মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(৬)

পাঠকদের কেউ কেউ হয়তো ক্রুজে গেছেন। এসব জাহাজে কী থাকে আর না থাকে বিলক্ষণ জানেন। আমাদের কাছে পুরো ব্যাপারটাই একটা নতুন অভিজ্ঞতা। বইপত্রে পড়েছি, সিনেমাতেও ক্রুজ শিপের কিছু কিছু দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু চাক্ষুস দেখা অন্য জিনিস! আমি তো একেবারে থ। অথচ আইল্যান্ড প্রিন্সেস জাহাজ হিসেবে খুব একটা বড়ো নয়। কিন্তু খেলাধূলোর জায়গা, সুইমিং পুল, সিনেমা হল, শপিং মল, এন্টারটেনমেন্ট সেন্টার, এক্সসারসাইজরুম, লাউঞ্জ, বার, বিউটি পার্লার, ওয়েডইং চ্যাপেল, কী নেই! ক্যাফেটেরিয়াতে অঢেল ফ্রি খাবার। এছাড়া রয়েছে আরও গোটা পাঁচেক রেস্টুরেন্ট। বলতে গেলে একটা ছোটোখাটো শহর জলে ভেসে বেড়াচ্ছে।

 

বিকেল পাঁচটায় জাহাজ ছাড়ল। তার আগে লাইফবোট কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তার একটা মহড়া হল। জাহাজ ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সবাই আলাদা হয়ে গেলাম। প্রমথ সাঁতার কাটবে প্ল্যান করে এসেছিল। একেনবাবু ওঁর অগাধ অনুসন্ধিৎসা নিয়ে জাহাজ পর্যবেক্ষণে বেরোলেন। আমি উপরে অবসার্ভেশন ডেকে দাঁড়িয়ে চারদিকের জল, ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া ভ্যানকুভার শহরের উঁচু উঁচু বাড়িগুলো দেখতে লাগলাম। ডেকে যাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন বেশীরভাগই সাহেব। একজন ছাড়া কোনো ভারতীয়ই চোখে পড়ল না। ভারতীয় ভদ্রলোকটি একটু বয়স্ক, কিন্তু বেশ মিশুকে –ঘুরে ঘুরে অনেকের সঙ্গেই কথা বলছেন। খানিক বাদে আমার পাশে এসে আলাপ করলেন। হার্লেমে থাকেন, নাম টিম ব্যাসারাথ। বয়স দূর থেকে যা ভেবেছিলাম, তার থেকে একটু বেশিই। গল্প করতে ভালোবাসেন। প্রশ্নও তেমন করতে হল না। নিজের থেকেই অনেক কথা বললেন। বাপঠাকুরদার একটা মনিহারি দোকান ছিল। কিন্তু উনি ব্যবসায়ে না ঢুকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়েছিলেন। কয়েকটা হোটেলে চাকরি করার পর ঢুকেছিলেন এই প্রিন্সেস ক্রুজ লাইনে। ক’দিন আগেও এই জাহাজেই ক্রুজ ডিরেক্টর ছিলেন। অফিশিয়ালি রিটায়ার করেছেন এই ট্রিপ আরম্ভ হবার ঠিক আগে। ওঁর রিপ্লেসমেন্টেও এসে গেছে। প্রথম আলাপেই এতগুলো কথা বলে ফেলে বোধ হয় একটু লজ্জা পেলেন। বললেন, “কিছু মনে করলেন না তো এত কথা বলে ফেললাম!”

 

“এতটুকু নয়, খুব ভালো হল আপনার সাথে আলাপ হয়ে। আগে আমরা কোনোদিন ক্রুজে আসিনি। জাহাজের সাইজ দেখে তো আমরা হতভম্ব! কি আছে কি নেই বুঝতে বুঝতেই ট্রিপটা শেষ হয়ে যাবে।”

 

“কিছু প্রশ্ন থাকলে ক্রুজ ডিরেক্টরের অফিসে চলে যাবেন। যাত্রীদের দেখভাল করার কাজ ঐ অফিসারের।”

 

“তার আর দরকার কি, আপনার সঙ্গেই তো আলাপ হয়ে গেল।”

 

হেসে ফেললেন টিম। “আমার কাজ তো শেষ। ভালোকথা, মেইন ডাইনিং রুমটা কালকের জন্যে এখনই গিয়ে বুক করে নিন, দেরি করলে জায়গা পাবেন না। ওখানকার অ্যাম্বিয়েন্স চমৎকার আর ক্যাফেটেরিয়ার থেকে বেটার খাবার।”

 

আমার কতগুলো প্রশ্ন ছিল, কিন্তু সেগুলো আর করা হল না। জাহাজের একজন স্টাফ ব্যস্ত হয়ে টিমকে ডাকতে এল। এক্সকিউজ মি’ বলে উনি চলে গেলেন।

 

এরমধ্যে জাহাজ সমুদ্রের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে। চরিদিকে শুধু জল ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি অবসার্ভেশন ডেক থেকে মেইন ডেকে নেমে এলাম। আগে খেয়াল করিনি, ছোটো একটা লাইব্রেরিও জাহাজে আছে। সেখানে আর কেউ নেই, একা একেনবাবু সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু দেখছেন।

 

আমাকে দেখে বললেন, “অ্যামেজিং স্যার, ট্রলি অ্যামেজিং।”

 

“কি অ্যামেজিং?”

 

“এই যে মাঝসমুদ্রে নেট কানেকশন। স্লো ঠিকই, কিন্তু আসছে।”

 

“আপনি এখানেও ইন্টারনেট দেখছেন, কত চার্জ জানেন?”

 

“সেকি স্যার, ফ্রি নয়!”

 

“জাহাজে ফ্রি হয় কি করে, নিশ্চয় স্যাটেলাইট কানেকশন!” আমি দেখেছিলাম রেটটা, কিন্তু একটু বাড়িয়েই বললাম। “প্রতি মিনিট ৫ ডলার।”

 

“কী সর্বনাশ স্যার! আমি তো প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে সার্ফ করছি!”

 

“তারমানে একশো ডলার। যাক গে, করেই যখন ফেলেছেন তখন তো আর কিছু করার নেই! তা কী এত হাতিঘোড়া দেখছিলেন?”

 

একশো ডলারের অঙ্কটা শুনে একেনবাবু এতই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন যে আমার খারাপ লাগল। বললাম, “আঃ, ছাড়ন তো। আপনার জন্যই তো আমরা ফোকোটে এই ক্রুজে এসেছি, এটা না হয় আমরাই দেব।”

 

এতে বোধহয় একটু কাজ হল। ল্যাপটপের মুখটা বন্ধ করতে করতে বললেন, “না না স্যার, আপনারা কেন দেবেন! আসলে কি জানেন স্যার, চট করে কনক্লশানে আসাটা খুব ভুল। নেটে দেখেছিলাম ক্রুজ শিপে নেট কানেকশন আছে। তার থেকে ধরে নিয়েছিলাম ওটা টিকিটের সঙ্গে ইনডেড।”

 

“তা তো বুঝলাম, কিন্তু এতক্ষণ ধরে এখানে করছিলেনটা কি? শুধু নেটে তো ছিলেন না বুঝতে পারছি।”

 

“এই একটু বই পড়ছিলাম স্যার। কিন্তু বইয়ের কালেকশন খুব লিমিটেড।”

 

“তা তো হবেই, ক্রুজে আর ক’জন বই পড়তে আসে!”

 

“ট্রু স্যার। কিন্তু জায়গাটা সুন্দর। লোকজন নেই, বাইরের দেয়ালটা দেখুন, পুরো কাঁচের। সেদিকে তাকালেই স্যার অন্তহীন সমুদ্র।”

 

“আপনি তো কবিদের মতো কথা বলছেন? কী পড়ছিলেন, কবিতার বই?”

 

“না স্যার, ভাস্করদের জীবনী।”

 

“ভাস্কর মানে? স্কাল্পটার?”

 

“হ্যাঁ, স্যার।”

 

“আপনার যে এ ব্যাপারে এত উৎসাহ ছিল। তা তো আগে জানতাম না?”

 

“ছিল না স্যার। তবে সেদিন ম্যাডাম ফ্রান্সিস্কা যে বললেন ফণীন্দ্রনাথ বসু-র কথা… হঠাৎ ওঁর নামটা চোখে পড়ল। তাই পড়ছিলাম।”

 

সেদিন মানে সপ্তাহ দুয়েক আগে। প্রমথর গার্লফ্রেন্ড ফ্যান্সিস্কা আমাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামে। মেয়েটা আমাদের পছন্দ করে, তাই মাঝেমাঝে গার্জেনগিরি করে। কেমিস্ট্রির ছাত্রী হলেও স্কাল্পচার, আর্ট এইসব নিয়ে পড়ে থাকে। তার ধাক্কা মাঝে মাঝেই আমাদের পোয়াতে হয়। শুধু প্রমথ নয়, আমরাও যাতে করে শিল্পজগতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিসগুলো উপভোগ করতে শিখি, তার জন্য ফ্রান্সিস্কা সদা সচেষ্ট। রোদাঁর একটা স্পেশাল এক্সিবিট চলছিল মিউজিয়ামে –বড়ো বড়ো তিন ডজন স্কাল্পচার আর তার সঙ্গে ওঁর আঁকা ছবি। সেই যাত্রাতেই ফ্রান্সিস্কা কথায় কথায় ফণীন্দ্রনাথ বসু-র প্রসঙ্গ তুলেছিল। রোদাঁ নাকি ওঁর কাজ পছন্দ করতেন। ফ্র্যাঙ্কলি আমি ভুলেই গিয়েছিলাম পুরো ব্যাপারটা। আর্ট,স্কাল্পচার ইত্যাদিতে আমার কোনও ইন্টারেস্টই নেই। একেনবাবুর সঙ্গে আমার আর প্রমথর তফাৎ হচ্ছে ওঁর জ্ঞানপিপাসা প্রবল। একটা কিছু কানে গেলেই হল, তক্কে তক্কে থাকেন কী করে সে ব্যাপারে আরেকটু জানা যায়। ওঁর কিছু জানা মানে আমাদের জ্বালাতন, বকবক করে বেশ কিছুদিন কান ঝালাপালা করবেন।

 

“ভেরি ইন্টারেস্টিং লাইফ স্যার। দেশের লোকেরা ওঁকে তেমন চেনেন না, কারণ ওঁর শিল্পীজীবনটা বিদেশে কেটেছে। মারাও গেছেন মাত্র ৩৮ বছর বয়সে স্কটল্যান্ডের এক শহরে জলে ডুবে।”

 

আমি হাঁ হুঁ কিছু না বলে, আলমারিতে কি কি বই পড়ার মতো আছে দেখতে গেলাম। একেনবাবু তাতে দমলেন না।

 

“আরও একজন বাঙালীর কথা এখানে লেখা আছে স্যার।” বইটা তুলে দেখালেন একেনবাবু। “ফণীন্দ্রনাথ বসুর মৃত্যু প্রসঙ্গে ফুটনোট হিসেবে। রোঁদার আরেকজন ভারতীয় ছাত্র মহম্মদ এম রহমানেরও অপঘাতে মৃত্যু হয়েছিল। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে খুন হন।”

 

“তাই?” অন্যমনস্ক হয়ে শেলফের বইগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

 

“হ্যাঁ স্যার, ওঁর বডিটা পোড়া অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। ‘হিজ বার্নট বডি ওয়াজ ফাউন্ড নিয়ার এ ডিচ। গট টু বি এ মার্ডার।

 

“দাঁড়ান, দাঁড়ান, কী বলছেন?” বই খুঁজতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম! খুন শুনে সম্বিত ফিরল। “পুড়িয়ে মারা হয়েছিল! কে খুন করল?”

 

“আর কিছু লেখা নেই স্যার এখানে, ওইটুকুই।”

 

“অন্য কোনো জায়গায় নিশ্চয় কিছু আছে?”

 

“বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি, স্যার।” রবীন্দ্রনাথের এই ফেমাস লাইনটা একেনবাবু প্রায়ই আওড়ান। বিশেষ করে যখন উত্তরটা জানা নেই বা চেপে যেতে চান। “আপনি পড়ুন স্যার, আমি ল্যাপটপটা ঘরে রেখে আসি।”

 

একেনবাবু চলে যাচ্ছেন দেখে বললাম, “রুমে যাবার আগে একটা কাজ করবেন প্লিজ, ডাইনিং রুমটা কালকে ডিনারের জন্য বুক করে আসুন। শুনলাম বেশি দেরি করলে নাকি ওখানে জায়গা মিলবে না।”

 

“তাই নাকি স্যার, এখনই যাচ্ছি!” বলে ব্যস্তসমস্ত হয়ে একেনবাবু ছুটলেন।

 

আমি ইতিমধ্যে বুক শেলফ থেকে জেমস থার্বারের মাই লাইফ এন্ড হার্ড টাইমস বইটা তুলে নিয়েছি। কিছু কিছু মজাদার বই আছে যা বারবার পড়া যায়, এটা তার একটা। পড়তে পড়তে কখন বইয়ের মধ্যে ডুবে গেছি খেয়াল নেই। প্রমথর ঠেলায় ঘোর কাটল।

 

“কি রে খাবি, না বই পড়ে খিদে মিটাবি?” প্রমথ সাঁতার কেটে স্নান টান সেরে রেডি। “একেনবাবু কোথায়?”

 

“উনি কালকের জন্যে ডিনার টেবিল বুক করতে গেছেন।”

 

“টেবিল বুক করতে!”

 

“হ্যাঁ, ডাইনিং রুমের টেবিল আগের দিন বুক না করলে জায়গা মিলবে না। দু’হাজার লোককে তো একসঙ্গে বসাতে পারবে না।”

 

“আর আজকে?”

 

“আজ কাফেটেরিয়ায় খেতে হবে। নো চয়েস।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *