থমকে থেমে গেল বুড়হা-বাঘা।
আলোতে মানুষের আনন্দ, বাঘের ভয়। কিছুক্ষণ মাটি কামড়ে পড়ে থাকল সে। মৃতের চেয়েও অনেক বেশি মৃতের মতো। বড় মিষ্টি এই মাটি। বুড়হা বাঘার দেশের মাটি। ভারতবর্ষের মাটি। যে-মাটি, একদিন প্রাগৈতিহাসিক গোঁন্দদের রূপকথার পৃথিবীর জন্ম-ইতিহাসের দারুণ-বলশালী কচ্ছপ কিচু রাজা বয়ে এনেছিল ইন্দ্রলোক থেকে। সাপেদের রাজা বুড়হা-নাঙ্গ আর তার বউ দুধ-নাঙ্গের রাজ্য ইন্দ্রলোক। সেখানে গিয়ে কিচুল রাজা সেখানের মাটি গিলে ফেলে লুকিয়ে তার পেটের মধ্যে করে বয়ে নিয়ে এসেছিল এই প্রস্তরময় পৃথিবীতে ফুল, ফল, শস্য ফলাবে বলে। পৃথিবীর আগের নাম ছিল সিঙ্গার দ্বীপ। তখনও নাঙ্গা-বাইগা আর নাঙ্গা বাইগিকে তৈরি করেননি ভগবান, তাঁর গায়ের ময়লা দিয়ে। তৈরি করেননি বুড়হা দেবকে, উইকে, কুসরো, সাইআম, ঘামসেনবাওয়া ইত্যাদি দেবতাদেরও। সেই সিঙ্গার দ্বীপ, অথবা ভারতবর্ষের মাটিতে নাক ছুঁইয়ে যুগ-যুগান্তরের গন্ধ নিচ্ছিল বুড়হাবাঘা।
হঠাৎ-ওঠা চাঁদের আলোয় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে পৃথিবীর সব শিকারির বড় শিকারি সাবধানী বুড়হা বাঘা অনেকক্ষণ মাটি কামড়ে মরা মাঠের উপর মড়ারই মতো পড়ে থাকল। নট নড়ন চড়ন নট কিচ্ছু হয়ে। অন্ধকারে অভ্যস্ত দুটি চোখকে চাঁদের আলো আস্তে আস্তে সইয়ে নিয়ে ভুতুড়ে রাতে একটা ভুতুড়ে প্রায়-নিশ্চল ছায়ারই মতো ভেজা ঘাসের মধ্যে এগিয়ে যেতে লাগল সে। প্রায় পৌঁছেই গেছে এখন তাঁবুর কাছে।
সাদা তাঁবুর দরজাটা বন্ধ। চাঁদের আলোয় একটা সফেদ হাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে তাঁবুটা।
বুড়হা-বাঘা আস্তে আস্তে তাঁবুটার চারদিকে ঘুরতে লাগল। ভিজে ঘাসের বনে, বনের রাজা, সব বাঘের সেরা বাঘার পায়ে কোনওই আওয়াজ হল না। বোঝা পর্যন্ত গেল না যে বাঘ এল। একজন ভালমানুষের বুকের মধ্যে খারাপত্ব যেমন করে চলে আসে চোরের মতো চুপিসাড়ে, শীতের রাতের বুড়হাবাঘা ঠিক তেমন করেই আসে।
দেখতে পেল যে, তাঁবুর একটামাত্র জানলার পর্দাটা খোলা। বুড়ো-শিকারির হাঁপানি আছে বলে বদিক বন্ধ করে শুতে পারে না সে। তাই তার মাথার দিকের জানলাটির পর্দা নামানো নেই। বুড়হা-বাঘা ভাবল, এই অদ্ভুত শিকারিকে একবার কাছ থেকে ভাল করে দেখবে সে। কে এই শিকারি? কী সে চায়? বুড়হাবার পায়ে-পায়ে কী কারণে সে এমন করে ছায়ার মতো ঘোরে? কেন সে হাঁকোয়া বা ছুতোয়া করাল না একবারও? সবাই যা করে, তা কেন করতে চায় না সাদা-দাড়ি? এর রহস্যটা বোঝা দরকার।
বুড়হা-বাঘা জানলার কাছে পৌঁছবে ঠিক সেই সময়ই একটা কুটরা হরিণ তাকে নদীর ওপারের ছির ঘাসের উঁচু ডাঙা থেকে দেখতে পেয়েই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ধ্বাক্ ব্বাক্ ব্বা করে ডাকতে লাগল। তার ডাক শুনে হনুমানের দল হুপ-হুপ-হুপ-হুপ-হুপ করে ডালপালা ঝাঁকিয়ে ঝাঁপাঝাঁপি করে সমস্ত বনের প্রাণীদের চিৎকার করে জানিয়ে দিল বুড়হা-বাঘার অস্তিত্ব। তাঁবুর পেছনের সেগুনবন থেকে শম্বরের দল ঢাংক ঢাংক করে ডাকতে ডাকতে বনের বুকের আগাছা এবং ঝোপঝাড় ভেঙে দৌড়ে গেল চৈত্রমাসের ঝড়ের মতো। নিরাপদ আশ্রয়ে। টিটিপাখি ডাকতে লাগল হট্টিটি-হুঁট-টি-টি-টি-হুট-টিটিটি-হুট।
