এক
এবার আমাদের দেশে আসাটা একেনবাবুর ইচ্ছেতেই হল। আমার আসার কোনো প্ল্যানই ছিল না, বাধ্য হলাম একেনবাবুর ঘ্যানঘ্যানানি সহ্য করতে না পেরে! সেই একেনবাবু, যিনি নিউ ইয়র্কে এসে পাক্কা তিনটি বছর ঘাপটি মেরে কাটিয়ে দিলেন –নো নড়নচড়ন! গত বছর প্রমথ আর আমি যখন আসছিলাম, ঘোষণা করলেন কয়েক সপ্তাহের জন্যে দেশে যাবেন না, গেলে একেবারে পাততাড়ি গুটিয়ে যাবেন।
ওটা ফালতু কথা। কৃপণ লোক, টু-পাইস বাঁচাবার চেষ্টা করছিলেন। এবার যখন ‘চলুন না স্যার’, ‘চলুন না স্যার’ আরম্ভ করলেন, মনে করিয়ে দিলাম সেই কথাটা।
“তাই বলেছিলাম নাকি? হবে হয়তো। আসলে কী স্যার, অনেকদিন ফ্যামিলিকে দেখিনি।”
ফ্যামিলি মানে স্ত্রী, একেনবাবু সব সময়েই স্ত্রীকে ফ্যামিলি বলেন। এর পর এটা নিয়ে খোঁচানো যায় না। পাঠকরা অবশ্য ভাবতে পারেন, একেনবাবু দেশে আসতে চাইলে আসুন, তার সঙ্গে আমাকে বা প্রমথকে আসতে হবে কেন? এর ব্যাখ্যা একেনবাবুকে না চিনলে দেওয়া অসম্ভব। ঘ্যানরঘ্যানর করে জীবন দুর্বিষহ করার অপরিসীম ক্ষমতা উনি ধরেন। সেটা সহ্য করার থেকে অনেক সহজ দেশে আসাটা। যাক সে কথা, দেশে আসার ওঁর আসল কারণটা অবশ্য প্লেনে আসতে আসতে উদ্ধার হল। একেনবাবু নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে সাড়ে তিন বছরের স্টাডি লিভ নিয়ে। তখন একেনবউদিকে সঙ্গে নেননি খরচার কথা ভেবে। কয়েক মাস আগে নিউ ইয়র্ক পুলিশের ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট ওঁকে একটা কনসাল্টিং-এর কাজ দিয়েছেন, পাঁচ বছরের কন্ট্রাক্ট। ক্রাইমেরও একটা কালচারাল সাইড আছে। নিউ ইয়র্ক শহরে এখন অনেক দক্ষিণ এশিয়ার লোক থাকে। দক্ষিণ এশিয়া মানে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এইসব জায়গা। এই ক্যুনিটিতে যেসব ক্রাইম ঘটছে, তার কিনারা করতে একেনবাবু সাহায্য করবেন। এছাড়া অন্যান্য কোনো কঠিন কেসেও একেনবাবুর মাথা কাজে লাগবে। কন্ট্রাক্টটা পাঁচ বছর দিয়ে শুরু হলেও সেটা যে বেড়ে পনেরো-কুড়ি বছর চলবে, সেটা একেনবাবু জানেন। সুতরাং এখন ফ্যামিলিকে আনানোর বন্দোবস্ত করতে হয়। কিন্তু মুশকিল হল একেবউদি বেঁকে বসেছেন। তিনি সাহেবদের দেশে যেতে প্রস্তুত নন। এটা অভিমানের ব্যাপারও হতে পারে। প্রথমে আমাকে নাওনি, এখন আমি যাব না। টেলিফোনে বহু অনুরোধ উপরোধে কাজ হয়নি, এখন সামনাসামনি বসে যদি ম্যানেজ করতে পারেন। নইলে ওঁর মতো কৃপণ লোকের পনেরোশো ডলার খরচা করাটা বাস্তবিকই আশ্চর্যের কথা! একেনবাবু অবশ্য আমাদের বলেছিলেন, এপ্রিল মাসে আসার কথা। কারণ সেই সময়ে টিকিট প্রায় চারশো ডলার কমে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রস্তাবটা অবাস্তব। আমার আর প্রমথর দু-জনেরই সেই সময়ে ক্লাস চলছে। একেনবাবুর আবার একা ট্র্যাভেল করতে ভালো লাগে না। সঙ্গী না থাকলে বকবক করবেন কী করে! তাই আমাদের ছুটির জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং ডিসেম্বরে আসাটা যে কী খারাপ সারাটা পথ সেই নিয়ে বক্তৃতা করেছেন। এই সময়ে অসম্ভব ভিড়, টিকিটের দাম বেশি, বড়োদিন আর নিউ ইয়ার হল নিউ ইয়র্কের বেস্ট টাইম আর শীতকাল হল কলকাতার সবচেয়ে বাজে সময় পলিউশন, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি। তাছাড়া ঠান্ডা-গরমে নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, আরও হরেক রকম ব্যাধির কথা, যেগুলো সারা বছর বাদ দিয়ে ঠিক কেন ডিসেম্বরেই হবে, সেটা অবশ্য আমি বুঝতে পারিনি। তবে তাতে একেনবাবুর এসে যায়নি। প্রমথ বরাবরই অধৈর্য। বলল, “আপনার সমস্যাটা কী মশাই, পরিষ্কার করে বলুন তো? টিকিটের ভাড়া? পনেরোশো ভার্সাস এগারোশো ডলার, না অন্য কোনো উচ্চতর প্রব্লেম?”
প্রমথর এই ডিরেক্ট চ্যালেঞ্জের উত্তরে শুধু ‘আপনি না স্যার, সত্যি! এইটুকু বলে কিছুক্ষণের জন্য চোখ বুজে আমাদের শান্তি দিলেন।
দুই
আমরা কলকাতায় এসেছি দিন সাতেক হল। তবে স্বীকার করতে হবে এবার একেনবাবু কলকাতায় আসায় আমাদের জমেছে ভালো। সকালবেলার নিউ ইয়র্কের আড্ডটা আমরা একেনবাবুর বাড়িতে সারি। তারচেয়েও বড়ো কথা পাঁউরুটি টোস্ট আর ডিমের অমলেটের বদলে প্রতিদিন ভ্যারাইটি খাবার জুটছে। অবশ্যই একেনবউদির কল্যাণে। সেই কল্যাণটা যাতে নিউ ইয়র্কেও বর্ষিত হয়, তারজন্য একেনবউদিকে আমি আর প্রমথও বোঝাচ্ছি। তার কিছুটা ফল বোধহয় হয়েছে। কারণ একদিন সকালে যখন একেনবাবুর বাড়িতে বসে চা খাচ্ছি, হঠাৎ উনি বললেন, “স্যার, আপনারা দুজনেই আমার টু ব্রাদার্স।”
প্রমথ বলল, “টু ব্রাদার্স, না টু ব্রাদার্স।”
“দুটোই স্যার, সত্যি আপনারা না। কী বলব স্যার, বলার কিছু নেই।”
এমন সময়ে পত্রিকাওয়ালা এসে পত্রিকা দিয়ে গেল। প্রমথ ধাঁ করে ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ তুলে নিল, একেনবাবু ‘বর্তমান পত্রিকাটা। আমি প্রমথকে বললাম, “এই, আমাকে একটা পাতা দে।”
দাঁড়া, দিচ্ছি, করতে করতে প্রমথ শেষে যে পাতাটা দিল সেখানে শুধু লোকাল সেলিব্রেটিদের খবর।
আমি বললাম, “ধুৎ, একটা ভালো পাতা দে।”
“ভালো পাতা কোথায় পাবো, এটা কি নিউ ইয়র্ক টাইমস নাকি? যেটা পেয়েছিস সেটাই পড়।”
আমি প্রতিবাদ করতে যাচ্ছি।
এমন সময় একেনবাবু বললেন, “দেখেছেন স্যার কাণ্ড, অগ্রগামী লাইব্রেরিতে দুটো পুরোনো ডায়েরি পাওয়া গেছে।”
এটা এমন কী দারুণ খবর বুঝলাম না। একেনবাবু মাঝেমাঝেই উলটোপালটা বলেন, তাই জিজ্ঞেস করলাম, “বই না ডায়েরি?”
“ডায়েরি স্যার, আর খুব পুরোনো। এই দেখুন না,” বলে কাগজটা আমায় এগিয়ে দিলেন।
সংক্ষিপ্ত খবর: যাদবপুরের একজন রিসার্চ স্কলার পুরোনো বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে দুটো ডায়েরি আবিষ্কার করেছে। একটা ডায়েরি হচ্ছে রবার্ট হুক নামে একজন বিজ্ঞানীর। লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আলাপ আলোচনা সম্পর্কিত নোট। অন্যটা সম্ভবত রামমোহন রায়ের লেখা ডায়েরি। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন দিনপঞ্জী। রামমোহন রায়ের ব্যাপারটা স্পেকুলেশন। রবার্ট হুকের নাম ডায়েরির প্রথম পাতাতেই লেখা, সুতরাং ভুল হবার কারণ নেই।
খবরটা পড়ে আমি বললাম, “এই বোধহয় সেই রবার্ট হুক, যে হুক-সূত্রের আবিষ্কর্তা।”
“সেটা কী স্যার?”
“একটা স্প্রিং-কে যত চাপ দেবেন, সেটা ওই অনুপাতে ছোটো হবে।”
“এটা স্যার এমন কি বিরাট আবিষ্কার?”
প্রমথ এতক্ষণ পত্রিকায় মুখ গুঁজে ছিল, হঠাৎ বলল, “কেন মশাই, গ্র্যাভিটির ব্যাপারটা তো সবাই জানে, তাহলে নিউটনকে নিয়ে এত মাতামাতি করেন কেন?”
এটা একটা অন্যায্য প্রশ্ন, কিন্তু প্রমথ মাঝে মাঝেই আমাদের দুজনকে খোঁচা না দিয়ে থাকতে পারে না।
আমি প্রসঙ্গ এড়াবার জন্য বললাম, “ডায়েরি দুটো লাইব্রেরিতে ছিল, অথচ এতদিন এর কথা কেউ জানত না– সেটা কী করে হয়!”
প্রমথ বলল, “কারণটা সিম্পল। স্যার বৈদ্যনাথ সরকার অনেকগুলো বই লাইব্রেরিকে দান করেছিলেন পঞ্চাশ বছর আগে। সেগুলো এতদিন গুদামজাত ছিল। এখন ক্যাটালগ করে তোলা হচ্ছে।”
আমি প্রমথর দিকে একটু অবাক হয়ে তাকাতেই, প্রমথ বলল, “কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না, তাহলে এই দ্যাখ,” বলে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটা পাতা এগিয়ে দিল। সেখানে কাদের ডায়েরি নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই, শুধু পঞ্চাশ বছর আগে স্যার বৈদ্যনাথ সরকারের দান করা বই থেকে দুটো পুরোনো ডায়েরি পাওয়া গেছে বলা হয়েছে।
“কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকানে এইরকম অনেক ডায়েরি পাওয়া যায় স্যার,” একেনবাবু বললেন। “আমার ছোটমামা সিস্টার নিবেদিতার একটা ডায়েরি পেয়েছিলেন। পরে সেটা রামকৃষ্ণ মিশন না কোথায় জানি দিয়ে দেন।”
“অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতার কাজ করেছিলেন, থাকলে আপনার টু-পাইস হত।” তারপরেই প্রসঙ্গ পালটে প্রমথ আমাকে বলল, “ভালোকথা, তুই সেদিন খুব কপচালি আমাদের দেশে ‘অনার কিলিং’ হয় না! এই দ্যাখ, মধ্যপ্রদেশে দুটো মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে একজন অন্য জাতের ছেলেকে বিয়ে করেছে বলে, আরেকজন বাবার হুকুম না মেনে নিকাব, মানে মুখ-না-ঢেকে স্কুলে পড়তে গিয়েছে বলে।”
এই ‘অনার কিলিং’ বা পরিবারের সম্মান বজায় রাখতে বাড়ির মেয়েদের হত্যা করা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে নিউ ইয়র্কে আমাদের মধ্যে তুমুল তর্ক হয়ে গেছে। ইউরোপে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইত্যাদি কয়েকটি দেশে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এর চল আছে বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসে-এ বেশ লেখালেখি হচ্ছিল। যেটা সবচেয়ে ভয়াবহ, এই সম্প্রদায়ের তথাকথিত শিক্ষিতরাও কেউ কেউ এটাকে অন্যায় বলে মনে করেন না। তর্কের মধ্যে আমি বলেছিলাম, আমাদের দেশে বধূহত্যা হয়, কিন্তু ‘অনার কিলিং’ হয় বলে শুনিনি।’
প্রমথ তখনই মারমার করে উঠেছিল, “তুই একটা গাধা, যে-দেশে এখনও সতীদাহ চলছে, সেদেশে ‘অনার কিলিং’ হয় না বললেই আমি মানব?”
যাইহোক, এখন হাতেনাতে আমাকে তথ্যটা দিল। আমায় স্বীকার করতেই হবে এইসব ব্যাপার আমার চোখ এড়িয়ে যায়। তবে নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য বললাম, “ওসব মধ্যপ্রদেশ রাজস্থানে হয়, কলকাতায় হয় না।”
“তোর মুণ্ডু!”
.
ইতিমধ্যে জলখাবার এসে গেছে। আজকে গরম গরম লুচি, বেগুনভাজা আর মোহনভোগ। একেনবউদি বোধহয় আরও লুচি ভাজছেন, কারণ কিচেন থেকে ভাজাভুজির শব্দ পাচ্ছি। অল্পক্ষণের মধ্যে আরেক প্রস্থ চাও এসে গেল।
খেতে খেতে একেনবাবু বললেন, “যাবেন নাকি স্যার?”
“কোথায়?”
“অগ্রগামী লাইব্রেরিতে।”
“ওই ডায়েরি দেখতে?”
“হ্যাঁ স্যার। রামমোহন রায়ের ডায়েরি হলে তো খুব পুরোনো হবে, তাই না স্যার?”
“তা শ-দেড়েক বছর তো হবেই,” আমি আন্দাজে বললাম।
“রবার্ট হুক তারও আগের লোক, তিনশো-সাড়ে তিনশো বছর।” প্রমথ বিজ্ঞের মত মন্তব্য করল।
রবার্ট হুক এত বছরের আগের লোক বলে জানা ছিল না। প্রমথ অবশ্য মাঝে মাঝে গম্ভীর ভাবে ভুল তথ্য দেয়। তবে দুটো ডায়েরিই যে খুবই পুরোনো সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। অগ্রগামী লাইব্রেরি আমাদের বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়। আমার মা মেম্বার। এবার এসে মা-র জন্য বই আনতে এর মধ্যে ওখানে একবার গিয়েছি।
ঠিক হল পরের দিন বিকেলে লাইব্রেরিতে একবার ঢু মারব।
.
পরের দিন আমরা গেলাম বটে, কিন্তু যা দেখার জন্য গেলাম, সেটা আর দেখা হল না। ডায়েরি দুটো কোথায় আছে কেউই জানে না। অথচ গতকাল বিকেলেও ডায়েরি দুটো রেফারেন্স র্যাক-এ ছিল। লাইব্রেরির এক ট্রাস্টি দেখতে এসেছিলেন ডায়েরি দুটোকে, হেড লাইব্রেরিয়ান নিজে দেখেছেন।
রেফারেন্স র্যাক দেখলাম অত্যন্ত অগোছাল অবস্থায়, অজস্র পুরোনো বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বেশির ভাগই স্যার বৈদ্যনাথ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া। কিন্তু যাদবপুরের যে স্কলারটি ডায়েরি দুটো প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি সকাল থেকে প্রায় দু-তিন ঘণ্টা তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওগুলোর সন্ধান পাননি। তারপর অন্যান্যরাও খুঁজেছে। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে। হেড লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে দেখা হল। তিনিও ভেবে পাচ্ছেন না কী করে ডায়েরি দুটো অদৃশ্য পারে! বিল্ডিং থেকে বেরোনোর সময় ব্যাগ চেক করা হয়, এমন কী যারা লাইব্রেরিতে কাজ করে তাদেরও। পুলিশের উপরও মনে হল ওঁর তেমন ভরসা নেই। কথায় কথায় বললেন, “এতদিন হয়ে গেল নোবেল চুরির রহস্যই ভেদ করতে পারল না, তারা খুঁজে পাবে দুটো পুরোনো ডায়েরি!”
আমি একেনবাবুকে বললাম, “কি মশাই, আপনার সার্ভিস অফার করবেন নাকি?”
“কী যে বলেন স্যার, কত মাথাওয়ালা লোক এ নিয়ে তদন্ত করবে। আমরা তো চুনোপুঁটি!”
এটা বিনয়, কারণ কয়েক মিনিট বাদেই সি.আই.ডি-র এক ভদ্রলোককে দেখলাম এগিয়ে একেনবাবুকে ‘কেমন আছেন স্যার’, কবে এলেন’, ইত্যাদি বলে চলে গেলেন।
তিন
সেদিন লাইব্রেরি থেকে ফিরে দিন কয়েকের জন্য মা-কে নিয়ে আমি বাণীপুরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে যথারীতি একেনবাবুর বাড়িতে গেছি চা খেতে। প্রমথ ইতিমধ্যেই এসেছে। আমাকে দেখে বলল, “এই যে এসে গেছিস, আমি একেনবাবুকে এতক্ষণ বোঝাচ্ছিলাম যে ডায়েরি চুরির ব্যাপারে ওঁর ইন্ডিপিন্ডেন্ট তদন্ত করা উচিত।”
“কেন?”
“কারণ ডায়েরিটা রবার্ট হুক-এর হলে ওটা মহা মূল্যবান বস্তু। গতকাল ইন্টারনেট সার্চ করে দেখলাম ওঁর একটা ডায়েরির খোঁজ প্রায় তিনশো বছর ধরে পাওয়া যাচ্ছিল না। ডায়েরিটাতে ১৬৬১ সাল থেকে ১৬৮২ পর্যন্ত রয়্যাল সোসাইটির নানান খবর ছিল। পাওয়ার পর ওটা নিলামে তোলা হবে ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই রয়্যাল সোসাইটির কিছু মেম্বার আর একটা ট্রাস্ট, নামটা এখন মনে পড়ছে না, ওটা প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়ে সোসাইটির লাইব্রেরিতে রেখে দেয়। কল্পনা করতে পারিস দেড় মিলিয়ন ডলার মানে প্রায় দশ কোটি টাকা!”
“কিন্তু এটা যে একটা নকল ডায়েরি নয় তার প্রমাণ কী? রবার্ট হুক একই বিষয়ে দুটো ডায়েরি রাখতে যাবেন কেন?”
“ইডিয়টের মতো কথা বলিস না। একটায় হয়তো সংক্ষেপে জিনিসগুলো টুকতেন, অন্যটাতে বিশদ করে লিখতেন। আর তাছাড়া এই ডায়েরিটাতে হয়তো অন্য সময়ের কথা রয়েছে। কি মশাই হতে পারে না?” একেনবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল প্রমথ।
“তা তো পারেই স্যার।”
“আর এটা যদি নকলও হয়, রামমোহনের ডায়েরিটাও তো ফ্যালনা নয়। ইন্টারেনেটেই পেলাম যে, রামমোহন ১৮৩১ সালে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, ১৮৩৩-এ ব্রিস্টল শহরের কাছে মারা যান। ওই সময়টাতে রামমোহনের সঙ্গে ইউনিটারিয়ান চার্চের খুব যোগাযোগ ছিল। ডায়েরিটা যদি তখন লেখা হয়, তাহলে চার্চের লোকরা ওটা পেতে মোটা রকমের টাকা দিতে দ্বিধা করবে না।”
“দাঁড়া দাঁড়া, ওটা যে রামমোহনের ডায়েরি তার কোনো প্রমাণ আছে?”
প্রমথ রেগে গিয়ে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় একেনবাবুর বাড়িতে যে মেয়েটি কাজ করে সে এসে বলল, এক ভদ্রলোক একেনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
ঘোষণাটা কোনো প্রস্তুতির সময় দেবার জন্য নয়। কারণ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। ভদ্রলোককে আগে কোথাও দেখেছি, কিন্তু ঠিক কোথায় মনে করতে পারলাম না। গায়ের রঙ বেশ শ্যামলা, কাঁচাপাকা চুল, মোটাসোটা ভারিক্কি চেহারা। বাইফোকাল চশমাটা নাকের উপর একটু নেমে এসেছে। পরনে ধুতি, পায়ে ফ্যান্সি চপ্পল, গায়ের সিল্কের পাঞ্জাবির উপর দামী কাশ্মিরী শাল জড়ানো। আঙুলে নানা ধরনের পাথরের বেশ কয়েকটা আঙটি। ভদ্রলোক মনে হয় জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী, সংসারের যাবতীয় ফাড়াউপদ্রব খণ্ডাবার জন্য ওগুলো ধারণ করেছেন। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি একেনবাবু?”
আমি মাথা নেড়ে একেনবাবুকে দেখিয়ে দিলাম।
ভদ্রলোক একেনবাবুর দিকে তাকিয়ে বোধহয় নিরাশ হলেন। একেনবাবু এমনিতেই রোগা, বেঁটে, আন-ইম্প্রেসিভ। তার ওপর আজ যে পায়জামাটা পরেছেন, সেটা গোড়ালি থেকে অন্তত ইঞ্চি ছয়েক উঁচুতে লটকে আছে। ফুলহাতার শার্টটা যে অবস্থায়, ওরকম শার্ট মা-র চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ঘরমোছা বানিয়ে ফেলত! তবে সেই শার্টের কিছুটা অবশ্য রোঁয়া-ওঠা হাতকাটা সোয়েটারে ঢাকা পড়েছে। সেটা ভালো না মন্দ– সে নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। মোটমাট, এই চেহারা আর পোশাক যার, সে কি কখনো ডিটেকটিভ হতে পারে!
সন্দেহ নিরসনের জন্যই বোধহয় ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “আপনিই কি এক সময়ে সি.আই.ডি-তে ছিলেন?”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“ব্যারিস্টার বিকাশ সেনকে চেনেন?”
“নিশ্চয় চিনি স্যার, নামকরা লোক।”
“ওঁর কাছেই আপনার খবর পেয়েছি। আমার নাম শুভংকর কুণ্ডু। কুণ্ডু টি-এস্টেটের নাম শুনেছেন?”
“সে কি স্যার, অতবড়ো টি গার্ডেন-এর কথা জানব না!”
“ওটা আমার।”
“মাই গড স্যার!”
একেনবাবুর শ্রদ্ধা-মিশ্রিত ভাব দেখে শুভংকরবাবু খুশি হলেন, “তবে এখন আর বাগানটা অত বড়ো নেই।” তারপর আমাদের দিকে এক লহমা তাকিয়ে বললেন, “আপনার কাছে একটা ব্যাপারে সাহায্যের জন্য এসেছি, কিন্তু সেটা একটু প্রাইভেট।”
“আপনি নিঃসন্দেহে এঁদের সামনে সব খুলে বলতে পারেন। ইনি হচ্ছেন বাপিবাবু, আর ইনি প্রমথবাবু। এঁরা দুজনেই পণ্ডিত মানুষ স্যার–নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়ান আর রিসার্চ করেন। আমার কাজেও ওঁরা বহু সাহায্য করেন।”
আমি আর প্রমথ ভদ্রলোককে নমস্কার করলাম। একবার ভাবলাম বলি, একেনবাবুর প্রথম কথাটা যদি বা অর্ধসত্য হয়, শেষের কথা প্রায় পুরোটাই অসত্য। আমরা সাহায্য করার চেষ্টা করি বটে, কিন্তু তাতে একেনবাবুর আদৌ কোনো উপকার হয় কিনা ঘোরতর সন্দেহ আছে।
কাজের মেয়েটি নিশ্চয় একেনবউদিকে খবর দিয়েছিল, চা এসে গেল।
“দুধ-চিনিতে অসুবিধা নেই তো স্যার, ওটাই খাই আমরা।”
“না, না, ঠিক আছে।” বলে ভদ্রলোক তার কাহিনি শুরু করলেন।
“দেখুন আমার একটিই মেয়ে। স্কুলে পড়ছে, হায়ার সেকেন্ডারির ফাইনাল ইয়ার। আমার যা কিছু সম্পত্তি ওই পাবে। আমি আর আমার স্ত্রী খুব সাবধানে ওকে বড়ো করেছি যাতে কুসঙ্গে না পড়ে। বুঝতেই তো পারছেন একে সুন্দরী, তার ওপর বাপের সব সম্পত্তি পাবে অনেক বদ ছেলেই ফুসলাবার চেষ্টা করবে। ও যখন মাধ্যমিকের ফাইনাল দিচ্ছে তখন আমার ভাগ্নের পরিচিত একটি ছেলেকে ওর প্রাইভেট টিউটর রেখেছিলাম। ছেলেটা বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে এম.এ পড়ছিল। সাধারণ ঘরের ছেলে, কিন্তু পড়াশুনোয় ভালো। অর্থকষ্টের মধ্যে আছে জেনে ওকে ভালো টাকা দিয়েই রেখেছিলাম। আমার স্ত্রী পরে আবিষ্কার করলেন ছেলেটার বদ-অভিসন্ধি আছে, পড়ানোর নাম করে আমার মেয়ের মাথাটা বিগড়ে দিচ্ছে! শোনামাত্র ওকে তাড়িয়ে একজন বৃদ্ধ মাস্টারমশাইকে টিউটর রেখেছি। বাড়ির ধারে কাছে ছোঁড়াকে আসতে দিই না।
“যাইহোক, শ্রীময়ীর আঠেরো বছর পূর্ণ হবে এই জানুয়ারিতে। ওর বিয়ের জন্য একটি সুপাত্র ঠিক করেছি। অবস্থা, মানমর্যাদা, সবকিছুতেই আমাদের সঙ্গে ম্যাচ করেছে। পাত্রপক্ষেরও আমার মেয়েকে পছন্দ হয়েছে। তারপরেই শুরু হয়েছে একটা উৎপাত।” কথাটা বলে শুভংকরবাবু গলা খাঁকারি দিলেন।
“উৎপাত স্যার?”
“হ্যাঁ, উৎপাতই বলতে পারেন। হঠাৎ একটা উড়ো চিঠি, যার বয়ান… আমার মেয়ে একজনের সঙ্গে প্রেম করছে, সেটা গোপন রেখে আমি মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এই খবর পাত্রপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হবে যদি না পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়।
“কোথায় টাকা দিতে হবে? কী ভাবে দিতে হবে? কোনো নির্দেশ নেই। শুধু লেখা আছে, পরে সেটা জানানো হবে, আর এটা হল আমার ফাস্ট ওয়ার্নিং।”
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি স্যার, আপনার মেয়ে যে প্রেম করছেন, সেটা আপনি জানলেন কী করে? এটা তো একটা বাজে খবরও হতে পারে।”
“একটা চিঠির কপি ওই চিঠির সঙ্গে এসেছিল। আমার মেয়েরই হাতের লেখা এবং নিঃসন্দেহে প্রেমপত্র। পরে একটা অচেনা লোক বার দুই ফোনও করেছে। বলেছে, ওদের কাছে আরও কিছু চিঠির কপি আছে, যেখানে অনেক খারাপ খারাপ কথাও রয়েছে। ওগুলো যদি পাত্রপক্ষের হাতে যায়, তাহলে লজ্জায় মুখ দেখানো কঠিন হবে!”
“আমি একটু কনফিউসড স্যার, এ যুগের মেয়ে হাতে চিঠি লিখবেন কেন ইমেল বা টেক্সট না করে!”
“আমিও সেটা ভেবেছিলাম, কিন্তু আমার মেয়ে একটু অন্যরকম। হাতে লিখতে ভালোবাসে। ওর ষোলো বছরের জন্মদিনে তিরিশ জন বন্ধুকে হাতে লিখে নিমন্তন্ন করেছিল। আমি বলেছিলাম কার্ড ছাপিয়ে দিচ্ছি। না, সেটা নাকি পার্সোনাল হবে না!”
“বুঝলাম স্যার, প্রেমপত্র তো পার্সোনাল হতেই হবে। কিন্তু আপনার মেয়ের হাতের লেখা কেউ তো নকলও করতে পারে। ওটা যে সত্যি সত্যিই আপনার মেয়ে লিখেছেন সে ব্যাপারে আপনি শিওর?”
“ওর মা ওকে চিঠির কপিটা দেখিয়েছে। চাপে পড়ে স্বীকার করেছে, পুরোনো টিউটর অজয়ের সঙ্গে চিঠি চালাচালি ও করে। আমার সঙ্গে ওর কোনো কথা হয়নি, কারণ অজয়কে চাকরি থেকে তাড়ানোর পর মেয়ে আমার সঙ্গে কোনো কথা বলে না।”
“আই সি, কিন্তু চিঠি চালাচালি করেন কী করে?”
“সেটাই রহস্য। ওর ওপর সব সময়ে কড়া নজর রাখা হয়, কোনো সময়েই একা বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। শপিং করতে গেলেও হয় ওর মা বা আমি সঙ্গে থাকি। মুশকিল হচ্ছে মেয়েটা ভীষণ সেন্টিমেন্টাল। অজয়কে যখন তাড়াই, তখন একবার সুইসাইডের চেষ্টা করেছিল। তাই যতটা কড়াকড়ি করা সম্ভব ততটা করি না। গান শিখতেও যায়। লাইব্রেরিতেও যায়। তবে কখনোই একা নয়। আর কেউ না হোক বিজু, মানে আমার বহুদিনের বিশ্বস্ত ড্রাইভার সঙ্গে থাকে। বিজুকে আমি ইনস্ট্রাকশন দিয়ে দিয়েছি, ও কখনো নেমকহারামি করবে না।”
“তাহলে তো ফুল-প্রুফ অ্যারেঞ্জমেন্ট, প্রমথ একটু শ্লেষের সঙ্গেই বলল।
শুভংকরবাবু শ্লেষটা ধরতে পারলেন না। বললেন, “সেটাই তো ভেবেছি। কিন্তু এর মধ্যে কী করে চিঠি চালাচালি হচ্ছে আমার মাথায় ঢুকছে না।”
মেয়ের প্রতি ভদ্রলোকের এ-রকম ডমিনেটিং অ্যাটিচুড মোটেই ভালো লাগছিল না। প্রমথ যে বেজায় চটেছে সেটা ওর পরের কথাতেই বুঝলাম। বলল, “আপনার মেয়ে লিখতে জানে, বাড়িতে কাগজপত্রও আছে, আর চিঠি ছুঁড়ে ফেলার মতো জানলাও নিশ্চয় আছে বাড়িতে?”
“আমার বাড়ি আপনি দেখেছেন?”
“না।”
“দেখলে বুঝতেন সেটা অসম্ভব। বাড়ির চারদিকে অনেকটা জমি ছেড়ে উঁচু দেয়াল।”
“কোনো কাজের লোক মারফতও তো চিঠি পাঠাতে পারেন?” আমি বললাম।
“সবাই বিশ্বস্ত। এই দুষ্কর্ম করে চাকরি খোয়ানোর সাহস কারো হবে না।”
“মেয়ের ঘরে কখনো কোনো চিঠি দেখেছেন?”
“না, ওর ঘরে আমি যাই না। আমার স্ত্রীও চান না আমি যাই। আমার মেয়েকে আমি চিনি। যদি আমি ওর ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র ঘাঁটতে শুরু করি তাহলে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটবে। তবে আমার স্ত্রী ওর ঘরে মাঝেমধ্যে যান। কিন্তু উনি খুব অ্যালার্ট নন। মেয়ে লেখাপড়া করছে না চিঠি লিখছে, সেটা ওঁর পক্ষে ধরতে পারা কঠিন।”
মনে মনে বললাম, বাঁচোয়া।
একেনবাবু এতক্ষণ চুপ করে আমাদের কথা শুনছিলেন, এবার মুখ খুললেন, “তা স্যার, আপনি আমার কী সাহায্য চান?”
“আমি চাই আপনি বার করুন কী ভাবে এই চিঠি চালাচালি চলছে? কাকে ও চিঠি লিখছে? কে আমাকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে? মোটমাট পুরো রহস্যের উদঘাটন। তারপর তাদের সিধে করার ভার আমার।”
“আমি একটু কনফিউসড স্যার, আপনার মেয়ে তো স্বীকারই করেছেন উনি অজয়বাবুকে চিঠি লিখছেন!”
“আমি শিওর নই। হয়তো আমাকে রাগানোর জন্যে কথাটা বলেছে অথবা ভাঁওতা দিয়েছে যাতে আসল লোককে না খুঁজে শুধু অজয়ের উপর নজর রাখি।”
“এটা কেন মনে হচ্ছে স্যার?”
“কারণ চিঠির যে কপিটা আমি পেয়েছি তাতে অজয়ের উল্লেখ নেই।”
“আই সি, আপনি পুলিশকে খবর দিয়েছেন?”
“খেপেছেন! ওরা কিছু জানা মানে পত্রিকাগুলো জানবে, এটা তো একটা মুখরোচক কাহিনি!”
“আপনি যে চিঠিটা পেয়েছেন স্যার, আর সেই সঙ্গে আপনার মেয়ের চিঠির কপিটা কি আমি দেখতে পারি?”
“নিশ্চয় পারেন, মুশকিল হল দুটোর কোনোটাই আমি খুঁজে পাচ্ছি না! সাবধানে কোথাও রেখেছি… কিন্তু ঠিক কোথায় মনে করতে পারছি না। তবে আপনাকে যা বললাম তার বেশি কিছু চিঠিতে ছিল না। স্রেফ দু-লাইনের চিঠি, আর মেয়ের চিঠিটাও অর্ডিনারি প্রেমপত্র।”
একেনবাবু চুপ করে রয়েছেন দেখে শুভংকরবাবু বললেন, “দেখুন একেনবাবু, পারিশ্রমিকের জন্য আপনি ভাববেন না। আপনি এখন আমেরিকায় গোয়েন্দাগিরি করেন আমি শুনেছি, এখানেও আপনার প্রাপ্তি বেশি ছাড়া কম হবে না। ডলারের সঙ্গে পাল্লা দেবার ক্ষমতা আমার আছে।”
“তা বুঝতে পারছি স্যার। কিন্তু আমি এখানে অল্প ক’দিনই আছি, অন্য কিছু কাজও আছে। একটু ভেবে দেখি স্যার।”
“টাকার অঙ্ক কত হলে আপনি ভাবা বন্ধ করবেন? আমার বংশমর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন, আর সময়ও আমার হাতে বেশি নেই।”
ভদ্রলোকের ঔদ্ধত্য আমার ভালো লাগছিল না। প্রমথ তো একেবারে খেপেই গেল!
“আপনার মেয়ে যাকে ভালোবাসে, তাকে বিয়ে করলে আপনার সম্মান কেন নষ্ট হবে? আর টাকার জোরে সত্যি-কথা লুকিয়ে অন্য জায়গায় মেয়ের বিয়ে দিলে আপনার সম্মানহানি হবে না?”
শুভংকরবাবু বোধহয় এ-রকম কিছু শুনতে হবে কল্পনা করেননি! মুখটা লাল হয়ে গেল। রাগ সামলে বললেন, “কী বলছেন আপনি?”
“খুব সহজ কথাই বলছি। টাকা দিয়ে আমাদের কিনে যদি কাজ হাসিল করতে চান, তাহলে ভুল জায়গায় এসেছেন। একেনবাবুকে আপনি চেনেন না।”
প্রমথকে উপেক্ষা করে শুভংকরবাবু একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “কাজটা কি আপনি নেবেন না?”
“একটু ভেবে দেখি স্যার। প্রমথবাবুকে আমি শ্রদ্ধা করি। ওঁর সঙ্গে আলাদা আলোচনা না করে আমি কথা দিতে পারছি না।”
কিছুক্ষণ সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে বোধহয় নিজের রাগটা সামলাবার চেষ্টা করলেন শুভংকরবাবু। তারপর বললেন, “কবে আপনি আপনার ডিসিশন জানাবেন?”
“কাল সকালেই স্যার, যদি আপনি সময়টুকু দেন।”
“বেশ,” বলে দায়সারা একটা নমস্কার করে শুভংকরবাবু চলে গেলেন। চা ঠান্ডা হয়ে গেল, মুখও দিলেন না।
চার
ভদ্রলোক চলে যাবার পর আমি প্রমথকে বললাম, “একেনবাবুর বেশ একটু টু-পাইস আসছিল, কেন তুই বাগড়া দিলি?”
“চুপ কর, পয়সা দিয়ে লোকটা পৃথিবী কিনতে চায়! প্রেমের মূল্য যারা দিতে জানে না, তাদের মানুষ বলে আমি গণ্য করি না। তাছাড়া এসব ঘেঁদো কাজ না নিয়ে একেনবাবুর উচিত ডায়েরি চুরির ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত করা।”
“আই সি, সেইজন্যেই পয়সার কাজটা না নিয়ে বিনি-পয়সার কাজটা করুন, তাই তুই চাস?”
আমার আর প্রমথর মধ্যে যখন কথা কাটাকাটি চলছে, তখন শুনলাম একেনবাবু বলছেন, “ইন্টারেস্টিং স্যার, খুবই ইন্টারেস্টিং।”
“কী ইন্টারেস্টিং?” জিজ্ঞেস করলাম।
“এই চিঠি চালাচালির ব্যাপারটা। এই রকম খবরদারির মধ্যে চিঠি-চাপাটি চালিয়ে যাওয়া তো সহজ ব্যাপার নয়। না স্যার, শুভংকরবাবুর মেয়ের এলেম আছে।”
“আমার কী মনে হয় জানেন, শুভংকরবাবুর স্ত্রী মেয়ের এই চিঠি চালাচালির ব্যাপারটা জানেন এবং সমর্থনও করেন। এতে রহস্যের কিছুই নেই। মেয়েটির প্রেমিক নিজেই প্রেমিকার বিয়ে বন্ধ করার জন্য শুভংকরবাবুকে চিঠি দিয়েছে। ব্ল্যাকমেলিং-এর ব্যাপারটা পুরো ফল্স প্রিটেন্স।”
“হতে পারে স্যার, খুবই সম্ভব।”
“তবে অবাক লাগছে এই ভেবে ভদ্রমহিলা যখন জানেন মেয়ে একজনকে ভালোবাসে, তাহলে স্বামীকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিতে বারণ করছেন না কেন? মেয়ে সুখী হোক, সব মায়েই তো চায়।”
“ওই রকম একটা স্বামীকে বাধা দেবেন মহিলা, তুই পাগল হয়েছিস নাকি?” প্রমথ বলে উঠল।
“কেন এটা বলছিস! স্ত্রী চান না বলে তো ভদ্রলোক মেয়ের ঘরে যেতেও সাহস পান না!”
“সেটা স্ত্রীর ভয় নয়, সুইসাইড-প্রোন মেয়ের ভয়ে। কি বলেন একেনবাবু?”
“আপনি আর স্যার ভুল বলেন কবে!”
“থ্যাঙ্ক ইউ। আর বুঝলেন একেনবাবু, আমি মত পালটাচ্ছি– কাজটা আপনি নিয়েই নিন। মোটা রকম পারিশ্রমিক নিয়ে খুঁজে বার করুন তো প্রেমিকটি কে? তারপর সাইডে প্রেমিককে বলুন কিছুদিনের জন্য গা-ঢাকা দিতে। ক’দিন বাদে মেয়েটি সাবালিকা হলে আমরাই না হয় উদ্যোগ নিয়ে ওদের বিয়ের দিয়ে দেব, দেখি বুড়ো বাপ আটকায় কী করে!”
“কিন্তু স্যার, উনি রেগে গিয়ে যদি ভয়ঙ্কর কিছু…।”
“অনার কিলিং’-এর কথা ভাবছেন? এমনিতে বাপির সঙ্গে সহমত হই না, কিন্তু এটা ও ভুল বলেনি… কলকাতায় ‘অনার কিলিং’-এর মতো কিছু ঘটবে না। বড়জোর খেপে গিয়ে শুভংকরবাবু মেয়ের মুখদর্শন করবেন না, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবেন। তা করুন। প্রেমিকের মুখ তো মেয়ে দর্শন করতে পারবে। আর সম্পত্তি হারাবার ভয়ে প্রেমিক যদি পিছিয়ে যায়, তাহলে সে বিয়ে না হওয়াই ভালো। মোদ্দা কথা, প্রেমের জয় হবে, আপনি দু-পয়সা ঘরে তুলবেন, বউদিও খুশি হবেন।”
“তা হবেন,” একেনবাবু মাথা নাড়লেন।
.
পরদিন ভোরবেলায় শুভংকরবাবুকে কাজটা নেবার খবর দিয়ে একেনবাবু অ্যাকশনে নামলেন। প্রথমে মিসেস কুণ্ডু, মানে শুভংকরবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে আমরা দেখা করলাম। ওঁদের কন্যার কী জানি কেনা-কাটার ছিল, কিন্তু মিসেস কুণ্ডুর একটু জ্বর জ্বর ছিল বলে তিনি বেরোননি, স্বামী মেয়ের সঙ্গে গেছেন। তাতে মিসেস কুণ্ডু একটু চিন্তিত মনে হল। মেয়ের সঙ্গে বাবার একেবারেই বনে না, কথাবার্তাও বহুদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু ওঁর শরীর ভালো যাচ্ছে না বলে শুভংকরবাবুই মেয়েকে নিয়ে ঘুরছেন। এরমধ্যে ক’দিন আগে লাইব্রেরি থেকে দু-জনে ফেরার পর মেয়ে নিজেই বাবার ঘরে গিয়ে নীরবতা ভেঙে তুমুল ঝগড়া করেছে। কারণটা মিসেস কুণ্ডু জানেন না। তারপর আবার কথা বন্ধ। আসলে দু জনেই ভীষণ একরোখা। এইরকম আরও অনেক কথা বললেন। ওঁর কথা শুনে একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা গেল– মেয়ের জন্য যে সম্বন্ধ স্বামী করেছেন, সেখানেই বিয়েটা ভালোয় ভালোয় চুকে গেলে তিনি অত্যন্ত খুশি হবেন, কারণ পাত্রটি সত্যিই ভালো। পাত্রটি কত ভালো জানতে না পারলেও পাত্রীটি যে অপরূপ সুন্দরী, সেটা দেওয়ালে টাঙানো ছবি থেকেই বুঝলাম। ফুলের উপমা বহু-ব্যবহৃত হয়ে খেলো হয়ে গেছে, কিন্তু তবুও ছবিগুলো দেখলে সেটাই প্রথম মনে আসে। এই রকম সুন্দর মিষ্টি একটি মেয়ে, প্রেম প্রস্ফুটিত হবার এক্কেবারে উপযুক্ত বয়স। কোথায় তার সুযোগ দেওয়া হবে, না গোয়েন্দা লাগিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে! ও আরেকটা ইম্পর্টেন্ট কথা, শুভংকরবাবুর মতো ওঁর স্ত্রীরও সন্দেহ আছে যে, মেয়ের চিঠি চালাচালি অজয়ের সঙ্গে কিনা, যদিও মেয়ে তাই বলেছে। অজয়কে উনি মাঝেমধ্যে দেখেছেন। যেমন লাইব্রেরিতে অজয়ও আসে, কিন্তু সব সময়েই দূরত্ব বাঁচিয়ে চলে। কখনোই তাকে কাছে এসে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে দেখেননি। তবে ওঁর একটা ভয় আছে শুভংকরবাবুর ভাগ্নে সুবীরকে নিয়ে। তার সঙ্গে মেয়ে সব সময়েই হাসিঠাট্টা গল্পগুজব করে। এতদিন উনি এ নিয়ে চিন্তা করেননি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপন ভাই-বোন তো ওরা নয়! মামাতো পিসতুতো ভাই-বোনের মধ্যেও তো মাঝেসাঝে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সেটা উনি শুভংকরবাবুকে বলার সাহস পাননি, পাছে সেই নিয়ে অশান্তি হয়।
একেনবাবু প্রশ্ন করলেন, “সুবীরবাবু কি প্রায়ই বাড়িতে আসেন, স্যার– মানে ম্যাডাম?”
“প্রায় প্রতিদিনই আসে। ওঁর ব্যবসার অনেক কিছুই সুবীর দেখছে কিনা।”
“তারমানে প্রতিদিনই সুবীরবাবুর সঙ্গে আপনার মেয়ের কথা হয় ম্যাডাম?”
“তা হয়।”
“কলেজে যখন আপনার মেয়ে যান, তখন কি সব সময়েই আপনার সঙ্গেই থাকেন?”
“তা থাকে।”
“ম্যাডাম, যখন প্রাইভেট ব্যাপার, মানে বাথরুমে…।”
“না, তখন একলাই যায়।”
“সেই সময়ে কি আর কোনো মেয়ে বাথরুমে যান?”
“তাকে দিয়ে চিঠি চালাচালি হয় কিনা ভাবছেন? না, সেটা আমি খেয়াল করেছি। অবশ্য আগে বাথরুমে গিয়ে কেউ যদি চিঠি রেখে আসে তবে অন্যকথা।”
বুঝলাম এই ব্যাপার নিয়ে কর্তা-গিন্নীর মধ্যে অনেক আলোচনা ইতিমধ্যেই হয়েছে।
“মেয়ের লেখা একটা চিঠি আপনি দেখেছেন জানি, কিন্তু ওটা ছাড়া অন্য কোনো চিঠি বা ওকে লেখা কোনো চিঠি কি আপনি দেখেছেন ম্যাডাম?”
“হ্যাঁ, দূর থেকে মেয়ে দেখিয়েছে, কিন্তু বলেছে ওগুলোতে হাত দেবার চেষ্টা করলে ও সুইসাইড করবে।”
“কেন দেখিয়েছেন বলে আপনার মনে হয়?”
“আসলে এটা ওর বাবাকে চ্যালেঞ্জ। বাবা যতই চেষ্টা করুক না কেন ওর এই চিঠি চালাচালি বন্ধ করতে পারবে না, চিঠিগুলো দেখিয়ে সেটাই আমাকে বলেছে।”
“চিঠিগুলো কি আপনি পড়েছেন ম্যাডাম?”
“আরে না, ছি ছি! দূর থেকে আমাকে দেখিয়েছে।”
“দূর থেকে যখন দেখেছেন, ওগুলো তো বাজে কাগজও হতে পারে, তাই না ম্যাডাম?”
সম্ভাবনাটা বোধহয় মিসেস কুণ্ডু ভাবেননি। শুধু বললেন, “মিথ্যে বলার পাত্রী আমার মেয়ে নয়। ও বলেছে নিয়মিত চিঠি পায় এবং চিঠি লেখে।”
“আপনার কী মনে হয় ম্যাডাম, কোত্থেকে চিঠিগুলো আসছে?”
“কে জানে, হয় কলেজ বা লাইব্রেরি। ওই দুটো জায়গাতেই ও নিয়মিত যায়।”
“গান শিখতেও তো যান?”
“তা যায়।”
“আপনার মেয়ে কি খুব বই পড়তে ভালোবাসেন ম্যাডাম?”
“আগে তো পড়ত না। আসলে এ বাড়িতে বই পড়ার বাতিক কারোরই ছিল না। ইদানীং দেখি নিয়মিত বই আনে।”
“কী এত পড়েন ম্যাডাম?”
“কে জানে, বইয়ের একটা লিস্ট বানিয়েছে, সেই লিস্ট মিলিয়ে দুটি করে বই নিয়ে আসে, এটাই দেখি।”
লিস্ট বানিয়ে ছেলেবেলায় আমাকেও বাবা জোর করে বই পড়িয়েছেন, নোবল প্রাইজ পাওয়া লেখকদের বই। তাই আশ্চর্য হলাম না। একেনবাবু অবশ্য লিস্টটা দেখতে আগ্রহ দেখালেন। মিসেস কুণ্ডু একটু ইতস্তত করে মেয়ের ঘর থেকে লিস্টটা নিয়ে এলেন। লিস্টটা সত্যিই ইন্টারেস্টিং। কোনো বিখ্যাত লেখকের বই সেখানে নেই। যে বইগুলো আছে, তার একটার নামও আমি দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না। এ-রকম অখ্যাত লেখকদের বই পড়ে সময় নষ্ট করার কারণ কী? কারণটা অবশ্য মিসেস কুণ্ডু নিজের থেকেই বললেন। মেয়ের খুব ইচ্ছে বই প্রকাশনা সংস্থা খোলে। অচেনা অজানা লেখকদের মধ্যে যাদের প্রতিভা আছে তাদের আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে। এদের বই ছাপিয়েই শুরু হবে প্রকাশনার জয়যাত্রা। খুব একটা ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া নয়, আবার একেবারেই যে বাজে তা বলছি না। সতেরো বছর বয়সে নানান স্বপ্ন থাকবেই। কিন্তু মনে হয় না এ ব্যাপারে শুভংকরবাবুর খুব একটা সহায়তা কন্যা পাবে।
.
আমরা যখন উঠছি, তখন শুভংকরবাবুর ভাগ্নে সুবীর এসে হাজির। ভালোই হল ওর কাছ থেকেও যা খোঁজ নেওয়ার নেওয়া যাবে। সুবীর দেখলাম একেনবাবুর কথা শুভংকরবাবুর কাছে ইতিমধ্যেই শুনেছে। একেনবাবু সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা স্যার, অজয়বাবু তো আপনার বন্ধু, তাই না?”
“ছিল, এখন আর যোগাযোগ নেই।”
“কেন স্যার?”
“আসলে অজয় শ্রীময়ীর সঙ্গে একটু বাড়াবাড়ি করছিল দেখে মামা খেপে গিয়ে ওকে তাড়ান। তারপর আমাকেও বলেছেন যোগাযোগ না রাখতে। আমি মামাকে এ নিয়ে চটাতে চাইনি।”
“শ্রীময়ীদেবীর সঙ্গে কি অজয়বাবুর কোনো যোগাযোগ আছে?”
“যদি থেকেও থাকে, আমি বলতে পারব না।”
“আপনি কি জানেন স্যার, আপনার মামা কেন আমাকে ডেকেছেন?”
“হ্যাঁ, শ্রীময়ীর সঙ্গে কার পত্রালাপ চলছে, সেটা বার করার জন্য।”
“কার সঙ্গে উনি পত্রালাপ করছেন আপনার ধারণা আছে?”
“ধারণার সঙ্গে বাস্তবের কী সম্পর্ক?”
“তবু শুনি না স্যার, আপনার ধারণা কী?”
সুবীর একটু ইতস্তত করে বলল, “মনে হয় অজয়ের সঙ্গে।”
“এটা কেন মনে হচ্ছে স্যার?”
“অজয়কে আমি চিনি। ও যদি কিছু করবে ঠিক করে, তা করবেই– কেউ আটকাতে পারবে না।”
“কিন্তু এটা তো এক তরফা ব্যাপার নয়, এখানে মিস শ্রীময়ীও চিঠি লিখছেন।”
“শ্রীময়ীও খুব একরোখা মেয়ে। এ ব্যাপারে অজয়ের সঙ্গে মিল।”
“আই সি। তা এই অজয় এখন কী করেন স্যার?”
“অনেক কিছুই করে কানে আসে, কিন্তু ঠিক কী করে সত্যিই আমি জানি না। দুঃখের কথা হি ওয়াজ এ ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। বয়োকেমিস্ট্রিতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল। শুধু পড়াশুনোই নয়, ছেলেবেলা থেকেই গাছপালা, মাটি, জল, ইত্যাদি নিয়ে কত যে এক্সপেরিমেন্ট করত! বাড়িতে ছোটোখাটো ল্যাবোরেটরি করেছিল বন্ধুবান্ধবের টাকায়। আমিও কিছু টাকা দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আরেকজন জগদীশ বসু হবে।”
“আপনি যে বললেন অনেক কিছুই করেন, সেগুলো কী স্যার?”
“দেখুন, এগুলো সত্যি কি মিথ্যা আমার পক্ষে জানা অসম্ভব। যেটা সত্যি, সেটা হল নিতান্ত সাধারণ অবস্থা থেকে ও হঠাৎ বেশ কিছু টাকা হাতে পেয়েছে! মাঝেমধ্যে হংকং, ব্যাঙ্কক এইসব জায়গায় যায়। কাশ্মীর, আফগানিস্তানের মতো জায়গাতেও গিয়েছে। কেউ কেউ বলে ও নাকি একটা স্মাগলিং রিং-এর সঙ্গে যুক্ত, টেররিস্ট লিঙ্কও আছে। উলটো দিকে সি.আই.এ-এর হয়ে কাজ করছে সেটাও শুনেছি।”
“দাঁড়ান স্যার, দাঁড়ান! আপনি না একটু আগে বললেন ওঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, এগুলো জানলেন কী করে?”
“কী আশ্চর্য, আমাদের কমন ফ্রেন্ডস তো আছে!”
“বুঝলাম স্যার। ও আরেকটা কথা, এ বাড়িতে আপনার সঙ্গেই মিস শ্রীময়ীর সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ, আপনাকে কি উনি কিছু বলেছেন ওঁর চিঠিপত্রের ব্যাপারে?”
“কিচ্ছু না। না বলে আমাকে বাঁচিয়েছে।”
“কেন স্যার?”
“বললে মামাকে বলতে হত, নইলে আমি জেনেও কিছু জানাইনি বলে আমার সর্বনাশ করতেন, আর বললে শ্রীময়ীর সর্বনাশ হত!”
“এটা মন্দ বলেননি স্যার। আচ্ছা অজয়বাবুর ঠিকানাটা আপনার জানা আছে?”
“ও থাকে ডোভার লেনে। ঠিকানাটা বলতে পারব না, কিন্তু বাড়ির ডিরেকশনটা দিতে পারি।”
“তাই দিন স্যার।”
সুবীর একটা কাগজে এঁকে বুঝিয়ে দিল কোথায় যেতে হবে। গড়িয়াহাট রোড থেকে ঢুকে ক’টা বাড়ি পরে পড়বে সেটাও বলে দিল। সুতরাং বাড়ি খুঁজে পেতে অসুবিধা হবার কারণ নেই।
“একটা ফোন করে যাবেন, নইলে ওর দেখা পাওয়া কঠিন।”
“ফোন নম্বর আছে আপনার কাছে?”
“সুবীর ওই কাগজেই নম্বরটা লিখে দিল।”
.
আমরা চলে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ একেনবাবু ঘুরে দাঁড়িয়ে সুবীরকে জিজ্ঞেস করলেন, “আরেকটা কথা স্যার, আর কাউকে কি আপনি সন্দেহ করেন যার সঙ্গে মিস কুণ্ডুর বন্ধুত্ব থাকতে পারে?”
“না, আর কাউকে মনে আসছে না।”
“আপনার সঙ্গে মিস কুণ্ডুর সম্পর্কটা এখন কীরকম?”
“হোয়াট ডু ইউ মিন? ও আমার বোন!” সুবীরের গলায় বিরক্তির ভাব স্পষ্ট।
“আরে না স্যার, ওঁর সঙ্গে শুভংকরবাবুর তো বাক্যালাপ নেই, আর আপনি শুভংকরবাবুর প্রিয় ভাগ্নে, তার কোনো এফেক্ট… তাই প্রশ্নটা করলাম…এনি ওয়ে, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”
.
বেরিয়ে এসে প্রমথ বলল, “চোরের মন বোঁচকার দিকে। যেই জিজ্ঞেস করলেন শ্রীময়ীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা, কেমন ঝাঁঝিয়ে উঠল দেখলেন।”
“তাই তো দেখলাম স্যার।”
“মিসেস কুণ্ডু হয়তো ঠিকই সন্দেহ করছেন। হয়তো অজয়কে দাঁড় করানো হয়েছে একটা ফলস টার্গেট হিসেবে। এটা সুবীর আর শ্রীময়ীর জয়েন্ট প্ল্যান।”
“কথাটা ভুল বলিসনি,” আমি বললাম, “ফ্র্যাঙ্কলি মেয়েটার যা দুর্দান্ত চেহারা, কে-না প্রেমে পড়তে চাইবে! তবে বিয়ে করতে পারবে না। রিলেশনশিপটা নিষিদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।”
“হু কেয়ার্স?”
“হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট কেয়ার্স। আইন বলে তো একটা ব্যাপার আছে।”
“আপনি কী বলেন একেনবাবু?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।
একেনবাবু বললেন, “আমি একটু কনফিউসড স্যার।”
“কেন?”
তার কোনো উত্তর দিলেন না। টিপিক্যাল একেনবাবু। মাঝে মাঝে বকবকিয়ে কানের পোকা বার করে দেন, মাঝে মাঝে মৌনব্রত নেন।
.
একেনবাবুর বাড়িতে পৌঁছেই প্রমথ বলল, “বউদি, চা হবে?”
“হবে ভাই, কিন্তু কাজ হল?”
“আপনার কর্তাকে জিজ্ঞেস করুন, তিনিই তো গোয়েন্দা।”
বউদি একেনবাবুর দিকে তাকাতেই উনি বললেন, “খুবই কনফিউসিং।”
“তোমার তো সব কিছুই কনফিউসিং,” বলে একেনবউদি চায়ের তদারক করতে গেলেন।
“কি কনফিউসিং বলুন তো, সুবীর আর মিস কুণ্ডুর ব্যাপারটা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সেটা তো বটেই স্যার, কিন্তু আমি ভাবছি শুভংকরবাবুর কথা।”
“ওতে কনফিউশনের কী আছে?”
“না, আমি ভাবছি স্যার যে, আজকালকার মেয়েরা তো খুচখাচ প্রেম অনেকেই করে, কিন্তু তাতে কি বিয়ে ভেস্তে যায়? মানে, যদি সত্যিকারের সিরিয়াস কিছু না হয়। শুভংকরবাবু তো সোজাসুজি পাত্রপক্ষকে বলতেই পারতেন মেয়ের একজনের সঙ্গে ভাব ছিল, কিন্তু এখন আর তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ নেই। এ নিয়ে এত টেনশন কেন?”
“এক্সাক্টলি,” প্রমথ বলল। “নিগোশিয়টেড ম্যারেজে যেসব মেয়েদের জিওগ্রাফি, মানে গায়ের উঁচু-নীচু ভালো, তাদের হিস্ট্রি জানতে গেলেই মুশকিল। আর যাদের হিস্ট্রি ভালো, তাদের যা জিওগ্রাফি… দেখলে পাত্রপক্ষের পছন্দ হবে না।”
“তুই চুপ করবি,” আমি বললাম। “অত্যন্ত ডিসরেস্পেক্টফুলি কথা বলিস মেয়েদের সম্পর্কে।”
“ডিসরেস্পেক্টের কী দেখলি! আমি বলছি বাস্তব সত্য। তুই একটা বাজে চেহারার মেয়েকে বিয়ে করবি?”
“হ্যাঁ, পুরুষরা তো সব কন্দর্পকান্তি, তাদের সবার জন্যই অপ্সরার দরকার হবে। আসল কথা মানুষের মনটা কেমন, অন্যগুলো সব বাহ্যিক।”
“গুড। কিন্তু এও তো সত্যি, আজ সব জেনেও তোর সঙ্গে যদি শ্রীময়ীর বিয়ের কথা ওঠে, তুই ওর মনটা পরীক্ষা করার আগেই উর্ধশ্বাসে ছুটবি বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য।”
“তুই থামবি, মেয়েটা আমার হাঁটুর বয়সি!”
“বাপির সঙ্গে তর্ক করে আমি সময় নষ্ট করব না,” প্রমথ একেনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল। “আপনি বলুন, শুভংকরবাবুর এত টেনশনের কারণটা কী?”
ইতিমধ্যে চা এসে গেছে।
“আই হ্যাভ নো ক্লু স্যার।” একেনবাবু বিস্কুটে কামড় বসিয়ে চায়ে চুমুক দিলেন।
পাঁচ
পরদিন একেনবাবুর বাড়িতে গিয়ে শুনলাম যে, উনি অজয়কে ফোনে ধরতে পেরেছেন। অজয় খুব ব্যস্ত। বাড়িতে দেখা হবে না, তবে সন্ধ্যার সময়ে অগ্রগামী লাইব্রেরিতে কিছুক্ষণের জন্য আসবে। সেখানে আমাদের মিনিট দশ-পনেরো সময় দিতে পারে। দ্যাক্স ইট।
ঠিক হ্যায়, সন্ধ্যার সময়ই সবাই যাব।
একেনবাবু দেখলাম অগ্রগামী লাইব্রেরির উপর একটু চটা। বললেন, “যাই বলুন স্যার, যাচ্ছেতাই সার্ভিস লাইব্রেরিটার। নিউ ইয়র্কের কমুনিটি লাইব্রেরিগুলোতে গিয়ে এদের ট্রেনিং নেওয়া উচিত।”
বিরক্তির কারণটা একটু বাদেই জানলাম। একেনবউদির কার্ড হারিয়ে যাওয়ায় নতুন কার্ড করাতে কয়েকদিন আগে বউদিকে নিয়ে লাইব্রেরি গিয়েছিলেন। আধ ঘণ্টা লাগবে কার্ড বানাতে। বেশ কিছু ফেরত দেওয়া বই একটা টেবিলে জমা করা আছে, মনে হয় খানিক বাদে বাদে ওগুলো র্যাকে তোলা হয়। বউদির পছন্দের একটা বই ওখানে দেখতে পেয়ে চাইতেই ডেস্ক-লাইব্রেরিয়ান বললেন, কার্ড না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ বইয়ের কার্ড আর মেম্বারশিপ কার্ড একসঙ্গে ক্লিপ করে জমা রেখে বই ইস্যু করা হয়।
একেনবাবু বললেন, “আধ ঘণ্টা বাদেই তো কার্ডটা পেয়ে যাবেন!”
কে শোনে?
একেনবাবুর মাথায় একটা প্রশ্ন জাগল। লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা স্যার, যদি দুটো বই চাই, কার্ড তো একটা?”
“তাহলে দুটো কার্ড লাগবে। যতগুলো বই একসঙ্গে নিতে চান, ততগুলো কার্ড করাতে হবে।”
অত্যন্ত সেকেলে নিয়ম! একেনবাবু ঠিক করলেন সুযোগ পেলে কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে হবে। তিনটে বই নিতে চাইলে তিনটে কার্ড? ননসেন্স!
ওঁরা যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কার্ড আসার অপেক্ষা করছেন, একটি সুন্দরী মেয়ে এসে টেবিলে রাখা আরেকটা বই চাইতেই কার্ড না নিয়েই লাইব্রেরিয়ান বইটা ইস্যু করে দিলেন। একেনবাবু সেটা দেখতে পেয়ে প্রশ্ন তুলতেই লাইব্রেরিয়ান বললেন, ‘কার্ডটা ওঁর গাড়িতে আছে, ড্রাইভার এখুনি এসে দিয়ে যাবে।’
আসল ব্যাপারটা পরে জানা গেল, মেয়েটি লাইব্রেরির এক ট্রাস্টির মেয়ে!
.
প্রমথ কাহিনিটা শুনে বলল, “ওগুলো বাজে কথা, সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। আপনি যদি আঠেরো-উনিশ বছরের তন্বী হতেন, আপনিও বইটা পেতেন। হুমদো মোটা লোক হলেও পেতেন, তবে কিনা ডেস্ক-লাইব্রেরিয়ানের হাতে দশ-বিশ টাকা ধরিয়ে দিতে হত। আপনার তো জানা উচিত। পুলিশে চাকরি করতেন এতদিন… দেশটা তো এভাবেই চলে।”
“জানি স্যার, ভেরি ব্যাড।”
“আপনার কিন্তু ওই মেয়েটিকে কনফ্রন্ট করা উচিত ছিল,” আমি বললাম। “কেন বাবার সুবাদে এভাবে অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে?”
“সেটা মন্দ বলেননি স্যার। এবার যখন দেখা হবে সেই প্রশ্নটাই করব।”
“তার মানে?”
“মানে স্যার, মেয়েটি হলেন মিস শ্রীময়ী। কাল ছবি দেখেই চিনতে পারলাম।”
.
সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় অজয় যেতে বলেছিল। আমরা তার কিছুক্ষণ আগেই গিয়ে পৌঁছোলাম। মোবাইলে ফোন করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই একজন সুবেশ যুবক অজয় বলে নিজের পরিচয় দিল। তারপর বলল, “কী ব্যাপার বলুন তো, আমার খোঁজ কেন করছেন?”
একেনবাবু ইনিয়ে বিনিয়ে আসল কারণটাতে পৌঁছোনোর আগেই অজয় বলল, “দেখুন, আমি তাস লুকিয়ে খেলি না। শুভংকরবাবু আপনাকে অ্যাপয়েন্ট করেছেন কে তাঁর মেয়েকে চিঠি লিখছে আর কে তাঁকে ভয় দেখাচ্ছে বার করতে, তাই তো?”
“অনেকটা তাই স্যার।”
“তার উত্তর হল, আমি চিঠি লিখছি, কিন্তু আমি ভয় দেখাচ্ছি না। কারণ তার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। শ্রীময়ীকে আমি ভালোবাসি, আমি ওকে বিয়েও করব। শ্রীময়ীর বাবা আপনার মতো একশো গোয়েন্দা দিয়েও সেটা আটকাতে পারবেন না।”
একেনবাবু বললেন, “কিন্তু স্যার, উনি যদি বিয়ে না দেন।”
“ওঁকে বিয়ে দিতে হবে কেন, শ্রীময়ী যেদিন আঠেরো বছরে পা দেবে, সেদিনই আমরা বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের জন্য অ্যাপ্লাই করব। শুভংকর কুণ্ডু সেটা ঠেকাতে পারবেন?”
“কিন্তু স্যার, উনি তো ওঁর সম্বন্ধ অন্য জায়গায় করেছেন!”
“সে বিয়ে হবে না, কারণ শুভংকরবাবুর মারণাস্ত্র আমার হাতে আছে।”
“কী স্যার সেটা?”
“সেটা আপনাকে বলব কেন?” কথাটা শেষ করতে না করতেই অজয়ের ফোন বাজল। “আপনি এসে গেছেন? হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি আসছি…” বলে হাত তুলে আমাদের বাই’ বলে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
আমরা অবশ্য অত দ্রুত বেরোতে পারলাম না। আমার সঙ্গে একটা ব্যাগ ছিল, সেটা খুলে সিকিউরিটিকে দেখাতে হবে। আমার আগে জনা দুই ছিল। তারা আবার অনেক বই নিয়ে যাচ্ছে। সেগুলো ইস্যু করা হয়েছে কিনা দেখতেও একটু সময় লাগল। তবে একই নিয়ম সবার জন্য নয়। যে হেড লাইব্রেরিয়ান সেদিন বললেন, সব কর্মচারীদের ব্যাগ চেক করা হয়। উনি নিজেই আমার সামনে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, সিকিউরিটি টু শব্দ করল না।
ছয়
এরমধ্যে একদিন শুভংকরবাবু এলেন। কেসটা এতটুকু এগোয়নি দেখে মনে হল বেশ ক্ষুণ্ণ হয়েছেন।
“আপনার কত খরচ হয়েছে?” একেনবাবুকে প্রশ্ন করলেন।
“বিশেষ কিছুই নয় স্যার।”
“তাও এই টাকাটা রাখুন,” বলে একটা পাঁচ হাজার টাকার চেক হাতে ধরিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, “ভেবেছিলাম, ব্যাপারটার একটা কিনারা করে ফেলবেন, কিন্তু কিছুই পারলেন না! বিয়ের বন্দোবস্ত করছি, অথচ কী ঘটতে চলেছে জানি না।”
আমরা সবাই চুপ।
“আমাদের বনেদি পরিবার। আমার বাবা ও জ্যাঠা এখনও বেঁচে। শেষে অঘটন ঘটলে তার পরিণতি কী হবে, সেটা আপনারা কতটা বোঝেন জানি না।”
আমরা সবাই বাঙাল, বাপ-ঠাকুরদা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসেছেন। বনেদিয়ানা বস্তুটা কী সেটা আমরা বুঝি না, সেইজন্যই নিশ্চয় মন্তব্যটা করা।
“আমারা আপ্রাণ চেষ্টা করছি স্যার,” একেনবাবু সাফাই গাইলেন।
“বহু পড়াশুনো করে ফেল করলেও সেটা ফেলই,” বলে ভদ্রলোক উঠে পড়লেন।
শুভংকরবাবু চলে যেতে আমি বললাম, “ভদ্রলোক বোধহয় জবাব দিয়ে গেলেন।”
প্রমথ বলল, “বোধহয়’ কথাটা আর জুড়ছিস কেন। সোজা ফুটিয়ে দিয়ে গেলেন। তখনই আমি বলেছিলাম, এইসব ঘেঁদো কাজ না নিতে!”
এরমধ্যে আমি আর প্রমথ দু-দিনের জন্য শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে শুনলাম মস্ত সুখবর, একেনবউদি অবশেষে আমেরিকা যেতে রাজি হয়েছেন। একেনবাবু খুশীতে ডগমগ। বললেন, “বুঝলেন স্যার, ফ্যামিলিকে যে শেষ পর্যন্ত রাজি করাতে পারব ভাবিনি। এবার আমেরিকাতে গিয়ে কোনো দুর্ভাবনা থাকবে না। ফ্যামিলি দূরে থাকলে স্যার, বুঝতেই তো পারছেন… একটা টেনশন।”
প্রমথ গম্ভীর ভাবে বলল, “আপনিও টেনশন-মুক্ত, আমরাও।”
“কেন স্যার?”
“এতদিন আপনার হ্যাপা সামলাতে সামলাতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। এখন আপনিও বউদিকে নিয়ে নিরিবিলিতে থাকবেন, আমাদেরও ঝাড়া হাত-পা।”
“কেন স্যার, আমি কি এতই জ্বালিয়েছি আপনাদের?”
“প্রমথর কথা ছাড়ুন তো! ওখানে গিয়ে আপনাদের জন্য কাছাকাছি একটা জায়গা দেখতে হবে।”
“বাপি কাছাকাছি কেন বলছে জানেন তো? যাতে বউদির রান্না যখন তখন গিয়ে খেয়ে আসতে পারে।”
“কী আশ্চর্য স্যার, ফ্যামিলি ওখানে থাকলে আপনারা অন্য কোথাও হাবিজাবি খাবেন, এটা কি হয় নাকি?”
“কেন মশাই, আমি কি বাজে রাঁধি?” প্রমথ তেড়ে উঠল।
“না, না, তা নয় স্যার। ফ্যামিলি খুশি হবে আপনারা খেলে। আপনাদের খুব পছন্দ করে ও।”
কথাটা মিথ্যে নয়, একেবউদি একজন গ্র্যান্ড বউদি। একেনবাবু বাঙাল, কিন্তু উনি কলকাতার মেয়ে। এত যত্ন করেন আমাদের দুজনকে, মনে হয় আমরা ওঁর আপন ভাই।
আদরের তাড়নায় প্রমথ তো একদিন বলেই ফেলল, “আপনি বড় বাড়াবাড়ি করেন বউদি!”
“কী যে বলেন ভাই, ওঁকে তো আমি চিনি, আপনারা দু-জন ওখানে না থাকলে কোথায় খেত, কী করত, ভাবতেও ভয় করে।” তারপর একটু মিষ্টি হেসে বললেন, “উনি কী বলেছেন জানেন?”
“কী?”
“আপনাদের বৌ খোঁজার জন্য নাকি আমাকে চেষ্টা করতে হবে।”
“রক্ষে করুন বউদি, ওইটি করবেন না,” আমি বললাম। “দেশে আসা ছেড়ে দেব ভাবছিলাম মায়ের বিয়ের তাগিদের জন্য। এখন ওখানে গিয়ে যদি আপনার তাগাদা শুরু হয়, তাহলে ইউরোপে কোথাও চাকরির খোঁজ করতে হবে। তবে হ্যাঁ, প্রমথ আর ফ্রান্সিস্কার বিয়েটা মনে হয় আপনাকেই ওখানে দিতে হবে। এখানে ও খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছে না।”
“চুপ কর শালা! সরি বউদি, বাপিটা এত ইডিয়টের মতো কথা বলে, মাথা ঠান্ডা রাখা কঠিন হয়ে যায়।”
“থাক ভাই, বউদির কাছে আর অত লজ্জা পেতে হবে না।”
“একটু পাওয়া ভালো বউদি,” আমি বললাম। “তাতে যদি মুখটা একটু শুদ্ধ হয়। ভাগ্যিস ফ্রান্সিস্কা বাংলা জানে না, নইলে আউট-রাইট ওকে রিজেক্ট করত।”
“করত না, কারণ গালাগালগুলো আমি তোকে দিই– এ ট্রলি ডিসার্ভিং ক্যান্ডিডেট। চাস তো খিস্তিগুলো ট্রান্সলেট করে বলে দিস, তারপর দেখিস কী রিয়্যাকশন হয়।”
“মাপ কর, ওগুলো আন্-ট্রানস্লেটেবল।”
যাক সে কথা, একেনবাবু আর একটা মোক্ষম খবর দিলেন। শুভংকরবাবু শেষ পর্যন্ত মেয়ের ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি ঠিক করেছেন অজয়ের সঙ্গেই শ্রীময়ীর বিয়ে দেবেন। হঠাৎ এই অ্যাবাউট টার্নের কারণটা একেনবাবু সঠিক জানেন না। যদিও আমি আঁচ করতে পারছিলাম যে, পাত্রপক্ষের কাছে অপমানিত হবার মানসিকতা ওঁর ছিল না। সংসারে কিছু কিছু লোক আছে যারা জীবনে কারোর কাছে নীচু হতে বা খোঁটা খেতে রাজি নয়। তারা যা করবে, যা ভাববে, সেটাই চূড়ান্ত ও শেষ কথা। তিনি নিজেই সম্বন্ধ ভেঙে অজয়ের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন মাথা উঁচু করে। নিশ্চয় বিয়ে ভেঙে দেবার একটা কারণও জানিয়েছেন পাত্রপক্ষকে। বলেছেন, কেন পাত্রকে বা তার পরিবারকে ওঁর পছন্দ হয়নি। একেনবাবু অবশ্য শুভংকরবাবুর কাছ থেকে ব্যাপারটা শোনেননি। সুবীর এর মধ্যে ফোন করেছিল একদিন, তার কাছেই জেনেছেন।
প্রমথ বলল, “চেকটা ক্যাশ করেছেন তো? তাড়াতাড়ি করুন, নইলে ওটা হয়তো স্টপ পেমেন্ট করে দেবেন– সব কিছু যখন মিটেই গেছে।”
সাত
আমাদের আমেরিকা ফিরে যাবার দিন ঘনিয়ে আসছে। এরমধ্যে একদিন সকালে একেনবাবুর বাড়িতে বসে গল্প করছি, প্রমথ এল। হাতে একটা বই, ‘টেররিস্ট এন্ড কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার’। আমি ওর কাছ থেকে বইটা নিয়ে পাতা উলটোতে উলটোতে বললাম, “তোর হল কী, এইসব পড়ছিস!”
“হাতে নিয়ে ঘুরছি, পড়ছি না তো!”
“হাতে নিয়েই বা ঘুরছিস কেন?”
“আর বলিস না, আমার মেসো গতকাল জোর করে হাতে ধরিয়ে দিল… এই দুর্দান্ত বই নাকি সকলের পড়া উচিত! ‘না’ বলতে পারলাম না, আজ গিয়ে ফেরত দেব।”
“না পড়েই?”
“কেন, তাতে হয়েছে কী, মেসো তো আর পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে না?”
“তুই অত্যন্ত ডিজঅনেস্ট।”
“চুপ কর, জ্ঞান দিস না। ও ভালোকথা, অগ্রগামী লাইব্রেরির সেই ডেস্ক-লাইব্রেরিয়ান মারা গেছেন, শুনেছিস?”
“তুই কী করে জানলি?”
“গতকাল মেসোর বাড়িতেই শুনলাম। মাসতুতো ভাই খুব নাটক-ফাটক করে। ওদের দলের সঙ্গেই ওই ডেস্ক-লাইব্রেরিয়ান অভিনয় করেতেন। দুর্দান্ত অ্যাক্টর। হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে কয়েকদিনের মধ্যেই গন।”
“কীসে মারা গেলেন স্যার, ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় নাকি?”
আমি জানি ওটাতে একেনবাবুর দারুণ ভয়। খুঁজে খুঁজে পত্রিকায় দেখেন ক-জনের ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়েছে।
“তা বলতে পারব না। তবে জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, রক্তবমি– এইসব নাকি উপসর্গ ছিল। সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক।”
আমি বললাম, “অসম্ভব নয়। তবে হার্ট অ্যাটাকে কি রক্তবমি হয়?”
“নির্ঘাত ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া স্যার,” একেনবাবু বললেন। “আমরাও তো লাইব্রেরিতে গেছি। বেশ কয়েকটা মশা ছিল স্যার ওখানে। আমাদের না হলে বাঁচি!”
“ছাড়ুন তো মশাই, অত ভয় থাকলে নিউ ইয়র্কে গিয়ে বসে থাকুন!”
প্রমথর ধমকে বোধহয় একটু কাজ হল। একেনবাবু কিছুক্ষণের জন্য চুপ করলেন।
আমি প্রসঙ্গ পালটাবার জন্য বললাম, “কী একেনবাবু, শুভংকরবাবু কি মেয়ের বিয়েতে আপনাকে নেমন্তন্ন করবেন বলে মনে হয়?”
“কে জানে স্যার, তবে না করলেই বাঁচি?”
“কেন মশাই, গিফট কিনতে হবে বলে?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।
“কী যে বলেন স্যার!”
“ঠিকই বলি, আপনার মাথা কোন দিকে যায়, সেটা আমার জানা আছে। তবে চিন্তার কী আছে, সস্তার গিফট দেবেন আর পেট পুরে খাবেন। পয়সা দিব্বি উশুল হবে।”
“আপনি না স্যার, সত্যি!”
“ঠিক আছে, আর জ্বালাব না। আর ফ্র্যাঙ্কলি এ নিয়ে আপনার চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। শুভংকরবাবু দু-সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ড না কোথায় জানি যাচ্ছেন, তিনি ফিরলে তারপর বিয়ের আয়োজন হবে। তার আগেই আমরা নিউ ইয়র্কে।”
“তুই এত কথা জানলি কী করে?”
“ইংল্যান্ড কিনা জানি না, তবে বাইরে যাচ্ছেন সেটা অজয়ের কাছে শুনলাম।”
“অজয়ের কাছে?”
“হ্যাঁ। মেসোর বাড়ি থেকে ফেরার পথে চানাচুর কিনতে উজ্জ্বলায় থেমেছিলাম। বিশাল লাইন, সেখানে অজয়ের সঙ্গে দেখা। অবাকই হলাম আমাকে চিনতে পেরেছে দেখে। একেনবাবুর কথা জিজ্ঞেস করল। বলল, মনে হচ্ছে আপনার গোয়েন্দা-বন্ধু আমাদের বিয়েটা আটকাতে পারলেন না। তখনই শুভঙ্করবাবুর বাইরে যাবার খবরটা বলল।”
আমি একেনবাবুকে বললাম, “দেখুন তো, কাজটায় একটা পয়সাও পেলেন না, অথচ শুধু শুধু দুর্নাম কুড়োলেন।”
পত্রিকা টেবিল থেকে পত্রিকাটা তুলে একটু অন্যমনস্ক হয়ে একেনবাবু বললেন, “তাই তো দেখছি স্যার।” তারপরেই একটা আর্তনাদ, “সর্বনাশ স্যার!”
“কী হল মশাই?”
“দেখেছেন পত্রিকার খবর?”
“কী?”
অগ্রগামী লাইব্রেরির আরও দু-জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে… জ্বর, শ্বাসকষ্ট, রক্তবমি। ঠিক ওই লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকের মত। আমি বলছি স্যার, ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া ছাড়া এটা আর কিছুই হতে পারে না। আই অ্যাম ইন ডিপ ট্রাবল স্যার।”
“আপনি তো আচ্ছা পাগল! গন্ডায় গন্ডায় লোক লাইব্রেরিতে প্রতিদিন যাচ্ছে, কারো কিছু হচ্ছে না, শুধু আপনারই হবে?”
“হবে স্যার, হবে। আমার ভীষণ ছোঁয়াচে রোগ হয়।”
এমন সময়ে একটা গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল সুবীর। ঘরে ঢুকে একেনবাবুর হাতে একটা খাম এগিয়ে দিয়ে বলল, “মামা একটু আগে এয়ারপোর্টে চলে গেলেন। গাড়িতে ওঠার সময়ে ওঁর খেয়াল হল, আপনার পুরো ফি দেওয়া হয়নি। তাই ভাগ্নের উপর দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।”
“পুরো ফি! আমি তো কিছুই করলাম না স্যার।”
“সেটা আপনি মামা ফিরে এলে বলবেন, এখন তো এটা ধরুন।” বলে খামটা একেনবাবুর হাতে প্রায় জোর করে গুছিয়ে দিলেন।
খামটা টেবিলে রেখে একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় উনি যাচ্ছেন স্যার?”
“লন্ডনে। তারপর বোধহয় প্যারিসও যাবেন। মামার ডিসিশন সব সময়ই লাস্ট মোমেন্টে। যাইহোক গুনে নিন। দশ হাজার টাকা থাকার কথা।”
একেনবাবু বললেন, “সত্যি স্যার, এটা কিন্তু আমি নিতে পারি না। পাঁচ হাজার দিয়ে গেছেন, এখন আবার দশ হাজার! কিছু করারই তো সুযোগ পেলাম না!”
“সুযোগ পাবেন কী করে, মামা মত পালটালে? ধরে নিন, এটা ওঁর মত পালটাবার খেসারত। তবে ভালোই করেছেন মত পালটেছেন, অন্য জায়গায় বিয়ে হলে বোনটা অসুখী হত।”
“মতটা পালটালেন কেন স্যার?”
“তা তো বলতে পারব না, অজয়কে জিজ্ঞেস করুন। তবে এলেম আছে ছেলেটার!”
“বিয়েটা হচ্ছে কবে স্যার?”
“ডেট এখনও ঠিক হয়নি, মামা ফিরলে ফাইনালাইজড হবে। মনে হয় জানুয়ারির শেষে।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং! একটু চা বলি স্যার?”
“না, থ্যাঙ্ক ইউ। আমায় এখুনি বেরোতে হবে শ্রীময়ীকে নিয়ে, ড্রাইভার হঠাৎ ছুটি নিয়েছে।”
“ভালো কথা স্যার, আমরা একটু আগে আলোচনা করছিলাম অগ্রগামী লাইব্রেরিতে বেশ কয়েক জনের অসুস্থ হওয়া নিয়ে। মিস শ্রীময়ীকে ক’দিন অন্তত ওখানে না-যেতে বলবেন। যদি ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়, তাহলে কখন যে কী হয়ে যায়!”
“তাই নাকি, জানতাম না তো!”
“আজকের খবর, স্যার।”
“ঠিক আছে বলে দেব। লাকিলি ও বেশ কয়েকদিন লাইব্রেরিতে যায়নি জানি।”
“তাহলে তো চমৎকার। আরকটা প্রশ্ন স্যার, এই অগ্রগামী লাইব্রেরির একজন ট্রাস্টি তো আপনার মামা। আর ক-জন ট্রাস্টি আছেন?”
“আরও দু-জন, কেন বলুন তো?”
“লাইব্রেরি সিস্টেম-এর ইম্প্রভমেন্ট নিয়ে একটু আলোচনা করতাম। এই যে স্যার, এক-একটা বইয়ের জন্য এক-একটা কার্ড করা… যাক গে স্যার, ওঁদের সঙ্গে দেখা হলে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলব। ওই দু-জন ট্রাস্টির নাম জানেন স্যার?”
একেনবাবু ঠিক কী বলতে চান, সুবীরের মাথায় ঢুকল না। কিন্তু উত্তরটা দিল, “অন্য দু-জন নামেই ট্রাস্টি। একজন বিকাশ দত্ত, হাঁটুর ব্যথায় শয্যাশায়ী, কানেও শোনেন না। মাঝে মাঝে মামার জন্য ওঁকে দিয়ে ট্রাস্টের কোনো কাগজে সই করাতে যা ঝামেলা হয়! আরেকজন সুরঞ্জন মিত্র। এখন মুম্বাইয়ে থাকেন, কালেভদ্রে কলকাতায় আসেন।”
“তাহলে তো এবার আলোচনাটা হবে না স্যার।”
“আপনি হেড লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। উনিই প্রায় চালান লাইব্রেরি।”
“বেশ, তাই বলব। থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”
“আচ্ছা চলি।”
“আসুন স্যার।”
.
প্রমথ এই ফাঁকে পত্রিকাটা তুলে নিয়ে পড়ছিল। সুবীর চলে যেতেই বলল, “কী অসুখ হয়েছে কিছু না জেনে খামোকা ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার ভয় দেখালেন কেন বলুন তো? সিম্পটমগুলোও তো ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার নয়।”
“কেন স্যার?”
“এই যে রক্তবমি, জ্বর, বুকে ব্যথা– এগুলি কি সব ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে হয়?”
“জ্বর আর গায়ে ব্যথা তো হয় স্যার। হয়তো সেইসঙ্গে অন্য কোনো অসুখও হচ্ছে।”
হঠাৎ প্রমথর কাছ থেকে নেওয়া বইটার একটা পাতায় চোখ পড়ল। আমি আর ঠাট্টা করার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না। বললাম, “বুঝলেন, একেনবাবু, সিম্পটমগুলো সব অ্যানথ্রক্সের। নিশ্চয়, নিরীহ বুক-লাভারদের মারবে বলে ‘হেট-বুক’ টেররিস্টরা গুচ্ছের মশাকে অ্যানথ্রক্স খাইয়ে অগ্রগামী লাইব্রেরিতে ছেড়ে দিয়ে গেছে।”
প্রমথ যোগ করল, “শুধু বুক-লাভার কেন, ‘হেট-কলকাতা’ গ্রুপ মশা ব্যবহার করে সারা কলকাতাকেই ধ্বংস করতে পারবে। শুধু একটাই সমস্যা, মশা অ্যানথ্রক্স জীবাণু খেলেও ছড়াতে পারে না।”
একেনবাবু বোধহয় সেই সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হবার জন্যেই বইটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন।
“কি মশাই, ভয় দূর হয়েছে?”
একেনবাবু আমাদের হাসিঠাট্টায় কান না দিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন, “আই ওয়াজ এ ফুল স্যার, আই ওয়াজ এ ফুল।” তারপরেই ঘরে অদৃশ্য হলেন।
.
একেনবাবুর এইসব খ্যাপামিতে আমরা অভ্যস্ত। তাই চেঁচিয়ে বউদিকে বললাম, “বউদি আর এক কাপ চা হবে নাকি?”
খানিক বাদে একেনবাবু ফিরে আসতে প্রমথ বলল, “সেলফ-রিয়্যালাইজেশনটা এত লেটে হল কেন?”
“কী স্যার?”
“এই যে, ‘আই ওয়াজ এ ফুল’ কথাটা বললেন।”
“আই মে বি এ বিগার ফুল স্যার।”
“তার মানে?”
“তার মানে স্যার, এয়ারপোর্ট পুলিশকে শুভংকরবাবুর ব্যাগ সার্চ করতে বললাম।”
“কী বলছেন যা-তা!”
“তাই তো বলছি স্যার, আই মে বি এ বিগার ফুল।”
“দাঁড়ান, দাঁড়ান, কী ব্যাপার বলুন তো?”
“জানি না স্যার, একটা থিওরি, জাস্ট এ থিওরি।”
“আঃ, বলুন না ব্যাপারটা কী!”
“আগে চা-টা আসুক স্যার।”
আট
ইতিমধ্যে চা এসে গেছে।
একেনবাবু বললেন, “চা-টা আগে খান স্যার, তারপর বলছি।”
চা খাচ্ছি। একেনবাবু ঘন ঘন পা নাড়াচ্ছেন, কিন্তু কিছু বলছেন না! চা শেষ হতে না হতেই আরেকটা ফোন।
একেনবাবু প্রায় লাফিয়ে উঠে চলে গেলেন। তারপর একটু বাদে ফিরে এসে বললেন, “যাক স্যার, ডায়েরি দুটো পাওয়া গেছে।”
“কী পাওয়া গেছে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“ডায়েরি দুটো স্যার, যেগুলো অগ্রগামী লাইব্রেরি থেকে চুরি হয়েছিল।”
“কোথায় পাওয়া গেছে?”
“শুভংকরবাবুর ব্যাগের মধ্যে।”
“দাঁড়ান মশাই, দাঁড়ান।” প্রমথ ধমকের সুরে বলল, “কোয়েশ্চেন-অ্যানসার-এর ফরম্যাট ছেড়ে পরিষ্কার করে বলুন। আমাদেরই এখন কনফিউসড করে দিচ্ছেন!”
“বলছি স্যার, বলছি। আসলে ব্যাপারটা সত্যিই বেশ গোলমেলে! আমার প্রথম থেকেই একটা সন্দেহ ছিল, শুভংকরবাবুর মত একজন ইনফ্লুয়েন্সিয়াল লোক– কেন এত বিচলিত হচ্ছেন একটা উড়ো চিঠি পেয়ে? না হয় ওঁর মেয়ের বিয়ে ভেঙেই যাবে। কিন্তু বংশ-মর্যাদা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করা কেন… অবশ্য এই ‘অনার কিলিং’-এর খবর-টবর শুনে মনে হল স্যার, পরিবারের সুনাম রক্ষার জন্য বাপ যদি নিজের মেয়েকে পর্যন্ত খুন করতে পারে তাহলে তো সব কিছুই সম্ভব! সে যাইহোক, এবার রহস্যের কথায় আসি।
শুভংকরবাবু দুটো জিনিস বুঝতে পারছিলেন না। কী করে তাঁর চোখ এড়িয়ে মেয়ে চিঠি চালাচালি করছেন, আর কে চিঠিগুলো দিয়ে ওঁকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছেন। একজন সম্ভাব্য ক্যান্ডিডেট হলেন যাঁকে ওর মেয়ে চিঠি লিখছেন। কারণ মেয়ের অন্য কোথাও বিয়ে হোক, তিনি অবশ্যই সেটা চাইবেন না। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে স্যার, তিনি ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করবেন কেন, বরং সোজাসুজি পাত্রপক্ষকে জানিয়ে বিয়েটা ভেস্তে দেবেন।”
“অথবা ডুডুও খাব, তামাকও খাব,” প্রমথ বলল। “ব্ল্যাকমেল করে টাকা হাতাবেন এবং পাত্রপক্ষকে জানিয়েও দেবেন।”
“পসিবল স্যার, অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু এটাও সম্ভব যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি এই সমস্ত ব্যাপারটার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সে কথা আপাতত থাক। আগে আসি স্যার, চিঠি চালাচালির ব্যাপারটাতে। চিঠি চালাচালি যে অজয়বাবুর সঙ্গে মিস কুণ্ডু করছেন, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। রহস্য হল, কী ভাবে চিঠি চালাচালি হচ্ছে। কিন্তু একটু ভাবতেই বুঝলাম, ইট ইজ সো সিম্পল। লিস্ট থেকে পর পর একটা করে বই নেওয়া, আর সেই বইয়ের মধ্যে চিঠি ঢুকিয়ে লাভারকে পাঠানো।”
“দাঁড়ান মশাই, কী করে সেটা সম্ভব?” প্রমথ প্রশ্ন তুলল, “সে বই তো অন্য কারো হাতে যেতে পারে!”
“না স্যার, যে অ্যারেঞ্জমেন্ট ওঁরা করেছিলেন, তাতে পারে না। ভেবে দেখুন স্যার, একেবারেই অখ্যাত লেখকের অজানা বইয়ের লিস্ট। কে ওই বই পড়ার জন্য হাপিত্যেশ করে থাকবে! বইগুলো সব সময়েই লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে। আর বইগুলো ফেরত দেবার পরে সেগুলো আলমারিতে ওঠার আগেই আরেকজন বইটা ইস্যু করে নেবে। লাইব্রেরিতে যাবার টাইমিংটা ঠিক রাখতে পারলে তো এতে কোনো অসুবিধা থাকে না স্যার।”
আমি বললাম, “বুঝেছি। শ্রীময়ী এসে চিঠি-লুকোনো বইটা জমা দেবে, আর বইটা রিসিভ হয়ে র্যাকে যাবার আগেই অজয় সেটা নিজের নামে ইস্যু করাবে। তারপর নিজের চিঠি ঢোকানো বইটা জমা দেবে। শ্রীময়ী খানিক বাদে লিস্টের আরেকটা বই আলমারি থেকে তুলে এনে সেটা আর অজয়ের সদ্য জমা-দেওয়া বইটা লাইব্রেরিয়ানকে দিয়ে ইস্যু করিয়ে বাড়ি ফিরবে। অন্য কারো হাতে পড়ার সম্ভবনা নেই।”
“এক্সাক্টলি স্যার। সেটাই আমি দেখেছিলাম, যখন মিস শ্রীময়ী টেবিলে ফেরত আসা একটা বই ইস্যু করে নিলেন। তখন অবশ্য বুঝিনি ব্যাপারটা। কিন্তু প্রমথবাবু আমার চোখটা খুলে দিলেন।”
“আমি!”
“হ্যাঁ স্যার, আপনি বললেন না যে, টাকা ফেললে আমিও ওই ভাবে বই নিতে পারতাম। তখনই ক্লিয়ার হতে শুরু করল চিঠি চালাচালির সহজ প্ল্যানটা। অর্থাৎ এর জন্য একটা সাহায্যের দরকার। সেই সাহায্যটা করতে পারেন সার্কুলেশন ডেস্কে বসা লাইব্রেরিয়ান। আমার ধারণা স্যার অজয়বাবু ওকে টাকাপয়সা দিয়ে হাত করিয়ে এই বন্দোবস্তটা করেছিলেন। এটা স্যার চমৎকার চলছিল। লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকও বুঝতে পারছিলেন কী হচ্ছে! মুশকিল হল, উনি লোভ সামলাতে পারেননি… সুন্দরী মেয়েকে লেখা প্রেমপত্র আর সুন্দরীর লেখা উত্তর… এগুলো কি না পড়ে পারা যায় স্যার? একটু সুযোগ পেলেই উনিও লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠিগুলো পড়তে শুরু করলেন। মিস শ্রীময়ীর একটা চিঠির মধ্যেই অজয় পেয়ে গেলেন শুভংকরবাবুকে ঘায়েল করার মারণাস্ত্র আর ওই লাইেব্রিয়ানমশাই পেয়ে গেলেন তাঁর ব্ল্যাকমেলের হাতিয়ার।”
“মারণাস্ত্র!”
“হ্যাঁ স্যার, ওই ডায়েরি চুরির ব্যাপারটা। ওই ব্যাপারটা স্যার আমাকে একটু ভাবিয়েছিল। ছিঁচকে চোর ওটা চুরি করবে না, ওর মূল্যই বুঝবে না। একজন গবেষক তার মূল্য বুঝলেও, সেটা বিক্রি করবার যে মার্কেট, সেখানে সহজে ঢুকতে পারবে না। আপনাদের মনে আছে কিনা, আমরা যখন ডায়েরি দুটো দেখতে গিয়েছিলাম, তখন শুনেছিলাম দুটোই অদৃশ্য হয় লাইব্রেরির একজন ট্রাস্টি সেগুলো দেখে যাবার পরে। ট্রাস্টিদের একজন হলেন শুভংকরবাবু আর একমাত্র তিনিই গত দু-সপ্তাহের মধ্যে বেশ কয়েকবার লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন অবশ্য মিস শ্রীময়ীকে পাহারা দেবার জন্য। ব্যবসার সূত্রে বিদেশে ওঁর অনেক কানেকশন আছে। উনি কি ডায়েরি-দুটো সরাতে পারেন? অসম্ভব নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা মিস শ্রীময়ীর চোখে পড়ে যাওয়াটাও খুবই সম্ভব। তারপর যখন মিসেস কুণ্ডুর কাছে শুনলাম লাইব্রেরি থেকে ফিরে বাবা আর মেয়ের তুমুল ঝগড়ার কথা, চিন্তা শুরু করলাম তার কারণটা কী হতে পারে? যে মেয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছে, হঠাৎ কী এমন ঘটল, যার জন্য সেই মেয়ে বাবার ঘরে ঢুকে চেঁচামেচি করবে? আর মেয়ের সঙ্গে ঝগড়ার কারণটা শুভংকরবাবুই বা কেন স্ত্রীকে জানাবেন না? একটু স্ট্রেঞ্জ স্যার, তাই না? তাহলে কি এর সঙ্গে ডায়েরি-চুরির ব্যাপারটাই জড়িত?”
“কিন্তু শ্রীময়ী অজয়কে এটা জানাল কেন?”
“শুধু অনুমান করতে পারি স্যার। লাইব্রেরিতে বাবার এই আচরণে মিস শ্রীময়ী মনে মনে দগ্ধ হচ্ছিলেন। এমনিতেই শুভংকরবাবুর ওপর মিস শ্রীময়ীর রাগ ছিল, এখন তাতে ঘৃতাহুতি পড়ল… যে-বাবা বংশ-মর্যাদা রক্ষার জন্য অজয়বাবুর সঙ্গে ওঁর বিয়ে আটকাচ্ছেন, তিনি কিনা আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে অম্লান বদনে ডায়েরি চুরি করছেন! কী শকিং! কাকে এটা জানাবেন, প্রিয়তমকে ছাড়া? কিন্তু ফলটা হল শুধু অজয়বাবু না, আমাদের লাইব্রেরিয়ানমশাইও এই গোপন তথ্যটি জেনে গেলেন। যে চিঠিতে শুভংকরবাবুকে ভয় দেখানো হয়েছিল, সেটা মেয়ের পুরোনো প্রেমের কথা ভাবি শ্বশুরবাড়িতে জানানো নিয়ে নয়, ডায়েরি চুরির ব্যাপারটা পুলিশকে জানিয়ে দেওয়া নিয়ে। এই কারণেই চিঠিটা স্যার শুভংকরবাবু আমার হাতে দেননি, পুলিশকেও ব্যাপারটা জানাতে চাননি। বুঝলেন স্যার, কী বলছি?”
“এ পর্যন্ত বুঝলাম, কিন্তু তারপর?”
“তারপর স্যার, শুভংকরবাবু আমাদের উপর ভরসা রাখতে পারলেন না। সোজা অজয়বাবুর দ্বারস্থ হলেন। ওঁর প্রথমে ধারণা হয়েছিল, হয়তো অজয়বাবুই মিস শ্রীময়ীকে পাওয়ার জন্য ওঁকে ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু অজয়বাবুর সঙ্গে কথা বলে বুঝলেন, সেটা নয়। অজয়বাবুও সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলেন, আর কে ব্যাপারটা জানতে পারে, বিশেষ করে চিঠির একটা জেরক্স কপি যখন শুভংকরবাবু পেয়েছেন। এঁদের মধ্যে নিশ্চয় একটা চুক্তি হল, অজয়বাবু লোকটিকে খতম করবেন আর শুভংকরবাবু তাঁর কন্যাকে অজয়বাবুর হাতে সমর্পণ করবেন।”
“মাই গড,” আমি বললাম।
“কিন্তু অজয় এ প্রস্তাবে রাজি হল কেন? সে তো এমনিতেই শ্রীময়ীকে পাচ্ছিল!” প্রমথ প্রশ্ন তুলল।
“অর্থ অনর্থম স্যার। আমার ধারণা টাকার লোভে। মিস শ্রীময়ীকে হয়তো পেতেন, কিন্তু শ্বশুরের সম্পত্তি পেতেন না। এক্ষেত্রে দুটোই মিলল। যেমন শ্বশুর, তেমনি জামাই স্যার। অজয়বাবু এলেমদার লোক, আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপের সঙ্গে কানেকশন ওঁর নিশ্চয়। ছিল। সেই সূত্রেই অ্যানথ্রক্সের মতো ভয়াবহ পাউডার উনি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। লাইব্রেরিয়ানকে মারাটা কোনো প্রব্লেমই নয়। মনে আছে স্যার, আমেরিকাতে একজন পোস্টম্যান আর এক মহিলা চিঠিতে অ্যানথ্রক্স থাকায় মারা গিয়েছিলেন?”
“তা আর নেই!”
অজয়বাবু নিশ্চয় সেটা জানতেন। খামের ভেতরে অ্যানথ্রক্স পাউডার ছড়িয়ে, যে-রকম সাধারণত লেখেন তেমন একটা চিঠি সেখানে ঢোকালেন। এসব করতে গিয়ে নিজে যাতে মারা না যান, তার জন্য সব রকম সতর্কতা নিশ্চয় নিয়েছিলেন। এবার বইয়ের মধ্যে খামটা পুরে, বইটা সাবধানে লাইব্রেরিতে ফেরত দিয়ে এলেন, যেমন সাধারণত দিয়ে আসেন। তবে এই বইটা লিস্ট-এর বাইরে ছিল, যাতে মিস শ্রীময়ী এটা না নেন। এও হতে পারে স্যার, ইতিমধ্যেই অজয়বাবু সম্পর্কে শুভংকরবাবুর সঙ্গে মিস শ্রীময়ীর সমঝোতা হয়ে গেছে। সুতরাং মিস শ্রীময়ী লাইব্রেরিতে আর যাবেন না। অজয়বাবু জানতেন লাইব্রেরিয়ান বইটা খুলে খাম থেকে চিঠি বার করে পড়বেন। আর সঙ্গে সঙ্গে অ্যানথ্রক্সের জীবননাশী জীবাণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে গিয়ে ঢুকবে। যার ফল দিন কয়েকের মধ্যেই অবধারিত মৃত্যু।”
“শুভংকরবাবু লন্ডন যাচ্ছিলেন কেন?”
“ওই ডায়েরি দুটো বেচতে স্যার। কোটি কোটি টাকার ব্যাপার। যে পার্টি কিনবে, তারা পরখ করে দেখবে। তাই নিজেই নিয়ে যাচ্ছিলেন।”
আমি বললাম, “ভাগ্যিস, প্রমথ বইটা এনেছিল, নইলে আপনার অ্যানথ্রক্সের থিওরিটা ভেস্তে যেত।”
“এখনও যেতে পারে স্যার। লাইব্রেরি থেকে যারা অসুস্থ হয়েছেন হাসপাতালে তাঁদের আলাদা করে রেখে পরীক্ষা করানোর কথা পুলিশকে বলেছি। পরীক্ষার রেজাল্ট না পাওয়া পর্যন্ত এখনও থিওরি। অজয়বাবুর বাড়িও সার্চ করা হচ্ছে– স্পেশাল টাস্কফোর্স দিয়ে।”
“যে গল্প আজ শোনালেন, তাতে ভাবছি কাগজের চিঠি পড়াই ছেড়ে দেব। এখন থেকে স্রেফ, ইমেল।” প্রমথ গম্ভীরভাবে বলল।
