ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(২৭)
মঙ্গলবার জুন ৭, ২০১১
বেশ কয়েকদিন বেভকে অফিসে দেখিনি। বোধহয় ছুটি নিয়েছে। একটু অবশ্য অবাক লাগছিল। গত সোমবার কিশোরের বাড়িতে যখন ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম, ছুটি নেবার কথা বলেনি। চিন্তা হচ্ছিল শরীরটরির ঠিক আছে কি না, যেরকম ভাইরাল ফিভার হচ্ছে চারিদিকে! আজ দেখলাম এসেছে। আমায় ‘হ্যালো’ বলল ঠিকই, কিন্তু ওইটুকুই। মুখের সেই হাসিটা নেই। বেভ হচ্ছে সেই দলে, যাদের মনের ভিতরে কী চলছে তা পরিষ্কার মুখে ফুটে ওঠে। আজ যে ওর মন বিক্ষিপ্ত, সেটা বুঝতে এক মুহূর্তও লাগল না। কিন্তু দাঁড়িয়ে যে জিজ্ঞেস করব, সে সময়টা এই মুহূর্তে নেই। সকাল থেকে নানা জায়গায় ছুটোছুটি করে যখন আবার অফিসে ঢুকলাম তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। আজ আর কোনও মিটিং নেই, বাঁচা গেছে!
বেশ কিছুদিন হল আমি আর প্রমথ একটা এইচডি অর্থাৎ হাই ডেফিনেশন টিভি কেনার কথা ভাবছি। কিন্তু অনেক গবেষণা করেও কী কেনা হবে স্থির করে উঠতে পারিনি। একেনবাবুর এ ব্যাপারে কোনও উৎসাহ নেই। তার মানে ওঁর কাছ থেকে কোনও কন্ট্রিবিউশন আশা করা যাবে না। ইদানীং প্রমথও এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। তার কারণটা বুঝতে পারি। ও আর ফ্র্যান্সিস্কা নিশ্চয় শিগগিরি বিয়ে করার কথা ভাবছে, সেক্ষেত্রে শেয়ারে এখন টিভি কেনা অর্থহীন। প্রমথ বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে ভাবতে খুবই খারাপ লাগে। একসঙ্গে আমরা বহু বছর কাটিয়েছি। আমাদের বাড়ির যা কিছু জিনিসপত্র, সবই ভাগাভাগি করে কেনা। তাই আমি চাই এ বাড়ি থেকে ও কিছু জিনিস নিয়ে যাক ওদের নতুন বাড়িতে। প্রমথকে এ ব্যাপারে একটা হিন্টও দিয়েছি। ওর উত্তর, “চুপ কর শালা, বেশি বদান্যতা দেখাতে হবে না। বুঝতে পারি, আমাকে ছেড়ে যেতে হবে, এর জন্য গিল্ট ফিলিং-এ ভুগছে। একদিন হঠাৎ বলল, “হ্যাঁরে, বেভ মেয়েটাকে তো বেশ ভালোই দেখতে, তোকে পছন্দও করে। কিশোরকে ফুটিয়ে তুই ওকে বিয়ে কর। আমি বলেছিলাম, আমার জন্যে তোকে ভাবতে হবে না। তুই নিজে আগে বিয়েটা কর। কিন্তু একটু অ্যাডভান্সড নোটিস দিস। রিসেপশনের পার্টি তো সেই আমাকেই অর্গানাইজ করতে হবে।
এই দেখুন, এইচডি টিভি-র কথা বলতে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে এলাম। ঠিকমত গুছিয়ে লেখা আমার ধাতে নেই। যেটা বলছিলাম, প্রমথর ভরসাতে আর না থেকে আমি ঠিক করেছি, নিজেই এইচডি টিভি কিনবো। দোকান থেকে না কিনে মেল অর্ডার দিয়ে কিনলে কিছুটা সস্তায় পাওয়া যায়। কিন্তু টিভি যদি কাজ না করে, তাহলে কী করব? ফেরত পাঠানোও তো একটা ঝামেলা। এসব ব্যাপারে আমার অগতির গতি হল জনি চু। চায়না টাউনে ওর চেনাজানা কয়েকটা অ্যাপ্লায়েন্সের দোকান আছে, সেখান থেকে ভালো ডিসকাউন্ট জোগাড় করে দিতে পারবে, সে গ্যারান্টি আমায় দিয়েছে। প্ল্যান ছিল জনিকে পাকড়াও করে আজ লাঞ্চ টাইমে চায়না টাউনে যাব। মোটামুটি একটা আইডিয়া করতে পারব, ৩৭ থেকে ৪০ ইঞ্চি সাইজের টিভি কিনতে কত লাগবে। জনির একটাই ডিমান্ড ওকে চায়না টাউনে লাঞ্চ খাওয়াতে হবে। চাইনিজ খেতে নিজেই ভালোবাসি, আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না। জনিকে যখন ফোন করতে যাচ্ছি, বেভ ঘরে ঢুকল।
“আর ইউ বিজি?” প্রশ্নটা করল ঠিকই, কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করে চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
ওর বিষণ্ণ মুখটা দেখে খারাপ লাগল।
“কী হয়েছে বেভ, সামথিং রং?”
“আই থিঙ্ক আই অ্যাম গোইং টু ব্রেক-আপ উইথ কিশোর।”
এই বম্ব শেলটার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না।
“সেকি?”
বেভের চোখটা দেখলাম ছলছল করছে। বলল, “হি হ্যাঁজ এ স্টাক-আপ ফ্যামিলি।”
বেভের এই কনক্লশনের কারণ যে কিশোরের কাকা, সেটা বুঝতে আইনস্টাইন হবার প্রয়োজন নেই। বললাম, “তুমি কিশোরকে বিয়ে করতে যাচ্ছ, ওর আঙ্কলকে নয়।”
“ইউ ডোন্ট নো দ্য হোল স্টোরি।” বেভ প্রায় আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল।
আমি হিসেব করে দেখলাম ওর স্টোরি শুনতে গেলে আজ চায়না টাউন যাওয়া হবে না। কিশোরের উপর রাগও হল। র্যাস্কেলটা নিজে তো আমার সময় নষ্ট করছেই, আবার ওর গার্লফ্রেন্ডকে দিয়েও সময় নষ্ট করাচ্ছে! করছিস তো প্রেম, এত ভুল বোঝাবুঝির কী দরকার?”
বেভকে বললাম, “আমায় এখন চায়না টাউন যেতে হবে। ফিরে এসে যদি শুনি?”
“চায়না টাউনে কেন যাচ্ছ?”
বেভকে আমার কেনাকাটার ব্যাপারে কিছু বলার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু সোজসাপটা প্রশ্নের উত্তর না দিলেও চলে না। বললাম, “একটা টিভি খুঁজতে যাচ্ছি।”
“তার জন্যে চায়না টাউন কেন যাবে? জ্যাক তোমায় অনেক বেটার ডিল দেবে।”
“জ্যাক?”
“আমার আঙ্কল।”
“আবার এক আঙ্কলকে জড়াচ্ছ!” ফস করে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
“হি ইজ এ ডাউন-টু-আর্থ ম্যান, ইউ উইল সি। আর আমি তোমার সঙ্গে গেলে যে ডিল পাবে, কোথাও ম্যাচ করাতে পারবে না।”
এই অকাট্য যুক্তি খারিজ করে চায়না টাউন যাওয়া যায় না। তাও ইতস্তত করছি দেখে, বেভ বলল, “আনলেস ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট টু গো আউট উইথ মি।”
এরপর ওর সঙ্গে না যাওয়াটা অসম্ভব।
“আমি আসছি,” বলে বেভ বেরিয়ে গেল। একটু বাদেই ফিরে এসে বলল। “হেলেন আমাকে কভার করবে বলেছে, এখনি চল, লাঞ্চ টাইম হয়ে গেলে আঙ্কল জ্যাক দোকানে থাকবে না।”
.
বেভের আঙ্কল জ্যাকের দোকানটা দূরে নয়। দোকানের নামটা শুনেই চিনতে পারলাম। অনেকবারই দেখেছি, বেশ বড় সাইজের দোকান। ওটা যে বেভের আঙ্কলের সেটা জানতাম না। যেতে যেতে বেভ বলল, “আমি জানি না কিশোরের আঙ্কল কিশোরকে কী বলেছে, বাট হি ইজ বিহেভিং স্ট্রেঞ্জলি।”
“কী স্ট্রেঞ্জলি?”
উত্তরটা দীর্ঘ, সংক্ষেপ না করেই লিখছি–
যেদিন আমরা কিশোরের বাড়িতে ডিনার খেয়েছিলাম, তার পরের দিন কিশোর বেভকে ফোন করে বলে, ও ওর আঙ্কলকে বুঝিয়েছে, বেভ বাবার প্রফেশন নিয়ে মজা করছিল। বেভের বাবা একজন বিজনেসম্যান। তারপর বেভকে বলে, বেভ যেন সেই পরিচয়ই ওর বাড়ির সবাইকে দেয়।
‘কেন তোমাদের ফ্যামিলিতে কি ব্লু-কলার ওয়ার্কারদের নিয়ে সমস্যা আছে?’ বেভ ক্ষুব্ধ হয়েই প্রশ্নটা করে।
কিশোর উত্তরটা এড়িয়ে যায়। তোমাকে তো আমি মিথ্যে কথা বলতে বলছি না। তোমার বাবা তো বিজনেসম্যানই, প্লাম্বিং-তো বিজনেসই।
বেভ তখন রেগে গিয়ে বলে, “না, আমার বাবা প্লাম্বার ফার্স্ট, বিজনেসম্যান সেকেন্ড।
‘এই সামান্য একটা অনুরোধ তুমি রাখতে পারবে না? আমি তো তোমায় মিথ্যে কথা বলতে বলছি না!’
‘এটা সামান্য অনুরোধ নয়, তুমি আমার বাবার পরিচয় লুকোতে বলছ। আই অ্যাম প্রাউড অফ হিম।
কিশোর নাকি তখন বলে, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, পরে তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলব। তবে মনে রেখো– ডিস্ক্রিশন ইজ বেটার পার্ট অফ ভ্যালার”।
এটা শুনে বেভ এত রেগে যায়, ফোন নামিয়ে রাখে। কিশোর বেশ কয়েকবার ফোন করে, কিন্তু বেভ উত্তর দেয়নি।
মনে মনে ভাবলাম, কিশোরটা একটা ইডিয়ট।
এসব শোনার পর আমার ঠিক কী বলা উচিত মাথায় খেলল না। বেভের মাথা একটু ঠাণ্ডা না হলে যাই বলি না কেন লাভ নেই। সো সরি টু হিয়ার দিস। থিংস উইল ওয়ার্ক আউট’… এসব বললাম ঠিকই। কিছু তো একটা বলতে হবে। লাকিলি কয়েক মিনিটের মধ্যেই বেভের আঙ্কলের দোকানের সামনে পৌঁছে গেলাম।
.
বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু দোকানটা বিশাল। দু’তলা জুড়ে ডিসপ্লে। অজস্র টেলিভিশন পর পর সাজানো। এক পাশে হোম থিয়েটার– সেখানে থ্রি-ডি-র নানান সরঞ্জাম। আরেকদিকে তাকের ওপর সারি সারি ব্লু-রে ডিভিডি সেট। দোতালায় রয়েছে ডিজিট্যাল ক্যামেরা, ও অন্যান্য নানান ইলেকট্রনিক্সের সম্ভার। বেভের আঙ্কল জ্যাক দোকানে ছিলেন। শুভ্রকেশ সম্ভ্রান্ত চেহারার ভদ্রলোক। বয়স বোধহয় সত্তরের কাছাকাছি। কিন্তু স্বাস্থ্য এখনো অটুট। বেভকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বেভকে বললেন, “এই নিশ্চয় তোমার সেই বন্ধু, রাইট?”
“না জ্যাক, এ আমার আরেক বন্ধু। ভেরি ডিয়ার ফ্রেন্ড, বাপি। ও একটা টেলিভিশন সেট কিনবে। তোমাকে কিন্তু ওকে ভীষণ ভালো ডিল দিতে হবে, আমি ওকে কথা দিয়ে নিয়ে এসেছি।”
“তুমি কথা দিলে, কী করে সেটা ফেলব? কী ধরণের সেট তুমি খুঁজছে ইয়ং ম্যান?”
আমি কী চাই বললাম। উনি ঘুরে ঘুরে বেশ কয়েকটা সেট দেখালেন। আমি মেল অর্ডারে কি রকম দাম হয় সেটা জানি। টিভির প্রাইসের সঙ্গে যে ডিসকাউন্ট প্রাইস ঝুলছে, সেটা কিন্তু মেল-অর্ডারের থেকে অনেকটাই বেশি। আমি দরাদরি করতে পারি না। তাই ভাবছিলাম কী করে বেভের আঙ্কল জ্যাককে এড়ানো যায়। জ্যাক বোধহয় আমার মনের ভাবটা বুঝলেন। বললেন, “ডিসকাউন্ট প্রাইসের দিকে তাকিয়ো না, আমার ফেভারিট ভাগ্নির বন্ধুর জন্য দাম অনেক কম হবে। ধর, এটা কিনতে চাইলে, তোমায় ৫৯০ দিতে হবে না, ৫২৫ দিলেই চলবে। এই দাম তুমি মেল-অর্ডারে পাবে না।”
উনি ঠিকই বলেছেন, এই মডেলের দাম আমি দেখেছি ৫৫০ থেকে ৫৭০-এ বিক্রি হচ্ছে। আমি ঝট করে ডিসিশন নিয়ে ফেললাম। “এটাই আমি কিনব।”
জ্যাক চোখ টিপে বেভকে বললেন, “এরকম বেশি বন্ধুকে আর এনো না, আমি দেউলিয়া হয়ে যাব।”
উত্তরে বেভ জ্যাককে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেল।
আমি যখন চেক-আউট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ক্রেডিট কার্ড দিচ্ছি, তখন শুনি জ্যাক বেভকে বলছেন, “এবার তুমি বাড়িটার পজেশন নাও। আমি বুড়ো হচ্ছি, চিরদিন তো থাকব না।”
বেভ কিছু উত্তর দিলো না।
“আমি জানি তুমি কি ভাবছ, কিন্তু তোমার মা নিশ্চয় চাইতেন তাঁর প্রাপ্যটা তুমি নেবে। তাঁর কথাটা একটু ভেবো।” বলে জ্যাক বেভকে আবার জড়িয়ে ধরলেন।
আমার ক্রেডিট কার্ড স্লিপে সই করা হয়ে গেছে। দোকান থেকেই টিভিটা বাড়িতে ডেলিভারি দিয়ে দেবে। তার টাইম ইত্যাদি ঠিক করে যখন মুখ ঘুরিয়েছি দেখি বেভ অদৃশ্য। গেল কোথায়? দেখি জ্যাকও নেই।
খানিক বাদেই বেভ পাশের একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। “সরি, কেভিনের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হল। জানতাম না ও এখানে মাস দেড়েক ধরে কাজ করছে। খুব খুশি, এখানে মাইনেপত্র ভালো, সেলস কমিশন আছে। আই অ্যাম সো হ্যাপি ফর হিম।”
“কেভিন?”
“যে ফিলাটেলিস্ট কর্নারে কাজ করত। বললাম না তার কথা সেদিন?”
জ্যাকও আরেকটা ঘর থেকে উদয় হল। জ্যাককে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।
.
রাস্তায় বেরিয়ে বেভকে বললাম, “তুমি ঠিক জায়গাতেই নিয়ে এসেছিলে, তোমার আঙ্কল বলেই এরকম ডিল দিলেন। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।”
“ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। জ্যাকের মতো আঙ্কল হয় না, আমায় খুব ভালোবাসে। শুধু ওর নিজের মেয়েই ওকে বুঝল না।”
“কেন, কী হয়েছে?”
“শার্লি প্রায় আমার বয়সি। হাইস্কুল শেষ করতে না করতেই বাড়ি ছেড়ে ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। অত্যন্ত বাজে একটা ছেলে। ক’দিন বাদেই শার্লিকে ডাম্প করে পালায়। কিন্তু প্রেগনেন্ট করার আগে নয়। শার্লি বাড়ি না ফিরে অদৃশ্য হয়ে যায়।”
“ওর সেই বয়ফ্রেন্ড? সে কোথায়?”
“ছিল একটা ড্রাগ অ্যাডিক্ট, এখন বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না। শার্লিও হয়তো নেই।”
“তোমার আঙ্কলের আর কোনও ছেলেমেয়ে আছে?”
“না। হি ইজ অ্যালোন নাউ। কয়েক বছর আগে স্ত্রীও মারা গেছে।”
“ওঁর স্ত্রী কি তোমার বাবার বোন?”
“আন্ট মিশেল হল বাবার বোন। আঙ্কল জ্যাক আমার মায়ের ভাই।”
.
চুপচাপ কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমি বেভকে জিজ্ঞেস করলাম, “লাঞ্চ খাবে?”
“কোথায়?”
“তুমি যেখানে চাও।”
“তাহলে এসো, এখানে ঢুকি।”
.
সামনেই একটা থাই রেস্টুরেন্ট ছিল, সেখানে ঢুকলাম। ভেতরটা লোকে গিজগিজ করছে। লাকিলি রেস্টুরেন্টের সামনে ক্যানোপির নীচে কয়েকটা টেবিল সাজানো ছিল। তার একটাতে জায়গা পেয়ে গেলাম।
খাবার অর্ডার করার পর বেভ হঠাৎ বলল, “তুমি তো আমায় জিজ্ঞেস করলে না, জ্যাক কী পজেশন নেবার কথা আমায় বলছিল?”
প্রশ্নটা আমার মনে জেগেছিল ঠিকই, কিন্তু ব্যাপারটা পার্সোনাল মনে হওয়ায় প্রসঙ্গটা তুলিনি।
“ব্যাপারটা নিশ্চয় ব্যক্তিগত, তাই জিজ্ঞেস করিনি।”
“ইট ইজ নাথিং টু ডু উইথ মাই সেক্স লাইফ, ইউ ক্যান অ্যাস্ক।” বলে এক ঝলক হাসল বেভ।
আজ সকাল থেকে যে বিষণ্ণ ভাবটা ওর ছিল, সেটা বোধহয় কেটে যাচ্ছে।
বললাম, “বেশ তাহলে জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কী?”
“বলতে পারি, কিন্তু লম্বা গল্প, তোমার শুনতে ইচ্ছে না করলে আমাকে থামিয়ে দিও।”
“বেশ, তাই দেব।”
“আমার দাদু ভীষণ বড়লোক ছিলেন। আঙ্কল জ্যাক আর মা ছাড়া ওর আর কোনও ছেলেপুলে ছিল না। মা হাইস্কুলে থাকতে থাকতেই বাবার প্রেমে পড়ে। কলেজে শেষ করার আগেই বাবাকে বিয়ে করে। বাবা খুব সুপুরুষ ছিল, কিন্তু গরিব ফ্যামিলির ছেলে। দাদুর এ বিয়েতে সম্মতি ছিল না। আমার জন্মের খুব অল্প দিনের মধ্যেই মা মারা যায়। দাদুর সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ ছিল না। ওই ফ্যামিলিতে একমাত্র আঙ্কল জ্যাকের সঙ্গেই ছিল। আঙ্কল জ্যাক আমার বাবাকে ভালোবাসত। দাদু মারা যাবার আগে আমায় দেখতে চেয়েছিল। তখন আমার বয়েস বারো। জ্যাকই আমায় জোর করে নিয়ে যায়। হ্যাঁম্পটন বিচের ওপর একটা হিউজ ম্যানশন। সেখানে ঢুকে আমি প্রথম বুঝতে পারলাম, কী ভীষণ বড়লোক এই দাদু। বিছানায় শুয়েছিল, পাশে একজন নার্স। আমাকে দেখে বুড়ো লোকটা হাত ধরে কাঁদতে শুরু করল। ফ্র্যাঙ্কলি, আই হ্যাড নো ফিলিংস ফর হিম। এর ক’দিন বাদেই শুনি দাদু মারা গেছে। উইলে আমার জন্যে একটা ট্রাস্ট রেখে গিয়েছে। তাতে অনেক টাকা আর গ্রিনিচে মা যেখানে বড় হয়েছে সেই বাড়িটা। জ্যাক হচ্ছে সেটার ট্রাস্টি। জ্যাক চায়, আমি ওটা নিই, বাট আই অ্যাম নট গোইং টু।”
“কেন?” আমি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম।
বাবা যতদিন বেঁচেছিল দাদু বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা চেয়েছিল, আমার সঙ্গে যেন দাদু-দিদিমার যোগাযোগ থাকে, কিন্তু বুড়ো বারবার অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওর ধারণা বাবা টাকার লোভে সেটা চেয়েছিল। আমি বাবাকে জানি, হি নেভার কেয়ার্ড ফর মানি। মাকে ভালোবেসেছিল বলেই বিয়ে করেছিল। আই উইল নেভার টাচ দ্যাট ওল্ড ম্যান’স মানি অ্যাস লং অ্যাস আই লিভ।”
‘কিশোর এটা জানে?” কেন এই প্রশ্নটা করলাম নিজেই জানি না।
“না, একমাত্র তোমাকেই বললাম। আজ শুধু তুমি আর আমি। প্লিজ ডোন্ট ব্রিং কিশোর হিয়ার, আই অ্যাম সো সিক অ্যাবাউট হিস অ্যাটিচুড।”
খাবার এসে গেছে। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, বেভ সম্পর্কে আমার ধারণা কী দ্রুত পালটে যাচ্ছে।
“কী ভাবছ?” বেভের প্রশ্নে সম্বিত ফিরল।
“কিছু না।”
বেভ হাত দিয়ে নিজের কপাল থেকে চুলটা একটু সরিয়ে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “ডু ইউ ফাইন্ড মি অ্যাট্রাক্টিভ?”
“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
“ওটা তো আমার প্রশ্নের উত্তর হল না।”
“তুমি কি উত্তরটা জান না?”
“নো, আই অ্যাম স্টিল ওয়েটিং ফর দ্য অ্যানসার।”
বেভের দিকে তাকিয়ে আছি। এলোমেলো বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ে উড়ে কপালে এসে পড়ছে। ঠোঁটে আবছা লিপস্টিক। ক্যানোপির ফাঁক দিয়ে এক ফালি সূর্যের আলো টেবিলের উপর পড়েছে। তার রিফ্লেকশনে বেভের গলার হারের লকেটটা চিকমিক করছে। লকেটের ঠিক নীচেই, ওর সাদা নরম বুকের খাঁজের ভেতর গাঢ় লাল রঙের ছোট্ট একটা তিল। আগে খেয়াল করিনি। কালো ব্লাউজের বর্ডারে ওটা যেন আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। আমার চোখে কী দেখল বেভ জানি না, অকারণেই আমার দিকে তাকিয়ে একটু লাজুক হাসল। আমার চোখের সামনে ওর দুই গালে আস্তে আস্তে দুটো টোল পড়ল।
আমি নিজেকে প্রায় হারিয়ে ফেলছিলাম। সজোরে মনকে ঝাঁকা দিয়ে সামলালাম।
বললাম, “দ্য আনসার ইজ, ইয়েস আই ডু, ভেরি মাচ সো৷”
মুখটা আলো হয়ে গেল বেভের। একটু হেসে মুখ নীচু করে খেতে শুরু করল।
খানিক বাদে মুখ তুলে বলল, “আমি যা বললাম, তা তুমি বিশ্বাস করলে? এটা তো বানানো গল্পও হতে পারে?”
“তা পারে, তবে বাড়ির পজেশনের ব্যাপারটা নিশ্চয় অসত্য নয়, ওটা তোমার আঙ্কল জ্যাকের কথা।”
“বাড়িটা হয়তো ব্রুকলিনের ছোট্ট বাড়ি।”
“হয়তো, কিন্তু তুমি যাকে বলছ, সে হচ্ছে একটা গরীব প্রফেসর, তার নিজের বাড়ি নেই। আছে শুধু একটা ভাঙা গাড়ি।”
“আবার ওটা গ্রিনিচের ম্যানসনও হতে পারে। আমি যদি প্রপার্টি ক্লেইম করি, আই উইল বি এ ভেরি রিচ উওম্যান। তুমি একজন রিচ উওম্যানের সঙ্গে লাঞ্চ খাচ্ছ।”
“ঐ,” আমি বললাম, “রিচ এন্ড বিউটিফুল।”
“থ্যাঙ্ক ইউ। হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট ফ্রম এ রিচ এন্ড বিউটিফুল উওম্যান, ইফ শি ইজ রেডি টু অফার ইউ এনিথিং?” চোখে চোখ রেখে আবার প্রশ্ন করল বেভ।
মুখে প্রায় এসে যাচ্ছিল, ‘এভরিথিং’। ও মাই গড করছি কী– বেভ কিশোরের ফিঁয়াসে– এখনো এনগেজড! সতর্ক হয়ে উত্তর দিলাম, “মে বি অ্যানাদার গুড ডিল ফ্রম হার আঙ্কল জ্যাক।”
এগিয়ে একটু ঝুঁকে আমার হাতের ওপর হাতটা আলতো করে রেখে বলল, “ইউ আর সো ইজি টু প্লিজ।”
.
বিকেলে টিভি কেনার প্রসঙ্গে বেভের কথা এল। গল্প শেষ হলে প্রমথ মন্তব্য করল, “কিশোর তো মনে হচ্ছে ফুটে গেছে, মেয়েটাও ডিরেক্ট হিন্ট দিচ্ছে। ঝুলে যা, এ চান্স আর পাবি না।”
“চুপ কর, আই হ্যাভ আদার থিংস ইন লাইফ।”
“কি আবার আদার থিংস? করিস তো প্রফেসরি, ছাত্র পড়াস, খাতা দেখিস, আর কিছু ফালতু রিসার্চ।”
“আর একটা কথা বলবি না এ নিয়ে,” প্রমথকে আমি আল্টিমেটাম দিলাম।
“বেশ বলব না, কিন্তু তুইও এটা একেনবাবুর নতুন কাহিনির সঙ্গে যোগ করবি না। তোর একটা হ্যাবিট আছে নিজের ব্যর্থ প্রেমের একটা গাথা গল্পের ফাঁকে ঢুকিয়ে দেওয়া।”
প্রমথর কথা অগ্রাহ্য করে টিভি কেনার কাহিনিটা ঢুকিয়ে দিলাম। প্রথমত এটা ব্যর্থ প্রেমের গাথা নয়। বেভের প্রতি একটা আকর্ষণ যে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, সেটা অস্বীকার করতে পারি না, কিন্তু সেটা প্রেমের পর্যায়ে নয়।
