তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

নয়

রিসিভার রেখে কর্নেল বললেন–জয়ন্ত! পোশাক বদলে নাও। এখনই বেরুতে হবে। আমিও রেডি হয়ে নিই।

 

তখনই উঠে পড়লুম। যে ঘরে আমার ডেরা, সেখানে গিয়ে পোশাক বদলে নিলাম। জ্যাকেটের ভেতর-পকেটে গুলিভরা রিভলভারটাও সাবধানে রাখলাম।

 

ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি, হালদারমশাই বিরসবদনে বসে আছেন। কিন্তু গোঁফের ডগার কাপন দেখে বোঝা যাচ্ছে, উনি প্রচণ্ড উত্তেজিত। আমাকে দেখে বললেন–প্রব্লেম হইল গিয়া, তখন আমি পাগলার বেশ ধরছি। সেই ট্যাক্সিটারে ফলো করবার উপায় ছিল না। বড়ো রাস্তায় ট্যাক্সি পাইতাম। কিন্তু পাগলেরে কোনো ট্যাক্সিড্রাইভার পাত্তা দিত, কন জয়ন্তবাবু?

 

বললাম–ঠিক বলেছেন। আপনার কিছু করার ছিল না।

 

–ছিল। একটুকখান উপায় ছিল। আমারই ভুল।

 

–কীসের ভুল?

 

–বাড়ি ফিরিয়্যাই ক্যাপটেন সিংহরে ফোন করা উচিত ছিল আমার। সাড়া নিশ্চয় পাইতাম না। কাজেই সোজা ওনার বাড়ি যাওয়াই উচিত ছিল। গোয়েন্দাপ্রবর শ্বাস ছেড়ে ফের বললেন–তা না কইরা স্নান করছিলাম। খাওয়ায় মন দিছিলাম। তারপর কর্নেলস্যারেরে ফোন করছিলাম। ক্যান যে এমন মতিভ্রম হইল কে জানে? চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। এমন ভুল কখনও হয় নাই।

 

কর্নেল সেজেগুজে বেরিয়ে এলেন। বললেন–আপনি ভুল করেননি হালদারমশাই! আপনি ঘুড়ির সুতো ঢিলে করে দিয়েছেন। ক্যাপটেন সিংহকে কিডন্যাপ করার যথেচ্ছ সুযোগ পেয়েছে হরিবাবু। এর ফলে বরং আমাদেরই সুবিধে হয়েছে। চলুন। বেরুনো যাক। ষষ্ঠী! দরজা বন্ধ কর। কোনও ফোন এলে বলবি, আমি বেরিয়েছি। কখন ফিরব, কিছু ঠিক নেই। …

 

গাড়ির পিছনের সিটে হালদারমশাই আর কর্নেল বসলেন। দু-পাশের জানালার কাচ তুলে দিলেন কর্নেল। বুঝলাম, উনি সারাপথ আত্মগোপন করে থাকতে চান। বড়ো রাস্তায় পৌঁছে আমার অস্বস্তি ফিরে এল। ব্যাকভিউ মিররে লক্ষ্য রাখলাম, কোনও লাল মারুতি আমাদের অনুসরণ করছে। কি না।

 

কর্নেল নির্দেশে ড্রাইভ করছিলাম। রাস্তায় লাল মারুতি পিছনে বা সামনে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। একবার ভাবলাম, অস্ত্রটা বাঁ পাশে সিটের ওপর ফেলে রাখি। কিন্তু কার্নেল কী বলবেন ভেবে তা করলাম না। শীতের বিকেল দ্রুত রং হারিয়ে ফেলছে। ল্যান্সডাউন রোডের মোড়ে জ্যামে কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেলাম। তারপর ক্রমশ রাস্তার দু-ধারে আলো জ্বলে উঠল।

 

পিছনে কর্নেলকে বলতে শুনলাম–সেই গলিটা চিনতে পারবেন তো?

