টাঁড়বাঘোয়া (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
কিন্তু না গেলেই বোধহয় ভাল হত। সিল্কের পাঞ্জাবীসুদ্ধ টিকায়েতের বাঁ হাতটি কনুই থেকে পরিষ্কার করে কাটা। পুরুষ্টু বাঁ হাতে হাতঘড়িটা বাঁধা আছে তখনও। সোনার সাইমা ঘড়ি একটা, কড়ে আঙুলে পলার আংটি। আঙুলগুলো দেখে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি। হাতটা এমন করে দাঁত দিয়ে কেটেছে যে দেখলে মনে হয় কোনও মেশিনে কাটা হয়েছে বুঝি।
টেড একটু এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল। তারপর আমাকে ইশারা করে নিজেও এগিয়ে গেল। টাঁড়বাঘোয়া এবং বাঘিনীর পায়ের দাগ দেখে দেখে আমরা খুব সাবধানে টিলার উল্টোদিকে এলাম, রাইফেলের সেফটি ক্যাচে আঙুল রেখে।
ঐখানে পৌঁছেই আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। আলাদা হওয়ার আগে ঘড়িতে দেখলাম সকাল সাতটা বেজেছে। টেড ফিসফিস করে বলল, সন্ধ্যে হবে সাতটাতে। আমাদের হাতে বারো ঘন্টা করে সময়। আমরা একা একাই খুঁজব বাঘদের। যদি দেখা না হয়, সাতটার সময় কুয়োতলায় পৌঁছব আমরা। কুয়োতলাই রাঁদেভু-পয়েন্ট আমাদের।
তারপর বলল, গুড লাক্। গুড হান্টিং।
আমি হাত তুলে ওকে শুভেচ্ছা জানালাম।
তারপর আমরা ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলাম।
টেড গেল পুবে। আমি পশ্চিমে।
একটু এগোতেই একটা গেম-ট্র্যাকের দেখা পেলাম। জঙ্গলে জানোয়ার-চলা সঁড়ি পথ। নানান জানোয়ারের পায়ের দাগ আছে সেখানে। পথটা বেরিয়েছে একটা ফাঁকা টাঁড়মতো জায়গা থেকে। পথটার গোড়াতেই কতগুলো কুঁচফলের ঝোঁপের গায়ে দেখলাম রক্ত লেগে আছে। তখনও শুকিয়ে যায়নি রক্ত। ঝোঁপের এমন জায়গাতে লেগে আছে রক্ত যে মনে হয় বাঘের বুক বা পেট সেই ঝোপে ঘষা খেয়েছে। বুক হলে বাঘিনীর বুক, পেট হলে টাঁড়বাঘোয়ার পেট। কারণ রক্ত বেশ উঁচুতেই লেগে আছে।
প্রথমটা কিছুক্ষণ রাইফেল সামনে করে আমি হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে এগোলাম। যাতে নীচে ভাল করে নজর করতে পারি। নাঃ, কোথাও কিছু নেই। তবে পথে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে রয়েছে।
পথটা এঁকেবেঁকে গেছে। কাছেই, সামনে একটা ঝরনা আছে। তার ঝরঝর শব্দ শুনতে পাচ্ছি। খুবই সাবধানে এগোচ্ছি। ঐ অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘামে গা এবং হাতের পাতা ভিজে গেছে আমার। হয়তো ভয়েও।
মিনিট পনেরো ঐভাবে চলার পর ঝরনাটার কাছে এসে গেলাম। তখন আরও সাবধান হলাম।
এক হাত যাচ্ছি আমি পাঁচ মিনিটে, প্রায় শুয়ে শুয়েই, যেন একটা শুকনো পাতাও না মাড়ানোর শব্দ হয়, পথের পাশের ঝোঁপঝাড়ে যেন একটুও কাঁপন না লাগে। পা ও হাত ফেলার আওয়াজ যেন নিজের কানেও না শোনা যায়।
একটা বাঁক আছে সামনে। বাঁকটার কাছে পৌঁছে আমি চুপ করে শুয়ে পড়লাম। কান খাড়া করে শুনবার চেষ্টা করলাম, কিছু শুনতে পাই কি না।
নাঃ, কোনও শব্দই নেই। ঝরনার ঝরঝর শব্দ ছাড়া। ঝরনার ঐ পারে একটা নীল আর লালে মেশা ছোট্ট মাছরাঙা পাখি নদীর শুকনো বুকে একটা ভেসে আসা কাঠের উপর বসে জলের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে কী যেন দেখছিল আর মাঝে মাঝে আশ্চর্য দুঃখ দুঃখ গলায় ডাকছিল। হঠাৎ পাখিটা যেন ভীষণ ভয় পেয়ে সোজা উপরে উড়ে গেল জোরে ডাকতে ডাকতে।
আমাকে কি ও দেখতে পেল? নাঃ। আমাকে দেখতে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। তবে? কেন ও ভয় পেয়ে উড়ল? এই কথা ভাবছি, ঠিক এমন সময় জলের মধ্যে ছপ ছপ শব্দ শুনতে পেলাম। কোনও জানোয়ার জল মাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে! কী জানোয়ার জানি না, কিন্তু জানোয়ারটা বাঁ দিক থেকে ডানদিকে হেঁটে আসছে। যেভাবে শব্দটা এগিয়ে আসছে আর থামছে, তাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাছরাঙা পাখিটা যেখানে বসেছিল তার সামনে এসে পৌঁছবে জানোয়ারটা। কী জানোয়ার? হরিণ? শম্বর? শুয়োর? বাঘ?
আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললাম।
রাইফেলটাকে এগিয়ে দিয়ে কাঁধে তুলে নিলাম। কাঁধে তুলে নিয়ে মাছরাঙাটা যে ভেসে-আসা কাঠে বসেছিল, সেই কাঠে নিশানা নিলাম। যে জানোয়ারই হোক সে ঐ কাঠের সামনে এলেই আমি তাকে গুলি করতে পারব। কিন্তু সেফটি-ক্যাচ অন করিনি। ঝরনাটা এত কাছে, আমার থেকে দশ হাত দূরেও নয়; এখানে সেফটি-ক্যাচ অন করলেই শব্দ হবে। তাই এখন আর উপায় নেই।
খুব শক্ত করে ধরে রাখলাম রাইফেলটাকে, আর ডান হাতের বুড়ো আঙুল রাখলাম সেফটি-ক্যাচের উপরে, যাতে গুলি করতে হলে সেফটি-ক্যাচ ঠেলে সঙ্গে সঙ্গে নিশানা না-সরিয়েও গুলি করতে পারি।
আওয়াজটা আরও একবার হল। জানোয়ারটা আরও কিছুটা এসে থমকে দাঁড়াল। তারপরই জলে চাক চাক চাক চাক শব্দ শুনতে পেলাম।
আমার হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে এল। বাঘ!
এমন জোর শব্দ করে বাঘ ছাড়া আর কোনও জানোয়ার জল খায় না। রাইফেলের ব্যারেলের রিয়ার-সাইট আর ফ্রন্ট-সাইটের মধ্যে দিয়ে চেয়ে, স্মল অফ দ্য বাটের সঙ্গে গাল ছুঁইয়ে দু চোখ খুলে আমি সেই দিকে তাকিয়ে রইলাম।
জল-খাওয়া সেরে জানোয়ারটা আবার চলতে শুরু করল। এসে গেছে; এসে গেল।
তার পরমুহূর্তেই দেখলাম একটা বিরাট বাঘ। তার বুকে একটা প্রকাণ্ড রক্তাক্ত ক্ষত, সেখান থেকে তখনও রক্ত বেরিয়ে আসছে, বড় বড় হলদে সাদা লোমের সঙ্গে রক্ত আর জল মাখামাখি হয়ে গেছে।
বাঘটার মাথাটা যেই কাঠটার কাছে এল, আমি সেফটি-ক্যাচ অন্ করেই ট্রিগারে হাত দিলাম। এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দে বাঘটা আমার দিকে মুখ ফেরাল। আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে আমি ট্রিগারে চাপ দিলাম। গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ঝপাং করে জল ছিটিয়ে বাঘটা জলে পড়ে গেল। তাড়তাড়ি বোল্ট খুলে চেম্বারে নতুন গুলি এনে আমি সেই দিকে তাকালাম। দেখলাম, বাঘটা মাছরাঙা পাখিটা যেই কাঠে বসে ছিল, সেই কাঠেই হেলান দিয়ে যেন বসে পড়েছে। আর তার কান আর মাথার মাঝামাঝি জায়গা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।
বাঘটার বসার ধরন দেখেই বুঝলাম যে ও আর উঠবে না। কিন্তু তবুও, যেহেতু আমি শুয়ে ছিলাম এবং যদি বাঘ চার্জ করে তবে হঠাৎ ঐ শোয়া অবস্থা থেকে ওঠা সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে, তাই কোনওরকম ঝুঁকি না নিয়ে আমি বাঘের বুক লক্ষ্য করে আরেকটি গুলি করলাম।
বাঘটা যেন একটু দুলে উঠেই ঝুলে গেল। যেন আর একটু আরাম করে কাঠটাতে হেলান দিল। ঠিক সেই সময় ঝরনার বাঁ দিক থেকে অন্য একটি বাঘ প্রচণ্ড গর্জন করে উঠল। গর্জনের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে উপরের ডালপালা ভেঙে তাকে খুব জোরে উল্টোদিকে দৌড়ে যেতে শুনলাম।
আমার আর টেড-এর একটি সাংকেতিক ডাক ছিল জঙ্গলের। বৌ-কথা-কও পাখির ডাক। বাঘটা মরে গেছে জেনে এবং অন্য বাঘটা কাছাকাছি আছে জেনে আমি উঠে সঁড়িপথ দিয়ে জঙ্গলের বাইরে এলাম। এসে ফাঁকা টাঁড়ে দাঁড়ালাম।
এই জায়গাটা ফাঁকা। যেদিক দিয়েই আক্রমণ আসুক না কেন, দেখা যাবে। তাই বাঁ হাতে রাইফেলটা ধরে ডানহাত মুখের কাছে নিয়ে আমি বার বার বৌ-কথা-কও পাখির ডাক ডাকতে লাগলাম।
আমি জানতাম যে, এত অল্প সময়ে টেড খুব বেশি দূরে যায়নি। তাছাড়া সে আমার রাইফেলের পরপর দুটি গুলির আওয়াজ নিশ্চয়ই শুনেছে। তাই টেড অল্পক্ষণেরই মধ্যেই সাড়া দেবে।
অনেকবার ডেকেও আমি যখন টেডের সাড়া পেলাম না তখন চিন্তাতে পড়লাম। বাঘটা এদিকেই আছে। টেড মিছিমিছি পুবে ঘুরে মরবে। টেড এলে আমরা দুজনে একসঙ্গে ঝরনার ওপারে চলে-যাওয়া বাঘটাকে খুঁজলে তাড়াতাড়ি তার দেখা পেতে পারি।
মিনিট দশেক ওখানে দাঁড়িয়েও যখন টেডের সাড়া পেলাম না তখন মনে হল যে, টেড নিশ্চয়ই অনেক দূরে চলে গেছে।
একাই যাব ভেবে যখন ঐদিকে ফিরে চলে যাচ্ছি। ঠিক সেই সময় জঙ্গলের মধ্যে খুব জোরে কিছু একটা দৌড়ে আসছে শুনতে পেলাম। তারপরই আমার প্রায় কানের কাছেই গুম করে টেডের ভারী রাইফেলের আওয়াজ শুনলাম। এবং আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে টেড ডানদিকের জঙ্গল থেকে এক লাফে ছিটকে বেরিয়েই দৌড়ে এল আমার দিকে। ওর চোখে মুখে ভয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী হল?
