চতুর্থ পরিচ্ছেদ
হোটেলে পৌঁছতে-পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে দুপুরের খাওয়াটা নমো নমো করে সেরে নেওয়া হল। তারপর একটু বিশ্রাম করে যখন ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরে এসে জমায়েত হওয়া গেল, তখন বিকেল প্রায় পাঁচটা বাজে। ঘরের দরজা দেখলুম ভিতর থেকে বন্ধ নয়, ভেজানো। ভিতরে ঢুকতে চোখে পড়ল, আর্ম-চেয়ারে বসে ভাদুড়িমশাই একটা হিন্দি ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছেন। সেই অবস্থাতেই মুখ না-তুলে বললেন, “বসুন।”
আমরা দুটো চেয়ার টেনে বসে পড়লুম। সদানন্দবাবু বললেন, “কী বুঝছেন?”
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “ছবির অন্তত একটা দিক একটু পরিষ্কার হয়ে আসছে। কেন, আপনারা সেটা বুঝতে পারেননি?”
বললুম, “না তো।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমি কিন্তু একটা কথা বুঝতে পেরেছি। বলব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলুন।”
“মিসেস মিত্রের বেশ ব্যক্তিত্ব আছে মশাই। জেরার চোটে মাধব মিত্তিরেকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলেছিলেন। ভদ্রলোকের তো দেখলুম একেবারে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা।”
আমি বললুম, “ওটা কিছু আশ্চর্য ব্যাপার নয়। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা হলে যা হয় আর কি। তরুণী ভার্যাটি, টেকিং অ্যাডভান্টেজ অব হার ইউথ, বৃদ্ধ স্বামীর উপরে একটু ব্যক্তিত্ব ফলাবেন, এ তো খুবই স্বাভাবিক।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনার কথাটা মোটেই ফেলে দেবার মতো নয়, কিরণবাবু। তবে কিনা, মিসেস মিত্রের বেলায় যে আরও একটা কারণ থাকা সম্ভব…আই মিন আরও বাস্তব ও আরও স্পষ্ট একটা কারণ, ওঁদের জেরা আর জবাবের ধরন থেকে কি এমন কথা আপনার একবারও মনে হয়নি?”
বললুম, “অন্য আর কী কারণ থাকতে পারে?”
“বলছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণা…আসলে ‘ধারণা’ বললে কমই বলা হয়, আমার বদ্ধমূল বিশ্বাস, এদের এই হোটেল, সিনেমা হল, স-মিল, অচার্ড আর অন্য জমিজমা, এক কথায় এদের এন্টায়ার প্রপার্টির মালিকানা আসলে সাবিত্রী মিত্রের।”.
“আর মাধব মিত্র?”
“স্ত্রীর হয়ে তিনি এই প্রপার্টির দেখাশুনো করেন মাত্র। তাও খুব এফিসিয়েন্টলি দেখাশুনো করতে পারেন না। ফলে বউয়ের কাছে ওইভাবে তাঁকে ধমক খেতে হয়।”
“মাধব মিত্রের নিজের বলতে কিছুই নেই?”
“দেরাদুনের ওই বিশাল বাড়িটার কথা ভাবছেন তো?” সিগারেটটা ফুরিয়ে এসেছিল। অ্যাশট্রের মধ্যে তার শেষাংশটুকু পিষে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটাও সম্ভবত সাবিত্রী দেবীর বাড়ি।”
“কী করে বুঝলেন?”
“আরে মশাই, বাড়িটা যদি মাধবানন্দের হত, তা হলে তার ড্রয়িং রুমে আমরা ওর বাপ-ঠাকুর্দার ছবি ঝুলতে দেখতুম, শ্বশুর আর দাদাশ্বশুরের ছবি ঝুলতে দেখতুম না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আরে ছ্যাছ্যা, লোকটা একেবারে বউয়ের হাত-তোলা হয়ে রয়েচে।”
আমি বললুম, “কিন্তু মাধব মিত্রের আর-কিছু না থাক, দিল্লির প্যাটেল-নগরে একটা বাড়ি অন্তত রয়েছে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুরো বাড়ি নয়, পৈতৃক বাড়ির একটা অংশ। তবে কিনা সেটাও থাকবে না। শুনলেনই তো, শ্যামনন্দন শেঠিয়ার কাছে ওই অংশটা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তাও কেন বিক্রি হচ্ছে? না, ওটা বিক্রি না করলে ওঙ্কারমল আগরওয়ালের খপ্পর থেকে ফলের বাগানটা তিনি উদ্ধার করে আনতে পারতেন না। আমার ধারণা, ওই ফলের বাগানও ওঁর নয়, সাবিত্রী মিত্রের।”
হঠাৎ একটা কথা আমার মনে পড়ে গেল। বললুম, “কিন্তু মাধব মিত্র তো আপনাকে বলেছেন যে, ওই বাগানের মধ্যে যে একটা শিবমন্দির রয়েছে, সেটার প্রতিষ্ঠাতা ওঁর ঠাকুর্দা। কাল যখন দেরাদুন থেকে মুসৌরি আসি, তখন ট্যাক্সির মধ্যে এই কথাই আপনি বলেছিলেন না?”
“তা বলেছিলুম। ইন ফ্যাক্ট মাধব মিত্র আমাকে বলেছিলেন যে, ঠাকুর্দার প্রতিষ্ঠিত ওই যে মন্দির, ওটা ওঁর কাছে একটা পবিত্র স্মৃতিচিহ্নের মতো, আর ওইজন্যেই উনি বাগানটা বিক্রি করতে চান না। তা যে যত টাকাই অফার করুক না কেন। কিছু বুঝলেন?”
“কী বুঝব? ওখানে মন্দির-ফন্দির কিছু নেই?”
“বাগানও আছে, মন্দিরও আছে।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “দেরাদুনে এসেই বিষ্টুর কাছে সে-সব খবর আমি নিয়েছি।”
“কিন্তু বাগানটা তো আপনি বলছেন সাবিত্রী দেবীর। আর ওটাও যদি উনি ওঁর বাবার সম্পত্তির অংশ হিসেবে পেয়ে থাকেন, তো বুঝতে হবে যে, বাগানের ভিতরের ওই যে শিবমন্দির, ওটা ওঁর পিতৃকুলেরই কেউ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “অর্থাৎ দত্ত-বংশের কেউ, ওই মানে যাঁদের টাইটেল হচ্চে মালিক।”
“রাইট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অবিশ্যি ব্যাঙাচির ল্যাজ যেমন খসে যায়, মালিক-টাইটেল পাবার পরে কুল-পদবি দত্তও ওঁদের নাম থেকে তেমন খসে গেছে। কিন্তু সে-কথা থাক, সাবিত্রী যে ওটা ওর বাবা সুরপতি মালিকের কাছ থেকে সরাসরি পেয়েছেন, এমনও আমার মনে হয় না। সুরপতি তো উইল করে যাননি। আমরা শুনেছি যে, তিনি মারা যাবার পর তাঁর তাবৎ সম্পত্তির একটা ইনভেন্টরি…”
সদানন্দবাবু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন, “মানে তালিকা, ফর্দ, ফিরিস্তি। ঠিক বলেচি তো?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “মনে রেখেছেন দেখছি। তো যে-কথা হচ্ছিল। সাবিত্রী দেবীর কাছে আমরা শুনেছি যে, সুরপতি মারা যাবার পর তাঁর তাবৎ সম্পত্তির একটা ইনভেন্টরি হয়, আর দাদার সপক্ষে নিজের দাবিদাওয়া ছেড়ে দিয়ে সাবিত্রী তাতে সই করে দেন। সো ফার সো গুড়। কেমন?”
বললুম, “ঠিক। কিন্তু কথা হচ্ছে, সেই ইনভেন্টরিতে যার উল্লেখ নেই, এমন দু’দুটো ফলের বাগানের খোঁজ পরে পাওয়া গিয়েছে। তারও একটার স্বত্ব অবশ্য মিসেস মিত্র তাঁর দাদার সপক্ষে ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যটার স্বত্বও ছেড়ে দিতেন। কিন্তু মাধব মিত্র বাধা দেওয়ায় এখনও ছাড়তে পারেননি।”
“বাঃ!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুধু সদানন্দবাবুর কেন, আপনার মেমারিও দেখছি বর্ধমান। তা এখন কথা হচ্ছে, যে বাগানের বাবদে ওঙ্কারমলের কাছ থেকে আড়াই লাখ অ্যাডভান্স নেওয়া হয়েছিল, সেটাই যদি এই দ্বিতীয় বাগান হয়, তো তার থেকে আমরা কী বুঝব?”
সদানন্দবাবু বললেন, “বুঝব যে, ওটা ঘোর বে-আইনি কাজ হয়েছিল।”
“কেন?”
“এই জন্যে যে, এখনও পর্যন্ত ওর মালিকানা কারও একার নয়। সাবিত্রী দেবী আর তাঁর দাদা, যৌথভাবে দু’জনেই ওর মালিক। সুতরাং যতক্ষণ না ওঁদের একজন অন্যজনের সপক্ষে স্বত্ব ত্যাগ করছেন, ততক্ষণ ওঁদের একজনেরও একার পক্ষে ওটা বিক্রি করা তো চলেই না, এমনকি সেই বাবদে অ্যাডভান্সও নেওয়া চলে না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মাধব মিত্র কিন্তু অ্যাডভান্স নিয়েছিলেন।”
আমি বললুম, “মাধব মিত্র নেননি। নিয়েছিল কিষনলাল। মানে দেরাদুনে যে-লোকটা ওঁদের সম্পত্তির দেখাশুনো করে। কলকাতায় অন্তত মাধববাবু আমাদের এই কথাই বলেছিলেন। এও বলেছিলেন যে, বাগানটা বেচার কোনও ইচ্ছেই তাঁর নেই।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ঠিক, ঠিক। মিত্তিরমশাই ওই কথাই বলেছিলেন বটে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুধু কলকাতায় কেন, দেরাদুনে এসেও মাধব মিত্র রিপিটেড দ্য সেম স্টোরি। কিনা বাগানটা উনি বেচতে চান না। কিন্তু আমি যদ্দুর যা বুঝছি, উনি বেচবার তালেই ছিলেন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “হাউ? বাগান তো ওঁর নয়, ওঁর বউয়ের। তাও পুরোটা নয়, অর্ধেক।”
“জানি। আমার ধারণা অন্তত সেইরকমই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবু যদি উনি বেচতে চেয়ে থাকেন, আর মাধব মিত্রের নির্দেশেই কিষনলাল যদি অ্যাডভান্সটা নিয়ে থাকে, তো প্রশ্ন উঠবে, মালিক না-হয়েও এই যে একটা প্রপার্টি উনি বেচতে চান, এটা কীসের জোরে। এর একটাই মাত্র উত্তর হয়। সাবিত্রী দেবী অসুস্থ, নিজের সম্পত্তির দেখভাল নিজে করতে পারেন না, তাই স্বামীকে হয়তো এমন কোনও পাওয়ার অভ অ্যাটর্নি বা ওকালতনামা দিয়েছেন যে, সম্পত্তি নিয়ে যা-কিছু ডিল করার সেটা ওঁর স্বামীই করবেন। এ ছাড়া তো অন্য কোনও উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না।”
আমি বললুম, “সেটা সম্ভব।”
সদানন্দবাবু বললেন, “এক্ষেত্রে সেটাও সম্ভব নয়। বাগানের পুরো মালিকানা যদি সাবিত্রী দেবীর না হয়, তো সেটা বেচার ব্যাপারে ওই ওকালতখানা কোনও কাজেই আসবে না।”
“তা হলে তো বুঝতে হবে, মাধব মিত্র ওঙ্কারমলকে টুপি পরাবার ব্যবস্থা করেছিল।’ ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু সাবিত্রী মিত্র সেটা বুঝতে পেরে রেগে যান। বনেদি বংশের মেয়ে, এই জোচ্চুরি ওঁর সহ্য হবে কেন। স্বামীকে উনি সাফ জানিয়ে দেন, অ্যাডভান্স বাবদ যে টাকা মাধব মিত্র নিয়েছেন, সেটা যেমন করেই হোক, ফেরত দিতে হবে। এবং সেটা করতে হবে উইদাউট সেলিং অর মর্টগেজিং এনি অভ হার প্রপার্টিজ। ফলে নিজের বাড়ি না-বেচে মাধব মিত্রের কোনও উপায়ই এক্ষেত্রে ছিল না। কিন্তু তার জন্য কি সাবিত্রী দেবীকে একটুও দুঃখিত মনে হল?”
আমি বললুম, “বাড়ি বেচার জন্যে দুঃখিত নন, তবে দামটা কম পাওয়া যাচ্ছে বলে দুঃখিত। বললেনও যে, প্যাটেল-নগরের মতো জায়গায় আরও বেশি দাম পাওয়া উচিত ছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভদ্রমহিলার ব্যাবসা-বুদ্ধি যে ওঁর স্বামীর তুলনায় অনেক প্রখর, তাতে আমার সন্দেহ নেই। সত্যি বলতে কী, যদি শুনি যে, এই যে এত ব্যাবসা এঁদের, এর পিছনে মাধবানন্দের কিচ্ছু কনট্রিবিউশান নেই, এঁদের যা কিছু হয়েছে, তা একা মিসেস মিত্রের বুদ্ধির জোরে হয়েছে, তো আমি একটুও অবাক হব না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “সাবিত্রী দেবী তা হলে কী দেখে ওঁর সঙ্গে ঘর ছেড়েছিলেন?”
ভাদুড়িমশাই তিক্ত হেসে বললেন, “আঠারো বছর বয়েসের একটা মেয়ে যা দেখে ঘর ছাড়তে পারে। চেহারা। মাধব মিত্রের চেহারা যে তখন রাজপুত্তুরের মতনই ছিল, সেটা বুঝতে তো আর খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। সাবিত্রীর কথা শুনেই তো বুঝলেন যে, ওঁর স্বামীর বয়েস এখন ষাট। তবু দেখুন, চুলে কলপ লাগাতে হচ্ছে বটে, কিন্তু চেহারার জলুস এখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।”
বললুম, “দুজনের বয়েসের ব্যবধান কিন্তু বাইশ বছরের। আঠারো আর চল্লিশের মধ্যে সেটা খুব বড় হয়ে দেখা দেয়নি ঠিকই, কিন্তু আটত্রিশ আর ষাটের মধ্যে দিয়ে থাকতেও পারে। তাই না?”
ভাদুড়িমশাই তক্ষুনি আমার কথার কোনও জবাব দিলেন না। একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “চলুন, বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসা যাক।”
তৈরি হয়ে নিতে পাঁচ মিনিটও লাগল না। আমরা ঘর বন্ধ করে বেরিয়ে পড়লুম।
২
সদানন্দবাবু প্রথমে বলেছিলেন, বেলায় খেয়েছেন বলে গা-টা যেন ম্যাজম্যাজ করছে, আজ আর তিনি বেরোবেন না, ঘরে বসে মিসেস বসুর কাছে একখানা চিঠি লিখে ফেলবেন। কিন্তু আজও যে আমরা সে-দিকেই যাব, যেদিকে রাস্তার ধারে বিদেশি জিনিসপত্তর বিক্রি হয়. এইটে জানবার পরে বললেন, “ঠিক আছে, শরীরকে বেশি আশকারা না-দেওয়াই ভাল, চলুন তা হলে আমিও যাই। ঘরেই যদি বন্দি হয়ে থাকব, তবে আর বেড়াতে আসা কেন?”
ফলে তিনি আমাদের সঙ্গী হয়েছেন। তবে মাঙ্কি-ক্যাপটা পরেননি দেখলুম। এই নিয়ে প্রশ্ন করায় বললেন, “আরে দূর দূর, রোজ-রোজ একইরকম ড্রেস করার কোনও মানে হয় নাকি? চার প্রস্ত পোশাক এনিচি, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরব।” আমার ধারণা এটা ওঁর মনের কথা নয়। চালাক মানুষ তো, অন্য কোনও লোক ভেবে যে ওঁর ওপরে হামলা হয়েছিল, সম্ভবত এটা উনি আঁচ করতে পেরেছেন। মাথায়-লোহার-বল-বসানো লাঠিখানি অবশ্য সঙ্গে নিতে ভোলেননি। সেটা নিয়ে যে-রকম বীরদর্পে হাঁটছেন, তাতে ঘিয়ে ভাজা নেড়িকুত্তাগুলো আমাদের ধারেকাছে আসতেও বিশেষ ভরসা পাচ্ছে না।
গান্ধীমূর্তিকে বাঁয়ে রেখে যে রাস্তাটা এগিয়ে গেছে, সেইটে ধরে মাইলখানেক হাঁটা হল। ভাদুড়িমশাই একটা পানের দোকান থেকে চার প্যাকেট সিগারেট কিনলেন। আর রাস্তার ধারে চট বিছিয়ে যারা বিদেশি জিনিস বিক্রি করে, তাদের কাছ থেকে সদানন্দবাবু কিনলেন একটা হংকংয়ের কাঁচি আর মেড ইন তাইওয়ান একটা কাচের খেলনা। সেটার মধ্যে গুটি পাঁচেক ছোট ছোট লোহার গুলি রয়েছে, গুলিগুলোকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক-একটা গর্তের মধ্যে ফেলতে হয়। ভেবেছিলুম খুব সহজ ব্যাপার, কিন্তু আসলে দেখলুম খুবই শক্ত। একটা গুলিকে গর্তের মধ্যে ফেলে যেই দ্বিতীয়টাকে গর্তের মধ্যে ফেলতে যাই, প্রথমটা অমনি গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে।
সদানন্দবাবু বললেন, “কমলি এটা পেলে খুব খুশি হবে।”
আমি বললুম, “এ-খেলা খেলতে গিয়ে ওর লেখাপড়া লাটে উঠে যাবে মশাই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনারা বরং গুলি খেলুন, আমি ততক্ষণে আর-একটা চক্কর দিয়ে আসি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “সে তো আমিও আর-এক চক্কর হাঁটব, কিন্তু তার আগে কোথাও একটু বসলে হত না? ওই তো একটা বেঞ্চি খালি রয়েছে, চলুন, একটু বসা যাক।”
সবাই মিলে বেঞ্চিটায় গিয়ে বসে পড়া গেল। বসবার পরমুহূর্তেই মনে পড়ল যে, একটা জরুরি কথা সেই দুপুর থেকেই জিজ্ঞেস করব করব ভাবছি, অথচ এখনও সেটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা জানাতে তিনি বললেন, “আবার কী জিজ্ঞেস করবেন?”
বললুম, “আজ দুপুরে মিসেস মিত্রকে যখন মেজর গুপ্তের চেম্বারের সামনে নামিয়ে দিই, তখন তিনি কিছু জিজ্ঞেস না করতেও আপনি বলেছিলেন, হ্যাঁ। কী ব্যাপার বলুন তো?”
“ওটা কোনও প্রশ্নের উত্তর নয়। বরং বলতে পারেন ওঁর অনুরোধের উত্তর।”
“কীসের অনুরোধ?”
