এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
মামা-ভাগ্নীর স্বপ্নভঙ্গ
কর্নেল বিকেলে ছাদে গিয়ে একটা ক্যাকটাসের দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। অ্যারিজোনার মরু অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ব্যারেল ক্যাকটাস। দেখতে ব্যারেল বা পিপের মতো। বাংলার কোমল জলবায়ুতে কিছুদিন কষ্ট পাওয়ার পর এখন সামলে উঠেছে। মাথায় গোলাপী মুকুট পরে নিয়েছে। কাটাগুলোর রঙেও সবুজের ঘোর লেগেছে। তবু চেহারা দেখে হাসি পায়। যেন ইউরোপের মধ্যযুগের সেই রাজসভার ভড়। পেটমোটা কুমড়োপটাস। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, না ডার্লিং! তোমাকে বরং বলা যাক্ গাগাঁতুয়া পাতাগ্রুয়েল। কী? খুশি তো?
ষষ্ঠী এসে দেখল, বাবামশাই বিড় বিড় করে কী বলছেন আর হাসছেন। আজকাল কী যেন হয়েছে ওঁর। মাথার গণ্ডগোল হয়নি তো? সে খুক করে কাসল।
কর্নেল ঘুরে তাকে দেখতে পেয়ে বললেন, ষষ্ঠী, মজা দেখে যা।
বাবামশাই, এক ভদ্রলোক এয়েছেন। সঙ্গে মেয়েছেলেও রয়েছেন।
কর্নেল ভুরু কুঁচকে তাকালে ষষ্ঠী ঝটপট বলল, মাথায় নম্বা-লম্বা চুল, মোটা করে। আর মেয়েছেলেটা কেমন যেন জংলি-জংলি ভাব। গেরামের মেয়েছেলের মতো। কেমন যেন
কর্নেল নেমে গিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকলেন। আরে! বনবিহারীবাবু যে! বলে ওঁর পাশে বসে থাকা ঊনিশ-কুড়ি বছর বয়সের এবং সত্যিই জংলি-জংলি ভাবের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সম্ভবত আপনার ছোট ভাগ্নী অপালা?
বনবিহারীবাবুও হাসলেন। আপনার চোখকে ফাঁকি দেওয়া কঠিন স্যার!
মৃগাঙ্কবাবুকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে শুনেছেন, কি?
শুনেছি। ডি সি সায়েবের কাছ থেকেই আসছি। উনি আপনার কাছে আসতে বললেন।
কর্নেল অপালাকে সস্নেহে বললেন, তুমি কখন এসেছ?
অপালা লজ্জিতভাবে মুখ নামিয়ে বলল, আজ ভোরবেলা।
বোঝা যাচ্ছিল, সে যথেষ্ট আড়ষ্ট হয়ে রয়েছে। বনবিহারীবাবু বললেন, প্রথমে ডি সি সায়েবের কাছে ওকে সঙ্গে করে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ওঁরা যদি বিহার পুলিসকে একটু বলে দেন তাতে কাজ হবে। কিন্তু ডি সি সায়েব বললেন, কিছু দরকার নেই। কর্নেলসায়েব হয়তো সেতাপগঞ্জ যাবেন। ওঁকে বলুন।
কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন, নতুন কিছু ঘটেছে ওখানে?
ঘটেছে মানে–অপালা এসে যা বলল, তাতে তো আমি হতভম্ব হয়ে গেছি। প্রথমে বিশ্বাস করতেই পারিনি, মানুষ এমন জানোয়ার হতে পারে। আপনাকে ইন্দু ভটচায়ের কথা বলেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, রুদ্রদাকে সেই খুন করেছে। দুধ দিয়ে কালসাপ পুষে গেছে রুদ্রদা! বনবিহারীবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন, তার এমন সাহস যে সে অপুর গায়ে হাত ওঠায়?
মারধর করেছে বুঝি?
চোখ জ্বলে উঠলে বনবিহারীবাবুর। ইন্দু হারামজাদা অপুকে বিয়ে করতে চায়! স্পর্ধাটা দেখুন একবার। অপুর বাপের বয়সী ব্যাটা! নেমকহারাম! আবার বলেছে, আমার নাকি এতে সায় আছে। বুঝুন!
কর্নেল অপালার দিকে তাকালেন। অপালা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অনেকদিন থেকে আমার পেছনে লেগেছে ইন্দুকাকা। বাবা খুন হওয়ার পর থেকে। আমার। শরম বাজত। তাই কাউকে কিছু বলিনি। কাল দয়ালদা চুপি চুপি বলল, মামার কাছে চলে যাও। নইলে বিপদ হতে পারে।
কে দয়াল?
বনবিহারীবাবু বললেন, রাঁধুনি। একমাত্র ওই লোকটাই খাঁটি মানুষ ওদের বাড়িতে।
অপালা চোখ মুছে বলল, আর মনিয়াও ভাল। সে না থাকলে বড়দি মরে যেত।
কর্নেল চোখ বুজেছিলেন। হঠাৎ চোখ খুলে বললেন, তুমিই তোমার বাবার একটা চিঠি পোস্ট করেছিলে কি অপালা–আমার নাম-ঠিকানা লেখা চিঠি?
অপালা আস্তে বলল, হ্যাঁ। চিঠিটা বাবার বিছানার তলায় পেয়েছিলাম। খামের মুখ আঁটা ছিল। ভাবলাম, চিঠিটা বাবা পোস্ট করতে ভুলে গিয়েছিল।
তুমি জানতে না চিঠিতে কী, লেখা আছে?
কর্নেলের চোখের দিকে তাকিয়ে অপালা মুখ নামালো। তেমনি মৃদুস্বরে বলল, খামটার মুখ জলে ভিজিয়ে খুলেছিলাম। তখন অতকিছু বুঝতে পারিনি। ভাবছিলাম, বাবা তো খুন হয়ে গেছেন। আর কী হবে চিঠিটা পাঠিয়ে? তারপর মেজদি খুন হবার খবর পেলাম। তখন খামটা এঁটে পোস্ট করে দিলাম।
তোমার কাকে সন্দেহ হয়, অপালা? তোমার বাবাকে কে খুন করেছে মনে হয়?
বনবিহারীবাবু কী বলতে ঠোঁট ফাঁক করলেন। কর্নেল ইশারায় তাকে থামিয়ে বললেন, বলো, অপালা!
অপালা বলল, ইন্দুকাকা।
ষষ্ঠী যথারীতি কফি ও স্ন্যাক্স রেখে গেল। কর্নেল কফির পেয়ালা এগিয়ে দিলেন অপালার দিকে। অপালা অনিচ্ছা-অনিচ্ছা করে চুমুক দিল। বনবিহারীবাবু বললেন, ওকে ইন্দু একেবারে জংলি করে ফেলেছে ছোটবেলা থেকে। রুদ্রদা তো কিছু দেখতেন না। শুধু জমিজমা, মামলা-মোকদর্মা আর হাঙ্গামা।
কর্নেল বললেন, যে রাতে তোমার বাবা খুন হন, তখন তুমি কোথায় ছিলে?
অপালা বলল, পাশের ঘরে। ভোরবেলা রোজ বাগান থেকে ফুল এনে বাবাকে দিই। বাবা ফুল ভালবাসতেন। যাবার সময় কিছু লক্ষ্য করিনি। ফুল। এনে দেখি, বাবার ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে একটা হাত দেখা যাচ্ছে। ভাবলাম, বাবা দরজা খুলতে এসে পড়ে গেছেন। তারপর কপাট ঠেলে দেখি, বাবা চিত হয়ে পড়ে আছেন। গলায় চাপচাপ রক্ত।
সেরাতে কোনো সন্দেহজনক কিছু ঘটেছিল? কোনো শব্দ শুনেছিলে?
না। আমার ঘুমটা খুব বেশি।
তোমার বাবা পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী ছিলেন?
হ্যাঁ। একটুও চলাফেরা করতে পারতেন না। বিছানা ছেড়ে নামতেও পারতেন না। আমি থাকলে আমিই বাবার মুখ ধুইয়ে গা মুছিয়ে দিতাম। খাইয়ে দিতাম। আমি না থাকলে দয়ালদা বা মনিয়াই ওসব করত।
তুমি কোথায় থাকতে?
প্রায় সারাটাদিন আমাদের ফার্মে। ইন্দুকাকা যেতে বলত। আমার ভালও লাগত যেতে। ফিরতাম সন্ধ্যাবেলায়।
হুঁ–তোমার বাবা বিছানা ছেড়ে নামতে পারতেন না বলছ। তাহলে কেমন। করে তিনি দরজা খুলেছিলেন?