টেড জবাব দেওয়ার আগেই দেখি টেড যেখান থেকে জঙ্গল ফুঁড়ে বেরোল, সেইখান দিয়ে একটা প্রকাণ্ড শঙ্খচূড় সাপ জঙ্গল লণ্ডভণ্ড করে ফণা আর লেজ দিয়ে ঝোঁপঝাড় ভাঙতে ভাঙতে আছড়াতে আছড়াতে টাঁড়ে বেরিয়ে এল।
আমি আমার রাইফেলটা টেড-এর হাতে দিয়ে একটা লম্বা শুকনো কাঠ তুলে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে পরপর কয়েকটা বাড়ি মেরে তাকে ঠাণ্ডা করলাম।
রাইফেল দিয়ে সাপ মারার অসুবিধে অনেক। সাপ মারতে শটগান সবচেয়ে ভাল।
টেড মাটিতে বসে পড়ে হাঁপাচ্ছিল।
আমি ফিরে এসে বললাম, এত বড় শঙ্খচূড় কেউই বোধহয় দেখেনি কখনও।
টেড বলল, তোর গুলির শব্দ শুনেই আমি এদিকে দৌড়ে আসছিলাম। তারপর তুই যখন বৌ-কথা-কও পাখির ডাক দিলি, তখন দাঁড়িয়ে পড়ে সেই ডাকের উত্তর দেব এমন সময় পেছনে শব্দ শুনে দেখি ঐ সাপটা ঝাঁটি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আমার পেছনে দৌড়ে আসছে।
তক্ষুনি গুলি করতে পারতাম। কিন্তু আমরা মানুষখেকো বাঘের পেছনে এসেছি, তাই গুলির আওয়াজে পাছে তারা সরে যায়, তাইই ভাবলাম, গুলি না করে দৌড়ে তোর কাছে এসে পৌঁছে যাই।
উরে ব্বাস্! একটু হলেই আজ খতম হয়ে গেছিলাম। শেষকালে যখন প্রায় আমাকে জঙ্গলের কিনারে এসে ধরে ফেলল এবং লেজের উপর সমস্ত শরীরটাকে তুলে আমার মাথা সমান লম্বা হয়ে উঠে একেবারে মাথায় ছোবল দেওয়ার উপক্রম করল তখন রাইফেলের ব্যারেলটা প্রায় তার ফণাতেই ছুঁইয়ে, গুলি করেই লাফিয়ে টাঁড়ে এসে পড়লাম। গুলিটা ফণাতে না লাগলে এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছিলাম আমি।
তারপর দম নিয়ে টেড বলল, তুই গুলি করেছিলি কেন? ডাকলিই বা কেন আমাকে? কিসে গুলি করলি?
আমি বললাম, টাঁড়বাঘোয়া এবং তার সঙ্গিনী দুজনেই এদিকেই আছে। তোকে উল্টোদিক থেকে ডেকে আনবার জন্য শীষ দিয়েছিলাম।
ও বলল, তা তো বুঝলাম। কিন্তু গুলি করলি কী দেখে?
বললাম, বাঘ দেখে!
টেড লাফিয়ে উঠল। বাঘ? কোথায়?
মিস্ করেছি। পালিয়ে গেছে। এবারে চল, ওদিকেই যাই।
মিস্ করলি? ঈসস।
তারপর বলল, চল্, এগোই। ঘড়িতে তখন আটটা বেজেছে। তখনও সময় আছে হাতে অনেক।
টেডকে সঙ্গে নিয়ে সুঁড়িপথ ধরে যখন আমি ঝরনাটার পাশে এসে দাঁড়ালাম তখন বাঘটাকে দেখেই টেড রাইফেল তুলল।
আমি হাত দিয়ে ওর রাইফেলের ব্যারেল নামিয়ে দিয়ে বললাম, বেচারা অনেকক্ষণ হল মরে গেছে।
বাঘটার থাবার দিকে তাকিয়ে টেড চিৎকার করে উঠল, টাঁড়বাঘোয়া, টাঁড়বাঘোয়া বলে।
তারপর আমার কান ধরে খুব করে মলে দিয়ে বলল, মিথ্যেবাদী, লায়ার, ইডিয়ট।
বলেই, আমাকে জড়িয়ে ধরল দুহাতে।
আমি ওকে শান্ত করে ফিফিস্ করে বললাম, অন্য বাঘটা সামনেই গেছে। চুপ করে যা। চল্ এখন এগোই।
ঝরনার পাশ দিয়েই আমরা উজানে চললাম। কিছুটা গিয়েই, যেখান থেকে বাঘিনীর আওয়াজ শুনেছিলাম সেখানে পৌঁছেই আমরা থমকে দাঁড়ালাম।
ঝরনার পারে, বালির মধ্যে একটা বড় কালো পাথরের উপর থেকে টিকায়েত আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। টিকায়েত মানে, টিকায়েতের মুণ্ডটা।
কেউ যেন দা দিয়ে কেটে পাথরে বসিয়ে রেখেছে সেটাকে। চোখ দুটো খোলা-ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
আমি ভয়ে টেডকে জড়িয়ে ধরলাম।
টেড বমি করার মতো একটা শব্দ করল।
তারপর আমাকে হাত ধরে নিয়ে এগোল সামনে। একটু সামনেই নদীর পারে টিকায়েতের শরীরের দুটি অংশ দুদিকে পড়ে আছে। রক্ত, আর বালি আর সাদা লাল হাড়ের টুকরোতে, কাল বিকেলের ঘোড়ায় চড়া লম্বা-চওড়া লোকটার কথা ভেবেই ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল আমাদের।
ঝরনাটা থেকে আমরা এখন প্রায় মাইলখানেক চলে এসেছি। এখানে জঙ্গল খুবই ঘন। এই সকালেও মনে হচ্ছে গভীর রাত। এমনই অন্ধকার ভিতরটা।
পুরো পথই আমরা ভিজে জায়গায় বাঘের পায়ের দাগ দেখে এসেছি। কিন্তু রক্ত কোথাও দেখিনি। আশ্চর্য! এখন নীচে এত ঝোঁপঝাড় এবং ঘন ঘাস য়ে পায়ের দাগ দেখা যাচ্ছে না। জায়গাটা একটা দোলা মতো। একটা বড় পাহাড়ী নদী বয়ে গেছে ছায়ায় ছায়ায়। তাই এত গাছ পাতা ঘাস এই গরমের সময়েও। নদীতে জলও রয়েছে এক হাঁটু মতো। স্রোত আছে।
টেড ফিসফিস করে বলল, একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। বুদ্ধিও ভাঁজতে হবে,–এই বলে একটা বড় পাথরের উপর বসল টেড। আমিও বসলাম। কিন্তু উল্টো দিকে মুখ করে।
টেড বলল, এখন সাড়ে দশটা বাজে। এখানে আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে বসি। ভাল করে শোন্ কোনও আওয়াজ শোনা যায় কি না। মিছিমিছি হেঁটে লাভ কী?
ওয়াটার বটল থেকে একটু জল খেলাম আমরা।
টেড পকেট থেকে একটা চকোলেট বের করে আমার পেছনদিকে হাত ঘুরিয়ে আধখানা এগিয়ে দিল।
ঐ জায়গাটার একদিকে ঘন বাঁশের জঙ্গল। বেশির ভাগই খড়হি বাঁশ। দমকে দমকে হাওয়া উঠছে বনের মধ্যে আর বাঁশবনে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। কটকট করে আওয়াজ হচ্ছে বাঁশবন থেকে।
মিনিট দশেক ওখানে বসে থাকার পর হঠাৎ আমার ডানদিক থেকে ও টেডের বাঁদিকের ঘন জঙ্গল থেকে হুপ-হাপ করে হনুমানের ডাক শোনা গেল। মনে হল, কিছু একটা দেখে ওরা খুব উত্তেজিত হয়েছে। হনুমানগুলো আমর যেখানে বসেছিলাম, তার থেকে বড় জোর দুশো গজ দূরে ছিল।
আমরা কান খাড়া করে সেই দিকে চেয়ে রইলাম। দেখলাম, হনুমানগুলো ডালে ডালে ঝাঁপাঝাঁপি করতে করতে ক্রমশ আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে ঘন-সবুজ পাতার চাঁদোয়ার মধ্যে মধ্যে।
আমি আর টেড তাড়াতাড়ি কিন্তু নিঃশব্দে বড় পাথরটা থেকে নেমে দুটো পাথরের আড়ালে গুঁড়ি মেরে বসলাম। একটু পরই কোনও জানোয়ারকে ঝোঁপঝাড়ের ভিতরে আসতে শোনা গেল। এই জায়গাটা ভিজে থাকায়, শুকনো পাতা মাড়ানোর খচমচ্ আওয়াজ হচ্ছিল না।
একটু পরই সেই আওয়াজটা থেমে গেল। তারপর আবার আড়ালে আড়ালে আওয়াজটা ফিরে গেল। হনুমানগুলোও এতক্ষণ টিকিট-না-কেটে র্যাম্পার্টে চড়ে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখার আনন্দে মশগুল সাপোটারদের মতো চেঁচামেচি লাফালাফি করছিল। গাছের মাথায় মাথায় ঐ আওয়াজটা থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরাও চুপচাপ হয়ে গেল।
টেড বলল বাঘ কিংবা চিতা।
আমি বললাম, এ অঞ্চলে চিতা একটিও ছিল না, বলছিল বস্তীর লোকেরা।
তাহলে তাই হবে।
বাঘ হলে টাঁড়বাঘোয়ার সঙ্গিনী।
টেড বলল, সঙ্গিনী কিন্তু আহত হয়নি। তুই লক্ষ করেছিলি যে এতখানি পথের সব জায়গায় পায়ের চিহ্ন থাকলেও রক্ত কোথাওই আমরা দেখিনি।
তা ঠিক।
টিকায়েতের সঙ্গের লোকদুটো ভুলও দেখে থাকতে পারে, আমি বললাম।
টেড বলল, যদি এই বাঘিনী মানুষখেকো না হয় তবে তাকে কি আমাদের এখুনি মারা উচিত? মাচায় উঠে টিকায়েতকে মেরেছিল–তা স্বাভাবিক বাঘেও মারে। ওটা রাগের মার। যে গুলি করেছে বা ভয় দেখিয়েছে; তাকে শাস্তি দেওয়া আর মানুষখেকো হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়।
আমি বললাম, তা ঠিক। কিন্তু পরে যদি দেখা যায় যে এই বাঘিনীও মানুষখেকো?
তাহলে আমরা আবার ফিরে আসব। মহুয়ামিলনে পলাশবনার লোকেরা ইচ্ছে করলেই যেতে পারে। তাছাড়া কলকাতার ঠিকানাও ওদের দিয়ে রাখব। ওরা খবর দিলেই আসব। কিন্তু আন্দাজে মানুষখেকো ভেবে বাঘিনীকে মারা আমার মনঃপূত নয়।
তারপর টেড আবার বলল, একটা কাজ কর। তুই জোরে গলা ছেড়ে গান গা। আমি জোরে জোরে কথা বলব। যদি মানুষখেকো হয় তবে তাকে আমরা জানান দিয়ে এখান থেকে ফিরে চলি চল্। মানুষখেকো হলে, সে হয়তো আমাদের পিছু নেবে।
আমি বললাম, পেট তো ভর্তি। পিছু নাও নিতে পারে। তাছাড়া, গুলির শব্দ শোনার পরও দিনের বেলায় আমাদের পিছু পিছু যাবেই যে, এমন কি কথা আছে?