হঠাৎ তাঁবুর দরজা খুলে বুড়ো শিকারি বেরিয়ে এল সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে। রাইফেল হাতে। তার সাদা দাড়ি, সাদা চুল, সাদা গোঁফ সেগুনবনের পাতায় পাতায় ক্রমশ-জোর-হওয়া চাঁদের আলোয় সুন্দর দেখাচ্ছিল। বুড়হা-বাঘাটার মনে হল, মানুষটা ভাল। সেও যেন ভাল বাঘ। তবে কেন সে তার পেছনে লেগেছে? কিসের শত্রুতা বুড়োর তার সঙ্গে? ভাল মানুষ আর ভাল বাঘের মধ্যে কোনও শত্রুতা থাকা তো উচিত নয়।
বুড়ো শিকারির হাতে বণ্ড-এর পাঁচ ব্যাটারির টর্চ। অ্যামেরিকা থেকে কিনে নিয়ে এসেছিল, বুড়ো যখন গেছিল ছেলে-বউয়ের কাছে। টর্চ ফেলল নদীর দিকে সে। বুড়হা-বাঘা ঘাসের মধ্যে ঘাস হয়ে মিশে রইল। দেখল তাঁবু থেকে একজন আদিবাসী ছেলে বেরিয়ে এল। আরও একটা টর্চ নিয়ে। কেন, বুঝল না বুড়হা বাঘা, ওরা দুজনেই বানজার নদীর দিকে টর্চ ফেলতে লাগল। বোধহয় কুরাটা ঐদিক থেকে ডেকেছিল বলেই।
বুড়হা বাঘা চাপা হাসি হাসল একবার। শব্দ না করে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে জিপের পেছনের কাসসি গাছের ছায়ায় এবং তারও পেছনের সেগুনবনের গভীরে অনেকখানি ঢুকে গিয়ে চার পায়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, মুখ ঘুরিয়ে একবার ডাকল—হুঁ-য়া-উ-উ…।
সমস্ত জঙ্গল থরথর করে কেঁপে উঠল। মনে হল, কামান দাগল যেন কেউ। সেগুনবনের গাছেদের হাতির কানের মতো পাতায় পাতায় চমক লেগে রুপোচুর-এর মতো শিশির ঝরতে লাগল টুপটুপ করে। পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সে-ডাকের প্রতিধ্বনি ফিরে এল নদী-নালার ঠাণ্ডা বুক ধরে, ছুটে গেল আঁক-বাঁক পেরিয়ে, উঠে গেল পাহাড়চুড়োর দিকে।
চমকে উঠল বুড়ো শিকারি। ভয় পেয়ে গেল তুরু।
কথা তো শুনলে না। দ্যাখো এবার। যার খোঁজ করো তুমি, সেই-ই খোঁজ করছে তোমার। বলেই, টর্চের আলো ফেলল তুরু, তাঁবুর চারপাশের ঘাস-নিড়োনো পরিষ্কার জায়গার নরম ভিজে মাটিতে। আতঙ্কিত গলায় বলল, এইই দ্যাখো! সেইই নিজে এসেছিল তোমার খোঁজে। এত বড় বাঘের পায়ের ভাঞ্জ না কেউ আজ অবধি দেখেছে, না দেখবে কখনও ভবিষ্যতে। মধ্যপ্রদেশের কোনও জঙ্গলে, কানহা-কিসলি, সীওনী, পেঞ্চ, বান্ধবগড় কোনও জঙ্গলেই এত বড় বাঘ আর একটিও নেই। বাঘের পায়ের দাগ তো নয়, যেন হাতির পায়ের ছাপ!
তুমি কী খুঁজবে তাকে বাপ্পা! সে তোমাকেই শুনিয়ে দিয়ে গেল যে, তাকে খোঁজার দরকার নেই। সে নিজেই হাজির। সাবধান করে দিয়ে গেল।
বলে গেল, আমি আছি। আমি অমর। মানুষের কাছে আমি হারিনি। হারব না কখনওই। আমিও অজেয়।
বাঃ। বলল শিকারি-বুড়ো।
বাঃ কী? তুরু উত্তেজিত হয়ে বলল।
বাঃ।
আবারও বলল, বুড়ো শিকারি।