 

হালদারমশাই বললেন–পারব। মুখস্থ হইয়া গেছে। এখনও কিছুটা দুর আছে। হাজরা রোড পার হইয়া।

 

কর্নেল একটু ঝুঁকে আমার প্রায় কানের কাছে বললেন-হাজরা রোডের মোড়ে গাড়ি একটু সময় দাঁড় করাবে। ওখানে লালবাজার থেকে ডিটেকটিভ এস আই নরেশ ধরের জিপ আর বালিগঞ্জ থানার পুলিশের গাড়ি অপেক্ষা করার কথা। বরং স্পিড কমিয়ে বাঁদিকে ঘেঁষে চলল।

 

একটু হেসে বললাম–আপনার বাইনোকুলার আনা উচিত ছিল।

 

কর্নেল কিছু বললেন না। হালদারমশাই বললেন–কী যে কন জয়ন্তবাবু! চারিদিকে আলোর প্রচণ্ড ছটা। বাইনোকুলারের কাম না।

 

মিনিট দশেক পরে দেখতে পেলাম, হাজরা রোডের মোড়ের এদিকে ফুটপাত ঘেঁষে পুলিশের। একটা জিপ আর একটা কালো ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। নরেশবাবু জিপের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। আমার ফিয়াট গাড়ির নম্বর ওঁর জানা।

 

কাছাকাছি গিয়ে একবার হর্ন বাজালাম। নরেশবাবু তাকালেন। তারপর হাতের মৃদু ইশারায় এগিয়ে যেতে বললেন। একটু পরে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে এগিয়ে চললাম। ব্যাকভিউ মিররে লক্ষ্য করলাম, নরেশবাবুর বাহিনী একটু দূর থেকে আমাদের অনুসরণ করছে।

 

মিনিট পাঁচেক পরে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন-সামনে বাঁদিকের গলি জয়ন্তবাবু!

 

গলিটা সংকীর্ণ। দুটো গাড়ি যাতায়াত করতে পারে। রিশ, ঠ্যালাগাড়ি, মানুষজনের ভিড় পেরিয়ে হালদারমশাইয়ের নির্দেশে আবার বাঁদিকে ঘুরলাম। কর্নেল বললেন-জয়ন্ত! গাড়িটা ওই বটতলার মন্দিরের কাছে রাখো।

 

এই গলিতে তত আলো নেই। দুধারে ঠাসাঠাসি উঁচু বাড়ি। ফুটপাত বলতে কিছু নেই। তবে এখানে তত ভিড় নেই। শুধু মন্দিরের চত্বরে বসে বিহারের দেহাতি লোকেরা ঢোল কত্তাল তুমুল বাজিয়ে ধর্মসঙ্গীত গাইছে। পাঁচটা বাজতেই এখন রাতের ছায়া। সেই ছায়াকে অবশ্য দুধারের বাড়ির জানালা থেকে আসা আলোর ছটা এলোমেলো করে ফেলেছে। গলিটা ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। পথচারীদের কোনও কৌতূহল এখুন লক্ষ্য করছিলাম না।

 

বেরিয়ে গাড়ি লক করে দেখলাম, কর্নেলও হালদারমশাই একটা বাড়ির দরজার সামনে পৌঁছে গেছেন। তাদের একটু তফাতে পুলিশের গাড়ি দুটো দাঁড়িয়ে আছে। শুধু নরেশবাবু জিপ থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এটাই তা হলে সেই হরিবাবুর বাড়ি? বাড়িটা দোতলা। একপাশে দরজা বা গেট। দোতলা বা একতলায় কোনও আলো নেই। কর্নেল চাপা স্বরে বললেন–হালদারমশাই! ব্যাড লাক। দরজার বাইরে তালা আঁটা।

 

হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন-মাগো পুলিশ হেল্প করুক। তালা ভাইঙ্গা বাড়ি সার্চ করুম! আপনি নরেশবাবুরে ডাকেন।

 

নরেশবাবু ততক্ষণে এসে গেছেন। একটু হেসে বললেন–ব্ল্যাংক সার্চ ওয়ারেন্ট এনেছি। নাম, বাড়ির নাম্বার, গলির নাম বসিয়ে নিলেই চলবে। তবে আপাতত তার দরকার দেখছি না। তালা ভেঙেই ঢুকতে হবে।

 

পুলিশভ্যান থেকে একজন উর্দিপরা অফিসার এবং সশস্ত্র কনস্টেবল বাহিনী ডেকে আনলেন নরেশবাবু। এবার পথচারীরা থমকে দাঁড়াচ্ছে দেখতে পেলাম। নরেশবাবুর জিপ থেকে সাদা পোশাকের পাঁচজন পুলিশ নেমে এল। তাদের হাতে বেঁটে লাঠি। তারা ভিড় হটাতে ব্যস্ত হল। দু-পাশের বাড়ির জানালা আর ব্যালকনি থেকে লোকেরা ব্যাপারটা দেখছে।

 

এক ভদ্রলোক নরেশবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন-হরিবাবুকে খুঁজছেন কি?

 

-হ্যাঁ। আপনি কে?

 

আজ্ঞে স্যার, আমার নাম অমরেন্দ্র বিশ্বাস। পাশের বাড়িটা আমার।

 

–তা হলে তো হরিবাবুকে আপনি চেনেন?

 

–চিনি মানে, তত কিছু না। উনি বেরোন কদাচিৎ। ওঁর সারভ্যান্ট ভগতকেও একটু-আধটু চিনি। হরিবাবু বাড়ি বেচে চলে যাবেন শুনেছি। প্রায়ই খদ্দের আসে দেখেছি। কী জানি কী ব্যাপার বুঝি না। তা স্যার আপনারা…

 

নরেশবাবু এবার পুলিশি মেজাজে বললেন-বাড়ির পাশে একজন ক্রিমিন্যাল থাকত। আর আপনারা কিছু টের পেতেন না?

 

অমরেন্দ্র বিশ্বাস করজোড়ে বললেন–আমি ছাপোষা মানুষ স্যার! কী করে জানব পাড়ার কোন লোক ক্রিমিন্যাল?

 

-হরিবাবু তালা এঁটে কখন কেটে পড়েছে, জানেন?

 

ভদ্রলোক বললেন-না স্যার! আমি লক্ষ্য করিনি কিছু। অফিস থেকে ফিরে একটা নার্সিং হোমে গিয়েছিলাম। আমার ভগ্নীপতির হার্টের অসুখ। সেখান থেকে আসছি।

 

অন্য এক ভদ্রলোক একটু তফাতে পানের দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে সহাস্যে বললেন-হরিবাবুকে অ্যারেস্ট করতে এসেছেন তো? একদিন আপনারা আসবেন, তা জানতাম।

 

নরেশবাবু বললেন–আপনি কে? কোথায় থাকেন?

 

–আজ্ঞে, আমি অ্যাডভোকেট নরেন্দ্রকুমার সেনের ক্লার্ক পরিতোষ মণ্ডল। আমার স্যারেরও হরিবাবু সম্পর্কে সন্দেহ ছিল। বাড়িটা এক বিধবা মহিলার। বছর সাত আট আগে তার কাছে হরিবাবু কিনেছিল, পুরো টাকা দেয়নি। আমার স্যার সেই মহিলাকে হেল্প করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হরিবাবুর হাতে অনেক গুণ্ডামস্তান আছে। আজকাল কী অবস্থা হয়েছে তা তো আপনাদের চেয়ে বেশি কে বুঝবে স্যার? হ্যাঁ! তালা ভেঙে সার্চ করুন আপনারা। পাড়ার লোকরা খুশি হবে স্যার। লোকটা চোরাকারবারি বলে গুজব রটে গেছে।

 

কিছুক্ষণ পরে দুজন কনস্টেবল একটা ছোট্ট লোহার রডের সাহায্যে তালাটা ভেঙে ফেলল। বুঝলাম, এ-কাজে দুজনেই বেশ দক্ষ। এইসমর হালদারমশাই চাপাস্বরে নরেশবাবুকে বললেন পিছনের দিকে বাড়ির কোনও দরজা আছে কিনা কে জানে!

