একটা অদ্ভুত চিঠি
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার সকালে খুরপি হাতে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ড’-এ। ছাদজুড়ে দেশবিদেশের যত অদ্ভুত ক্যাকটাস, অর্কিড আর বিদঘুঁটে গড়নের কিছু উদ্ভিদ। তার হাতে ইতিমধ্যে যথেষ্ট মাটি মেখে গেছে এবং অন্যমনস্কতার দরুন সান্তাক্লজ অথবা পাদ্রীসুলভ সাদা দাড়িও কলঙ্কিত। তার। টুপিতে একটা সবুজ পোকা শীর্ষে ওঠার চেষ্টা করছে এবং কিনারায় গড়িয়ে পড়ছে। তবু তার চেষ্টার বিরাম নেই। গত বছর অ্যারিজোনার রুক্ষ মরু অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ব্যারেল ক্যাকটাসটা বাংলার কোমল জলবায়ুতে–বিশেষ করে বৃষ্টির স্বাদ পেয়ে ফুলে উঠেছে এবং মাথায় গোলাপী টুপি পরেছে। রাজসভার ভড়দের মতো দেখতে। অথচ তদ্রূপ নিরীহ নয়। ধারাল কাটা উঁচিয়ে সজারুর মতো মারমুখী। গার্গাতুয়া পাতাগুয়েলের কথা মনে পড়ে।
কিন্তু কর্নেল অন্যমনস্ক। কাল রাত থেকে একটা চাপা ক্ষোভ আর ব্যর্থতা ভেতর ভেতর তাঁকে অস্থির রেখেছে। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। ভাবছিলেন, নেমে গিয়ে ডাক দফরতরকে একটা চিঠি কড়া লিখবেন। মাত্র শ পাঁচেক কিলোমিটার দুরত্ব অতিক্রম করতে একটা চিঠির প্রায় তিন মাস লেগে যায়। অথচ এমন একটা জরুরি চিঠি।
কাল সম্ভবত বিকেলে লেটারবক্সে চিঠিটা দিয়ে গেছে পোস্টম্যান। ডায়মন্ডহারবারের ওদিকে খোঁজ পেয়ে কাল একটা আমবাগান থেকে আবার এক দুর্লভ প্রজাতির অর্কিড আনতে গিয়েছিলেন। রাতে খাবার টেবিলে ষষ্ঠী চিঠিটা রেখেছিল। খাওয়ার পর অভ্যাসমতো ড্রয়িংরুমে ইজিচেয়ারে বসে কফি ও চুরুটের সঙ্গে চিঠিটা পড়েই তিনি অবাক। পুরনো নোটবই ছিঁড়ে ঝটপর্ট লেখা চিঠি। আঁকাবাকা জড়ানো হরফ। চিঠিটা এই :
বসন্তনিবাস
সেতাপগঞ্জ, পূর্ণিয়া, বিহার
৭-৪-৮০
মান্যবরেষু,
অনেক কষ্টে আপনার ঠিকানা যোগাড় করিয়াছি। বরদাভূষণ ত্রিবেদীর বাড়িতে আপনি একবার আসিয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় নাই। আমি পক্ষাঘাতে চলচ্ছক্তিরহিত। নতুবা নিজেই আপনার কাছে যাইতাম। কাহাকেও বিশ্বাস করার ভরসা হয় না। তাই এই চিঠি। আপনি দয়া করিয়া শীঘ্র আসুন। আমি বিপন্ন। প্রতিমুহূর্তে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় আছি। কতকগুলি অদ্ভুত ঘটনা ঘটিতেছে। সাক্ষাতে সব কথা বলিব। স্টেশনে টাঙ্গা, রিকশা, ট্যাক্সি সবই পাইবেন। বসন্তনিবাস বলিলেই চলিবে। সামান্য ইঙ্গিত দিলাম মাত্র। প্রচুর রহস্য।
ইতি–
রুদ্রেন্দুপ্রসাদ রায়চৌধুরি
আজ আঠারো জুলাই। রুদ্রেন্দুপ্রসাদ সম্ভবত বৃদ্ধ (কর্নেলও সদ্য পঁয়ষট্টিতম জন্মদিন পেরিয়ে এসেছেন) এবং অসুস্থতার দরুন হয়তো বাতিকগ্রস্তও। এক ধরনের বুড়ো মানুষ আছেন, তাঁরা বিপত্নীক হলে তো কথাই নেই, অকারণ ঝামেলা বাড়ান। বিপন্ন হন বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায়’ থাকেন। তাছাড়া ওই প্রচুর রহস্য’। একটা ছেলেমানুষিও আঁচ করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা অন্যদিকে থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে কর্নেলের। চিঠির তারিখ ৭ এপ্রিল। এতদিন লেগে গেল কেন পৌঁছুতে? ঠিকানাও সঠিক লেখা আছে। অথচ কর্নেল হঠাৎ একটু চঞ্চল হলেন। চিঠিটা তার গার্ডেনিং জোব্বার পকেটে নিয়ে ছাদে উঠেছেন নিজের এই অবচেতন তাগিদটা টের পেয়েই এ চাঞ্চল্য। তাহলে কি কিছু মিস করেছেন চিঠিতে, যেজন্য আবার ওটা খুঁটিয়ে পড়ার ইচ্ছে? টেবিলে পড়ে ছিল খামটা। পকেটে ভরার সময় অতকিছু ভাবেননি। এখন ধরা পড়ল, শুধু ডাকবিভাগের দেরির জন্য নয়, যেন অন্য কোনো গূঢ় ব্যাপার আছে এর মধ্যে, যা নিয়ে তাঁর অবচেতনায় চিন্তার তরঙ্গ বয়ে চলেছে। খামটা বের করে সকালের আলোয় খোলা আকাশের নিচে আবার পড়তে গেলেন। তারপর জোব্বার অন্য পকেট থেকে বের করলেন একটা আতস কাঁচ। প্রথমে পেছনদিকটা পরীক্ষা করলেন। হুঁ, খামটা কেউ খুলেছিল। আবার ধ্যাবড়া করে এঁটে দিয়েছে। খামের ওপর ডাকঘরের ছাপ অস্পষ্ট। সেতাপগঞ্জ। অনুমান করা যাচ্ছে। তারিখের আবছা কালির আঁচড়ের সঙ্গে খামের ওপর দাগ পড়েছে। আতসকাঁচের ভেতর সব মিলিয়ে ১৩ সংখ্যাটার ছাপ ফুটে উঠল। পাশে জে হরফ।
আনলাকি থার্টিন। তের জুলাই চিঠিটা সেতাপগঞ্জ ডাকঘরে পোস্ট করা হয়েছে। তাহলে ব্যাপারটা সত্যি রহস্যময় হয়ে উঠল এতক্ষণে। ডাক দফতরের কোনো দোষ নেই। চিঠিটা এতদিন বাদে ডাকে দেওয়া হয়েছে। মধ্যে একটা রবিবার গেছে। স্থানীয় ডাকঘরের ছাপ পড়েছে ১৭ জুলাই। কর্নেল একটা চাপা উত্তেজনা বোধ করলেন। পত্রলেখক রুদ্ৰেন্দুপ্রসাদ কি এখনও বেঁচে আছেন? বেঁচে থাকুন আর মারাই যান, ব্যাপারটা গোলমেলে থেকে যাচ্ছে। মারা গেলে সেই মৃত্যুর মধ্যেই গণ্ডগোল আছে, তা সুনিশ্চিত–চিঠিটা ডাকে দেওয়ায় সেটা আঁচ করা যায়।
আর যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে ধরে নেওয়া যায়, কোনো কারণে সব গণ্ডগোল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আবার শুরু হয়েছে।
অবশ্য তারিখটা—
হয়তো তারিখটা সংশোধন করতে মনে ছিল না বা সুযোগ পাননি।…
ষষ্ঠী এসে দাঁত বের করল। নালবাজারের নাহিড়িসায়েব, বাবামশাই।
কর্নেল ভুরু কুঁচকে বললেন, ফোন নামিয়ে রেখে ডাকতে এসেছিস তো? নাকি সেদিনকার মতো–
ষষ্ঠী জোরে মাথা দুলিয়ে খিক খিক করে হাসল। বারেবারে ফোং ভুল হবে নাকি? দেখুন গে না, টেবিলে কাত করে রেখে এয়েছি।
কর্নেল খাম আর আতসকাচ পকেটে ঢুকিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।…