অপালা একটু চুপ করে থেকে বলল, পরে আমার অবাক লেগেছিল। কারণ, বাবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে আমি রোজ বন্ধ করে দিতাম। ও ঘরের ভেতর দিয়ে আমার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তাম। বাবার ঘর আর আমার ঘরের মাঝের দরজাটা খোলা থাকত। ভোরে যখন বেরুতাম, তখন আমার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় যেতাম। বারান্দার মুখেই সিঁড়ি। বাবার ঘুম হয় না সারা রাত। ভোরে একটু ঘুমোন। বাগান থেকে ফুল এনে আমার ঘর হয়ে বাবার ঘরে ঢুকতাম। বাবা জেগে উঠলে তখন ওঘরের দরজা আমিই খুলে দিতাম।
তুমিই বাবার ডেডবডি প্রথম দেখেছিলে?
হ্যাঁ। বাড়িতে তখনও সবাই শুয়ে।
কে কোথায় শুয়ে?
আমি আর বাবা ওপরতলায়। ইন্দুকাকা, বড়দি, শ্যামা, দয়ালদা, মানিয়া– সবাই নিচের তলায় যে যার ঘরে। এখন ইন্দুকাকা বাবার ঘরটা দখল করেছে।
বাবার গলায় রক্ত দেখেছিলে। টাটকা রক্ত, না জমাটবাঁধা রক্ত?
টাটকা রক্ত। তখনও চুঁইয়ে পড়ছিল।
তোমার মনে হয়নি তুমি বেরিয়ে যাওয়ার পর কেউ ওঁকে খুন করেছে।
তখন কিছু মাথায় আসেনি। এখন আপনি বললেন বলে তাই মনে হচ্ছে।
তাহলে তো তোমার ঘর দিয়ে ঢুকে ওঁকে খুন করতে পারে?
বনবিহারী কান করে শুনছিলেন। হু। তাই করেছিল। আমি গিয়ে সব শোনার পর পুলিশকে সেটাই সাজেস্ট করেছিলাম। ওখানকার পুলিশ বড় অদ্ভুত। পাত্তাই দিল না আমাকে। ওদের মাথায় রঘুয়া ঢুকে বসে আছে।
তুমি বাগান থেকে ফুল আনার সময় যখন বাড়ি ঢুকেছিলে কাউকে দেখতে পাওনি?
না। সবাই শুয়েছিল তখনও। অত ভোরে আমাদের বাড়ির কেউ ওঠে না।
তোমার বড়দি–
অপালা দ্রুত বলল, তার কিছুদিন আগে একরাত্রে বড়দি বাবার দরজায় জোরে ধাক্কা দিচ্ছিল আর খারাপ-খারাপ কথা বলে বাবাকে গাল দিচ্ছিল। আমি বাবার ডাকাডাকিতে জেগে গেলাম। বাবার ঘরের দরজা খুলে দেখি, বড়দি একটা লম্বা ছুরি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছুরি মারতে এল আমাকে। আমি ওর হাত ধরে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে ফেলে দিলাম। বড়দিকে ধাক্কা দিলাম। বড়দি পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। কিন্তু কথাটা কাউকে বলতে বারণ করেছিল ইন্দুকাকা। শুধু কলকাতা এসে মেজদিকে বলেছিলাম।
ইন্দুবাবু বারণ করেছিলেন?
হুঁ। বড়দির হাতে অনেকসময় ওই ছুরিটা দেখতে পেতাম। কেড়ে নিতে গেলে অজ্ঞান হয়ে যেত। তাই ইন্দুকাকা আমাকে বকত। বলত, কেন ওকে ঘাঁটাতে যাচ্ছিস? যা খুশি করুক না।
তোমার বাবা খুন হওয়ার পর তোমার বড়দির রি-অ্যাকশন কী হয়েছিল?
বড়দি সবার সঙ্গে ওপরে এসে বাবাকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।
যখন সুস্থ থাকত, তখন কিছু বলত না তোমাকে বাবার সম্পর্কে?
কৈ, তেমন কিছু বলে অপালা ঢোক গিলল। হ্যাঁ–একদিন মন্দিরতলায় গিয়ে বসেছিল। ডাকতে গেলাম। তখন হঠাৎ বলল, অপু, তুই পালিয়ে যা শিগগির! নইলে তোর গলা কেটে ফেলবে। কে গলা কাটবে, কিছুতেই বলল না। তারপর থেকে আমি রাত্রে ভাল করে দরজা এঁটে শুতাম। কেউ কোনো কারণে ডাকলেও দরজা খুলতাম না।
বনবিহারীবাবু বললেন, লজ্জা করিসনে। ইন্দু ব্যাটার ব্যাপারটা বল্ ওঁকে!
অপালা মুখ নামিয়ে বলল, ইন্দুকাকা রোজ রাতে আমার ঘরের দরজা নক করতেন। পরশু রাতেও খুব জ্বালাচ্ছিলেন। আমি দরজা খুলিনি।
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, তোমাদের বাড়িতে রাত্রে ঢিল পড়ত শুনেছি?
হ্যাঁ। বড়দি বদমাইসি করত।
বনবিহারীবাবু অবাক হয়ে বললেন, খুকু ঢিল ছুড়ত? কৈ, বলিসনি তো?
বলে কী লাভ? বড়দি তো ওইরকমই চিরদিন। ওর যত রাগ ছিল বাবার ওপর। রাত্তিরবেলা নিচে থেকে বাবার ঘরের দিকে ঢিল ছুঁড়ত। বাবা চেঁচামেচি করতেন।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমাদের বাগানে পাথরের মূর্তিটা নাকি চলাফেরা করে বেড়ায় রাত্রিবেলা?
অপালা বলল, সেও বড়দির কাণ্ড। মূর্তিটার পায়ের কাছে রাতদুপুরে গিয়ে বসে থাকত। কেউ খুঁজতে গেলেই লুকিয়ে যেত। সবাই ভাবত বুঝি মূর্তিটা জ্যান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এক রাত্রে বাবাও সেই ভুল করে বন্দুক নিয়ে। দৌড়ে গিয়েছিলেন। আছাড় খেয়ে প্যারালেসিস হয়েছিল।
আচ্ছা বনবিহারীবাবু, রুদ্রেন্দুবাবু কি কোনো উইল করে গেছেন?
বনবিহারীবাবু বললেন, উইল করবেন বলে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি যাবার আগেই তো খুন হয়ে গেলেন।
তাহলে ওঁর সব সম্পত্তি প্রচলিত আইনে তিন মেয়েই পাবে?
হ্যাঁ। তার মানে, মেয়েদের বিয়ে হলে কার্যত তাদের স্বামীরাই মালিক হবে।
তাহলে মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি এক-তৃতীয়াংশের মালিক হয়ে গেছে?
হয়েছে বৈকি। বনবিহারীবাবু গলার ভেতর বললেন। তবে মৃগাঙ্ক তো এখন খুনের আসামী। তাছাড়া বিহারমুল্লুকে গিয়ে সম্পত্তি দখলের হাঙ্গামা সামান্য নয়। ইন্দু ব্যাটাচ্ছেলে বাগড়া দেবার জন্য তৈরি আছে। ওই লোকটা থাকতে কারুর সাধ্য নেই ওখানে গিয়ে নাক গলায়। ক্রমশ খুঁটি গেড়ে বসে গেছে যে।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, ঠিক আছে। অপালা আপাতত আপনার কাছেই থাক। আমি আগামীকাল সেতাপগঞ্জ রওনা হব, ভাবছি। আশা করি, একটা ফয়সালা হয়ে যাবে।
বনবিহারীবাবু করজোড়ে বললেন, মা-বাবা হারা অনাথা দুই বোন, কর্নেল! একজন তো মরার দিন গুনছে। চোখে জল এসে গেল বনবিহারীবাবুর। ওই মগের মুল্লুকে আর অপুকে পাঠাচ্ছি না। আমার ছেলেমেয়ে নেই–নিঃসন্তান মানুষ আমি। অপু থাক আমার কাছে। এখন ওই হতভাগিনী খুকুকে আপনি উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন। চুলোয় যাক সম্পত্তি! বলবেন, আমি গিয়ে ওকে নিয়ে এলেই পারি। চেষ্টা করেছি বহুবার। মেয়েটা কিছুতেই আসবে না। এই অপুও কি আসত? তাছাড়া এখন যদি আমি যাই, ইন্দু আমাকে মেরে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে। অপু চলে আসাতে সে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। আপনি অভাগা মেয়েটাকে আমার কাছে এনে দিন কর্নেল!
কর্নেল আস্তে বললেন, দেখা যাক।..
