টাঁড়বাঘোয়া (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
পলাশবনা গাঁয়ের কাছাকাছি আসতেই আমাদের ঘন্টা আড়াই লেগে গেল। ইচ্ছে করেই মহুয়ামিলনে খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রাম নিয়ে আমরা রাত দেড়টা নাগাদ ওখান থেকে বেরিয়েছিলাম যাতে ভোর ভোর এসে পলাশবনাতে পৌঁছতে পারি।
পথের এক জায়গায় একটা বেশ উঁচু এবং গভীর জঙ্গলে ভরা পাহাড় আছে। তার গায়ে ন্যাড়া চ্যাটালো কালো পাথরের চাঙ্গড়। অনেকগুলো বড় বড় গুহা। সবে ওঠা একটু চাঁদের আলোয় গরমের শেষ রাতের হাওয়ায় দোলাদুলি করা ডাল-পালার ছায়ায় পাহাড়টাকে ভুতুড়ে ভুতুড়ে লাগছিল।
টিরিদাদা এখানে এসেই আমাদের একেবারে গায়ে গায়ে সেঁটে চলতে লাগল।
টেড বলল, কি হল টিরিদাদা? ভয় পেও না। আমারও মন বলছে, এখানে ভূত নিশ্চয়ই আছে।
টিরিদাদা প্রচণ্ড রেগে উঠল। এবং সঙ্গের দু-একজন ওর সঙ্গে তাল মেলাল।
বলল, রাতের বেলায় বনপাহাড়ে ওসব দেবতাদের নিয়ে রসিকতা একেবারেই করতে নেই। ওরা ঐসব দেবতাদের ভাল করেই জানে, তাই ভয় পায়। বন্দুক দিয়ে তো আর ওঁদের মারা যাবে না।
টেড চুপ করে গেল।
হঠাৎ আমাদের সামনের অল্প চাঁদের আলোয় মাখামাখি ভুতুড়ে পাহাড়তলী থেকে একটা আওয়াজ উঠল উঁ-আঁউ। পাহাড়ের আনাচ-কানাচ, উপত্যকা সব সেই আওয়াজে গঙ্গম করে উঠল।
লোকগুলো সব ঘন হয়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াল আমাদের পেছনে।
বুড়ো সর্দার ফিসফিস্ করে বলল, টাঁড়বাঘোয়া।
সে বাঘের গলার আওয়াজ এত জোরালো এবং এমন গম্ভীর এবং যার আওয়াজ শুনেই তলপেটের কাছে ব্যথা ব্যথা লাগছিল, তাই তার চেহারাটা ঠিক কীরকম হবে তা অনুমান করে আমি মোটেই খুশি হলাম না।
টেড কিছুক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে যেদিক থেকে শব্দটা এসেছিল সেই দিকে চেয়ে থেকে বিড় বিড় করে কী যেন বলল।
বাঘটা আরেকবার ডাকল।
একটু পরেই একটা কোটরা হরিণ আর একদল মেয়ে শম্বর জঙ্গলের ডানদিকে দৌড়তে দৌড়তে ডাকতে ডাকতে চলে গেল। তাতে বুঝলাম, বাঘটা আমাদের পথ থেকে অনেক ডানদিকে সরে যাচ্ছে।
মশালগুলো জোর করে নিয়ে ওরা আবার এগোলো। আমি আর টেড রাইফেলের ম্যাগাজিনে গুলি লোড করে নিলাম। উঁচু-নিচু পথে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে চেম্বারে গুলি থাকলে, তাই চেম্বার ফাঁকাই রাখলাম। ভাবলাম, বাঘ কী অত সহজে দেখা দেবে আমাদের।
যখন আমরা পলাশবনা গ্রামের সীমানায় কাঁটাগাছের বেড়া দেওয়া অনেক ক্ষেত-খামার আর জটাজুট-সম্বলিত বড় অশ্বত্থগাছের নীচের বনদেবতার থান পেরিয়ে গ্রামের দিকে এগোতে লাগলাম তখন একজনের বাড়ির উঠোনের কাঠের বেড়ায় বসে, গলা-ফুলিয়ে একটা সাদা বড়কা মোরগ কঁকর-কঁ-অঅ করে ডেকে উঠে রাত পোহানোর খবর পৌঁছে দিল দিকে দিকে।
পলাশবনাতে পৌঁছতেই খবর পাওয়া গেল যে, টিকায়েত খুবই চটে গেছে, গাঁয়ের লোকদের উপরে। সে বাঘ মেরে দেবে বলা সত্ত্বেও তাকে না-বলে-কয়ে তারা যে আমাদের কাছে পৌঁছে গেছে তার সম্মানে লেগেছিল। টিকায়েত খবর দিয়ে রেখেছিল যে, তার সঙ্গে দেখা না করে যেন আমরা জঙ্গলে না-ঢুকি। কারণ, এই গ্রামের মালিক সেইই।
এই টিকায়েতেরও অন্য সব টিকায়েতেরই মতো অনেক জমিজমা, গাই-বলদ, মোয়, প্রজা, লেঠেল ইত্যাদি ছিল। সাধারণ গরীব মানুষদের উপর এদের প্রতিপত্তি ও অত্যাচার যাঁরা নিজের চোখে না দেখেছেন তাঁরা বিশ্বাসও করতে পারবেন না।
যাইই হোক, টেড আমার দিকে তাকাল, আমি টেডের দিকে। আগে টিকায়েতকেই মারব, না বাঘ মারব ঠিক করে উঠতে পারলাম না আমরা। টিকায়েত একজন লেঠেল পাঠিয়েছিল। সাড়ে ছ’ফিট লম্বা সেই পালোয়ান সাত ফিট লম্বা লাঠি হাতে যখন শুনল যে, আমাদের এখন টিকায়েতের সঙ্গে দেখা করার একেবারেই সময় নেই; আমরা আগে বুড়ির মৃতদেহের খোঁজেই যাচ্ছি; তখন খুবই অবাক চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে চলে গেল সে, টিকায়েতকে আমাদের দুঃসাহসের খবরটা দিতে।
টিরিদাদার উপর মালপত্রের জিম্মা দিয়ে, বুড়ির ঘর কিংবা অন্য যে কোনও খোলামেলা একটা ঘর গ্রামের এক প্রান্তে যাতে পাওয়া যায় তার খোঁজ করতে বলে দুজন স্থানীয় যুবকের সঙ্গে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
প্রথমেই এলাম কুয়োতলায়। বুড়ির মাটির কলসীটা ভেঙে পড়ে ছিল তখনও। যুবক দুটি বুড়িকে মাটিতে টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ দেখে দেখে এগোতে লাগল। প্রথমে অবশ্য একটুও দাগ ছিল না টেনে নেওয়ার। বুড়ির ঘাড় আর কাঁধ কামড়ে ধরে প্রকাণ্ড বাঘটা প্রায় তাকে শূন্যে তুলেই নিয়ে গেছে অনেকখানি।
বাঘটা যে কত বড় তা তার পায়ের দাগ দেখেই বোঝা গেল। দশ ফিটের মতো হবে বলে মনে হল আমার ও টেডের। বেশিও হতে পারে। অবশ্য, ওভার দ্য কাৰ্ভস্ মাপলে। বাঘের পায়ের চিহ্ন দেখে আমারও রীতিমত ভয়ই করতে লাগল। টেড-এরও নিশ্চয়ই করছিল। কিন্তু কে যে বেশি ভয় পেয়েছে তা তক্ষুনি বোঝা গেল না। পরে নিশ্চয়ই বোঝা যাবে।
শাল জঙ্গলের মধ্যে কিছুদূর নিয়ে গিয়েই বুড়ির সাদা থানটাকে খুলে ফেলেছে বাঘ। রক্তমাখা, তখন সপসপে কাপড়টা ওরা তুলে নিল। দেখা গেল, বাঘটা বুড়িকে কতগুলো পুটুস আর আনারসের মতো দেখতে মোরব্বার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে গেছে। সেই জায়গাটা পেরিয়ে এক টুকরো হরজাই জঙ্গলে ঢুকে, সেই জঙ্গলও পেরিয়ে একটা কালো পাথরের বড় টিলার পাশে, কতগুলো ঢেওটা, টেটর আর পলাশ গাছের মধ্যে ঢুকে নীচের পুটুস আর শালের চারার মধ্যে মৃতদেহটাকে লুকিয়ে রেখেছে।
প্রায় সবটাই খেয়ে গেছে। আছে শুধু একটা পা আর মাথার খুলি। চুলগুলো ছিঁড়ে ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। দেখেই আমাদের গা-গোলাতে লাগল। সেইই প্রথম মানুষখেকো বাঘে-খাওয়া মানুষের মড়ি দেখলাম আমি আর টেড।
চারদিক দেখে-টেখে মনে হল, বাঘ এখন কাছাকাছি নেই। নেই যে তা বোঝা গেল পাখিদের এবং নানা জানোয়ারের ব্যবহারে। কাছাকাছি মাচা বাঁধার মতো কোন গাছও দেখলাম না ভাল। পলাশ গাছগুলো ছোট ছোট ছিল, তাছাড়া ঐ গাছগুলোর নীচের দিকটা ন্যাড়া হয়। গরমের সময় তো পাতাও থাকে না মোটে। শুধুই ফুল। লালে লাল হয়ে আছে চারিদিক। ঢেওটা ও ঢোটরগুলোও তথৈবচ। তার চেয়ে ঐ বড় কালো টিলাটাতে বসলে কেমন হয় সে কথা আমি আর টেড সেই দিকে চেয়ে চুপ করে ভাবছি, ঠিক সেই সময়ই একটা শম্বর ভীষণ ভয় পেয়ে ডাকতে ডাকতে টিলাটার পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে আমাদের একেবারে পাশ দিয়ে জোরে দৌড়ে চলে গেল খুরে খুরে পাথরের ঠকাঠক্ শব্দ করে।
ব্যাপারটা কী যখন তা বোঝার চেষ্টা করছি তখনই গোটা দশেক জংলী কুকুর টিলাটার পাশ থেকে দৌড়ে বেরিয়েই শম্বরটাকে লাফাতে লাফাতে ধাওয়া করে নিয়ে চলে গেল।
রাজকোঁয়া, রাজকোঁয়া! বলে চেঁচিয়ে উঠল সঙ্গের যুবক দুটি।
টেড ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে চুপ করতে বলল ওদের।
তারপর ওদের গাছে উঠে, বসে থাকতে বলে, আমি আর টেড দুজনে দুদিকে চলে গেলাম, টিলাটাকে ভাল করে দেখার জন্যে। রাতে কোথায় বসা যায়, এবং আদৌ বসা যায় কি-না তা খুব সাবধানে খতিয়ে দেখতে হবে আমাদের। সন্ধের পর এই কালো পাথরের টিলার চারপাশে কালো কালো ছায়া পাথরের মতোই চেপে বসবে। কোনওদিকেই কিছু দেখা যাবে না। এবং বাঘ যদি আসে তবে শুধু শব্দ শুনেই তার গতিবিধি ঠিক করতে হবে। জায়গাটা এমন যে, চাঁদ উঠলেও ছায়ারা দলে আরও ভারী হবে।
আমরা দুজনে টিলার দুদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। সাবধানে। রাইফেলের সেফটি-ক্যাচে আঙুল রেখে। এখন আর একে অন্যকে দেখা যাচ্ছে না। কতগুলো ছাতার পাখি ডাকছে। উড়ছে। বসছে। বুড়ির দুর্গন্ধ শরীরেও একরাশ পোকা উড়ছে বসছে। একঝাঁক টিয়া হঠাৎ কাঁচ্ কাঁচ্ করে ডাকতে ডাকতে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল গ্রীষ্ম-সকালের শান্ত সমাহিত ভাবটা একেবারে ছিঁড়ে-খুঁড়ে দিয়ে।
আমি আস্তে আস্তে উঠতে লাগলাম টিলাটার উপরে। টেডকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। ও নিশ্চয়ই অন্য দিক দিয়ে উঠেছে। টিলাটার উপরে একটা গুহা। এবং সেই গুহার ঠিক সামনে পাথরের উপর বাঘের ময়লা পড়ে আছে। দেখতে পেলাম। খুব বেশি পুরনো নয়। তিন চার দিনের হতে পারে, বেশি হলে।
তবে কি টাঁড়বাঘোয়া এখন এই গুহার মধ্যেই বিশ্রাম নিচ্ছে?
গুহার মুখে একটুও ধুলো বালি নেই যে, বাঘের পায়ের দাগ পড়েছে কি না তা দেখব! রাইফেলটা লক করে সেফটি-ক্যাচটা তুলে রাখলাম। প্রয়োজন হলে মুহূর্তের মধ্যে যাতে সেফটি-ক্যাচকে ঠেলে সরানো যেতে পারে।
গুহার মুখের একপাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি, গুহার মধ্যে ঢাকা ঠিক হবে কি হবে না; হঠাৎ এমন সময় মনে হল আমার পিছন থেকে কে যেন আমাকে এক-দৃষ্টিতে দেখছে। প্রত্যেক শিকারীই জানেন যে, বনে-জঙ্গলে এরকম মনে হয়। একেই হয়তো বলে শিকারীদের সিক্সথ-সে। মনে হতেই, ঘুরে দাঁড়ালাম আমি রাইফেলসুদ্ধ।
ঘুরে দাঁড়ালাম বটে কিন্তু দেরী হয়ে গেল।
হয়তো আমাদের দুজনেরই। একটা প্রকাণ্ড হলুদরঙা বাঘের দাড়ি-গোঁফওয়ালা মুখ মুহূর্তের জন্যে গোল কালো পাথরের উপর দেখা দিয়েই অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি পাথর টপকিয়ে টপকিয়ে ঐদিকে এগোতে লাগলাম টিলাটাকে ঘুরে ঘুরে। বাঘটা যেখানে ছিল সেখান থেকে একলাফেই আমার ঘাড়ে পড়তে পারত। কিন্তু আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে বাঘের কাছে পৌঁছতে হলে অনেকখানি ঘুরেই যেতে হবে অনেকগুলো পাথর ডিঙ্গিয়ে ও গহ্বর এড়িয়ে।
হঠাৎই আমার টেড-এর কথা মনে হল।
আমি শিকারের আইন ভেঙ্গে চেঁচিয়ে বললাম, টেড, ওয়াচ-আউট। দ্য ম্যানইটার ইজ এ্যারাউন্ড।
টেড সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল দূর থেকে, আই নো।
যখন বাঘটার জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছি রাইফেল বাগিয়ে, তখন টিলার পশ্চিমদিকের ঝাঁটি জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে একটা ভারী জানোয়ারের দ্রুত চলে যাওয়ার আওয়াজ শোনা গেল ঝরে-পড়া শুকনো পাতা মচমচিয়ে।
সেইদিকে চেয়ে আওয়াজটা লক্ষ্য করতে লাগলাম। দূরে যেতে যেতে আওয়াজটা একটা ছায়াচ্ছন্ন পাহাড়ী নালার মধ্যে গিয়ে মিলিয়ে গেল।
আমি নেমে এলাম সাবধানে টিলা থেকে। গাছে-বসা একটা লোককে জিগগেস করলাম, টিলার উপর থেকে গুহার মুখটি সে দেখতে পাচ্ছে কি না?
সে বলল, পাচ্ছে।
আমি বললাম, গুহার ঐ মুখটার দিকে নজর রাখতে। কিছু দেখলেই যেন চেঁচিয়ে আমাকে বলে।
ও বলল, আচ্ছা।
নেমে দেখি, টেড খুব মনোযোগ দিয়ে মাটিতে কী যেন দেখছে।
আমি যেতেই, আমাকে দেখাল। টিলার নীচে, মাটিতে এক জোড়া বাঘের পায়ের দাগ। টাঁড়বাঘোয়ার দাগ এবং একটি বাঘিনীর পায়ের দাগ। বাঘিনী টাঁড়বাঘঘায়ার চেয়ে ছোট।
এরপর আমরা দুজনে সাবধানে টিলাটার চারদিকে একবার ঘুরলাম আরও দাগ আছে কি না দেখার জন্যে। টিলার পশ্চিম দিকে, যেদিকে আওয়াজটা মিলিয়ে যেতে শুনেছিলাম একটু আগে, সেই দিকে মাটিতে অনেক পায়ের দাগ দেখলাম বাঘ ও বাঘিনীর। তিন-চারদিন আগে বৃষ্টি হয়েছিল, নরম মাটিতে দাগগুলো স্পষ্ট।
আমরা মহা সমস্যায় পড়লাম।
ফিরে এলাম আবার বুড়ির দেহ যেখানে পড়েছিল সেখানে। যে-লোকটা গুহার মুখে পাহারা দিচ্ছিল তাকে বসিয়ে রেখে, গাছের অন্য লোকটাকে নেমে আসতে বলল টেড।
সে নামলে, তাকে দ্বিতীয় বাঘের কথা জিজ্ঞেস করল ও।
ওরা তো আকাশ থেকে পড়ল। গ্রামের যত লোক নানান কাজে প্রত্যেকদিন জঙ্গলে আসছে তাদের মধ্যে কেউই এক টাঁড়বাঘোয়া ছাড়া অন্য কোনও বাঘকে দেখেনি। পায়ের দাগও দেখেনি। এই এলমে আশে-পাশে কখনও কোনও চিতাবাঘও দেখেনি ওরা। হয়তো তার কারণ টাঁড়বাঘোয়াই। তার মতো পাহারাদার থাকতে কোনও চিতাবাঘেরই এখানে এসে ওস্তাদী করতে সাহস হয়নি।
ইতিমধ্যে চারজন লোক হৈ হৈ করতে করতে দড়ি আর একটা চৌপাই মাথায় করে এসে হাজির। তারা বলল যে, তারা টিকায়েতের লোক। টিকায়েত রাতে এখানে মাচা করে বসবে, তাই মাচা বাঁধতে পাঠিয়েছে।
তারপর আমাদের দিকে ফিরে বলল, আপনারা কিন্তু বাঘের গায়ে গুলি-টুলি করবেন না। করমচারীয়া আপনাদের খুঁজছে। আপনাদের খুবই বিপদ হবে টিকায়েতের কথা না শুনলে।
করমচারীয়া, জানা কথা, টিকায়েতেরই লোক। কিন্তু সে আমাদের খুঁজলেই তো আমরা যাব না তার কাছে।
টেড বলল, টিকায়েতের পোষা বাঁদর নই আমরা।
আমাদের সঙ্গে যুবক দুটি টেড-এর কথাতে হেসে উঠল।
তাতে টিকায়েতের লোকগুলো আরও চটে গেল।
গাছের উপর থেকে অন্য লোকটিও নীচে নেমে এলে আমি টিকায়েতের লোকদের বললাম, মাচা কোথায় বাঁধবে?
ওরা বলল, যে গাছে সুবিধে মতো বাঁধা যায়।
কিন্তু টিকায়েতকে গিয়ে বলো যে, এখানে দু দুটো বাঘ আছে। একনলা শটগান নিয়ে তার পক্ষে এই দু দুটি বাঘের মোকাবিলা করা কি সম্ভব হবে? তার প্রাণের ভয় নেই?
টেড বলল, টিকায়েতকে গিয়ে বলো, আমরা সকলে মিলেই একসঙ্গে বাঘ দুটি মারার চেষ্টা করি।
ওরা ভাবল, ঠাট্টা করছি।
তখন টেড তাদের নিয়ে গিয়ে পায়ের দাগ দেখাল ভাল করে, বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা কী!
দুটো বাঘের পায়ের দাগ দেখে লোকগুলো ফ্যাসাদে পড়ল। তারপর রাইফেল-হাতে আমরা ঐ জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি দেখে ওরাও বোধহয় খালি হাতে ঐ অকুস্থলে থাকা নিরাপদ নয় ভাবল।
আমরা একটু এগোতেই দেখি উপুড়-করা খাঁটিয়া মাথার উপর নিয়ে পেছন পেছন আসছে পুরো দল বড় বড় পা-ফেলে।
টেড বলল, চল্ আমরা ফিরে যাই। এখানে দেখছি টিকায়েতকেই আগে মারতে হবে, তারপর বাঘ মারার বন্দোবস্ত। এতরকম কমপ্লিকেশান, এত জনের এত মতো নিয়ে মানুষখেকো বাণ মারা যায় না।
আমি বললাম, যা বলেছি! গ্রাম থেকে আমরা প্রায় মাইলখানেক এসেছিলাম। বুড়ির ঘরে নয়। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে আমাদের জন্যে দুটি ঘর ছেড়ে দিয়েছে ওরা! গোবর দিয়ে উঠোন লেপে দিয়েছে। ঘরের ভিতরও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেছে। কিন্তু গরমের মধ্যে জানলাহীন ঐ ঘরে কী করে শোব রাতে তাইই ভাবছিলাম।
টিরিদাদা চা করে ব্রেকফাস্ট তৈরি করে ফেলল, আমাদের দেখেই।
মুড়ি ভাজা। তার মধ্যে কাঁচা পেঁয়াজ কাঁচা লঙ্কা কেটে মুড়ির সঙ্গেই ভেজেছে। তারপর তার মধ্যে ওমলেট কেটে টুকরো টুকরো করে দিয়ে দিয়েছে। গ্রামের গাছের ল্যাংড়া আম। আর কফি।
ঘর দুটোর পাশে একটা মস্ত তেঁতুলগাছ ছিল। তার তলায় চৌপাই বিছিয়ে আমি লম্বা হয়ে শুলাম। আর সাহেব মানুষ টেড, ঘটিতে জল নিয়ে ফর্সা-ফর্সা ঠ্যাং বের করে লাল গামছা পরে জঙ্গলে গেল! যারা জঙ্গলে যাওয়া-আসা করে প্রত্যেকেরই অভ্যেস থাকে।
তেঁতুলতলার ফুরফুরে হাওয়াতে আমি ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। এমন সময় হঠাৎ শোরগোল শুনে তাকিয়ে দেখি ভাগলপুরী সিল্কের পাঞ্জাবী আর লোম-ওয়ালা গোবদা গোবদা পা-দেখানো মিলের ফিনফিনে ধুতি পরা, সোনার হাত-ঘড়ি হাতে, চকচকে কালো নাগরা পায়ে একজন মস্ত লম্বা-চওড়া লোক একটা সাদা ঘোড়ায় চড়ে এদিকে আসছে আর তার পিছনে কুড়ি-পঁচিশজন লাঠিধারী ষণ্ডা-মাকা লোক।
আমি আরামের ঘুম ছেড়ে তাড়াতাড়ি চৌপাইতে উঠে বসলাম।
ঠিক আমার সামনে এসে লোকটি দাঁড়িয়ে পড়ে ধমক দিয়ে শুধোল, আকী শুভ নাম?
আমি নাম রলোম। সবিনয়ে।
টিকায়েত বলল, তাঁর এলাকাতে এসব তিনি সহ্য করবেন না। এই পলাশবনা গ্রামে সব কিছু তাঁর ইচ্ছামতোই হয়েছে এযাবৎ এবং হবে চিরদিন।
ভাবছিলাম, এতবড় একটা বিপদ! কোনদিন বাঘ কাকে নেয় তার ঠিক নেই। তারপর আজ দেখা গেল জোড়া বাঘ। গ্রামের গরীব লোকগুলো এতদূর থেকে আমাদের ডেকে নিয়ে এল আর যে গ্রামের মালিক, মাথা, তারই কি না এই ব্যবহার?
লোকটার দিকে অবাক চোখে চেয়ে আমি বসেছিলাম। এমন লোককে কিছুই বলার নেই।
এমন সময় টেডকে আসতে দেখা গেল। টিকায়েতের মুখ দেখে মনে হল, এমন সাহেব টিকায়েত বাপের জন্মেও দেখেনি। টকটকে গায়ের রঙ, মাথাভরা বাদামী চুল, খালি গা, পায়ে চটি, লাল গামছা পরে সাহেব ঘটি হাতে টাঁড় থেকে প্রাতঃকৃত্য শেষ করে আসছে।
টেড এসেই বলল, এখানে ভিড় কিসের?
তখনও তো দেশ স্বাধীন হয়নি। সাদা চামড়া দেখলেই লোকে বেশ সমীহ করত। কিন্তু এই রকম গামছা-পরা সাহেবকে সমীহ করা ঠিক হবে কি না, একটু ভাবল টিকায়েত। তারপর নিজের লোকদের সামনে ইজ্জৎ বাঁচাবার জন্যে বলল, আপনাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।
টেড বলল, সে কথা ভেবে দেখব। কিন্তু এখুনি আপনার একজন লোক দিন আমাকে। আমি এস-ডি-ও সাহেবের কাছে চিঠি পাঠাব, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে এই বাঘকে ম্যান-ইটার’ ডিক্লেয়ার করার জন্যে এবং চার পাশের সব গ্রামের মানুষদের চেঁড়া পিটিয়ে সাবধান করে দেওয়ার জন্যে।
টিকায়েত, টেড-এর হর্তাকর্তার মতো কথা শুনে হকচকিয়ে গেল বলে মনে হল।
আমি বললাম, ঘোড়া থেকে নামা হোক। আপনার রাজত্বে এলাম, আপনাদেরই উপকার করার জন্যে, তা আপনিই শত্রুর মতো ব্যবহার করছেন!
তারপর বললাম, দয়া করে নামুন, বাঘটার খবরাখবর দিন আমাদের। বাঘও তো আপনার প্রজা। আপনি তার খোঁজ না রাখলে, আর কে রাখবে?
টিকায়েত ঘোড়া থেকে নামল।
আমি বললাম, আপনার বন্দুকটা কোথায়? শুনেছি দারুণ দামি বিলিতি বন্দুক। আমাদের একবার দেখান। নেড়ে-চেড়ে দেখি অন্তত একটু।
টেড আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। তারপর ইংরেজীতে বলল, কী ব্যাপার? অত গ্যাস দিচ্ছিস কেন?
আমিও ইংরেজীতে বললাম, মিষ্টি কথা বলতে তো পয়সা লাগে না। দ্যাখ-না, ওঁকে বন্ধু করে ফেলেছি।
টেড বলল, যেমন তুই। তোর বন্ধুও তো তেমনই হবে!
টেড জামাকাপড় পরে আসতে গেল।
টিকায়েত এসে চৌপাইতে বসল।
লোকটার বয়স আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। চল্লিশ-টল্লিশ হবে। শুনলাম, তার এগারোটা ছেলেমেয়ে, পাঁচশ বিঘা জমি, দেড়শো গরু-মোষ। জঙ্গলের মধ্যে ভাণ্ডার। বিহারের গ্রামে-জঙ্গলে ক্ষেত-খামার দেখাশোনার জন্যে মাটির বাড়ি করে এরা, তার মধ্যে গুদামটুদামও থাকে। ওরা বলে ভাণ্ডার।
টিকায়েত একটা লোককে ডেকে কী বলল। সে আরও দুজনকে সঙ্গে করে দৌড়ে চলে গেল।
আমি টিরিদাদাকে বললাম, চা করে খাওয়াও টিকায়েত সাহেবকে।
ইতিমধ্যে টেড জামা-কাপড় পরে এল। এবার ওকে পুরোদস্তুর সাহেব-সাহেব দেখাতে লাগল। টিকায়েতের ভক্তিও পুরো হল। হাব-ভাবও একটু নরম হল।
বলল, আপনারা এই ঘরে কি থাকবেন? আমার বাড়ি চলুন নয়তো ভাণ্ডারে বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। খাঁটি গাওয়া ঘি-এর পরোটা, হরিণের মাংসের আচার, ক্ষেতের ছোলার ডাল, আর তার সঙ্গে খরগোশের এবং শম্বরের মাংস খাওয়াব।
তারপর বলল, নীলগাই এখানে এত যে, ক্ষেত-খামারই করা যায় না। আমরা যে হিন্দু, তাই নীলগাই আমরা মারি না। গো-হত্যা হবে।
ওদের বুঝিয়ে লাভ নেই যে, নীল গাই-এর নামই নীল গাই, কিন্তু তারা মোটেই গরু নয়। একরকমের এন্টেলোপ। এবং এরাই এবং বাঁদর-হনুমানই সবচেয়ে ক্ষতি করে ফসলের। কিন্তু গ্রামের লোকের কুসংস্কারের জন্যে নীলগাই আর বাঁদর হনুমান মারে না আমাদের দেশে। নীলগাইকে খুব একটা মজার নামে ডাকে এরা। বলে, ঘোড়ফরাস্। নামটা শুনলেই আমার বুক ধড়ফরাস্।
টিরিদাদা চা আর হান্টলি-পামারের বিস্কিট এনে দিল টিকায়েতকে। টিকায়েত যখন প্রীত হয়ে চা খাচ্ছে, তখন যে লোকগুলো চলে গেছিল তারা এক গাদা মাঠরী আর পাড়া নিয়ে এল। নিশ্চয়ই টিকায়েতের বাড়ি থেকে।
টিকায়েত বলল, খেয়ে দেখুন। সব বাড়ির তৈরি। অসুখ হওয়ার ভয় নেই। মাঠরী খাঁটি ঘি-এ এবং বাড়ির জাঁতায়-পেষা ময়দা দিয়ে তৈরি।
টিকায়েতের ভুঁড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতেই পারছিলাম যে, ঘি সত্যিই খুব খাঁটি। চা খেতে খেতে টিকায়েতকে বললাম, তাহলে বাঘটাকে কী করা যাবে?
টিকায়েত বলল, চলুন না আমরা তিনজনেই বসি আজ। শুনলাম যে, টিলা আছে ওখানে একটা। ঐ টিলাতেই তিনজনে তিন জায়গায় বসে থাকব।
টেড আমাকে ইংরেজীতে বলল, তুই যাত্রাপার্টিতে কবে নাম লেখালি? ম্যান-ইটার মারতে তাহলে সঙ্গে তবলচী, সারেঙ্গীওয়ালাকেও নিয়ে যা!
আমি টিকায়েতকে বললাম, ঐ টিলাতে বসা খুবই বিপজ্জনক। চাঁদ নেই এখন। আর বাঘ তো অমনি বাঘ নয়; মানুষখেকো। কখন যে নিঃশব্দে এসে কাক করে ঘাড় কামড়ে নিয়ে যাবে বোঝার আগেই, তারও ঠিক নেই। তাতে আবার দুটি।
টিকায়েতের মুখে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। বলল, আপনারা তাহলে খুব বাঘ মারবেন! বাঘ মারতে সাহস লাগে।
বলেই, তাচ্ছিল্যের চোখে তাকিয়ে আবার বলল, ইয়ে বাচ্চোঁকা কাম নেহী।
আমি বললাম, তা লাগে। কিন্তু গোঁয়ার্তুমি আর সাহস এক কথা নয়। মানুষখেকো বাঘ মারতে বোকা-বোকা সাহসের চেয়ে বুদ্ধি আর ধৈর্য অনেক বেশি লাগে।
টিকায়েত বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, যা বোঝার তা বুঝেছি। আপনাদের মতো বাচ্চা ছেলেদের কর্ম নয় এই বাঘ মারা।
তারপরই বলল, বাজীই লাগান একটা তাহলে।
আমার খুব রাগ হল আমাদের বাচ্চা বলাতে।
টেড বলল, বাজী কিসের?
বাঘ কে মারবে? বাঘ মারার বাজী।
আমি বললাম, বাঘ মরলেই হল। কে মারে সেটা অবান্তর।
টিকায়েত আবার বলল, বুঝেছি। ভয় পেয়ে পেছিয়ে যাচ্ছেন।
তারপর আবার বলল, বলুন কী বাজী? সাহস আছে? কী হল? বাজী ধরবারও সাহস নেই?
টেড হঠাৎ বলল, বাজী একটা রাখা যাক। কিন্তু অন্য বাজী। বাঘ আগে আপনাকে খাবে, না আমাদের খাবে? আমাদের তো এখানে কেউই নেই। আমার বন্ধুকে খেলে তাকে ভালভাবে সৎকার করবেন। আর আমাকে খেলে, জঙ্গলের মধ্যে একটা সুন্দর ফুল গাছের নীচে ছায়াওয়ালা জায়গায় কবর দেবেন।
তারপর একটু চুপ করে থেকে লোকজনদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলল, আর আপনি মরলে, আমরা দাঁড়িয়ে থেকে আপনাকে দাহ করার বন্দোবস্ত করব। নদীর পারে।
টিকায়েত বেজায় চটল। বলল, বুঝেছি।
টেড আবার বলল, কী হল? বাজীর?
টিকায়েত বলল, আপনাদের বাজীর মধ্যে আমি নেই। আমি একাই বসব আজ বাঘের জন্যে।
আমি বললাম, বসেনই যদি, তাহলে টিলায় বসবেন না, আমার অনুরোধ।
ভেবে দেখব।
টেড বলল, একজন লোক দিন, যাতে দিনে দিনে এস-ডি-ওর কাছে যেতে পারে। এস-ডি-ও আবার ডিএমকে জানাবেন তবে তো ম্যান-ইটার ডিক্লেয়ার করতে পারবেন।
লোকের কি অভাব? লোক দিয়ে দিচ্ছি দেড়-বোঝা। আপনি চিঠি লিখে দিন।
টিকায়েত বলল।
টেড টিরিদাদাকে কাগজ আনতে বলল।
টিরিদাদা কাগজ আনলে চিঠি লিখে সই করল, আমাকেও সই করতে বলল। টিকায়েতকে বলল সই করতে গ্রামের লোকেদের হয়ে।
টিকায়েত লেখাপড়া জানে না। ডানহাতের ইয়া মোটকা বুড়ো আঙ্গুলে কালি লাগিয়ে টিপসই দিল সে।
তারপরেই উঠে পড়ে বলল, আমি যাই। মাচা বাঁধার বন্দোবস্ত করি গিয়ে।
টেড বলল, তা যান। আমরা আজ খুব ঘুমোব। কাল আপনাকে দাহ করতে অনেক মেহনত হবে তো! যা ঘি আছে আপনার শরীরে! পুড়তে অনেক সময় লাগবে।
টিকায়েত হাসি হাসি মুখে বলল, চলি।
বলেই, ঘোড়ার দিকে এগোতে গেল।
টেড বলল, একটু দাঁড়ান। আপনিই তো গত বছরে বাঘটাকে গুলি করেছিলেন। কোথায় লেগেছিল গুলি? আপনি কি জানতেন না যে, গরমে যখন পিপাসার্ত জানোয়ারেরা জল খেতে আসে তখন তাদের ঐভাবে মারা বে-আইনী?