টেড বলল, সেটাও ঠিক। তবুও আমার মন সায় দিচ্ছে না। চল্ আমরা ফিরে যাই আজ। তাছাড়া, টিকায়েতের শরীরের অংশ আর মাথাটা নিয়ে যেতে হবে সঙ্গে করে। দাহ করার জন্যে।
আমি বললাম, তা ঠিক! কিন্তু কী করে নেব? আমার যে ভাবতেই ভয় করছে।
টেড বলল, ওর ছেলেটার কথা ভাব। শরীরের কোনও অংশ না নিয়ে। গেলে তো তোদের হিন্দুমতে মৃতের সৎকারই হবে না।
তা ঠিক।
টেড বলল, কী হল? গান গা।
আমি জোরে গাইতে লাগলাম :
“ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা,
তাহার মাঝে আছে যে দেশ, সকল দেশের সেরা।
স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে যে, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।”
টেড সঙ্গে শীষ দিতে লাগল। আমরা কাঁধের উপর দিয়ে পেছনে নজর রাখতে রাখতে আস্তে আস্তে ফিরতে লাগলাম।
আধ মাইল যাওয়ার পরও কোনও কিছু যে আমাদের পিছু নিয়েছে এমন বোঝা গেল না।
আরও আধ মাইল চলার পরও না।
টেড বলল, দ্যাখ আমার মন বলছে বাঘটা ভাল। দেখিস। ও রাগের মাথায় একটা খুন করে ফেললেও আর কখনও মানুষ খাবে না।
আমরা যখন টাঁড়বাঘোয়ার কাছে এসে পৌঁছলাম তখন দেখে আশ্চর্য হলাম যে তার গায়ে একটি তীরও যে লেগেছে এমন দাগ নেই। টেড আর আমি আমাদের জামা খুলে তার মধ্যে করে টিকায়েতের মাথা আর পেটের কিছুটা অংশ মুড়ে নিলাম। এবারেও টিকায়েতের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, যেন টিকায়েত নীরব চোখে বলছে, বাজীতে হার হয়েছে আমার। ছেলেমানুষ তোমরাই জিতে গেলে!
টেড বলল, যদি তীর লাগার কথাটা মিথ্যা হয়, তাহলে বাঘিনী যে টিকায়েতের মাংস খেয়েছে, আধখানা মুখে করে নিয়ে গেছে এও মিথ্যা হতে পারে। চল্ ফিরে চল্। গ্রামের লোকেদের সঙ্গে পরামর্শ করি। যদি আর কোনও অত্যাচার হয় গ্রামে তখন তো আমরা আছিই।
বেচারা টাঁড়বাঘোয়া!
তার কোনও দোষ ছিল না। সে এ গ্রামের প্রহরী ছিল। যদি না টিকায়েত তার থাবাটাকেই ভেঙে দিত তাহলে সে বেচারার মানুষের ক্ষতি করার কোনও প্রয়োজনই ছিল না।
এখন দুপুর দেড়টা বাজে। খিদে পেয়েছে প্রচণ্ড। গ্রামে ফিরে টাঁড়বাঘোয়াকে নিয়ে আসার, চামড়া ছাড়াবার বন্দোবস্ত করতে হবে, টিকায়েতের সৎকারের সময় সামনে থাকতে হবে; এখন অনেক কাজ আমাদের।
আমি বললাম, চল টেড, যাওয়া যাক এবার।
টেড বলল, যাবি যাবি। মানুষখেকো বাঘ মারলি তুই। এই জায়গাটাতে একটু বসে থাকি। মিনিট দশেক জিরিয়ে নিই।
তারপর বলল, কী করে মারলি বল তো শুনি।
আমি বললাম, মানুষখেকো যদি টিকায়েতকে না মারত তাহলে আজ সত্যিই আনন্দের দিন ছিল। মনটা এত খারাপ হয়ে গেছে যে, কিছুই আর ভাল লাগছে না।
টেড বলল, যা ঘটে গেছে এবং যে-সম্বন্ধে আমাদের কিছুমাত্র করণীয় নেই; সেই আলোচনা করে লাভ কী? বল্ তো তুই, কী করে মারলি, কোথায় দেখলি ওকে? গুলি খেয়ে কী করল টাঁড়বাঘোয়া?
টেড টাঁড়বাঘোয়ার দিকে মুখ করে নদীর বালিতে বসেছিল। আর আমি টাঁড়বাঘোয়ার পাশে একটা পাথরে।
টেড-এর কথার উত্তরে আমি কথা বলব, ঠিক এমন সময় হঠাৎ আমার চোখ পড়ল টেড-এর চোখে। টেড-এর চোখ দুটো সজাগ হয়ে উঠেছে, কান উৎকর্ণ, টেড আমার পেছনের জঙ্গলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেন কী দেখছে।
আমি ওর দিকে আবার তাকাতেই ও ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলল আমাকে।
