ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

(১৬)

 

বুধবার মে ২৫, ২০১১

 

আজ তাড়াতাড়ি অফিসে এসে আমার পেপারটা নিয়ে পড়েছি। ওটাকে দশ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। একটা স্পেশাল ইস্যুতে পেপারটা যাচ্ছে, সাবমিশানের ডেডলাইন মিস করতে চাই না। ভাগ্যক্রমে আজ অফিসে কেউই প্রায় নেই। বেভকেও ওর ডেস্কে দেখলাম না। দরজা বন্ধ করে বেশ কয়েক ঘণ্টা কাজ করলাম। তারই মধ্যে ক্যাফেটেরিয়া থেকে একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে এলাম। বহুদিন বাদে সলিড প্রোগ্রেস হল পেপারটাতে। আজ কিশোরের সঙ্গে কফি খেতে হবে কথা দিয়েছি, নইলে আরেকটু কাজ করা যেত।

 

.

 

কিশোরকে এত রাগতে আগে আমি দেখিনি। রাগের তোড়ে বেশ কয়েকবার বলল, ‘তোর বন্ধু রামসুন্দরকে আমি খুন করব।’ কথার কথা ঠিকই, কিন্তু কফি কর্নারে, যেখানে আশেপাশে অনেকে আছে, এভাবে খুন করব’ বলাটা একেবারেই অনুচিত। আমি অনেক কষ্টে ওকে শান্ত করলাম। তারপর যেটা ওর কাছ থেকে উদ্ধার করলাম, সেটা হল রামসুন্দরের ব্যাপারটা বেভ কিশোরকে এতদিন জানায়নি। গতকাল তোবোকেনে যাবার পথে বলেছে। আমার সঙ্গে বেভের যা কথা হয়েছে তাও বলেছে।

 

কিশোর বলল, “স্কাউড্রেলটার আস্পর্ধা দেখ, বেভকে ভয় দেখাচ্ছে, ইন্ডিয়াতে গেলে পুলিশ দিয়ে আমাদের অ্যারেস্ট করাবে! কে কাকে অ্যারেস্ট করে দেখব। ব্যাটা জানে না যে আমার কাকা তামিলনাড়ুর ডিজি, হেড অফ পুলিশ। আমার মামা অন্ধ্রের ক্যাবিনেট মিনিস্টার, আমার মেসোমশাই দিল্লীতে…।”

 

“এর মধ্যে গুরুজনদের টানছ কেন, অবভিয়াসলি রামসুন্দর একটা সিলি কথা বলেছে।”

 

“না, আমি ওকে ছাড়ব না,” কিশোর বলল। “পরশু কাকা, নিউ ইয়র্কে আসছে, আমি জিজ্ঞেস করব রেড্ডী বলে কোনও পুলিশ অফিসার আছে নাকি। তাঁর জানা উচিত যে, তাঁর ছেলে এইসব কুকীর্তি করছে।”

 

প্রায় আধঘণ্টা গেল, কিশোরকে ঠাণ্ডা করতে। তারপর একথা সেকথার পর হঠাৎ বলল, “বেভ থিঙ্কস হাইলি অফ ইউ।”

 

আমি অবাক হবার ভান করে বললাম, “সেকি? ও তো কালকেই কমপ্লেন করল ওকে আমি ইগ্নোর করি!”

 

“মে বি দ্যাটস হোয়াই। এনিওয়ে, বেশি অ্যাটেনশন দিও না, কারণ উই আর গোইং টু গেট ম্যারেড সুন।”

 

“কংগ্রাচুলেশনস! এই দারুণ কথাটা এতক্ষণ চেপে রাখলে? সুন মানে কবে?”

 

“দুমাস। সেইজন্যেই আবার কাল আন্ট মিশেলের সঙ্গে দেখা করলাম। তোমাকে বলেছিলাম না, বোধহয় বেভকে নিয়ে মঙ্গলবার আন্ট মিশেলে কাছে যাব?”

 

“নিশ্চয় বলেছিলে, তখন খেয়াল করিনি।”

 

“আসলে তোমার সঙ্গে শুক্রবার যখন কথা হয়, তখনো বেভকে ফর্মালি প্রোপোজ করিনি। ঠিক করে রেখেছিলাম রবিবার করব। সোমবার কাজের জন্যে বাইরে থাকব, মঙ্গলবার ফিরে এসে বেভ আর আমি দুজনে মিলে আন্ট মিশেলকে সুখবরটা দেব। সো মেনি থিংস ক্যান হ্যাঁপেন। যতক্ষণ না বেভ বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে, ততক্ষণ বোধহয়-টা বাদ দিই কী করে?”

 

“তা তো বটেই।”

 

“আই ফিল ব্যাড যে তুমি আমার কাছে না শুনে অন্যের কাছে শুনেছ আমার প্রোপোজ করার কথা।”

 

“আমি এতটুকু মাইন্ড করিনি। তোমাদের এনগেজমেন্টের খবরে আন্ট মিশেল নিশ্চয় খুব খুশি হয়েছেন। উনি তো বেভের খুব ক্লোজ, তাই না?”

 

“হ্যাঁ, আন্ট মিশেলের কাছেই ও বড় হয়েছে। ওয়ান্ডারফুল লেডি। আশি বছর বয়েস, এখনো কী উৎসাহ নিয়ে স্যুপ কিচেন চালাচ্ছেন। প্রতিদিন প্রায় একশো লোক সেখানে খায়।”

 

“জাস্ট কিউরিয়াস… বেভের মা কি…”

 

কিশোর আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “বেভের মা মারা যান বেভ যখন এক বছরের। আন্ট মিশেলের বয়স তখন ষাটের কাছাকাছি, বেভের বাবার থেকে উনি ছিলেন প্রায় কুড়ি বছরের বড়। বেতের বাবা আর বিয়ে করেননি। তাই আন্ট মিশেলই বেভকে বড় করেছেন। বাই দ্য ওয়ে, ইউ উইল হ্যাভ টু বি মাই বেস্ট ম্যান।”

 

“আমার থেকে বেটার কাউকে পেলে না?” আমি ফাজলামি করে বললাম।

 

“কেন, তুমি হবে না?”

 

“নিশ্চয় হব, এটা তো একটা অনার। তা বাবা-মাকে খবরটা দিয়েছ?”

 

“হ্যাঁ, বেভকে প্রোপোজ করার আগেই দিয়েছি। ওঁরা অবশ্য একটু অ্যাপ্রিহেন্সিভ, কোন বাড়ির মেয়ে, কী করে– সে নিয়ে তাঁদের হাজার গণ্ডা প্রশ্ন। আসলে দেশে আমার জন্যে একটি পাত্রী পছন্দ করে রেখেছেন। মেয়েটাকে চিনি, এক ধনকুবেরের মেয়ে। সেটাও একটা কারণ। যাই হোক, কাকা কী একটা কাজে ওয়াশিংটন ডিসি-তে এসেছেন। নিউ ইয়র্কেও কিছু কাজ আছে। পরশু এসে সেগুলো সেরে আমার সঙ্গে কয়েকদিন থাকবেন। তাঁর কাছ থেকে শিওর ওঁরা অনেক রিপোর্ট নেবেন। তবে আমি বলে দিচ্ছি, শেষমেশ সবাই লাইনে এসে যাবে। বিয়েও অ্যাটেন্ড করবে।”

 

‘ওয়ান্ডারফুল।”

 

“কাকা এলে তোমায় ডাকব। ভেরি ইন্টারেস্টিং ম্যান। পুলিশে কাজ করেন বটে, কিন্তু ফিজিক্সে এম.এসসি করেছিলেন। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। তোমার মতো প্রফেসর হননি বলে এখনো আফশোস করেন। তুমি কি নেক্সট উইকে ব্যস্ত থাকবে? ডেটটা এখুনি বলতে পারছি না, কাকার অন্য কি প্ল্যান আছে না জানা পর্যন্ত।”

 

“আমি মোটেই বিজিম্যান নই। তোমার কাকার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে কোন প্রোগ্রাম থাকলেও ক্যানসেল করতে পারব।”

 

“থ্যাঙ্ক ইউ।”

 

“ভালো কথা, বেভকে বলেছিলাম ওর আন্টকে বলতে, ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। সেটা কি ও বলতে পেরেছে? আজ তো ওকে অফিসে দেখলাম না।”

 

“ও, হ্যাঁ, সেটাই তো তোমাকে বলতে বলেছে। ও কাল ফেরেনি, আন্ট মিশেলের সঙ্গে আজকের দিনটা কাটাবে বলে। তোমরা তো কাল সন্ধ্যার সময় যাবে? কোনও প্রব্লেম নেই। বেভ হয়তো তোমাদের সঙ্গে যেতে পারবে না, কিন্তু আন্ট মিশেলের ঠিকানা, যাবার ডিরেকশন, ফোন নম্বর সবকিছু কাল তোমাকে অফিসে দিয়ে দেবে।”

 

“কেন আমরা যাচ্ছি জান তো?”

 

“হ্যাঁ, বেভ বলেছে অশোক দুবের মার্ডারের ব্যাপারে। আন্ট মিশেল ওকে খুব ভালো করে চিনতেন। খুবই শকড ওর মৃত্যু নিয়ে। বেভ বলল, তোমার এক ডিটেক্টিভ বন্ধু এটা নিয়ে ইনভেস্টিগেট করছেন। নামটা ঠিক ধরতে পারেনি। কী নাম বল তো?”

 

“একেন্দ্র সেন। আমরা একেনবাবু বলে ডাকি।”

 

“ও মাই গড, নামটা তো চেনা চেনা লাগছে। ইনিই কি ম্যানহাটানের মুনস্টোন মিস্ট্রি ক্র্যাক করেছিলেন?”

 

“হ্যাঁ, ইনিই। ওঁর আরও অনেক কীর্তি আছে।”

 

“উনি যে তোমার বন্ধু সেটা তো জানতাম না!”

 

“তুমি হচ্ছ আমার ছাত্র জীবনের বন্ধু। পড়া শেষ করে তো বস্টন না কোথায় পাড়ি দিলে। এখানে এসে আমার অফিসে দেখা দিলে এই সেদিন, কয়েকমাস আগে। তারপর তোমার সঙ্গে বার কয়েক যে দেখা হয়েছে, সেটা হল এই কফি কর্নারে। সেই কথাবার্তাও মূলত তোমার ভাবি পত্নী বেভকে নিয়ে। আমি অভিযোগ করছি না, প্রেমে পড়লে বিশ্বের অন্য কোনও দিকে দৃষ্টি থাকে না। আই ফুল্লি আন্ডারস্ট্যান্ড।”

 

“তা ঠিকই,” কিশোর একটু লজ্জা পেল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *