ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

(২৪)

 

শনিবার জুন ৪, ২০১১, বিকেল

 

বিকেল বেলা আমরা সবাই নিউ হেরিটেজ হোটেলে গেলাম। প্রথমে শেখরবাবুর খোঁজ করলাম। ইন্দ্র আগে থেকেই শেখরবাবুকে আমাদের আসার কথা জানিয়ে রেখেছিল। খবর দিতেই অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন।

 

ভদ্রলোক আমাদের থেকে অনেকটাই বড় হবেন। মনে হল বছর পঞ্চাশেক বয়স। কথাবার্তা বেশ হিসেব করে বলেন, ইন্দ্রের মতো হড়বড়ে নন। একেনবাবু যাই জিজ্ঞেস করেন, চোখ বুজে একটু ভেবে আকাশের দিকে তাকিয়ে যা বলার বলেন। বলতেই বলতেই চোখটা আবার বুজে ফেলেন। ভাবার সময়টা প্রশ্ন অনুসারে কম-বেশি হয়।

 

“ইন্দ্রবাবুর বাড়িতে কি আপনারা প্রতি বৃহস্পতিবার তাস খেলেন?”

 

এই সিম্পল প্রশ্নটার উত্তর এমন গভীর ভাবে চিন্তা করে দিলেন, মনে হল জীবনমরণ সমস্যার উত্তর দিচ্ছেন।

 

“প্রতি বৃহস্পতিবার বলা ঠিক হবে না। তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে খেলা হয়। হলে বৃহস্পতিবারই হয়।”

 

“কী খেলেন স্যার আপনারা, পোকার?”

 

আবার একটু নীরবতা।

 

“তাও খেলি, কেন বলুন তো?”

 

“আসলে স্যার, অশোকবাবুর মৃত্যু নিয়ে আমরা তদন্ত করছি, ইন্দ্রবাবু আপনাকে বোধহয় বলেছেন।”

 

“তা বলেছেন, কিন্তু তার সঙ্গে পোকার খেলার সম্পর্কটা বুঝছি না।”

 

“অশোকবাবু কি স্যার আপনাদের সঙ্গে পোকার খেলতেন না?”

 

“না।”

 

“কোনও দিন খেলেননি?”

 

শেখরবাবু আবার চিন্তামগ্ন হলেন। তারপর বললেন, “হাঁ, একদিন খেলেছিল।”

 

“কবে স্যার?”

 

“দিনক্ষণ আমার মনে নেই, তবে বেশি দিন আগে নয়।”

 

“আপনারা যখন খেলতেন, তখন অশোকবাবু কী করতেন স্যার?”

 

“ঘরেই থাকত। হয় বই পড়ত, নয় ফোনে কথা বলত। মাঝে মাঝে আমাদের ড্রিংকস এনে দিত।”

 

“ওখানে আপনাদের পাশে বসে ফোন করতেন স্যার?”

 

“না, না, আমাদের ডিস্টার্ব করত না। ফোন করার দরকার হলে একটু দূরে গিয়ে নীচু গলাতেই কথা বলত।”

 

“এক জায়গায় দাঁড়িয়ে স্যার?” প্রশ্নটায় শেখরবাবু একটু বিরক্তই হলেন। আমিও বুঝলাম না, এইসব আলতু ফালতু প্রশ্ন একেনবাবু করছেন কেন!

 

“আমি তাস খেলতে যেতাম, অশোক এক জায়গায় না পাঁচ জায়গায় দাঁড়িয়ে ফোন করছে দেখতে যেতাম না।”

 

একেনবাবু আরও বোধহয় কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাধা পেলেন। শেখরবাবু বললেন, “আমি এখন আর সময় দিতে পারব না। আপনার আর কিছু জানার থাকলে সেগুলো লিখে রেখে যান, আমি উত্তরগুলো ইন্দ্রের হাতে দিয়ে দেব।”

 

কথাগুলো বলে নমস্কার করে অদৃশ্য হলেন। একেনবাবুকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না।

 

.

 

জিম ভেস্পিকে পাওয়া গেল না। এড গুয়ান্সিয়াল ছিলেন। ইন্দ্র ওঁকে ডাকতে যাবার আগে আমাদের সতর্ক করে দিলেন, “এড একটু কুইক টেম্পার্ড। সাবধানে ওঁর সঙ্গে কথা বলবেন।”

 

ইন্দ্র চলে যেতেই প্রমথ একেনবাবুকে বলল, “এডকে চটিয়ে হোটেলের এতগুলো লোকের খাওয়া মাটি করবেন না কিন্তু।”

 

একেনবাবু আবার হিউমার ভালো বোঝেন না। বললেন, “ছি ছি স্যার, চটাব কেন?”

 

.

 

খানিকবাদেই এড এল। দাড়ি-অলা ছ’ফুট লম্বা গাট্টাগোট্টা একটা লোক। বয়স আমাদের মতোই হবে। মাথাটা কামানো, গলায় একটা সোনালী চেন। সোজা কিচেন থেকে এসেছে বলেই বোধহয় ঘর্মাক্ত কলেবর। রুমাল দিয়ে মাথা আর ঘাড় মুছছে। দেখে মনে হল বেশ উদ্ধত টাইপ।

 

ইন্দ্র আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এড বলল, “আমি ভীষণ বিজি, কথা বলার সময় নেই।”

 

একেনবাবু বললেন, “কখন আপনার সময় হবে স্যার, তখনই না হয় আমরা কথা বলব।”

 

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে এড খানিকটা ধমকের সুরেই বলল, “কী জানতে চাও?”

 

“স্যার, আপনি কি অশোকবাবুকে একটা পোকার খেলার বই দিয়েছিলেন?”

 

“ইজ দ্যাট এ ক্রাইম?”

 

“ক্রাইম কেন হবে স্যার, দিয়েছিলেন কিনা জিজ্ঞেস করছি।”

 

“দিয়েছিলাম।”

 

“কেন বলবেন?”

 

“আট ডলারের একটা বই কেন দিয়েছি, তার কারণ তোমাকে জানাতে হবে? গিভ মি এ ব্রেক!”

 

শেষের স্ল্যাংটার অর্থ একেনবাবু ঠিক বুঝলেন কিনা জানি না। জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি স্যার পোকার খেলার একজন এক্সপার্ট?”

 

“আই লাইক দ্য গেম।”

 

“শুধু কি ইন্দ্রবাবুদের সঙ্গে খেলেন, না অন্য জায়গাতেও খেলেন?”

 

“দ্যাটস নান অফ ইওর বিজনেস।”

 

কোনও সন্দেহ নেই লোকটা অত্যন্ত অবনক্সাস।

 

প্রমথ হঠাৎ বলে ফেলল, “হাউ অ্যাবাউট অ্যান আন্ডারগ্রাউন্ড পোকার জয়েন্ট?”

 

“গো টু হেল!” মুখচোখ লাল করে ক্ষিপ্ত এড চলে গেল।

 

.

 

এডের চড়া গলা শুনে ইন্দ্র ছুটে এল। আমাদের কাছে ক্ষমা চাইল এডের হয়ে। তার কোনও দরকার ছিল না। আমরা ইন্দ্রের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাব-ওয়ে ধরে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “শেখরবাবুকে খেলার সময়

 

অশোকবাবু কী করতেন, সে নিয়ে এত প্রশ্ন করছিলেন কেন?”

 

“কে জানে স্যার, মনে হল মিস্টার এডের সঙ্গে অশোকবাবুর কোনও আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়তো হয়েছিল, যার জন্য এড অশোকবাবুকে খেলা শিখিয়েছিলেন। খেলার সময় ফোনের অছিলায় অশোকবাবু মিস্টার এডকে অন্যের হাত সম্পর্কে সঙ্কেত দিতেন। লাভের অঙ্ক পরে ভাগাভাগি করতেন। অশোকবাবু অবশ্য ভাগের টাকাটা সকাজেই লাগাতেন। ভালো কাজের জন্য একটু অসৎ হওয়ার মধ্যে অশোকবাবু বোধহয় অন্যায় খুঁজে পাননি। পরে এই ভাগাভাগি নিয়েই হয়তো মিস্টার এডের সঙ্গে গোলমাল হয়। এভরিথিং ইজ পসিবল স্যার, নাথিং ইজ ইমপসিবল।”

 

“কালকে আমাদের প্রোগ্রাম কি?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।

 

“কালকে সকালে একবার পামেলা জোনসের কাছে যাব।”

 

“কাল তো রবিবার!”

 

“উনি কাল অফিসে থাকবেন। আমার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে স্যার।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *