মেলাবেন তিনি মেলাবেন (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(১০)

টিমদের বাড়ি থেকে ফেরার দিন কয়েক বাদে শুক্রবার কলেজে যাচ্ছি। ফল সেমিস্টার শুরু হয়ে গেছে, দুপুরে একটা ক্লাস আছে। একেনবাবু বললেন, “স্যার, আজকে একজন মহিলা আপনাকে ফোন করতে পারেন। আমি থাকব না, তাই আপনার নম্বরটা দিয়েছি।”

 

“কী ব্যাপার? আর আপনি থাকছেন না মানেটা কী?”

 

“আমি স্যার ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের সঙ্গে একটা কাজ করতে ব্রুকলিনে যাব, সেখানে ফোনটোন রিসিভ করা যাবে না। কিন্তু ফোনটা ইম্পর্টেন্ট। প্যারিস থেকে মিস্টার ডুবোয়া বলে একজন নিউ ইয়র্ক পুলিশের কাছে কমপ্লেন করেছেন, ওঁদের ফ্যামিলির পুরোনো ট্রেজার, রোঁদার একটা স্কাল্পচার চুরি হয়েছে বলে।”

 

“দাঁড়ান দাঁড়ান, এটা কি টিমের সেই ছোট্ট স্ট্যাচুর কথা বলছেন?”

 

“হতে পারে স্যার।”

 

“কিন্তু আপনি এর মধ্যে জড়ালেন কি ভাবে?”

 

“সে আরেক কাহিনি। কথা প্রসঙ্গে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট বোয়ার কথাটা বলছিলেন। নিউ ইয়র্ক পুলিশ এরকম ভেইগ কমপ্লেন নেয় না। তাছাড়া চুরি হলেও হয়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু যেহেতু আমার মনে হল সঙ্গে আমাদের বন্ধু টিম ব্যাসারাথ জড়িত থাকতে পারেন, ভাবলাম এ নিয়ে যতটা সম্ভব জানা যায় যাক না।”

 

“তা তো বুঝলাম কিন্তু ফোন করেউনি কী বলবেন? আর আমি তো পুলিশ নই, আমাকে বলবেনই বা কেন। তাছাড়া এই যদি সেই মিস্টার ডুবোয়া হন, তাহলে তো তিনি ইংরেজিও জানেন না।” দায়িত্বটা কাটাবার জন্যে বেশ কিছু যুক্তি দিলাম।

 

“আমি পুরোটা বলিনি স্যার, ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আমাদের কথা ওঁকে বলেছেন। আমরা প্রাইভেট গোয়েন্দা হিসেবে ওঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করব। আর ফোন করবেন ওঁর মেয়ে। ব্রিজিট ব্যুভোয়া বা ওরকম কিছু একটা নাম। তিনি ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টরিয়াতে আছেন।”

 

“সে তো বুঝতেই পারছি, রিচ উয়োম্যান।”

 

“হ্যাঁ স্যার, আর শুনেছি খুব সুন্দরী।”

 

প্রমথর সঙ্গে থেকে থেকে একেনবাবুও আজকাল বেশ রসিক হয়ে উঠেছেন।

 

“আপনি সে খোঁজটা পেলেন কোত্থেকে?”

 

“অনুমান করলাম স্যার, ফ্রেঞ্চ লেডি তো!”

 

আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই আর প্রশ্ন না করে কলেজের দিকে রওনা হলাম।

 

দুপুরের ক্লাস শেষ করে সবে অফিসে ঢুকে নিজের চেয়ারে বসেছি। এমন সময় একটা ফোন এল। ফ্রেঞ্চ অ্যাকসেন্টে এক মহিলা আমার নামটাকে চন্দ্রবিন্দু দিয়ে মার্ডার করে খোঁজ করছেন। এমনিতেই ফ্রেঞ্চ অ্যাকসেন্টের ইংরেজি আমি ভালো বুঝি না, তার ওপর আমার অফিসে ওয়ারলেস সিগন্যাল ভালো আসে না, বেশ কেটে কেটে যাচ্ছে। মহিলার ইংরেজি জ্ঞানও ব্যাপারটা প্রাঞ্জল হতে দিচ্ছে না। যেটুকু উদ্ধার করলাম, সেটা হল উনি রাত দশটার ফ্লাইটে প্যারিস ফিরে যাচ্ছেন। কতগুলো কথা আমাদের জানা দরকার, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু ফোনে কথাগুলো বোঝাতে পারবেন না। পাঁচটা নাগাদ ওঁর হোটেলে এসে যেন দেখা করি।

 

আমার বিরক্তি লাগল। প্রথম কথা পাঁচটা নাগাদ ভিড় ঠেঙিয়ে ব্রুম স্ট্রিট থেকে পার্ক আর ফরটিনাইন্থ স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত যেতে হবে। আর সত্যি কথা বলতে কি, এইসব বড়োলোকদের জায়গায় একা একা যেতে আমার ভালোও লাগে না। তার ওপর ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি শুনতে হবে ফ্রেঞ্চ অ্যাকসেন্টে! সেটা বুঝব কি না কে জানে! হঠাৎ মনে হল বেভকে যদি বলি? বেভ ভালো ফ্রেঞ্চ জানে। যদিও আমাদের অফিস সেক্রেটারি, কিন্তু ভালো বন্ধু। যদিও এর মধ্যে ওকে জড়াতে ভালো লাগছিল না। সঙ্কোচও হচ্ছিল কী ভাবে কথাটা তুলব ভেবে। হোপ সি ডাসন্ট মাইন্ড। বেভের অফিস পাশেই। ওর কাছে যাবার আগেই দেখি ও এসে হাজির।

 

“তোমাকে ডিটেকটিভ ফোন করেছিল। জানতে চেয়েছে ব্রিজিট ব্যুভেয়ার সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে কি না।”

 

একেনবাবুকে বেভ পছন্দ করে। ডিটেকটিভ বলে ডাকে।

 

“হ্যাঁ, কথা হয়েছে।”

 

আমার মুখচোখের অবস্থা দেখে বেভ আঁচ করল একটা কিছু হয়েছে। চেয়ার টেনে বসে বলল, “সামথিং রং?”

 

ঠিক কি ভাবে প্রসঙ্গটা তুলব ভাবতে ভাবতে অকারণেই টেবিলের কাগজপত্রগুলো এদিক ওদিক সরালাম।

 

“ইউ ওয়ান্ট টু সে সামথিং, রাইট?”

 

“ইয়েস।”

 

“কী?”

 

“আজ সন্ধ্যায় তুমি কী করছ?”

 

“নট মাচ। কেন?”

 

“আমার সঙ্গে ডিনার খাবে?”

 

“ইউ আর নট ফলিং ইন লাভ উইথ মি, আর ইউ?” দুষ্টু দুষ্টু মুখে বেভ জিজ্ঞেস করল।

 

এতদিনে বেভকে চিনে গেছি বলে এগুলোতে তেমন লজ্জা বোধ করি না।

 

“নট ইয়েট, জাস্ট এ ডিনার ইনভিটেশন,” বেভকে বললাম। “তবে খাবার আগে তোমাকে আমার সঙ্গে এক জায়গায় যেতে হবে।”

 

“কোথায়?”

 

“ওয়ালড অ্যাস্টরিয়ায় ব্রিজিট ব্যুভেয়া বলে একজনের কাছে।” বেভকে ব্যাপারটা খুলে বললাম।

 

“নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড,” বেভ হাসল, কিন্তু হাসিটা যেন একটু নিষ্প্রভ। “এটা ডেট নয়, ইউ নিড অ্যান ইন্টারপ্রেটার।”

 

কথাটা অসত্য নয়। কিন্তু সেটা স্বীকার না করে ডিফেন্সিভ পজিশন নিলাম। “দ্যাটস নট ট্র, অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম, উই শুড গো আউট ফর ডিনার। কিন্তু উইক এন্ডে তো তুমি সব সময়ই ব্যস্ত থাকো?”

 

“হাউ ডু ইউ নো, ইউ নেভার অ্যাস্কড মি আউট!”

 

সর্বনাশ এর কি উত্তর দিই? কিন্তু কিছু তো একটা বলতে হবে!

 

আমার শব্দ সঙ্কট দেখে বেভের বোধহয় একটু করুণা হল। বলল, “উত্তর দিতে হবে, আই উড লাভ টু হ্যাভ ডিনার উইথ ইউ টু নাইট অর এনি নাইট।”

 

প্রমথ আমায় খ্যাপায় বেভ আমার প্রতি অনুরক্ত বলে। আমি অবশ্য হেসে উড়িয়ে দিই। বেভ একটু ফ্লার্ট করতে ভালোবাসে। সেক্রেটারির চাকরি করে শুধু জেদের বসে। ও শুধু সুন্দরী নয়, ও হচ্ছে একজন এয়ারেস। ওর দাদু ছিলেন ফিদি রিচ। একজন সাধারণ লোককে বিয়ে করে ওর মা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিলেন বলে বাড়ির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়। প্রথমে বেভের বাবার মৃত্যু, তারপর মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে বেভের মামা নিজের থেকেই এগিয়ে এসে একমাত্র ভাগ্নি বেভের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিছুদিন আগে যখন একটা টিভির খোঁজ করছিলাম তখনই ব্যাপারটা শুনি। বেভ এই গরীব প্রফেসরের পয়সা বাঁচাতেই ওর মামার বিশাল দোকানে নিয়ে গিয়েছিল। দেখেই বুঝেছিলাম উনি খুব স্নেহশীল লোক। বেভের সঙ্গে গেছি বলে প্রায় নামমাত্র টাকা দিয়ে টিভিটা পেয়েছিলাম। বিক্রিবাটা হয়ে যাবার পর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম বেভকে চাপ দিচ্ছেন ওর মায়ের নামে যে সব জমিজমা দাদু রেখে গেছেন তাড়াতাড়ি সেগুলোর দখল নিতে। আমাকে উনি ঠিক কী ভেবেছিলেন জানি না। কিন্তু আমাকেও বারবার বলেছিলেন বেভকে বোঝাতে। অনুমান করতে পেরেছিলাম, মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের কথা হচ্ছে। সেগুলো নিলে আর সেক্রেটারির কাজ করতে হবে না, পায়ে পা তুলে বাকি জীবন কাটাতে পারবে। এ নিয়ে আগে লিখেছি। থাক সে কথা।

 

ম্যানহাটনে পুরো একটা ব্লক জুড়ে ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টরিয়া হোটেলটা। কোনদিক দিয়ে ঢুকব যখন ভাবছি দেখলাম বেভ এগিয়ে গেল। হাবভাবে বুঝলাম আগে একাধিক বার এখানে এসেছে। নিজেই লীড নিয়ে আমার হয়ে ব্রিজিট ব্যুভেয়ারকে লবি থেকে ফোন করল। লবিতে আমিই একমাত্র ভারতীয়। তাই চিনিতে ব্রিজিটের অসুবিধা হল না। বেশ লম্বা ডেলিকেট চেহারার ব্রুনেট মেয়ে। মেয়ে বলছি কারণ বয়স বছর তিরিশ পঁয়তিরিশের বেশি হবে না। আমি বেভের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বেভকে কেন সঙ্গে এনেছি জানালাম। বেভ ফ্রেঞ্চ জানে –যদি ফ্রেঞ্চে ওঁর বক্তব্য বলতে সুবিধা হয়, তাহলে বেভকে বলতে পারবেন। পাছে উনি চটেন ওঁর ইংরেজি জ্ঞানের অপমান করছি। তাই যোগ করলাম আমার নিজের ইংরেজিও একটু উইক, তাই হয়তো ওঁর সব কথা হয়তো বুঝতে পারব না। বেভ ইন্টারপ্রেটারের কাজ করবে।

 

ভাগ্যিস বেভ সঙ্গে ছিল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে দুয়েকটা কথা বলেই উনি বোঁ করে ফ্রেঞ্চে চলে গেলেন। বেভই শ্রোতা। ইংরেজি থেমে থেমে বলেন, ফ্রেঞ্চ বলেন ঝড়ের বেগে। আমি চিন্তিত হচ্ছিলাম, বেভ ওঁর বয়ান কতটা বুঝতে পারছে। মধ্যে আমি শুধু বেভকে একবার জিজ্ঞেস করলাম যে সবকিছু বুঝতে পারছে কি না। বেভ বরাভয়ের একটা দৃষ্টি দিল। কথাবার্তা সব লবিতে বসেই হল। ব্রিজেটের আরেকটা কী কাজ ছিল, তাই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। বেভ কিছু একটা ওকে বলল। তখন উনি একটা কার্ড বেভকে ধরিয়ে দিলেন। আমাকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বললেন, ওকে আমার কনট্যাক্ট নম্বর দিয়েছি, যদি আর কোনো প্রশ্ন থাকে। হোটেল থেকে বেরিয়ে ঘড়িতে দেখলাম সোয়া ছ’টা। একটা ট্যাক্সি নিয়ে গেলাম পেনাং রেস্টুরেন্টে। ভালো থাই আর মালয়েশিয়ান খাবার পাওয়া যায় ওখানে। আমি আগে বার দুই খেয়েছি, দু’বারই একশোয় একশো। মনে হল বেভ খুশিই হবে। লাকিলি ভিড় ছিল না। একটা কর্নারে দু’জন বসার একটা বুথ পেয়ে গেলাম। বেশ নিরিবিলি।

 

যে মেয়েটি আমাদের অ্যাটেন্ড করছে সে বলল, আজকে একটা স্পেশাল ড্রিঙ্ক ওরা সার্ভ করছে –টম ইয়াম সিয়াম।

 

আমি বললাম, “টম ইয়াম তো একটা স্যুপ!”

 

“হ্যাঁ স্পাইসি স্যুপ, কিন্তু তাতে ভদকা, লেমন গ্রাস, লিচি সিরাপ আর লঙ্কার গুঁড়ো দিয়ে এটা বানানো হয়েছে।”

 

“সর্বনাশ! ঝাল হবে তো!”

 

“খুব অল্প লঙ্কা, তোমাদের ভালো লাগবে।”

 

বেভ বলল, “আমি নেব।”

 

এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে কেন। আমিও নিলাম। তারপর মেনু দেখে বেশ কয়েকটা ডিশ অর্ডার করলাম।

 

বেভ দেখলাম মিটিমিটি হাসছে।

 

“কী ব্যাপার?”

 

“আই গেট ড্রাঙ্ক ভেরি কুইকলি।”

 

“প্লিজ, আমাকে পুরো ব্যাপারটা বলার আগে ড্রাঙ্ক হয়ে যেও না, একেনবাবুকে আজ রাতে রিপোর্ট করতে হবে। গেলাসে চুমুক দেবার আগেই সবকিছু বলে ফেল, নইলে আবার ভুলে যাবে।”

 

ব্যাগ থেকে আই-ফোনটা বার করে বেভ বলল, “আই হ্যাভ রেকর্ডেড এভরিথিং, একদম ভেব না।”

 

ড্রিঙ্কটা সত্যিই চমৎকার। ঝাল-ঝাল মিষ্টি মিষ্টি একটা কিও আছে।

 

“সি ইজ এ রিচ এন্ড বিউটিফুল কাউন্টেস, তাই না?” বেভ গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল।

 

“শি ইজ ওকে, আমি অত ভালো করে দেখিনি।”

 

“কাম! কাম!”

 

“সত্যি বলছি, আমি তোমার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।”

 

“ডু ইউ ওয়ান্ট মি টু বিলিভ দ্যাট!”

 

“নো, কিন্তু ও কথা থাক, কী বলল বলো?”

 

বেভ গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিয়ে বাইরের দিকে একটু তাকাল। মনে হল ওর চোখের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য একটু নিষ্প্রভ। বাইরের দিকে তাকিয়েই আমার উদ্দেশ্যে বলল, “মনে হচ্ছে তুমি মোর ইন্টারেস্টেড ইন হার স্টোরি দ্যান মি।”

 

এত আচ্ছা ফ্যাসাদ! হ্যাঁ বললেও ঝামেলা, না বললেও।

 

তারপর আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আই গেট ইট, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু অ্যানসার।”

 

“দ্যাক্স নট টু বেভ,” আমি অন্তর থেকেই কথাটা বললাম।

 

“তাহলে আমাকে একটু অ্যাটেনশন দাও, তুমি ডিনারে নিয়ে এসেছ আমাকে।”

 

আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু বোকা বোকা হেসে বললাম, “আই অ্যাম অল ইয়োর্স।”

 

“গুড,” চোখদুটো আবার চিকচিক করে উঠল বেভের। বিজয়িনী হাসি হেসে বলল, “এখন তোমায় বলব।”

 

বেভের কাছে যা শুনলাম, তা টিমের কাছ থেকে আগেই শুনেছি। নতুনের মধ্যে হল ব্রিজিটের বাবা ব্রিজিটকে বলেছেন টিমের ওই স্কাল্পচারটা রোদাঁ-র হাতের কাজ। এরকম একটা স্কাল্পচার ওঁর ঠাকুরদার ছিল, যেটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছে এটাই সেই চুরি হওয়া জিনিস। ব্রিজিট অবশ্য বিশ্বাস করেনি। বাবা মাঝে মাঝেই স্কাল্পচার নিয়ে বেশী উত্তেজিত হয়ে যান, লজিক নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না। এটা ঠিক, ওঁর বাবা স্কাল্পচার নিয়ে বহু পড়াশুনো করেছেন। নামিদামি সব স্থপতির কাজ ও টেকনিকের সঙ্গে উনি পরিচিত। কিন্তু একটা কিছু দেখেই কনফিডেন্টলি সেটা কার কাজ বলে দেওয়া ব্রিজিটের মনে হয়েছে একটু বাড়াবাড়ি। তবে এটা যদি রোদাঁর হয় আর চুরি হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে ক্রুজশিপের স্টাফের কাছে থাকাটা বিস্ময়কর।

 

যাইহোক, ক্রুজ থেকে ফিরেই ব্রিজিটের বাবা রিক স্প্রে বলে একটি লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। লোকটি কমিশন নিয়ে আর্ট কালেক্টরদের দুষ্প্রাপ্য আর্ট জোগাড় করে দিতে সাহায্য করে। ব্রিজিট একবারই লোকটিকে দেখেছে। পছন্দ হয়নি, মনে হয়েছে গোলমেলে ক্যারেক্টার। ওর একমাত্র পজিটিভ হচ্ছে, ভালো ফ্রেঞ্চ বলতে পারে। বাবার কাছে মিস্টার ব্যাসারাথের ফোন নম্বর আর ঠিকানা ছিল। রিককে সেটা দিয়ে স্কাল্পচারটা জোগাড় করে রাখতে বলেন। আরও বলেন যে এক সময়ে ওটা ওঁর ফ্যামিলিতেই ছিল, কিন্তু চুরি হয়ে যায়। তবে সেই নিয়ে ঝামেলা করার দরকার নেই। দরকার হলে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দু’হাজার অফার করতে পারেন, প্রয়োজনে একটু ভয় দেখানো যেতে পারে। মোট কথা স্ট্যাচুটা ওঁর চাই-ই। অফার অ্যাকসেপ্ট করলে সঙ্গে সঙ্গে টাকাটা ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার করে দেবেন। ইন্সিডেন্টাল খর্চার জন্যে রিককে পাঁচশো ডলার ক্যাশও দেন। স্কাল্পচারটা পেলে আরও পাঁচশো ডলার কমিশন দেবেন। এটা প্রায় মাস তিনেক আগের কথা। ব্রিজিট আরও কয়েকদিন নিউ ইয়র্কে কাটিয়ে বাড়ি ফেরে।

 

প্যারিসে গিয়ে ব্রিজিট শোনে যে রিক স্প্রে জানিয়েছেন টাকার অঙ্ক অনেকটা না বাড়ালে ওটা পাওয়া যাবার সম্ভবনা নেই, তবে ভয় একটু দেখিয়ে এসেছেন –তাতে যদি কিছু কাজ হয়। কিন্তু তার কয়েকদিন পর রিক স্প্রে জানান যে মূর্তিটাই চুরি হয়ে গেছে! ব্রিজিটের বাবা তখন নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা কোয়াইট আনহেল্পফুল। তবে তাদের একজন মিস্টার একেন সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে তিনি যদি স্কাল্পচারটা উদ্ধার করতে সাহায্য করতে পারেন। যদি মিস্টার সেন কাজটার ভার নিতে রাজি হন ফী নিয়ে তখন কথা হবে।

 

“আর ও হ্যাঁ, এইটে –এইটে হল সেই স্কাল্পচারটার ফোটো, যেটা ব্রিজিটের বাবা কিনতে চেয়েছিলেন।” ব্যাগ থেকে বার করে বেভ আমাকে দিল।

 

একটা স্বল্পবাস পরা মেয়ে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে এমন কিছু আহামরি লাগল না। এর জন্যে হাজার-দুহাজার ডলার! আমি একবার ঘড়ির দিকে তাকালাম। প্রায় আটটা। এর মধ্যে খাবার এসে গেছে। বেভ আরেকটা ড্রিঙ্ক অর্ডার করল। আমি নিচ্ছি না দেখে বলল, “ইউ মাস্ট লার্ন টু রিল্যাক্স, কাল পরশু তো কলেজ নেই। হ্যাভ সাম ফান!”

 

টম ইয়াম সিয়াম বেশ পোটেন্ট ড্রিঙ্ক। ভাবছিলাম খাওয়াটা কি উচিত হবে! গাড়ি চালিয়ে অবশ্য আসিনি। বেভ আমার জন্যে অপেক্ষা করল না। আমার হয়ে আরেকটা ড্রিঙ্ক অর্ডার করে দিল। খেতে খেতে হাবিজাবি অনেক গল্প হল। তার বেশির ভাগই কলেজের লোকেদের নিয়ে, কিছু আমার নিজের বাড়ির কথা আর কিছু ওর নিজের জীবনের কথা, যার অধিকাংশই আমি মোটামুটি জানি। অন্যমনস্ক হয়ে জল খেতে গিয়ে আরেকটু হলেই টেবিলের ওপর রাখা ফোটোটার ওপর জল ফেলছিলাম।

 

বেভ তাড়াতাড়ি ফোটোটা টেবিল থেকে তুলে নিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কী করবে ফোটোটা নিয়ে?”

 

“একেনবাবুকে দেব, ওঁর ইনভেস্টিগেশনে যদি কিছু কাজে লাগে।”

 

“তাহলে এটা এখানে নষ্ট হবার আগে, আমি এটাকে রেখে দিই।” মুচকি হেসে ফোটোটা আবার ব্যাগে পুরল বেভ।

 

ভালোই হল ফোটোটার যা সাইজ, আমার পকেটে ঢুকত না। হঠাৎ আমার মনে পড়ল বেভ বলেছিল ওর দাদু আর্ট কালেক্ট করতেন। অজস্র টাকা থাকলে বোধ হয় সেগুলোই লোকে করে। কোনো কারণ ছাড়াই প্রশ্ন করলাম, “তোমার দাদুর কালেকশনে কোনও রোদাঁ রয়েছে কি?”

 

বেভের মুখটা হঠাৎ কেমন জানি সিরিয়াস হয়ে গেল। বলল, “জানি না। তোমাকে তো বলেছি, দাদু বেঁচে থাকতে ওই বাড়িতে শুধু একবারই গিয়েছিলাম। তবে আঙ্কল জ্যাক হচ্ছে ডাই হার্ড রোদাঁ ফ্যান। ওর সঙ্গে কথা বললে রোদাঁ সম্পর্কে যা জানার আছে সবই জেনে যাবে।”

 

“তাই নাকি, তাহলে তো এটা দেখাতে হচ্ছে! থ্যাঙ্ক ইউ।”

 

“ইন ফ্যাক্ট, উনি তোমার খোঁজ করছিলেন?”

 

“আমার! কেন?”

 

“বলব না।”

 

বেভের আরেকটা টম ইয়াম সিয়াম খাবার ইচ্ছে ছিল। আমি কোনোমতে নিরস্ত করলাম। বিল চুকিয়ে বেরিয়ে দেখি, বেভ আমার হাত ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরে আছে। অস্ফুটভাবে বলল, “টোল্ড ইউ, আই গেট ড্রাঙ্ক কুইকলি।”

 

“দুটো খেলে কেন?”

 

“ও আই হ্যাড এ লাভলি টাইম!”

 

অ্যালকোহলের প্রভাব আমার নিজের ওপরও একটু পড়েছিল। ওকে ব্যালেন্স করে হাঁটিয়ে নিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। ট্যাক্সিতে উঠেও আমার হাত ছাড়ল না। সারাটা পথ কাঁধে মাথা দিয়ে রইল। রাস্তায় বেভকে একা না ছেড়ে ওর অ্যাপার্টমেন্ট পর্যন্ত গেলাম। ব্যাগ থেকে হাতড়ে হাতড়ে চাবি বার করে দরজা খুলে বলল, “তুমি ভেতরে আসবে না?”

 

এমনভাবে কথাটা বলল যে উপেক্ষা করা কঠিন। কিন্তু না, আজকে ঢুকলে হয়তো নিজেকেই সামলাতে পারব না। নিজেকে সংযত করে বললাম, “বেভ, ইট ইজ লেট।”

 

“টুমরো ইজ স্যাটারডে।”

 

“আই নো।”

 

আমার গলার স্বরে একটা কিছু ছিল। বেভ জোর করল না।

 

“ঠিক আছে এসো না।” পরমুহূর্তে আমার গলা জড়িয়ে বলল, “বাট ইউ মাস্ট কিস মি গুডবাই।”

 

বেভ চলে যেতেই খেয়াল হল ওর কাছ থেকে ছবিটা নেওয়া হয়নি।

 

বাড়িতে ফিরে দেখি একেনবাবু টিভি দেখছেন।

 

“আপনি আছেন ভালো,” আমি অনুযোগের সুরে বললাম, “আমার ঘাড়ে ফ্রেঞ্চ মহিলাকে চাপিয়ে আপনি এখানে আরাম করে টিভি দেখছেন।”

 

“কী যে বলেন স্যার। আপনি তো ম্যাডাম বেভের সঙ্গে ছিলেন?”

 

“আপনি জানলেন কি করে?”

 

“কেন স্যার, আমি কি গোয়েন্দা নই?”

 

“তা মানি, কিন্তু আপনি তো ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের সঙ্গে মিটিং-এ ছিলেন?”

 

“প্রমথবাবু তো সেখানে ছিলেন না। তিনি আপনার অফিসে গিয়ে শুনলেন আপনি বেভ ম্যাডামকে ডেটে নিয়ে গেছেন।”

 

“ডেট! সেই রাস্কেলটা কোথায়?”

 

“তিনি ম্যাডাম ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে খেতে গেছেন।”

 

“চুকে গেছে। এখন শুনুন, আপনার ইনফরমেশন জোগাড় করতে আমার একশো ডলার গচ্চা গেছে!”

 

টাকার অঙ্কটা শুনে একেনবাবু আঁতকে উঠলেন। “সে কি! কী করে স্যার?”

 

“মেয়েটা তো ইংরেজি ভালো করে জানে না। তাই বেভকে নিয়ে গেলাম। খবরগুলো অন্তত পাওয়া গেল।”

 

“তা তো বুঝলাম স্যার, কিন্তু একশো ডলারের ব্যাপারটা আসছে কোত্থেকে?”

 

“আচ্ছা, একটা মেয়েকে শুক্রবার বিকেলে ইন্টারপ্রেটারের কাজ করিয়ে না খাইয়ে ছেড়ে দেওয়া যায়!”

 

“কখনোই না স্যার। তার ওপর ইন্টারপ্রেটার যদি বেভ ম্যাডাম হন। আমার কিন্তু স্যার বেভ ম্যাডামকে খুব পছন্দ।”

 

“বেশ তো পরের বার আপনিই ওকে নিয়ে যাবেন।”

 

“কী যে বলেন স্যার, আপনি থাকতে আমি কেন! আমি কফি বানাই স্যার, তারপর শুনি কী উদ্ধার করলেন ফ্রেঞ্চ লেডির কাছ থেকে।”

 

এইসব কথাবার্তার মধ্যেই প্রমথ এসে হাজির। এসেই আমাকে অ্যাটাক। “তোকে একেনবাবু একটা কাজের জন্যে পাঠালেন, আর তুই সেটা না করে বেভের সঙ্গে প্রেম করতে বেরোলি।”

 

“স্টুপিডের মতো কথা বলিস না!” আমি এক ধমক লাগালাম।

 

“না, না স্যার,”একেনবাবু আমার সমর্থনে এগিয়ে এলেন। “বাপিবাবু অনেক কিছু জেনে এসেছেন। বেভ ম্যাডাম না থাকলে খবরগুলো পাওয়াই যেত না।”

 

“আপনি আবার কিচেনে কী খুটখাট করছেন? আমি কফি বানাচ্ছি, আপনার কফি তো মুখে দেওয়া যায় না!” একেনবাবুকে সরিয়ে দিয়ে প্রমথ কফি তৈরির ভার নিল। তারপর আমাকে বলল, “শুনি অনেক কিছু কী জেনে এসেছিস?”

 

আমার কাছ থেকে সব শুনে একেনবাবু বললেন, “ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার!”

 

“কী ইন্টারেস্টিং পেলেন এর মধ্যে? একটা বুড়ো ফ্রেঞ্চম্যান একজনের গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের জিনিস নিজের ঠাকুরদার বলে দাবি করছে উইদাউট এ শ্ৰেড অফ প্রুফ। আর আপনার সাহায্য চাইছে সেটা কবজা করার জন্য। বলে দিন মিলিয়ন ডলার লাগবে। তার থেকে টিমকে একটা ভালো টাকা দিয়ে দিন আর বাকি জীবনটা বউদির সঙ্গে হেসে খেলে কাটান।”

 

“কী যে বলেন স্যার, আপনাদের ছেড়ে কোথায় যাব?”

 

“ও, আপনার জন্যে আমি আর বাপি বিয়ে করব না।”

 

“আরে না স্যার, তা বললাম কখন!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *