ল্যাংড়া পাহান (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
তিন
প্রচণ্ড গর্জনে আমি ঘুম ভেঙে চমকে উঠলাম। কাছেই কোথাও একটি বাঘ আর একটি বাঘিনী একই সঙ্গে গর্জন করছে। মনে হচ্ছে গাছপালা, পাহাড়-পর্বত সব ভেঙে পড়বে।
চাঁদ উঠেছে চমৎকার। পরিষ্কার আকাশ। হাওয়া বইছে ঝিরঝির করে। করোঞ্জ আর নানা রকম ফুলের গন্ধে ভরে আছে সে হাওয়া। পিউ-কাঁহা পাখি ডাকছে। মাথা খারাপ করে দেবে। সাধে কি সাহেবরা এদের নাম দিয়েছে ব্রেইন ফিভার। আমি নদীর পাশে বালির উপরে শুয়ে আছি। ফুটফুটে চাঁদের আলোয় অবাক হয়ে দেখতে পেলাম, আমার বন্দুকটা মহুয়া গাছের গুঁড়িতে হেলান দেওয়া আছে। কে যে এখানে বন্দুকটা আনল, কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।
কী ব্যাপার তা ভাল করে বোঝার আগেই আমি রাইফেলটার কাছে দৌড়ে গিয়ে ওটাকে তুলে নিলাম। কেন, কোন আক্কেলে যে আমি নদীর পাশে এমন রাতে নদীর বালিতে ঘুমিয়ে ছিলাম, বন্দুকটাকে পনেরো কুড়ি হাত দূরে এমনভাবে রেখে, কিছুতেই তা ভেবে পেলাম না।
গরমের দিন। জলের পাশে, সাপ, বিছে তো বটেই, সমস্ত জন্তু-জানোয়ারেরই আনাগোনা। আমি কেন এখানে এসেছিলাম? আমার হাতে বন্দুকই বা কেন? শত চেষ্টা করেও মনে পড়ল না। শুধু মনে পড়ল যে, মালীর বউ বলেছিল, সন্ধের আগে-আগে ফিরবেন সাহেব। শুয়োরের ভিণ্ডালু রাঁধব আজকে।
যা বাঘ আর বাঘিনীর কাছে খেলা, তাই-ই সমস্ত বনের জানোয়ার, পাখি, পোকামাকড় সকলের নাভিশ্বাস। মনে হচ্ছিল, তর্জনে-গর্জনে পাহাড় চৌচির হবে বুঝি, গাছ পড়ে যাবে, ভূমিকম্পে যেমন পড়ে। অন্যরা সব শান্ত। চুপচাপ। আমি যেন ঘোরের মধ্যে হেঁটে যেতে লাগলাম সেই বাঘ-বাঘিনীর আওয়াজের বিপরীত দিকে। কিন্তু বন্দুক কাঁধে নিয়ে। হাতে পর্যন্ত নিয়ে নয়।
আমি এখানে রাইফেল হাতে কী করতে যে এসেছিলাম, তাও মনে পড়ল না আমার।
চাঁদনি রাত ছিল বলে তাই রক্ষে। নিজের মনে, চাঁদের বনে বিভোর হয়ে নদী ধরে হাঁটতে-হাঁটতে এগোচ্ছিলাম আমি। এ সব নদী, বন, পাহাড় আমার সম্পূর্ণ অচেনা। এ কোন দেশের, কোন গ্রহের রাত? তবু নদী ধরেই হাঁটতে লাগলাম গন্তব্যহীনভাবে। রাত তখন বেশ গভীর। অথচ কত রাত তা দেখতেও ইচ্ছে করল না হাত-ঘড়িতে। আমি নিজেকেই নিজে বললাম, অনেক রাত!
চলতে-চলতে একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম। যেখানে নদীটা একটা কাঁচা লাল মাটির ফরেস্ট রোডের উপর দিয়ে গড়িয়ে গেছে। সেইখানে পৌঁছেই আমি, ডান দিকে মোড় নিলাম। অথচ কেন নিলাম জানি না। কিছু ভেবে নিইনি। পথও চিনি না। আমাকে চলতে হবে বলেই যেন আমি চলছি। ডানদিকে কেন? ডানদিকে চলতে হবে বলেই যেন আমি চলছি। ডানদিকে কেন? ডানদিকে কী আছে?
আরও আধ মাইল চলার পর যখন ডগলাসের সাদা-রঙা ছোট্ট বাংলোটা চোখে পড়ল, চাঁদের আলোয় ধবধবে, দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের মধ্যে, তখন হঠাৎ একই সঙ্গে সকাল থেকে ঘটা সব ঘটনার কথা আমার হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল। মনে পড়তেই ডগলাসের বাঘের নখে কাটা বীভৎস মুখোনির কথাও মনে পড়ে গেল। তখন ভীষণই গা ছমছম করে উঠল। হঠাৎই এক দারুণ ভয় আমাকে আছন্ন করে ফেলল।
ওখান থেকে বড়-বড় পায়ে এগিয়ে, জঙ্গলটা পেরোতেই আমার বাংলো দেখা গেল। বাইরের বারান্দাতে একটি লণ্ঠন জ্বলছে। মালী রেখেছে। সারা রাতই জ্বলবে। মালীর ঘরের সামনে গিয়ে ওদের বন্ধ দরজায় একবার ধাক্কা দিলাম। তখন আমার আর দাঁড়াবার মতো জোরও গায়ে ছিল না। শরীর আর মনও ভেঙে পড়েছিল।
দরজায় ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই ভিতর থেকে হাঁউমাঁউ আওয়াজ শোনা গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই গুডুম করে একটি গুলি হল। গুলিতে, মালীর খাপরার চালের ঘরের দু-তিনটে খাপরা উড়েও গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের শোরগোল আরও বাড়ল। কিন্তু গুলির শব্দ হবার পরেও মার্কিগঞ্জে যে একজনও জীবন্ত মানুষ থাকে এবং অন্তত পাঁচজনের বাড়িতে দোনলা বারো বোরের টোটাবন্দুকও আছে, একথা মনে হল না। তখন আমি মালী আর তার বউয়ের নাম ধরে ডাকতে লাগলাম। কোমর থেকে টর্চ খুলে আলো ফেললাম দরজার দিকে। তারই পরে ওরা জবাব দিল।
বিরক্ত গলায় বললাম, এসো তোমরা। চলো, এখানে এতই ভয় পাও তো খাবার ঘরের মেঝেতে শোবে আজ থেকে। ঘর, তালা বন্ধ করো।
আসলে ভয়টা ওদের নয়। আমার নিজের ভয়টাই তখনও কাটেনি। অবশ্য ভয়টা বাঘের নয়। ভয়টা ভূতেরও নয়। তবে ভয়টা কীসের? ভয়টা স্মৃতিনাশের। ভয়টা আমার ভয় না-পাওয়ার কারণে। এমন অবস্থাতে তো জীবনে পড়িনি কখনও এর আগে!
মালী বউ বাংলোর ভিতরে ঢুকে বলল, কিছু খাবেন সাহেব?
বললাম, জল। শুধু জল।
কফি? কফিও না?
না।
বলেই, মনে পড়ল; পোর্ক-ভিন্ডালুর কথা। ওকে বললাম, আচ্ছা! তুমি না আজ শুয়োরের ভিডালু রান্না করবে বলেছিলে?
ও অবাক হল। ওর স্বামীর দিকে একবার তাকাল।
তারপর আড়ষ্ট ভাবে বলল, সে তো গতবারে যখন এসেছিলেন, তখন বলেছিলাম। আর আমিও বলিনি। ডগলাস সাহাব খেতে চেয়েছিলেন, তাই আপনি রান্না করতে বলেছিলেন। কত্তোদিন আগে!
মালীর বউ-এর চোখে বিস্ময় আর মুখে ভয় ফুটে উঠল।
আমি পাগলের মতো হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলাম, শুয়োর? কী শুয়োর? বুনোশুয়োর?
না সাহাব!
অবাক হয়ে, মালীর বউ বলল, বস্তির শুয়োর। শুক্রবারের হাট থেকে মালী কিনে এনেছিল। চারবছর আগে তো আপনি এসেছিলেন, শেষ।
বলেই, সে হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠল।
বলল, হু-উ-উ ডগলাস সাহাব।
কে বলেছে? যুগলপ্রসাদ?
হাঁ সাহাব?
বলেই বলল, যুগলপ্রসাদ তো পাগল হয়ে গেছে!
পাগল হয়ে গেছে? কবে, মানে কখন?
যখন ফিরে এল আপনাকে জঙ্গলে ছেড়ে। নিজের বাবার নাম পর্যন্ত ভুলে গেছে। নিজের নামও ভুলে গেছে। খালি নেচে-নেচে বলছে, হাঃ! হাঃ! যিসকা বান্দারিয়া, ওহি নাচায়ে! হাঃ! হাঃ! যিসকা বান্দারিয়া, ওহি নাচায়ে!
আমার মুখের মধ্যে থুথু ক্রমশ ঘন হয়ে আসছিল। বুঝতে পারছিলাম যে, এবার আমার পাগল হবার পালা! বললাম, যুগলপ্রসাদের সঙ্গে আর কেউ ছিল? ছিল না?
হাঁ। ছিল তো? হুডকু। লখমন ওরাওঁয়ের বেটা। উও ভি বোবা কালা হয়ে গেছে বিলকুল। আপনি ঠিক আছেন তো সাহাব?
বিলকুল!
ধমক দিয়ে বললাম ওদের। কিন্তু ওদের মুখ দেখেই মনে হল যে, ওরা বোধ হয় বিশ্বাস করছে না আমাকে।
আমাকে জল খাওয়াও এক গ্লাস। আর এক বোতল জল মাথার কাছে রেখে তোমরা শুয়ে পড়ো। কাল কথা হবে।
মালী যখন জলটা নিয়ে এল, তখন বললাম, আজ ল্যাংড়া পাহান কি এদিকে এসেছিল?
না তো? বাঘোয়ার কোনও খবর নেই।
ভাল। এবার ভাল করে দরজা-টরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ো তোমরা। বন্দুকটা কাছেই রেখো। কিন্তু সেটা আমাকে মারবার জন্যে তোমাকে দিইনি। একটু আগেই গুলিটা দরজার দিকে নল করে করলেই তো দরজা ফুটো করে ফর্দাফাঁই করে দিত আমাকেই! এমন গুলিখোর আমি হতে চাই না। তোমার মতন শিকারির হাতে মরলে আমার নরকবাস নিশ্চিত।
ও বলল, খুউব দোষ হয়ে গেছে সাহাব। হা রাম। শোবার সময়ে একবার টর্চ জ্বালিয়ে হাতঘড়িটা দেখলাম। সকাল পৌনে তিনটে। মালীকে বললাম, আলো ফুটলেও আমাকে চা দিয়ে ঘুম ভাঙাবে না। যখন ওঠার, তখনই উঠে চা চাইব। কারও সঙ্গে দেখাও করব না, চান না করে।
শোবার পরও আধ ঘণ্টা ঘুম এল না। তারপর আবার বাংলোর উজলা কম্পাউন্ডের পরিচিত গন্ধ ও শব্দ এক-এক করে সব নাকে ও কানে আসতে লাগল ধীরে-ধীরে, খুবই ধীরে-ধীরে, বালির মধ্যে জল যেমন করে চুঁইয়ে যায়, তেমনি করে। ক্রমশ আমি স্বাভাবিকতার দিকে ফিরতে লাগলাম অনেক পথ মাড়িয়ে এসে। কাল সকাল থেকে এখন অবধি কী করে যে কাটল, তার হিসেব-নিকেশ, পারলে, দিনের আলোতেই করা যাবে। তারপর চোখ বুজে এল এক সময়।