টিকায়েত হেসে বলল, জঙ্গলে আবার আইন কী? আমার এখানে আইন আমি বানাই। আমি যা করি, তাইই আইন। আমরাই আইন, আমি ইচ্ছেমতোই ভাঙতে পারি। তার জন্যে কারও কাছে জবাবদিহি করতে রাজী নই। সে রকম বাপের ব্যাটা নই আমি। জাভি যায়গা তভি নেহী! কভভি নেহী।
তা ভাল। টেড বলল, কিন্তু বাঘটাকে আহত করে আপনিই তো বুড়ি আর মেয়েটির মৃত্যুর জন্যে দায়ী হলেন। আপনাকে আপনার প্রজারা খুনের দায়ে দায়ী করতে পারে। কাছেও হয়তো মনে মনে।
টিকায়েত কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, দেখুন, আপনাদের সঙ্গে ফালতু কথা বলার সময় আমার নেই। আমার রাজত্বে আপনারা অতিথি, তাই ভাল ব্যবহার করছি। আমি দিগা টিকায়েতের বেটা। আমার বাবা ডাকাত ছিল। তার ভয়ে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। আমাকে আপনারা ভয় দেখাবেন না। আমার রক্ত ভয় কাকে বলে তা জানে না। এই জঙ্গলের আমিই রাজা। আপনারা হয়তো বুঝতে পারবেন না আমার কথা, কী আমি বলতে চাচ্ছি। কিন্তু শুধু এই কারণেই বাঘটাকে আমারই মারতে হবে। নইলে আমার ইজ্জৎ থাকবে না।..
একটু চুপ করে থেকে টিকায়েত আবার বলল, এই টাঁড়বাঘোয়া, যতদিন প্রজার মতো আমার রাজত্বে ছিল, ওকে কিছুই বলিনি। গত বছরে আমার একটা ঘোড়া খেয়েছিল, তাইই ভেবেছিলাম শাস্তি দেওয়া দরকার। এবার আমার দৃজন প্রজাকে ও মেরেছে!
একটু চুপ করে থেকে বলল, সমঝা না, এক জঙ্গলে দুজন রাজা থাকতে পারে না। হয় আমি থাকব; নয় টাঁড়বাঘোয়া থাকবে। আপনাদের সঙ্গে আমার কোনও ঝগড়া নেই। দয়া করে আমার কথাটা বুঝুন। এটা আমার সম্মানের ব্যাপার। আমাকে আগে চেষ্টা করতে দিন। আমি না পারলে বা আপনাদের অনুমতি দিলে তখনই আপনারা মারবেন।
টেড বলল, তা হয় না। আমাদেরও একটা দায়িত্ব আছে। প্রথমত একনলা বন্দুক দিয়ে অতবড় বাঘকে আপনার মারতে যাওয়াটাই বোকামি। দ্বিতীয়ত গ্রামের লোকরা আমাদের ডেকে এনেছে তাদের এতবড় বিপদের মধ্যে ফেলে আমরা চলে তো আর যেতে পারি না।
টিকায়েত, বলল, বাঘ কি কেউ শুধুই বন্দুক দিয়ে মারে? আমার বন্দুকের গুলির সঙ্গে আমার টিকায়েতের রক্ত, আমার রাগ, আমার ঘেন্না, সব কিছুই তো গিয়ে লাগবে টাঁড়বাঘোয়ার গায়ে। সে যত বড় বাঘই হোক না, আমার চোখে চোখ রাখতে পারবে? পারে কোনও প্রজা রাজার চোখে চোখ রাখতে? আমার কাছে এলেই ও ভয়েই মারা যাবে। সামনাসামনি এলে হয় একবার।
আমরা টিকায়েতের কথা শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। অদ্ভুত মানুষ। এরকম মানুষ আমরা কেউই দেখিনি আগে। পড়িওনি কোনও বইয়ে।
টেড বলল, তাইই যদি হবে, তাহলে গত বছর আপনার গুলি খেয়ে ও বেঁচে গেল কী করে? এমন গুলিশোর বাঘকে প্রজা বানালেনই বা কেন?
টিকায়েত মাথা নিচু করে চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, ও আমাকে দেখতে পায়নি। আমিও ওকে দেখতে পাইনি। সেদিন আমার ছোটছেলের জন্মদিন ছিল। বাড়ির লোককে কোটরা হরিণের মাংস খাওয়ার কথা দিয়ে জলের কাছে গিয়ে বসেছিলাম। বেলা পড়ে এসেছিল। প্রচণ্ড গরমে, ক্লান্তিতে, ঘুম ঘুম এসে গেছিল। হঠাৎ দেখি, জলের পাশের পুটুস ঝোঁপের আড়ালে কোটরা হরিণের মতো লালচে কী একটা জানোয়ার এসে দাঁড়িয়েছে। কখন যে এল জানোয়ারটা তা বুঝতেই পারিনি। হরিণই হবে ভেবে গুলি করে দিয়েছিলাম বন্দুক তুলেই। গুলি করতেই বিকট চিৎকার করে এক বিরাট লাফ দিয়ে যখন সে চলে গেল, তখন দেখি টাঁড়বাঘোয়া।
কোথায় গুলি লেগেছিল?
জানি না। বোধহয় পায়ের থাবা-টাবাতে।
কি গুলি দিয়ে মেরেছিলেন?
তখন আমার বিলিতি বন্দুক ছিল না। মুঙ্গেরি গাদা বন্দুকে তিন-আঙুল বারুদ কষে গেদে সামনে সীসার গুলি পুরে ঠুকে দিয়েছিলাম।
আমি বললাম, আপনি একটু আগেই বললেন যে, টাঁড়বাঘোয়াকে আপনার ঘোড়া খাওয়ার জন্য শাস্তি দিতে গেছিলেন।
আমার ঘোড়া এবং বস্তীর ধোপার গাধা। ওরা সকলেই আমার প্রজা। তাই আমারই হল। শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাঘ ভেবে তো আর গুলি করিনি। কোটরা ভেবেই করেছিলাম। অত কাছ থেকে গুলি লাগলে কোরা চিৎপাত হয়ে পড়ে যেতই। বাঘ জানলে, ভাল করে নিশানা নিয়ে মোক্ষম জায়গাতেই মারতাম। তাহলে ওখানেই তাকে শুয়ে থাকতে হত। তখন আমার রাশিচক্রের একটু গোলমাল চলছিল। এখন তা কেটে গেছে।
বলেই বলল, এই দেখুন, একটা মাদুলী ধারণ করেছি, বলেই, পাঞ্জাবীর ভিতর থেকে সোনার হারে বাঁধা পেল্লায় একটা মাদুলী দেখাল।
টেড বলল, আমাদের শুভ কামনা রইল। কিন্তু আপনি তাহলে তিনদিন সময় নিন। তিনদিনের মধ্যে রাজায় রাজায় যুদ্ধ শেষ না হলে আমরা এই উলুখাগড়ারাও কিন্তু নেমে পড়ব যুদ্ধে। আপনার কথাটা আমরা বুঝেছি, বোঝবার চেষ্টা করছি বলেই, এই কথা বলছি। এবং আগে আপনাকে সুযোগ দিচ্ছি। আপনার বাঘ আপনিই মারুন।
টিকায়েত এতক্ষণে হাসল।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, বজরঙ্গবলী আপনাদের ভাল করুন। আমি জানতাম, আমার কথা আপনারা বুঝবেন। আপনাদের বহত মেহেরবানী। জয় বজরঙ্গবলীকা জয়!
এই বলে তো ঘোড়ায় গিয়ে উঠল টিকায়েত। বিরাট সাদা ঘোড়াটার ঘাড়ের কেশর ফুলে উঠেছিল। সেই ঘোড়ার উপর এই পলাশবনা গ্রামের টিকায়েতকে রোদে সত্যি সত্যিই একজন রাজার মতোই দেখাচ্ছিল।
ঘোড়ার লাগাম টেনে টিকায়েত বলল, আপনারা কিন্তু আমার অতিথি। খাওয়া-দাওয়া, সব আমারই দায়িত্ব। এখানে আপনারা রান্না করে খেলে আমি খুবই দুঃখ পাব। রান্না যদি একান্তই করেনই, তবু রসদ কিন্তু সব আমিই পাঠিয়ে দেব। এইটুকু নিশ্চয় করতে দেবেন আমাকে।
জবাবে আমাদের কিছু বলার সুযোগ না-দিয়েই টিকায়েত ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল সেই টিলার দিকে, যেখানে বুড়ি পড়ে রয়েছে।
আমি বললাম, রাজা রাজড়ার ব্যাপারই বটে। ঘোড়ায় চড়ে, শোভাযাত্রা করে কেউ মানুষখেকো বাঘ মারতে যায় শুনেছিস কখনও টেড?
রোদের মধ্যে লাল ধুলো উড়িয়ে দুকি-চালে-চলা সাদা ঘোড়ার পিঠে বসা টিকায়েত জঙ্গলের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
টেড সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে হঠাৎ বলল, খুব ইন্টারেস্টিং কিন্তু মানুষটা।
আমি বললাম, ভীষণ দাম্ভিক। এত গর্ব ভাল নয়।
টেড বলল, আমি তোর সঙ্গে একমত নই। গর্ব না থাকলে কী নিয়ে মানুষ বাঁচে। গর্বর মধ্যে দোষ নেই। কিন্তু টিকায়েতের গর্বর কারণটার মধ্যে কোনও গুণও নেই। এই গর্ব ভাল কারণে, ভাল কাজের জন্যে হলে আরও ভাল হত।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, জানিস, আমার মনে হয়, গর্ব। ব্যাপারটার নিজেরই আলাদা একটা গুণ আছে। একটা বেগও আছে। যার গর্ব আছে, তার দায়িত্ব অনেক, সেই গর্বকে বাঁচিয়ে রাখার। আর এই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে করতেই এ সব মানুষ অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। তাই না? দেখিস, মানুষটার এমন জেদ, ঠিক বাঘটা মেরেই দেবে। আমাদের কপালে আর মানুষখেকো মারা হল না। মিছিমিছিই এলাম এতদূর তল্পিতল্পা নিয়ে।
টিরিদাদা চায়ের কাপ তুলে নিতে এসেছিল, হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলল, বাঘে খাবে ওকে। বাঘে খাবে।
টেড ধমক দিল, কেন বাজে কথা বলছ টিরিদাদা?
টিরিদাদা বলল, বাজে কথা নয়। ও যখন কথা বলছিল, আমি তখন যমদূতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি ওর একেবারে পিছনে। ওর আয়ু শেষ।
আমি রেগে গিয়ে বললাম, যত্ত সব বাজে কুসংস্কার তোমার টিরিদাদা। টিরিদাদা অভিমানের গলায় বলল, আরে! আমি দেখলাম যে নিজের চোখে।
তারপর গলা নামিয়ে বলল, টিকায়েত হচ্ছে দিগা টিকায়েতের বেটা আর আমি হচ্ছি মিরি-পাহানের বেটা। আমিও সব দেখতে পাই। সত্যিই দেখেছি যমদূতকে! বিশ্বাস করো।
টিরিদাদার কথা যেন শোনেইনি এমনভাবে অন্যমনস্ক গলায় টেড দূরে তাকিয়ে হঠাৎই বলল, তোদের দেশে এইরকম গর্বিত, উদ্ধত সব মানুষ থাকতেও ব্রিটিশরা তোদেরে পরাধীন করে রাখল যে কী করে এতবছর তা ভাবলেও অবাক লাগে।