“বাঃ, সেটা তো আপনার সামনেই উনি আমাকে করলেন। কিন্তু ওঁর স্বামী হঠাৎ এসে পড়লেন তো, তাই তক্ষুনি তক্ষুনি উত্তরটা ওঁকে দেওয়া যায়নি। ভদ্রমহিলার ধারণা, ওঁকে মারবার একটা ষড়যন্ত্র চলছে।”
“তা তো বুঝতে পারছি।”
“তাই উনি চান যে, ওঁর কেসটা যেন আমি টেক আপ করি। চেম্বারের সামনে গাড়ি থেকে নেমে উনি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু ড্রাইভার ছিল বলে মুখ ফুটে কিছু বলেননি। অর্থাৎ বাড়ির ড্রাইভার কিছু জানুক, এটা উনি চান না। সম্ভবত উনি ভয় পাচ্ছেন যে, ড্রাইভার কিছু জানলে ওঁর স্বামীও জেনে যাবেন। যা-ই হোক, ওঁকে আমি ‘হ্যাঁ” বলেছি।”
বললুম, “তার মানে মাধব মিত্রের হয়ে নয়, মিসেস মিত্রের হয়ে আপনি কাজ করবেন। এই তো?”
ভাদুড়িমশাই হেসে ফেললেন। তারপর হাসি থামিয়ে হঠাৎই ভীষণ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “ভদ্রমহিলাকে যে এর আগে কোথায় দেখেছি, সেটাই ঠিক মনে করতে পারছি না।”
সদানন্দবাবু তাঁর সদ্য-কেনা খেলনাটা নিয়ে গুলিগুলোকে গর্তে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এবারে সেটা নামিয়ে রেখে বললেন, “মিসেস মিত্রকে তো? কী জানি, আমারও কেমন যেন চেনা-চেনা ঠেকচিল। মনে হচ্চিল যেন হয় তপন সিংহ আর নয়তো তরুণ মজুমদারের কোনও ছবিতে ওঁকে দেকিচি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুব ছবি দেখেন বুঝি?”
সদানন্দবাবু বললেন, “খুব না, ওই কালেভদ্রে। এককালে অবশ্য বড়ুয়াসায়েবের বই বিস্তর দেকিটি। ‘দেবদাস’ দেকিচি। ‘মুক্তি’ দেকিচি। আজকাল আর তেমন ছবি হয়ও না, দেকিও না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভেবেছিলুম, আর-একটু হাঁটব। কিন্তু না, হোটেলে ফিরে দুটো ফোন করতে হবে। তা ছাড়া বিষ্টুর সঙ্গেও একটু কথা বলা দরকার। … সদানন্দবাবু, কালও একটু সকাল-সকাল উঠতে পারবেন?”
বললুম, “সদানন্দবাবু তো সকাল-সকালই ওঠেন, আমারই বরং উঠতে বড্ড দেরি হয়। কিন্তু কাল আবার কী কাজ পড়ল? কোথাও যেতে হবে?”
“গেলে ভাল হয়।”
“কোথায়?”
‘দেরাদুন থেকে মাইল কুড়ি দূরে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাগানটা এখনও চোখে দেখিনি। একবার দেখে আসতে পারলে ভাল হত। ভাবছি, ফিরতি পথে বিষ্টুর ওখানে থামব। ওর সঙ্গে যা কথা বলবার, তখনই বলা যাবে।”
৩
আজও সেই সাত-সকালেই মুসৌরি থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি। যেখানে যাব, তার নাম শুনলুম মুঠিয়া। দেরাদুন আমার খুব-একটা অচেনা জায়গা নয়, তবে এই এলাকায় এ-রকম নাম এর আগে কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ল না। অবশ্য ট্যাক্সিওয়ালা দেখলুম জায়গাটা চেনে। এখন আমরা সেই মুঠিয়ার দিকেই চলেছি। স্রেফ সেই বাগানটা দেখব বলেই যাওয়া।
যেতে-যেতে একটা কথা বলে রাখি। কাল বিকেলে ভাদুড়িমশাইয়ের দুটো ফোন করবার ছিল। অনায়াসেই সে-দুটো ফোন হোটেলে ফিরে করা যেত। কিন্তু তা তিনি করলেন না। গান্ধী-মূর্তির কাছাকাছি এসে, রাস্তার উপরে আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে, তিনি একটা দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। এখানে অনেক দোকানের সামনেই আইএসডি/এসটিডি লেখা বোর্ড টাঙানো থাকতে দেখেছি। এটাও সেই রকমের একটা দোকান। দোকানে ঢুকে ফোন সারতে তাঁর আধ ঘন্টার কিছু বেশিই লাগল। বেরিয়ে আসবার পরে ‘কাকে ফোন করলেন’ জিজ্ঞেস করতে বললেন, “একটা করলুম কাছেই, দেরাদুনে। অন্যটা দূরে, তবে দেশের বাইরে নয়।”
এখন আবার আজকের কথায় ফিরে আসি। সকাল-সকাল উঠেছি বলে আর পাহাড়ের হাওয়া বেশ চনমনে বলে শরীরটা খুব ঝরঝরে লাগছিল। আমাদের ট্যাক্সি অবশ্য ইতিমধ্যে পাহাড় থেকে নেমে এসে দেরাদুন শহরের চৌহদ্দি ছাড়িয়েছে। পথটা এখন সমতল, শুধু মাঝে-মধ্যে একটু-আধটু ঢেউ খেলানো। মুসৌরির সেই কনকনে ঠান্ডাটা আর নেই, তবে বাতাস তেমন গরমও নয়। সদানন্দবাবু তাঁর অলেস্টার আর মাঙ্কি ক্যাপটা দেরাদুনে পৌঁছেই খুলে ফেলেছিলেন। এবারে জাম্পারও খুলতে যাচ্ছেন দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা কিন্তু গায়ে রাখাই ভাল, হঠাৎ ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমার যে বড্ড গরম লাগচে মশাই।”
“লাগুক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবু ওটা খুলবেন না। হুট করে যদি চোরা ঠান্ডা লাগে তো বিপদে পড়বেন।”
মুঠিয়ায় পৌঁছলুম সাড়ে এগারোটা নাগাদ। সেখানে বড়রাস্তা থেকে সরু একটা ফিডার রোডে ঢুকে, একে-ওকে পথের নিশানা জিজ্ঞেস করতে-করতে আরও তা প্রায় আড়াই-তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে যখন বাগানে পৌঁছলুম তখন বারোটা বেজে গেছে।
বাগানের পাহারাদার প্রথমটায় একটু আপত্তি করেছিল ঠিকই, কিন্তু ভাদুড়িমশাই যখন তাকে বললেন যে, আমরা মিত্রসাহেবের লোক আর তাঁরই কথায় আমরা বাগান দেখতে এসেছি, তখন আর সে আমাদের ভিতরে ঢুকতে দিতে কোনও আপত্তি করল না।
বাইরে থেকেই যা আন্দাজ করেছিলুম, এবারে ভিতরে ঢুকে বোঝা গেল যে, সেটা ভুল নয়। বাগানটা সত্যিই বিশাল। অধিকাংশ গাছই পেয়ারা আর আমের। সেই সঙ্গে বিস্তর চিকু অর্থাৎ সবেদা গাছও রয়েছে। প্রায় সব গাছই যে অনেক কালের পুরনো, সে তাদের গুঁড়ির বেড় আর ডালপালার বিস্তার দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
খানিক এগোতে মন্দিরটা চোখে পড়ল। খুব যে বড় মাপের মন্দির তা নয়। চূড়ার উপরে ত্রিশূল। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠলে শিক-বসানো দরজার ওদিকে কুচকুচে কালো পাথরের একটি শিবলিঙ্গ দেখা যায়। বারান্দার ছাত থেকে লোহার আংটায় বাঁধা শিকল ঝুলছে। শিকলের মাথা থেকে ঝুলছে একটি ঘন্টা। পিতলের ঘন্টা। তবে অনেক কাল ঘষামাজা হয় না বলে সেটির রংও পাঁশুটে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে।
মন্দিরটির গড়নেও বিশেষ বৈচিত্র্য দেখলুম না। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামেগঞ্জে কি নদীর ধারে এ-রকম বিস্তর শিবমন্দির আমাদের চোখে পড়ে। ঘন্টাটাকে বাজিয়ে দিয়ে নীচে নেমে এলুম।
নীচে মন্দিরের একপাশে বেশ বড়সড় একটা বেলগাছ। ভাদুড়িমশাই সেই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে নিবিষ্টভাবে কিছু একটা ভাবছিলেন নিশ্চয়, ঘন্টার শব্দে তিনি চমকে গিয়ে থাকবেন, তাই হয়তো মুখ তুলে এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যে, মনে হল, কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না। পরক্ষণেই অবশ্য স্বাভাবিক হয়ে এল তাঁর চাউনি। হেসে বললেন, “নেমে এলেন যে?”
বললুম, “কিছুই তো দেখবার নেই।”
বাগানে ঢুকবার পর থেকে পাহারাদারটি আমাদের সঙ্গ ছাড়েনি। লোকটির নাম শুনলুম মহাবীর। তা মহাবীর সারাক্ষণই একেবারে ছায়ার মতো আমাদের সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরছে। আমার কথা শুনে সে বলল, “হ্যাঁ সাব, দেখবার কুছু নাই।”
সদানন্দবাবু বললেন, “মন্দির পুজো হয় না?”
মহাবীর বলল, তিরিশ বছর সে এই বাগান পাহারা দিচ্ছে, এর মধ্যে কখনও পুজো হতে দেখেনি। তবে শুনেছে যে মন্দিরটা যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি বেঁচে থাকতে ‘হর রোজ’ পুজো হত। তিনি দিল্লির লোক, কিন্তু শেষ বয়েসে দিল্লি থেকে এখানে চলে আসেন। বাগানের মধ্যেই একটা খাপরার চালের ঘর বানিয়ে নিয়ে একা সেখানে থাকতেন। তিনি মারা যাবার পরে পুজোও বন্ধ হয়ে গেছে।
জিজ্ঞেস করলুম, “এত সব তুমি কোথায় শুনলে?”
উত্তরে মহাবীর বলল, সে এই গ্রামেরই লোক। যা বলল, তা তার বাপ-ঠাকুর্দার কাছে শুনেছে।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, এবারে যাওয়া যাক।”
ট্যাক্সিটাকে রাস্তার উপরে দাঁড় করিয়ে রেখে আমরা বাগানে ঢুকেছিলুম। বাগান থেকে বেরিয়ে ফের সেটাতে উঠে পড়া গেল।
এই পথ দিয়ে যখন আসি, তখন দেরাদুন ছাড়িয়ে রাস্তার ধারের একটা ধাবার সামনে মিনিট কুড়ি পঁচিশের জন্য গাড়ি থামিয়ে আমরা সকালের চা-জলখাবারের পর্বটা সেখানেই সেরে নিয়েছিলুম। ইতিমধ্যে আবার খিদে পেয়ে গেছে। সদানন্দবাবু দেখলুম বেশ কায়দা করে সেটা জানিয়েও দিলেন। “ওরেব্বাবা, সওয়া একটা বাজে দেখচি!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তো কী হয়েছে?”
“না মানে বলছিলুম যে, কিছু খেয়ে নিলে হত না?
“এই কথা?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “একটু বাদেই তো দেরাদুনে পৌঁছচ্ছি। দুপুরের খাওয়াটা সেখানেই সেরে নেব অখন।”
দুপুরের খাওয়া মানে রুটি, তর্কা আর একটা ভাজি। ড্রাইভারটি সেই সঙ্গে এক গ্লাস খাট্টা লসসি খেল, আর লসসির বদলে আমরা খেলুম দারচিনি-লবঙ্গ-এলাচের গন্ধযুক্ত চা। সকালবেলার সেই ধাবাতেই সেটা সেরে নেওয়া গেল। খাওয়া শেষ হাতে সদানন্দবাবু বললেন, “এবারে তো আমরা মেজর গুপ্তের কাছে যাব, তাই না?”
হাতঘড়ি দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন তিনটে বাজে। বিষ্টুর চেম্বার চারটের আগে খোলে না। এদিকে আবার মিসেস মিত্রের সঙ্গেও কয়েকটা কথা বলা দরকার। তা ওঁদের বাড়িটা তো পথেই পড়ে, এখনই বরং দেখা করে যাই।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ভদ্রমহিলাকে বিরক্ত করা হবে না তো? মানে অনেকেরই তো দুপুরে একটু গড়িয়ে নেবার অব্যেস থাকে…উনি যদি জেগে না থাকেন তো…”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদের বলা হয়নি, কাল রাত্তিরে মুসৌরি থেকে ওঁদের বাড়িতে ফোন করেছিলুম। তখনই শুনলুম যে, মাধবানন্দ সারাদিন বাড়িতে থাকবেন না, কী একটা কাজে মুসৌরি যাবেন, ফিরতে-ফিরতে সন্ধে হবে। তাই ভাবছিলুম যে, এই সময়ে গেলেই ভাল।”
৪
মিসেস মিত্র জেগেই ছিলেন। বারান্দায় পাতা বেতের চেয়ারে বসে বই পড়ছিলেন একটা। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আসুন আসুন।” আমরা ভিতরের ড্রইং রুমে গিয়ে বসলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন মিসেস মিত্র, আমি ভণিতা করতে ভালবাসি না। যা বলবার, সোজা কথায় সরাসরি বলি। আমার ধারণা, আপনি নিউরোসিসের রুগি নন, সত্যিই আপনাকে মেরে ফেলবার একটা চেষ্টা চালানো হচ্ছে।”
মিসেস মিত্র মুখ নিচু করে বসে ছিলেন। মুখ না-তুলেই মৃদু গলায় বললেন, “কে চালাচ্ছে?’
“তা আমি জানি না। আপাতত শুধু এইটুকুই বলতে পারি যে, অ্যাকসিডেন্ট কখনও পরপর ঘটে না। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে পরপর ঘটে চলেছে। স্কুটার আপনাকে একবার নয়, দু’বার ধাক্কা মেরেছে, আপনার শোবার ঘরের লাইটের সুইচের তার কেউ এক্সপোজ করে রেখেছে, তার উপরে আবার কেউ জানলার কাচ ভেঙে আপনার বাথরুমে ঢুকেছিল। এতগুলো বিপজ্জনক ঘটনা সাধারণত উপর্যুপরি ঘটে না। ফলে আমার মনে হচ্ছে যে, এগুলো অ্যাকসিডেন্টাল ব্যাপার নয়, কেউ এগুলি ঘটিয়ে চলেছে। ইন ফ্যাক্ট, এইরকম মনে হচ্ছে বলেই আপনার কেসটা আমি নিয়েছি। কিন্তু তারও দুটো শর্ত আছে।”
একই রকমের মৃদু গলায় মিসেস মিত্র বললেন, “কী শর্ত বলুন।”
“আমার প্রথম শর্ত, আপনার কেসটা যে আমি নিয়েছি, এটা কাউকে বলা চলবে না।”
“আমার স্বামীকেও না?”
“না। দ্বিতীয় শর্ত, এই বাড়ি ছেড়ে অন্তত কয়েকটা দিন আপনাকে আর-কোথাও গিয়ে থাকতে হবে।”
এতক্ষণে মুখ তুললেন মিসেস মিত্র। বললেন, “কোথায় যাব? সেই অর্থে তো কোনও বাপের বাড়িও আমার নেই।”
“কোনও হোটেলে গিয়ে থাকা যায় না? হপ্তা দুয়েকের জন্যে? হোটেলটা অবশ্য এখানে কিংবা মুসৌরিতে নয়, একটু দূরে হওয়াই ভাল। এই ধরুন দিল্লিতে। সম্ভব?”
“না, মিঃ ভাদুড়ি।” সরাসরি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিসেস মিত্র বললেন, “এক-আধদিনের জন্যে হলে পারা যেত। কিন্তু আপনি তো হপ্তা দুয়েকের কথা বলছেন। না না, অদ্দিনের জন্যে এই বাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারব না।”
“কেন, আপনি এখানে না-থাকলে মিঃ মিত্রের খুব অসুবিধে হবে?”
“না না, ওঁর কথা আমি ভাবছি না। আর তা ছাড়া ওঁর অসুবিধেই বা হবে কেন? কুক রইল, কাজের মেয়েটি রইল, চৌকিদার আর মালি রইল। যাকে ছাড়া ওঁর চলে না, সেই বিজুও তো রইল। তা হলে আর ওঁর অসুবিধে কী। না, সে-সব নয়।”
“তবে?”
“আমি এই বাড়িটার কথাই ভাবছি, মিঃ ভাদুড়ি।” একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন মিসেস মিত্র। তারপর বললেন, “আমি যে এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাই না, তা নয়। যাই। দু-একটা দিন থাকিও কিন্তু তারপরেই কী যে হয়, অস্থির অস্থির লাগে। মনে হয়, ফিরে আসতে হবে। যেমন করেই হোক, এখানে, এই বাড়িতে আমাকে ফিরে আসতে হবে।…শুনে আপনার অবাক লাগছে, তাই না?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা যে একটু লাগছে না, তা নয়। কেন, এই বাড়িটার জন্যে আপনার এত মায়া কেন?”
মিসেস মিত্র ম্লান হাসলেন। বললেন, “মিঃ ভাদুড়ি, আমি তো আপনাকে বলেছি যে, আমার বিয়েতে আমার · তাজির মত ছিল না। আসলে মত ছিল না বললে কমই বলা হয়। তিনি ছিলেন এই বিয়ের ঘোর বিরোধী। বাড়ি থেকে পালিয়ে আমি বিয়ে করেছিলুম। তার জন্যে তিনি আমাকে ক্ষমা করেননি। শুধু তিনি কেন, আমি যে বাড়ি থেকে পালিয়েছি, এটা জেনে দাদাজিও প্রচণ্ড রেগে যান।”
“অর্থাৎ সীতাপতি মালিক। তিনি কি তখনও বেঁচে ছিলেন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু পিতাজির মতন তাঁর রাগটা তিনি পুষে রাখেননি। অন্তত তাঁর মৃত্যুর আগে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তা নইলে তাঁর উইলে এই বাড়িটা তিনি আমাকে দিয়ে যেতেন না।”
“এ-বাড়ি কি তিনিই তৈরি করিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।” মিসেস মিত্র বললেন, “আগে এর কম্পাউন্ড আরও অনেক বড় ছিল। আমার স্বামী তো বলতে গেলে প্রায় কিছুই করতেন না, বিয়ের পর আমাদের প্রথম দু’তিন বছর তাই খুব কষ্টে কেটেছে। তারপর এই বাড়িটা পেয়ে গেলুম। পাবার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই কম্পাউন্ডের জমির বেশির ভাগই বিক্রি করে দিই। তা ধরুন দু’বিঘের মতন। তাও বড়-রাস্তার লাগোয়া জমি। দেরাদুনে তখন জমির দাম লাফিয়ে-লাফিয়ে চড়ছে। কিছুদিন ধরে রাখতে পারলে নিশ্চয় আরও অনেক বেশি দাম পাওয়া যেত। কিন্তু আমাদের তখন ধরে রাখবার মতো অবস্থা নয়। আর তা ছাড়া, তড়িঘড়ি বিক্রি করেও যে-টাকা পেয়েছিলুম, আজকের বাজারে যা-ই হোক, পনরো-ষোলো বছর আগে তার দামও নেহাত কম ছিল না। টাকাটা আমার স্বামী শেয়ার মার্কেটে খাটাতে চেয়েছিলেন। তা আমি খাটাতে দিইনি। আমি ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে। টাকা কীভাবে বাড়াতে হয়, আমার বড় ভাইয়া না শিখুক, পিতাজি আর দাদাজিকে দেখে সেই আঠারো বছর বয়েসের মধ্যেই তা আমি শিখেছি। আর তাই জমি-বিক্রির টাকাটা দিয়ে আমি…”
“ছোটখাটো একটা ব্যাবসা শুরু করে দিলেন, এই তো?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলুম।”
“ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন।” মিসেস মিত্র বললেন, “আজ আপনি আমাদের যা-কিছু দেখছেন, মুসৌরির ওই হোটেল, ওই সিনেমা হল, দেরাদুনের দুটো স-মিল আর এখানে-ওখানে যা-কিছু ল্যান্ডেড প্রপার্টি, এই সবই গত দশ-পনরো বছরের মধ্যে হয়েছে। আর এই সবকিছুরই মূলে রয়েছে সেই জমি-বিক্রির টাকা। এখন বলুন মিঃ ভাদুড়ি, এই বাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারি? আর তা ছাড়া, এই বাড়িটা যে আমার কাছে একটা সাইকোলজিক্যাল নারিশমেন্টের মতন, সেটাও আমি স্বীকার করব। যতক্ষণ এর মধ্যে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি, ততক্ষণ এর দরজা-জানলা আর গাছপালা আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের পরিবারের সব্বাই না হোক, অন্তত একজন আমাকে ক্ষমা করেছিলেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুধু আপনার ঠাকুর্দা কেন, ক্ষমা সম্ভবত শেষ পর্যন্ত আপনার বাবাও আপনাকে করেছিলেন। কিন্তু সে-কথা থাক। আপনার যখন এতই অনিচ্ছা, তখন এই বাড়ি আপনাকে ছাড়তে হবে না, আমার দ্বিতীয় শর্তটা আমি উইথড্র করে নিচ্ছি। কিন্তু এখানে থাকলে সারাক্ষণ আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। আমি তো পুলিশের লোক নই যে, আপনার প্রোটেকশানের ব্যবস্থা করে দেব। ওটা আপনাকে নিজেকেই করতে হবে। কোনও ব্যাপারে যদি সন্দেহ জাগে, তৎক্ষণাৎ আমাকে ফোন করবেন।…আর হ্যাঁ, যারা এখানে কাজ করে, তারা সবাই বিশ্বাসী তো?”
“কাজ তো করে মোট পাঁচজন। তাদের মধ্যে কুক, চৌকিদার আর মালি আমার দাদাজির আমলের লোক। তিনজনেই আমাকে আমার ছেলেবেলা থেকে দেখছে। ওদের যদি না বিশ্বাস করি তো নিজেকেও বিশ্বাস করতে পারব না।”
এতক্ষণ আমি একটিও কথা বলিনি। এবারে বললুম, “কাজের মেয়েটি?”
“ওকে আপনারা দেখেছেন।” মিসেস মিত্র বললেন, “দুর্গা আমাদের চৌকিদারের মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল, স্বামী নেয় না, ছেলেপুলেও নেই, বিয়ের বছর দুয়েক বাদে সেই যে শ্বশুরবাড়ি থেকে এখানে চলে এসেছিল, সেই থেকে এখানেই রয়ে গেছে। না, ওকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই।”
বললুম, “বাকি রইল বিজু, আপনাদের ড্রাইভার।”
মিসেস মিত্র একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ওর বিষয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে পারব না। বছর দেড়েক আগে আমার স্বামী ওকে ড্রাইভারের কাজে বহাল করেন। শুনেছি আউধের ওদিককার লোক। তবে কেমন লোক তা জানি না। আমার স্বামী যে ওর উপরে খুব ডিপেন্ড করেন, এটা অবশ্য বলতে পারি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, কে কেমন লোক, তা তো সহজে বুঝবার উপায় নেই, সুতরাং যতটা সম্ভব সাবধানে থাকুন। আর হ্যাঁ, আমরা মুঠিয়া থেকে আসছি, ওখানকার বাগান আর মন্দির দেখলুম। ওই নিয়ে দু-একটা কথা জানা দরকার।”
“কী জানতে চান বলুন।”
“মন্দিরের এক পাশে একটা বেলগাছের তলায় কয়েক টুকরো পাথর পড়ে থাকতে দেখেছি। শ্বেতপাথর। তাতে মনে হচ্ছে, মন্দিরের গায়ে শ্বেতপাথরের একটা ফলক গাঁথা ছিল, দেওয়ালে নোনা ধরে গিয়ে ফলকটা কখনও মন্দিরের গা থেকে খসে পড়ে ভেঙে টুকরো হয়ে গিয়ে থাকবে।”
“হতে পারে।” মিসেস মিত্র বললেন, “কিন্তু আমি কিছু জানি না। ইন ফ্যাক্ট, মুঠিয়ার ওই বাগানে আমি কখনও যাইনি। যাবার ইচ্ছেও নেই। আমার স্বামী আপত্তি করছেন বটে, কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে আমি যত ভাবছি, ততই মনে হচ্ছে যে, পিতাজির প্রপার্টির কিছুই তো আমার প্রাপ্য নয়, আর তাই অন্য বাগানটার বেলায় যা করেছি, এটার বেলাতেও তা-ই করব।”
“অর্থাৎ এটার ক্ষেত্রেও আপনার দাদার সপক্ষে আপনার স্বত্ব আপনি ছেড়ে দেবেন, কেমন?”
“হ্যাঁ।”
“দয়া করে ওই কাজটি করবেন না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ-কথা কেন বলছি, সেটা আপনি পরে বুঝবেন। কিন্তু ইতিমধ্যে একটা কাজ আপনাকে করতে হবে।”
“কী করতে হবে?”
“বাগানটাকে পাহারা দেবার ব্যবস্থা একেবারে নিখুঁত করে তুলতে হবে। আপনি রিসোর্সফুল মহিলা, সুতরাং কাজটা আপনার পক্ষে শক্ত হবার কথা নয়। বাস, আর-কিছু বলবার নেই। আজ তা হলে আসি।”
ভদ্রমহিলাকে নমস্কার করে আমরা উঠে পড়লুম।
৫
আমরা আসায় ভদ্রলোক যে খুব বিস্মিত হয়েছেন, মেজর গুপ্তের চোখমুখ দেখেই তা বোঝা যাচ্ছিল। বললেন, “কী ব্যাপার ভাদুড়িদা, এই সময়ে হঠাৎ? কারও শরীর-টরির বিগড়োয়নি তো?” ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে, দেশলাই কাঠিটা শূন্যে বার দুই নেড়ে নিবিয়ে সেটা অ্যাশট্রের মধ্যে ফেলে দিলেন। তারপর একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আরে না, সে-সব কিছু নয়।”
“তা হলে?”
“মাধব মিত্তির তোমার রেফারেন্স দিয়েছিলেন বলেই কেসটা নিয়েছি, নইলে নিতুম না। তো ওই ব্যাপারে দু-একটা কথা জানবার ছিল। তুমি তো ওঁদের খুবই কাছের লোক, তাই ভাবলুম, তোমার কথা যতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, সেটা আর কারও কথা হবে না।”
“কী জানতে চান, বলুন। কিন্তু তার আগে এক কাপ চা তো খাবেন?”
“না হে বিষ্টু,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা ধাবায় বসে একটু আগেই চা খেয়েছি। দারচিনি-এলাচ দেওয়া চা। তাও এক কাপ করে নয়, পুরো এক-এক গেলাশ করে। এখনও তাই গা গুলোচ্ছে। না রে বাপু, আর চায়ের নাম কোরো না। আগে বরং কথাটা শেষ করি।…কিন্তু তোমার কাজে ব্যাঘাত করলুম না তো? এক্ষুনি তো পেশেন্ট আসতে শুরু করবে।”
“না না,” মেজর গুপ্ত নির্মল হাসলেন। “আমার রুগি দেখার সময় সাতটা থেকে ন’টা। তার আগে কেউ আসবে না।”
“তা হলে তুমি এত তাড়াতাড়ি চেম্বারে আসো যে? বাড়িতে বসে আর-কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেই তো পারো।”
মেজর গুপ্ত আবারও হাসলেন। তবে এবারকার হাসিটা আগের মতো নির্মল নয়, একটু ম্লান। বললেন, “কাকে বাড়ি বলছেন ভাদুড়িদা, ওই কি একটা বাড়ি হল? রাত্তিরে ওখানে ঘুমুতে যাই আর দুপুরে যাই খেতে। তাও দুপুরের খাওয়ার পরেই মনটা ছটফট করতে থাকে, একটু গড়িয়ে নিয়েই তাই ফের এখানে চলে আসি।”
“এইজন্যই তোমাকে আবার বিয়ে করতে বলেছিলুম।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু কিছুতেই তুমি রাজি হলে না। অথচ উর্মিলাকে বিয়ে করে দিব্যি আবার সংসার পেতে বসতে পারতে।”
মেজর গুপ্ত এবারেও ম্লান হেসে বললেন, “আমাকে বিয়ে না-করে মেয়েটা বেঁচে গেছে। রাজি কি সাধে হইনি ভাদুড়িদা। বউ আমার কপালে টিকবার নয়। দু’দুটো বউ তো টেকেনি, এটাও টিকত না।…তো আপনি কী জানতে চান বলুন।”
বলা হল না। ভাদুড়িমশাই মুখ খুলবার আগেই পাশের দরজা দিয়ে একটি নার্স এসে ঢুকল। মেজর গুপ্ত বললেন, “কী ব্যাপার মিস দত্ত?”
“তিন নম্বর বেডের পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। বড্ড ছটফট করছে। আপনি একবার দেখে এলে ভাল হয়।”
মেজর গুপ্ত টেবিল থেকে স্টেথোস্কোপটা তুলে নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা একটু বসুন, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসছি।”
কথাটা শেষ করে তিনি আর দাঁড়ালেন না, নার্সটির সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ফিরে.. এলেন মিনিট দশেক পরে। বললেন, “বছর দশ-বারোর বাচ্চা একটা ছেলে, গাছ থেকে পড়ে গিয়ে হাতের হাড় ভেঙেছিল। সেটা সেট করে প্লাস্টার করে দিয়েছি। কিন্তু জ্ঞান ফিরে এসেছে তো, তাই চেঁচাচ্ছিল। একটা ঘুমের ওষুধ দিতে হল, এখন বেশ কিছুক্ষণ ঘুমোবে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “এখানে কি রুগি ভর্তি করে চিকিচ্ছে করা হয় নাকি মশাই?”
মেজর গুপ্ত বললেন, “তাও হয়, তবে জায়গা থাকলে। আসলে দোতলাটা ভাড়া নিয়ে যা করতে পেরেছি, সেটা নামেই নার্সিং হোম, ছ’টার বেশি বেডের ব্যবস্থা করতে পারিনি, আর ক্যাবিন মাত্র দুটো। ফলে যাঁরা ভর্তি হতে চান, তাঁদের জায়গা দিতে পারি না। দেওয়া যাবেও না, যদ্দিন না নিজের প্ল্যানমতো একটা বাড়ি এখানে তুলতে পারছি। কিন্তু সেটাই বা কী করে হবে, জমি আর বিল্ডিং মেটিরিয়ালের যা দাম!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ব্যাঙ্কের কাছ থেকে লোন নেওয়া যায় না?”
“ব্যাঙ্ক আমাকে লোন দেবে কেন?” মেজর গুপ্ত ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “আমার কি কোনও পোলিটিক্যাল ব্যাকিং আছে। আমার শুধু স্বপ্ন দেখাই সার। বিরাট একটা নার্সিং হোম করব, সেখানে সবরকম পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, যেমন চিকিৎসা তেমন নার্সিংও হবে এ-ওয়ান, সামনে একটা বাগান থাকবে, বাগানের মধ্যে ফোয়ারা,—যখন ডাক্তারি পড়তুম, তখন থেকে তো এই স্বপ্নই দেখে আসছি। কিন্তু কিছু হল কোথায়? শেষ পর্যন্ত কী হল? না ছ’টা বেড আর দুটো ক্যাবিনের একটা শ্যাবি পিজরাপোল।”
মেজর গুপ্ত একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও সব কথা থাক ভাদুড়িদা। কী জানতে চান বলুন। দেখি আপনাকে সাহায্য করতে পারি কি না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি তোমাকে গোটাকয়েক প্রশ্ন করব, বিষ্টু। যদি মনে করো যে, উত্তর দেওয়াটা একজন ডাক্তার হিসেবে তোমার পক্ষে আনএথিক্যাল হবে, তা হলে দিয়ো না। সেক্ষেত্রে আমি বরং অন্য কোনও সূত্রে উত্তরগুলো জেনে নেবার চেষ্টা করব।”
মেজর গুপ্ত তাঁর বিষণ্ণ ভাবটা ইতিমধ্যে কাটিয়ে উঠেছিলেন। কৌতুকের গলায় বললেন, “যালে, আপনার প্রশ্নই তো শুনিনি। সেটা আগে শোনা যাক, তখনই বরং ঠিক করব যে, উত্তর দেব কি দেব না।”
“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওঁদের…আই মিন মাধবানন্দ আর তাঁর স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কটা কী রকম?”
“এটা বলতে আমার এথিকসে আটকাচ্ছে, ভাদুড়িদা। আমি ওঁদের হাউস-ফিজিশিয়ান, দু’জনেরই চিকিৎসা আমাকে করতে হয়।”
“তা হলে বোলো না। আই ওন্ট ইনসিস্ট।”
“কিন্তু আমি যেমন ওঁদের ডাক্তার, তেমন আপনিও তো মিঃ মিত্রের হয়ে তদন্ত করতে এসেছেন। তাও আবার আমারই রেফারেন্সে। তাই ভাবছি যে, আপনাকে বলা যেতে পারে। যদি অবশ্য আপনার তদন্তের তাতে সুবিধে হয়। কিন্তু আগেই জানিয়ে রাখি, যা-ই বলি না কেন, দ্যাট উইল বি ইন স্ট্রিক্ট কনফিডেন্স। আপনি ছাড়া আর কেউ সেটা জানবে না।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে আমি বললুম, “আপনারা বরং কথা বলুন, আমি আর সদানন্দবাবু বরং ততক্ষণ একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”
মেজর গুপ্তই বললেন, “আরে না না, আপনারা বসুন, আপনারা ভাদুড়িদা’র ট্রাস্টেড বন্ধু, তাই ওঁকে যা বলব, সেটা আপনারা জানলেও কোনও ক্ষতি নেই।…তো যা বলছিলুম। আপনি জানতে চাইছেন ওঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক কীরকম। তো এর উত্তরে ভাল মন্দ কিছু একটা আমাকে বলতে হয়। কিন্তু মুশকিল কী জানেন, ও দুটো উত্তরের কোনওটাই আমি দিতে পারছি না। কেন পারছি না জানেন?”
“কেন?” প্রশ্নটা ভাদুড়িমশাইয়ের।
“এইজন্য পারছি না যে, দাম্পত্য সম্পর্ক বলতে যা বোঝায়…মানে যেটাকে অনেকে ক্রুড ভাবেন, কিন্তু আমরা ডাক্তাররা যাকে অত্যন্ত নর্মাল একটা ব্যাপার বলে জানি, সেই সম্পর্কটাই ওঁদের নেই। অন্তত গত বারো-চোদ্দো বছর ধরে নেই।”
“এটা তুমি কী করে জানলে?”
“জানলুম তার কারণ আমি ওঁর চিকিৎসক। চিকিৎসা করতে গিয়ে কয়েকটা ব্যাপারে আমার মনে কিছু সন্দেহ দেখা দেয়, তাই নিয়ে ওঁকে প্রশ্ন করি, প্রথম-প্রথম উনি আমাকে এড়িয়ে যান, পরে একদিন আমার চেম্বারে এসে—বুঝতেই পারছেন আন্ডার দ্য ইনফ্লুয়েন্স অভ লিকার -কনফেস করেন যে, হি লস্ট হিজ ভিরিলিটি অ্যাট দ্য এজ অভ ফর্টিফাইভ। নাউ থিঙ্ক অভ মিসেস মিত্র। ভদ্রমহিলার বয়েস তখন কত?”
স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান কত, আগের দিনই সেটা মিসেস মিত্রের কাছে শুনেছিলেন বলে হিসেবটা সদানন্দবাবুর নখাগ্রেই ছিল। তিনি বললেন, “নট মোর দ্যান টুয়েন্টিথ্রি।”
মেজর গুপ্ত বললেন, “তবেই বুঝুন। ভাদুড়িদা, আপনি দাম্পত্য সম্পর্কের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন না? তা শারীরিক কিছু দাবিদাওয়ার ব্যাপার আছে তো। সেটা পূরণের কোনও ব্যবস্থা যেখানে নেই, তেইশ বছরের একটি মেয়ের সঙ্গে তার স্বামীর সম্পর্ক সেখানে কী দাঁড়াতে পারে? দিনে-দিনে সেটা আরও খারাপ হয়েছে মাত্র। আসলে দে লিভ আন্ডার ওয়ান রুফ, বাট দে লিভ লাইক স্ট্রেঞ্জার্স। সেদিক থেকে ওদের ম্যারেজ একটা ক্রুয়েল জোক ছাড়া আর কিছুই নয়।”
যেমন সদানন্দবাবু, তেমন আমিও একেবার চুপ করে গিয়েছিলুম। ভাদুড়িমশাইও কোনও কথা বলছিলেন না। আমার মতো তাঁরও বোধহয় মনে হচ্ছিল যে, জানলা-দরজা বন্ধ একটা ঘরের মধ্যে আমরা আটকা পড়ে গেছি। বিষয়টা বড্ড ব্যক্তিগত বলেই ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার।
ভাদুড়িমশাই তাঁর প্যাকেট থেকে আবার একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। টেবিলের উপরে একটা পেপারওয়েট পড়ে ছিল। সেটা তুলে নিয়ে নাড়াচাড়া করলেন কিছুক্ষণ। তারপর পেপারওয়েটটাকে আবার যথাস্থানে রেখে দিয়ে মৃদু গলায় বললেন, “শরীর যদি এতই জরুরি হবে, তো মাধবানন্দকে উনি ডিভোর্স করলেন না কেন? আদালত যা গ্রাহ্য করবে, এমন গ্রাউন্ড যে ছিল না, তা তো নয়। তা হলে?”
মেজর গুপ্ত বললেন, “ তা তো আর একজন ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করা যায় না। আবার জিজ্ঞেস না-করে কিছু বুঝবারও উপায় নেই। তবে হ্যাঁ, কেন করেননি, সেটা আন্দাজ করতে পারি।”
“ঠিক আছে, কী আন্দাজ করেছ, সেটাই বলো।”
“কী জানেন ভাদুড়িদা,” মেজর গুপ্ত বললেন, “আমার ধারণা, বাইরে থেকে যতই শান্ত, ভদ্র আর নিরীহ মনে হোক, ভিতরে-ভিতরে শি ইজ আ ভেরি স্ট্রং উয়োম্যান। স্ট্রং অ্যান্ড প্রাউড। হতে পারে যে, ওঁর প্রাইডই এক্ষেত্রে একটা মস্ত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডিভোর্স চাওয়া মানেই তো এটা মেনে নেওয়া যে, ওঁর বাবার কথাটাই ঠিক, আঠারো বছর বয়সে ওই যে উনি চল্লিশ বছরের এক উইডোয়ারের জন্যে বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, এটা মোটেই ঠিক হয়নি। আমার তো মনে হয়, ডিভোর্স না-চাওয়ার এটাই মস্ত কারণ। উনি হার মানতে চান না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “উনি যে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন, এটা তুমি জানো?”
মেজর গুপ্ত বললেন, “কে না জানে। দেরাদুন আর মুসৌরিতে বলতে গেলে এমন লোক নেই, যে জানে না।”
“ওঁদের আর্থিক অবস্থা কেমন?”
“ওঁদের বলবেন না, ওঁর বলুন।” মেজর গুপ্ত বললেন, “মিসেস মিত্রের আর্থিক অবস্থা খুবই ভাল। অথচ শুনেছি, প্রথম যখন ওঁরা দেরাদুনে আসেন তখন একটা স্থায়ী ঠিকানা পর্যন্ত ওঁদের ছিল না। তারপর ওঁর হাতে কিছু টাকা এল, সেই টাকা নিয়ে উনি ব্যাবসায় নামলেন, অ্যান্ড দ্য হোল পিকচার চেঞ্জড। সিনেমা বলুন, হোটেল বলুন, স-মিল বলুন, ট্রান্সপোর্ট বিজনেস বলুন, জমি কেনা-বেচা বলুন, যা-কিছুতেই উনি হাত দিয়েছেন তাতেই সোনা ফলেছে। শি মাস্ট হ্যাভ মেড ক্রোরস, অ্যান্ড অল ডিউরিং দ্য লাস্ট টেন-টুয়েলভ ইয়ার্স।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন মেজর গুপ্ত। তারপর বললেন, “কী জানেন ভাদুড়িদা, ওঁর জীবনের একটা দিক যে একেবারেই নিষ্ফল, একটা বাচ্চা পর্যন্ত হল না, দ্যাট এক্সপ্লেনস দিস ট্রিমেন্ডাস সাকসেস ইন আ টোটালি ডিফারেন্ট এরিয়া।”
“তার মানে…”
“মানে ওঁর তাবৎ আকাঙ্ক্ষা আর উদ্যম, যা একটা দিকে কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছিল না, তা একেবার অন্য দিকে চ্যানেলাইজড হয়ে গেল। আমি সাইকোলজিস্ট নই, কিন্তু এ ছাড়া তো অন্য কোনও ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মাধব মিত্রের কাজটা তা হলে কী?”
“উনি ওঁর স্ত্রীর প্রপার্টির দেখাশোনা করেন। তা ছাড়া আর কিছুই না।”
“কিন্তু কলকাতায় গিয়ে উনি যে আমাকে বললেন, যেমন এখানে তেমন কলকাতাতেও ওঁর উপরে হামলা হয়েছে, হিজ লাইফ ইজ ইন ডেঞ্জার, এটা হচ্ছে কেন? একটা-কিছু কারণ তো থাকতে হবে। এ-ব্যাপারে তুমি কিছু বলতে পারো?”
“উনি কী বলেন?”
“উনি তো কোনও সূত্রই আমাকে ধরিয়ে দিতে পারছেন না। বলছেন, ওঁর কোনও শত্রু নেই। বলছেন, ওঁর কাছে এটা একটা মিস্টিরিয়াস ব্যাপার। মিঃ মিত্রের কথা শুনলে কী মনে হয় জানো? মনে হয় যে, উনি নিজেই একটা ধাঁধায় পড়ে গেছেন।”
“পড়া কিন্তু উচিত ছিল না।”
কথাটা বলে আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন মেজর গুপ্ত। বোধহয় ভেবে নিলেন যে, আর কিছু বলা উচিত হবে কি না। তারপর বললেন, “দেখুন ভাদুড়িদা, ওঁর যে কোনও শত্রু নেই, এই কথাটা সম্ভবত উনি ঠিক বলেননি। উনি যে-ধরনের লোক, তাতে বরং ওঁর কিছু শত্রু থাকাই স্বাভাবিক। একে তো পেটে দু’পাত্র পড়লেই ওঁর মেজাজ চড়ে যায়, তখন ক্লাবে বসে এখানকার গণ্যমান্য সব বিজনেসম্যান আর পোলিটিশানদের সম্পর্কে এমন সব নোংরা কথা বলতে থাকেন যে, আমার সন্দেহ হয়, হি হ্যাজ আ গড-গিভন ট্যালেন্ট অভ অ্যান্টাগোনাইজিং পিপল, তো তাদেরই যে-কেউ ওর পিছনে লোক লাগাতে পারে, জাস্ট টু টিচ হিম আ গুড লেসন। তার উপরে আবার, আমি যদ্দুর জানি, বাজারে ওঁর দেনাও নেহাত কম হবে না। শুনেছি সবই চড়া সুদের দেনা। অথচ তার কোনওটাই যে উনি শোধ করবেন, কিংবা করতে পারবেন, তার লক্ষণ নেই। এদিকে সুদের অঙ্ক আসল ছাড়িয়ে যাবার জোগাড়।”
“এত টাকা ওর কীসে লাগে?”
“শেয়ার কিনতে লাগে। ওঁর ধারণা, শেয়ার মার্কেটটা উনি খুব ভাল বোঝেন। আদতে কিছুই বোধহয় বোঝেন না। ফলে, যে-কোম্পানিরই শেয়ার কিনুন, পরদিন থেকেই তার দর পড়ে যেতে থাকে। এর মধ্যে যে খানিকটা দুর্ভাগ্যের ব্যাপার আছে, তাও অবশ্য বলব। নইলে যে-সব শেয়ার উনি অ্যাট পার কিনেছেন…..মানে দশ টাকার শেয়ার দশ টাকাতেই কিনেছেন, তার দামই বা উনি কেনবার পরেই হঠাৎ দশ টাকা থেকে ঝপ করে আট টাকায় পড়ে যাবে কেন? ওঁর ধারণা, এটা সাময়িক ব্যাপার, দর আবার চড়চড় করে উঠবে। কিন্তু ওঠে না।”
ভাদুড়িমশাই ফের একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ ধোঁয়া ছাড়লেন কিছুক্ষণ। তারপর আধ-খাওয়া সিগারেটটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে বললেন, “বাজারে ওঁর দেনার পরিমাণ কত?”
“তা আমি কী করে জানব?” মেজর গুপ্ত বললেন, “তবে লাখ কয়েক হবে নিশ্চয়।”
“সেটা শোধ করবার সাধ্য ওর নেই, কেমন?”
“কী করে থাকবে,” মেজর গুপ্ত বললেন, “ওঁদের যা-কিছু প্রপার্টি, সবই তো মিসেস মিত্রের নামে। ওঁর নিজের বলতে দিল্লিতে একটা বাড়ি ছাড়া আর কিসসু নেই। তাও পুরো বাড়ি নয়, পৈতৃক বাড়ির একটা অংশ। কিন্তু কাল রাত্তিরে ক্লাবে বসে উনি যা বললেন, তাতে ওটা বিক্রি করার টাকায় যে ধার শোধ হবে, এমন ভরসা কম।”
“কী শুনলে?”
“শুনলুম, ওটা বিক্রি করে আর্নেস্ট মানি হিসেবে পাঁচ লাখ পেয়েছেন, পরে আরও পাঁচ লাখ পাওয়া যাবে। তবে ইতিমধ্যেই তার আড়াই লাখ নাকি ওঙ্কারমল আগরওয়াল বলে এক ব্যবসায়ীর অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত দিতে গেছে। আর বাদবাকি যা হাতে আছে, তাই দিয়ে…”
“তাই দিয়ে কী?”
“তাই দিয়ে ফের শেয়ার কিনবেন। ক্লাবে বসে অন্তত এই কথাই বলছিলেন। তার মানে বুঝলেন তো? ও-টাকাও জলে গেল। ওঁর ধার আর শোধ হবার নয়।”
“ঠিক আছে বিষ্টু,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি ধরে নিচ্ছি যে, যাঁদের কাছ থেকে উনি টাকা ধার করেছেন, কিন্তু শোধ দিচ্ছেন না, তাঁরাই ওঁর উপরে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়।”
সদানন্দবাবু এতক্ষণ মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলেন। কিন্তু আর পারলেন না। বললেন, “এ তো বোঝাই যাচ্চে যে, তারাই কালপ্রিট। এর মধ্যে আবার প্রশ্ন উঠচে কেন?”
“উঠছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “টাকা যারা ধার দেয়, তাদের আসল লক্ষ্য তো হওয়া উচিত সুদসমেত টাকাটা ফেরত পাওয়া। তা মিঃ মিত্রকে মেরে ফেললে তো আর টাকাটা ফেরত পাওয়া যাবে না।”
মেজর গুপ্ত বললেন, “মেরে ফেলতে চায়, এমন ভাবছেন কেন? এমনও তো হতে পারে যে, হামলা যারা করছে, প্রাণে মারা নয়, স্রেফ ভয় দেখিয়ে তারা টাকা আদায় করতে চায়।”
“ভয় দেখাবার জন্যে তারা কলকাতা অবধি ধাওয়া করবে?”
“সেটা আবার কী ব্যাপার?”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বলুন কিরণবাবু।”
কাঁকুড়গাছিতে অরুণ সান্যালের ফ্ল্যাটে বসে মাধবানন্দ যা বলেছিলেন, মেজর গুপ্তকে জানালুম। বললুম, “ফুটপাথ থেকে কেউ নাকি ধাক্কা দিয়ে ওঁকে রাস্তার উপরে একটা স্টেশন-ওয়াগনের সামনে ফেলে দেয়। পরদিনই হোটেলের উপরতলার বারান্দা থেকে একটা ফুলগাছের টব ওঁর পাশে এসে আছড়ে পড়ে। মাথার উপরেই পড়ত, স্রেফ ভাগ্যক্রমে উনি রক্ষা পেয়ে যান।”
মেজর গুপ্ত হেসে বললেন, “ধুর, আমার এ-সব বিশ্বাস হয় না। মানে ঘটনা দুটোর কথা যে আমি অবিশ্বাস করছি, তা নয়, কিন্তু তাই বলে ওকে মারবার জন্যে কেউ এখান থেকে কলকাতা অব্দি গেছে, আর গিয়ে এইসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে, এতটা বিশ্বাস করা শক্ত। আসলে উনি আতঙ্কে ভুগছেন। বেসলেস আতঙ্ক। আমরা এটাকে কী বলি জানেন তো?”
সদানন্দবাবু বললেন, “হাইপোকনড্রিয়া!”
“আরে,” মেজর গুপ্ত বললেন, “আপনি যে দেখছি আমাদের ভাষাতেই কথা বলছেন। আপনিও কি ডাক্তার নাকি মশাই?”
কুণ্ঠিত গলায় সদানন্দবাবু বললেন, “না না, কথাটা আমি আমাদের এক বন্ধুর কাছে শুনিচি। তিনিও ডাক্তার। তা তিনিই বলছিলেন যে, মাধব মিত্তির সম্ভবত হাইপোকনড্রিয়ায় ভুগচেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ফরগেট হোয়াট হ্যাপেনড ইন ক্যালকাটা। এখানে যে মাধব মিত্রের উপরে বারকয়েক হামলা হয়েছে, সেটা তো ঠিক। তা তুমি বলছ, এর উদ্দেশ্য সম্ভবত ভয় পাইয়ে টাকা আদায় করা। কিন্তু যতই ভয় পাওয়াক, ধার শোধ করবার ক্ষমতাই যে মাধব মিত্রের নেই, তা কি তারা জানত না?”
মেজর গুপ্ত বললেন, “বাড়ি বিক্রি করবার পরে কিন্তু খানিকটা ক্ষমতা হয়েছে, ভাদুড়িদা।”
“সেটা এখন হয়েছে। কিন্তু হামলা যখন হয়, তখন তো সে-ক্ষমতা ওঁর ছিল না। তবু কেন হামলা হল? টাকা পাওয়ার অন্য কোনও উপায় বা সোর্স কি তখনও মাধব মিত্রের ছিল? আই মিন এমন কোনও সোর্স, ওঁর পাওনাদাররা যার খবর রাখত?”
মেজর গুপ্ত বললেন, “বাঃ, ওঁর স্ত্রীই তো একটা বিরাট সোর্স।”
“কিন্তু সেই সোর্স যদি টাকা বার করে দেনার দায় মেটাতে পারতেন, তা হলে তো ওঁর উপরে হামলাই হত না। এর থেকে আমরা কী বুঝব বিষ্টু? মিসেস মিত্র ওঁকে টাকাটা দেননি?”
“এমন হতে পারে যে, প্রথম-প্রথম এক-আধবার দিয়েছেন, কিন্তু সবই যে জলে যাচ্ছে, এটা বুঝতে পেরে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। আবার এমনও হতে পারে যে, টাকাটা উনি আদৌ মিসেস মিত্রের কাছে চাননি।”
“কেন? স্ত্রীর কাছে হাত পাততে ওঁর আত্মসম্মানে বাধছে?”
মেজর গুপ্তের মুখেচোখে দেখলুম আবার সেই বিষণ্ণতার ছায়া পড়েছে। বললেন, “মিঃ মিত্ৰ আমার পেশেন্ট। তবু কথাটা যখন উঠেছে, তখন বলাই বোধহয় ভাল। না, ভাদুড়িদা, আত্মসম্মানের বালাই ওঁর নেই।”
“এটা কেন বলছ?”
“তার আগে আপনিই বলুন, যার একটুও সেল্ফ রেসপেক্ট আছে, সে কখনও নিজেরই এক সাবঅর্ডিনেট মহিলা কর্মচারীর সঙ্গে ফস্টিনষ্টি করতে যায়? তার হাত ধরে টানাটানি করে?”
“এটা আবার উনি কার সঙ্গে করলেন?”
“ওঁদের হোটেলের রিসেপশনিস্টের সঙ্গে।”
“ইউ মিন মিসেস সিনহার সঙ্গে?”
“হ্যাঁ, ভাদুড়িদা।” মেজর গুপ্ত বললেন, “মিসেস সিনহা আগে আমার এখানেই কাজ করতেন। কিন্তু আমার নার্সিং হোম তো ছোট, আয়ও খুবই কম, মাইনেপত্তরও তাই তেমন-কিছু ওঁকে কখনও দিতে পারিনি। চেষ্টায় থাকতুম, যাতে অন্য কোথাও আর-একটু বেশি মাইনেতে ওঁকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। এদিকে আবার ভদ্রমহিলা ইংরিজিটাও চলনসই গোছের জানেন, কথাবার্তায় চালচলনে স্মার্টও বটেন, তাই ভ্যালি ভিউ হোটেলে যখন একজন রিসেপশনিস্টের দরকার হল, তখন মিসেস মিত্রকে ধরে আমিই সেই চাকরিটা ওঁকে পাইয়ে দিই। কাজটা তো শুনি মোটামুটি ভালই চালাচ্ছিলেন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব যে এফিসিয়েন্ট, সে তো দেকলেই বোঝা যায়। মুখেও সব সময়ে হাসি লেগে আচে।”
“আর দেখবেন না। অন্তত ওখানে নয়।”
সদানন্দবাবু হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, “কেন?”
“পরশু রাত্তিরে হোটেলে ফিরে মিঃ মিত্র ওঁকে কিছু বলেছিলেন। এমন-কিছু, যা কোনও ভদ্রলোক বলতে পারে বলে উনি ভাবেননি। হাত ধরে নাকি টানাটানিও করেছিলেন। ফলে কাল সকালেই ওখানকার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে উনি আবার এখানে ফিরে এসেছেন। বলছেন, বেশি টাকার দরকার নেই, এখানে যা পাচ্ছিলেন, তাতেই উনি চালিয়ে নেবেন। তাতে অন্তত সম্মানটা বাঁচবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভেরি স্যাড। কিন্তু একটা কথা যে বুঝতে পারছি না, বিষ্টু।”
“কোন কথাটা?”
“মাধব মিত্রের যে আত্মসম্মানের বালাই নেই, তা তো বুঝলুম। কিন্তু ও-বালাই যখন নেই, তখন ধার শোধ করবার জন্যে তিনি বউয়ের কাছে হাত পাতছেন না কেন?”
“তা তো বলতে পারব না, ভাদুড়িদা।” মেজর গুপ্ত বললেন, “তবে হ্যাঁ, কারণ একটা আন্দাজ হয়তো করতে পারি।”
“বলে ফ্যালো।”
“মেবি হি ইজ ওয়েটিং ফর সামথিং টু হ্যাপেন।”
“হোয়াট সামথিং?”
“মিসেস মিত্রও যে ইতিমধ্যে দু-তিনটে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন, তার মধ্যে একবার ইলেকট্রোকুটেড হতে-হতে অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন, সেটা জানেন তো?”
“জানি।”
“এদিকে আবার ভদ্রমহিলার স্বাস্থ্যও খুব ভাল নয়। আমারই পেশেন্ট, তাই জানি। একে হাইপার টেনশনের রুগি, তার উপরে আবার প্রেশারও ইদানীং বড্ড ফ্লাকচুয়েট করছে।”
“একটা কথা বলো তো, দুর্ঘটনাতেই হোক আর হার্ট-অ্যাটাক হয়েই হোক, হঠাৎ যদি উনি মারা যান তো ওঁর সম্পত্তি কে পাবে?”
“কেন, ওঁর স্বামী।”
“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। “আর কিছু জিজ্ঞেস করবার নেই। আজ চলি।”
“চা তো খেলেন না।”
“ওটা আর-একদিন এসে খাওয়া যাবে।”
মেজর গুপ্তের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আমরা ট্যাক্সিতে উঠলুম। মুসৌরি পর্যন্ত পথ ভাদুড়িমশাই যেমন ঝিম মেরে বসে রইলেন, তাতে মনে হল, মনে-মনে কোনও একটা জট ছাড়াবার চেষ্টা করছেন। হোটেলে ঢুকে দেখলুম, রিসেপশান কাউন্টারে মিসেস সিনহার বদলে অল্পবয়সী আর-একটি মেয়ে বসে আছে। মিসেস সিনহা যে এখানকার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, সেটা জানা-ই ছিল, তাই অবাক হলুম না।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আটটা বাজে, আপনারা খেয়ে নিয়ে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন। সারাটা দিন খুব ধকল গেছে।”
বললুম, “আপনি খাবেন না?”
“এক্ষুনি না। ভাবছি খানিক বাদে রুম সার্ভিসকে বলে একটা সুপ আনিয়ে নেব। ওতেই চলে যাবে।”
“এখন তা হলে কী করবেন আপনি?”
“নটা নাগাদ দুটো ফোন আসবার কথা আছে। যতক্ষণ না আসে, ততক্ষণ ভাবব।”
“কী নিয়ে ভাববেন? এই কেসটা নিয়ে নিশ্চয়?”
“না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এক ফরাসি জমিদারকে নিয়ে। ব্লুবেয়ার্ডের নাম শুনেছেন?”
“তা কেন শুনব না?” আমি বললুম, “এটাও তা হলে সেই ব্যাপার?”
“তা-ই তো ভাবছি। যান, আপনারা খেয়ে নিয়ে ঘরে চলে যান। আমি আর-একটু ভাবি।”
ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