 

নরেশবাবু একটু হেসে বললেন–ভাববেন না মি. হালদার! আমাদের লোকজনের সেদিকেও নজর আছে।

 

দরজার ভিতরে সংকীর্ণ একটা করিডর। বাঁদিকে একটা তিনতলা বানি। জানালায়-জানালায় অজস্র মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। ডান দিকে হরিবাবুর বাড়ি এবং নিচের তলায় একটা দরজা। সেই দরজাতেও তালা আঁটা ছিল। তালা ভেঙে একটা ঘরে ঢুকে নরেশবাবু সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। পুরোনো সোফাসেট, জীর্ণ একটা চেয়ার আর টেবিল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এ ছাড়া ঘরটাতে কিছুই নেই। এই ঘরের কোণ থেকে দোতলার সিঁড়ি উঠে গেছে। কর্নেল নিচের তলার পাশের ঘরে উঁকি দিয়ে বললেন, -এই ঘরে ভগত থাকে মনে হচ্ছে।

 

একটা খাটিয়া। মশারি ঝুলছে দেয়ালের কোণে। বিছানা ছাড়া কেরোসিন কুকার, অ্যালুমিনি য়ামের হাঁড়ি, ঘটি আর বাসন-কোসন ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। কর্নেল বিছানা তুলে দেখলেন। তলায় কিছু নেই।

 

দোতলাতেও দুটো ঘর। প্রথম ঘরটার দরজার তালা ভাঙতে হল। এই ঘরে ভগতের খাটের মতোই খাট ছাড়া আর কোনও জিনিস নেই। পাশের ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন নরেশবাবু। একটা সেকেলে খাটে বিছানা পাতা আছে। দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে। একটা মাত্র কাঠের আলমারিতে অগোছাল বই ঠাসা। সব বই ধর্মসংক্রান্ত। পুবের জানালার ওপরে একটা তাকে সিদ্ধিদাতা গণেশের সিঁদুররাঙা মূর্তি। কিছু শুকনো ফুল পড়ে আছে।

 

প্রথমে পুলিশি ধরনে সার্চ শুরু হল। কর্নেল খাটের তলায় উঁকি দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুচকি হেসে বললেন–হালদারমশাই! হরিবাবু মনে হচ্ছে শুধু ব্রিফকেস আর ছড়ি নিয়ে কেটে পড়েছে। এমন কিছু রেখে যায়নি, যাতে তাকে খুঁজে বের করার সুত্র পাওয়া যায়।

 

বালিগঞ্জ থানার অফিসার নরেশবাবুকে বললেন–আমার ধারণা, হরিবাবু এখানে মাঝে মাঝে এসে থাকত। স্থায়ীভাবে কেউ এ-বাড়িতে বসবাস করলে আরও আসবাব বা জিনিসপত্র পাওয়া যেত।

 

বিছানার ওপর চাদরটা তত পরিষ্কার নয়। বালিশ দুটোও যেমন-তেমন। তলার পুরোনোনা তোশক নিচে ফেলে দুজন কনস্টেবল নারকেল ছোবড়ার গদি টেনে এনে একপাশে নামাল। নরেশবাবু বালিশ, তোশক আর গদি খোঁজাখুঁজি করে হাসলেন। লোকটা যে-ই হোক, খুব ধুরন্ধর। নিজের এতটুকু চিহ্ন রেখে যায়নি। কর্নেলসায়েব! আপনার কী ধারণা?

 

কর্নেল বললেন–আপনার সঙ্গে আমি একমত। চলুন। বেরুনো যাক…

 

বালিগঞ্জ থানার অফিসারের নির্দেশে দোতলার দরজায় একজন কনস্টেবল হাতকড়া এঁটে দিল। আমরা নেমে এলাম।

 

গলিতে ততক্ষণে মানুষের ভিড় হটাচ্ছে পুলিশ। নরেশবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে কর্নেল বললেন- বাকিটা পুলিশের হাতে ছেড়ে দিয়ে এবার আমরা কেটে পড়ি জয়ন্ত! আসুন হালদারমশাই!…

 

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ষষ্ঠীচরণের তৈরি সুস্বাদু কফি খেতে খেতে বললাম–একটা ব্যাপার আমাকে অবাক করেছে কর্নেল! সত্যি! ভীষণ অবাক হয়েছি।

 

কর্নেল বললেন- কী ব্যাপারে?

 

রীতিমতো হইহল্লা করে পাড়ায় শোরগোল তুলে হরিবাবুর বাড়িতে হানা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন কেন? এতে তো হরিবাবু খুব সতর্ক হয়ে যাবে। ওর চ্যালাদের কেউ-কেউ নিশ্চয় ঘটনাস্থলে ছিল।

 

হালদারমশাই বললেন- জয়ন্তবাবু ঠিক কইছেন। আমিও কিছু বুঝলাম না। দুয়ারে তালা আটকানো ছিল। তার মানে বাড়ির ভিতরে হরিবাবু নাই। আমার ক্লায়েন্টরে কিডন্যাপ কইরা নিজের বাড়িতে সে রাখবে ক্যান?

 

কর্নেল চুপচাপ কফি খাওয়ার পর চুরুট ধরালেন। তারপর একটু হেসে বললেন-হ্যাঁ! রীতিমতো শো-বিজনেস বলা যায়। তোমাদের কথা ঠিক। কিন্তু এর দরকার ছিল।

 

গোয়েন্দাপ্রবর বললে–ক্যান কর্নেলস্যার?

 

–হরিবাবুর সঠিক ডেরা যে ওই বাড়িটা নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল। ওখানে সে সবসময় থাকত না, তা ওর ঘরগুলো দেখেও বোঝা গেল। অথচ হালদারমশাই তাকে ফিটফাট ফুলবাবুর বেশে দেখেছেন। যে ওইরকম ফুলবাবুটি সেজে বেরোয়, ঘরে তার অন্তত একটু আভাস মিলবে। কিন্তু মিলল না। ঘরগুলো একেবারে সাদামাটা। চালচুলোহীন লোকের আস্তানা। সোফাসেটও ছেঁড়াখোঁড়া।

 

বললাম–ক্যাপটেন সিংহকে কিডন্যাপ করার পর সে এসে ঘরের দামি বা দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে গেছে হয়তো।

 

কর্নেল হাসলেন। হরিবাবু নিজে না এসে তার চ্যালা ভগতকে সেসব জিনিস নিয়ে যেতে বলে থাকবে। কারণ হালদারমশাই দেখেছিলেন, বাড়িতে ভগতকে রেখে সে সুশীলার সঙ্গে ট্যাক্সিতে চেপে চলে যায়। যাই হোক, এবার হালদারমশাইকে একটা কাজ করতে হবে।

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন কন কর্নেলস্যার!

 

–আপনি সুশীলার বাড়ি চলে যান। খোঁজ নিন সে বাড়িতে আছে কি না। বাড়িতে থাকলে তার সঙ্গে কথা বলবেন না। আমাকে কোনও জায়গা থেকে টেলিফোনে শুধু জানিয়ে দেবেন। আর ট্যাক্সির নাম্বারটা এই কাগজে লিখে দিন।

 

কর্নেলকে নাম্বারটা লিখে দিয়ে হালদারমশাই বললেন–আপনি চাইলে ক্যাপটেন সিংহের নেমকার্ড আপনারে দিমু।

 

–দিন। সুশীলার ঠিকানাটাও বরং লিখে দিন। …

 

গোয়েন্দাপ্রবর অভ্যাসমতো সবেগে বেরিয়ে গেলেন। তারপর কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। একটু পরে সাড়া এলে তিনি বললেন-কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। ..মি. সোম! আপনাকে অজয়েন্দ্র রায়ের সম্পর্ক…ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ। ওটা কি কাকেও দিয়ে আমার কাছে পাঠাবেন?…ইউ আর ওয়েলকাম মি. সোম! আমার সৌভাগ্য…হ্যাঁ। আমি আছি। অন্তত এ-রাতে কোথাও বেরুচ্ছি না। শীতের রাতে এই বৃদ্ধ অর্কিড-পাখি-প্রজাপতি-ক্যাকটাসের জন্য কোথাও হানা দিতে অক্ষম মি. সোম। … ঠিক আছে। আসুন। ….

 

কর্নেল রিসিভার রেখে সোফায় হেলান দিলেন। বললাম–মি. সোম নামটা আমার শোনা মনে হচ্ছে।

 

কর্নেল চোখ বুজে বললেন–শিপিং কর্পোরেশনের কলকাতা ব্রাঞ্চের ম্যানেজার মিঃ অসীম সোম।

 

-উনি থাকেন কোথায়?

 

–ক্যামাক স্ট্রিটে কোম্পানির বাংলোবাড়িতে…

 

প্রাধ আধঘণ্টা পরে ডোরবেল বাজল। তারপর একজন স্মার্ট চেহারার প্রৌঢ় ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে বললেন-পথে একটু দেরি হয়ে গেল। পার্ক স্ট্রিটে জ্যাম। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট আসবার কথা কাগজে পড়েছিলাম। সম্ভবত তার জন্যই পার্ক স্ট্রিটের ওই অবস্থা।

 

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে তার করমর্দন করে বসালেন। তারপর বললেন–অনেকদিন পরে আপনি এলেন!

 

মি. সোম একটা ব্রিফকেস খুলতে খুলতে বললেন–হ্যাঁ। প্রায় এক বছর। গত নভেম্বরে এসে আপনাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিলাম।

 

কর্নেল হাসলেন। –ও কিছু না। আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডনরা অনেকেই আমার পাল্লায় পড়ে কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে। শাহিন খান এখন নাকি দুবাইয়ে ঘাঁটি করেছে। আপনাদের আর সে বিরক্ত করে না আশা করি?

 

–না। এই নিন আপনার অজয়েন্দু রায়ের পুরো ডেটা। এই খামে সব কাগজপত্র, মাদার কম্পিউটার থেকে বের করতে একটু সময় লেগেছে, এই যা।

 

কর্নেল একটা লম্বা পেটমোটা খাম নিলেন এবং বললেন–আগে কফি। এটা পরে খুলব। খুঁটিয়ে পড়ার পর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে পরে আপনাকে রিং করব। ষষ্ঠী! শিগগির কফি চাই। হা–আলাপ করে দিই।

 

মি. সোম হাসলেন। দরকার হবে না। জয়ন্তবাবুকে আমি দেখেই চিনেছি। উনি হয়তো আমাকে ভুলে গেছেন।

 

সঙ্গে সঙ্গে খিদিরপুর ডকে শিপিং কর্পোরেশনের একটা জাহাজভর্তি মাল চুরি যাওয়ার সাংঘাতিক ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। মি. সোমের সঙ্গে করমর্দন করে বললাম–দুঃখিত মি. সোম। ভুলে গিয়েছিলাম আপনার কথা।

 

-তাতে কী? আপনারা সাংবাদিক। নিত্যনতুন ঘটনা এসে আপনাদের ব্যস্ত রাখে।

 

এইসময় টেলিফোন বাজল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন–হ্যাঁ। বলুন মি. হাটি। .ও মাই গড! কোথায় ছিল ট্যাক্সিটা?..রাস্তা থেকে ছিটকে পড়েছিল, আপনি শিয়োর?…মেয়েটিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন?…সুশীলা দাসী?…মাথার পিছনে গুলি-কী অদ্ভুত! ঠিক দীপনারায়ণবাবুর মতো…হা, ট্যাক্সিড্রাইভারের পালানোরই কথা। …সকালে দেখা হবে। রাখছি। …

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *