মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(৪)
পরের দিন ইউনিভার্সিটিতে কোনো কাজই ছিল না। একেনবাবুও ফ্রি। আমাকে বললেন, “চলুন স্যার, মুরুব্বিজনের সেবাটা করে ফেলি।”
“তারমানে?”
“মানে মামুদ সাহেবের খালুর কাজটা করে ফেলা যাক।”
“আপনি আবার গুরুজনদের মুরুব্বি বলতে শুরু করলেন কবে থেকে?”
“তারেক সাহেব তো সবসময় তাই বলেন।”
“তারেক তো অনেক কিছুই বলে! সে কথা থাক, কিন্তু এই সক্কালবেলায় কুইন্সে ছুটবেন! তার ওপর ঠিকানাটাই তো মনে হচ্ছে ভুল।”
“ভুল হলে তো চুকেই গেল স্যার, একটু হাওয়া খেয়ে আসা যাবে।” তারপর প্রমথকে বললেন, “আপনিও চলুন না স্যার, তিনজনে বেশ গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।”
প্রমথ ব্রেকফাস্ট করে দ্বিতীয় কফিটা শেষ করছে। মামুদের খালুর গল্পটা কালকেই ওকে করেছিলাম। কিন্তু ও কোনো উৎসাহই দেখাল না। বলল, “ছ’দিন বাদে ক্রুজে যাব, কী ঝুট-ঝামেলার মধ্যে ঢুকছেন! একজনকে চেনেন না, কী টাইপের লোক জানেন না, হঠাৎ গিয়ে হাজির হবেন? হয়তো ড্রাগ ডিলার, দরজায় অচেনা বাদামি চামড়া দেখলে গুলি চালিয়ে দেবে!”
প্রমথটা আমার চেয়ে অনেক প্র্যাকটিক্যাল। আমি এতসব ভাবিনি।
একেনবাবু বললেন, “না, না, স্যার, রিস্ক নেব কেন, একটু খোঁজখবর করা আর কি। সেই ফাঁকে কুইন্সও একটু ঘোরা হয়ে যাবে… আর যেতে যেতে একটু গল্পও করা যাবে।
“গল্প তো এখানেই হতে পারে, আর হাওয়া খেতে চান তো সেন্ট্রাল পার্কে চলুন, আমি রাজি। কুইন্সে নয়।” বলে প্রমথ কফির কাপ ধুতে গেল।
প্রমথর মতো আমিও দুয়েকবার কাটাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্রমথর ক্যারেক্টারের ডিজিটালিটি আমার মধ্যে নেই। প্রমথ হয় ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’, নো কম্প্রোমাইজ। আমি অত জোর দিয়ে কিছু বলতে পারি না। একেনবাবুর ঘ্যানঘ্যানানি সহ্য করতে না পেরে শেষে বেরোলাম।
রহমান সাহেবের অফিসের লোকটি খুব একটা ভুল বলেনি। ঠিকানাটা খুঁজে পেতে আমাকেও কয়েকবার চক্কর খেতে হল। খুঁজতে খুঁজতে শেষে একটা ইলেকট্রনিক স্টোরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দোকানের মালিক ছাড়া এই ঠিকানায় কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়। তাও একেনবাবুকে গাড়িতে বসিয়ে আমি নামলাম। পার্কিং নেই, গাড়িতে কেউ না থাকলে টিকিট দেবে।
ছোট্ট দোকান, মালপত্রে ঠাসা! সেলস কাউন্টারে একজনই। লোকটাকে দেখে মনে হল হিস্পানিক। এড ফাউলারের নাম শুনে বেশ বিরক্ত হল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বলল,
“কালকেও একজন এসেছিল তোমাদের দেশ থেকে, একই প্রশ্ন করেছিল। উত্তরটা কি এক দিনের মধ্যে পালটে যাবে?”
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “আমি খুব লজ্জিত, খবরটা জানতাম না।”
মোস্ট আনফ্রেন্ডলি লোকটা। বলল, “এখন তো জানলে, গুড বাই।”
“ওকে।” বলে আমি বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম।
“রং অ্যাড্রেস! খামোকা আসা হল।”
“আই অ্যাম কনফিউজড স্যার, একটা ভুল ঠিকানা ভদ্রলোক কেন দিলেন?”
আমি গাড়িটা স্টার্ট দিতে দিতে বললাম, “গুড কোয়েশ্চেন, কিন্তু উত্তরটা কে দেবে!”
“এই ঠিকানায় অন্য কোনো অ্যাপার্টমেন্ট নেই, বাড়িটা তো তিনতলা।”
একেনবাবুর কথায় খেয়াল হল। নামার সময় অত খেয়াল করিনি। স্টার্ট বন্ধ করে আবার ঢুকলাম দোকানে। “আচ্ছা, ওপরের তলা দুটোর ঠিকানা কি এক?”
লোকটা দেখলাম এবার বেশ চটেছে। “তুমি কি এদেশে নতুন এসেছ? জানো না, এক ঠিকানা দুটো জায়গার হতে পারে না!”
আমি চুপ আছি দেখে বোধহয় একটু করুণা হল। বলল, “উপরের ঠিকানা ৩৮ আর ৩৯। আর কিছু জানতে চাও?”
“না, না থ্যাঙ্ক ইউ, সরি।”
ফিরে এসে একেনবাবুকে বললাম, “আপনার প্রশ্নের উত্তর হল। ৩৮ আর ৩৯।”
“হ্যাঁ, সেটাই বুঝতে পারলাম।”
“তার মানে!”
“ওই যে দেখুন, সামনের দোতলা বাড়িতে লেখা ৪৮; আর তার পাশে একটা তিনতলা বাড়ি, সেখানে অবশ্য ঠিকানা কোনো লেখা নেই। কিন্তু ওগুলোর নম্বর নিশ্চয় ৫০, ৫১ আর ৫২। কারণ পাশের লম্ৰোম্যাটে নম্বর হচ্ছে ৫৩।”
আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, “এই ক্যালকুলেশনটা একটু আগে করলেই পারতেন, আমাকে দোকানের লোকটার ধাঁতানি খেতে হত না। আর খুঁজছেন তো ৪৭!”
“তা ঠিক, কিন্তু আরেকটা জিনিসও বার করেছি স্যার।”
“কী?”
“আমার মনে হয় এড ফাউলার লিখতে চেয়েছিলেন ৪৯। দেখুন, ৭-এর সামনেটা একটা শুড়ের মতো, ওটাকে ইংরেজি ৯-ও মনে করা যায়।”
“সব কিছুই মনে করা যায়, কিন্তু আমি আর গাড়ি থেকে নামছি না। আপনি চান তো নেমে সন্দেহ নিরসন করুন।”
“নিশ্চয় স্যার, আপনি বসুন।”
একেনবাবু এলেন মিনিট কয়েকের মধ্যে। মুখ দেখেই বুঝলাম একটা কিছু ঘটেছে। কাউকে ফোন করতে করতে আসছিলেন। গাড়িতে উঠতেই স্টার্ট দিলাম।
“না, স্যার এখন যাওয়া যাবে না, একটু দাঁড়াতে হবে।”
“তার মানে?”
“আমার ধারণা এড ফাউলার খুন হয়েছেন। ধরে নিচ্ছি স্যার, ঘরে উনিই ছিলেন।”
“হোয়াট! কী বলছেন যা-তা!”
“ঠিকই বলছি স্যার। উপরে যাবার সিঁড়ির নীচে দেখলাম দুটো মেলবক্স। ৪৯ নম্বরের মেলবক্স-এ এড ফাউলার লেখা। ৪৮ নম্বরের মেলবক্সে কোনো নাম নেই। দোতলায় উঠে দেখি দরজাটা অল্প একটু খোলা। তার ফাঁক দিয়েই দেখলাম একটা লোক চিৎ হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। পুরো বুকটা রক্তে ভেজা। ভেতরে ঢুকলাম না, সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে ফোন করলাম।”
“ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট তো ম্যানহাটনের– এটা তো ওঁর জুরিসডিকশন নয়! 911 ডায়াল করলেই পারতেন!”
“জানি স্যার, কিন্তু এখানকার পুলিশকে ফোন করলে আমাদের নিয়ে ঝামেলা করত। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টই কুইন্সের পুলিশকে খবর দিচ্ছেন। আমাদের পরিচয়ও দিয়ে দেবেন। তাই পুলিশ না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি।”
“আচ্ছা বিপদ হল তো!”
কয়েক মিনিটের মধ্যে দুটো পুলিশের পেট্রল গাড়ি লালাবাতি ঘোরাতে ঘোরাতে এসে হাজির হল। গাড়িতে দুজন করে অফিসার। একজন পুলিশ গাড়ি থেকে নেমে আমাদের গাড়ির সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, “হু ইজ মিস্টার সেন?”
অন্য গাড়ি থেকে নেমে দু’জন গটগট করে দরজা খুলে উপরে গেল।
“দ্যাট মি স্যার, দ্যাট মি!” তড়িঘড়ি করে একেনবাবু গাড়ি থেকে নেমে হাতটা এগিয়ে দিলেন।
অফিসার হ্যান্ডশেক করল না। বরং সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞেস করল, “আপনি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর?”
“নট এ গুড ওয়ান স্যার, বাট ইয়েস।”
একেনবাবুর সাজপোষাক, ভাবভঙ্গি আর কথা বলার ধরণ দেখে অফিসারের ভুরুটা কোঁচকাল। “ডোন্ট অ্যাক্ট স্মার্ট, যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দিন। আপনি এই মৃত্যুর কথাটা রিপোর্ট করেছিলেন?”
“ইয়েস স্যার।”
“এখানে না করে ম্যানহাটনে কেন?”
“আমি ওখানে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টকে চিনি, আমি জানি উনি খবরটা ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবেন।”
“নেক্সট টাইম কল ৯১১। দিস ইস আওয়ার এরিয়া।”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“আপনি এখানে কেন এসেছিলেন?”
“বাংলাদেশের একজন ডিপ্লোম্যাট আমাকে পাঠিয়েছিলেন স্যার, এড ফাউলারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।”
“এড ফাউলার কে?”
“আমার ধারণা যিনি মারা গেছেন স্যার।”
“তিনি যে মারা গেছেন কি করে জানলেন?”
“দেখে তো তাই মনে হল স্যার।”
“দেখে মনে হল! আপনি অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেছিলেন?”
“দরজাটা খোলা ছিল স্যার, ভেতরে ঢুকিনি। দরজার বাইরের থেকেই দেখেছি।”
“যিনি এড ফাউলারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর নাম কি?”
“পুরো নামটা তো জানি না স্যার,” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “রহমান সাহেবের পুরো নাম কি স্যার?”
আমি মাথা নাড়লাম, “ঠিক জানি না।”
“কেন যোগাযোগ করতে চেয়েছিলেন?”
“এড ফাউলার বলে একজন ওঁকে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন, সেই ব্যাপারে।”
“চিঠি! কি ধরণের চিঠি?”
“ওঁর এক আত্মীয়ের খবর চেয়ে…”
“হোয়াট! ইউ আর মেকিং নো সেন্স!”
এভাবে প্রশ্ন আর উত্তর চললে পরিস্থিতিটা আরও গোলমেলে হয়ে যাবে। আমি তাই সংক্ষেপে ব্যাপারটা অফিসারকে বললাম।
অফিসার সেটা শোনার পর আমাকে প্রশ্ন করল। “আপনি কে?”
“আমি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়াই।”
“কী পড়ান?”
“ফিজিক্স?”
“আপনি এখানে এলেন কেন?”
“আমি মিস্টার সেনকে রাইড দিচ্ছি।”
“উনি আমাকে নানা ভাবে সাহায্যও করেন,” এটা বলার কোনো দরকার ছিল না একেনবাবুর। শুধু শুধু কথা বাড়ালেন।
“কী রকম সাহায্য?”
“নট রিয়েলি। আমরা অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করি। আমরা বন্ধু। ওঁর গাড়ি নেই, তাই ওঁকে অনেক সময় রাইড দিই।”
অফিসার একটু চুপ করে ঘড়িটা দেখলেন। তারপর একটু সরে গিয়ে সেলফোনে কার সাথে কথা বলতে শুরু করলেন।
আমি একেনবাবুকে বললাম, “আর মেলা আত্মীয়তা করবেন না, চলুন ওঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি যাওয়া যাক।”
অফিসার ফিরে এসে বললেন, “কখন এসেছিলেন আপনারা?”
“মিনিট দশেক আগে।”
“আপনাদের কোনো কার্ড আছে, যদি যোগাযোগ করতে হয়।”
আমি পকেট থেকে আমার একটা ভিসিটিং কার্ড দিলাম। আমাদের একই ফোন নম্বর। পেছনে একেনবাবুর নামটা লিখে দিলাম।
“ইউ মে গো নাই।”
আর দেরি না করে গাড়ি চালালাম।
“হঠাৎ, এভাবে ছেড়ে দিল! আমি ভেবেছিলাম আরও জেরা করবে।” আমি বললাম।
“আমার মনে হয় স্যার, বুঝতে পেরেছে আমরা জড়িত নই। মৃত্যুটা আমাদের আসার অনেক আগেই হয়েছে। মুখে যাই বলুক, ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট নিশ্চয় এদের বসকে ভালো করেই জানিয়েছেন আমরা কারা। তবে আমার মনে হয় স্যার রহমান সাহেবকে এরা জেরা করবে।”
আমরা বাড়ি ফিরে এড ফাউলারের খুনের খবরটা রহমান সাহেবকে জানালাম।
তিনি তো শুনে অবাক। বললাম, “পুলিশ হয়তো আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।”
“আমার সঙ্গে!”
“আমাদের কাছে শুনেছে, আপনি খোঁজ করছিলেন বলেই আমরা গিয়েছিলাম।” কথাটা শুনে রহমান সাহেব উৎফুল্ল হলেন না। বললেন, “লোকটা মরার আর সময় পেল না। শুধু শুধু একটা ঝুট-ঝামেলা!”
খুব একটা ঝুট-ঝামেলা অবশ্য নয়। পরে শুনলাম পুলিশ ইউএন-এর বাংলাদেশ মিশনে শুধু একটা ফোন করেছিল। রহমান সাহেবের ডিপ্লোম্যাটিক ইস্যুনিটি আছে। এসব ব্যাপারে ওঁকে ঘাঁটাবার কোনো এক্তিয়ারই পুলিশের নেই।
রহমান সাহেব পরের দিন সকালেই চলে গেলেন। পার্ফেক্ট জেন্টলম্যান। যাবার আগে আমাদের বাই’ বলে গেলেন–যার কোনো দরকার ছিল না। বার বার ধন্যবাদ দিলেন। বললেন, ঢাকায় কোনো দিন এলে, আমরা ওঁর সঙ্গে যেন অবশ্যই যোগাযোগ করি। নিজের একটা কার্ডও দিলেন। আমার একটু লজ্জাই লাগছিল। যে কাজটা আমরা করার চেষ্টা করছিলাম, সেটা যে কেউই করতে পারত। তাছাড়া এড ফাউলার ডেড, সুতরাং ওঁর বড়োচাচার প্রশ্নের উত্তরটাও পেলেন না।
