মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(২)

আর সাতদিন বাদে ক্রুজ শুরু হচ্ছে। সামার ভেকেশন চলছে বলে পড়ানোর দায়িত্ব নেই, দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেছি। বাইরের ঘরে দেখি একেনবাবু সোফায় বসে পা নাচাচ্ছেন। আমাকে দেখে বললেন, “বুঝলেন স্যার, প্রমথবাবু বলছিলেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বাংলাদেশ নাকি আমাদের পশ্চিমবঙ্গকে হার মানায়।”

 

বিশ্বনিন্দুক প্রমথর এটা বলার একমাত্র কারণ আমাকে উত্ত্যক্ত করা। প্রমথ জানে দুই বাংলা নিয়ে নীচের অ্যাপার্টমেন্টের তারেক আলীর সঙ্গে আমার নিয়মিত যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধটা মূলত কালচারাল সাইড –নাটক, গান, সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে। প্রমথ মাঝে মাঝে তাতে ইন্ধন জোগায়। একেনবাবুকে কিছু বলা মানে উনি সেটা আমাকে রিপিট করবেন। চেষ্টা হচ্ছে যুদ্ধের নতুন একটা ফ্রন্ট খুলতে।

 

আমি প্রমথর ফাঁদে পা দিলাম না। বললাম, “হতেই পারে, এ ব্যাপারে তো মানুষের হাত নেই। কিন্তু সে ব্যাটা গেছে কোথায়?”

 

“ল্যাবে। কী জানি একটা জরুরী কাজ আছে স্যার।” বলে একেনবাবু নিজের ঘরে অদৃশ্য হলেন।

 

আমি স্টোভ জ্বালাবার চেষ্টা করতে করতে ভাবছিলাম এবার এই প্রাগৈতিহাসিক স্টোভটাকে সার্ভিস করাতে হবে অথবা নতুন স্টোভ কিনতে হবে। আমি বা একেনবাবু কেউই ওটা জ্বালাতে পারি না। পাইলট কাজ করে না, বার্নারগুলোর অর্ধেক প্রায় বুজে গেছে। প্রমথ কিছু একটা করে, যার ফলে ওটা চালু হয়। কিন্তু ঠিক কী করে, সেটা ট্রেড সিক্রেট করে রেখে দিয়েছে! লাইটার দিয়ে ক্লিক ক্লিক করছি আর গ্যাস নবটা ঘোরাচ্ছি। হঠাৎ স্টোভটা দপ করে জ্বলে নিভে গেল! চমকে এক পা পিছিয়ে গেলাম, “হোয়াট দ্য হেল!” এমন সময় শুনি তারেকের গলা, “বাপিদাদা, কোনো সমস্যা?”।

 

বাইরের দরজা প্রমথ নিশ্চয় খোলা রেখে চলে গিয়েছিল, তারেক কখন ঢুকেছে খেয়ালও করিনি। ক’দিন আগে তারেক আমাকে এক চোট নিয়েছে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা নিয়ে, যার কনফ্লুশন–বাংলাভাষাকে বাংলাদেশই বাঁচিয়ে রাখবে, পশ্চিমবঙ্গ নয়। সেই থেকে আমি তক্কে তক্কে রয়েছি। কোনও সমস্যা ইংরেজি নয় ঠিকই, কিন্তু এটি ইংরেজি any problem-এর একেবারে আক্ষরিক অনুবাদ। কলকাতায় কেউ ওভাবে কথা বলে না। আমি তারেককে চেপে ধরতেই বলল, “এটা ইংরেজি নয়, এটা বাংলাদেশের বাক্-রীতি। আমরা এরকম করেই কথা বলি ‘সমস্যা নাই’, ‘অসুবিধা নাই, ‘অবশ্যই’। আপনি যদি এর মধ্যে ‘no problem’, certainly’ এসব খোঁজেন তাহলে তো মুশকিল!”

 

আমি অন্য লাইন ধরলাম। “শোনো তারেক, তুমি তো সেদিন লেকচার ঝেড়ে গেলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা বাংলাদেশের বই পড়ি না, সিনেমা দেখি না, ইত্যাদি। গত সপ্তাহে আমি সাতটা বাংলাদেশের নাটক দেখেছি ইউটিউবে, সেখানে তো ইংরেজির ছড়াছড়ি! ‘ফ্রেশ হয়ে নেওয়া’, ‘টেনশন নিও না, ‘ফান করা’, ‘লাভ করি’ ‘ওকে ডান’–এগুলো ইংরেজি নয়? না এগুলোও তোমাদের বাক-রীতি! এই করেই তোমরা বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখছ?”

 

“কী মুশকিল দাদা, আমি কি বলেছি বাংলাদেশে সবাই বাংলায় কথা বলে? ও কথা থাক, আরেকটা কথাও আমি বলেছিলাম, আমাদের দেশের নায়িকারা খুব সুন্দর দেখতে। সেটা কি এখন মানেন? আপনি তো আগে কাউকে দেখার যোগ্য মনে করেননি!”

 

“বাজে কথা বলছ, কখনোই সেটা বলিনি। দেখিনি এটুকুই বলেছি।”

 

“এখন তো প্রমথদাদার কাছে শুনলাম, আপনি নাকি বাংলাদেশের নায়িকাদের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন!”

 

“প্রমথর কোনো কথা তুমি বিশ্বাস কর? তবে এটা ঠিক তোমাদের অনেক সুন্দরী নায়িকা আছে। সে কথা থাক, এই সাত সকালে আমার কাছে নিশ্চয় নায়িকা-সংবাদ নিতে আসনি?”

 

“তা আসিনি, নাস্তা হয়েছে আপনাদের?”

 

“দুয়েকটা ইংরেজি শব্দ আমার অনারে ব্যবহার কোরো, ব্রেকফাস্ট বললে বুঝতে সুবিধা হয়।”

 

“ঠিক আছে দাদা, ব্রেকফাস্ট হয়েছে?”

 

“না দেখছ তো, স্টোভটাই জ্বালাতে পারছি না। প্রমথটা সকালবেলা অদৃশ্য হয়েছে!”

 

“তাহলে নীচে চলুন। আমাদের ওখানে খাবেন। একেনবাবু কোথায়, ওঁকেও দরকার।”

 

একেনবাবু বোধহয় স্টোভ জ্বালানোর ঝামেলা এড়াতে ঘাপটি মেরে শোবার ঘরে বসেছিলেন! নাম শোনামাত্র বেড়িয়ে এসে বললেন, “কেমন আছেন স্যার?”

 

“ভালো আছি। আপনাদের ডাকতে এলাম, নীচে আসুন একসঙ্গে চা কফি খাওয়া যাবে।”

 

একেনবাবুকে সতর্ক করলাম আমি, “এটা কিন্তু নিঃশর্ত খাবার অফার নয়, আপনাকে ওর দরকার বলেছে। খাবার পর কিছু অনুরোধ করলে ফেলতে পারবেন না।”

 

“কী যে বলেন স্যার, আপনিও দেখছি প্রমথবাবুর মতো কথা বলছেন। এই স্যারের সঙ্গে কি আমার সেরকম সম্পর্ক!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *