ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(৪)

আমাদের প্ল্যান ছিল সাড়ে ছ’টা নাগাদ নিউ হেরিটেজ হোটেলে যাব। প্রমথ আর আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে অশোক দুবে সম্পর্কে যেসব খবর পত্র-পত্রিকায় বেরিয়েছে সেগুলো গুগল সার্চ করে পড়তে লাগলাম। সব জায়গাতেই প্রায় একই খবর। শুধু লোকাল পেপার, ‘হোবোকেন উইকলি’-তে সংবাদটা একটু বড় করে পেলাম।

 

অশোককে গুলি করা হয়েছে ক্লোজ রেঞ্জ থেকে। খুন খারাবি সাধারণত টাকার জন্যেই হয়। মাগিং করতে গিয়ে বাধা পেলে ছুরিটুরি চলে, অনেক সময়ে গুলিও। এক্ষেত্রে পকেট থেকে মানিব্যাগ খোয়া যায়নি, যেটা পাজলিং। ডেডবডি পাওয়া গেছে বহু বছর বন্ধ হয়ে থাকা একটা পেপার ফ্যাক্টরির সামনে। সেখানে দিনের বেলাতেও লোকজন থাকে না, রাতে তো কথাই নেই। খানিক দূরে, ফ্যাক্টরির রাস্তা যেখানে বড় রাস্তায় গিয়ে পড়েছে, সেই মোড়ে কয়েকটা দোকান আছে। তাদের কর্মচারীদের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। গুলির আওয়াজ কেউই শোনেনি। পুলিশ এখন ভাবছে, খুনটা হয়েছে হয়তো অন্য কোথাও, বডিটা শুধু ডাম্প করা হয়েছে ফ্যাক্টরির সামনে।

 

এই রিপোর্ট কতটা নির্ভরযোগ্য কে জানে! রিপোর্টার কী করে জানল, পুলিশ কী ভাবছে বা না ভাবছে? সে কথা থাক, তবু কিছুটা ইনফরমেশন পাওয়া গেল।

 

বাইশতলা নিউ হেরিটেজ হোটেল ম্যানহাটানের কলম্বাস সেন্টারের কাছে। ভাবতে ভালো লাগে এরকম একটা ঝা-চকচকে হোটেলের মালিক ভারতীয়। মার্কিন মুলুকে মোটেল ব্যাবসায়ে অবশ্য বহু গুজরাতি রয়েছে। মোটেল হল মোটরবিহারীদের জন্য হোটেল, দূর পথে যেতে অল্প-খরচায় একটা রাত কাটানোর জায়গা। ছোটো ছোটো শহরে হাই-ওয়ের পাশে বা কাছাকাছি এইসব গুজরাতি মোটেলগুলোতে ম্যানেজার, রুম-সার্ভিস, রিসেপশনিস্ট, ক্যাশিয়ার সব ‘অল ইন দ্য ফ্যামিলি’। মিনিমাম ওয়েজ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, ওভারটাইম দিতে হয় না, এমন কি মাইনেপত্র ঠিক মতো না পেলেও হ্যাঁঙ্গামা হয় না। ওদের সঙ্গে কম্পিটিশনে সাহেবরা পেরে উঠবে কেন। বলা বাহুল্য, সেগুলো আর নিউ হেরিটেজ এক লিগের নয়। নিউ হেরিটেজ হোটেলে থাকতে হলে পকেট ভারী না হলে চলবে না। শুনেছি কয়েকটা সুইট আছে, যেখানে এক একটা রাতের জন্যে কম করে দু-তিন হাজার ডলার লাগে! আমি তো কল্পনাই করতে পারি না কারা থাকে ওখানে! ভারতীয় মালিকানার আরও দুয়েকটা ভালো হোটেল যে নিউ ইয়র্কে নেই তা নয়, কিন্তু এত বড় হোটেল চেন আগে হয়নি। ক্যানাডা, আমেরিকা, মেক্সিকো– এই তিনটে দেশ মিলিয়ে মোট বারোটা নিউ হেরিটেজ হোটেল চালু আছে। প্রত্যেকটাই ফাইভ স্টার প্লাস। আরও কয়েকটা খোলা হচ্ছে। নিউ হেরিটেজ হোটেল ইউরোপেও নাকি এবার যাচ্ছে। নিউ হেরিটেজ হোটেলে যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধে প্রায় সাতটা। দেবরাজকে বাইরে কোনও কাজে চলে যেতে হয়েছিল। কিন্তু, লবির রিসেপশনিস্টদের সতর্ক করে রেখেছিলেন। আমরা নিজেদের পরিচয় দেওয়া মাত্র রিসেপশন ডেস্কের পিছনে অফিসঘর থেকে ইন্দ্র রায় বেরিয়ে এলেন।

 

ইন্দ্রর বয়স বেশি নয়, বছর তিরিশ পঁয়ত্রিশের মধ্যে হবে। লম্বা চওড়া চেহারা। গায়ের রঙ বেশ ফর্সা। তীক্ষ্ণ নাসা, তার নীচে বেশ পুরু একটা গোঁফ। চুল ছোটো করে ছাঁটা, ঘন ভুরুর নীচে চোখদুটো বেশ বড়। টিপিক্যাল বাঙালি বাঙালি চেহারা নয়। পরিচয় নিয়ে জানলাম ইন্দ্রর মা পাঞ্জাবী, দেবরাজ সিং-এর দূর-সম্পর্কের মাসি। অর্থাৎ দেবরাজ ওঁকে বাঙালি বলে পরিচয় দিলেও উনি হচ্ছেন হাফ-বাঙালি। তবে বড় হয়েছেন কলকাতায়। ইন্দ্র বেশিক্ষণ কথা বলতে পারলেন না, রেস্টুরেন্ট বুকিং-এর কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। অনুরোধ করলেন মিনিট দশেক রেস্টুরেন্টে বসতে, তারমধ্যেই ওঁর কাজ শেষ হয়ে যাবে।

 

রেস্টুরেন্টে একটা কর্নার টেবিল ফাঁকা ছিল। সেখানে আমাদের বসিয়ে ইন্দ্র চলে গেলেন। যাবার আগে বলে গেলেন, “চা, কফি, যা-চান অর্ডার করুন, এভরিথিং ইজ অন দ্য হাউস।”

 

বসতে না বসতেই সারপ্রাইজ, প্রমথ রেস্টুরেন্টে ঢুকছে।

 

“তোর না কাজ ছিল?” আমি বললাম।

 

“ছিল, কিন্তু চুকে গেছে। বাড়িতেই যাচ্ছিলাম, যেতে যেতে ভাবলাম একেনবাবুর যদি কোনও হেল্প লাগে, তোকে দিয়ে তো কিছু হবে না!” তারপর চেয়ার টেনে বসে বলল, “কফি অর্ডার করেছিস?”

 

“না।”

 

প্রমথই উদ্যোগী হয়ে সবার জন্য কফি অর্ডার করে একেনবাবুকে বলল, “এর জন্যে কিন্তু আপনাকে চার্জ করব। আপনি এই কেস থেকে গুচ্ছের ডলার কামাবেন, আর কফি খাবেন আমার পয়সায়, সেটা চলবে না!”

 

“তোর কোনও চিন্তা নেই,” আমি বললাম, “ইন্দ্র বলে গেছে, এভরিথিং ইজ অন দ্য হাউস।”

 

“ইস্‌স, একটু আগে বলবি তো! আরও দু-চারটে জিনিস তাহলে অর্ডার করতাম!”

 

“তুই লেট-এ আসবি, তার কুফল কিছু ভোগ করবি না?”

 

প্রমথ এ নিয়ে আর কিছু বলার আগেই একেনবাবু বললেন, “একটা প্রশ্ন করব স্যার?”

 

“ইট ইজ এ ফ্রি কান্ট্রি, করুন। তবে উত্তর পাবার গ্যারেন্টি নেই।”

 

“তুই কি ভদ্রভাবে কিছু বলতে পারিস না?” আমি প্রমথকে ধমকালাম।

 

“অভদ্রতার কী দেখলি, এটা কি ফ্রি কান্ট্রি নয়? আর একেনবাবুর এই ভড়ং-এর কী দরকার, প্রশ্ন যা করার তা তো করবেনই!”

 

“আপনি এই প্রমথটাকে সহ্য করেন কী করে?” আমি একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম।

 

“কী যে বলেন, স্যার। প্রমথবাবু হলেন ডিমের মতো। বাইরের খোলসটাই কঠিন, ভেতরটা কুসুমের মতো নরম।”

 

“থ্যাঙ্ক ইউ একেনবাবু,” একেনবাবুকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার উদ্দেশ্যে প্রমথ বলল, “একেনবাবু লোক চেনেন, তুইই শুধু আমায় চিনলি না।”

 

প্রমথকে পাত্তা না দিয়ে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী প্রশ্ন ছিল আপনার?”

 

“কলকাতায় এখন কটা বাজে?”

 

আমি হিসেব করে বললাম, “এখন এখানে ডে-লাইট সেভিংস চলছে, তার মানে সাড়ে ন’ঘণ্টার ডিফারেন্স। ঘড়িতে এখন সাতটা। তার থেকে আড়াই ঘণ্টা বাদ দিন। তার মানে বিকেল সাড়ে চারটে। এবার দিনকে রাত করে ফেলুন। বিকেল সাড়ে চারটের বদলে ভোর সাড়ে চারটে।”

 

“এটা দারুণ হিসেব দিয়েছেন স্যার, মাথা দোলাতে দোলাতে একেনবাবু বললেন। আড়াই ঘণ্টা বাদ– রাতকে দিন, দিনকে রাত।” তারপর এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “এই ডে-লাইট সেভিংস-এর ব্যাপারটা কেন এল বলুন তো?”

 

“আমি শিওর নই, শুনেছি এনার্জি বাঁচাবার জন্যে এটা শুরু হয়েছিল।”

 

“তার মানে?”

 

“বসন্তকালে সূর্য যখন সকাল সকাল ওঠে, তখন ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দিলে রাত আটটা-নটা পর্যন্ত আলো থাকে। আলো থাকতে থাকতেই অফিস-স্কুল-কলেজ, দোকানপাট, সবকিছু চলে। অর্থাৎ আলো জ্বালানোর খরচা বাঁচে।” ।

 

“ব্যাপারটা বোঝা গেল না স্যার, তার থেকে বসন্তকালে সবকিছু এক ঘণ্টা আগে খুললেই তো সমস্যা মিটে যায়।”

 

“তা যায়।”

 

“তাহলে?”

 

এইসব কথাবার্তার মধ্যেই ইন্দ্র এসে হাজির।

 

কিছু কিছু লোক আছে, যারা বেশি কথা বলতে ভালোবাসে, ইন্দ্র সেই দলে। একটা প্রশ্ন করলে তিনটে প্রশ্নের উত্তর দেন! জানা গেল, ইন্দ্র আর অশোক দুবে ইন্ডিয়াতে ক্লাসমেট ছিলেন। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন একই বছরে। চাকরিতেও ঢুকেছিলেন একসঙ্গে, ওবেরয় হোটেলে ট্রেইনি হিসেবে। কয়েক বছর সেখানে কাজ করে নিউ হেরিটেজ হোটেল গ্রুপ-এ যোগ দেন। অশোক নিউ ইয়র্কে আসেন, ইন্দ্র যান সিঙ্গাপুরের ব্রাঞ্চে।

 

জিজ্ঞেস করলাম, “সিঙ্গাপুরেও আপনাদের হোটেল আছে?”

 

“আছে, কিন্তু ওটা নিউ হেরিটেজ হোটেল নয়, নিউ এজ হোটেল। মালিকানা এক, কিন্তু টেকনিক্যাল কারণে নামটা অন্য। নিউ এজ হোটেল ইন্ডিয়াতেও আছে।”

 

“সবগুলোতেই ‘নিউ স্যার, বেশ ইন্টারেস্টিং।” একেনবাবু মন্তব্য করলেন। “হেরিটেজ আর এজ– দুটোই তো এমনিতে ওল্ড, কিন্তু নিউ লাগিয়ে কেমন জানি ‘নতুন’ হয়ে গেছে।”

 

‘নিউ লাগানোর কারণটা অবশ্য অনুমান করা যায়। নিশ্চয় হেরিটেজ হোটেল অন্য কোনও কোম্পানির নামে রেজিস্টার্ড। কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করে ইন্দ্র বললেন, এটা দেবরাজদার স্বভাব, সবকিছুতেই একটা টুইস্ট।”

 

“কথাটা একটু বুঝিয়ে বলুন স্যার।”

 

“মানে টুইস্টেড সেন্স অফ হিউমার। আমাদের কফি শপের নাম ‘বিফোর এন্ড আফটার’। কফি শপ-এর এরকম নাম কেন বলুন তো?”

 

আমাদের চোখে বিস্ময় দেখে বললেন। কারণ, মেইন কোর্স এখানে পাবেন না, পাবেন অ্যাপেটাইজার আর স্ন্যাকস– যা মেইন কোর্সের আগে অর্ডার করা হয়, সেই জন্য ‘বিফোর’।”

 

“এবার বুঝেছি,”প্রমথ বলল, “চা, কফি, আইসক্রিম, কেক– এগুলো অর্ডার করা হয় মেইন কোর্সের পরে, তাই ‘আফটার’। ভেরি ক্লেভার।”

 

এটা কতটা টুইস্টেড হিউমার জানি না, তবে নামটা নিঃসন্দেহে মজাদার।

 

“আরও শুনুন,” ইন্দ্র বলে চললেন, “এখানে সবে জয়েন করেছি। প্রথম দিন দেবরাজদার অফিসে ঢুকে দেখি জানলায় তিনটে মাছি বসে, আর দেবরাজদা হাউসকিপিং এর ম্যানেজারকে ধমকাচ্ছেন। “কী পরিষ্কার করেন অফিস, সেই তখন থেকে মাছিগুলো বসে আছে!”

 

ভদ্রলোক দৌড়ে একটা মাছি মারার স্পেয়ার নিয়ে জানলায় স্প্রে করলেন। কোথায় কী, কিচ্ছু হল না! ভদ্রলোক অবাক হয়ে আরও কয়েকবার স্প্রে করলেন, মাছিগুলোর নড়ার নাম নেই! তখন দেবরাজদা চটে উঠে বললেন, ‘বেরোন তো, আমি দেখছি। বলতে কি, প্রায় ধাক্কা দিয়েই ভদ্রলোককে ঘর থেকে তাড়ালেন!

 

আসলে আঠা দিয়ে দেবরাজদাই কয়েকটা মরা মাছি জানলায় আটকে রেখেছিলেন। ভদ্রলোক চলে যাবার পর, কাগজ দিয়ে খুঁচিয়ে মাছিগুলোকে মাটিতে ফেললেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে বললেন, ‘এই রামলাল সব সময়ে বড়াই করে ওর মতো এফিশিয়েন্ট নাকি কেউ নয়, তাই একটু শিক্ষা দিলাম।”

 

মনে হল ইন্দ্র ওঁর দেবরাজদার একজন বড় ভক্ত। এ নিয়ে হয়তো আরও গল্প চলত। আমিই প্রসঙ্গ পালটে জিজ্ঞেস করলাম, “কতগুলো হোটেল আপনাদের?”

 

“নিউ হেরিটেজ আর নিউ এজ নিয়ে মোট আঠাশটা।”

 

“চেইনটা যে এত বড়ো জানতাম না।”

 

“এখন কী দেখছেন, আরও অনেক বড় হবে। বিপাশা মিত্রের সঙ্গে একটা ডিল চলছে অনেকদিন ধরে, সেটা হয়ে গেলে ওঁর সঙ্গে জয়েন্টলি আরও পনেরোটা হোটেল খোলা হবে দু’বছরের মধ্যে! বিশ্বাস করবেন, শুধু একটা টু-স্টার হোটেল নিয়ে দেবরাজদা ব্যবসা শুরু করেছিলেন দশ বছর আগে। আজ সেটা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে! সব নিজের চেষ্টায় চটপট ডিসিশান নিতে পারেন, রিস্ক নিতে ভয় পান না। রিয়েলি একজন অ্যামেজিং পার্সন!”

 

“ম্যাডাম আর স্যার বুঝি খুব বন্ধু?” এবার একেনবাবু প্রশ্ন।

 

“দেবরাজদা আর বিপাশা মিত্রের কথা বলছেন?”

 

“হ্যাঁ, স্যার।”

 

“বন্ধু-শত্রু দুইই। শি ইজ এ টাফ উওম্যান। এই ডিল নিয়ে দেবরাজদা যা হিমসিম খাচ্ছে, তা বলার নয়। অন্যদের কিছু বলে না, কিন্তু মাঝে মধ্যে আমায় দুঃখের কথা বলে।”

 

আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আঠাশ প্লাস পনেরো, তার মানে দু-বছর বাদে দাঁড়াবে তেতাল্লিশটা! সবগুলোই এই ক্লাসের হোটেল, সত্যিই ইমপ্রেসিভ!

 

যাক সে কথা, এখন ইন্দ্রের কথায় ফিরে আসি। গত বছর ইন্দ্র এখানে চলে আসেন। অশোকের অ্যাপার্টমেন্টে একটা ঘর ফাঁকা ছিল। সেখানেই ইন্দ্র এসে ওঠেন। প্রথমে টেম্পোরারি বন্দোবস্ত হিসেবে। কিন্তু অশোকের আগ্রহে, সেটাই পার্মানেন্ট হয়ে যায়। একথা সেকথার পর একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “অশোকবাবু কি কোনও দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন স্যার?”

 

“দুশ্চিন্তা? না, তেমন তো কিছু নজরে পড়েনি! মাঝে মাঝে আমাদের সবারই একটু আধটু মন খারাপ হয়, সেগুলো ধরছি না। তবে হ্যাঁ, টাকাপয়সা নিয়ে ওর একটা সমস্যা চলছিল। তা নিয়ে একটু চিন্তাও ছিল।”

 

“কী ধরণের সমস্যা স্যার, আপনি জানেন?”

 

“সমস্যা মানে অশোক যা রোজগার করত, সবই খরচ করে ফেলত। না, না, নিজের জন্য নয়, নানান সৎ কাজে জড়িয়ে ছিল ও। ফলে টাকার টানাটানি প্রায়ই ওর হত।”

 

“আই সি, ওঁর কোনও শত্রু ছিল স্যার?”

 

“অশোকের শত্রু? মানুষের উপকার ছাড়া অন্য কিছু তো ওকে করতে দেখিনি। আমাকে ধরুন, চাকরি পেয়েই একটা গাড়ি কিনে ফেললাম। অশোক চাকরি পেয়ে বাড়ি বানাবার প্রজেক্ট নিল। নিজের বাড়ি নয়, অনাথদের জন্যে একটা স্কুল বাড়ি। সত্যি কথা বলতে কি, নিজের জন্যে প্রায় কিছুই করত না। ওকে দেখে মনে হত কত ক্ষুদ্র মনের লোক আমরা!”

 

“বরাবরই উনি এরকম ছিলেন স্যার?”

 

“বরাবর। যখন ছাত্র ছিল তখনও অনাথ-আতুর দেখলে মুভড হত।”

 

“ওঁর ছেলেবেলা কি খুব কষ্টে কেটেছিল স্যার?”

 

মনে মনে ভাবছিলাম, শুধু একেনবাবুই এ ধরণের ফালতু প্রশ্ন করতে পারেন!

 

“নট অ্যাট অল। বড়লোক না হলেও সচ্ছলতার অভাব ছিল না ওদের বাড়িতে। যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। ওদের বাড়িতে আমি অনেকবার গেছি। ও ছিল আন্টি আর আঙ্কলের একমাত্র ছেলে, চোখের মণি। কালকেই আঙ্কলের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওঁর মৃত্যুর খবরে আন্টি এত ভেঙ্গে পড়েছেন, ডাক্তারকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে সামলাতে হচ্ছে।”

 

“ভেরি ট্র্যাজিক স্যার,” একেনবাবু বললেন, “এন্ড কনিফিউসিং।”

 

“কনফিউসিং?” ইন্দ্র বিস্ময়ভরে তাকালেন।

 

“মানে অশোকবাবুকে এইভাবে গুলি করাটা। আচ্ছা স্যার, উনি কি ব্যাগে অনেক টাকাকড়ি নিয়ে ঘুরতেন?”

 

“না, বেশির থেকে কমই বরং থাকত। আমরা প্রায়েই একসঙ্গে ট্রেনে বাড়ি ফিরতাম– কতদিন হয়েছে, রাস্তায় বা ট্রেন স্টেশনে কিছু কিনতে হলে আমার কাছে টাকা ধার নিয়েছে। বাড়ি গিয়েই অবশ্য শোধ দিয়ে দিত। এ নিয়ে আমি ওকে ঠাট্টা করেছি। ও বলত ‘পকেটে টাকা থাকলেই আজেবাজে জিনিসে খরচা করতে ইচ্ছে করবে। ধার করতে হলে কেনার আগে সাতবার ভাবব। পকেটে টাকা না থাকায় ঝামেলাতেও পড়েছে, তবু ক্রেডিট কার্ড করায়নি।”

 

“বুঝলাম না। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করাও তো ধার করা, ব্যবহার করার আগে সাতবার ভাবতে পারতেন?” প্রমথ বলল।

 

“ঠিক, কিন্তু সেটা ভার্চুয়াল ধার, কারো কাছ থেকে হাত পেতে পয়সা নেওয়া নয়। তাই ধার করছি বলে মনে হয় না।”

 

“যেদিন উনি মারা যান স্যার, সেদিন উনি আপনার সঙ্গে ফেরেননি?”

 

“না, বৃহস্পতিবার আমার ডে অফ। সেদিন অশোক একাই ফিরছিল।”

 

“আপনি কি জানেন স্যার, অশোকবাবু খুন হয়েছেন আটটা থেকে দশটার মধ্যে?”

 

“সেটাই শুনলাম। আমি পুলিশের ফোন পাই রাত এগারোটা নাগাদ। অশোক ওর ব্যাগে এমার্জেন্সি কতগুলো নম্বর রেখেছিল। প্রথমেই আমার নম্বর ছিল।”

 

“আপনি কোথায় ছিলেন স্যার ওই সময়ে মানে আটটা থেকে দশটার মধ্যে?”

 

“বাড়িতে।”

 

“একা?”

 

“না, অশোক ছাড়া আমাদের হোটেলের আরও তিনজন হোবোকেনে থাকে। প্রতি বৃহস্পতিবার আমার বাড়িতে সবাই তাস খেলতে আসে। কাজ থেকেই সোজা চলে আসে। তার আগেই আমি পিৎসা বা চাইনিজ অর্ডার করে আনিয়ে রাখি। খেয়ে দেয়ে খেলা শুরু করি।”

 

“ক’টা পর্যন্ত তাস খেলেছিলেন স্যার?”

 

“পুলিশের ফোন না পাওয়া পর্যন্ত।”

 

“বৃহস্পতিবার সবাই কখন এসেছিলেন?”

 

“এক্সাক্ট টাইম বলতে পারব না। রাস্তায় ভীড় ছিল বলে এডের একটু দেরি হয়েছিল আসতে, কিন্তু তাও আটটার আগেই এসেছিল।”

 

“আপনার এই কলিগদের নামগুলো বলতে পারেন?”

 

“নিশ্চয়। এডের কথা তো বললাম, এড গুয়ান্সিয়াল। অন্য দু’জন হল—শেখর পাণ্ডে, আর জিম ভেস্পি।”

 

“এঁরা কী করেন স্যার?”

 

“এড আর জিম আমাদের কিচেন স্টাফ। শেখরদা অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করে।”

 

“ট্রেন স্টেশন আপনাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কতদূরে?”

 

“কাছেই, হাঁটা পথে মিনিট পনেরো।“

 

“ওঁরা সবাই স্যার আপনার কাছাকাছি থাকেন?”

 

“জিম আর শেখরদার বাড়ি কাছেই। এড থাকে হোবোকেনের অন্য প্রান্তে। কিন্তু ও ট্রেনে যাতায়াত করে না, গাড়ি নিয়ে যায়।”

 

“ধরে নিচ্ছি স্যার, সেদিন অশোকবাবু শেখরবাবুদের সঙ্গে এক ট্রেনে ফেরেননি।”

 

“না, ফিরলে শেখরদা বা জিম দেখতে পেত।”

 

“আপনারা হোটেল থেকে বাড়ি ফেরেন কখন?”

 

“নির্ভর করছে ডিউটি কখন। ডে ডিউটি থাকলে ফিরতে ফিরতে সন্ধে সাড়ে ছ’টা সাতটা।”

 

“অশোকবাবু এত দেরি করে কেন ফিরছিলেন জানেন?”

 

“না। তবে অশোককে একটা কাজে বুধবার পেনসিলিভ্যানিয়া যেতে হয়েছিল জানি। বৃহস্পতিবার বিকেলে অফিসে রিপোর্ট করে তারপর বাড়ি ফিরবে বলেছিল। দেরিটা তার জন্য হতে পারে। কিন্তু ওর বডি পাওয়া গিয়েছিল ওল্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়াতে, যেটা বাস বা ট্রেন স্টেশন থেকে বাড়ি আসার পথে পড়ে না। তাই বুঝে উঠতে পারছি না কেন ওই পথ দিয়ে আসছিল!”

 

“হয়তো স্যার বাড়িতে আসছিলেন না, কারোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?”

 

“ওই নির্জন জায়গায়?”

 

“হয়তো যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রশ্নটা একবার করেছি স্যার, তাও আরেকবার করি… ওঁর টাকাপয়সার সমস্যা কি শুধু সৎকাজ নিয়ে?”

 

“মাই গড!” একেনবাবু কোনদিকে যাচ্ছেন এবার মনে হল ইন্দ্র বুঝেছেন।

 

“আপনার ধারণা ওঁকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছিল? কিন্তু কেন?”

 

একেনবাবু উত্তর দিলেন না। ইন্দ্র এবার বললেন, “একটা দুশ্চিন্তার কথা আমি জানি, কিন্তু তার সঙ্গে ব্ল্যাকমেল-এর কোনো সম্পর্ক নেই। ওর স্কুল বিল্ডিং প্রজেক্ট শেষ করা যাচ্ছিল না টাকার অভাবে সেটা নিয়ে খুব দুর্ভাবনা ছিল। আমি অবশ্য এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখিনি। এর আগেও এরকম নানান প্রজেক্ট নিয়ে ওকে মাথা ঘামাতে দেখেছি।”

 

“কোথাকার স্কুল বিল্ডিং স্যার?”

 

“তা বলতে পারব না।“

 

“কী ভাবে টাকা পাঠাতেন উনি?”

 

“তাও বলতে পারব না। মনে হয় ব্যাঙ্ক-ড্রাফট করে।”

 

“আপনি করতে দেখেননি?”

 

“না।”

 

“এসব প্রজেক্টের জন্যে উনি কি কারও কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন স্যার?”

 

“কার কাছ থেকে নেবে? বন্ধু বলতে তো আমরা। আমাদের কারোরই অত টাকা দেবার ক্ষমতা নেই।”

 

“টাকা ধার তো অন্য জায়গা থেকেও করা যায়, যায় না স্যার?”

 

“তা যায়।” ইন্দ্র একটু থতমতো খেয়ে বললেন। “এই নিয়ে দেবরাজবাবুর সঙ্গে কি ওঁর কথাবার্তা হয়েছিল?”

 

“তা হয়েছিল। ও হাজার দশেক ডলার অ্যাডভান্স চেয়েছিল দেবরাজদার কাছ থেকে। আমাকেও একটু তদবির করতে বলেছিল।”

 

“আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে টাকার দরকারটা খুব জরুরি ছিল।”

 

“হ্যাঁ, সেটা ঠিক।”

 

“আগে এরকম টাকা জোগাড়ের জন্যে ব্যস্ত হতে দেখেছিলেন?”

 

“না, তা দেখিনি।“

 

“আপনি কি দেবরাজবাবুকে টাকার কথাটা বলেছিলেন?”

 

“হ্যাঁ, দেবরাজদা বলেছিল একটু ভেবে দেখবে।”

 

“এটা কবেকার কথা স্যার?”

 

“অশোক মারা যাবার কয়েকদিন আগের কথা।”

 

“আই সি। বাড়িতে অশোকবাবুর ফোনটোন আসত স্যার?”

 

“কাজের বাইরে অশোক খুব একটা মিশুকে ছিল না। বাড়িতে এক আধটা ফোনই ওর জন্যে আসত। মিশেল বলে একজন মেয়ে মাঝে মাঝে ফোন করত। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম মেয়েটা ওর গার্লফ্রেন্ড। ইনফ্যাক্ট, আমি একটু আশ্চর্যই হয়েছিলাম, কারণ অশোকের সঙ্গে আমাদের এক কলিগের এক সময়ে বেশ ভাব ছিল। ইন প্যারালাল অশোক আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়েছে– সেটা অশোকের মতো ছেলের কাছে আশা করা যায় না। যাই হোক, পরে জানলাম মিশেল কমবয়সী মেয়ে নয়, আশি বছরের এক বৃদ্ধা হোবোকেনের ওয়েস্ট সাইডে গরীবদের জন্যে একটা স্যুপ কিচেন চালান। ওখানে অশোক মাঝেমাঝে গিয়ে সাহায্য করত।”

 

“আপনাদের সেই কলিগ, যাঁর সঙ্গে অশোকবাবুর ভাব ছিল স্যার, তাঁর নামটা কি?”

 

“সীমা শ্রীমালী। এখন সে অন্য হোটেলে কাজ করে।”

 

“এক সময়ে ভাব ছিল বললেন স্যার, তার মানে পরে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়?”

 

“রাইট। কেন, তার উত্তর আমি জানি না।”

 

“এ নিয়ে আপনার সঙ্গে কোনও কথা হয়নি?”

 

“না। অশোক আমার বহুদিনের বন্ধু ঠিকই, কিন্তু আমি যেমন মুখে যা আসে বলে ফেলি, অশোক তার সম্পূর্ণ উলটো। ভেরি প্রাইভেট পার্সন।”

 

“আর কার ফোন আসত স্যার?”

 

“ওর এক পিসতুতো দিদি ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকে, সে প্রায়েই ফোন করত। তার বিয়ে নিয়ে বেশ সমস্যা চলছিল, অশোককেও সেই দিদির জন্য দুশ্চিন্তা করতে দেখেছি। পিসি পিসেমশাই দেশ থেকে চলে আসায় সেই চিন্তাটা যায়।”

 

“আই সি।”

 

“এছাড়া… ও হ্যাঁ, আরেকটা ফোন আসে… মারা যাবার একদিন আগে। জন সামথিং… লাইনটা খারাপ ছিল, কথাগুলো কেটে যাচ্ছিল। কোনও নম্বরও দেয়নি। অশোক বাড়ি নেই শুনে পরে আবার ফোন করবে বলেছিল।”

 

“কখন ফোনটা এসেছিল স্যার?”

 

“এক্সাক্ট টাইম বলতে পারব না। সকাল এগারোটা সাড়ে এগারোটা হবে।”

 

“সেটাতো বুধবার ছিল স্যার?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“কিন্তু আপনি তো একটু আগে বললেন বৃহস্পতিবার আপনার ডে-অফ।”

 

“রাইট, কিন্তু সেদিন সকালে জ্বর জ্বর করছিল বলে আমি ছুটি নিয়েছিলাম।”

 

“পরে কি ভদ্রলোক আবার ফোন করেছিলেন স্যার?”

 

“না, বোধহয় ওর মৃত্যুর খবরটা জেনে গিয়েছিল।”

 

ইন্দ্রকে এবার একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ওঁর বাড়িতে আমরা যেতে পারি কিনা, যদি অশোকবাবুর ঘর থেকে কোনও ক্রু আবিষ্কার করা যায়।

 

পুলিশ এর মধ্যেই তন্ন তন্ন করে ঘরটা দেখেছে, ইন্দ্র জানালেন। কিছুই পায়নি। তবে আমরা আসতে চাইলে ওঁর কোনও সমস্যা নেই। শুধু কাল হোটেল থেকে ফিরতে ওঁর একটু দেরি হবে, রাত আটটার আগে বাড়ি পৌঁছবেন না।

 

ঠিক হল, রাত আটটার পরেই আমরা যাব।

 

ফেরার পথে প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “কী বুঝছেন?”

 

“বেশ কনফিউসিং স্যার।”

 

“আমার কি মনে হচ্ছে জানেন, অশোকের এই টাকার সমস্যা শুধু দান খয়রাত করার জন্যে নয়।”

 

“তবে কিসের জন্যে?”

 

“আই ডোন্ট নো। মে বি হি গট ইনটু ড্রাগস। পয়সা টয়সা উড়িয়ে পরে ধারকর্জ করে ড্রা কিনেছে। তারপর পাওনার টাকা দিতে না পারায় খুন হয়েছে। নইলে রাত্রিবেলা ওরকম নির্জন জায়গায় কেন যাবে ও? ড্রান্সের কেনাবেচা তো ওসব জায়গাতেই চলে, তাই না?”

 

একেনবাবু একটু উদাসীন ভাবে বললেন। “কে জানে স্যার, আটোন্সির রেসাল্টটা তো আমরা জানি না। অ্যাডিক্ট ছিল প্রমাণিত হলে অবশ্য খুনের একটা ব্যাখ্যা খাড়া করা যায়। নেশা বড় বিষম বস্তু।”

 

“অশোক ড্রাগ অ্যাডিক্ট হলে ইন্দ্র সেটা জানত,” আমি বললাম। “এই থিওরি আমি ঠিক মানতে পারি না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *